All rights reserved]{ মূল্য—আ০

অষ্টম খণ্ড।

বহদারণ্যকোপনিষদ্

(তৃতীয় ভাগ)

মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্য-বেদান্ত-তীর্থ- কর্ত্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত।

তৃতীয় সংস্করণ।

প্রকাশক

শ্রীসুবোধচন্দ্র মজুমদার।

দেব সাহিত্য কুটীর প্রাইভেট লিঃ ২১, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা। সন ১৩৩৯ সাল

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।

৮০১

সর্ব্ববিশেষণোপলক্ষণার্থং সর্ব্বান্তরগ্রহণম্। যৎ সাক্ষাৎ অব্যবহিতং অপরোক্ষাৎ অগৌণং, ব্রহ্ম বৃহত্তমম্ আত্মা সর্ব্বস্য সর্ব্বস্যাভ্যন্তরঃ, এতৈগুণৈঃ সমস্তৈরুক্ত এষঃ। কোহসৌ তবাত্মা? যোহয়ৎ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতস্তব, স যেনাত্মনা আত্মবান্, ল এষ তবাত্মা-তব কার্য্যকরণসঙ্ঘাতস্যেত্যর্থঃ। তত্র পিণ্ডঃ, তস্যাভ্যন্তরে লিঙ্গাত্মা করণসঙ্ঘাতঃ, তৃতীয়ো যশ্চ সন্দিহ্যমানঃ, তেষু কতমঃ মমাত্মা সর্ব্বান্তরত্ত্বয়া বিব- ক্ষিতঃ-ইত্যুক্ত ইতর আহ-যঃ প্রাণেন মুখনাসিকাসঞ্চারিণা প্রাণিতি প্রাণচেষ্টাং করোতি, যেন প্রাণঃ প্রণীয়তইত্যর্থঃ; স তে তব কার্য্যকরণসংঘাতস্য আত্মা বিজ্ঞানময়ঃ; সমানমন্যৎ। যঃ অপানেন অপানীতি, ব্যানেন ব্যানীতীতি ছান্দসং দৈর্ঘ্যম্। সর্ব্বাঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতগতাঃ প্রাণনাদিচেষ্টা দারুযন্ত্রস্যেব যেন ক্রিয়ন্তে -ন হি চেতনাবদনধিষ্ঠিতস্য দারুযন্ত্রস্যেব প্রাণনাদিচেষ্টা বিদ্যন্তে; তস্মাদ্বিজ্ঞান- ময়েন অধিষ্ঠিতং বিলক্ষণেন দারুযন্ত্রবৎ প্রাণনাদিচেষ্টাং প্রতিপদ্যতে; তস্মাৎ সোহস্তি কার্য্যকরণসঙ্ঘাতবিলক্ষণঃ, যশ্চেষ্টয়তি ॥১৬৮৷৷১৷৷

টীকা। ভুজ্যুপ্ৰশ্ননির্ণয়ানন্তর্য্যমপশব্দার্থঃ। সংবোধনমভিমুখীকরণার্থম্। দ্রষ্টুরব্যবহিতমিত্যুক্তে ঘটাদিবদব্যবধানং গৌণমিতি শক্যত, তন্নিরাকর্তুমপরোক্ষাদিত্যুক্তম্। মুখ্যমেব দ্রষ্টুবব্যবহিতং স্বরূপং ব্রহ্ম। তথা চ, দ্রষ্ট্রধীনসিদ্ধত্বাভাবাৎ স্বতোহপরোক্ষমিত্যর্থঃ। শ্রোত্রং ব্রহ্ম মনো ব্রহ্মেত্যাদি যথা গৌণং, ন তথা গৌণং দ্রষ্টুরব্যবহিত’ ব্রহ্মান্বিতীয়ত্বাদিত্যাহ-ন শ্রোত্রেতি। উক্তমব্যবধানমাকাঙ্ক্ষাদ্বারাহনন্তরবাক্যেন সাধয়তি-কিং তদিত্যাদিনা। তস্য পরিচ্ছিন্নত্ব- শঙ্কাং বারয়তি-সর্বস্যেতি। সর্বনামভ্যাং প্রত্যগব্রহ্ম বিশেষ্যং সমর্প্যতে, ইতরৈস্ত শব্দৈ- বিশেষণানীতি বিভাগমভিপ্রেত্যাহ-যদ্যঃশব্দাভ্যামিতি। ইতিরুচ্যত ইত্যনেন সংবধ্যতে। ইতিশব্দো দ্বিতীয়ঃ প্রশ্নসমাপ্ত্যর্থঃ। তমেব প্রশ্নং বিবৃণোতি-বিস্পষ্টমিতি। ১

ত্বমর্থে বাক্যার্থান্বয়যোগ্যে পৃষ্টে তৎপ্রদর্শনার্থং প্রত্যুক্তিমবতারয়তি-এবমুক্ত ইতি। সর্ব্বান্তর ইতি বিশেষোক্ত্যা প্রশ্নস্য বিশেষান্তরাণামনাস্তামাশঙ্ক্যাহ-সর্বাবিশেষণেতি। এষ সবান্তর ইতিভাগন্যার্থং বিবৃণোতি-যৎ সাক্ষাদিতি। এষ-শব্দার্থং প্রশ্নপূর্ব্বকমাহ-কোহ- সাবিতি। আত্মশব্দার্থং বিবৃণোতি-যোহয়মিতি। যেনেত্যত্র সশব্দো দ্রষ্টব্যঃ। ষষ্ঠ্যর্থং স্পষ্টয়তি-তবেতি। প্রশ্নান্তরমুখাপ্য প্রতিবক্তি-তত্রেত্যাদিনা। সব্বান্তরস্তবাত্মেত্যুক্তে সতীতি যাবৎ। তৃতীয়ো মাতৃ-সাক্ষী প্রণীয়তে প্রাণনবিশিষ্টঃ ক্রিয়ত ইতি যাবৎ। কথমেতাবতা সন্দেহোহপাকৃত ইত্যাশঙ্ক্য বিবক্ষিতমনুমানং বক্তুং ব্যাপ্তিমাহ-সর্বা ইতি। যা খল্বচেতন- প্রবৃত্তিঃ সা চেতনাধিষ্ঠানপূর্ব্বিকা, যথা রথাদিপ্রবৃত্তিরিত্যর্থঃ। যেন ক্রিয়ন্তে সোহস্তীতি সংবন্ধঃ। দৃষ্টান্তস্থ্য সাধ্যবৈকল্যং চেতনাধিষ্ঠানং পরিহরতি-ন হীতি। সংপ্রত্যনুমানমারচয়তি- তস্মাদিতি। বিমতা চেষ্টা চেতনাধিষ্ঠানপূর্ব্বিকাহচেতনপ্রবৃত্তিত্বাদ্রখাদিচেষ্টাবদিত্যর্থঃ। প্রতি- পদ্যতে প্রাণাদীতি শেষঃ। অনুমানফলমাহ-তস্মাৎ সোহস্তীতি। চেষ্টয়তি কার্যকরণসংঘাত- মিতি শেষঃ ॥১৬৮৷৷১॥

3

৮০২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ভাষ্যানুবাদ।—অতঃপর, এই উষস্তনামক চাক্রায়ণ—চক্রঋবির পুত্র পূর্ব্বোক্ত যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। যে ব্রহ্ম সাক্ষাৎ—কোন বস্তু দ্বারা ব্যবহিত নয়, এমন অপরোক্ষ অর্থাৎ দ্রষ্টার মুখ্য প্রত্যক্ষাত্মক, কিন্তু ‘শ্রোত্রই ব্রহ্ম, মনই ব্রহ্ম’ ইত্যাদিস্থানীয় ব্রহ্মের ন্যায় ইহা গৌণ বা অমুখ্য ব্রহ্ম নহে। ভাল, তাহা কি? না, তাহা আত্মা। আত্মা-শব্দে এখানে প্রত্যক্-আত্মা বুঝাই- তেছে; কারণ, আত্মা-শব্দটা ঐরূপ অর্থেই প্রসিদ্ধ; সর্ব্বান্তর অর্থ—সকলের অভ্যন্তরস্থ;[ক্লীবলিঙ্গ] ‘যৎ’ ও[পুংলিঙ্গ] ‘যঃ’ শব্দ থাকায় বুঝা যাইতেছে যে, প্রসিদ্ধ আত্মা ও ব্রহ্ম একই বস্তু,(কিন্তু কেহ কাহারো অতিরিক্ত নহে); সেই সর্ব্বপ্রেরক আত্মার স্বরূপ আমাকে ব্যাখ্যা করিয়া বলুন—বেশ স্পষ্ট করিয়া— শৃঙ্গে ধরিয়া যেমন গরু দেখায়, তেমনি ‘ইহাই সেই আত্মা’ এইরূপ করিয়া আমার নিকট বলুন। ১

এই কথার উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-ইহাই তোমার জিজ্ঞাসিত সর্ব্বান্তর -সকলের অভ্যন্তরস্থ আত্মা; যাহা সাক্ষাৎ সম্বন্ধে-ইন্দ্রিয়াদিকৃত ব্যবধান রহিতভাবে মুখ্য ব্রহ্ম-সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ ও সর্ব্বান্তর-সকলের অভ্যন্তরস্থ অর্থাৎ উক্ত সমস্ত বিশেষণ-বিশিষ্ট আত্মা। এখানে ‘সর্ব্বান্তর’ বিশেষণটি অপরাপর আত্মগুণেরও সম্বন্ধজ্ঞাপক। তুমি যে আত্মার নির্দেশ করিয়াছ, সেই আত্মাটি কে? তোমার এই যে দেহেন্দ্রিয়-সমষ্টি, ইহা যে আত্মা দ্বারা আত্মবান্(চেত- নায়মান হইতেছে), তাহাই তোমার অর্থাৎ দেহেন্দ্রিয়সমষ্টির সর্ব্বান্তর আত্মা। প্রথমে স্কুল দেহপিণ্ড, তাহার অভ্যন্তরে ইন্দ্রিয়াদি-সমষ্টিভূত লিঙ্গাত্মা(সুক্ষ্ম দেহ), এবং যে আত্মার সম্বন্ধে সন্দেহ হইতেছে, তাহা হইতেছে তৃতীয়; এই তিনটির মধ্যে কোন্টিকে তুমি আমার সর্ব্বান্তর আত্মা বলিয়া বুঝাইতে ইচ্ছা করিতেছ? উষস্ত এই কথা বলিলে পর, যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-যে আত্মা মুখ ও নাসিকাপ্রভৃতি স্থানে সঞ্চরণশীল প্রাণের দ্বারা প্রাণন করিতেছে-প্রাণ-চেষ্টা করিতেছে, অর্থাৎ এই প্রাণ যাহার দ্বারা স্বকার্য্যে প্রেরিত হইতেছে, তাহাই হইতেছে-দেহেন্দ্রিয়- সংঘাতময় তোমার বিজ্ঞানময়(জীবরূপী) আত্মা; পরবর্তী অন্যান্য অংশের অর্থও এতদনুরূপ। যিনি অপানবায়ু দ্বারা অপানব্যাপার করিয়া থাকেন, এবং যিনি ব্যান বায়ু দ্বারা ব্যানচেষ্টা করিয়া থাকেন,(তাহাই তোমার অভিমত সর্ব্বান্তর আত্মা); ‘অপানীতি’ ও ‘ব্যানীতি’ পদ দুইটীর হ্রস্ব ইকার বৈদিক নিয়মানুসারে দীর্ঘ হইয়াছে। বুঝিতে হইবে যে, দারুময় যন্ত্রের ন্যায় দেহে- ন্দ্রিয়াদিতে প্রাণনাদি(শ্বাসপ্রশ্বাসাদি) সমস্ত চেষ্টা যাহার সাহায্যে নিষ্পন্ন

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।

৮০৩

হইয়া থাকে,—দারুযন্ত্র যেমন কোনও চেতনকর্তৃক অধিষ্ঠিত বা পরিচালিত না হইয়া কোন প্রকার চেষ্টা করিতে সমর্থ হয় না, তেমনি প্রাণাদি করণবর্গও অপর কোনও চেতনের অধিষ্ঠান ব্যতিরেকে শ্বাসপ্রশ্বাসাদি নিজ নিজ ক্রিয়া সম্পাদন করিতে পারে না; বুঝিতে হইবে যে, অচেতন-বিলক্ষণ(চেতন) বিজ্ঞানময় জীবাত্মাকর্তৃক অধিষ্ঠিত হইয়াই প্রাণাদি-করণবর্গ কাঠনির্ম্মিত যন্ত্রের ন্যায় নিজ নিজ প্রাণনাদি ব্যাপার সম্পাদন করিতে সমর্থ হয়। অতএব [স্বীকার করিতে হইবে যে,] দেহেন্দ্রিয়াদি-বিলক্ষণ এমন একটি পদার্থ(চেতন আত্মা) নিশ্চয়ই আছে, যাহা অভ্যন্তরে থাকিয়া প্রাণনাদি কার্য্য নির্ব্বাহ করিতেছে ॥১৬৮৷৷১৷৷

স হোবাচোষস্তশ্চাক্রায়ণো যথা বিক্রয়াদসৌ গৌরসাবশ্ব ইত্যেবমেবৈতদ্ব্যপদিষ্টং ভবতি যদেব সাক্ষাদপরোক্ষাদ্বহ্ম,—য আত্মা সর্ব্বান্তরস্তং মে ব্যাচক্ষেতি, এষ ত আত্মা সর্ব্বান্তরঃ, কতমো যাজ্ঞবল্ক্য সর্ব্বান্তরঃ।

ন দৃষ্টেদ্রষ্টারং পশ্যেন শ্রুতেঃ শ্রোতারংশৃণুয়াঃ ন মতেৰ্ম্মন্তারং মন্ত্রীথা ন বিজ্ঞাতের্বিজ্ঞাতারং বিজানীয়াঃ। এষ ত আত্মা সর্ব্বান্তরোহতোহন্যদার্তম্, ততো হোষস্তশ্চাক্রায়ণ উপররাম ॥১৬৯৷২৷৷

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি তৃতীয়াধ্যায়স্য চতুর্থং ব্রাহ্মণম্ ॥৩॥৪॥

সরলার্থঃ।—[ইতোহপি বিস্পষ্টতয়া আত্মস্বরূপপ্রদর্শনায় যাজ্ঞবল্ক্যং নিযো- জয়িতুম্ উষস্তঃ প্রক্রমতে “স হোবাচ” ইত্যাদি]। সঃ(উষস্তঃ) চাক্রায়ণঃ উবাচ হ—যথা[কশ্চিৎ]—‘অসৌ গৌঃ, অসৌ অশ্বঃ’ ইতি বিক্রয়াৎ(‘অসৌ’-পদেন পরোক্ষতয়া নির্দ্দিশেৎ), এবমেব(যথোক্তগবাশ্বনির্দেশবৎ এব) এতৎ(ব্রহ্ম) ব্যপদিষ্টং(ত্বয়া উপদিষ্টং) ভবতি,[অপরোক্ষতয়া ব্রহ্ম প্রতিপাদয়িতুং প্রবৃত্তেন ত্বয়া যৎ প্রাণনাদি-চেষ্টাদ্বারা পরোক্ষতয়া প্রতিপাদিতং, নৈতৎ ন্যায্যমনুষ্ঠিতমিতি ভাবঃ];[অতঃ] যৎ এব(নিশ্চয়ে) সাক্ষাৎ অপরোক্ষাৎ(অপরোক্ষং) ব্রহ্ম, যঃ আত্মা সর্ব্বান্তরঃ, তং(আত্মানং) মে(মহ্যং) ব্যাচক্ষ(স্পষ্টং কথয়),[যদি শক্লোষি ইতি ভাবঃ]।[এবমুক্তঃ যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] এষঃ(বক্ষ্যমাণঃ) তে (তব) দেহেন্দ্রিয়-সমুদায়াত্মকস্য সর্ব্বান্তরঃ আত্মা।[উষন্তঃ তদ্বিশেষ-জিজ্ঞা-

৮০৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সয়া পুনরাহ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, কতমঃ সর্ব্বান্তরঃ?(স্কুল-সূক্ষ্মদেহ-বিজ্ঞাতৃষু মধ্যে কঃ ত্বয়া সর্ব্বান্তরো বিবক্ষিতঃ?)[অবিশেষস্য আত্মনঃ ঘটাদিবৎ ইদন্তয়া নির্দ্দিষ্ট- মশক্যতয়া পরোক্ষতয়ৈব তৎ বিজ্ঞাপয়িষ্যন্ যাজ্ঞবল্ক্য আহ-হে উষস্ত,] দৃষ্টেঃ (বুদ্ধিবৃত্তেঃ) দ্রষ্টারং(স্ব-প্রকাশেন প্রকাশয়ন্তং) ন পশ্যেঃ(দৃষ্টিবিষয়ং ন কুৰ্য্যাঃ, “যেনেদং জানতে সর্ব্বং, তং কেনান্যেন জানতাম্” ইত্যাশয়ঃ); তথা শ্রুতেঃ(শ্রবণজন্যজ্ঞানস্য) শ্রোতারং ন শৃণুয়াঃ; মতেঃ(মনোবৃত্তেঃ) মন্তারং (প্রকাশকং) ন মন্ত্রীথাঃ; তথা, বিজ্ঞাতেঃ(বুদ্ধিবৃত্তেঃ) বিজ্ঞাতারং(অনু- ভবিতারং) ন বিজানীয়াঃ(ন প্রকাশয়েঃ, প্রকাশকান্তরাভাবাদিত্যর্থঃ)। এযঃ (যথোক্তঃ) সর্ব্বান্তরঃ, তে(তব) আত্মা,(যঃ ত্বয়া পৃষ্টঃ); অতঃ(যথোক্তাদ আত্মনঃ) অন্যৎ(ভিন্নং দেহাদি) আর্ত্তং(বিনাশশীলমিত্যর্থঃ)। ততঃ(তস্মা- দাত্মনঃ প্রশ্নার্থনির্ণয়াৎ) উষস্তঃ চাক্রায়ণঃ উপররাম(বিরতো বভূব ইত্যর্থঃ) ॥১৬৯৷২৷৷

মূলানুবাদ:-আত্মার স্বরূপটি আরও বিশেষভাবে প্রকাশ করিবার জন্য উষস্ত পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন। উষস্ত- নামক চাক্রায়ণ বলিলেন-যেমন কোন লোক[দূরবর্তী গো, অশ্ব প্রভৃতির পরিচয় দিবার সময়] বলিয়া থাকে যে, এইরকম প্রাণীর নাম গো, আর এইরকম প্রাণীর নাম অশ্ব; তোমার প্রদত্ত আত্মতত্ত্বোপদেশও ঠিক তদ্রূপই হইয়াছে; অর্থাৎ প্রত্যক্ষবৎ নির্দেশ করিতে যাইয়া অবশেষে এইরূপ কতকগুলি কার্য্য দ্বারা তাহার পরিচয় দেওয়া হইয়াছে; ইহা তোমার পক্ষে ন্যায্য কার্য্য হয় নাই;[অতএব] যাহা ঠিক সাক্ষাৎ অপরোক্ষ(প্রত্যক্ষ) ব্রহ্ম, যাহা সর্বান্তর আত্মা, তাহাই আমাকে বিশেষ করিয়া বল।[তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] ইহাই-আমি যাহার কথা বলিয়াছি, ঠিক তাহাই তোমার অভিপ্রেত সর্বান্তর আত্মা; কিন্তু তাহার সম্বন্ধে ইহার অধিক আর কিছু বলিতে পারা যায় না; অতএব দৃষ্টির অর্থাৎ চক্ষুরিন্দ্রিয়জ জ্ঞানের যিনি দ্রষ্টা-প্রকাশক, তাহাকে দেখিবে না অর্থাৎ তাহাকে দর্শন করিবার জন্য প্রয়াস পাইবে না; শ্রবণেন্দ্রিয়জ জ্ঞানের প্রকাশককে শ্রবণ করিবে না; মতির-মনোবৃত্তি সংশয়াদির প্রকাশককে মনের দ্বারা প্রকাশ করিতে চেষ্টা করিবে না, এবং

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।

৮০৫

বিজ্ঞাতির—কর্তব্যাকর্ত্তব্য-নির্দ্ধারক বুদ্ধিবৃত্তির বোদ্ধাকে বুদ্ধি দ্বারা জানিবে না।[যাহা বলিলাম,] ইহাই তোমার জিজ্ঞাসিত সর্ব্বান্তর আত্মা; তদ্ভিন্ন আর যা‘কিছু, সমস্তই আর্ত্ত—ধ্বংসশীল। ইহার পর উষস্ত চাক্রায়ণ প্রশ্ন হইতে নিবৃত্ত হইলেন ॥ ১৬৯ ॥ ২ ॥

ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে চতুর্থ ব্রাহ্মণ ব্যাখ্যা ॥ ৩ ॥ ৪ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।—স হোবাচ উষস্তশ্চাক্রায়ণঃ—যথা কশ্চিদন্যথা প্রতিজ্ঞায় পূর্ব্বম্, পুনর্বিপ্রতিপন্নো ক্রয়াদন্যথা—অসৌ গৌঃ, অসাবশ্বঃ, যশ্চলতি ধাবতীতি বা; পূর্ব্বং প্রত্যক্ষং দর্শয়ামীতি প্রতিজ্ঞায়, পশ্চাৎ চলনাদিলিঙ্গৈঃ ব্যপ- দিশতি—এবমেব এতদ্ ব্রহ্ম প্রাণনাদিলিঙ্গৈর্ব্যপদিষ্টং ভবতি ত্বয়া; কিং বহুনা, ত্যক্তা গো-তৃষ্ণানিমিত্তং ব্যাজ্রম্, যদেব সাক্ষাদপরোক্ষাদ্ ব্রহ্ম, য আত্মা সর্ব্বান্তরঃ, তৎ মে ব্যাচক্ষেতি। ইতর আহ—যথা ময়া প্রথমং প্রতিজ্ঞাতং—তব আত্মা এবং- লক্ষণ ইতি, তাং প্রতিজ্ঞামনুবর্ত্তএব—তৎ তথৈব, যথোক্তং ময়া। ১

টীক।। প্রশ্নপ্রতিবচনয়োরননুরূপত্বমাশঙ্কতে-স হোবাচেতি। দৃষ্টান্তমেব স্পষ্টয়তি- অসাবিত্যাদিনা। প্রত্যক্ষং বা দর্শয়ামীতি পূর্ব্বং প্রতিজ্ঞার পশ্চাৎ-যশ্চলতাসৌ গৌঃ, যো বা ধাবতি সোহশ্বঃ, ইতি চলনাদিলিংঘৈর্যথা গবাদি ব্যপদিশতি, এবমেব ব্রহ্ম প্রত্যক্ষং দর্শয়ামীতি মৎপ্রশ্নানুসারেণ প্রতিজ্ঞায় প্রাণনাদিলিঙ্গৈস্তদুপদিশতস্তে প্রতিজ্ঞাহানিরনবধেয়বচনতা চ স্যাদি- ত্যর্থঃ। প্রতিজ্ঞাপ্রশ্নাবনুসর্ত্তব্যৌ বুদ্ধিপূর্ব্বকারিনেতি ফলিতমাহ-কিং বহুনেতি। প্রত্যুক্তি- তৎপর্য্যমাহ-যথেতি। প্রতিজ্ঞানুবর্ত্তনমেবাভিনয়তি-তত্তথেতি। ১

যৎ পুনরুক্তম্-তমাত্মানং ঘটাদিবদ্বিষয়ীকুরু ইতি, তদশক্যত্বাৎ ন ক্রিয়তে। কস্মাৎ পুনস্তদশক্যমিত্যাহ-বস্তু-স্বাভাব্যাৎ। কিং পুনস্তদ্বস্তস্বাভাব্যম্? দৃষ্ট্যাদি- দ্রষ্টৃত্বম্; দৃষ্টের্ডষ্টা হ্যাত্মা। দৃষ্টিরিতি দ্বিবিধা ভবতি-লৌকিকী পারমার্থিকী চেতি। তত্র লৌকিকী চক্ষুঃসংযুক্তান্তঃকরণবৃত্তিঃ, সা ক্রিয়ত ইতি জায়তে বিন- শ্যতি চ; যা তু আত্মনো দৃষ্টিরগ্যুষ্ণপ্রকাশাদিবৎ, সাচ দ্রষ্টুঃ স্বরূপত্বাৎ ন জায়তে ন বিনশ্যতি চ। সা ক্রিয়মাণয়োপাধিভূতয়া সংসৃষ্টেব ইতি ব্যপদিশ্যতে- দ্রষ্টেতি; ভেদবচ্চ-দ্রষ্টা দৃষ্টিরিতি চ। যাসৌ লৌকিকী দৃষ্টিশ্চক্ষুদ্বারা রূপোপরক্তা জায়মানৈব নিত্যয়া আত্মদৃষ্ট্যা সংসৃষ্টেব তৎপ্রতিচ্ছায়া, তয়া ব্যাপ্তৈব জায়তে, তথা বিনশ্যতি চ; তেনোপচর্য্যতে দ্রষ্টা সদা পশ্যন্নপি-পশ্যতি, ন পশ্যতি চেতি; ন তু পুনঃ দ্রষ্টুদৃষ্টেঃ কদাচিদপ্যন্যথাত্বম্। তথা চ বক্ষ্যতি ষষ্ঠে-“ধ্যায়তীব লেলায়তীব”, “ন হি দ্রষ্টুদৃষ্টের্বিপরিলোপো বিদ্যুতে” ইতি চ। ২

৮০৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

কতমো যাজ্ঞবল্ক্যেত্যাদিপ্রশ্নস্য তাৎপর্য্যমাহ-যৎ পুনরিতি। ন দৃষ্টেরিত্যাদিবাক্যস্ত তাৎপৰ্য্যং বদন্নুত্তরমাহ-তদশক্যত্বাদিতি। আত্মনো বস্তুত্বাদ্ ঘটাদিবদ্বিষয়ীকরণং নাশক্যমিতি শঙ্কতে-কম্মাদিতি। বস্তুম্বরূপমনুসৃত্য পরিহরতি-আহেতি। ঘটাদেরপি তর্হি বস্তুস্বাভাব্যান্মা ভূদ্বিষয়ীকরণমিতি মম্বানঃ শঙ্কতে-কিং পুনরিতি। দৃষ্ট্যাদিসাক্ষিত্বং বস্তুস্বাভাব্যং, ততশ্চা- বিষয়ত্বং, ন চৈবং বস্তুস্বাভাব্যং ঘটাদেরস্তীত্যুত্তরমাহ-দৃষ্ট্যাদীতি। দৃষ্ট্যাদি-সাক্ষিণোহপি দৃষ্টি- বিষয়ত্বং কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-দৃষ্টেরিতি। যথা প্রদীপো লৌকিকজ্ঞানেন প্রকাশ্যো ন স্বপ্রকাশকং জ্ঞানং প্রকাশয়তি, তথা দৃষ্টিসাক্ষী দৃষ্ট্যা ন প্রকাশ্যত ইত্যর্থঃ। দৃষ্টেরষ্টৈব নাস্তীতি সৌগতাঃ; তান্ প্রত্যাহ-দৃষ্টিরিতীতি। লৌকিকীং ব্যাচষ্টে-তত্রেতি। পারমার্থিকীং দৃষ্টিং ব্যাকরোতি-যা ত্বিতি। নম্বাত্মা নিত্যদৃষ্টিস্বভাবশ্চেৎ কথং দ্রষ্টেত্যাদিব্যপদেশঃ সিধ্যতি, তত্রাহ-সা ক্রিয়মাণয়েতি। সাক্ষ্যবুদ্ধি-তদ্বৃত্তিগতং কর্তৃত্বং ক্রিয়াত্বং চাধ্যাসিকং নিত্যদৃরূপে ব্যবহ্রিয়তইত্যর্থঃ। আত্মনো নিত্যদৃষ্টিস্বভাবত্বে কথং পণ্যতি ন পণ্যতি চেতি কাদাচিৎকো ব্যবহার ইত্যাশঙ্ক্যাহ-যাহসাবিতি। যা বহুবিশেষণা লৌকিকী দৃষ্টিঃ, অসৌ তৎপ্রতিচ্ছায়েতি সংবন্ধঃ। তথা চ যা তৎপ্রতিচ্ছায়া, তয়া ব্যাপ্তৈবেতি যাবৎ। কিমিতৌপচারিকো ব্যপদেশঃ, মুখ্যস্ত কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন ত্বিতি। দৃষ্টের্বস্ততো ন বিক্রিয়াবত্ত্বমিত্যত্র বাকাশেষমনু- কুলয়তি-তথা চেতি। ২

তমিমমর্থমাহ—লৌকিক্যা দৃষ্টেঃ কৰ্ম্মভূতায়াঃ, দ্রষ্টারং—স্বকীয়য়া নিত্যয়া দৃষ্ট্যা ব্যাপ্তারং ন পশ্যেঃ। যাসৌ লৌকিকী দৃষ্টিঃ কৰ্ম্মভূতা, সা রূপোপরক্তা ‘রূপাভিব্যঞ্জিকা ন আত্মানং—স্বাত্মনো ব্যাপ্তারং প্রত্যঞ্চৎ ব্যাপ্নোতি; তস্মাৎ তং প্রত্যগাত্মানং দৃষ্টেন্দ্রষ্টারং ন পশ্যেঃ। তথা শ্রুতেঃ শ্রোতারং ন শৃণুয়াঃ; তথা মতেৰ্মনোবৃত্তেঃ কেবলায়া ব্যাপ্তারং ন মন্ত্রীথাঃ; তথা বিজ্ঞাতেঃ কেবলায়া বুদ্ধিবৃত্তের্ব্যাপ্তারং ন বিজানীয়াঃ; এষ বস্তুনঃ স্বভাবঃ; অতো নৈব দর্শয়িতুং শক্যতে গবাদিবৎ। ৩

উত্তেহর্থে ন দৃষ্টেরিত্যাদিশ্রুতিমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-তমিমমিত্যাদিনা। উক্তমেব প্রপঞ্চয়তি- যাহসাবিতি। ন দৃষ্টেরিত্যাদিবাক্যার্থং নিগময়তি-তস্মাদিতি। উক্তন্যায়মুত্তরবাক্যেঘতি- দিশতি-তথেতি। উক্তং বস্তুস্বাভাব্যমুপসংহৃত্য ফলিতমাহ-এষ ইতি।:

“ন দৃষ্টেন্দ্রষ্টারম্”ইত্যত্র অক্ষরাণি অন্যথা ব্যাচক্ষতে কেচিৎ,-ন দৃষ্টেন্দ্রষ্টারং দৃষ্টেঃ কর্তারৎ দৃষ্টিভেদমকৃত্বা দৃষ্টিমাত্রস্য কর্তারৎ ন পশ্যেরিতি। দৃষ্টেরিতি কৰ্ম্মণি ষষ্ঠী। সা দৃষ্টিঃ ক্রিয়মাণা ঘটবৎ কৰ্ম্ম ভবতি। দ্রষ্টারমিতি ভূজন্তেন দ্রষ্টুদৃষ্টিকর্তৃত্বমাচষ্টে; তেনাসৌ দৃষ্টেন্দ্রষ্টা দৃষ্টেঃ কর্তেতি ব্যাখ্যাতৃণামভিপ্রায়ঃ। তত্র দৃষ্টেরিতি ষষ্ঠ্যন্তেন দৃষ্টিগ্রহণং নিরর্থকমিতি দোষৎ ন পশ্যন্তি, পশ্যতাং বা পুনরুক্তমসারঃ প্রমাদপাঠ ইতি পানাদরঃ। কথং পুনরাধিক্যম্? তৃজন্তেনৈব দৃষ্টিকর্তৃত্বস্থ্য সিদ্ধত্বাৎ দৃষ্টেরিতি নিরর্থকম্; তদা ‘দ্রষ্টারং ন পশ্যেঃ’ ইত্যেবদেব

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।

৮০৭

বক্তব্যম্। যস্মাৎ ধাতোঃ পরঃ তৃচ্ ক্রয়তে, তদ্ধাত্বর্থকর্তরি হি তৃচ্ স্মর্য্যতে, ‘গন্তারং ভেত্তারং বা নয়তি’ ইত্যেতাবানেব হি শব্দঃ প্রযুজ্যতে; ন তু ‘গতে- র্গন্তারং, ভিদের্ভেত্তারম্’ ইতি অসত্যর্থবিশেষে প্রয়োক্তব্যঃ। ন চার্থবাদত্বেন হাতব্যং—সত্যাৎ গতৌ; ন চ প্রমাদপাঠঃ, সর্ব্বেষামবিগানাৎ; তস্মান্ধ্যাখ্যা- তৃণামের বুদ্ধিদৌর্ব্বল্যম্, নাধ্যেতৃপ্রমাদঃ। ৪

ন দৃষ্টেরিতাত্র স্বপক্ষমুক্ত। ভর্তৃপ্রপঞ্চপক্ষমাহ-ন দৃষ্টেরিতি। কথমক্ষরাণামন্যথা ব্যাখ্যেত্যা- শঙ্ক্য তদিষ্টমক্ষরার্থমাহ-দৃষ্টেরিতি। ইতিশব্দো ব্যাচক্ষত ইত্যনেন সংবধ্যতে। এবং ব্যাকুর্ব্বতামভিপ্রায়মাহ-দৃষ্টেরিতীতি। কর্মণি ষষ্ঠীমেব স্ফুটয়তি-সা দৃষ্টিরিতি। ষষ্ঠীং ব্যাখ্যায় দ্বিতীয়াং ব্যাচষ্টে-দ্রষ্টারমিতীতি। পদার্থমুক্ত। বাক্যার্থমাহ-তেনেতি।

উক্তাং পরকীয়ব্যাখ্যাং দুষয়তি-তত্রেতি। দৃষ্টিকর্তৃত্ববিবক্ষায়াং তৃজন্তেনৈব তৎসিদ্ধেঃ ষষ্ঠী নিরর্থিকেত্যর্থঃ। কথং পুনর্ব্যাখ্যাতারো যথোক্তং দোষং ন পশ্যন্তি, তত্রাহ-পশ্যতাং বেতি। ষষ্ঠীনৈরর্থকাং প্রাগুক্তমাকাঙ্ক্ষাদ্বারা সমর্থয়তে-কথমিত্যাদিনা। কিয়ত্তহীহার্থ- বদিত্যাশঙ্ক্যাহ-তদেতি। তত্র হেতুমাহ-যম্মাদিতি। ক্রিয়া ধাত্বর্থঃ। কর্তা প্রত্যয়ার্থঃ। তথা চৈকেনৈব পদেনোভয়লাভাৎ পৃথক্রিয়াগ্রহণমনর্থকমিত্যর্থঃ। দৃষ্টেরিত্যস্যানর্থকত্বং দৃষ্টান্তেন সাধয়তি-গন্তারমিত্যাদিনা। অর্থবাদত্বেন তহীদমুপাত্তমিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। বিধিশেষত্বাভাবাদম্মদুক্তগত্যা চার্থবত্ত্বসংভবাদিত্যর্থঃ। অথ পরপক্ষে নিরর্থকমেবেদং পদং প্রমাদাৎ পঠিতমিতি চেৎ, নেত্যাহ-ন চেতি। সর্বেষাং কাশ্বমাধ্যন্দিনানামিতি যাবৎ। কথং তহীদ’ পদমনর্থকমিতি পরেষাং প্রতীতিস্তত্রাহ-তস্মাদিতি। ৪

যথা তু অস্মাভিব্যাখ্যাতম্—লৌকিকদৃষ্টের্বিবিচ্য নিত্যদৃষ্টিবিশিষ্টঃ আত্মা প্রদর্শয়িতব্যঃ, তথা কর্তৃকর্মবিশেষণত্বেন দৃষ্টিশব্দস্য দ্বিঃপ্রয়োগ উপপদ্যতে, আত্ম- স্বরূপনির্ধারণায়; “ন হি দ্রষ্টুদৃষ্টেঃ” ইতি চ প্রদেশান্তরবাক্যেন একবাক্যতোপ- পন্না ভবতি; তথাচ ‘চক্ষুংষি পশ্যতি, শ্রোত্রমিদং শ্রুতম্’ ইতি শ্রুত্যন্তরেণৈক- বাক্যতোপপন্না। ন্যায়াচ্চ—এবমেব হি আত্মনো নিত্যত্বমুপপদ্যতে বিক্রিয়াভাবে; বিক্রিয়াবচ্চ নিত্যমিতি চ বিপ্রতিষিদ্ধম্। “ধ্যায়তীব লেলায়তীব”, “ন হি দ্রষ্টুদৃষ্টের্বিপরিলোপো বিদ্যতে”, “এষ নিত্যো মহিমা ব্রাহ্মণস্য” ইতি চ শ্রুত্যক্ষরাণ্যন্যথা ন গচ্ছন্তি। ৫

কথং পুনর্ভবতামপি দূশেদ্বিরুপাদানমুপপদ্যতে, তত্রাহ-যথা ত্বিতি। প্রদর্শয়িতব্যপদা- দুপরিষ্টাদিতিশব্দো দ্রষ্টব্যঃ। কর্তৃকৰ্ম্মবিশেষণত্বেন সাক্ষি-সাক্ষ্যসমর্পকত্বেনেতি যাবৎ। তৎসমর্পণ- মিতি কুত্রোপযুজ্যতে, তত্রাহ-আত্মেতি। দৃষ্ট্যাদিসাক্ষ্যাত্মা ন তদ্বিষয় ইতি তৎস্বরূপনিশ্চয়ার্থং সাক্ষ্যাদিসমর্পণমিত্যর্থঃ। আত্মা নিত্যদৃষ্টিস্বভাবো ন দৃশ্যায়া দৃষ্টৈবিষয় ইত্যেষ চেন্ন দৃষ্টেরিত্যাদি- বাক্যস্যার্থঃ, তদা নহীত্যাদিনাহস্যৈকবাক্যত্বং সিধ্যতি, তস্মাদ্যথোক্তার্থত্বমেব ন দৃষ্টেরিত্যাদি- বাক্যস্যেত্যাহ-ন হীতি। আত্মা কূটস্থদৃষ্টিরিত্যত্র তলবকারশ্রুতিং সংবাদয়তি-তথা চেতি।

৮০৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তস্য কূটস্থদৃষ্টিত্বে হেত্বন্তরমাহ—ন্যায়াচ্চেতি। তমেব ন্যায়ং বিশদয়তি—এবমেবেতি। বিপক্ষে দোষমাহ—বিক্রিয়াবচ্চেতি। ইতশ্চাত্মনো নাস্তি বিক্রিয়াবত্ত্বমিত্যাহ—ধ্যাতীবেতি। অন্যথা বিক্রিয়াবত্ত্বে সতীতি যাবৎ। ৫

ননু দ্রষ্টা শ্রোতা মন্তা বিজ্ঞাতেত্যেবমাদীন্যক্ষরাণ্যাত্মানোহবিক্রয়ত্বে ন গচ্ছ- স্তীতি; ন; যথাপ্রাপ্তলৌকিকবাক্যানুবাদিত্বাত্তেষাম্; নাত্মতত্ত্বনির্ধারণার্থানি তানি; “ন দৃষ্টের্ডষ্টারম্” ইত্যেবমাদীনাম্ অন্যার্থাসম্ভবাৎ যথোক্তার্থপরত্বমব- গম্যতে; তস্মাদনববোধাদের হি বিশেষণং পরিত্যক্তং দৃষ্টেরিতি। এষ তে তব আত্মা সর্ব্বৈরুক্তৈঃ বিশেষণৈর্বিশিষ্টঃ; অতঃ এতস্মাদাত্মন অন্যদার্তং—কার্য্যং বা শরীরং, করণাত্মকং বা লিঙ্গম্; এতদেবৈকমনার্তমবিনাশি কূটস্থম্। ততো হোযস্তশ্চাক্রায়ণ উপররাম ॥১৬৯৷২৷৷

ইতি বৃন্দাবনে কোশলনিধি তৃতীয়ধ্যায়ে চতুর্থধ্যায়ে সমাপ্তা। ॥৩৪॥ অবিক্রিয়ত্বেহপি শ্রুত্যক্ষরাণ্যনুপপন্নানীতি শঙ্কতে-নন্বিতি। ন তেষাং বিরোধঃ, দৃষ্টং দৃষ্ট্যাদিকর্তৃত্বমনুসৃত্য প্রবৃত্তে লৌকিকে বাক্যে তদর্থানুবাদিত্বাদুক্তশ্রুত্যক্ষরাণাং স্বার্থে প্রামাণ্যাভাবাদিতি পরিহরতি-নেত্যাদিনা। ন দৃষ্টেরিত্যাদীন্যপি তর্হি শ্রুত্যক্ষরাণি ন স্বার্থে প্রমাণানীত্যাশঙ্ক্যাহ-ন দৃষ্টেরিতি। অন্যোহর্থো দৃষ্ট্যাদিকর্তা। যথোক্তোহর্থো দৃষ্ট্যাদিসাক্ষী। দ্রষ্ট পদস্য সাক্ষিবিষয়ত্বে সিদ্ধে দৃষ্টেরিতি সাধ্যসমর্পণাৎ, তদর্থবত্ত্বোপপত্তিরিত্যুপসংহরতি- তস্মাদিতি। পক্ষান্তরং নিরাকৃত্য স্বপক্ষমুপপাদ্যানন্তরং বাক্যং বিভজতে-এষ ইতি। অন্যদার্তমিতিবিশেষণসামর্থ্যসিদ্ধমর্থমাহ-এতদেবেতি ॥১৬৯।১॥

ইতি বৃন্দাবনে কোপনিবদ্গদাধরঃ। তৃতীয়স্কন্ধে চতুর্থস্কন্ধে। ৪৪।

ভাষ্যানুবাদ।—“স হোবাচ উষস্তশ্চাক্রায়ণঃ” ইত্যাদি। যেমন কোন লোক প্রথমে অন্যরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া, শেষে কার্য্যকালে সুযোগ না দেখিয়া অন্যপ্রকার উপদেশ দিয়া থাকে, অর্থাৎ যেমন গো ও অশ্বকে প্রত্যক্ষ প্রদর্শন করাইব বলিয়া প্রতিজ্ঞার পর, উপদেশকালে গমনাদি কার্য্য দ্বারা বুঝাইয়া থাকে— যাহা চলিয়া বেড়ায়, তাহা গো, আর যাহা দৌড়িয়া যায়, তাহা অশ্ব; তুমিও যে, প্রাণনাদি কার্য্য দ্বারা আত্মস্বরূপ ব্রহ্মের উপদেশ দিতেছ, তাহাও ঠিক তদ্রূপই হইয়াছে। অধিক কথার প্রয়োজন নাই, তুমি গো-গ্রহণের লোভে যে, ছল বা প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছ, তাহা পরিত্যাগ কর, এবং যাহা কেবল সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষস্বরূপ ব্রহ্ম, যাহা সর্ব্বান্তর আত্মা, তাহাই আমার নিকট ব্যাখ্যা কর। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—আমি প্রথমে তোমার নিকট যেরূপ লক্ষণান্বিত আত্মার স্বরূপ বুঝাইবার প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, এখনও আমি সেই প্রতিজ্ঞারই অনুবৃত্তি বা অনুসরণ করিতেছি; আমি আত্মার স্বরূপ যেরূপ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্

৮০৯

বলিয়াছি, তাহা ঠিক সেইরূপই বটে(তাহার কিছুমাত্র ব্যতিক্রম করি নাই) ১।

তাহার পর, সেই আত্মাকে যে, ঘটাদি বাহ্য পদার্থের ন্যায় প্রত্যক্ষের বিষয়ীভূত করিয়া দিতে বলিয়াছ, অসম্ভব বলিয়াই তাহা করা হইতেছে না। যদি বল, অসম্ভব কেন?[আমি বলি,] বস্তু-স্বভাবই তাহার কারণ। ভাল, সেই বস্তুস্বভাবটি কিরূপ?[সেই স্বভাব হইতেছে-] দৃষ্টিপ্রভৃতির দ্রষ্টৃত্ব; কারণ, আত্মা হইতেছে-দৃষ্টির দ্রষ্টা-প্রকাশক। দৃষ্টি দুই রকম আছে-এক লৌকিক দৃষ্টি, অপর পারমার্থিক দৃষ্টি; তন্মধ্যে লৌকিক দৃষ্টি হইতেছে-চক্ষুর সহিত সম্বন্ধ- প্রাপ্ত অন্তঃকরণের বৃত্তি বা পরিণামবিশেষ; তাহা উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন হয় বলিয়াই বিনষ্টও হয়; কিন্তু অগ্নির উষ্ণত্ব ও প্রকাশাদির ন্যায় যাহা আত্মার স্বরূপভূত দৃষ্টি(পারমার্থিক দৃষ্টি), তাহা দ্রষ্টারই-অন্তঃকরণবৃত্তি-প্রকাশক আত্মারই স্বরূপ বা স্বাভাবিক ধর্ম; সুতরাং তাহা জন্মেও না, মরেও না(নিত্য)। সেই নিত্য দৃষ্টিই উৎপত্তিশীল বুদ্ধি ও তদ্বৃত্তিরূপ উপাধির সহিত সম্মিলিতের ন্যায় হইয়া-‘দ্রষ্টা’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে, এবং ‘দ্রষ্টা’ ও ‘দৃষ্টি’- এইরূপ ভেদব্যবহারও লাভ করিয়া থাকে; আর চক্ষুরিন্দ্রিয় দ্বারা দৃশ্য- বিষয়াকারে আকারিত যে লৌকিক দৃষ্টি-জন্মসময়েই এই নিত্য আত্মদৃষ্টির সহিত যেন সংসৃষ্টই হয় অর্থাৎ বাস্তবিক সম্বন্ধ না থাকিলেও যেন সংবদ্ধ বলিয়াই প্রতীত হয়, তাহা সেই নিত্য আত্ম-দৃষ্টিরই প্রতিচ্ছায়া বা প্রতিবিম্ব মাত্র; তাহা সেই আত্মচ্ছায়াসহকারেই জন্ম লাভ করিয়া থাকে, এবং সময়ে আবার বিনষ্টও হইয়া যায়। এইরূপ বৃত্তিগত জন্ম-মরণসংস্পর্শ বশতঃই, নিত্য- প্রকাশ দ্রষ্টা(আত্মা) সর্ব্বদা দর্শনশীল হইয়াও, সময়ে দর্শন করে ও দর্শন করে না;-এইরূপ ঔপচারিক(যাহা সত্য নহে-আরোপিত, সেইরূপ) ব্যবহারের বিষয়ীভূত হইয়া থাকে; বাস্তবিক পক্ষে দ্রষ্টার দৃষ্টি কখনও বিলুপ্ত হয় না, বা হইতে পারে না। ষষ্ঠ অধ্যায়েও এই কথাই বলিবেন- ‘আত্মা যেন ধ্যানই করিতেছে, যেন ক্রিয়াই করিতেছে’, এবং ‘দ্রষ্টার দৃষ্টি কখনও বিলুপ্ত হয় না’ ইতি। ২

এখন এই বিষয়টিই পরিস্ফুট করিয়া বলিতেছেন—কর্মভূত(দৃশ্য) লৌকিক দৃষ্টির যিনি দ্রষ্টা, অর্থাৎ যিনি স্বীয় নিত্যদৃষ্টি বা প্রকাশ দ্বারা ঐ লৌকিক দৃষ্টিকে প্রকাশিত করেন, তাহাকে(দৃষ্টির দ্রষ্টাকে) দর্শন করিবে না; অভিপ্রায় এই যে, এই দর্শনের কর্মস্বরূপ যে লৌকিক দৃষ্টি(বুদ্ধিবৃত্তি), তাহা কোনও রূপ-

৮১০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বিশেষ দ্বারা উপরঞ্জিত হইয়া(তদাকারে আকারিত হইয়া) সেই সেই বিষয়কে প্রকাশিত করিয়া থাকে বটে, কিন্তু আত্মাকে অর্থাৎ নিজেরই দ্রষ্টা বা প্রকাশক প্রত্যক্-আত্মাকে ব্যাপিতে পারে না(প্রকাশ করিতে পারে না); অতএব দৃষ্টির দ্রষ্টা সেই প্রত্যক্-আত্মাকে দর্শন করিবে না। এইরূপ, যিনি শ্রুতির শ্রোতা—শ্রবণেন্দ্রিয়জ জ্ঞানের প্রকাশক, তাহাকে শ্রবণ করিবে না; এইরূপ মতির—চিৎপ্রতিভাসরহিত মনোবৃত্তির প্রকাশককে মনন করিবে না, অর্থাৎ শুদ্ধ মনোবৃত্তিদ্বারা প্রকাশ করিবে না; এইরূপ, বিজ্ঞাতির—কেবলই নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধিবৃত্তির প্রকাশককে জানিবে না; কারণ, এইরূপই বস্তুস্বভাব;[স্বভাবের বিরুদ্ধে কখনই কার্য্য হইতে পারে না।] সুতরাং বিজ্ঞানস্বভাব আত্মাকে গবাদি পশুর ন্যায় প্রত্যক্ষতঃ প্রদর্শন করিতে পারা যায় না। ৩

কেহ কেহ “ন দৃষ্টেন্দ্র ষ্টারম্” এই বাক্যের অন্যপ্রকার শব্দার্থ কল্পনা করিয়া থাকেন। তাঁহারা বলেন-‘দৃষ্টির দ্রষ্টাকে দর্শন করিবে না’ অর্থ-দৃষ্টির কোন প্রকার প্রভেদ না করিয়া-শুধু দৃষ্টির কর্ত্তাকে দর্শন করিবে না। তাহাদের অভিপ্রায় এই যে, ‘দৃষ্টেঃ’ পদে যে ষষ্ঠী, তাহা কর্মবিহিত; সুতরাং ঘটাদি পদার্থের ন্যায় ঐ দৃষ্টিও যখন ক্রিয়মাণ হয়, তখনই কৰ্ম্মস্বরূপ হয়। আর ‘দ্রষ্টারম্’ এই তৃচ্প্রত্যয়ান্ত পদে দ্রষ্টার দৃষ্টিকর্তৃত্ব প্রকাশ করিতেছে; সুতরাং এই দ্রষ্টা অর্থ-দৃষ্টির কর্তা(যাহাকর্তৃক ঐ দৃষ্টি-কার্য্য সম্পন্ন হয়)। তাহাদের এ ব্যাখ্যায় ‘দৃষ্টেঃ’ এই ষষ্ঠীবিভক্ত্যন্ত পদদ্বারা দৃষ্টির নির্দেশ করা যে, অনর্থক হইয়া পড়ে, এ দোষ তাঁহারা দেখিতে পান না; অথবা দেখিতে পাইলেও, ইহা পুনরুক্ত বা অসার প্রামাদিক পাঠ মনে করিয়া তদ্বিষয়ে আদর করা আবশ্যক মনে করেন না। ভাল, এখানে আধিক্য দোষ হয় কি প্রকারে? হাঁ, যে হেতু তৃচ্প্রত্যয়ান্ত ‘দ্রষ্টারম্’ পদেই যখন দৃষ্টিকর্তৃত্ব পাওয়া গিয়াছে, তখন আবার ষষ্ঠ্যন্ত ‘দৃষ্টেঃ’ পদে পৃথক্ কৰ্ম্ম নিৰ্দেশ করা নিশ্চয়ই নিরর্থক হইতেছে; এ পক্ষে কেবল ‘দ্রষ্টারম্’ মাত্র বলাই উচিত। শব্দের ব্যবহারপ্রণালী হইতেছে এই যে, যে ধাতুর পর তৃচ্প্রত্যয় হয়, সেই ধাতুর যাহা প্রকৃত অর্থ, তৃচ্প্রত্যয়ে সেই অর্থেরই কর্ত্তাকে বুঝায়(১); এই জন্য ‘গন্তারং ভেত্তারং বা নয়তি’(গমন-কর্ত্তাকে বা ভেদ-

(১) তাৎপর্য্য—‘গম্’ ধাতুর উত্তর তৃচ্প্রত্যয় করিলে প্রয়োগ হয়—গন্তা। গম্ ধাতুর অর্থ—গমন; সুতরাং এই তৃচ্প্রত্যয়ে গমনের কর্ত্তাকেই বুঝাইয়া থাকে। তৃচ্প্রত্যয়ে গমন- কর্ত্তাকে বুঝাইয়া দেয় বলিয়াই আর পৃথক্তভাবে গমনরূপ কর্ম্মের নির্দেশ করা আবশ্যক হয় না; আবশ্যক হয় না বলিয়াই কেহই ‘গমনস্য গন্তা’ বলে না। আলোচ্য স্থলেও

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।

৮১১

কর্তাকে লইয়া যাইতেছে), এইরূপই প্রয়োগ হইয়া থাকে, কিন্তু অর্থান্তরের সম্ভাবনা না থাকিলে, ‘গতেঃ গন্তারম্, ভিদেঃ ভেত্তারৎ’ এইরূপ প্রয়োগ কখনই করা হয় না। তাহার পর, সার্থকতা রক্ষার উপায় বিদ্যমান থাকিতে ‘অর্থবাদ’ বলিয়া উপেক্ষা করাও কখনই উচিত হয় না; এবং প্রামাদিক পাঠ পরিকল্পনা করাও সঙ্গত হয় না; কারণ, এ বিষয়ে কাহারো নিন্দাবাদ দেখিতে পাওয়া যায় না। অতএব বলিতে হইবে যে, ইহা কেবল ব্যাখ্যাতৃগণেরই বুদ্ধি-দৌর্ব্বল্যের পরিচায়ক, কিন্তু অধ্যেতৃবর্গের প্রমাদের ফল নহে। ৪

পক্ষান্তরে, আমরা ব্যাখ্যাস্থলে যেরূপ অর্থ বলিয়াছি-লৌকিক দৃষ্টি হইতে পৃথক্ করিয়া নিত্য প্রকাশস্বভাব আত্মার স্বরূপ প্রকাশের আবশ্যকতা প্রদর্শন করিয়াছি, সেইরূপ ব্যাখ্যা স্বীকার করিলেই কর্তৃবিশেষণরূপে ও কর্মবিশেষণরূপে দৃষ্টি শব্দের দুইবার প্রয়োগ উপপন্ন হইতে পারে; কারণ, ঐরূপ প্রয়োগে আত্মস্বরূপ নিরূপণ সহজ হইতে পারে। বিশেষতঃ অন্যপ্রকরণে পঠিত “নহি দ্রষ্টুদৃষ্টেঃ” ইত্যাদি বাক্যের সহিত এই শ্রুতিবাক্যের অনায়াসেই একবাক্যতাও করা যাইতে পারে। তাহা যদি হয়, তবে ‘চক্ষুঃসমূহ দর্শন করিতেছে’, ‘এই শ্রবণেন্দ্রিয় শ্রবণ করিতেছে’ ইত্যাদি স্থানান্তরীয় শ্রুতির সহিতও ইহার একবাক্যতা(সমানার্থ- কতা) উপপন্ন হয়। বিশেষতঃ এতদনুকূল যুক্তিও আছে-যথোক্ত ব্যাখ্যানুসারে আত্মার অবিক্রিয়ত্ব সিদ্ধ হইলেই তাহার নিত্যত্বও উপপন্ন হইতে পারে। একই পদার্থের যে, বিক্রিয়াবত্ত্ব ও নিত্যত্ব, ইহা বিরুদ্ধ কথা। অধিকন্তু পরপক্ষীয় ব্যাখ্যানুসারে-‘যেন ধ্যানই করেন, যেন স্পন্দনই করেন’, ‘দ্রষ্টার দৃষ্টি কখনও বিলুপ্ত হয় না’, ‘ব্রাহ্মণের(ব্রহ্মনিষ্ঠের) ইহা নিত্য মহিমা(বিভূতি)’ ইত্যাদি শ্রুতিগুলির যথাশ্রুত অর্থও সঙ্গত হয় না। ৫

ভাল কথা, আত্মা যদি বিকারবিহীন—অবিক্রিয়ই হয়, তাহা হইলে ত ‘দ্রষ্টা, শ্রোতা, মন্তা, বিজ্ঞাতা’ ইত্যাদি কথাগুলির অর্থ-সঙ্গতি হয় না; না, সে কথা বলা যায় না; কারণ, উক্ত বাক্যগুলি কেবল লোক-প্রসিদ্ধ বা ব্যবহারিক বাক্যের অনুবাদ মাত্র; কিন্তু পরমার্থ তত্ত্বনিদ্ধারক নহে। ‘ন দৃষ্টেদ্রষ্টারম্’ ইত্যাদি বাক্যের অন্যপ্রকার অর্থ হইতে পারে না বলিয়াই, বুঝা যাইতেছে যে, আমরা যেরূপ অর্থ নির্দেশ করিয়াছি, তাহাই ঐ সকল বাক্যের যথার্থ অর্থ।

৮১২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অতএব অজ্ঞান বশতঃই পরপক্ষ ‘দৃষ্টেঃ’ বিশেষণটি পরিত্যাগ করিয়াছেন। উক্ত- প্রকার সর্ব্ববিধ বিশেষণবিশিষ্ট দ্রষ্টাই তোমার আত্মা; যথোক্ত বিশেষণসম্পন্ন এই আত্মার অতিরিক্ত যাহা কিছু—কার্য্যাত্মক স্থূল শরীর বা করণসমষ্টিরূপ লিঙ্গ- শরীর, তৎসমস্তই আর্ত্ত—ধ্বংসশীল; একমাত্র এই আত্মাই কেবল অনার্ত্ত— অবিনাশী—কূটস্থ(১)। ইহার পর উষস্ত চাক্রায়ণ বিরত হইলেন ॥১৬৯৷২৷৷

ইতি তৃতীয়োঽধ্যায়ে চতুর্থ ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুসারে ॥৩॥৪॥

পঞ্চম অধ্যায়।

আভাসভাষ্যম্।—বন্ধনং সপ্রযোজকমুক্তম্; যশ্চ বদ্ধঃ, তস্যাপি অস্তিত্বমধিগতম্, ব্যতিরিক্তত্বৎ চ। তস্যেদানীং বন্ধ-মোক্ষসাধনং সসন্ন্যাসমাত্ম- জ্ঞানং বক্তব্যমিতি কহোলপ্রশ্ন আরভ্যতে।

টীকা। ব্রাহ্মণত্রয়ার্থং সংগতিং বক্তুমনুবদতি—বন্ধনমিতি। চতুর্থব্রাহ্মণার্থং সংক্ষিপতি— যশ্চেতি। উত্তরব্রাহ্মণতাৎপয্যমাহ—তস্যেতি। উষস্তপ্রশ্নানন্তর্য্যমথশব্দার্থঃ। পূর্ববদিত্যভি- মুখীকরণার্থং সম্বোধিতবানিত্যর্থঃ। বন্ধধ্বংসিজ্ঞানপ্রশ্নো নাত্র প্রতিভাতি, কিংত্বনুবাদমাত্র- মিত্যাশঙ্ক্যাৎ—যং বিদিত্বেতি। তং ব্যাচক্ষেতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ।

আভাস-ভাষ্যানুবাদ।—ইতঃপূর্ব্বে জীবের বন্ধন ও বন্ধনের হেতুভূত কর্ম্মের কথা উক্ত হইয়াছে, এবং সংসারে যিনি বদ্ধ হন, তাঁহার অস্তিত্ব এবং দেহাতিরিক্তত্বও নির্ধারিত হইয়াছে; এখন সেই বদ্ধ আত্মার বন্ধনবিমুক্তির উপায়ভূত সন্ন্যাস ও আত্মজ্ঞানের কথা বলিবার জন্য এই কহোল-প্রশ্নাত্মক কহোলব্রাহ্মণ আরব্ধ হইতেছে—

অথ হৈনং কহোলঃ কৌষীতকেয়ঃ পপ্রচ্ছ—যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ যদেব সাক্ষাদপরোক্ষাদ্বহ্ম য আত্মা সর্ব্বান্তরস্তং মে ব্যাচক্ষেত্যেষ ত আত্মা সর্ব্বান্তরঃ।

কতমো যাজ্ঞবল্ক্য সর্ব্বান্তরো যোহশনায়া-পিপাসে শোকং মোহং জরাং মৃত্যুমত্যেতি।

এতং বৈ তমাত্মানং বিদিত্বা ব্রাহ্মণাঃ পুত্রৈষণায়াশ্চ বিত্তৈষণায়াশ লোকৈষণায়াশ্চ ব্যুত্থায়াথ ভিক্ষাচর্য্যং চরন্তি; যা হ্যেব পুত্রৈষণা সা বিত্তৈষণা যা বিভৈষণা সা লোকৈষণোভে হোতে এষণে এব ভবতঃ। তস্মাদ ব্রাহ্মণঃ পাণ্ডিত্যং নির্বিদ্য বাল্যেন তিষ্ঠাসেৎ। বাল্যং চ পাণ্ডিত্যং চ নির্বিদ্য্যাথ মুনি- রমৌনং চ মৌনং চ নির্বিদ্য্যাথ ব্রাহ্মণঃ; স ব্রাহ্মণঃ কেন স্যাদ্ যেন

৮১৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

স্যাৎ তেনদৃশ এবাতোহহ্মদার্থং, ততো হ কহোলঃ কৌষীতকেয় উপররাম ॥ ১৭০ ॥ ১ ॥

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি তৃতীয়াধ্যায়স্য পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্ ॥৩॥৫॥

সরলার্থঃ।-অথ(উষস্তবিরামানন্তরম্) কহোলঃ(তন্নামকঃ) কৌষীত- কেয়ঃ(কুষীতকস্যাপত্যং পুমান্) এনং(যাজ্ঞবল্ক্যৎ) পপ্রচ্ছ হ।[সঃ] উবাচ হ-হে যাজ্ঞবল্ক্য, যৎ এব সাক্ষাৎ(অব্যবধানেন) অপরোক্ষাৎ(অপরোক্ষ- প্রত্যক্ষচৈতন্যং) ব্রহ্ম, যঃ আত্মা, তং সর্ব্বান্তরং(আত্মানং) মে(মহাং) ব্যাচক্ষু (বিশদীকৃত্য ব্রূহি) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] এবঃ(বক্ষ্যমাণঃ) সর্ব্বান্তরঃ তে(তব)[অভিমতঃ] আত্মা।[কহোল আহ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য,[ত্বদুক্তঃ] সর্ব্বান্তরঃ(আত্মা) কতমঃ(দেহেন্দ্রিয়াদিযু মধ্যে কঃ সঃ?)।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] যঃ অশানায়াপিপাসে(অশিতুমিচ্ছা অশনায়া, পাতুমিচ্ছা পিপাসা- ক্ষুধা-তৃষ্ণে ইত্যর্থঃ), শোকং, মোহং, জরাং, মৃত্যুম্ অত্যেতি(অতিক্রামতি, যঃ পিপাসাদিভিঃ ন সম্বধ্যতে, স ইত্যর্থঃ) ইতি।

ব্রাহ্মণাঃ(ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ পুরুষাঃ) এতং(যথোক্তং) তং(প্রসিদ্ধং) আত্মানং বিদিত্বা(শাস্ত্রাচার্য্যাভ্যাম্ অধিগম্য) পুত্রৈষণায়াঃ(পুত্রকামনায়াঃ) চ, বিত্তৈ- ষণায়াঃ(গো-হিরণ্যাদিধনাশায়াঃ) চ, লোকৈষণায়াঃ(স্বর্গাদিলোক-লাভেচ্ছায়াঃ) চ ব্যুত্থায়(বিশেষেণ বিরজ্য, তাঃ ত্যক্তা) অথ(অনন্তরং) ভিক্ষাচর্য্যৎ(ভিক্ষায়াঃ চর্য্যং চরণং যত্র, তং ভিক্ষাচর্য্যং সন্ন্যাসং) চরন্তি(সন্ন্যাসমবলম্বন্তে ইত্যর্থঃ)। যা হি পুত্রৈষণা(পুত্রকামনা), সা এব বিত্তৈষণা, যা[চ] বিত্তৈষণা, সা[এব] লোকৈষণা,-এতে(যথোক্ত-সাধ্য-সাধনভূতে) উভে এব এষণে ভবতঃ,[তত্র পুত্র-বিত্তয়োঃ সাধনত্বম্, লোকস্য চ সাধ্যত্বমিত্যাশয়ঃ]; তস্মাৎ(এষণানাৎ সাধ্য-সাধনাত্মকত্বাৎ, ততএব চ ক্ষয়িত্বাৎ হেতোঃ, ব্রাহ্মণঃ পাণ্ডিত্যং(আত্ম- বিজ্ঞানম্) নির্বিদ্য(নিঃশেষেণ বিদিত্বা-আত্মবিজ্ঞানং সমাপ্য) বাল্যেন(বাল- ভাবেন-নিরভিমানার্জবাদিস্বভাবেন, জ্ঞান-বলাবলম্বনেন বা) তিষ্ঠাসেৎ(স্থাতু- মিচ্ছেৎ-এষণাত্রয়পরিত্যাগেন আত্মবিজ্ঞানমেব সমাশ্রয়েদিত্যর্থঃ)। বাল্যং চ পাণ্ডিত্যং চ নির্বিদ্য(নিঃশেষেণ বিদিত্বা) অথ[অনন্তরং] মুনিঃ(মননশীলঃ) -অনাত্মপ্রত্যয়-পরিহারেণ আত্মপ্রত্যয়তৎপরঃ(ভবেৎ); অথ অমৌনং চ মৌনং চ নির্বিদ্য ব্রাহ্মণঃ(ব্রহ্মনিষ্ঠঃ) স্যাৎ। সঃ ব্রাহ্মণঃ কেন(কীদৃশেনাচারেণ উপলক্ষিতঃ) স্যাৎ? যেন(যেন কেনাপি আচারেণ উপলক্ষিতঃ) স্যাৎ,

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমং ব্রাহ্মণম্। ৮১৫

তেন ঈদৃশঃ(যথোক্তপ্রকারঃ) এব[স্যাৎ, যেন কেনাপি আচারেণ বর্ত- মানস্যাপি তস্য ব্রাহ্মণত্বং ন হীয়তে, ইত্যাশয়ঃ, নত্বাচারে অনাদরো দর্শিতঃ]। অতঃ(অস্মাৎ ব্রাহ্মণ্যাবস্থানাৎ) অন্যৎ(অবিদ্যাবিষয়ঃ বস্তু) আর্ত্তং (বিনাশি)। ততঃ কহোলঃ কৌষীতকেয়ঃ উপররাম(প্রশ্নাৎ বিরতো বভূব) হ ॥১৭০৷৷১৷৷

মূলানুবাদ।—অতঃপর কুষীতকপুত্র কহোল ঋষি যাজ্ঞ- বল্ধ্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন। কহোল বলিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, যাহা সাক্ষাৎ অপরোক্ষ ব্রহ্ম, এবং যাহা দেহাদি অপেক্ষাও আভ্যন্তরীণ আত্মা, তাহার স্বরূপ আমার নিকট বর্ণনা কর।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] দেহেন্দ্রিয়াদি-সমষ্ট্যভিমানী তোমার ইহাই সর্ব্বান্তর আত্মা।[কহোল বলিলেন—] যাজ্ঞবল্ক্য, সেই সর্ব্বান্তর আত্মা কোন্টি?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] যাহা ক্ষুধা, পিপাসা, শোক, মোহ, জরা ও মৃত্যু অতিক্রম করে, অর্থাৎ যাহা ক্ষুধা পিপাসাদি রহিত, [তাহাই সর্ব্বান্তর আত্মা]।

ব্রাহ্মণগণ এই আত্মাকেই অবগত হইয়া পুত্রৈষণা, বিত্তৈষণা ও লোকৈষণা হইতে ব্যুত্থিত হইয়া অর্থাৎ পুত্র ও বিত্তাদি বিষয়ে কামনা পরিত্যাগ করিয়া ভিক্ষাচর্য্য(সন্ন্যাস) অবলম্বন করিয়া থাকেন। প্রকৃত পক্ষে কিন্তু যাহা পুত্রৈষণা, তাহাই বিত্তৈষণা এবং যাহা বিত্তৈষণা, তাহাই লোকৈষণা,—একটি সাধন, অপরটি ফল, এই সাধ্যসাধনভাব ভেদে এষণা কেবল দুইটিমাত্রই—অতিরিক্ত নহে।

সেই হেতু এখনও ব্রহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তি পাণ্ডিত্য(আত্মতত্ত্ব) সম্যরূপে অবগত হইয়া বাল্যে বালকের ন্যায় নিরভিমান সরলতাদি স্বভাব অথবা জ্ঞান-বল অবলম্বনে অবস্থান করিবেন; তাহার পর, বাল্য ও পাণ্ডিত্য সমাপ্ত করিয়া মুনি—মননশীল হইবেন; শেষে অমৌন ও মৌন উভয়ই পরিসমাপ্ত করিয়া ব্রহ্মেতে তন্ময় হইবেন। সেই ব্রাহ্মণ কিরূপ আচার অবলম্বন করিবেন? যেরূপ আচারই অবলম্বন করুন, তিনি ঐরূপই থাকেন, অর্থাৎ এষণাবিনির্ম্মুক্ত ব্রহ্মস্বরূপেই প্রতি- ষ্ঠিত থাকেন।[যেরূপ আত্মতত্ত্বের কথা বলা হইল,] এতদতিরিক্ত

৮১৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সমস্তই আর্ত্ত—বিনাশশীল; তাহার পর কুষীতকের পুত্র কহোল নিবৃত্ত হইলেন ॥ ১৭০ ॥ ১ ॥

তৃতীয় অধ্যায়ে পঞ্চম ব্রাহ্মণ ব্যাখ্যা ॥ ৩ ॥ ৫ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।—অথ হ এনং কহোলো নামতঃ কুষীতকস্যাপত্যং কৌষীতকেয়ঃ পপ্রচ্ছ; যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচেতি পূর্ব্ববৎ। যদেব সাক্ষা- দপরোক্ষাদ্ ব্রহ্ম, য আত্মা সর্ব্বান্তরঃ, তং মে ব্যাচক্ষেতি, যৎ বিদিত্বা বন্ধনাৎ প্রমুচ্যতে। যাজ্ঞবল্ক্য আহ—এষঃ তে তবাত্মা। ১

টীকা। ব্রাহ্মণত্রয়ার্থং সঙ্গতিং বক্তু মনুবদতি-বন্ধনমিতি। চতুর্থব্রাহ্মণার্থং সংক্ষিপতি- মশ্চেতি। উত্তরব্রাহ্মণতাৎপর্য্যমাহ-তস্যেতি। উষন্তপ্রশ্নানন্তর্য্যমথশব্দার্থঃ। পূর্ববদিত্যভি- মুখীকরণার্থং সম্বোধিতবানিত্যর্থঃ। বন্ধধ্বংসিজ্ঞানপ্রশ্নো নাত্র প্রতিভাতি, কিন্তুনুবাদমাত্রমিত্যা- শঙ্ক্যাহ-যং বিদিত্বেতি। তং ব্যাচক্ষেতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। ১

কিমুষস্ত-কহোলাভ্যাং এক আত্মা পৃষ্টঃ? কিং বা ভিন্নাবাত্মানৌ তুল্য- লক্ষণাবিতি? ভিন্নাবিতি যুক্তম্, প্রশ্নয়োরপুনরুক্তত্বোপপত্তেঃ। যদি হ্যেক আত্মা উষন্ত-কহোলপ্রশ্নয়োর্বিবক্ষিতঃ, তত্রৈকেনৈব প্রশ্নেনাধিগতত্ত্বাৎ তদ্বিষয়ো দ্বিতীয়ঃ প্রশোহনর্থকঃ স্যাৎ; নচার্থবাদরূপত্বং বাক্যস্য; তস্মাদ্ভিন্নাবেতাবাত্মানো ক্ষেত্রজ্ঞ- পরমাত্মাখ্যাবিতি কেচিদ্ব্যাচক্ষতে। ২

প্রঃয়োরবান্তরবিশেষপ্রদর্শনার্থং পরামৃশতি—কিমুষস্তেতি। তত্র পূর্ব্বপক্ষং গৃহ্লাতি— ভিন্নাবিতীতি। উক্তমর্থং ব্যতিরেকদ্বারা বিবর্ণোতি—যদি হীত্যাদিনা। অথৈকং বাক্যং বস্তুপরং, তস্যার্থবাদো দ্বিতীয়ং বাক্য? নেত্যাহ—ন চেতি। দ্বয়োর্বাক্যয়োস্তুল্যলক্ষণত্বে ফলিতমাহ—তস্মাদিতি। তত্রান্যং বাক্য ক্ষেত্রজ্ঞমধিকরোতি, দ্বিতীয়ং পরমাত্মানমিত্যভি- প্রেত্যাহ—ক্ষেত্রজ্ঞেতি। ২

তন্ন, ত ইতি প্রতিজ্ঞানাৎ; ‘এষ ত আত্মা’ ইতি হি প্রতিবচনে প্রতিজ্ঞাতম্। ন চৈকস্য কার্য্যকরণসঙ্ঘাতস্য দ্বাবাত্মানাবুপপদ্যেতে; একো হি কার্য্যকরণ- সঙ্ঘাত একেনাত্মনা আত্মবান্; ন চোষস্তস্যান্যঃ কহোলস্যান্যে। জাতিতো ভিন্ন আত্মা ভবতি; দ্বয়োরগৌণত্বাত্মত্বসর্ব্বান্তরত্বানুপপত্তেঃ। যদ্যেকমগৌণং ব্রহ্ম দ্বয়োঃ, ইতরেণ অবশ্যং গৌণেন ভবিতব্যম্; তথা আত্মত্বং সর্ব্বান্তরত্বং চ, বিরুদ্ধত্বাৎ পদার্থানাম্। যদ্যেকং সর্ব্বান্তরং ব্রহ্ম আত্মা মুখ্যঃ, ইতরেণা- সর্ব্বান্তরেণানাত্মনা অমুখ্যেনাবশ্যং ভবিতব্যম্; তস্মাদেকস্যৈব দ্বিঃশ্রবণং বিশেষবিবক্ষয়া। ৩

ব্রাহ্মণদ্বয়েনার্থদ্বয়ং বিবক্ষিতমিতি ভর্তৃপ্রপঞ্চপ্রস্থানং প্রত্যাহ-তন্নেতি। প্রশ্নপ্রতি- বচনয়োরেকরূপত্বান্নার্থভেদোহস্তীত্যুক্তমুপপাদয়তি-এব ত ইতি। তথাপ্যর্থভেদে কাহনুপ-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮১৭

পত্তিস্তত্রাহ-ন চেতি। তদেবোপপাদয়তি-একো হীতি। কার্য্যকরণসংঘাতভেদাদাত্ম- ভেদমাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। জাতিতঃ স্বভাবতোহমহমিত্যেকাকারস্ফুরণাদিত্যর্থঃ। ইতশ্চ ন তত্ত্বভেদ ইত্যাহ-দ্বয়োরিতি। তদেব স্ফুটয়তি-যদীতি। দ্বয়োর্ম্মধ্যে যদ্যেকং ব্রহ্মাগৌণং, তদেতরেণ গৌণেনাবশ্যং ভবিতব্যং, তথা আত্মত্বাদি যদ্যেকস্তেষ্টং তদেতরস্যানাত্মত্বাদীতি কুতঃ স্যাদিতি চেৎ, তত্রাহ-বিরুদ্ধত্বাদিতি। উক্তোপপাদনপূর্ব্বকং দ্বিঃশ্রবণস্যাভিপ্রায়মাহ- বদীত্যাদিনা। অনেকমুখ্যত্বাসংভবাদস্ততঃ পরিচ্ছিন্নস্য ঘটবদব্রহ্মত্বাদনাত্মত্বাচৈকমেব মুখ্যং প্রত্যগ্‌ভূতং ব্রহ্মেত্যর্থঃ। যদি জীবেশ্বরভেদাভাবাৎ প্রশ্নয়োর্নার্থভেদস্তর্হি পুনরুক্তিরনর্থিকেত্যাশঙ্ক্যাহ -তস্মাদিতি। ৩

যত্তু পূর্ব্বোক্তেন সমানং দ্বিতীয়ে প্রশ্নান্তরে উক্তম্, তাবন্মাত্রৎ পূর্ব্বস্যৈ- বানুবাদঃ,—তস্যৈবানুক্তঃ কশ্চিদ্বিশেষো বক্তব্য ইতি। বঃ পুনরসৌ বিশেষঃ—ইতি? উচ্যতে—পূর্ব্বস্মিন্ প্রশ্নে—অস্তি ব্যতিরিক্ত আত্মা, যস্যায়ৎ সপ্রযোজকো বন্ধ উক্ত ইতি, দ্বিতীয়ে তু তস্যৈবাত্মনোহশনায়াদি- সংসারধর্মাতীতত্বং বিশেষ উচ্যতে, যদ্বিশেষপরিজ্ঞানাৎ সন্ন্যাসসহিতাৎ পূর্ব্বোক্তাদ্বন্ধনাদ্বিমুচ্যতে। তস্মাৎ প্রশ্নপ্রতিবচনয়োঃ “এষ ত আত্মা” ইত্যেব- মন্তয়োস্তুল্যার্থতৈব। ৪

তহি স এব বিশেষো দর্শয়িতব্যো যেন পুনরুক্তিরর্থবতীত্যাশঙ্ক্যাহ-যত্ত্বিতি। অনুক্তবিশেষ- কথনাথমুক্তপরিমাণং নির্ণেতুমুক্তানুবাদশ্চেদনুক্তো বিশেষস্তর্হি প্রদৃশ্যতামিতি পৃচ্ছতি-কঃ পুনরিতি। বুভূৎসিতং বিশেষং দর্শয়তি-উচাত ইতি। ইতি-শব্দঃ ক্রিয়াপদেন সংবধ্যতে। কিমিতোষ বিশেষো নির্দিগতে, তত্রাহ-যদ্বিশেষেতি। অর্থভেদাসংভবে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। যোহশনায়েত্যাদিনা তু বিবক্ষিতবিশেষোক্তিরিতি শেষঃ। ৪

ননু কথমেকস্যৈবাত্মনোহশনায়াদ্যতীতত্বং তদ্বত্ত্বঞ্চেতি বিরুদ্ধধৰ্ম্মসমবায়িত্ব- মিতি? ন, পরিহৃতত্বাৎ; নামরূপবিকার-কার্য্যকরণলক্ষণসঙ্ঘাতোপাধিভেদ- সম্পর্ক-জনিতভ্রান্তিমাত্রং হি সংসারিত্বমিত্যসকৃদবোচাম, বিরুদ্ধশ্রুতিব্যাখ্যান প্রস- ঙ্গেন চ; যথা রজ্জু-শুক্তিকা-গগনাদয়ঃ সর্প-রজত-মলিনা ভবন্তি পরাধ্যাবোপিত- ধর্ম্মবিশিষ্টাঃ, স্বতঃ কেবলা এব রজ্জুশুক্তিকাগগনাদয়ঃ; ন চৈবৎ বিরুদ্ধধর্ম্মসম- বারিত্বে পদার্থানাং কশ্চন বিরোধঃ। ৫

একমেবাত্মতত্ত্বমধিকৃত্য প্রশ্নাবিত্যত্র চোদয়তি-নন্বিতি। বিরুদ্ধধর্মবত্ত্বান্মিথো ভিন্নৌ প্রশ্নার্থাবিত্যেতদ্দূষয়তি-নেতি। পরিহৃতত্বমেব প্রস্ফুটয়তি-নামরূপেতি। তয়োব্বিকারঃ কার্য্যকরণলক্ষণঃ সংঘাতঃ, স এবোপাধিভেদস্তেন ସଂପର୍କস্তস্মিন্নহংমমাধ্যাসন্তেন জনিতা ভ্রান্তিরহং কর্তেত্যাতা, তাবন্মাত্রং সংসারিত্বমিত্যনেকশো ব্যুৎপাদিতং, তস্মান্নাস্তি বস্তুতো বিরুদ্ধধর্মবত্ত্ব- মিত্যর্থঃ। কিংচ সবিশেষত্বনির্বিশেষত্বশ্রুত্যোর্বিষয়বিভাগোক্তিপ্রসঙ্গেন সংসারিত্বস্য মিথ্যাত্বং মধুব্রাহ্মণান্তেইবোচামেত্যাহ-বিরুদ্ধেতি। কথং তর্হি বিরুদ্ধধর্মবত্ত্বপ্রতীতিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-

৮১৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যথেতি। পরেণ পুরুষেণাজ্ঞানেন বাহ্য্যারোপিতৈঃ সর্পত্বাদিভির্ধর্ম্মৈবিশিষ্টা ইতি যাবৎ। স্বতশ্চাধ্যারোপেণ বিনেত্যর্থঃ। প্রতিভাসতো বিরুদ্ধধর্মবত্তেইপি ক্ষেত্রজ্ঞেশ্বরয়োভিন্নত্বান্তিন্থার্থা- বেব প্রশ্নাবিতি চেন্নেত্যাহ—ন চৈবমিতি। নিরুপাধিকরূপেণাসংসারিত্বং সোপাধিকরূপেণ সংসারিত্বমিত্যবিরোধ উক্তঃ। ৫

নামরূপোপাধ্যস্তিত্বে “একমেবাদ্বিতীয়ম্”, “নেহ নানাস্তি কিঞ্চন” ইতি শ্রুতয়ো বিরুধ্যেরন্নিতি চেৎ; ন, সলিলফেনদৃষ্টান্তেন পরিহৃতত্বাৎ, মৃদাদিদৃষ্টা- ন্তৈশ্চ। যদা তু পরমার্থদৃষ্ট্যা পরমাত্মতত্ত্বাৎ শ্রুত্যনুসারিভিরন্যত্বেন নিরূপ্যমাণে নাম-রূপে মৃদাদিবিকারবৎ বস্তুন্তরে তত্ত্বতো ন স্তঃ—সলিলফেনঘটাদিবিকার- বদেব, তদা তদপেক্ষয়া “একমেবাদ্বিতীয়ম্” “নেহ নানাস্তি কিঞ্চন” ইত্যাদিপরমার্থ- দর্শনগোচরত্বং প্রতিপদ্যতে। যদা তু স্বাভাবিক্যা বিদ্যয়া ব্রহ্মস্বরূপৎ রজ্জুশুক্তিকা- গগনস্বরূপবদেব স্বেন রূপেণ বর্তমানং কেনচিদস্পৃষ্টস্বভাবমপি সৎ নামরূপকৃত- কার্য্যকরণোপাধিভ্যো বিবেকেন নাবধার্য্যতে, নামরূপোপাধিদৃষ্টিরেব চ ভবতি স্বাভাবিকী, তদা সর্ব্বোহয়ং বস্ত্বন্তরাস্তিত্বব্যবহারঃ। ৬

ইদানীমুপাধ্যভ্যুপগমে সদ্বয়ত্বং সতশ্চৈব ঘটাদেরুপাধিত্বদৃষ্টেরিতি শঙ্কতে-নামেতি। সলিলাতিরেকেণ ন সন্তি ফেনাদয়ো বিকারাঃ, নাপি মুদাদ্যতিরেকেণ তদ্বিকারাঃ শরাবাদয়ঃ সন্তীতি দৃষ্টান্তাখ্য-যুক্তিবলাদাবিদ্য-নামরূপরচিতকার্য্যকরণসংঘাতস্যাবিদ্যামাত্রত্বাৎ, তস্যাশ্চ বিদ্যয়া নিরাসান্নৈবমিতি পরিহরতি-নেত্যাদিনা। কাযাসত্ত্বমভ্যুপগম্যোক্তমিদানীং তদপি নিরূপ্যমাণে নাস্তীত্যাহ-যদা স্থিতি। নেহ নানাহস্তি কিংচনেত্যাদিশ্রুত্যনুসারিভির্বস্তদৃষ্ট্যা নিরূপ্যমাণে নামরূপে পরমাত্মতত্ত্বাদন্যত্বেনানন্যত্বেন বা নিরূপ্যমাণে তত্ত্বতো বস্তন্তরে যদা তু ন স্ত ইতি সংবন্ধঃ। মৃদাদিবিকারবদিত্যুক্তং প্রকটয়তি-সলিলেতি। তদা তৎপরমাত্মতত্ত্ব- মপেক্ষ্যেতি যোজনীয়ম্। কদা তর্হি লৌকিকো ব্যবহারস্তত্রাহ-যদা ত্বিতি। ৬

অস্তি চায়ং ভেদকৃতো মিথ্যাব্যবহারঃ, যেষাং ব্রহ্মতত্ত্বাদন্যত্বেন বস্তু বিদ্যতে, যেষাং চ নাস্তি। পরমার্থবাদিভিস্তু শ্রুত্যনুসারেণ নিরূপ্যমাণে বস্তুনি-কিং তত্ত্ব- তোহস্তি বস্তু, কিং বা নাস্তীতি, ব্রহ্মৈকমেবাদ্বিতীয়ৎ সর্ব্বসংব্যবহারশূন্যমিতি নির্ধার্য্যতে, তেন ন কশ্চিদ্বিরোধঃ। ন হি পরমার্থাবধারণনিষ্ঠায়াৎ বস্ত্বন্তরাস্তিত্বৎ প্রতিপদ্যামহে, “একমেবাদ্বিতীয়ম্” “অনন্তরমবাহ্যম্” ইতি শ্রুতেঃ। নচ নামরূপ- ব্যবহারকালে তু অবিবেকিনাং ক্রিয়াকারকফলাদিসংব্যবহারো নাস্তীতি প্রতি- বিধ্যতে; তস্মাদ্ জ্ঞানাজ্ঞানে অপেক্ষ্য সর্ব্বঃ সংব্যবহারঃ শাস্ত্রীয়ো লৌকিকশ; অতো ন কাচন বিরোধাশঙ্কা। সর্ব্ববাদিনামপ্যপরিহার্য্যঃ পরমার্থসংব্যবহার- কৃতো ব্যবহারঃ। ৭

অবিদ্বেষী, শৌর্য্যবতী, এক যশোবন্তা, বিবেচনাবতী, নরোত্তম, তথা সৌভাগ্যবান। বাসব-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমং ব্রাহ্মণম্।

৮১৯

হারন্চেৎ, তর্হি বিবেকিনাং নাসৌ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—অন্তি চেতি। ভেদভানপ্রযুক্তো ব্যবহারো বিবেকিনামবিবেকিনাং চ তুল্য এবায়ং, বস্তন্তরাস্তিত্বাভিনিবেশস্তু বিবেকিনাং নাস্তীতি বিশেষঃ।

ননু যথাপ্রতিভাসং বস্তুন্তরঃ পারমার্থিকমেব কিং ন স্যাত্তত্রাহ-পরমার্থেতি। কিং দ্বিতীয় বস্তু তত্ত্বতোহস্তি কিং বা নাস্তীতি বস্তুনি নিরূপমাণে সতি শ্রুত্যনুসারেণ তত্ত্বদর্শিভি- রেকমেবাদ্বিতীরং ব্রহ্মাব্যবহার্য্যমিতি নির্দ্ধার্য্যতে, তেন ব্যবহারদৃষ্ট্যাশ্রয়ণেন ভেদকৃতো মিথ্যা- ব্যবহারস্তত্বদৃষ্ট্যাশ্রয়ণেন চ তদভাববিষয়ঃ শাস্ত্রীয়ো ব্যবহার ইত্যুভয়বিধব্যবহারসিদ্ধিরিত্যর্থঃ। তত্র শাস্ত্রীয়ব্যবহারোপপত্তিং প্রপঞ্চয়তি-ন হাঁতি। তথা চ বিদ্যাবস্থায়াং শাস্ত্রীয়োহভেদ- ব্যবহারঃ, তদিতরব্যবহারস্থাভাসমাত্রমিতি শেষঃ। অবিদ্যাবস্থায়াং লৌকিকব্যবহারোপপত্তিং বিধৃণোতি-ন চ নামেতি। উভয়বিধব্যবহারোপপত্তিমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। উক্তরীত্যা ব্যবহারদ্বয়োপপত্তৌ ফলিতমাহ-অত ইতি। প্রত্যক্ষাদিরু বেদান্তেষু চেতি শেষঃ। জ্ঞানাজ্ঞানে পুরস্কৃত্য ব্যবহারঃ শাস্ত্রীয়ো লৌকিকশ্চেতি নাম্মাভিরেবোচ্যতে, কিংতু সর্বেষামপি পরীক্ষকাণা- মেতৎ স’মতং, সংসারদশায়াং ক্রিয়াকারকব্যবহারস্য মোক্ষাবস্থায়াং চ তদভাবস্তেষ্টত্বাদিত্যাহ- সর্ববাদিনামিতি। ৭

তত্র পরমার্থাত্মস্বরূপমপেক্ষ্য প্রশ্নঃ পুনঃ-কতমো যাজ্ঞবল্ক্য সর্ব্বান্তর ইতি। প্রত্যাহ ইতরঃ-যঃ অশনায়া-পিপাসে, অশিতুমিচ্ছা অশনায়া, পাতুমিচ্ছা পিপাসা, তে অশনায়াপিপাসে যোহত্যেতীতি বক্ষ্যমাণেন সম্বন্ধঃ। অবিবেকিভিস্তলমল- বদিব গগনং গম্যমানমেব তল-মলে অত্যেতি, পরমার্থতস্তাভ্যামসংসৃষ্টস্বভাবত্বাৎ; তথা মুঢ়ৈরশনায়া-পিপাসাদিমদ্ ব্রহ্ম গম্যমানমপি-ক্ষুধিতোহহং পিপাসিতোহহ- মিতি, তে অত্যেত্যেব, পরমার্থতস্তাভ্যামসংসৃষ্টস্বভাবত্বাৎ, “ন লিপ্যতে লোক- দুঃখেন বাহ্যঃ” ইতি শ্রুতেঃ, অবিদ্বস্লোকাধ্যারোপিতদুঃখেনেত্যর্থঃ। প্রাণৈক- ধৰ্ম্মত্বাৎ সমাসকরণং অশনায়াপিলাসয়োঃ। ৮

নিরুপাধিকে পরস্মিন্নাত্মনি চিদ্ধাতাবনাদ্যবিদ্যাকল্পিতোপাধিকৃতমশনায়াদিমত্ত্বং, বস্তুতত্ত্ব তদ্রাহিতামিত্যুপপাদ্যানন্তরপ্রশ্নমুখাপ্য প্রতিবক্তি-তত্রেত্যাদিনা। কল্পিতাকঞ্জিতয়োরাত্ম- রূপয়োনির্ধারণার্থা সপ্তমী। যোহত্যেতি স সর্ব্বান্তরত্বাদিবিশেষণস্তবাত্মেতি শেষঃ। ননু পরো নাশনায়াদিমান্ অপ্রসিদ্ধে’, নাপি জীবস্তথা, তস্য পরমাদব্যতিরেকাদত আহ-অবিবেকিভি- রিতি। পরমার্থত ইত্যুভয়তঃ সংবধ্যতে। ব্রহ্মৈবাখণ্ডং সচ্চিদানন্দমনাদ্যবিদ্যা-তৎকার্য্যবুদ্ধ্যাদি- সংবদ্ধমাভাসদ্বারা স্বানুভবাদ অশনায়াদিমদগম্যতে তত্ত্বম্, বস্তুতোহবিদ্যাসংবন্ধাদশনায়াদ্যতীতং নিতামুক্তং তিষ্ঠতীত্যর্থঃ। অশনায়াপিপাসাদিমদ্ ব্রহ্ম গম্যমানমিতি বদন্নাচাযো নানাজীববাদস্যা- নিষ্টত্বং সূচয়তি। পরমার্থতো ব্রহ্মণ্যশনায়াদ্যসংবন্ধে মানমাহ-ন লিপ্যত ইতি। বাহ্যত্ব- মসঙ্গত্বম্। লোকদুঃখেনেত্যযুক্তং, লোকস্যানাত্মনো দুঃখসংবন্ধনভ্যুপগমাদিত্যাশঙ্ক্যাহ- অবিদ্বদিতি। অশনায়াপিপাসয়োঃ সমস্যোপাদানে হেতুমাহ-প্রাণেতি। ৮

শোকম্, মোহম্—শোক ইতি কায্যঃ; ইষ্টং বস্তু উদিশ্য চিন্তয়তো যদরমণম্,

৮২০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তৎ তৃষ্ণাভিভূতস্য কামবীজম্; তেন হি কামো দীপ্যতে। মোহস্ত বিপরীত- প্রত্যয়-প্রভবোহবিবেকো ভ্রমঃ, স চাবিদ্যা সর্ব্বস্যানর্থস্য প্রসববীজম্; ভিন্নকার্য্য- ত্বাৎ তয়োঃ শোক-মোহয়োরসমাসকরণম্; তৌ মনোহধিকরণৌ, তথা শরীরাধি- করণৌ জরাৎ মৃত্যুৎ চাত্যেতি। জরেতি কার্য্যকরণসঙ্ঘাত-বিপরিণামো বলি- পলিতাদিলিঙ্গঃ। মৃত্যুরিতি তদ্বিচ্ছেদঃ বিপরিণামাবসানঃ, তৌ জরামৃত্যু শরীরাধিকরণাবত্যেতি। ৯

অরতিবাচী শোকশব্দো ন কামবিষয় ইত্যাশঙ্ক্যাহ—ইষ্টমিতি। কামবীজত্বমরতেরনু- ভবেনাভিব্যনক্তি—তেন হীতি। কামস্য শোকো বীজমিতি স কামতয়া ব্যাখ্যাতঃ, অনিত্যা- শুচিদুঃখানাত্মসু নিত্যশুচিসুখাত্মখ্যাতিঃ বিপরীতপ্রত্যয়ঃ, তস্মান্মনসি প্রভবতি কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্যা- বিবেকঃ, স লৌকিকঃ সম্যজ্ঞানবিরোধাদ্ব্রমোহবিদ্যেত্যুচ্যতে। তস্যাঃ সর্ব্বানর্থোৎপত্তৌ নিমিত্তত্বং মূলাবিদ্যায়াস্থপাদানত্বং, তদেতদাহ—মোহস্থিতি। কামস্য শোকঃ, মোহো দুঃখস্য হেতুরিতি ভিন্নকাৰ্য্যহং, তদ্বিচ্ছেদ ইত্যত্র কায্যকরণসংঘাতস্তচ্ছব্দার্থঃ। ৯

এতে অশনায়াদয়ঃ প্রাণ-মনঃ-শরীরাধিকরণাঃ প্রাণিযু অনবরতং বর্তমানাঃ অহোরাত্রাদিবৎ ‘সমুদ্রোর্ম্মিবচ্চ প্রাণিষ, সংসার ইত্যুচ্যতে। যোহসৌ দৃষ্টে- দ্রষ্টেত্যাদিলক্ষণঃ সাক্ষাদ্ অব্যবহিতঃ, অপরোক্ষাৎ অগৌণঃ সর্ব্বান্তর আত্মা ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তানাং ভূতানাম্, অশনায়াপিপাসাদিভিঃ সংসারধর্মৈঃ সদা ন স্পৃশ্যতে-আকাশ ইব ঘনাদিমলৈঃ; তম্ এতং বৈ আত্মানং স্বং তত্ত্বং বিদিত্বা জ্ঞাত্বা-অয়মহমস্মি পরং ব্রহ্ম সদা সর্ব্বসংসারবিনির্মুক্তং নিত্যতৃপ্তমিতি, ব্রাহ্মণাঃ -ব্রাহ্মণানামেবাধিকারো ব্যুত্থানে, অতো ব্রাহ্মণগ্রহণম্; ব্যুত্থায় বৈপরীত্যে- নোত্থানং কৃত্বা; কুত ইত্যাহ-পুত্রৈণায়াঃ-পুত্রার্থা এবণা পুত্রৈষণা-পুত্রেণ ইমং লোকং জয়েয়মিতি লোকজয়সাধনং পুত্রং প্রতীচ্ছা এষণা-দারসংগ্রহঃ, দার- সংগ্রহমকৃত্বেত্যর্থঃ। বিত্তৈষণায়াশ্চ-কর্মসাধনস্য গবাদেরুপাদানম্--অনেন কৰ্ম্ম কৃত্বা পিতৃলোকং জেষ্যামীতি, বিদ্যাসংযুক্তেন বা দেবলোকম্, কেবলয়া বা হিরণ্য- গর্ভবিদ্যয়া দৈবেন বিত্তেন দেবলোকম্। ১০

সংসারান্বিরক্তস্য পারিব্রাজ্যং বক্তু মুত্তরং বাক্যমিত্যভিপ্রেত্য সংক্ষেপতঃ সংসারস্বরূপমাহ- যে ত ইত্যাদিনা। তেষামাত্মধৰ্ম্মহং ব্যাবর্তয়িতুং বিশিনষ্টি-প্রাণেতি। তেষাং স্বরসতো বিচ্ছেদশঙ্কাং বারয়তি-প্রাণিথিতি। প্রবাহরূপেণ নৈরন্তর্য্যে দৃষ্টান্তমাহ-অহোরাত্রাদি- বদিতি। তেষামতিচপলত্বে দৃষ্টান্তঃ-সমুদ্রোর্ম্মিবদিতি। তেষাং হেয়ত্বং দ্যোতয়তি-প্রাণিধিতি। যে যথোক্তাঃ প্রাণিধশনায়াদয়স্তে তেষু সংসার ইত্যুচ্যত ইতি যোজনা। এতং বৈ তমিত্যত্র তচ্ছব্দার্থমুষস্তপ্রশ্নোক্তং ত্বংপদার্থং কথয়তি-যোহসাবিতি। এতচ্ছব্দার্থং কহোলপ্রশ্নোক্তং তৎপদার্থং দর্শয়তি-অশনায়েতি। তয়োরৈক্যং সামানাধিকরণ্যেন সূচিতমিত্যাহ-তমেত-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমং ব্রাহ্মণম্। ৮২১

মিতি। জ্ঞানমেব বিশদয়তি-অয়মিত্যাদিনা। জ্ঞাত্বা ব্রাহ্মণা ব্যুত্থার ভিক্ষাচর্য্যং চরস্তীতি সংবন্ধঃ। সংন্যাসবিধায়কে বাক্যে কিমিত্যধিকারিণি ব্রাহ্মণপদং, তত্রাহ-ব্রাহ্মণানামিতি। পুত্রার্থামেষণামের বিবৃণোতি-পুত্রেণেতি। ততো ব্যুত্থানং সংগৃহ্লাতি-দারসংগ্রহমিতি। বিত্তৈষণায়াশ ব্যুত্থানং কর্তব্যমিত্যাহ-বিত্তেতি। বিত্তং দ্বিবিধং মানুষং দৈবং চ। মানুষং গবাদি, তস্য কৰ্ম্মসাধনস্যোপাদানমুপার্জনং, তেন কৰ্ম্ম কৃত্বা কেবলেন কর্মণা পিতৃলোকং জৈষ্যামি। দৈবং বিত্তং বিদ্যা, তৎসংযুক্তেন কৰ্ম্মণা দেবলোকং, কেবলয়া চ বিদ্যয়া তমেব জৈষ্যামীতীচ্ছা বিত্তৈষণা, ততশ্চ ব্যুত্থানং কর্তব্যমিতি ব্যাচষ্টে-কৰ্ম্মসাধনস্তেতি। এতেন লোকৈষণায়াশ্চ ব্যুত্থানমুক্তং বেদিতব্যম্। ১০

দৈবাদ্বিতাদ ব্যুত্থানমেব নাস্তীতি কেচিৎ; যস্মাৎ তদ্বলেন হি কিল ব্যুত্থান- মিতি। তদসৎ, ‘এতাবান্ বৈ কামঃ’ ইতি পঠিতত্বাদ্ এষণামধ্যে দৈবস্য বিত্তস্য। হিরণ্যগর্ভাদিদেবতাবিষয়ৈব বিদ্যা বিত্তমিত্যুচ্যতে, দেবলোকহেতুত্বাৎ। ন হি নিরুপাধিকপ্রজ্ঞানঘনবিষয়া ব্রহ্মবিদ্যা দেবলোকপ্রাপ্তিহেতুঃ, “তস্মাত্তৎ সর্ব্বমভবৎ” “আত্মা হোষাৎ স ভবতি” ইতি শ্রুতেঃ; তদ্বলেন হি ব্যুত্থানম্, “এতং বৈ তমা- ত্মানং বিদিত্বা” ইতি বিশেষবচনাৎ। তস্মাৎ ত্রিভ্যোহপ্যেতেভ্যঃ অনাত্মলোক- প্রাপ্তিসাধনেভ্য এষণাবিষয়েভ্যো ব্যুত্থায়--এষণা কামঃ “এতাবান্ বৈ কামঃ” ইতি শ্রুতেঃ, এতস্মিংস্ত্রিবিধে অনাত্মলোকপ্রাপ্তিসাধনে তৃষ্ণামকৃত্বেত্যর্থঃ। ১১

দৈবাদ্বিতাদব্যুত্থানমাক্ষিপতি-দৈবাদিতি। তস্যাপি কামত্বাত্ততো ব্যুত্থাতব্যমিতি পরি- হরতি-তদসদিতি। তহি ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ সকাশাদপি ব্যুত্থানাত্তনমূলধ্বংসে তদ্ব্যাঘাতঃ স্তাদিত্যা- শঙ্ক্যাহ-হিরণ্যগর্ভাদীতি। দেবতোপাসনায়া বিত্তশব্দিতবিদ্যাত্বে হেতুমাহ-দেবলোকেতি। তৎপ্রাপ্তিহেতুত্বং ব্রহ্মবিদ্যায়ামপি তুল্যমিতি চেন্নেত্যাহ-ন হীতি। তত্র ফলান্তরশ্রবণং হেতু- করোতি-তস্মাদিতি। ইতশ্চ ব্রহ্মবিদ্যা দৈবান্বিতাদ্বহিয়েবেত্যাহ-তছলেনেতি। প্রাগেব বেদনং সিদ্ধং চেৎ, কিং পুনর্ব্যুত্থানেনেত্যাশঙ্কা প্রযোজকজ্ঞানং তৎপ্রযোজকম্, উদ্দেশ্যং তু তত্ত্ব- সাক্ষাৎকরণমিতি বিবক্ষিত্বাহ-তস্মাদিতি। প্রযোজকজ্ঞানং পঞ্চম্যর্থঃ। ব্যুত্থায় ভিক্ষাচধ্যং চরস্তীতি সংবন্ধঃ। ব্যুত্থানস্বরূপপ্রদর্শনার্থমেষণাস্বরূপমাহ-এষণেতি। কিমেতাবতেত্যাশঙ্কা ব্যুত্থানস্বরূপমাহ-এতস্মিন্নিতি। সম্বন্ধস্তু পূর্ববৎ। ১১

সর্ব্বা হি সাধনেচ্ছা ফলেচ্ছৈব; অতো ব্যাচষ্টে শ্রুতিঃ একৈব এষণেতি। কথম্? যা হ্যেব পুত্রৈষণা, সা বিত্তৈষণা, দৃষ্টফলসাধনত্বতুল্যত্বাৎ; যা বিত্তৈষণা সা লোকৈষণা; ফলার্থৈব সা; সর্ব্বঃ ফলার্থপ্রযুক্ত এব হি সর্ব্বং সাধনমুপাদত্তে; অত একৈবৈষণা। যা লোকৈষণা, সা সাধনমন্তরেণ সম্পাদয়িতুং ন শক্যতে— ইতি সাধ্য-সাধনভেদেন উভে হি যস্মাদেতে এষণে এব ভবতঃ; তস্মাদ্ ব্রহ্মবিদো নাস্তি কৰ্ম্ম কৰ্ম্মসাধনং বা—অতো যেহতিক্রান্তাঃ ব্রাহ্মণাঃ, সর্ব্বং কৰ্ম্ম কৰ্ম্মসাধনঞ্চ সর্ব্বৎ দেবপিতৃমানুষনিমিত্তং যজ্ঞোপবীতাদি—তেন হি দৈবং পিত্র্যৎ মানুষঞ্চ কৰ্ম্ম

৮২২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ক্রিয়তে, “নিবীতং মনুষ্যাণাম্” ইত্যাদিশ্রুতেঃ। তস্মাৎ পূর্ব্বে ব্রাহ্মণা ব্রহ্মবিদঃ ব্যুত্থায়—কর্মভ্যঃ কর্মসাধনেভ্যশ্চ যজ্ঞোপবীতাদিভ্যঃ, পরমহংসপারিব্রাজ্যং প্রতিপদ্য, ভিক্ষাচর্য্যং চরন্তি—ভিক্ষার্থং চরণং ভিক্ষাচর্য্যম্ চরন্তি—ত্যক্তা স্মার্ত্তং লিঙ্গং কেবলাশ্রমমাত্রশরণানাং জীবনসাধনং পারিব্রাজ্যব্যঞ্জকম্; “বিদ্বান্ লিঙ্গ- বর্জিতঃ” “তস্মাদলিঙ্গো ধর্মজ্ঞোহব্যক্তলিঙ্গোহব্যক্তাচারঃ” ইত্যাদিস্মৃতিভ্যঃ, “অথ পরিব্রাড্‌বিবর্ণবাসা মুণ্ডোহপরিগ্রহঃ” ইত্যাদিশ্রুতেঃ, “সশিখান্ কেশান্ নিকৃত্য বিসৃজ্য যজ্ঞোপবীতম্” ইতি চ। ১২

যা হ্যেবেত্যাদিশ্রতেস্তাৎপয্যমাহ—সর্বা হীতি। ফলং নেচ্ছতি সাধনং চ চিকীর্ষতীতি ব্যাঘাতাৎ ফলেচ্ছান্তর্ভূতৈব সাধনেচ্ছা, তদ্যুক্তমেষণৈক্যমিত্যর্থঃ। শ্রুতেস্তদৈক্যব্যুৎপাদকত্বং প্রশ্নপূর্ব্বকং ব্যুৎপাদয়তি—কথমিত্যাদিনা। ফলৈষণান্তর্ভাবং সাধনৈষণায়াঃ সমর্থয়তে—সর্ব ইতি। উভে হীত্যাদিশ্রুতিমবতার্য্য ব্যাচষ্টে—যা লোকৈষণেতি।

প্রযোজকজ্ঞানবতঃ সাধ্যসাধনরূপাৎ সংসারাদ্বিরক্তস্য কৰ্ম্মতৎসাধনয়োরসম্ভবে সাক্ষাৎ- কারমুদ্দিশ্য ফলিতং সংস্থাসং দশয়তি—অত ইতি। অতিক্রান্তা ব্রাহ্মণাঃ কিং প্রজয়েত্যাদি- প্রকাশিতাঃ, তেষাং কৰ্ম্ম কৰ্ম্মসাধনং চ যজ্ঞোপবীতাদি নাস্তীতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। দেবপিতৃমানুষ- নিমিত্তমিতি বিশেষণং বিশদয়তি—তেন হীতি। প্রাচীনাবীতং পিতৃণাম্ উপবীতং দেবানা- মিত্যাদিশব্দার্থঃ। যস্মাৎ পূর্ব্বে বিচারপ্রযোজকজ্ঞানবন্তো ব্রাহ্মণা বিরক্তাঃ সংন্যস্য তৎপ্রযুক্তং ধৰ্ম্মমন্বতিষ্ঠন্, তস্মাদধুনাতনোহপি প্রযোজকজ্ঞানী বিরক্তো ব্রাহ্মণস্তথা কুৰ্য্যাদিত্যাহ—তস্মাদিতি। ‘ত্রিদণ্ডেন যতিশ্চৈব’ ইত্যাদিস্মৃতেন পরমহংসপারিব্রাজ্যমত্র বিবক্ষিতমিত্যাশঙ্ক্যাহ—তাত্তে তি। তস্য দৃষ্টার্থত্বান্ মুমুক্ষুভিস্ত্যাজত্বং সুচয়তি—কেবলমিতি। অমুখ্যত্বাচ্চ তস্য ত্যাজ্যতেত্যাহ— পারিব্রাজ্যেতি। তথাপি ত্বদিষ্টঃ সংন্যাসো ন স্মৃতিকারৈনিবদ্ধ ইতি চেন্নেত্যাহ—বিদ্বানিতি। প্রত্যক্ষশ্রুতিবিরোধাচ্চ স্মার্তসংন্যাসো মুখ্যো ন ভবতীত্যাহ—অথেতি। ১২

ননু ‘ব্যুত্থায় ভিক্ষাচর্য্যং চরস্তি’ ইতি বর্তমানাপদেশাদ্ অর্থবাদোহয়ম্; ন বিধায়কঃ প্রত্যয়ঃ কশ্চিৎ ক্রয়তে-লিঙ্গলোটব্যানামন্যতমোহপি; তস্মাদর্থ- বাদমাত্রেণ শ্রুতিস্মৃতিবিহিতানাং যজ্ঞোপবীতাদীনাং সাধনানাং ন শক্যতে পরি- ত্যাগঃ কারয়িতুম্; “যজ্ঞোবীত্যেবাধীয়ীত যাজয়েদ্ যজেত বা।” পারিব্রাজ্যে তাবদধ্যয়নং বিহিতম্;

“বেদসন্যসনাৎ শূদ্রস্তস্মাদ্বেদং ন সংন্যসেৎ” ইতি; “স্বাধ্যায় এবোৎসৃজ্যমানো বাচম্” ইতি চ আপস্তম্বঃ; “ব্রহ্মোজ্জাং বেদনিন্দা চ কৌটসাক্ষ্যৎ সুহৃদ্বধঃ। গর্হিতান্নাদ্যয়োর্জগ্ধিঃ সুরাপানসমানি ষট্।”

ইতি বেদপঞ্জিতে বৈষ্ণবপুরাণ। “উপাসনে শম্ভুঃ কৃষ্ণানামতিথীনাং, হোমে”

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমং ব্রাহ্মণম্।

৮২৩

জপ্যকৰ্ম্মণি ভোজন আচমনে স্বাধ্যায়ে চ যজ্ঞোপবীতী স্যাৎ” ইতি পরিব্রাজক- ধর্ম্মেষু চ গুরূপাসনস্বাধ্যায়ভোজনাচমনাদীনাং কৰ্ম্মণাৎ শ্রুতিস্মৃতিষু কর্তব্যতয়া চোদিতত্বাৎ গুর্ব্বাদ্যপাসনাঙ্গত্বেন যজ্ঞোপবীতস্য বিহিতত্বাৎ তৎপরিত্যাগো নৈবা- বগন্তুং শক্যতে। ১৩

এতং বৈ তমিত্যাদিবাক্যস্য বিধায়কত্বমুপেত্য সর্ব্বকৰ্ম্ম-তৎসাধনপরিত্যাগপরত্বমুক্তমাক্ষি- পতি—নন্বিতি। ইতশ্চ যজ্ঞোপবীতমপরিত্যাজ্যমিত্যাহ—যজ্ঞোপবীত্যেবেতি। যাজনাদি- সমভিব্যাহারাদসংস্যাসিবিষয়মেতদিত্যাশঙ্ক্যাহ—পারিব্রাজ্যে ভাবদিতি। বেদত্যাগে দোষ- শ্রুতেস্তদত্যাগেহপি কথং পারিব্রাজ্যে যজ্ঞোপবীতিত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ—উপাসন ইতি। ইত্যনেন বাক্যেন গুর্ব্বাদ্যপাসনাঙ্গত্বেন যজ্ঞোপবীতস্থ্য বিহিতত্বাৎ পরিব্রাজকধর্ম্মেষু গুরূপাসনাদীনাং কর্তব্যতয়া শ্রুতিস্মৃতিষু চোদিতত্বাদ্ যজ্ঞোপবীতপরিত্যাগোহবগন্তং নৈব শক্যত ইত্যন্বয়ঃ। ১৩

যদ্যপ্যেষণাভ্যো ব্যুত্থানং বিধীয়ত এব, তথাপি পুত্রাদ্যেষণাভ্যস্তিসৃভ্য এব ব্যুত্থানম্, ন তু সর্ব্বস্মাৎ কর্মণঃ কৰ্ম্মসাধনাচ্চ ব্যুত্থানম্; সর্ব্বপরিত্যাগে চাশ্রুতং কৃতৎ স্যাৎ, শ্রুতঞ্চ যজ্ঞোপবীতাদি স্থাপিতং স্যাৎ; তথাচ মহানপরাধঃ বিহিতাকরণ-প্রতিষিদ্ধাচরণনিমিত্তঃ কৃতঃ স্যাৎ; তস্মাদ্ যজ্ঞোপবীতাদি-লিঙ্গ- পরিত্যাগোহন্ধপরম্পরৈব। ন, “যজ্ঞোপবীতং বেদাংশ সর্ব্বং তদ্বর্জয়েদ্ যতিঃ” ইতি শ্রুতেঃ। ১৪

সম্প্রতি প্রৌঢ়িমারূঢ়ো ব্যুত্থানে বিধিমঙ্গীকৃত্যাপি দূষয়তি—যদ্যপীত্যাদিনা। এষণাভ্যো ব্যুত্থানে সত্যেষণাত্বাবিশেষাৎ কর্ম্মণস্তৎসাধনাচ্চ ব্যুত্থানং সেৎস্যতীত্যাশঙ্ক্য যজ্ঞোপবীতা- দেরেষণাত্বমসিদ্ধমিত্যাশয়েনাহ—সর্ব্বেতি। অশ্রুতকরণে শ্রুতত্যাগে চ ‘অকুর্ব্বন্ বিহিতং কৰ্ম্ম’ ইত্যাদিস্মৃতিমাশ্রিত্য দূষণমাহ—তথা চেতি। ননু দৃশতে যজ্ঞোপবীতাদিলিঙ্গত্যাগঃ, স কম্মান্নিরাক্রিয়তে, তত্রাহ—তম্মাদিতি। নেয়মন্ধপরস্পরেতি পরিহরতি—নেত্যাদিনা। ১৪

অপিচ, আত্মজ্ঞানপরত্বাৎ সর্ব্বস্যা উপনিষদঃ-আত্মা দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্য ইতি হি প্রস্তুতম্; স চাত্মৈব সাক্ষাদপরোক্ষাৎ সর্ব্বান্তরঃ অশনায়াদি- সংসারধৰ্ম্মবর্জিতঃ-ইত্যেবং বিজ্ঞেয় ইতি তাবৎ প্রসিদ্ধম্। সর্ব্বা হীয়মুপনিষদ্ এবংপরেতি বিধ্যন্তরশেষত্বং তাবন্নাস্তি, অতো নার্থবাদঃ, আত্মজ্ঞানস্য কর্তব্যত্বাৎ। আত্মা চ অশনায়াদিধর্মবান্ ন ভবতীতি সাধন-ফলবিলক্ষণো জ্ঞাতব্যঃ; অতো ব্যতিরেকেণ আত্মনো জ্ঞানম্ অবিদ্যা-“অন্যোহসাবন্যোহহমস্মীতি, ন স বেদ” “মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি, য ইহ নানেব পশ্যতি” “একধৈবানুদ্রষ্টব্যমেকমেবাদ্বিতীয়ম্” “তত্ত্বমসি” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। ক্রিয়াফলং সাধনঞ্চ অশনায়াদিসংসারধৰ্মাতীতা- দাত্মনঃ অন্যদবিদ্যাবিষয়ম্-“যত্র হি দ্বৈতমিব ভবতি” “অন্যোহসাবন্যোহহমস্মি, ন স বেদ” “অথ যেহন্যথাতো বিদুঃ” ইত্যাদিবাক্যশতেভ্যঃ। ১৫

৮২৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ব্রহ্মচর্য্যাদেব প্রব্রজেদিত্যাদিবিধ্যুপলন্তেপি প্রৌঢ়বাদেনাত্মজ্ঞানবিধিবলাদেব সংন্যাস’ সাধয়িতুমাত্মজ্ঞানপরত্বং তাবদুপনিষদামুপন্যস্যতি-অপি চেতি। ইতশ্চান্তি সংন্যাসে বিধিরিতি যাবৎ। তদ্বিধিবলাদেব সংন্যাসসিদ্ধিরিতি শেষঃ। কথং সর্ব্বোপনিষদাত্মজ্ঞানপরেষ্যতে, কর্তৃস্তুতিদ্বারা কৰ্ম্মবিধিশেষত্বেনার্থবাদত্বাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-আত্মেত্যাদিনা। অস্ত যথোক্তং বস্তু বিজ্ঞেয়ং, তথাপি প্রস্তুতে কিং জাতং? তদাহ-সর্ব্বা হীতি। ননু তস্য কর্তব্যত্বেংপি কথং কৰ্ম্ম-তৎসাধনত্যাগসিদ্ধিরত আহ-আত্মা চেতি। বিপক্ষে দোষমাহ-অত ইতি। সাধন- ফলাত্তর্ভূতত্বেনাত্মনো জ্ঞানমবিদ্যেত্যত্র প্রমাণমাহ-অন্যোহসাবিত্যাদিনা। ক্রিয়াকারকফল- বিলক্ষণস্যাত্মনো জ্ঞানং কর্তব্যং, তৎসামর্থ্যাৎ সাধ্যসাধনত্যাগঃ সিধ্যতীত্যুক্তং; সম্প্রত্যবিদ্যা- বিষয়ত্বাচ্চ সাধ্যসাধনয়োর্বিদ্যাবতা ত্যাজ্যতেত্যাহ-ক্রিয়েতি। তস্যাবিদ্যাবিষয়ত্বে শ্রুতীরুদা- হরতি-যত্রেতি। ১৫

ন চ বিদ্যাবিদ্যে একস্য পুরুষস্য সহ ভবতঃ, বিরোধাৎ-তমঃপ্রকাশাবিব। তস্মাদাত্মবিদঃ অবিদ্যাবিষয়োহধিকারো ন দ্রষ্টব্যঃ ক্রিয়া-কারক-ফলভেদরূপঃ, “মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি” ইত্যাদিনিন্দিতত্বাৎ। সর্ব্বক্রিয়াসাধনফলানাঞ্চ অবিদ্যা- বিষরাণাৎ তদ্বিপরীতাত্মবিদ্যয়া হাতব্যত্বেনেষ্টত্বাৎ, যজ্ঞোপবীতাদিসাধনানাঞ্চ তদ্বি- ষয়ত্বাৎ; তস্মাদসাধনফলস্বভাবাদাত্মনঃ অন্যবিষয়া বিলক্ষণা এষণা। উভে হোতে সাধন-ফলে এষণে এব ভবতঃ, যজ্ঞোপবীতাদেস্তৎসাধ্যকর্মণাঞ্চ সাধনত্বাৎ, “উভে হোতে এষণে এব” ইতি হেতুবচনেনাবধারণাৎ। যজ্ঞোপবীতাদিসাধনাৎ, তৎসাধ্যেভ্যশ্চ কৰ্ম্মভ্যঃ অবিদ্যাবিষয়ত্বাৎ এষণারূপত্বাচ্চ জিহাসিতব্যরূপত্বাচ্চ ব্যুত্থানং বিধিৎসিতমেব। ১৬

অবিদ্যাবিষয়ত্বেহপি সাধনাদি বিদ্যাবত এব ভবিষ্যতি, বিদ্যাবিদ্যয়োরম্মদাদিয়ু সাহিত্যোপ- লস্তাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। বিদ্যাবিদ্যয়োঃ সাহিত্যাসম্ভবে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। ইতশ্চ প্রযোজকজ্ঞানবতা সাধ্যসাধনভেদো ন দ্রষ্টব্যো বিবগ্নিত-তত্ত্বসাক্ষাৎকারবিরোধিত্বাদি- ত্যাহ-সর্ব্বেতি। ভবত্ববিদ্যাবিষয়াণাং বিদ্যাবতস্ত্যাগঃ, তথাপি কুতো যজ্ঞোপবীতাদীনাং ত্যাগস্তত্রাহ-যজ্ঞোপবীতাদীতি। তদ্বিষয়ত্বাদিত্যত্র তচ্ছব্দোহবিদ্যাবিয়ঃ। এষণাত্বাচ্চ যজ্ঞোপবীতাদীনাং ত্যাজ্যতেত্যাহ-তস্মাদিতি। জ্ঞেয়ত্বেন প্রস্তুতাদিতি যাবৎ। সাধ্যসাধন- বিষয়া তদাত্মিকৈষণা ত্যাজেত্যত্র হেতুমাহ-বিলক্ষণেতি। পুরুষার্থরূপাদ্বিপরীতা সা হেয়েত্যর্থঃ। সাধ্যসাধনয়োরেষণাত্বং সাধয়তি-উভে হীতি। তথাপি যজ্ঞোপবীতাদীনাং কর্মণাং চ কথমেষণাত্বমিত্যাশঙ্ক্য সাধনান্তর্ভাবাদিত্যাহ-যজ্ঞোপবীতাদেরিতি। তয়োরেষণাত্বং কথং প্রতিজ্ঞামাত্রেণ সেৎস্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ--উভে হীতি। তয়োরেষণাত্বে সিদ্ধে ফলিতমাহ- যজ্ঞোপবীতাদীতি। ১৬

ননু উপনিষদ আত্মজ্ঞানপরত্বাৎ ব্যুত্থানশ্রুতিঃ তৎস্তুত্যর্থা, ন বিধিঃ; ন; বিধিৎসিতবিজ্ঞানেন সমানকর্তৃত্বশ্রবণাৎ। নহি অকর্তব্যেন কর্তব্যস্য সমানকর্তৃক-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮২৫

ত্বেন বেদে কদাচিদপি শ্রবণং সম্ভবতি; কর্তব্যানামের হি অভিষব-হোম-ভক্ষাণাৎ যথা শ্রবণম্—অভিযুত্য হুত্বা ভক্ষয়স্তীতি, তদ্বদ্ আত্মজ্ঞানৈষণা-ব্যুত্থান-ভিক্ষা- চর্য্যাণাং কর্তব্যানামের সমানকর্তৃকত্বশ্রবণং ভবেৎ। ১৭

আত্মজ্ঞানবিধিরেব সংন্যাসবিধিরিত্যুক্তত্বাদ ব্যুথায়েত্যস্য নাস্তি বিধিত্বমিতি শঙ্কতে- নন্বিতি। ব্যুথায় বিদিত্বেতি পাঠক্রমমতিক্রম্য ব্যাখ্যানে ভবত্যেবায়ং বিবিদিযোবিধিরিতি পরিহরতি-ন বিধিৎসিতেতি। পাঠক্রমেহপি প্রযোজকজ্ঞানবতো বিরক্তস্য ভবত্যেবায়ং বিধি- রিত্যভিপ্রেত্যাহ-ন হীতি। উক্তমেবান্বয়মুখেনোদাহরণদ্বারা বিবৃণোতি-কর্তব্যানামিতি। অভিযুত্য সোমস্য কণ্ডনং কৃত্বা রসমাদায়েত্যর্থঃ। ১৭

অবিস্তাবিষয়ত্বাদেষণাত্বাচ্চ অর্থপ্রাপ্ত আত্মজ্ঞানবিধেরেব যজ্ঞোপবীতাদি- পরিত্যাগঃ, ন তু বিধাতব্য ইতি চেৎ; ন; সুতরামাত্মজ্ঞানবিধিনৈব বিহিতস্য সমানকর্তৃকত্বশ্রবণেন দার্যোপপত্তিঃ, তথা ভিক্ষাচর্য্যস্য চ। যৎ পুনরুক্তম্—বর্ত্ত- মানাপদেশাদর্থবাদমাত্রমিতি; ন; ঔদুম্বর-যুপাদিবিধিসমানত্বাদদোষঃ। ১৮

পাঠক্রমমেবাশ্রিত্য শঙ্কতে-অবিদ্যেতি। প্রযোজকজ্ঞানবতো বিরক্তস্যাত্মজ্ঞানবিধিসামর্থ্য- লব্ধস্য যজ্ঞোপবীতাদিত্যাগস্থ্য কর্তব্যাত্মজ্ঞানেন সমানকর্তৃকত্বশ্রবণাদতিশয়েনাবশ্যকত্বসিদ্ধিরিত্যু- ত্তরমাহ-ন সুতরামিতি। ব্যুত্থানে দর্শিতং ন্যায়ং ভিক্ষাচয্যেৎপ্যতিদিশতি-তথেতি। ভিক্ষা- চর্য্যস্য চাত্মজ্ঞানবিধানৈকবাক্যস্য তথৈব দার্চোপপত্তিরিতি সম্বন্ধঃ। ব্যুত্থানাদিবাক্যস্তার্থবাদত্ব- মুক্তমনূদ্য দুষয়তি-যৎ পুনরিত্যাদিনা। ঔদুম্বরো যুপো ভবতীত্যাদৌ লোট্পরিগ্রহেণ বিধি- স্বাকারবদত্রাপি পঞ্চমলকারেণ বিধিসিদ্ধেনার্থবাদত্বশঙ্কেত্যর্থঃ। ১৮

‘ব্যুত্থায় ভিক্ষাচর্য্যৎ চরন্তি’ ইত্যনেন পারিব্রাজ্যং বিধীয়তে; পারিব্রাজ্যা- শ্রমে চ যজ্ঞোপবীতাদিসাধনানি বিহিতানি লিঙ্গঞ্চ শ্রুতিভিঃ স্মৃতিভিশ্চ; অতস্ত- দ্বর্জয়িত্বা অন্যস্মাদ ব্যুত্থানম্ এষণাত্বেহপীতি চেৎ; ন, বিজ্ঞানসমানকর্তৃকাৎ পারিব্রাজ্যাদেষণাব্যুত্থানলক্ষণাৎ পারিব্রাজ্যান্তরোপপত্তেঃ। যদি তদ্ এষণাভ্যো ব্যুত্থানলক্ষণং পারিব্রাজ্যম্, তদ্‌ আত্মজ্ঞানাঙ্গম্, আত্মজ্ঞানবিরোধ্যেষণাপরিত্যাগ- রূপত্বাৎ, অবিদ্যাবিষয়ত্বাচ্চ এষণায়াঃ; তদ্ব্যতিরেকেণ চ অস্তি আশ্রমরূপং পারিব্রাজ্যং ব্রহ্মলোকাদি-ফলপ্রাপ্তিসাধনম্, যদ্বিষয়ং যজ্ঞোপবীতাদিসাধনবিধানং লিঙ্গবিধানঞ্চ। নচ এষণারূপসাধনোপাদানস্য আশ্রমধর্মমাত্রেণ পারিব্রাজ্যান্তর- বিষয়ে সম্ভবতি সতি, সর্ব্বোপনিষদ্বিহিতস্যাত্মজ্ঞানস্য বাধনং যুক্তম্; যজ্ঞোপ- বীতাদ্যবিদ্যাবিষয়ৈষণারূপ-সাধনোপাদিত্সায়াং চ অবশ্যম্ অসাধন-ফলরূপস্য অশনায়াদিসংসারধৰ্ম্মবজ্জিতস্য ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ ইতি বিজ্ঞানং বাধ্যতে। ন চ তদ্বাধনং যুক্তম্, সর্ব্বোপনিষদাং তদর্থপরত্বাৎ। ১৯

নক্ষত্রং যৎকঞ্চনং শৌর্য্যং যৎকঞ্চনমূর্ত্তিতং। যথাঃ শকুন্তল—ভূষাণোঽপি। কা। কহি

৮২৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বিপ্রতিপত্তিস্তত্রাহ-পারিব্রাজ্যেতি। লিঙ্গং ত্রিদণ্ডত্বাদি। ‘পুরাণে যজ্ঞোপবীতে বিসৃজ্য নবমুপাদায়াশ্রমং প্রবিশেৎ ত্রিদন্তী কমণ্ডলুমান” ইত্যাদ্যাঃ শ্রুতয়ঃ স্মৃতয়শ্চ। এষণাত্বাদ যজ্ঞোপবীতাদীনামপি ত্যাজ্যত্বমুক্তমিত্যাশঙ্ক্য শ্রুতিস্মৃতিবশাদ ব্যুত্থানে সঙ্কোচমভিপ্রেত্যাহ- অত ইতি। উদাহৃতশ্রুতিস্মৃতীনাং বিষয়ান্তরং দর্শয়ন্নুত্তরমাহ-নেত্যাদিনা। তদেব বিবৃণোতি-যদ্ধীত্যাদিনা। তস্যাত্মজ্ঞানাঙ্গত্বে হেতুমাহ-আত্মজ্ঞানেতি। এষণায়ান্তদ্বিরোধিত্ব- মেব কুতঃ সিদ্ধং, তত্রাহ-অবিদ্যেতি। তর্হি যথোক্তানাং শ্রুতিস্মৃতীনাং কিমালম্বনং, তদাহ- তদ্ব্যতিরেকেণেতি। আশ্রমত্বেন রূপ্যতে, বস্তুতত্ত্ব নাশ্রমস্তদাভাস ইতি যাবৎ। তস্যাত্ম- জ্ঞানাঙ্গত্বং বারয়তি-ব্রহ্মেতি।

অথ ব্যুত্থানবাক্যোক্ত-মুখ্যপারিব্রাজ্যবিষয়ত্বমেব লিঙ্গাদিবিধানস্য কিং ন স্যাৎ, তত্রাহ-ন চেতি। এষণারূপাণি সাধনানি যজ্ঞোপবীতাদীনি, তেষামুপাদানমনুষ্ঠানং, তস্যাশ্রমধৰ্ম্মমাত্রে- ণোক্তন্য যথোক্তে সংন্যাসাভাসে বিষয়ে সতি প্রধানবাধেন মুখ্যপারিব্রাজ্যবিষয়ত্বমযুক্তমিত্যর্থঃ। কথং পুনর্মুখ্যপারিব্রাজ্যবিষয়ত্বে যজ্ঞোপবীতাদেরিষ্টে প্রধানবাধনং, তদাহ-যজ্ঞোপবীতাদীতি। সাধ্যসাধনয়োরাসঙ্গে তদ্বিলক্ষণস্যাত্মনো জ্ঞানং বাধ্যতে চেৎ, কা নো হানিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। ১৯

‘ভিক্ষাচর্য্যং চরন্তি’ ইত্যেষণাৎ গ্রাহয়ন্তী শ্রুতিঃ স্বয়মেব বাধত ইতি চেৎ; অথাপি স্যাদেষণাভ্যো ব্যুত্থানং বিধায় পুনরেষণৈকদেশং ভিক্ষাচর্য্যৎ গ্রাহয়ন্তী তৎ- সম্বদ্ধমন্যদপি গ্রাহয়ন্তীতি চেৎ; ন, ভিক্ষাচর্য্যস্যাপ্রযোজকত্বাৎ—হুত্বোত্তরকাল- ভক্ষণবৎ; শেষপ্রতিপত্তিকৰ্ম্মত্বাদ অপ্রযোজকং হি তৎ; অসংস্কারকত্বাচ্চ—ভক্ষণৎ পুরুষসংস্কারকমপি স্যাৎ, নতু ভিক্ষাচর্য্যম্, নিয়মাদৃষ্টস্যাপি ব্রহ্মবিদোহনিষ্টত্বাৎ।

নিয়মাদৃষ্টস্যানিষ্টত্বে কিং ভিক্ষাচর্য্যেণেতি চেৎ; ন, অন্যসাধনাদ্যুত্থানস্য বিহিত- ত্বাৎ। তথাপি কিং তেনেতি চেৎ; যদি স্যাৎ, বাঢ়ম্, অভ্যুপগম্যতে হি তৎ। ২০

ভিক্ষাচর্য্যং তাবদ্বিহিতং, বিহিতানুষ্ঠানং চ যজ্ঞোপবীতাদি বিনা ন সম্ভবতীতি শ্রুত্যৈ- বাত্মজ্ঞানং যজ্ঞোপবীতাদিবিরোধি বাধিতমিতি শঙ্কতে-ভিক্ষাচর্য্যমিতি। শঙ্কামেব বিশদয়তি-অথাপীত্যাদিনা। যথা হুতশেষস্য ভক্ষণং বিহিতমপি ন দ্রব্যাক্ষেপকং পরিশিষ্ট- দ্রব্যোপাদানেন প্রবৃত্তেঃ, তথা সর্ব্বস্বত্যাগে বিহিতে পরিশিষ্টভিক্ষোপাদানেন বিহিতমপি ভিক্ষা- চরণমুপবীতাদ্যনাক্ষেপকমিত্যুত্তরমাহ-নেত্যাদিনা। দৃষ্টান্তমেব স্পষ্টয়তি-শেষেতি। তদ্ভক্ষণ- মিতি সম্বন্ধঃ। অপ্রযোজকং দ্রব্যবিশেষস্তানাক্ষেপকমিতি যাবৎ। যদ্বা দাষ্টান্তিকমেব স্ফুটয়তি-শেষেতি। সর্ব্বস্বত্যাগে বিহিতে শেষন্য কালস্য শরীরপাতান্তস্য প্রতিপত্তিকৰ্ম্মমাত্রং ভিক্ষাচর্য্যম্, অতো ন তদুপবীতাদিপ্রাপকমিত্যর্থঃ। কিঞ্চ ভিক্ষাচর্য্যস্য শরীরস্থিত্যৈবাক্ষিপ্তত্বান্ন তত্রাপি বিধিঃ, দূরে তদ্বশাদুপবীতাদিসিদ্ধিরিত্যাহ-অসংস্কারত্বাচ্চেতি। তদেব স্ফুট্যতে- ভক্ষণমিতি। ‘এককালং চরেস্তৈক্ষম’ ইত্যাদিনিয়মবশাদদৃষ্টং সিধ্যদুপবীতাদিকমপ্যাক্ষিপতীতি চেনেত্যাহ-নিয়মেতি। বিবিদিষোস্তদিষ্টমপি নোপবীতাদ্যাক্ষেপকং জ্ঞানোৎপাদকশ্রবণাদ্যুপ- যোগিদেহস্থিত্যর্থত্বেনৈব চরিতার্থহাদিতি ভাবঃ।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮২৭

তর্হি যথাকথঞ্চিদুপনতেনান্নেন শরীরস্থিতিসম্ভবাদ্ভিক্ষাচর্য্যং চরন্তীতি বাক্যং ব্যর্থমিতি শঙ্কতে-নিয়মাদৃষ্টস্যেতি। ভিক্ষাচর্যানুবাদেন প্রতিগ্রহাদিনিবৃত্ত্যর্থত্বাদ্বাক্যন্য নানর্থক্য- মিত্যুত্তরমাহ-নান্যেতি। নিবৃত্ত্যুপদেশেন বাক্যস্যার্থবত্ত্বেহপি তদুপদেশস্য নার্থবত্ত্বং, কুটস্থাত্ম- জ্ঞানেনৈব সর্ব্বনিবৃত্তেঃ সিদ্ধেরিতি শঙ্কতে-তথাপীতি। যদি নিষ্ক্রিয়াত্মজ্ঞানাদশেষনিবৃত্তিঃ স্যাৎ, তর্হি তদস্মাভিরপি স্বীক্রিয়তে সত্যমিত্যঙ্গীকরোতি-যদীতি। যদি তু ক্ষুধাদিদোষ- প্রাবল্যাদাত্মানং নিষ্ক্রিয়মপি বিস্মৃত্য প্রার্থনাদিপরো ভবতি, তদা নিবৃত্ত্যুপদেশোহপি ভবত্যর্থবানিতি ভাবঃ। ২০

যানি পারিব্রাজ্যেহভিহিতানি বচনানি-“যজ্ঞোপবীত্যেবাধীয়ীত” ইত্যাদিনি, তানি অবিদ্বৎপারিব্রাজ্যমাত্রবিষয়াণীতি পরিহৃতানি, ইতরথা আত্মজ্ঞানবাধঃ স্যাদিতি হ্যুক্তম্।

“নিরাশিষ্যমনাস্তুং নির্ম্মমকারমস্তুতিম্।

অগ্নিং কুণ্ডকুণ্ডং তং দেবা ব্রাহ্মণং বিদুঃ।

ইতি সর্ব্বকর্মাভাবং দর্শয়তি স্মৃতিবিদুষঃ; “বিদ্বাল্লিঙ্গবিবর্জিতঃ” “তস্মাদলিঙ্গো ধৰ্ম্মজ্ঞঃ” ইতি চ। তস্মাৎ পরমহংসপারিব্রাজ্যমেব ব্যুত্থানলক্ষণং প্রতিপদ্যতে আত্মবিৎ সর্ব্বকৰ্ম্মসাধনপরিত্যাগরূপমিতি। ২১

প্রাগুক্তবাক্যবিরোধান্নিবৃত্ত্যুপদেশোহশক্য ইতি চেৎ, তত্রাহ—যানীতি। মুখ্যপরিব্রাডবিষয়ত্বে দোষং স্মারয়তি—ইতরথেতি। নিবৃত্ত্যুপদেশানুগ্রহকত্বেন স্মৃতীরুদাহরতি—নিরাশিষমিত্যা- দিনা। অমুখ্যসংখ্যাসিবিষয়ত্বাসম্ভবান্ মুখ্যপরিব্রাডবিষয়ং ব্যুত্থানবাক্যমিত্যুপসংহরতি—তস্মা- দিতি। ইতি-শব্দো ব্যুত্থানবাক্যব্যাখ্যানসমাপ্ত্যর্থঃ। ২১

যস্মাৎ পূর্ব্বে ব্রাহ্মণা এতামাত্মানম্ অসাধন-ফলস্বভাবং বিদিত্বা সর্ব্বস্মাৎ সাধন- স্বরূপাদেষণালক্ষণাদ ব্যুত্থায় ভিক্ষাচর্য্যৎ চরন্তি স্ম-দৃষ্টাদৃষ্টার্থং কৰ্ম্ম তৎসাধনং চ হিত্বা, তস্মাৎ অদ্যত্বেহপি ব্রাহ্মণঃ ব্রাহ্মবিৎ পাণ্ডিত্যং পণ্ডিতভাবম্-এতদাত্ম- বিজ্ঞানং পাণ্ডিত্যম্, তৎ নির্বিদ্য নিঃশেষং বিদিত্বা-আত্মবিজ্ঞানং নিরবশেষং কৃত্বেত্যর্থঃ-আচার্য্যত আগমতশ্চ, এষণাভ্যো ব্যুত্থায়-এষণা-ব্যুত্থানাবসানমেব হি তৎ পাণ্ডিত্যম্, এষণা-তিরস্কারোদ্ভবত্বাৎ এষণাবিরুদ্ধত্বাৎ; এষণাম্ অতিরস্কৃত্য ন হি আত্মবিষয়স্য পাণ্ডিত্যস্যোদ্ভবঃ-ইত্যাত্মজ্ঞানেনৈব বিহিতমেষণাব্যুত্থানম্, আত্মজ্ঞানসমানকর্তৃক-ক্তাপ্রত্যয়োপাদানলিঙ্গশ্রুত্যা দৃঢ়ীকৃতম্। ২২

তস্মাদিত্যাদি বাক্যমবতাৰ্য্য ব্যাচষ্টে—যম্মাদিত্যাদিনা। উক্তমেব ব্যুত্থানং স্পষ্টয়তি— দৃষ্টেতি। বিবেকবৈরাগ্যাভ্যামেষণাভ্যো ব্যুত্থায় শ্রুত্যাচার্য্যাভ্যাং কর্তব্যং জ্ঞানং নিঃশেষং কৃত্বা বাল্যেন তিষ্ঠাসেদিতি ব্যবহিতেন সম্বন্ধঃ। পাণ্ডিত্যং নির্বিদ্যেত্যনেনৈব ব্যুত্থানং বিহিত- মিত্যাহ—এষণেতি। তদ্ধি পাণ্ডিত্যমেষণাভ্যো ব্যুত্থানস্যাবসানে সম্ভবতি, তদত্র ব্যুত্থানবিধি- রিত্যর্থঃ। তদেব স্ফুটয়তি—এষণেত্যাদি। তাসাং তিরস্কারেণ পাণ্ডিত্যমুদ্ভবতি তস্যৈষণাভ্যো

৮২৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বিরুদ্ধত্বাৎ, তথা চ পাণ্ডিত্যং নির্বিদ্যেত্যত্র তাভ্যো ব্যুত্থানবিধানমুচিতমিত্যর্থঃ। বিনাপি ব্যুথানং পাণ্ডিত্যমুক্তবিষ্যতীতি চেন্নেত্যাহ-ন হীতি। পাণ্ডিত্যং নির্বিদ্যেত্যত্র ব্যুত্থানবিধি- যুক্তমুপসংহরতি-ইত্যাত্মজ্ঞানেনেতি। তর্হি কিমিতি বিদিত্বা ব্যুথায়েত্যত্র ব্যুত্থানে বিধি- রভ্যুপগতঃ, তত্রাহ-আত্মজ্ঞানেতি। তেন ব্যুত্থানস্য সমানকর্তৃকত্বে জ্ঞাপ্রত্যয়স্যোপাদানমেব লিঙ্গভূতা শ্রুতিস্তয়া দৃঢ়ীকৃতং নিয়মেন প্রাপিতং ব্যুত্থানমিত্যর্থঃ। ২২

তস্মাদেষণাভ্যো ব্যুত্থায় জ্ঞানবলভাবেন বাল্যেন তিষ্ঠাসেৎ স্থাতুমিচ্ছেৎ। সাধনফলাশ্রয়ং হি বলম্ ইতরেষাম্ অনাত্মবিদাম্, তদ্বলং হিত্বা বিদ্বান্ অসাধন- ফলস্বরূপাত্মবিজ্ঞানমেব বলং—তদ্ভাবমেব কেবলমাশ্রয়েৎ; তদাশ্রয়ণে হি করণানি এষণাবিষয়ে এনং হৃত্বা ন স্থাপয়িতুমুৎসহন্তে; জ্ঞান-বলহীনং হি মুঢ়ং দৃষ্টাদৃষ্ট- বিষয়ায়ামেষণায়ামের এনং করণানি নিযোজয়ন্তি। বলং নাম আত্মবিদ্যয়া অশেষ- বিষয়দৃষ্টিতিরস্করণম্; অতস্তদ্ভাবেন বাল্যেন তিষ্ঠাসেৎ; তথা “আত্মনা বিন্দতে বীর্য্যম্” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ “নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ” ইতি চ। ২৩

বাল্যেনেত্যাদি বাক্যমুখাপ্য ব্যাকরোতি-তস্মাদিতি। বিবেকাদিবশাদেষণাভ্যো ব্যুখায় পাণ্ডিত্যং সম্পাদ্য তস্মাৎ পাণ্ডিত্যাজ জ্ঞানবলভাবেন স্থাতুমিচ্ছেদিতি যোজনা। কেয়ং জ্ঞান- বলভাবেন স্থিতিরিত্যাশঙ্ক্য তাং ব্যুৎপাদয়তি-সাধনেত্যাদিনা। বিদ্বানিতি বিবেকিত্বোক্তিঃ। যথোক্তবলভাবাবষ্টন্তে করণানাং বিষয়পারবশ্যনিবৃত্ত্যা পুরুষস্যাপি তৎপারবন্যনিবৃত্তিঃ ফলতী- ত্যাহ-তদাশ্রয়ণে হীতি। উক্তমেবার্থং ব্যতিরেকমুখেণ বিশদয়তি-জ্ঞানবলেতি। নম্বন্যাপি জ্ঞানস্য বলং কীদৃগিতি ন জ্ঞায়তে, তত্রাহ-বলং নামেতি। বাল্যবাক্যার্থমুপসংহরতি-অত ইতি। যথা জ্ঞানবলেন বিষয়াভিমুখী দৃষ্টস্তিরষ্ক্রিয়তে, তথেতি যাবৎ। আত্মনা তদ্বিজ্ঞানাতি- শয়েনেত্যর্থঃ। বীযাং বিষয়দৃষ্টিতিরস্করণমসামর্থ্যমিত্যেতৎ। বলহীনেন বিষয়দৃষ্টিতিরস্করণসামর্থ্য- রহিতেনায়মাত্মা ন লভ্যো ন শক্যঃ সাক্ষাৎকর্তুমিত্যর্থঃ। ২৩

বাল্যঞ্চ পাণ্ডিত্যঞ্চ নির্বিদ্য নিঃশেষং কৃত্বা, অথ মননাৎ মুনিরোগী ভবতি। এতাবদ্ধি ব্রাহ্মণেন কর্তব্যম্, যদত সর্ব্বানাত্মপ্রত্যয়তিরস্কারঃ; এতৎ কৃত্বা কৃত- কৃত্যো যোগী ভবতি। অমৌনঞ্চ আত্মজ্ঞানানাত্মপ্রত্যয়তিরস্করণম্ পাণ্ডিত্য- বাল্যসংজ্ঞকৌ নিঃশেষং কৃত্বা—মৌনং নাম অনাত্মপ্রত্যয়তিরস্করণস্য পর্য্যবসানং ফলম্, তচ্চ নির্বিদ্য, অথ ব্রাহ্মণঃ কৃতকৃত্যো ভবতি—ব্রহ্মৈব সর্ব্বমিতি প্রত্যয় উপজায়তে। স ব্রাহ্মণঃ কৃতকৃত্যঃ, অতো ব্রাহ্মণঃ; নিরুপচরিতং হি তদা তস্য ব্রাহ্মণ্যং প্রাপ্তম্; অত আহ—স ব্রাহ্মণঃ কেন স্যাৎ—কেন চরণেন ভবেৎ? যেন স্যাৎ—যেন চরণেন ভবেৎ, তেন ঈদৃশ এবায়ম্—যেন কেনচিৎ চরণেন স্যাৎ, তেন ঈদৃশ এব উক্তলক্ষণ এব ব্রাহ্মণো ভবতি। যেন কেনচিচ্চরণেনেতি স্তুত্যর্থম্—যেয়ং ব্রাহ্মণ্যাবস্থা, সেয়ং স্তূয়তে, ন তু চরণেহনাদরঃ। ২৪

যোনিঃ স্যাৎ যোনিঃ স্যাৎ যোনিঃ স্যাৎ যোনিঃ স্যাৎ। পূর্ব্বোক্তত্রয়স্য যোনিঃ স্যাৎ-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮২৯

নার্থোহথশব্দঃ। তদেবোপপাদয়তি—এতাবদ্ধীতি। বাক্যান্তরমুখাপ্য ব্যাকরোতি—অমৌনং চেত্যাদিনা। মৌনামৌনয়োব্রাহ্মণ্যং প্রতি সামগ্রীত্বদ্যোতকোহথশব্দঃ। ব্রাহ্মণ্যমুপপাদয়তি— ব্রহ্মৈবেতি। আচার্য্যপরিচর্য্যাপূর্ব্বকং বেদান্তানাং তাৎপর্য্যাবধারণং পাণ্ডিত্যম্। যুক্তিতোহ- নাত্মদৃষ্টতিরস্কারো বাল্যম্। ‘অহমাত্মা পরং ব্রহ্ম ন মত্তোহন্যদস্তি কিঞ্চন’ ইতি মনসৈবানু- সন্ধানং মৌনম্। মহাবাক্যার্থাবগতিব্রাহ্মণ্যমিতি বিভাগঃ।

প্রাগপি প্রসিদ্ধিং ব্রাহ্মণ্যমিতি চেৎ, তত্রাহ-নিরুপচরিতমিতি। ব্রহ্মবিদঃ সমাচারং পৃচ্ছতি-স ইতি। অনিয়তং তস্য চরণমিত্যুত্তরমাহ-যেনেতি। উক্তলক্ষণত্বং কৃতকৃত্যত্বম। অব্যবস্থিতং চরণমিচ্ছতো ব্রহ্মবিদো যথেষ্টচেষ্টাহভীষ্টা স্যাৎ, তথা চ ‘যদযদচারতি শ্রেষ্ঠঃ’ ইতি স্মৃতেরিতরেষামপ্যাচারেংনাদরঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-যেন কেনচিদিতি। বিহিতমাচরতো নিষিদ্ধং চ তাজতঃ শুদ্ধবুদ্ধেঃ শ্রুতাদ্বাক্যাৎ সম্যগ্ধীরুৎপদ্যতে, তস্য চ বাসনাবশাদ ব্যবস্থিতৈব চেষ্টা নাব্যবস্থিতেতি ন যথেষ্টাচরণপ্রযুক্তো দোষ ইত্যর্থঃ। ২৪

অতঃ এতস্মাৎ ব্রাহ্মণ্যাবস্থানাদ্ অশনায়াদ্যতীতাত্মস্বরূপাৎ নিত্যতৃপ্তাদ্ অন্যদবিদ্যাবিষয়মেষণালক্ষণং বস্তুন্তরম্ আর্ত্তং বিনাশি—আত্তিপরিগৃহীতং স্বপ্ন- মায়ামরীচ্যুদকসমম্ অসারম্, আত্মৈবৈকঃ কেবলো নিত্যমুক্ত ইতি। ততো হ কহোলঃ কৌষীতকেয় উপররাম ৷ ১৭০ ॥ ১॥

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ তৃতীয়োঽধ্যায়ঃ পঞ্চমঃ ক্বচিৎ। অধ্যায়ঃ ॥৩॥

অতোহন্যদিত্যাদি ব্যাকরোতি—অত ইতি। স্বপ্নেত্যাদি বহুদৃষ্টান্তোপাদানং দাষ্টান্তিকস্য বহুরূপত্বদ্যোতনার্থম্। অতোহন্যদিতি কুতো বিশেষণমিত্যাশঙ্ক্যাহ—আত্মৈবেতি। ১৭০।১॥ ইতি বৃহদারণ্যকোপনিদ্ভাসটীকায়া’ তৃতায়াধ্যায়স্থ পঞ্চমং কহোলব্রাহ্মণম্। ৩।৫।

ভাষ্যানুবাদ।—অনন্তর কহোলনামক কুষীতকের পুত্র—কৌষীতকেয় তাঁহাকে(যাজ্ঞবল্ক্যকে) জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি পূর্ব্বের ন্যায় যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন—যাহা সাক্ষাৎ অপরোক্ষ ব্রহ্ম, যাহা সর্ব্বাপেক্ষা অন্তর- তম আত্মা, এবং যাহাকে অবগত হইয়া জীব বন্ধন হইতে বিমুক্ত হইয়া থাকে, তাহার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়া আমাকে বলুন। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—‘ইহাই তোমার অভিমত আত্মা’।

এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, উষস্ত ও কহোল কি একই আত্মার সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছেন? অথবা উভয়ে এক-লক্ষণান্বিত বিভিন্ন আত্মার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছেন? কেহ কেহ ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন যে, উভয়ের জিজ্ঞাসিত আত্মা বিভিন্ন হওয়াই যুক্তিসিদ্ধ; নচেৎ প্রশ্নদ্বয়ে পুনরুক্তি দোষ ঘটে। কহোল ও উষস্তের প্রশ্নে যদি একই আত্মা অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে প্রথম প্রশ্নদ্বারাই তাহা সিদ্ধ হওয়ায় তদ্বিষয়ে আবার দ্বিতীয় প্রশ্নের অবতারণা করা সম্পূর্ণ নিরর্থক

৮৩০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হইয়া পড়ে; অথচ ইহার কোনটিই ‘অর্থবাদ’ বাক্য নহে,[যে, নিরর্থক হইলেও দোষাবহ হইবে না।] অতএব, উভয় প্রশ্নের বিষয়ীভূত আত্মা নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন—একটি ক্ষেত্রজ্ঞ(জীব), অপরটি পরমাত্মা।[এতদুত্তর—] ২

না-তাহাদের সে ব্যাখ্যা সমীচীন বোধ হয় না; কারণ ‘তে’ কথাটি থাকায় এখানে পূর্ব্বোক্ত আত্মারই প্রতিজ্ঞা বা প্রতীতি রহিয়াছে; অর্থাৎ প্রতিবচন প্রদান কালে ‘এষ তে আত্মা’ বলিয়া প্রথমোক্ত আত্মার নির্দেশই বক্তব্যরূপে প্রতিজ্ঞাত হইয়াছে। অথচ একই দেহেন্দ্রিয়সমষ্টিতে কখনই দুইটি আত্মা থাকিতে পারে না; কেন না, একটি দেহ একটি আত্মা দ্বারাই ‘আত্মবান্’ হইয়া থাকে, বিশেষতঃ উযস্তের আত্মা ও কহোলের আত্মা কখনই ভিন্নজাতীয় হইতে পারে না; কারণ, তাহা হইলে, উভয়ের জিজ্ঞাসিত আত্মার অগৌণত্ব (মুখ্যত্ব), আত্মত্ব ও সর্ব্বান্তরত্ব কখনই উপপন্ন হইতে পারে না। উভয় প্রশ্নের মধ্যে যদি একটি মুখ্য ব্রহ্ম হয়, তাহা হইলে নিশ্চয়ই অপরটিকে গৌণ বা অমুখ্য ব্রহ্ম বলিতেই হইবে, এবং আত্মত্ব ও সর্ব্বান্তরত্বের অবস্থাও তদনুরূপই হইবে; কারণ, গৌণ ও মুখ্য পদার্থ পরস্পর বিরুদ্ধস্বভাব; একটি যদি সর্ব্বান্তর ব্রহ্ম ও মুখ্য আত্মা হয়, তাহা হইলে, অবশ্যই অপরটিকে অমুখ্য-অসর্ব্বান্তর অনাত্মা হইতেই হইবে। অতএব স্বীকার করিতে হইবে যে, বিশেষভাবে জানিবার অভিপ্রায়ে একই আত্মার সম্বন্ধে দুইবার দুইটি প্রশ্ন করা হইয়াছে,(স্বতন্ত্র আত্মার সম্বন্ধে নহে)। ৩

আর দ্বিতীয় প্রশ্নেও, যে অংশটুকু প্রথমোক্ত প্রশ্নার্থের সমান হইয়াছে, সেই অংশটুকু প্রথম প্রশ্নেরই অনুবাদ বা পুনরুল্লেখ মাত্র। উদ্দেশ্য-পূর্ব্বে এ সম্বন্ধে যে সমস্ত বিশেষ কথা বলা হয় নাই, এখানে সে সমস্ত কথাই প্রকাশ করিয়া বলা; [ইহাই পুনরুল্লেখের প্রয়োজন]। সেই বিশেষই যে কি, তাহা এখন কথিত হইতেছে-প্রথম প্রশ্নে এইমাত্র বলা হইয়াছে যে, দেহাদির অতিরিক্ত একটি আত্মা আছে, এবং তাহার সম্বন্ধেই সংসারবন্ধন ও তৎপ্রয়োজক কর্ম্মের কথা উক্ত হইয়াছে; দ্বিতীয় প্রশ্নে সেই আত্মাই যে, অশনায়াদি সংসারধর্মাতীত- নিত্যশুদ্ধ, এই অনুক্ত বিশেষাংশ বর্ণিত হইতেছে; যে বিশেষ অংশটি অবগত হইলে পর, জীব সন্ন্যাস-সহকৃত বিবেক-বিজ্ঞানবলে পূর্ব্বোক্ত বন্ধন হইতে বিমুক্ত হইতে পারে। অতএব বলিতে হইবে যে, “এষ তে আত্মা” পর্যন্ত প্রশ্ন ও প্রতি- বচনে একই বিষয় অবলম্বিত হইয়াছে, পৃথক্ বিষয় নহে। ৪

জ্ঞান কথা, একই ভাষা, অনাদ্যাদি-ধর্ম্মবিরহিতও বটে, আবার তত্রবিরহিতও

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ অধ্যায়ঃ।

৮৩১

বটে, এইরূপ বিরুদ্ধ ধর্ম্মের সম্বন্ধ হয় কিরূপে? না,—এ আপত্তি হইতে পারে না; কারণ, পূর্ব্বেই ইহার পরিহার করা হইয়াছে;—জীবের সংসারিত্ব(অশ- নায়াদি ধর্ম্মসম্বন্ধ) যে, নামরূপাত্মক বিকারময় দেহেন্দ্রিয়াদি-উপাধিসম্বন্ধ- জনিত ভ্রান্তি মাত্র, একথা আমরা আত্মবিষয়ক বিরুদ্ধার্থক শ্রুতির ব্যাখ্যাস্থলে অনেকবার বলিয়াছি। রজ্জু, শুক্তি ও আকাশ প্রভৃতি পদার্থসমূহ যেমন পর- কীয় অধ্যারোপজ ধর্ম্মের সহিত সম্বদ্ধ হইয়া যথাক্রমে সর্প, রজত ও মলিন বলিয়া প্রতিভাত হইয়া থাকে সত্য, কিন্তু স্বরূপতঃ তাহারা রজ্জু, শুক্তি ও গগনাদিরূপেই থাকে, কিছুমাত্র পার্থক্য লাভ করে না,[ইহাও তদ্রূপ]; এবংবিধ ভাবে বিরুদ্ধ ধর্ম্মের সম্বন্ধ হইলেও পদার্থসম্বন্ধে কিছুমাত্র বিরোধ বা অসামঞ্জস্য ঘটিতে পারে না। ৫

যদি বল, ব্রহ্মাতিরিক্ত নাম-রূপাত্মক উপাধির অস্তিত্ব স্বীকার করিলে, ‘ব্রহ্ম নিশ্চয়ই এক অদ্বিতীয়’, ‘জগতে বা ব্রহ্মে কিছুমাত্র নানা বা বিভেদ নাই’ ইত্যাদি শ্রুতিসমূহ ত বিরুদ্ধ হয়? না, তাহাও হয় না; কারণ, জলের ফেনা ও মৃত্তিকার ঘট প্রভৃতি দৃষ্টান্ত দ্বারা পূর্ব্বেই সে দোষের সমাধান করা হইয়াছে(১)। আর যে অবস্থায় শ্রুতিপথানুগামী সুধীগণ পারমার্থিক তত্ত্ব নিরূপণে প্রবৃত্ত হইয়া উক্ত নাম ও রূপকে পরমাত্মা হইতে পৃথক্ করিয়া গ্রহণ করেন, সেই অবস্থায়ই জলের ফেনা ও মৃত্তিকাবিকার ঘটপটাদির ন্যায় উক্ত নাম ও রূপ অসত্য বলিয়া পরি- গণিত হয় এবং তখনই তাদৃশ নাম রূপ লক্ষ্য করিয়া “একম্ এব অদ্বিতীয়ম্” “নেহ নানা অস্তি কিঞ্চন” ইত্যাদি শ্রুতিসমূহ পারমার্থিক বস্তুতত্ত্ব প্রদর্শনে সামর্থ্য লাভ করিয়া থাকে। আর চিরকালই স্বস্বরূপে অবস্থিত ব্রহ্ম অপর বস্তুর কোন ধৰ্ম্ম দ্বারা সংস্পৃষ্ট না হইয়াও, যখন নাম-রূপজনিত দেহেন্দ্রিয় উপাধি হইতে পৃথকৃত না হন, পরন্তু নাম-রূপাত্মক উপাধির উপরেই লোকের স্বাভাবিক দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে, তখনই এই সমস্ত জাগতিক বস্তুর অস্তিত্ব-ব্যবহার হইয়া থাকে। ৬

যাহাদের নিকট পরমার্থসত্য ব্রহ্মের অতিরিক্ত বস্তুর অস্তিত্ব প্রতীত হয়, আর যাহাদের নিকট প্রতীত হয় না, তাহাদের সকলের নিকটই এই ভেদ-সাপেক্ষ

(১) তাৎপয্য—পূর্ব্বে বলা হইয়াছে যে, জলের ফেনা যেমন জল হইতে স্বতন্ত্র বস্তু নহে, এবং মৃত্তিকানির্মিত ঘট ও শরা প্রভৃতি যেমন মৃত্তিকা হইতে অতিরিক্ত দ্বিতীয় পদার্থ নহে; সুতরাং সে সমুদয়ের দ্বারা জল ও মৃত্তিকার ভেদ সিদ্ধ হয় না, তেমনি ব্রহ্ম হইতে প্রাদুর্ভূত নাম ও রূপ দ্বারাও পরম কারণ ব্রহ্মের অদ্বৈতত্ব-হানি হয় না ইত্যাদি।

৮৩২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ব্যবহার বর্তমান থাকে; তবে বিশেষ এই যে, যাহারা পরমার্থতত্ত্বের অনুসন্ধান করিয়া থাকেন, তাহারা শ্রুতি অনুসারে তত্ত্ব নিরূপণে প্রবৃত্ত হইয়া—জগতে সত্য বস্তু কিছু আছে কি না, এই বিচারে প্রবৃত্ত হইয়া সর্ব্বপ্রকার সংসারধর্ম্ম- বর্জিত এক অদ্বিতীয় তত্ত্ব অবধারণ করিতে সমর্থ হন; তাঁহাদের সে অবস্থায় আমরা কখনই অপর কোন বস্তুর অস্তিত্ব বা সত্যতা অস্বীকার করি না; কারণ, সর্ব্বনিষেধক ‘একম্ এব অদ্বিতীয়ম্’ ‘অনন্তরম্ অবাহ্যম্’ ইত্যাদি শ্রুতিই প্রমাণ। পক্ষান্তরে, নাম-রূপ-ব্যবহার কালে অবিবেকীদিগের যে, ক্রিয়া, কারক ও কামাদি ব্যবহার বিদ্যমান দেখা যায়, তাহারও অস্তিত্ব নিষেধ করিতেছি না। অতএব বুঝিতে হইবে যে, শাস্ত্রীয় বা লৌকিক যত প্রকার ব্যবহার আছে, তৎ সমস্তই জ্ঞান ও অজ্ঞান-সাপেক্ষ, অর্থাৎ জ্ঞানীর পক্ষে ব্যবহার অসত্য, আর অজ্ঞের পক্ষে ব্যবহার সত্য, এই মাত্র উভয়ের মধ্যে প্রভেদ। ৭

এখন আত্মার পরমার্থ স্বরূপ সম্বন্ধে পুনরায় প্রশ্ন হইতেছে-হে যাজ্ঞবল্ক্য, সর্ব্বান্তর আত্মা কোন্টি? উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-যাহা অশনারা ও পিপাসা অতিক্রম করিয়াছে, অর্থাৎ যাহা অশনের(ভোজনের) ইচ্ছা-অশনায়’, এবং পানের ইচ্ছা-পিপাসা, এতদুভয়ের অতীত। অবিবেকী লোকেরা আকাশে তল ও মলিনতাদি ধৰ্ম্ম আরোপ করিয়া থাকে, কিন্তু স্বভাব-স্বচ্ছ আকাশ প্রকৃত- পক্ষে সেই তল ও মলিনতাদিগুণে সংস্পৃষ্ট না হইয়াও, যেমন সময়ে তাহা অতিক্রম করে, তেমনি অজ্ঞ জনেরা-আমি ক্ষুধার্ত, আমি পিপাসার্ত, এইরূপ প্রতীতি অনুসারে ব্রহ্মকে ক্ষুধা-তৃষ্ণাদিযুক্ত বলিয়া মনে করে, সত্য, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্ম তাহার অতীতই বটে; কারণ, কস্মিন্ কালেও ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ব্রহ্মকে স্পর্শ করিতে পারে না। শ্রুতি বলিতেছেন-‘ব্রহ্ম লোক-প্রসিদ্ধ দুঃখে স্পৃষ্ট হন না; কারণ, তিনি উহার অতীত’, এখানে ‘লোক-দুঃখ’ কথার অর্থ-অজ্ঞজন কর্তৃক আরোপিত দুঃখ। অশনায়া ও পিপাসা উভয়ই প্রাণের ধর্ম; এই জন্য এই দুই শব্দের সমাস (অশনায়া-পিপাসে) করা হইয়াছে। ৮

এইরূপ শোক ও মোহ[অতিক্রম করেন]; শোক অর্থ কাম(বাসনা), অর্থাৎ অভীষ্ট বস্তু পাইবার জন্য চিন্তাবশতঃ যে অপ্রীতিভাব, তাহাই তৃষ্ণাতুর ব্যক্তির কামোদ্ভবৰ মূল কারণ; কেন না, ঐ অপ্রীতির দরুণই লোকের কাম- বৃত্তি(শোক) বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। মোহ অর্থ—বিপর্যয়-বুদ্ধিপ্রসূত অবিবেক ভ্রম মাত্র; এই মোহই সমস্ত অনর্থসৃষ্টির মূলকারণ—অবিদ্যাস্বরূপ। শোক ও মোহ বিভিন্ন কারণ হইতে উৎপন্ন হয়; এই জন্য উভয় পদের সমাস করা হয়

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণঃ।

৮০৩

নাই। শোক ও মোহ উভয়ই মনের ধর্ম্ম। মনে অবস্থিত শোক ও মোহ এবং শরীরগত জরা ও মৃত্যুকে অতিক্রম করিয়া থাকেন। জরা অর্থ—দেহেন্দ্রিয়সমষ্টির ক্ষয়োন্মুখ পরিণাম; শরীরগত বলি(ত্বক্-ভঙ্গ) ও কেশপক্কতা প্রভৃতি দ্বারা তাহার সূচনা হয়। মৃত্যু অর্থ—দেহের ক্ষয়োন্মুখ পরিণামের পরিসমাপ্তি; শরীরগত সেই জরা ও মৃত্যু অতিক্রম করেন। ৯

দিন-রাত্রির ন্যায় এবং সামুদ্রিক তরঙ্গ মালার ন্যায় প্রাণিমণ্ডলে নিরন্তর আবর্ত্তমান এবং প্রাণ, মন ও শরীরে অবস্থিত সেই যে, অশনায়াদি ধৰ্ম্ম, তাহাই প্রাণিগণের সংসারনামে অভিহিত হইয়া থাকে। এই যে আত্মা ‘দৃষ্টির দ্রষ্টা’ ইত্যাদি রূপে লক্ষিত হইল, এবং যাহা সাক্ষাৎ অর্থাৎ অপর বস্তুকৃত ব্যবধান- রহিত, অপরোক্ষাৎ গৌণসম্বন্ধরহিত(প্রত্যক্ষাত্মক) সর্ব্বান্তর, ব্রহ্মাদি স্তম্ব (তৃণ) পর্য্যন্ত ভূতের আত্মা, এবং আকাশ যেমন মেঘাদি দ্বারা কলুষিত হয় না, তেমনি অশনায়া-পিপাসাদিরূপ সাংসারিক ধর্ম্মে নিত্য অসংশ্লিষ্ট, সেই এই আত্মাকে—আপনারই প্রকৃত স্বরূপকে অবগত হইয়া—‘আমি হইতেছি সর্ব্বসংসার- ধর্ম্ম-বর্জ্জিত নিত্যতৃপ্ত পরব্রহ্মস্বরূপ’ এইরূপ অনুভব করিয়া, ব্রাহ্মণ—সাধারণতঃ ব্রাহ্মণগণেরই ব্যুত্থানে অধিকার; এই জন্য এখানে ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দ প্রযুক্ত হইয়াছে। সেই ব্রাহ্মণগণ ব্যুত্থান করিয়া সংসারের বিপরীতভাবে উত্থান করিয়া—। কোথা হইতে[উত্থান করিয়া]? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিতেছেন—পুত্রৈষণা হইতে; পুত্র লাভের জন্য যে এষণা—কামনা, তাহা পুত্রৈষণা—পুত্রলাভ করিয়া আমি ইহলোক জয় করিব(প্রতিষ্ঠিত হইব), এইরূপে যে, লোকজয়ের উপায়ভূত পুত্রের জন্য ইচ্ছা অর্থাৎ দার-পরিগ্রহ করা, তাহা না করিয়া। বিত্তৈষণা হইতে—বিত্তৈষণা অর্থ—কর্মসম্পাদনের উপায়ভূত গবাদি বিত্ত সংগ্রহ করা; এই বিত্ত দ্বারা কর্ম করিয়া পিতৃলোক জয় করিব, অথবা বিদ্যাসংযুক্ত কৰ্ম্মদ্বারা দেবলোক লাভ করিব, কিংবা কৰ্ম্ম-বিরহিত কেবল হিরণ্যগর্ভ-বিদ্যারূপ দৈব বিত্ত দ্বারা দেবলোক জয় করিব,[এইরূপ ইচ্ছা হইতেও ব্যুত্থান করিয়া]—। ১০।

কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, দৈব বিত্ত হইতে ব্যুত্থানই হইতে পারে না; কেন না, দৈব বিত্তের প্রভাবেই ব্যুত্থান হইয়া থাকে;[সুতরাং তাহা হইতে ব্যুত্থান করা একেবারেই অসম্ভব]। তাহাদের সে কথা সঙ্গত হয় না; কারণ, ‘এতাবান্ বৈ কামঃ’ কথায় দৈব-বিত্তকেও এষণামধ্যে ধরা হইয়াছে। হিরণ্যগর্ভাদি- দেবতাবিষয়ক বিদ্যা বা উপাসনা দ্বারা দেবলোক লাভ হয়; এইজন্য হিরণ্যগর্ভাদি- বিষয়ক বিদ্যাই ‘দৈব বিত্ত’ নামে কথিত হয়; কিন্তু সর্ব্বোপাধিরহিত প্রজ্ঞান-

3

৮৩৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ঘন ব্রহ্ম-বিষয়ক বিদ্যা কখনই দেবলোক-প্রাপ্তির উপায় নহে। ‘সেই ব্রহ্মজ্ঞান প্রভাবে সর্বাত্মক হইয়াছিলেন’ ‘তিনি এ সকলের আত্মা হন’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, সর্বাত্মভাবই তাহার ফল; অতএব ব্রহ্মবিদ্যাকে কখনই দৈব বিত্তমধ্যে গ্রহণ করা যাইতে পারে না। ‘সেই এই আত্মাকে অবগত হইয়া’ এই শ্রুতিতে বিশেষোক্তি থাকায় বুঝা যায় যে, দৈব বিত্তের বলেই ব্যুতানকার্য্য নিষ্পন্ন হইয়া থাকে। অতএব অনাত্মলোকের প্রাপ্তিসাধন এই ত্রিবিধ এষণার—কামনার সমস্ত বিষয় হইতেই ব্যুতান করিয়া—উক্ত ত্রিবিধ অনাত্ম-লোক-প্রাপ্তির সাধন বিষয়ে তৃষ্ণা না করিয়া—। ১১।

ফলসিদ্ধিই সাধনের প্রধান উদ্দেশ্য; অতএব যতপ্রকার সাধনেচ্ছা আছে, তৎসমস্তই ফলেচ্ছা হইতে অনতিরিক্ত; এই অভিপ্রায়ে শ্রুতি বলিতেছেন- ‘এষণা একই’(অতিরিক্ত নহে)। কি প্রকারে? যেহেতু যাহা পুত্রৈষণা, ফলতঃ তাহাই বিত্তৈষণা; কারণ, উভয়ই লোকপ্রসিদ্ধ বা ঐহিক ফল- সিদ্ধির তুল্য উপায়। তাহার পর, যাহা বিত্তৈষণা, তাহাই লোকৈষণা; কেন না, ফলসাধনই বিত্তৈষণার মুখ্য উদ্দেশ্য-জগতে যে কোন লোক যে কোন প্রকার সাধন বা উপায় অবলম্বন করিয়া থাকে, ফললাভই সে সমস্ত উপায়-প্রবৃত্তির মূল। অতএব জগতে এষণা একই বটে। যাহা লোকৈষণা, উপযুক্ত সাধন ব্যতিরেকে কখনই তাহা সম্পাদন করিতে পারা যায় না; অতএব সাধ্য ও সাধনভেদে এষণা দুইপ্রকার-ফলৈষণা ও সাধনৈষণা; সুতরাং যাহারা ব্রহ্মবিদ্, তাহাদের পক্ষে কৰ্ম্ম বা কর্মসাধনের সম্ভাবনাই হয় না; অতএব এখানে ‘ব্রাহ্মণ’ পদে অতীত অর্থাৎ পূর্ব্বাশ্রমের ব্রাহ্মণগণ বুঝিতে হইবে। ‘মনুষ্যগণের(পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কৰ্ম্ম করিবার সময়) নিবীতী হইবে’(১) ইত্যাদি শ্রুতি অনুসারে জানা যায় যে, যজ্ঞোপবীত প্রভৃতিই দেবলোক, পিতৃলোক ও মনুষ্যলোক লাভের উপায়ভূত কর্মসিদ্ধির নিমিত্ত বা সহায়; সুতরাং ব্রহ্মবিদের সম্বন্ধে কোন প্রকার কৰ্ম্ম ও কৰ্ম্মসাধন গ্রহণ করা সম্ভবপর হইতে পারে না। অতএব[এইরূপই অর্থ করিতে হইবে যে,] পূর্ব্বতন ব্রাহ্মণগণ-ব্রহ্মবিদ্গণ সমস্ত কৰ্ম্ম ও কৰ্ম্মসাধন যজ্ঞোপবীত-

(১) তাৎপর্য্য—‘উপবীতং যজ্ঞসূত্রং প্রোদ্ধত’ দক্ষিণে করে। প্রাচীনাবীতমন্যৎ স্যাৎ নিবীতঃ কণ্ঠ-লম্বিতম্ ॥’(অমরকোষ) অর্থাৎ যজ্ঞোপবীত যখন বাম স্বন্ধে স্থাপিত হয়, তখন, উহার নাম ‘উপবীত’, যখন দক্ষিণ স্কন্ধে স্থাপিত হয়, তখন উহার নাম ‘প্রাচীনাবীত’ যখন মালার ন্যায় কণ্ঠে লম্বিত হয়, তখন উহার নাম ‘নিবীত’ ইত্যাদি।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্।
৮৩৫

ধারণাদি হইতে ব্যুত্থান করিয়া—পরমহংস-পরিব্রাজকভাব অবলম্বন করিয়া, ভিক্ষাচর্য্যা আচরণ করেন। ভিক্ষার জন্য যে, চরণ—বিচরণ, তাহা ভিক্ষাচর্যা। শ্রুতির ‘চরন্তি’ কথা হইতে এইরূপ অর্থ বুঝিতে হইবে যে, যাহারা কেবলই গার্হস্থ্যাদি আশ্রমধর্ম্মে নিষ্ঠাযুক্ত, তাহাদের জীবনরক্ষার জন্য স্মৃতিশাস্ত্রোক্ত, যে সমস্ত ব্যঞ্জক বা চিহ্ন(যজ্ঞোপবীতাদি) ছিল, সে সমস্ত পরিত্যাগপূর্ব্বক বিচরণ করেন। ‘সেই হেতু ব্রহ্মবিদ্ পুরুষ বাহ্যচিহ্ন সমুদয় পরিত্যাগ করিয়া গূঢ়চিহ্ন ও গূঢ়াচার হইবেন’ ইত্যাদি স্মৃতিশাস্ত্র হইতে, ‘পরিব্রাজক বিবর্ণবাসা(গৈরিক বস্ত্র পরিহিত), মুণ্ডিতমূর্দ্ধা, এবং সর্ব্বপ্রকার পরিগ্রহবজ্জিত হইবেন’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে এবং ‘সশিখ কেশ পরিত্যাগ করিয়া ও যজ্ঞোপবীত পরিত্যাগ করিয়া’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতেও প্রমাণিত হয় যে, বিদ্বান্ ব্রহ্মবিদ্ পুরুষ আশ্রমোচিত সর্ব্ববিধ চিহ্নরহিত হইয়া থাকেন। ১২

ভাল কথা, “বুখ্যায় অথ ভিক্ষাচর্য্যং চরন্তি” বাক্যে বিধিবোধক লিঙ্ লোট্ বা তব্যপ্রভৃতি কোনপ্রকার বিধি-প্রত্যয় না থাকায়, পক্ষান্তরে সাধারণ ভাবে বর্তমান বিভক্তি লোট্ প্রত্যয়মাত্র থাকায় বুঝা যাইতেছে যে, উক্ত বাক্যটি নিশ্চয়ই ভিক্ষাচরণের বিধায়ক নহে, কেবল ‘অর্থবাদ’ মাত্র; অতএব অর্থবাদ বাক্যের অনুবলে শ্রুতিস্মৃতিবিহিত কর্মসাধন যজ্ঞোপবীতাদি চিহ্নগুলি কখনই পরিত্যাগ করান যাইতে পারে না। শ্রুতি স্পষ্টাক্ষরে বলিতেছেন—‘যজ্ঞোপবীতধারী হইয়াই অধ্যয়ন করিবে, যজ্ঞ করিবে ও করাইবে’ ইতি। তাহার পর, সন্ন্যাসাবস্থায়ও বেদাধ্যয়নের বিধান দেখিতে পাওয়া যায়—‘বেদ পরিত্যাগ করিলে শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হয়, অতএব বেদ পরিত্যাগ করিবে না’, আপস্তম্ব বলিয়াছেন—‘বেদাধ্যয়ন কালে বাক্সংযম করিবে‘। তাহার পর, বেদ-পরিত্যাগে দোষশ্রুতিও রহিয়াছে; যথা—‘বেদত্যাগ, বেদনিন্দা, কূটসাক্ষ্য, সুহৃদবধ, নিন্দিতান্ন ও উচ্ছিষ্টান্ন-ভোজন, —এ সমস্ত সুরাপানের তুল্য‘। বিশেষতঃ ‘গুরু, বৃদ্ধ ও অতিথির উপাসনায়, হোমে, জপকার্য্যে, ভোজনে, আচমনে, এবং বেদাধ্যয়নে যজ্ঞোপবীতধারী হইবে‘। সন্ন্যাস-ধর্মবিষয়ক উক্ত শ্রুতি ও স্মৃতি শাস্ত্রে গুরুসেবা, বেদাধ্যয়ন, ভোজন ও আচমনাদি কৰ্ম্মসমূহ কর্তব্যরূপে বিহিত হওয়ায় এবং গুরূপাসনাদি কার্য্যের অঙ্গরূপে যজ্ঞোপবীতধারণ বিহিত থাকায় কিছুতেই তাহার পরিত্যাগ পাওয়া যাইতেছে না। ১৩

আর যদি যথোক্ত এষণা হইতে ব্যুত্থানের বিধি স্বীকার করিতেই হয়, তাহা হইলেও, কেবল পুত্রাদি-বিষয়ক ত্রিবিধ এষণা হইতেই ব্যুত্থান স্বীকার করিতে

৮৩৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হইবে; কিন্তু সমস্ত কৰ্ম্ম ও কর্মসাধন হইতে ব্যুত্থান স্বীকার করিতে পারা যায় না; কারণ, সমস্ত কৰ্ম্ম ও তৎসাধনের পরিত্যাগ কল্পনা করিলে, অশ্রুতের কল্পনা ও শ্রুতহানি অর্থাৎ শাস্ত্রবিহিত যজ্ঞোপবীতাদি সাধনের পরিত্যাগ করিতে হয়। পক্ষান্তরে, ঐরূপ কল্পনা করিলে, বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান না করায় এবং নিষিদ্ধ কর্মের অনুষ্ঠান করায় মহা অপরাধও হইতে পারে; অতএব যথোক্ত রীতিতে যে, যজ্ঞোপবীতপ্রভৃতি কর্মসাধনের পরিত্যাগ, তাহা কেবল ‘অন্ধপরম্পরা’ ভিন্ন আর কিছুই নহে(১)। না-কৰ্ম্ম ও তৎসাধন পরিত্যাগেও মহা অপরাধ বা ‘অন্ধ-পরম্পরা’ ন্যায়ের সম্ভাবনা নাই; কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন —‘যতি(সন্ন্যাসী) যজ্ঞোপবীত ও বেদাধ্যয়নাদি সমস্ত বর্জন করিবেন’ ইতি। ১৪

অপিচ, আত্মজ্ঞান-প্রতিপাদনেই সমস্ত উপনিষদের তাৎপর্য্য—এখানেও আত্মবিষয়ক দর্শন, শ্রবণ ও মননের আবশ্যকতা বর্ণিত হইয়াছে। সেই আত্মাকেই যে, সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষাত্মক সর্ব্বান্তর ও অশনায়াদি-ধৰ্ম্মনিবজ্জিত ভাবে জানিতে হইবে, ইহাও শাস্ত্রসিদ্ধ কথা; আর ঐরূপ অর্থ প্রতিপাদনেই যখন সমস্ত উপনিষ- দের তাৎপর্য্য, তখন এই বাক্যটিকে অনুকোনও বিধিবাক্যের অঙ্গ বা অধীনও বলা যাইতে পারে না; পক্ষান্তরে আত্মজ্ঞানের কর্তব্যতা বিষয়ে স্পষ্ট বিধি থাকায় ‘অর্থবাদ’ বলিয়াও সেই বাক্যের অপ্রামাণ্য বলিতে পারা যায় না। আত্মা যখন অশনায়াদিধর্মযুক্ত নয়, তখন তাহাকে ক্রিয়া, সাধন ও ক্রিয়াফল হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বলিয়াই জানিতে হইবে; আর অশনায়াদি ধৰ্ম্ম সহকারে যে, আত্মকে জানা, তাহাই অবিদ্যা; শ্রুতি বলিতেছেন—‘যে লোক আপনাকে ও উপাস্য আত্মাকে পৃথক্ বলিয়া মনে করে, প্রকৃতপক্ষে সে আত্মাকে জানে না,’ ‘যে ব্যক্তি আত্মাকে ভিন্নবৎ দর্শন করে, সে মৃত্যুর পর মৃত্যুকে প্রাপ্ত হয়’, ‘আত্মাকে একরূপেই দর্শন করিতে হইবে’, ‘ব্রহ্ম নিশ্চয়ই এক অদ্বিতীয়’, ‘তুমি তৎস্বরূপই বটে’ ইত্যাদি। আর ক্রিয়াফল ও ক্রিয়াসাধন যে, অশনায়াদি-সংসারধর্মবর্জিত আত্মা হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র—অবিদ্যার বিষয়(অজ্ঞানাধিকারভুক্ত), তাহাও, ‘যে অবস্থায়

(১) তাৎপর্য্য—‘অন্ধপরম্পরা’ ন্যায়টী এই প্রকার—পিতৃপিতামহাদি পুরুষ-পরম্পরাক্রমে যাহারা অন্ধ, তাহাদের যেমন শ্বেতপীতাদি রূপ ও আকৃতি বিষয়ে সাধারণতঃ ভ্রান্তধারণা থাকে; এবং সেই ভ্রান্তধারণার বশে বর্ণ ও আকৃতি বিষয়ে অসত্যজ্ঞান পোষণ করিয়া থাকে, তেমনি যে কোনও বিচাৰ্য্য বিষয়ে যদি শ্রুতি ও যুক্তিবিরুদ্ধ লোকপ্রসিদ্ধ ভ্রান্তধারণার পোষণ করা হয়, তাহাকে ‘অন্ধপরম্পরা’ ন্যায় বলা হয়।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমং ব্রাহ্মণম্। ৮৩৭

দ্বৈতের ন্যায় হয়,’ ‘পক্ষান্তরে যাহারা আত্মাকে ইহার অন্যরূপ বলিয়া জানে’ ইত্যাদি শত শত শ্রুতিবাক্য হইতে প্রমাণিত হইতেছে। ১৫

বিশেষতঃ আলোক ও অন্ধকারের ন্যায় পরস্পর বিরুদ্ধস্বভাব বিদ্যা ও অবিদ্যা একই সময়ে একই পুরুষের থাকা সম্ভবপর হইতে পারে না; অতএব ক্রিয়া কারক ও ফলভেদাত্মক অবিদ্যাধিকারও আত্মবিদের সম্বন্ধে কল্পনা করা যাইতে পারে না; ‘সে ব্যক্তি মৃত্যুর পরও মৃত্যু প্রাপ্ত হয়’ ইত্যাদি বাক্যেও আত্মবিদের ক্রিয়াদি-সম্বন্ধ নিন্দিত হইয়াছে। তাহার পর, অবিদ্যাধিকারভুক্ত সর্ব্বপ্রকার ক্রিয়া, ক্রিয়াসাধন ও তৎফলসমূহ তদ্বিপরীত আত্মবিদ্যার সাহায্যে পরিত্যাগ করানই শ্রুতির অভিপ্রেত। কথিত যজ্ঞোপবীতাদি সাধনসমূহ অবিদ্যাধিকারেই বিহিত;[সুতরাং আত্মবিদের পক্ষে অবিদ্যাধিকার কল্পনা করা সঙ্গত হইতে পারে না]। অতএব, বলিতে হইবে যে, স্বভাবতই যাহা সাধন বা ফলাত্মক নহে, সেই আত্মা কখনই যথোক্ত ‘এষণা’র বিষয় নহে। এষণার বিষয় হইতেছে— তদতিরিক্ত স্বতন্ত্র বস্তু। যজ্ঞোপবীতাদি চিহ্ন ও তদধীন কর্ম্ম, সমস্তই সাধনাত্মক; সাধনাত্মক বলিয়াই সাধন ও ফলভেদে এষণা দুইপ্রকার মাত্র দাঁড়াইতেছে; ‘এই দুইটিমাত্র এষণা’ এই শ্রুতিবাক্যেও এষণার দ্বিত্বই অবধারিত হইয়াছে। অতএব যজ্ঞোপবীতাদি সাধন ও তৎসাধ্য সমস্ত কর্ম্ম হইতে ব্যুত্থানের বিধান করাই উক্ত শ্রুতির অভিপ্রেত বলিয়া বুঝা যাইতেছে। ১৬

পুনঃ প্রশ্ন হইতেছে যে, আত্মজ্ঞান-প্রতিপাদনেই যখন সমস্ত উপনিষদের তাৎপয্য, তখন ব্যুত্থানবোধক বাক্যকে আত্মজ্ঞানেরই প্রশংসামাত্র বলিতে হইবে; উহা কখনই বিধায়ক হইতে পারে না। না, এ কথাও বলা যায় না; কারণ, একই ব্যক্তিকে বিবিধিত(যাহার বিধান করা অভিপ্রেত, সেই) আত্মজ্ঞান ও ব্যুত্থান, উভয়েরই কর্ত্তরূপে নির্দেশ করিয়াছেন, অর্থাৎ শ্রুতি বলিতেছেন যে, যে ব্যক্তি আত্মজ্ঞান লাভের অভিলাষী, সেই ব্যক্তিই ব্যুত্থান করিবে; সুতরাং ব্যুত্থানবিধিকে ‘অর্থবাদ’ বলিতে পার না; কেন না, যাহা অকর্ত্তব্য—বিহিত নয়, তাহার সহিত কখনও অবশ্যকর্ত্তব্য বিষয়ের এককর্ত্তৃকত্ব নির্দেশ করা বেদের কুত্রাপি দেখিতে পাওয়া যায় না; পক্ষান্তরে অবশ্যকর্ত্তব্য যজ্ঞাঙ্গ স্নান, হোম ও ভক্ষণ সম্বন্ধে যেমন একই ব্যক্তির কর্তৃত্ববোধক শ্রুতি রহিয়াছে—‘সোম কর্ত্তন করিয়া, হোম করিয়া ভক্ষণ করিবে’ ইত্যাদি, এখানেও তেমনি আত্মজ্ঞান, এষণা- ত্যাগ ও ভিক্ষাচর্য্যা—এ সমস্ত কার্য্য অবশ্যকর্তব্যরূপে বিহিত বলিয়াই এ সম্বন্ধে একই ব্যক্তির কর্তৃত্ব হওয়া সঙ্গত হয়। ১৭

৮৩৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যদি বল, যজ্ঞোপবীতাদি চিহ্নগুলি যখন অবিদ্যাধিকারভুক্ত এবং এষণারও (কামনারও) বিষয়ীভূত, তখন আত্মজ্ঞানের বিধান হইতেই তৎসমস্তেরও পরি- ত্যাগ পাওয়া যাইতেছে; উহার জন্য আর পৃথক্ ভাবে বিধান করিবার আবশ্যক হয় নাই। না, একথাও হইতে পারে না; কারণ, তাহা হইলেও, আত্মজ্ঞানের বিধি দ্বারাই সর্ব্বত্যাগও বিহিত হওয়ায়, এবং তাহার সঙ্গে আবার একই ব্যক্তির কর্তৃত্ব-শ্রুতি থাকায়, ব্যুত্থান ও ভিক্ষাচর্যাবিধানের বরং দৃঢ়তাই স্থাপিত হইয়াছে। আর যে,[‘চরন্তি’ ক্রিয়ায়] বর্তমানকালীন বিভক্তির প্রয়োগ থাকায় ইহাকে শুধু ‘অর্থবাদ’ মাত্র বলা হইয়াছে, তাহাও যুক্তিসঙ্গত হয় নাই; কেন না, ঔদুম্বর (ঔদুম্বরকাষ্ঠ নির্মিত) যূপাদি বিষয়ক বিধির সহিত সাম্য থাকায় এখানেও বর্তমান বিভক্তি নির্দেশ দোষাবহ হয় নাই, অর্থাৎ বর্তমানা বিভক্তি নির্দেশ সত্ত্বেও যেমন ঔদুম্বর যুপ-বিধায়ক বাক্যকে অর্থবাদ বলিয়া উপেক্ষা করা হয় না, তেমনি আলোচ্য স্থলেও কেবল বর্তমানা বিভক্তির(লট্-বিভক্তির) প্রয়োগ থাকাতেই অর্থবাদ বলিয়া উপেক্ষা করিতে পারা যায় না। ১৮

যদি বল, ‘ব্যুত্থানের পর ভিক্ষাচর্য্যা করিবে, এই বাক্যে কেবল পারিব্রাজ্য বা সন্ন্যাসাশ্রমই বিহিত হইয়াছে, এবং শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্রে সন্ন্যাসাশ্রমেও আশ্রম-চিহ্ন যজ্ঞোপবীতাদি ধারণের বিধান রহিয়াছে; অতএব ‘এষণার’ বিষয় হইলেও, শাস্ত্রবিহিতের পরিত্যাগ করা যখন অসঙ্গত, তখন তদ্ভিন্ন বিষয় হইতেই ব্যুত্থান বুঝিতে হইবে। না, এ কথাও বলিতে পার না; কারণ, উক্ত বিধি দ্বারা যদি শ্রুতিবিহিত আশ্রমচিহ্ন যজ্ঞোপবীতাদি ভিন্ন অপর সাধনের পরিত্যাগই কল্পনা করিতে হয়, তাহা হইলেও বলিতে হইবে যে, আত্মজ্ঞের জ্ঞানাঙ্গরূপে বিহিত এষণা-পরিত্যাগরূপ সন্ন্যাস হইতে স্বতন্ত্র যে, আর একপ্রকার সন্ন্যাসের বিধান আছে, তাহাতেই ঐ সমস্ত চিহ্ন ধারণ করা আবশ্যক হয়। কারণ, এষণাত্রয় হইতে ব্যুত্থানাত্মক যে পারিব্রাজ্য, তাহা আত্মজ্ঞানের অঙ্গ; কেন না, এষণামাত্রই অবিদ্যার বিষয়, আর এই ব্যুত্থান হইতেছে তদ্বিরোধী ‘এষণা’-পরি- ত্যাগস্বরূপ। এতদতিরিক্ত যে, আর একপ্রকার ‘পারিব্রাজ্য’ আশ্রম আছে, তাহা দ্বারা ব্রহ্মলোক লাভ হয় এবং সেই আশ্রমাত্মক পারিব্রাজ্য সম্বন্ধেই কৰ্ম্ম- সাধন ও আশ্রমচিহ্ন যজ্ঞোপবীতাদি ধারণের বিধান। শুধু আশ্রমধর্মরূপে বিহিত এষণাত্মক সাধনসংরক্ষণের ব্যবস্থা যখন দ্বিতীয় পারিব্রাজ্যাশ্রমেই সার্থক হইতে পারে, তখন তাহা দ্বারা সর্ব্বোপনিষদ্বিহিত আত্মজ্ঞানের বাধাপ্রদান করা যুক্তিসঙ্গত হইতে পারে না। অবিদ্যার বিষয়ীভূত যজ্ঞোপবীতাদিরূপ সাধনসমূহ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৩৯

গ্রহণ করিতে ইচ্ছা করিলে, সাধন ও ফলবিলক্ষণ এবং অশনায়াদি-সংসার ধৰ্ম্ম- বর্জিত ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’(আমি ব্রহ্ম) এইরূপ বিজ্ঞান(বিদ্বদনুভব) নিশ্চয়ই বাধিত হয়। ঐরূপ তত্ত্ব-নিরূপণেই যখন সমস্ত উপনিষদের তাৎপর্য্য, তখন তাহাতে বাধা দেওয়া কখনই সমীচীন হয় না। ১৯

যদি বল, ‘ভিক্ষাচর্য্যৎ চরন্তি’ শ্রুতিটি এষণাত্মক ভিক্ষানুষ্ঠানের বিধান করিয়া নিজেই নিজের বাধা ঘটাইতেছে। অভিপ্রায় এই যে, শ্রুতি প্রথমতঃ এষণা- পরিত্যাগের বিধান করিয়া, পুনরায় এষণারই একাংশ ভিক্ষাচর্য্যগ্রহণের অনুমতি করায়, বুঝা যাইতেছে যে, তৎসম্পর্কিত অন্য কার্য্যের অনুষ্ঠানেও শ্রুতির অনুমতি আছে। না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, হোমের পরকালীন হুতশেষ ভক্ষণের ন্যায় ভিক্ষাচর্য্যও উহার প্রযোজক নহে; অর্থাৎ যেমন হোমের পর হুতশেষ যদি থাকে, তবেই তাহা ভক্ষণ করিতে হয়, কিন্তু না থাকিলে, হুতশেষ ভক্ষণের অনুরোধে আর পুনর্ব্বার হোম করিতে হয় না; তেমনি ব্যুত্থানের পর জীবিকার জন্য যদি কিছু কার্য্য করা আবশ্যক হয়, তবে ভিক্ষাই করিবে; কিন্তু ভিক্ষার জন্য কখনই ব্যুত্থান করিবে না। অসংস্কারকত্বও ভিক্ষাচর্য্যার অপর কারণ,-হুতশেষ ভক্ষণ করা হোমকর্তা যজমানের সংস্কারক বা শুদ্ধিকারণও হইয়া থাকে, কিন্তু ভিক্ষানুষ্ঠান কখনও সন্ন্যাসীর সংস্কারক হয় না বা হইতে পারে না; কারণ, কোন প্রকার নিয়ম প্রতিপালন দ্বারা যে, অদৃষ্ট(পুণ্য) লাভ করা, ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তির তাহাও অভিলষিত নহে। যদি বল, কোনরূপ নিয়ম প্রতিপালন করায়, যে পুণ্য হয়, তাহা যদি ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তির নিতান্তই অভিলষণীয় না হয়, তাহা হইলে তাহার ভিক্ষাচর্য্যায়ই বা প্রয়োজন কি? না, এ আপত্তিও করিতে পার না; কারণ, অপরাপর কাম্যফলের জন্য যে সমস্ত সাধন বিহিত, কেবল সে সমুদয় হইতেই ব্যুত্থান বা নিবৃত্তি এখানে বিহিত হইয়াছে, কিন্তু ভিক্ষাচর্যা নিবারিত হয় নাই। ভাল, এখানে সাধনান্তর হইতে ব্যুত্থান বিহিত হইয়া থাকে, থাকুক, তথাপি ভিক্ষায় প্রয়োজন কি? হাঁ, এ কথা সত্যই বটে; যদি প্রয়োজন থাকে, তবেই উহার আবশ্যকতা স্বীকার করা হয়,(নচেৎ নহে)। ২০

তাহার পর, ‘যজ্ঞোপবীতযুক্ত হইয়াই অধ্যয়ন করিবে’ ইত্যাদি যে সমস্ত বচন পারিব্রাজ্য সম্বন্ধে উল্লিখিত হইয়াছে, সে সমস্ত বচন অবিদ্বৎ-পারিব্রাজ্য সম্বন্ধেই উক্ত হইয়াছে—বলিয়া পূর্ব্বেই সে আপত্তির পরিহার করা হইয়াছে, এবং তাহা না হইলে যে, আত্মজ্ঞানেরই বাধা উপস্থিত হয়, একথাও আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। তাহার পর, ‘বিদ্বান্(আত্মজ্ঞ সর্ব্ববিধ চিহ্ন রহিত হইবেন,’

৮৪০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

‘আত্মতত্ত্বজ্ঞ পুরুষ কোনপ্রকার আশ্রমচিহ্নে চিহ্নিত থাকেন না’ এবং ‘যে ব্যক্তি প্রিয়প্রাপ্তির আশা রাখে না, প্রিয়-সাধন কর্ম্ম করে না, নমস্কার ও স্তুতিবর্জিত হয়, এবং ক্ষীণকর্ম্মা ও স্বয়ং অক্ষীণস্বভাব, দেবগণ তাঁহাকেই ব্রাহ্মণ বা ব্রহ্মজ্ঞ বলিয়া জানেন’ ইত্যাদি শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্র আত্মজ্ঞের পক্ষে সর্ব্ববিধ কৰ্ম্ম-সম্বন্ধ- পরিত্যাগ প্রদর্শন করিতেছে। অতএব আত্মবিদ্ পুরুষ যে, ব্যুত্থান অবলম্বন করিবেন, তাহা নিশ্চয়ই সমস্ত কৰ্ম্ম ও কর্মসাধন পরিত্যাগরূপ পরমহংসপারি- ব্রাজ্যরূপ সন্ন্যাস, কিন্তু তাহা অবিদ্বৎসন্ন্যাস নহে। ২১

[অতঃপর শ্রুতির শব্দার্থ বিবৃত হইতেছে-] যেহেতু পূর্ব্ববর্তী ব্রাহ্মণগণ এই আত্মাকে পাইবার জন্য সাধন ও ফলাত্মক সমস্ত এষণা হইতে(কাম্য বিষয় হইতে) ব্যুত্থান করিয়া-ঐহিক ও পারলৌকিক কৰ্ম্ম ও কর্মসাধন পরিহার করিয়া ভিক্ষা- চর্য্যা অবলম্বন করিয়াছেন; সেইহেতু এখনও ব্রাহ্মণ-ব্রহ্মবিদ্ ব্যক্তি, পাণ্ডিত্য- পণ্ডিতভাব-এই আত্মজ্ঞান নিঃশেষরূপে অবগত হইয়া অর্থাৎ শাস্ত্র ও আচার্য্যের নিকট হইতে সম্পূর্ণরূপে আত্মবিজ্ঞান লাভ করিয়া, পরে পূর্ব্বোক্ত ত্রিবিধ এষণা হইতে ব্যুত্থিত হইয়া,-যেহেতু এষণাক্ষয়েই যথোক্ত পাণ্ডিত্যের উৎপত্তি, এবং এষণা মাত্রই উহার বিরোধী; সেই হেতু তৎসত্ত্বে আত্মবিষয়ক জ্ঞান কখনই উৎপন্ন হইতে পারে না; অতএব যদিও আত্মবিষয়ক তত্ত্বজ্ঞানের বিধানেই তৎপ্রতিপক্ষ এষণা- পরিত্যাগও বিহিতই হইয়াছে-বুঝিতে পারা যায়; সুতরাং তাহার জন্য আর পৃথক্ বিধির আবশ্যক হয় না সত্য;[তথাপি] শ্রুতির ‘ব্যুত্থায়’ পদে ‘ত্বা’ প্রত্যয় দ্বারা আত্মবিজ্ঞানের কর্ত্তাকেই ব্যুত্থানের কর্তা বলিয়া নির্দেশ করিয়া তাৎপর্য্য-লব্ধ ব্যুথা- নের দৃঢ়তা সম্পাদন করিয়াছেন;[সুতরাং ইহা স্বতন্ত্র ‘অপূর্ব্ব বিধি’ নহে]। ২২

অতএব জ্ঞানী পুরুষ সর্ব্ববিধ বিষয়-বাসনা পরিত্যাগপূর্ব্বক ‘বাল্যে’ জ্ঞান- বল অবলম্বনে অবস্থান করিতে ইচ্ছা করিবেন। যাহারা আত্মজ্ঞানরহিত, উপযুক্ত সাধন ও তৎফল আশ্রয় করাই তাহাদের বল; কিন্তু বিদ্বান্ পুরুষ অজ্ঞ- জনাশ্রয়ণীয় তাদৃশ বল পরিত্যাগ করিয়া, যাহা সাধন ও ফলস্বরূপ নয়, এবংবিধ আত্মজ্ঞানরূপ বলেরই কেবল আশ্রয় গ্রহণ করিবেন; ঐরূপ জ্ঞান-বল আশ্রয় করিলে, বিষয়লোলুপ ইন্দ্রিয়গণ তাহাকে আকর্ষণ করিয়া আর এষণার বিষয়ে নিক্ষেপ করিতে সমর্থ হয় না; কেন না, যে ব্যক্তি জ্ঞান-বলবিহীন মুঢ়, ইন্দ্রিয়গণ তাহাকেই ঐহিক ও পারলৌকিক কাম্য বিষয়ে নিয়োজিত করিয়া থাকে। এখানে বল অর্থ—আত্মজ্ঞান-প্রভাবে সমস্ত বিষয়াসক্তিকে অভিভূত করা। অতএব সেই জ্ঞান-বলরূপ ভালভাবে থাকিতে ইচ্ছা করিবে(যত্ন করিবে)।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—পঞ্চমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৪১

‘আত্মজ্ঞানপ্রভাবে বীর্য্য লাভ করে’, এবং ‘বলহীন পুরুষ এই আত্মাকে লাভ করিতে পারে না’ ইত্যাদি শ্রুতিও এতদনুরূপ অর্থই প্রকাশ করিতেছে। ২৩

উক্ত বাল্য ও পাণ্ডিত্য নিঃশেষ করিয়া-সম্পূর্ণরূপে অধিগত হইয়া, অনন্তর মনন করিয়া মুনি-যোগী হইবেন(১)। ব্রহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তির ইহাই একমাত্র কর্তব্য যে, সর্ব্বপ্রকার অনাত্মবিষয়ক চিন্তা বিদূরিত করা; তিনি এই কার্য্য করিয়াই কৃতকৃত্য-যোগী হন। তাহার পর, অমৌন-আত্মজ্ঞান ও অনাত্মচিন্তা-বর্জনরূপ পাণ্ডিত্য ও বাল্য নিঃশেষ করিয়া ব্রহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তি কৃতকৃত্য হন-তখন তাঁহার সর্বত্র ব্রহ্ম-বুদ্ধি সমুৎপন্ন হয়। এখানে মৌন অর্থ-অনাত্মবুদ্ধিনিবৃত্তির পর্য্যবসান -শেষফল। সেই ব্রাহ্মণ তখন কৃতকৃত্য হন। তখন তাঁহার যথার্থ ব্রাহ্মণ্য লব্ধ হয় বলিয়া তিনি প্রকৃত ব্রাহ্মণ-পদবাচ্য হন; এইজন্য বলিতেছেন যে, সেই ব্রাহ্মণ কিরূপ আচার-সম্পন্ন হইবেন?[উত্তর-] যেরূপ হন, অর্থাৎ যেরূপ আচার- সম্পন্নই হউন, তিনি যথোক্ত প্রকারই হন; তিনি যে-কোন প্রকার আচরণ করিতে পারেন, তাহাতেও তিনি উক্ত প্রকার ব্রাহ্মণই থাকেন, অর্থাৎ কিছুতেই তাঁহার ব্রহ্মনিষ্ঠার ব্যাঘাত হয় না। ‘যে কোন প্রকার আচারযুক্ত হন’ কথাটি আত্মবিদ্ ব্যক্তির স্তুতিসূচকমাত্র; ইহা দ্বারা উক্ত ব্রাহ্মণ্যাবস্থার প্রশংসা করা হইতেছে মাত্র, কিন্তু সদাচারে অনাদর প্রদর্শন করা হইতেছে না। ২৪

ইঁহার অতিরিক্ত—অশনায়াদিবিনির্ম্মুক্ত নিত্যতৃপ্ত আত্মস্বরূপ যথোক্ত ব্রাহ্মণ্যাবস্থায় অবস্থিতির অতিরিক্ত—অবিদ্যার বিষয়ীভূত এষণাত্মক যে কোন বস্তু,[তৎসমস্তই] আর্ত্ত—পীড়াগ্রস্ত অর্থাৎ বিনাশশীল; সুতরাং স্বপ্ন ও মরীচিকা- তুল্য—মায়াময় মিথ্যা অসার; কেবল আত্মাই একমাত্র নিত্যমুক্ত ও অবিনশ্বর। একথার পর কুর্ষীতকপুত্র কহোল প্রশ্ন হইতে নিবৃত্ত হইলেন ॥ ১৭০ ॥ ১ ॥

ইতি শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণায় নমঃ। কুরুক্ষেত্রং তত্রৈব তস্মিন্ কালচক্রং। ॥৩॥ ৫॥

ষষ্ঠং ব্রাহ্মণম্।

অথ হৈনং গার্গী বাচকুবী পপ্রচ্ছ; যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ— যদিদং সর্বমপ্সোতঞ্চ প্রোতং চ, কস্মিন্ নু খল্পাপ ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি, বায়ৌ গার্গীতি, কস্মিন্ নু খলু বায়ুরোতশ্চ প্রোত- শ্চেত্যন্তরিক্ষলোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্নু খল্বন্তরিক্ষলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি, গন্ধর্ব্বলোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্নু খলু গন্ধর্ব্বলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেত্যাদিত্যলোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্নু খল্বাদি- ত্যলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি, চন্দ্রলোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্নু খলু চন্দ্রলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি, নক্ষত্রলোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্ নু খলু নক্ষত্রলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি, দেবলোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্নু খলু দেবলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতীন্দ্র- লোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্নু খল্বিন্দ্রলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি, প্রজাপতিলোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্ নু খলু প্রজাপতিলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি, ব্রহ্মলোকেষু গার্গীতি, কস্মিন্নু খলু ব্রহ্মলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি, স হোবাচ গার্গি, মাতি- প্রাক্ষীৰ্মা তে মূর্দ্ধা ব্যপপ্তদনতিপ্রশ্যাং বৈ দেবতামতিপৃচ্ছসি, গার্গি মাতি প্রাক্ষীরিতি, ততো হ গার্গী বাচকব্যুপররাম ॥১৭১৷৷১৷৷

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি তৃতীয়াধ্যায়ঃ

মহাং ব্রাহ্মণম্ ॥ ৩ ॥ ৬ ॥

সরলার্থঃ।—[অতঃ পরং যথোক্তস্য সর্ব্বান্তরস্যাত্মনঃ স্বরূপসমধিগমায় গার্গী-প্রশ্ন আরভ্যতে—“অথ হৈনম্” ইত্যাদিঃ।] অথ(কহোলবিরামানন্তরম্) বাচরুবী(বচক্লোঃ কন্যা) গার্গী এনং(যাজ্ঞবল্ক্যৎ) পপ্রচ্ছ, হ(ঐতিহ্যে)। যে যাজ্ঞবল্ক্য-ইতি[সম্বোধয়ন্তী সা] উবাচ হ—যৎ ইদৎ(দৃশ্যমানং) সর্ব্বং (পার্থিবৎ বস্তু) অপ্সু(জলে) ওতৎ চ প্রোতৎ চ(আতানবিতান-বিন্যস্ত-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—ষষ্ঠং ব্রাহ্মণম্।

৮৪৩

পটতত্ত্ববৎ সর্ব্বতঃ অনুস্যতম্)[অস্তি]; আপঃ(তানি জলানি) খলু(নিশ্চয়ে) কস্মিন্(কিন্নামকে বস্তুনি) ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ[সন্তি] নু(প্রশ্নে)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] হে গাগি, বায়ৌ(স্বকারণীভূত-বায়ুমণ্ডলে) [বর্তন্তে] ইতি।[গার্গী পুনঃ পপ্রচ্ছ-] নু(ভোঃ) বায়ুঃ কস্মিন্(কুত্র বস্তুনি) ওতঃ চ প্রোতঃ চ? ইতি;[উত্তরম্-] হে গার্গি, অন্তরিক্ষলোকেষু (আকাশমণ্ডলে)[ওতঃ চ প্রোতঃ চ অস্তি] ইতি।[পুনঃ প্রশ্ন:-] অন্তরিক্ষ- লোকাঃ খলু কস্মিন্ নু(প্রশ্নে) ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি,[উত্তরম্-] হে গাগি, গন্ধর্ব্বলোকেষু[ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ] ইতি।[পুনঃ প্রশ্ন:-] গন্ধর্ব্ব- লোকাঃ খলু কস্মিন্ ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি।[উত্তরম্-] হে গার্গি, আদিত্যলোকেষু(সূর্য্যমণ্ডলে) ইতি।[পুনঃ প্রশ্নঃ] আদিত্যলোকাঃ খলু কস্মিন্ ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি;[উত্তরম্] হে গার্গি, চন্দ্রলোকেষু(চন্দ্রমণ্ডলে) ইতি।[পুনঃ প্রশ্ন:] চন্দ্রলোকাঃ খলু কস্মিন্ নু ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি। [উত্তরম্] হে গার্গি, নক্ষত্রলোকেষু ইতি।[পুনঃ প্রশ্নঃ] নক্ষত্রলোকাঃ খলু কস্মিন্ ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি;[উত্তরম্] হে গার্গি, দেবলোকেষু ইতি।[পুনঃ প্রশ্নঃ] দেবলোকাঃ খলু কস্মিন্ নু ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি; [উত্তরম্-] হে গার্গি, ইন্দ্রলোকেষু ইতি।[পুনঃ প্রশ্নঃ] ইন্দ্রলোকাঃ খলু কস্মিন্ নু ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি;[উত্তরম্-] হে গার্গি, প্রজাপতি- লোকেষু ইতি।[পুনঃ প্রশ্নঃ] প্রজাপতিলোকাঃ খলু কস্মিন্ নু ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি;[উত্তরম্-] ব্রহ্মলোকেষু ইতি। ব্রহ্মলোকাঃ খলু কস্মিন্ নু ওতাঃ চ প্রোতাঃ চ? ইতি। সঃ(যাজ্ঞবল্ক্য:) উবাচ হ-হে গার্গি, মা অতি- প্রাক্ষী:(প্রশ্নানহবিষয়ে প্রশ্নং মা কার্ষীঃ); তে(তব) মুর্ধা(মস্তকং) মা ব্যপপ্তৎ(যদি ত্বম্ অপ্রষ্টব্যমপি ভূয়ঃ পৃচ্ছসি, তহি ধ্রুবং তব মস্তকং পতিষ্যতি, তৎ মা পতেদ্ ইত্যাশয়ঃ)।[ঋষিঃ স্বয়মেব ইমমর্থৎ ব্যাকুর্ব্বন্ আহ-] হে গার্গি, অনতিপ্রশ্ন্যাং(প্রশ্নানহাঁম্ অপি) দেবতাৎ অতিপৃচ্ছসি,[তৎ] মা অতি- প্রাক্ষীঃ(তদ্বিষয়ে প্রশ্নং মা কার্ষীঃ)। ততঃ(যাজ্ঞবল্ক্য-বচনশ্রবণাৎ পরম্) বাচরুবী গার্গী উপররাম(প্রশ্নাৎ বিরতা বভূব) হ ॥ ১৭১ ॥ ১॥

মূলানুবাদ।—অতঃপর বচরু তনয়া গার্গী উক্ত যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন—তিনি সম্বোধন করিয়া বলিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই যে, সম্পূর্ণ পৃথিবীমণ্ডল জলরাশিতে ওত-প্রোত রহিয়াছে;[ বল

৮৪৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

দেখি,] এই জলরাশি আবার কোথায় ওত-প্রোত আছে? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—বায়ুমণ্ডলে; ভাল, বায়ুমণ্ডল আবার কোথায় ওতপ্রোত আছে?[উত্তর হইল,] হে গার্গি, অন্তরিক্ষ লোকে(আকাশমণ্ডলে); [পুনঃ প্রশ্ন হইল—] অন্তরিক্ষলোক কোথায় ওতপ্রোত আছে? [উত্তর হইল,] হে গার্গি, গন্ধর্ব্বলোকে। আচ্ছা, গন্ধর্ব্বলোক আবার কোথায় ওতপ্রোত আছে?[উত্তর—] হে গার্গি, আদিত্যলোকে; আদিত্যলোক আবার কোথায় ওতপ্রোত আছে? হে গার্গি, চন্দ্রলোকে; [পুনঃ প্রশ্ন হইল,] সেই চন্দ্রলোক কোথায় ওতপ্রোত আছে? [উত্তর—] হে গার্গি, নক্ষত্রলোকে; সেই নক্ষত্রলোক কোথায় ওতপ্রোত আছে?[উত্তর—] হে গার্গি, তাহা আছে দেবলোকে; আচ্ছা, সেই দেবলোক কোথায় ওতপ্রোত আছে? হে গার্গি, তাহা আছে ইন্দ্রলোকে; সেই ইন্দ্রলোক কোথায় ওতপ্রোত আছে? হে গার্গি, তাহা আছে প্রজাপতিলোকে; সেই প্রজাপতিলোক কোথায় ওতপ্রোত আছে? হে গার্গি, তাহা আছে ব্রহ্মলোকে; সেই ব্রহ্মলোক কোথায় ওতপ্রোত আছে? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে গার্গি, তুমি আর অধিক জিজ্ঞাসা করিও না; তোমার শিরঃপাত না হউক, অর্থাৎ যাহা প্রশ্নের যোগ্য নয়, উত্তরের অতীত, তুমি তদ্বিষয়ে প্রশ্ন করিতেছ; এরূপ প্রশ্ন করিলে তোমার মস্তক খসিয়া পড়িবে; অতএব তুমি এরূপ অযোগ্য প্রশ্ন হইতে বিরত হও; তোমার মস্তক-পাত না হউক। এ কথার পর বচরুর কন্যা গার্গী প্রশ্ন হইতে বিরতা হইলেন ॥ ১৭১ ॥ ১ ॥

বৃহদারণ্যকোপনিষদে তৃতীয়াধ্যায়ে ষষ্ঠোঽধ্যায়ঃ ॥ ৬ ॥ ৬ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।-যৎ সাক্ষাদপরোক্ষাদ্ ব্রহ্ম সর্ব্বান্তর আত্মেত্যুক্তম্, তস্য সর্ব্বান্তরস্য স্বরূপাধিগমায় আ শাকল্যব্রাহ্মণাদ গ্রন্থ আরভ্যতে। পৃথিব্যা- দীনি হ্যাকাশান্তানি ভূতানি অন্তর্ব্বহির্ভাবেন ব্যবস্থিতানি; তেষাং যৎ বাহ্যং বাহ্যং, অধিগম্যাধিগম্য নিরাকুর্ব্বন্ দ্রষ্টুঃ সাক্ষাৎ সর্ব্বান্তরোহগৌণ আত্মা সর্ব্ব- সংসারধৰ্ম্মবিনির্ম্মুক্তো দর্শয়িতব্য ইত্যারম্ভঃ-অথ হ এনং গার্গী নামতঃ, বাচরুবী বচকোদুহিতা পপ্রচ্ছ; যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ; যদিদৎ সর্ব্বং পার্থিবৎ ধাতুজাতম্ অপ্সু উদকে ওতৎ চ প্রোতৎ চ-ওতম্ দীর্ঘপটতত্ত্ববৎ, প্রোতৎ তির্য্যক্তন্তুবৎ,

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—ষষ্ঠং ব্রাহ্মণম্।

৮৪৫

বিপরীতং বা; অস্তিঃ সর্ব্বতঃ অন্তর্ব্বহির্ভূতাভির্য্যাপ্তমিত্যর্থঃ; অন্যথা সক্তমুষ্টি- বৎ বিশীর্য্যেত। ইদং তাবদনুমানমুপন্যস্তম্—যৎ কাৰ্য্যং পরিচ্ছিন্নং স্থূলং, কার- ণেনাপরিচ্ছিন্নেন সুক্ষ্মেণ ব্যাপ্তমিতি দৃষ্টম্—যথা পৃথিবী অদ্ভুঃ; তথা পূর্ব্বং পূর্ব্বমুত্তরেণোত্তরেণ ব্যাপিনা ভবিতব্যম্—ইত্যেষ আ সর্ব্বান্তরাদাত্মনঃ প্রশ্নার্থঃ। তত্র ভূতানি পঞ্চ সংহতান্যেবোত্তরম্ উত্তরং সূক্ষ্মভাবেন ব্যাপকেন কারণরূপেণ চ ব্যবতিষ্ঠন্তে। নচ পরমাত্মনোহর্ব্বাক্ তদ্ব্যতিরেকেণ বস্তুন্তরমস্তি, “সত্যস্য সত্যম্” ইতি শ্রুতেঃ; সত্যঞ্চ ভূতপঞ্চকম্, সত্যস্য সত্যং চ পর আত্মা। ১

কস্মিন্ন খল্পাপ ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি—তাসামপি কার্য্যত্বাৎ স্থূলত্বাৎ পরি- চ্ছিন্নত্বাচ্চ কচিদ্ধি ওতপ্রোতভাবেন ভবিতব্যম্; ক তাসামোতপ্রোতভাবঃ? ইতি। এবমুত্তরোত্তরং প্রশ্নপ্রসঙ্গো যোজয়িতব্যঃ। বায়ৌ গার্গীতি। ননু অগ্না- বিতি বক্তব্যম্; নৈষ দোষঃ; অগ্নেঃ পার্থিবং বা আপ্যং বা ধাতুমনাশ্রিত্য ইতর- ভূতবৎ স্বাতন্ত্র্যেণাত্মলাভো নাস্তীতি তস্মিন্ ওতপ্রোতভাবো নোপদিশ্যতে। ২

কস্মিন্ নু খলু বায়ুরোতশ্চ প্রোতশ্চেতি; অন্তরিক্ষলোকেষু গার্গীতি। তান্যেব ভূতানি সংহতানি অন্তরিক্ষলোকাঃ; তান্যপি গন্ধর্ব্বলোকেষু গন্ধর্ব্ব- লোকাঃ, আদিত্যলোকেষু আদিত্যলোকাঃ, চন্দ্রলোকেষু চন্দ্রলোকাঃ, নক্ষত্র- লোকেষু নক্ষত্রলোকাঃ, দেবলোকেষু দেবলোকাঃ, ইন্দ্রলোকেষু ইন্দ্রলোকাঃ, বিরাটশরীরারম্ভকেষু ভূতেষু প্রজাপতিলোকেষু প্রজাপতিলোকাঃ, ব্রহ্মলোকেষু ব্রহ্মলোকা নাম—অণ্ডারম্ভকাণি ভূতানি; সর্ব্বত্র হি সূক্ষ্মতারতম্যক্রমেণ প্রাণুপ- ভোগাশ্রয়াকারপরিণতানি ভূতানি সংহতানি তান্যের পঞ্চেতি বহুবচনভাঞ্জি। ৩

কস্মিন্ নু খলু ব্রহ্মলোকা ওতাশ্চ প্রোতাশ্চেতি। স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ— হে গার্গি, মাতিপ্রাক্ষীঃ স্বপ্রশ্নন্যায়প্রকারমতীত্য আগমনেন প্রষ্টব্যাং দেবতাম্ অনুমানেন মা প্রাক্ষীরিত্যর্থঃ। পৃচ্ছন্ত্যাশ্চ মা তে তব মূদ্ধা শিরঃ ব্যপপ্তৎ বিস্পষ্টৎ পতেৎ; দেবতায়াঃ স্বপ্রশ্ন আগমাবিষয়ঃ, তং প্রশ্নবিষয়মতিক্রান্তো গার্গ্যাঃ প্রশ্নঃ, আনুমানিকত্বাৎ। স যস্যা দেবতায়াঃ প্রশ্নঃ, সা অতিপ্রশ্না, ন অতিপ্রশ্না অনতি- প্রশ্না—স্বপ্রশ্নবিষয়ৈব, কেবলাগমগম্যেত্যর্থঃ। তাম্ অনতিপ্রশ্যাং বৈ দেবতাম্ অতিপৃচ্ছসি; অতো গাগি, মাতিপ্রাক্ষীঃ, মর্ত্তুং চেৎ নেচ্ছসি। ততো হ গার্গী বাচরুব্যুপররাম॥ ১৭১ ॥ ১ ॥

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ তৃতীয়োঽধ্যায়ঃ ষষ্ঠং গর্গীভাষ্যম্ ॥ ৩ ॥ ৬ ॥

টীকা। পূর্ব্বব্রাহ্মণয়োরাত্মনঃ সব্বান্তরত্বমুক্তং, তন্নির্ণয়ার্থমুত্তরং ব্রাহ্মণত্রয়মিতি সঙ্গতিমাহ— যৎ সাক্ষাদিতি। উক্তমেব সম্বন্ধং বিবৃণোতি-পৃথিব্যাদীনীতি। অন্তর্ব্বহির্ভাবেন সুক্ষ্মস্থূল-

৮৪৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তারতম্যক্রমেণেত্যর্থঃ। বাহ্যং বাহ্যামিতি বীঙ্গোপরিষ্টাত্তচ্ছব্দো দ্রষ্টব্যঃ, যত্তদোনিত্যসম্বন্ধাৎ, নিরাকুর্ব্বন্ যথা মুমুক্ষুঃ সর্বান্তরমাত্মানং প্রতিপদ্যতে, তথা স যথোক্তবিশেষণো দর্শয়িতব্য ইত্যুত্তরগ্রন্থারম্ভ ইতি যোজনা। কহোলপ্রশ্ননির্ণয়ানন্তর্য্যমথশব্দার্থঃ। যৎ পার্থিবং ধাতুজাতং তদিদং সর্বমপ্সিত্যাদি যোজনীয়ম্। পদার্থমুক্তা বাক্যার্থমাহ-অস্তিরিতি। পার্থিবস্য ধাতুজাতস্যাদ্ভব্যাপ্ত্যভাবে দোষমাহ-অন্যথেতি। কিমত্র গার্গ্যা বিবক্ষিতমিতি, তদাহ- ইদং তাবদিতি। তদেব দর্শয়িতুং ব্যাপ্তিমাহ-যৎ কাৰ্য্যমিতি। কারণেন ব্যাপকেনেতি শেষঃ। যৎ কার্য্যং, তৎ কারণেন ব্যাপ্তং, যৎ পরিচ্ছিন্নং, তদ্ব্যাপকেন ব্যাপ্তং, যচ্চ স্থূলং, তৎ সূক্ষেণ ব্যাপ্তমিতি ত্রিপ্রকারা ব্যাপ্তিঃ। ইতিশব্দস্তৎসমান্ত্যর্থঃ। ব্যাপ্তিভূমিমিহ-যথেতি। সম্প্রত্যনুমানমাহ-তথেতি। পূর্ব্বং পূর্বমিত্যবাদেদর্দ্ধস্মিণো নির্দেশঃ। উত্তরেণোত্তরেণ বাষ্বাদিকারণেনাপরিচ্ছিন্নেন সুক্ষেণ ব্যাপ্তমিতি শেষঃ। বিমতং কারণেন ব্যাপকেন সূক্ষ্মেণ ব্যাপ্তং কার্য্যত্বাৎ পরিচ্ছিন্নত্বাৎ স্থূলত্বাচ্চ পৃথিবীবদিত্যর্থঃ। সর্বান্তরাদাত্মনোহর্ব্বাগুক্তন্যায়ং সর্বত্র সঞ্চারয়তি-ইত্যেষ ইতি। ১

ননু তথাপি ভূতপঞ্চকব্যতিরিক্তানাং গন্ধর্ব্বলোকাদীনামপ্যান্তরত্বেনোপদেশাৎ কথং ভূত- পঞ্চকব্যুদাসেন সর্ব্বান্তরপ্রতিপত্তির্বিবক্ষিতেতি, তত্রাহ—তত্রেতি। উক্তনীত্যা প্রশ্নার্থে স্থিতে সতীতি যাবৎ। ভূতাত্মস্থিতি-নির্দ্ধারণে বা সপ্তমী। অথ পরমাত্মানং ভূতানি চ হিত্বা পৃথগেব গন্ধর্ব্বলোকাদীনি বস্তুন্তরাণি ভবিষ্যন্তি, নেত্যাহ—ন চেতি। গন্ধর্ব্বলোকাদীন্যপি ভূতানামে- বাবস্থাবিশেষাস্ততঃ সত্যং ভূতপঞ্চকং, তস্য সত্যং পরং ব্রহ্ম, নান্যদন্তরালে প্রতিপত্তব্যমিত্যন্য- প্রতিষেধার্থৌ চশব্দৌ। ২

তাৎপর্য্যমুক্ত। প্রশ্নমুখাপ্য তদক্ষরাণি ব্যাকরোতি-কস্মিন্নিত্যাদিনা। কস্মিন্নু খলু বায়ু- রিত্যাদাবুক্তস্যারমতিদিশতি-এবমিতি। বায়াবিত্যযুক্তা প্রত্যুক্তিরপামগ্নিকাৰ্য্যত্বাদগ্নাবিতি বক্তব্যত্বাদিতি শঙ্কতে-নন্বিতি। অগ্নেরুদকব্যাপকত্বেহপি কাষ্ঠবিদ্যুদাদিপারতন্ত্র্যাৎ স্বতন্ত্রেণ কেনচিদপাং ব্যাপ্তির্ব্বক্তব্যা, ইত্যগ্নিং হিত্বা তৎকারণে বায়াবিত্যুক্তং, বায়োশ্চ স্বকারণতন্ত্রত্বেহপি নোদক-তন্ত্রতেতি তদ্ব্যাপকত্বসিদ্ধিরিত্যুত্তরমাহ-নৈষ দোষ ইত্যাদিনা। ৩

অন্তরিক্ষলোকশব্দার্থমাহ-তান্যেবেতি। প্রজাপতিলোকশব্দার্থং কথয়তি-বিরাড়িতি। অন্তরিক্ষলোকাদীনাং প্রত্যেবমেকত্বাৎ কৃতো বহুবচনমিত্যাশঙ্ক্যাহ-সর্ব্বত্র হীতি। পূর্ব্ববদনু- মানেন সূত্রং পৃচ্ছন্তীং গার্গীং প্রতিষেধতি-স হোবাচেত্যাদিনা। উত্তমেব স্পষ্টয়ন্ বাক্যার্থ- মাহ-আগমেনেতি। প্রতিষেধাতিক্রমে দোষমাহ-পৃচ্ছন্ত্যাশ্চেতি। মূর্দ্ধপাতপ্রসঙ্গং প্রকটয়ন্ প্রতিষেধমুপসংহরতি-দেবতায়া ইত্যাদিনা ॥ ১৭১ ॥ ১ ॥

ইতি কৃষ্ণদাসদেবনিবন্ধে। তৃতীয়ধ্যায়ে ষষ্ঠঃ শ্লোকঃ॥ ৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ।—ইতঃপূর্ব্বে যাহাকে সাক্ষাৎ অপরোক্ষ সর্ব্বান্তর আত্মা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। সেই সর্ব্বান্তর আত্মার যথার্থ স্বরূপ নিরূপণের জন্য পরবর্তী শাকল্য ব্রাহ্মণ পর্য্যন্ত(নবম ব্রাহ্মণ পর্য্যন্ত) শ্রুতিবাক্য আরব্ধ হই- তেছে। পৃথিবী হইতে আরম্ভ করিয়া আকাশপর্য্যন্ত ভূতবর্গ সর্ব্বত্র বাহ্যাভ্যন্তর-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—ষষ্ঠং ব্রাহ্মণম্।

৮৪৭

ভাবে অবস্থিত রহিয়াছে; তন্মধ্যে যে যে ভূত অপেক্ষাকৃত বাহ্য(বাহিরে অবস্থিত), সে সমস্তের স্বরূপ প্রদর্শন এবং আন্তরত্ব প্রত্যাখ্যানপূর্ব্বক দ্রষ্টার সাক্ষাৎ সর্ব্বান্তরত্ব ও সর্ববিধ সংসারধর্মবিবর্জিত মুখ্য আত্মত্ব প্রদর্শনার্থ এই ব্রাহ্মণের আরম্ভ হইতেছে— অতঃপর বচক্র-দুহিতা গার্গী উক্ত যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। তিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন—এই যে, পার্থিব বস্তুসমূহ, তৎসমস্তই জলের মধ্যে ওত-প্রোতভাবে বর্তমান রহিয়াছে, অর্থাৎ অন্তরে ও বাহিরে সর্ব্বতো- ভাবে জলরাশি দ্বারা পরিব্যাপ্ত হইয়া আছে; তাহা না হইলে শক্তমুষ্টির ন্যায় (মুষ্টিবদ্ধ ছাতুর মত) বিশীর্ণ হইয়া অর্থাৎ পরস্পর পৃথক্ হইয়া পড়িত, মিলিত থাকিত না। ওত অর্থ—বস্ত্রে দীর্ঘভাবে প্রসারিত সূত্র, প্রোত অর্থ—বক্রভাবে বিস্তারিত সূত্র; অথবা ইহার বিপরীতভাবেও ‘ওত ও প্রোত’ শব্দের অর্থ ধরা যাইতে পারে। এখানে এ কথায় এইরূপ একটি অনুমানের নিয়ম দেখান হইল যে, যে যে বস্তু পরিমিত ও স্থূল, তাহা তদপেক্ষা বৃহৎ ও সূক্ষ্ম কারণ দ্বারা পরিব্যাপ্ত হইয়া থাকে; যেমন পৃথিবী জলের দ্বারা ব্যাপ্ত। এই প্রকার[আরও যে সমস্ত ভূত বর্তমান আছে, তাহাদের মধ্যেও] পূর্ব্ব পূর্ব্ব ভূতগুলি পরবর্তী ব্যাপক ভূত সমুহ দ্বারা ব্যাপ্ত বা কবলিত বুঝিতে হইবে। সর্ব্বান্তর আত্মা পর্য্যন্ত এই নিয়ম চলিবে; ইহাই উক্ত প্রশ্নের মর্ম্ম। ক্ষিত্যাদি পাঁচটি পদার্থের নাম—ভূত; সেই পাঁচটি ভূতের মধ্যে পরবর্তী ভূতটি পূর্ব্ববর্তী ভূত অপেক্ষা সূক্ষ্ম, ব্যাপক ও কারণাত্মক। পরমাত্মার নিম্নস্তরে পঞ্চভূতাতিরিক্ত আর কোনও বস্তু নাই; [সুতরাং গন্ধর্ব্বলোক প্রভৃতি বস্তুও পঞ্চভূতেরই অন্তর্গত—অবস্থাবিশেষ ভিন্ন আর কিছুই নহে]; কারণ, “সত্যস্য সত্যম্” শ্রুতি বলিতেছেন যে, ভূতসমূহ ‘সত্য’- পদবাচ্য; পরমাত্মা আবার সেই সত্যেরও সত্য স্বরূপ ॥ ১[পৃথিবী যেমন জলে আছে, তেমনি] জল আবার কোথায় ওতপ্রোত আছে?—অভিপ্রায় এই যে, জলও যখন স্কুল ও পরিমিত একটি ভূত পদার্থ, তখন তাহারও কোনস্থানে ওতপ্রোতভাবে থাকা উচিত;[অতএব জিজ্ঞাসা করি—] সেই জলসমূহ ওতপ্রোতভাবে কোথায় আছে? পরবর্তী অন্যান্য ভূত- সম্বন্ধেও এই জাতীয় প্রশ্নের সংযোজনা করিতে হইবে।[উক্ত প্রশ্নের উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] হে গাগি, বায়ুতে, অর্থাৎ জলরাশি বায়ুমণ্ডলে[ওতপ্রোত- ভাবে আছে]। ভাল, এখানে ত অগ্নিতেই জলের ওতপ্রোতভাব বলা উচিত ছিল?[কারণ, অগ্নি হইতেই জলের উৎপত্তি; সুতরাং তাহাতেই জলের

৮৪৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ওতপ্রোতভাবে থাকা যুক্তিসিদ্ধ; অতএব বায়ুতে তাহার ওতপ্রোতভাব হইতে পারে কিরূপে?] না—ইহা দোষাবহ হয় না; কারণ, অপরাপর ভূতের ন্যায় অগ্নি কখনই পার্থিব কিংবা জলীয় কোন বস্তু অবলম্বন না করিয়া স্বাধীনভাবে থাকিতে পারে না; এই জন্য তাহাতে আর পৃথক্ত্বাবে ওতপ্রোত- ভাবের কথা বলা হইল না ॥ ২

[গার্গী পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন-] সেই বায়ু আবার কোথায় ওতপ্রোত- ভাবে আছে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হে গাগি, অন্তরিক্ষলোকে; উক্ত পৃথিব্যাদি ভূতসমূহই সংহত বা সম্মিলিতাবস্থায় অন্তরিক্ষলোকে পরিণত হয়; তাহারাই আবার গন্ধর্ব্বলোকে গন্ধর্ব্বলোক রূপে, আদিত্যলোকে আদিত্য লোকরূপে, চন্দ্রলোকে চন্দ্রলোকরূপে, নক্ষত্রলোকে নক্ষত্রলোকরূপে, দেবলোকে দেবলোকরূপে, ইন্দ্রলোকে ইন্দ্রলোকরূপে, প্রজাপতিলোকে প্রজাপতিলোকরূপে পরিণত হয়; প্রজাপতিলোক অর্থ-বিরাটশরীরের উৎপাদক ভূতসমূহ; উহারাই আবার ব্রহ্মলোকে ব্রহ্মলোকরূপে প্রকটিত হয়। ব্রহ্মলোক অর্থ-ব্রহ্মাণ্ডজনক ভূতসমূহ। সর্ব্বত্র সেই পঞ্চভূতই সংহত বা সম্মিলিত হইয়া প্রাণিগণের উপভোগযোগ্য বিশেষ বিশেষ স্থান বা লোকরূপে পরিণত হইয়া থাকে; এইজন্যই লোক-শব্দগুলির উত্তর বহুবচনের প্রয়োগ হইয়াছে ॥ ৩

সেই ব্রহ্মলোক আবার কোথায় ওতপ্রোত আছে?[তদুত্তরে] যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, হে গাগি, তুমি এরূপ অনুচিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিও না; অর্থাৎ উক্ত প্রণালী পরিত্যাগ কর; যে দেবতার তত্ত্ব কেবল আগমানুসারে জানিতে হইবে, অনুমানের সাহায্যে তদ্বিষয়ে প্রশ্ন করিও না। সেরূপ প্রশ্ন করিলে নিশ্চয়ই তোমার মস্তক পতিত হইবে। পরদেবতাবিষয়ক উক্ত প্রশ্নটি হইতেছে কেবল আগমগম্য; গার্গীর প্রশ্ন সেই প্রশ্নপ্রণালী অতিক্রম করিয়াছে; কারণ, গার্গীর প্রষ্টব্য বিষয় হইতেছে—আনুমানিক অর্থাৎ অনুমানানুযায়ী,(শাস্ত্রানুযায়ী নহে)। এখানে যে দেবতার(ব্রহ্মের) সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হইয়াছে, সেই দেবতাটি হইতেছে অনতিপ্রশ্ন্য অর্থাৎ আনুমানিক প্রশ্নের অবিষয়—কেবলই আগমগম্য; তুমি সেই অনতিপ্রশ্ন্যা দেবতার সম্বন্ধে প্রশ্ন করিতেছ; অতএব হে গাগি, যদি মরিতে ইচ্ছা না কর, তবে এ বিষয়ে আর প্রশ্ন করিও না। তাহার পর বাচরুবী গার্গী বিরতা হইলেন ॥ ১৭১ ॥ ১ ॥

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদে তৃতীয়াধ্যায়ের ষষ্ঠ গার্গী- ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥ ৩ ॥ ৬ ॥

সপ্তমঃ ব্রাহ্মণঃ।

অথ হৈনমুদ্দালক আরুণিঃ পপ্রচ্ছ; যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ-মদ্রেঘবসাম পতঞ্চলস্য(ক) কাপ্যস্য গৃহেযু যজ্ঞমধী- য়ানাঃ, তস্যাসীদ্ভার্য্যা গন্ধর্ব্বগৃহীতা, তমপৃচ্ছাম-কোহসীতি, সোহব্রবীৎ-কবন্ধ আথর্বণ ইতি, সোহব্রবীৎ পতঞ্চলং কাপ্যং যাজ্ঞিকাস্শ্চ বেথ নু ত্বং কাপ্য তৎ সূত্রং, যেনায়ঞ্চ লোকঃ পরশ লোকঃ সর্বাণি চ ভূতানি সন্দৃক্কানি ভবন্তীতি, সোহ- ব্রবীৎ পতঞ্চলঃ কাপ্যো নাহং তদ্‌ ভগবন্ বেদেতি, সোহব্রবীৎ পতঞ্চলং কাপ্যং যাজ্ঞিকাস্শ্চ বেথ নু ত্বং কাপ্য তমন্তর্যামিণং য ইমঞ্চ লোকং পরঞ্চ লোকস্ সর্বাণি চ ভূতানি যোহন্তরো যময়তাতি, সোহব্রবীৎ পতঞ্চলঃ কাপ্যো নাহং তং ভগবন্ বেদেতি, সোহব্রবীৎ পতঞ্চলং কাপ্যং যাজ্ঞিকাস্শ্চ যো বৈ তৎ কাপ্য সূত্রং বিদ্যাৎ তঞ্চান্তর্য্যামিণমিতি, স ব্রহ্মবিৎ স লোকবিৎ স দেববিৎ স বেদবিৎ স ভূতবিৎ স আত্মবিৎ স সর্ববিদিতি তেভ্যোহব্রবীৎ; তদহং বেদ, তচ্চেৎ ত্বং যাজ্ঞবল্ক্য সূত্রমবিদ্বাস্তঞ্চান্তর্যামিণং ব্রহ্মগবীরুদজসে মূর্দ্ধা তে বিপতিষ্য- তীতি। বেদ বা অহং গৌতম তৎ সূত্রং তঞ্চান্তর্যামিণমিতি, যো বা ইদং কশ্চিদ ক্রয়াদ্বেদ বেদেতি, যথা বেথ, তথা ক্রহীতি ॥ ১৭২॥ ১॥

সরলার্থঃ।—অথ(গার্গীবিরামানন্তরম্) আরুণিঃ(অরুণস্যাপত্যং পুমান্) উদ্দালকঃ(তন্নামক ঋষিঃ) পপ্রচ্ছ; যাজ্ঞবল্ক্যেতি[সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—মদ্রেষু(মদ্রদেশেযু) কাপ্যস্য(কপিবংশীয়স্য) পতঞ্চলস্য গৃহেযু(ভবনে) যজ্ঞং(যজ্ঞবিদ্যাৎ) অধীয়ানাঃ(পঠন্তঃ সন্তঃ) অবসাম(তচ্ছিষ্যরূপেণ উষিত-

৮৫০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বস্তু)[বয়ম্]। তস্য(পতঞ্চলস্য) ভার্য্যা(পত্নী) গন্ধর্ব্বগৃহীতা(গন্ধর্ব্বেণ অমানুষসত্ত্বেন আবিষ্টা) আসীৎ।[বয়ং] তৎ(গন্ধর্ব্বম্) ‘অপৃচ্ছাম(পৃষ্টবন্তঃ) -কঃ(কিন্নামকঃ কিংস্বরূপশ্চ ত্বম্) অসি? ইতি। সঃ(গন্ধর্ব্বঃ) অব্রবীৎ- আথর্ব্বণঃ(অথর্ব্বণঃ অপত্যং) কবন্ধঃ(কবন্ধনামকঃ)[অস্মি] ইতি। সঃ (গন্ধর্ব্বঃ) কাপ্যং পতঞ্চলং যাজ্ঞিকান্(যজ্ঞশাস্ত্রাধ্যায়িনঃ তচ্ছিষ্যান্) চ অব্রবীৎ (পপ্রচ্ছ)-হে কাপ্য, ত্বং তৎ(প্রসিদ্ধং) সূত্রং(সূত্রাত্মানম্), বেথ (জানাসি) নু? যেন(সূত্রেণ) অয়ং চ লোকঃ(বর্তমানং জন্ম), পরঃ চ লোকঃ (ভবিষ্যৎ জন্ম চ), সর্বাণি ভূতানি(ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তানি) চ সংদৃদ্ধানি(গ্রথি- তানি, সূত্রেণ মাল্যমিব সম্যক্ সংবদ্ধানি) ভবন্তি ইতি। সঃ(এবং পৃষ্টঃ) পতঞ্চলঃ অব্রবীৎ-হে ভগবন্, অহং তৎ ন বেদ্মি(জানামি) ইতি। সঃ (গন্ধর্ব্বঃ) কাপ্যং পতঞ্চলং যাজ্ঞিকান্ চ[পুনঃ] অব্রবীৎ-হে কাপ্য, ত্বং তং অন্তর্যামিণং বেথ নু(জানাসি কিম্)? যঃ(অন্তর্যামী) যঃ অন্তরঃ (অভ্যন্তরস্থঃ সন্) ইমং চ লোকং পরং চ লোকম্, সর্ব্বাণি চ ভূতানি[পূর্ব্ববৎ] যময়তি(নিয়ময়তি-যথাধিকারং প্রেরয়তি) ইতি। সঃ(এবমুক্তঃ) পতঞ্চলঃ কাপ্যঃ অব্রবীৎ-হে ভগবন্, অহং তৎ অন্তর্যামিণং ন বেদ(নজানামি) ইতি।

[পুনরপি] সঃ(গন্ধর্ব্বঃ) পতঞ্চলং কাপ্যৎ যাজ্ঞিকান্ চ অব্রবীৎ-হে কাপ্য, যঃ(জনঃ) তৎ(মৎপৃষ্টং) সূত্রং, তং অন্তর্যামিণং চ ইতি(ইখং) বিদ্যাৎ (জানীয়াৎ), সঃ(বেত্তা) ব্রহ্মবিৎ, সঃ লোকবিৎ, সঃ দেববিৎ, সঃ বেদবিৎ, সঃ ভূতবিৎ, সঃ আত্মবিৎ, সঃ সর্ব্ববিৎ-ইতি তেভ্যঃ(কাপ্যাদিভ্যঃ) অব্রবীৎ। অহং তৎ(গন্ধর্ব্বোক্তং সর্ব্বং) বেদ(জানামি)। হে যাজ্ঞবল্ক্য, চেৎ(যদি) ত্বং তৎ (গন্ধর্ব্বোক্তং) সূত্রং, তং(গন্ধর্ব্বোক্তং) অন্তর্যামিণ: চ অবিদ্বান্(অজানন্ সন্) ব্রহ্মগবীঃ(ব্রহ্মবিদাং স্বভূতাঃ স্বত্ববতীঃ গাঃ) উদজসে(গৃহং নয়সি),[তদা] তে (তব) মুর্ধা(মস্তকং) বিপতিষ্যতি(বিস্পষ্টং পতিষ্যতি) ইতি।[এবং পৃষ্টঃ যাজ্ঞ- বল্ক্য আহ-] হে গৌতম(গোতমবংশীয় উদ্দালক), অহং বৈ(অবধারণে) তৎ সূত্রং, তৎ অন্তর্যামিণং চ বেদ ইতি।[উদ্দালকঃ পুনরাহ-] যঃ কশ্চিৎ বৈ(যঃ কোহপি) ইদং ক্রয়াৎ(বক্তুং শত্রুয়াৎ-)[অহং] বেদ, বেদ ইতি,[পরমার্থতত্ত্ব ন বেত্তি, তথা ত্বমপি ব্রবীষি ইত্যাশয়ঃ]। হে যাজ্ঞবল্ক্য, যথা বেথ(জানাসি ত্বং), তথা ক্রহি(কথয়েত্যর্থঃ) ॥১৭২৷১৷৷

মূল্যমান।—যতঃপর যৎকিঞ্চিৎ উদ্যোগক বাঞ্ছনীয়।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমং ব্রাহ্মণম্। ৮৫১

জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন- আমরা যজ্ঞবিদ্যা অধ্যয়ন করিবার সময় কপিবংশীয় পতঞ্চলের গৃহে বাস করিয়াছিলাম। পতঞ্চলের পত্নী গন্ধর্বাবিষ্টা ছিলেন; আমরা সেই গন্ধর্বকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম যে, তুমি কে? তদুত্তরে সে বলিয়াছিল -আমি অথর্বণের পুত্র, আমার নাম কবন্ধ। সেই গন্ধর্ব কপিগোত্রীয় পতঞ্চলকে এবং যাজ্ঞিকদিগকে লক্ষ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন- হে কাপ্য, তুমি কি সেই সূত্রকে(সূত্রাত্মাকে) জান? যাহা দ্বারা ইহলোক(বর্তমান জন্ম), পরলোক(পর জন্ম), এবং ব্রহ্মাদি তৃণলতা- পর্য্যন্ত সমস্ত ভূত গ্রথিত বা সম্বদ্ধ হইয়া রহিয়াছে? তদুত্তরে কপিগোত্রীয় পতঞ্চল বলিয়াছিলেন-ভগবন্, আমি তাহা জানি না। সেই গন্ধর্ব পুনশ্চ পতঞ্চল ও যাজ্ঞিকগণকে লক্ষ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন-হে কাপ্য, তুমি সেই অন্তর্যামীকে জান কি?-যিনি সকলের অভ্যন্তরে থাকিয়া এইলোক, পরলোক এবং সমস্ত ভূতকে নিয়মিত করিয়া রাখিতেছেন; পতঞ্চল বলিলেন-ভগবন্, আমি তাহাকে(অন্তর্যামীকে) জানি না।

সেই গন্ধর্ব্ব কাপ্য ও যাজ্ঞিকগণকে বলিয়াছিলেন—হে কাপ্য, যে ব্যক্তি উক্ত সূত্র ও অন্তর্যামীকে জানেন, তিনি ব্রহ্মবিৎ, তিনি লোকবিৎ, তিনি দেববিৎ, তিনি বেদবিৎ, তিনি ভূতবিৎ, তিনি আত্মবিৎ এবং তিনিই সর্ব্বতত্ত্বজ্ঞ; একথা তিনি তাহাদিগকে বলিয়াছিলেন; আমি তাহা জানি। হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি যদি সেই সূত্র ও অন্তর্যামীকে না জানিয়া ব্রহ্মবিদের প্রাপ্য গোসমূহ গ্রহণ করিয়া থাক, তাহা হইলে তোমার মস্তক খসিয়া পড়িবে।[তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] হে গৌতম(উদ্দালক), আমি উক্ত সূত্রাত্মা ও অন্তর্যামীকে জানি। [এ কথার পর উদ্দালক বলিলেন—] যেমন সাধারণ লোকে বলিয়া থাকে যে, আমি জানি—আমি জানি;[তোমার কথাও তদনুরূপ]; তুমি যেরূপ জান, তাহা প্রকাশ করিয়া বল ॥ ১৭২ ॥ ১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম।—ইদানীং ব্রহ্মলোকানামন্তরতমং সূত্রং বক্তব্যমিতি তদর্থ আরম্ভঃ; তচ্চাগমেনৈব প্রষ্টব্যমিতি ইতিহাসেনাগযোগপন্যাসঃ ক্রিয়তে—

৮৫২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অথ হৈনম্ উদ্দালকো নামতঃ অরুণস্যাপত্যমারুণিঃ পপ্রচ্ছ; যাজ্ঞবন্দ্যেতি হোবাচ। মদ্রেষু দেশেষু অবসাম উষিতবন্তঃ; পতঞ্চলস্য-পতঞ্চলো নামতঃ-তস্যৈব কপি- গোত্রস্য কাপ্যস্য গৃহেযু যজ্ঞমধীয়ানা যজ্ঞশাস্ত্রাধ্যয়নৎ কুর্ব্বাণাঃ। তস্যাসীদ্ভার্য্যা গন্ধর্ব্বগৃহীতা; তম্ অপৃচ্ছাম-কোহসীতি। সোহব্রবীৎ কবন্ধো নামতঃ, অথর্ব্বণোহপত্যম্ আথর্ব্বণ ইতি। ১

সোহব্রবীদ্ গন্ধর্ব্বঃ পতঞ্চলং কাপ্যৎ যাজ্ঞিকাংশ তচ্ছিষ্যান্-বেথ নু ত্বং হে কাপ্য, জানীষে তৎ সূত্রম্। কিং তৎ? যেন সূত্রেণ অয়ং চ লোকঃ ইদং চ জন্ম, পরশ্চ লোকঃ পরং চ প্রতিপত্তব্যৎ জন্ম, সর্ব্বাণি চ ভূতানি ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তানি সন্দৃন্ধানি সংগ্রথিতানি-অগিব সূত্রেণ বিষ্টন্ধানি ভবন্তি যেন, তৎ কিং সূত্রং বেথ। সোহব্রবীৎ এবং পৃষ্টঃ কাপ্যঃ-নাহং তৎ ভগবন্ বেদেতি-তৎ সূত্রং নাহং জানে, হে ভগবন্নিতি সংপুজয়ন্নাহ। সোহব্রবীৎ পুনর্গন্ধর্ব্ব উপাধ্যায়মস্মাৎশ -বেথ নু ত্বং কাপ্য তমন্তর্য্যামিণম্-অন্তর্যামীতি বিশেষ্যতে-য ইমঞ্চ লোকং পরৎ চ লোকং সর্ব্বাণি চ ভূতানি যোহন্তরঃ অভ্যন্তরঃ সন্ যময়তি নিয়ময়তি- দারুযন্ত্রমিব ভ্রাময়তি-স্বং স্বমুচিতব্যাপারং কারয়তীতি। সোহব্রবীদেবমুক্তঃ পতঞ্চলঃ কাপ্যঃ-নাহং তৎ জানে ভগবন্নিতি সংপূজয়ন্নাহ। ২

সোহব্রবীৎ পুনর্গন্ধর্ব্বঃ; সূত্র-তদন্তগতান্ত্যামিণোবিজ্ঞানং ভূয়তে-যঃ কশ্চিৎ ‘বৈ তৎ সূত্রং হে কাপ্য, বিদ্যাৎ বিজানীয়াৎ, তঞ্চান্তর্যামিণং সূত্রান্তর্গতং-তস্যৈব সূত্রস্থ্য নিয়ন্তারং বিদ্যাৎ যঃ, ইত্যেবম্ উক্তেন প্রকারেণ, স হি ব্রহ্মবিৎ পরমাত্ম- বিৎ, স লোকাংশ ভূরাদীন্ অন্তর্য্যামিণা নিয়ম্যমানান্ লোকান্ বেত্তি; স দেবাংশ অগ্ন্যাদীন্ লোকিনো জানাতি, বেদাংশ সর্ব্বপ্রমাণভূতান্ বেত্তি, ভূতানি চ ব্রহ্মাদীনি সূত্রেন প্রিয়মাণানি তদন্তর্গতেনান্তর্যামিণা নিয়ম্যমানানি বেত্তি; স আত্মানং চ কর্তৃত্বভোক্তৃত্ববিশিষ্টং তেনৈবান্তর্য্যামিণা নিয়ম্যমানং বেত্তি; সর্ব্বঞ্চ জগৎ তথাভূতং বেত্তীতি। এবং স্তুতে সূত্রান্তর্য্যামিবিজ্ঞানে প্রলুব্ধঃ কাপ্যোহ- ভিমুখীভূতঃ বয়ঞ্চ; তেভ্যশ্চাস্মভ্যম্ অভিমুখীভূতেভ্যোহব্রবীদ্ গন্ধর্ব্বঃ সূত্রমন্ত- র্য্যামিণং চ। তদহং সূত্রান্তর্য্যামিবিজ্ঞানং বেদ, গন্ধর্ব্বাল্লব্ধাগমঃ সন্; তচ্চেদ্ যাজ্ঞবল্ক্য, সূত্রং তঞ্চান্তর্যামিণম্ অবিদ্যান্ চেৎ-অব্রহ্মবিৎ সন্ যদি ব্রহ্মগবীরুদ- জসে-ব্রহ্মবিদাং স্বভূতা গা উদজসে উন্নয়সি ত্বমন্যায়েন, মচ্ছাপদগ্ধস্য মূর্দ্ধা শিরঃ তে তব বিস্পষ্টং পতিষ্যতি। ৩

এবমুক্তো যাজ্ঞবল্ক্য আহ—বেদ জানাম্যহম্, হে গৌতমোতি গোত্রতঃ, তৎ সূত্রং —যদ্ গন্ধর্ব্বঃ তুভ্যমুক্তবান্, যঞ্চ অন্তর্য্যামিণং গন্ধর্ব্বাদ্বিতবস্তো যুয়ম্, তঞ্চান্ত-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমং ব্রাহ্মণম্।

৮৫৩

র্য্যামিণং বেদ অহম্—ইতি এবমুক্তে প্রত্যাহ গৌতমঃ—যঃ কশ্চিৎ প্রাকৃত ইদৎ —যৎ ত্বয়োক্তং ক্রয়াৎ; কথম্? বেদ বেদইতি আত্মানং শ্লাঘয়ন্; কিং তেন গর্জিতেন; কার্যেণ দর্শয়? যথা বেথ, তথা ব্রূহীতি ॥ ১৭২। ১॥

টীকা। পূর্ব্বস্মিন্ ব্রাহ্মণে সূত্রাদর্ব্বাক্তনং ব্যাপকমুক্তম্, ইদানীং সূত্রং তদন্তর্গতমন্তর্যামিণং চ নির্ব্বক্ত মুত্তরব্রাহ্মণমিতি সঙ্গতিমাহ—ইদানীমিতি। ব্রাহ্মণতাৎপর্য্যমুক্তাখ্যায়িকাতাৎপর্য্যমাহ— তচ্চাগমেনৈবেতি। আচার্য্যোপদেশোহত্রাগমশব্দার্থঃ। গাগ্যা মূর্দ্ধপাতভয়াদুপরতেরনন্তর- মিত্যথ-শব্দার্থঃ। ১

নৌহৃদ্যং পিত্তপিত্তঘ্নং কফঘ্নং শ্লেষ্মনাশকং—সুস্বাদু। ২

ইতি-শব্দার্থমাহ—এবমিতি। যেনায়ং চেত্যাদিরুক্তঃ প্রকারঃ, স সর্ব্বলোকাংশ বেত্তীতি সম্বন্ধঃ। বিশেষণোক্তিপূর্ব্বকং তানের লোকাননুবদতি—ভূরাদীনিতি। স ব্রহ্মবিদিত্যাদি- নোক্তং সঙ্ক্ষিপতি—সর্ব্বং চেতি। তথাভূতং সূত্রেণ বিধৃতমন্তয্যামিণা চ নিয়ম্যমানমিতি যাবৎ। প্রস্তুতস্তুতিপ্রয়োজনমাহ—ইত্যেবমিতি। ভবত্বেবং তব সূত্রাদিজ্ঞানং, মম কিমায়াত- মিত্যাশঙ্ক্যাহ—তচ্চেদিতি। কিং তেনেত্যত্র তস্যেত্যধ্যাহারঃ। কার্য্যেণ দর্শয়েত্যুক্তং বিবৃণোতি—যথেতি ॥১৭২॥১॥

ভাষ্যানুবাদ।-এখন ব্রহ্মলোকের আভ্যন্তরীণ সূক্ষ্ম সূত্রাত্মার স্বরূপ প্রকাশ করা আবশ্যক হইয়াছে; তাহার জন্য এই প্রকরণের অবতারণা করা হইতেছে। শাস্ত্রোপদেশানুসারেই তাহা জিজ্ঞাসা করিতে হয়; এই জন্য গল্প- চ্ছলে সে কথার উল্লেখ করা হইতেছে-অতঃপর উদ্দালকনামক আরুণি-অরুণের পুত্র প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন-আমরা মদ্রদেশে যজ্ঞশাস্ত্র(যজ্ঞবিদ্যা) অধ্যয়ন করত কপিবংশীয় পতঞ্চলের গৃহে বাস করিয়াছিলাম। তাহার পত্নী গন্ধব্বরত্নক আবিষ্টা ছিল; আমরা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম-তুমি কে? সে বলিল-আমি অথর্ব্বণ-অথর্ব্বণের পুত্র, আমার নাম করন্ধ ॥ ১

সেই গন্ধর্ব্ব কপিবংশীয় পতঞ্চলকে এবং যাজ্ঞিবগণকে অর্থাৎ পতঞ্চলের শিষ্যগণকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন—হে কাপ্য, তুমি কি সেই ‘সূত্র’কে জান? কোন সূত্রকে? যে ‘সূত্র’ দ্বারা এই লোক অর্থাৎ বর্তমান জন্ম ও পরলোক— ভবিষ্যৎ জন্ম এবং ব্রহ্মাদি স্থাবরপর্যন্ত সমস্ত ভূতবর্গ সংদূগ্ধ অর্থাৎ সূত্রদ্বারা গ্রথিত মাল্যের ন্যায় সম্যরূপে গ্রথিত রহিয়াছে—তুমি কি সেই সূত্রাত্মাকে জান? এইরূপ জিজ্ঞাসার পর কাপ্য সম্মানপ্রদর্শনপূর্ব্বক উত্তর করিলেন, হে ভগবন্(পূজনীয়), না—আমি আপনার জিজ্ঞাসিত সূত্রতত্ত্ব জানি না॥ ২

সেই গণ্ডর্ব্ব পূর্ব্বোক্ত সূত্র ও তত্তৎপাদী অশ্বত্থামিত্র বিষয়ক বিজ্ঞানের প্রস্থান-

৮৫৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

পূর্ব্বক পুনর্ব্বার বলিলেন-হে কাপ্য, যে কোন লোক যথোক্ত প্রকারে উক্ত সূত্রকে জানেন, এবং সূত্রান্তর্গত অথচ উক্ত সূত্রেরই নিয়ামক অন্তর্যামীকে অবগত হন, সেই লোকই যথার্থ ব্রহ্মবিৎ অর্থাৎ পরমাত্মাকে জানেন; সেই ব্যক্তিই লোকবিৎ, অর্থাৎ উক্ত অন্তর্যামিকর্তৃক নিয়মিত পৃথিব্যাদি লোকসমূহ অবগত হন; সেই ব্যক্তিই পৃথিব্যাদিলোকের অধিপতি অগ্নিপ্রভৃতি দেবতাকে জানেন; সর্ব্ববিষয়ে প্রমাণস্বরূপ বেদসমূহও জানেন; সূত্রাত্মা যাহাদের ধারণ করিয়া আছে, এবং অন্তর্যামী যাহাদিগকে নিয়মিতভাবে পরিচালিত করিতেছেন, সেই ব্রহ্মাদি তৃণপর্যন্ত ভূতবর্গকেও জানেন; এবং সেই অন্তর্যামিকর্তৃক পরিচালিত ও কর্তৃত্ব-ভোক্তৃত্ববিশিষ্ট আত্মাকেও অবগত হন; অধিক কি, সমস্ত জগতের যথার্থ স্বরূপ যথাযথভাবে উপলব্ধি করিয়া থাকেন। উক্ত গন্ধর্ব্ব সূত্রাত্মা ও অন্তর্যামি- বিষয়ক বিজ্ঞানের এইরূপে প্রশংসা করিলে পর, কাপ্য পতঞ্চল এবং আমরা প্রলুব্ধ হইয়া শ্রবণে সমুৎসুক হইয়াছিলাম। আমরা শ্রবণের জন্য অভিমুখীভূত হইলে পর, সেই গন্ধর্ব্ব আমাদিগকে সূত্রাত্মা ও অন্তর্যামি-বিষয়ক বিজ্ঞানের উপদেশ দিয়াছিলেন। অতএব আমি গন্ধর্ব্বের নিকট হইতে উপদেশ পাইয়া সূত্র ও অন্তর্যামী সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান লাভ করিয়াছি;[তোমার কিন্তু সে বিজ্ঞান নাই;] অতএব হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি যদি সেই সূত্রাত্মা ও অন্তর্যামীকে না জানিয়া-যদি ব্রহ্মজ্ঞ না হইয়া এই সমস্ত ব্রহ্মগবী-ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তিগণের স্বভূত (সম্পত্তি স্বরূপ) এই সমস্ত গো অন্যায়পূর্ব্বক লইয়া যাও, তাহা হইলে তুমি আমার শাপে দগ্ধ হইবে, এবং তোমার মস্তক সম্পূর্ণরূপে খসিয়া পড়িবে। ৩

এই কথার পর যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে গোতমবংশজ উদ্দালক, গন্ধর্ব্ব তোমাকে যে সূত্রাত্মা ও অন্তর্যামীর তত্ত্ব বলিয়াছিলেন, আমি সেই সূত্রাত্মা ও অন্তর্যামীর তত্ত্ব জানি। যাজ্ঞবল্ক্য এই কথা বলিলে পর, উদ্দালক বলিলেন—তুমি যাহা বলিলে, ইহা যে-কোন লোক অর্থাৎ অতিসাধারণ লোকেও বলিতে পারে। কি প্রকার? নিজের প্রশংসা বা উৎকর্ষখ্যাপনের জন্য[না জানিয়াও] ‘আমি জানি, আমি জানি’[বলিতে পারে]; কিন্তু সেরূপ অসার বাক্যব্যয়ে ফল কি? কার্যতঃ তাহা দেখাও; যে রকম জান, তাহা প্রকাশ করিয়া বল ॥১৭২৷৷১৷৷

স হোবাচ বায়ুর্বৈ গৌতম তৎ সূত্রম্, বায়ুনা বৈ গৌতম সূত্রেণায়ঞ্চ লোকঃ পরশ্চ লোকঃ সর্বাণি চ ভূতানি সন্দৃকানি

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমং ব্রাহ্মণম্।
৮৫৬

ভবন্তি, তস্মাদ্বৈ গৌতম পুরুষং প্রেতমাহুর্ব্যস্রহসিষতাস্যাঙ্গা- নীতি, বায়ুনা হি গৌতম সূত্রেণ সংদৃন্ধানি ভবন্তীত্যেবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্যান্তর্য্যামিণং ব্রূহীতি ॥ ১৭৩॥ ২॥

সরলার্থঃ।—সঃ(এবমুক্তঃ যাজ্ঞবল্ক্যঃ) উবাচ হ—হে গৌতম, বায়ুঃ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) তৎ(পূর্ব্বোক্তং) সূত্রম্। হে গৌতম, বায়ুনা সূত্রেণ(সূত্র- রূপেণ বায়ুনা) অয়ং(বর্তমানঃ) চ লোকঃ, পরঃ চ লোকঃ, সর্ব্বাণি চ ভূতানি (ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তানি) সংদৃদ্ধানি(গ্রথিতানি) ভবন্তি। হে গৌতম, তস্মাৎ বৈ(এব হেতোঃ) প্রেতং(মৃতং) পুরুষম্ আহুঃ(কথয়ন্তি)[জনাঃ]—অন্য (মৃতস্য) অঙ্গানি(অবয়বাঃ) ব্যস্রংসিষত(বিস্রস্তানি, সূত্রনাশে মণয় ইব বিপর্যস্তানীত্যর্থঃ) ইতি; হি(যস্মাৎ) হে গৌতম, বায়ুনা সূত্রেণ সংদৃদ্ধানি (অঙ্গানি) ইতি।[উদ্দালক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এবমেব(ত্বয়া সূত্রং যথা বর্ণিতং, তৎ তথৈবেত্যর্থঃ);[অতঃপরং] অন্তর্যামিণং ব্রূহি(কথয়) ইতি ॥১৭৩৷৷২৷৷

মূলানুবাদ:-[উদ্দালকের কথা শুনিয়া] যাজ্ঞবল্ক্য বলি- লেন-হে গৌতম, সূক্ষ্ম বায়ু হইতেছে তোমার জিজ্ঞাসিত সেই সূত্র। হে গৌতম, বায়ুরূপ সূত্রদ্বারা এই লোক, পরলোক এবং ব্রহ্মাদি তৃণ- পর্যন্ত সমস্ত ভূত গ্রথিত রহিয়াছে। হে গৌতম, এইজন্যই মৃত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করিয়া লোকে বলিয়া থাকে যে, ইহার হস্তপদাদি অঙ্গসমূহ বিস্রংষিত(শিথিলীভূত) হইয়াছে; কেন না, বায়ুরূপ সূত্র দ্বারাই অঙ্গসমূহ বিধৃত হইয়া থাকে।[উদ্দালক বলিলেন-] ঠিক এইরূপই, অর্থাৎ তুমি যে প্রকার সূত্রের স্বরূপ নির্দেশ করিলে, তাহা ঠিক সেইরূপই বটে; এখন অন্তর্যামীর স্বরূপ বর্ণনা কর ॥ ১৭৩॥ ২॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—স হোবাচ যাজ্ঞল্ক্যঃ। ব্রহ্মলোকা যস্মিন্ ওতাশ্চ প্রোতাশ্চ বর্তমানে কালে, যথা পৃথিব্যপু; তৎ সূত্রমাগমগম্যং বক্তব্যমিতি— তদর্থং প্রশ্নান্তরমুখাপিতম্; অতস্তন্নির্ণয়ায়াহ—বায়ুর্ব্বে গৌতম, তৎ সূত্রম্, নান্যৎ। বায়ুরিতি সূক্ষ্মমাকাশবৎ বিষ্টম্ভকং পৃথিব্যাদীনাম্, যদাত্মকং সপ্তদশবিধং লিঙ্গং কর্মবাসনাসমবায়ি প্রাণিনাম্, যৎ তৎ সমষ্টিব্যষ্ট্যাত্মকম্, যস্য বাহ্যা ভেদাঃ সপ্ত সপ্ত মরুদগণাঃ—সমুদ্রস্যেবোর্ময়ঃ, তদেতদ্ বায়ব্যং তত্ত্বং সূত্রমিত্যভিধীয়তে।

৮৫৬. বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বায়ুনা বৈ গৌতম, সূত্রেণায়ঞ্চ লোকঃ পরশ্চ লোকঃ সর্ব্বাণি চ ভূতানি সন্দ- ন্ধানি ভবন্তি সংগ্রথিতানি ভবন্তীতি প্রসিদ্ধমেতৎ। অস্তি চ লোকে প্রসিদ্ধিঃ; কথম্? যম্মাদ্বায়ুঃ সূত্রম্, বায়ুনা বিধৃতং সর্ব্বম্; তস্মাদ্বৈ গৌতম, পুরুষং প্রেতমাহুঃ কথয়ন্তি—ব্যস্রংসিষত বিস্রস্তানি অন্য পুরুষস্যাঙ্গানীতি। সূত্রাপগমে হি মণ্যাদীনাং প্রোতানামবস্রংসনং দৃষ্টম্; এবং বায়ুঃ সূত্রম্; তস্মিন্ মণিবৎ প্রোতানি যদি অন্যাঙ্গানি স্যুঃ, ততো যুক্তমেতৎ বায়ুপগমে অবস্রুৎসনমঙ্গানাম্; অতো বায়ুনা হি গৌতম, সূত্রেণ সন্দৃদ্ধানি ভবন্তীতি নিগময়তি। এবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য, সম্যক্ উক্তং সূত্রম্; তদন্তর্গতং তু ইদানীং তস্যৈব সূত্রস্য নিয়ন্তারমন্তর্য্যামিণং ক্রহীত্যুক্ত আহ—॥১৭৩৷৷২৷৷

টীকা। যাজ্ঞবস্ক্যোক্তেস্তাৎপয্যমাহ—ব্রহ্মলোকা ইতি। ইত্যভীষ্টমাগমবিদাম্-ইত্যধ্যা- হৃত্য আদ্যস্তেতি-শব্দস্য যোজনা। প্রশ্নান্তরং সূত্রবিষয়ং গৌতমবাক্যম্। বৈশব্দার্থমাহ— নান্যদিতি। সূক্ষ্মত্বে দৃষ্টান্তমাহ—আকাশবদিতি। বায়ুমের বিশিনষ্টি—যদাত্মকমিতি। পঞ্চ ভূতানি, দশ বাহ্যানীন্দ্রিয়াণি, পঞ্চবৃত্তিঃ প্রাণঃ, চতুব্বিধমন্তঃকরণমিতি সপ্তদশবিধত্বম্। কর্ম্মণাং বাসনানাং চোত্তরসৃষ্টিহেতুনাং প্রাণিভিরজ্জিতানামাশ্রয়ত্বাদপেক্ষিতমেব লিঙ্গমিত্যাহ— কর্ম্মেতি। তস্যৈব সামান্যবিশেষাত্মনা বহুরূপত্বমাহ—যত্তদিতি। তন্তৈব লোকপরীক্ষক- প্রসিদ্ধত্বমাহ—যস্যেতি।

তস্য সূত্রত্বং সাধয়তি—বায়ুনেতি। প্রসিদ্ধমেতৎ সূত্রবিদামিতি শেষঃ। লৌকিকাং প্রসিদ্ধিমেব প্রশ্নপূর্ব্বকমনন্তরশ্রুত্যবষ্টন্তেন; স্পষ্টয়তি—কথমিত্যাদিনা। উক্তমেব দৃষ্টান্তেন ব্যনক্তি—সূত্রেত্যাদিনা। বায়োঃ সূত্রত্বে সিদ্ধে ফলিতমাহ—অত ইতি॥ ১৭৩॥২॥

ভাষ্যানুবাদ।-যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন; পৃথিবী যেরূপ জলেতে ওতপ্রোত- ভাবে আছে, তেমনি বর্তমান সময়ে সমস্ত ব্রহ্মলোক যাহার মধ্যে ওতপ্রোত রহিয়াছে, আগমানুসারে সেই ‘সূত্রের’ প্রকৃত স্বরূপটি নিরূপণ করিতে হইবে; তন্নিরূপণার্থই এই নূতন প্রশ্ন উত্থাপিত হইতেছে। অতএব তাহার(সূত্রের) স্বরূপ নিরূপণার্থ যাজ্ঞবল্ক্য বলিতেছেন-হে গৌতম, বায়ুই তোমার অভিপ্রেত সূত্র; অন্য কিছু নহে। এখানে বায়ু-শব্দে পৃথিব্যাদির বিধারক ও আকাশের ন্যায় সূক্ষ্ম বায়ু বুঝিতে হইবে। প্রাণিগণের কর্ম-বাসনা-সমবায়ী(কর্মসংস্কার- যুক্ত) সপ্তদশ অবয়বাত্মক লিঙ্গশরীর যাহা হইতে উৎপন্ন হয়,(১) যাহা সমষ্টি ও

(১) তাৎপর্য্য—“পঞ্চপ্রাণ-মনোবুদ্ধি-দশেন্দ্রিয়সমন্বিতম্। শরীর সপ্তদশভিঃ সূক্ষ্ম তল্লিঙ্গমুচ্যতে।” অর্থাৎ প্রাণাপানাদি পঞ্চ বায়ু, মন, বুদ্ধি, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয়, এই সপ্তদশ পদার্থের সমবায়ে রচিত শরীরের নাম—‘সূক্ষ্মশরীর’; ‘লিঙ্গশরীর’ ইহার নামান্তর। এই লিঙ্গশরীর আবার সমষ্টি ও ব্যষ্টিরূপ, সমষ্টি লিঙ্গশরীর হিরণ্যগর্ভের, আর ব্যষ্টি লিঙ্গশরীর

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৫৭

ব্যষ্টিরূপ, এবং সমুদ্রগত তরঙ্গসংঘের ন্যায় ঊনপঞ্চাশ বায়ু যাহার বাহ্য ভেদ; সেই বায়ুতত্ত্বই ‘সূত্র’ নামে অভিহিত হইয়া থাকে।

হে গৌতম, বায়ুরূপ সূত্র দ্বারা যে, এই লোক, পর লোক এবং সমস্ত ভূত সংদৃদ্ধ হইয়া—সম্যক্ গ্রথিত হইয়া রহিয়াছে, ইহা প্রসিদ্ধ কথা; জগতেও ইহা প্রসিদ্ধ; কিরূপে? যেহেতু বায়ুই সূত্র এবং বায়ু দ্বারাই সমস্ত জগৎ বিশেষভাবে ধৃত। হে গৌতম, সেই হেতুই মৃত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করিয়া লোকে বলিয়া থাকে—এই ব্যক্তির অঙ্গসমূহ বিস্রস্ত(শিথিলীভূত) হইয়াছে; সূত্রের অভাবে তৎসম্বন্ধ মণিপ্রভৃতির বিস্রংসন বা শিথিলীভাব দেখিতে পাওয়া যায়; বায়ুও ঠিক সেইরূপ সূত্র। জীবের অঙ্গসমূহও যদি ঠিক মণিরই মত তাহাতে ওত-প্রোত(গ্রথিত) থাকে বলিয়াই শরীর হইতে বায়ু বহির্গত হইলে অঙ্গসমূহের বিস্রংসন বা অবসাদ হওয়া যুক্তিসঙ্গত হয়; এই জন্যই, ‘হে গৌতম, বায়ুরূপ সূত্র দ্বারা সম্যক্ গ্রথিত হইয়া থাকে’ বলিয়া পূর্ব্বকথারই সমর্থন করিতেছেন।[গৌতম বলিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এই- রূপই বটে; তুমি ঠিক উত্তর বলিয়াছ। এখন ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যবর্তী সেই সূত্রেরই নিয়ামক অন্তর্যামীর স্বরূপ প্রকাশ করিয়া বল। এই কথা শুনিয়া যাজ্ঞবল্ক্য বলিতে লাগিলেন—॥১৭৩৷৷২৷৷

যঃ পৃথিব্যাং তিষ্ঠন্ পৃথিব্যা অন্তরো যং পৃথিবী ন বেদ যস্য পৃথিবী শরীরং যঃ পৃথিবীমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তরা- ম্যমৃতঃ ॥ ১৭৪ ॥ ৩ ॥

সরলার্থঃ।—[ এবমুক্তঃ যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] যঃ পৃথিব্যাং তিষ্ঠন্ পৃথিব্যাঃ অন্তরঃ(অভ্যন্তরঃ), যং পৃথিবী ন বেদ(জানাতি), পৃথিবী যস্য শরীরং(শরীর- স্থানীয়ং), যঃ অন্তরঃ(অভ্যন্তবস্থঃ সন্) পৃথিবীৎ যময়তি(নিয়মেন পরিচালয়তি), এষঃ(যথোক্তগুণসম্পন্নঃ) তে(তব)[ অভিমতঃ] অমৃতঃ(অবিনাশী) অন্তর্যামী (অন্তঃস্থিত্বা সংযমনকারী) অমৃতঃ আত্মা ॥১৭৪৷৷৩৷৷

মূলানুবাদ।—যিনি পৃথিবীতে অবস্থিত ও পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ এবং পৃথিবী যাহাকে জানে না; পৃথিবী যাহার শরীর, এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া পৃথিবীকে পরিচালিত করিতেছেন; তিনিই তোমার জিজ্ঞাসিত অবিনাশী অন্তর্যামী আত্মা ॥ ১৭৪ ॥ ৩ ॥

৮৫৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

শাঙ্করভাষ্যম্।—যঃ পৃথিব্যাং তিষ্ঠন্ ভবতি, সোহন্তর্যামী। সর্ব্বঃ পৃথিব্যাং তিষ্ঠতীতি সর্বত্র প্রসঙ্গো মাভূদিতি বিশিনষ্টি—পৃথিব্যা অন্তরোহভ্যন্তরঃ। তত্রৈতৎ স্যাৎ, পৃথিবী দেবতৈব অন্তর্যামীতি; অত আহ—যমন্তর্যামিণং পৃথিবী- দেবতাপি ন বেদ—ময্যন্যঃ কশ্চিদ্বর্ত্তত ইতি। যস্য পৃথিবী শরীরম্—যস্য চ পৃথিব্যেব শরীরম্, নান্যৎ; পৃথিবীদেবতায়া যৎ শরীরম্, তদেব শরীরং যস্য। শরীরগ্রহণং চোপলক্ষণার্থম্; করণঞ্চ পৃথিব্যাস্তস্য; স্বকৰ্ম্মপ্রযুক্তং হি কার্য্যৎ করণঞ্চ পৃথিবীদেবতায়াঃ; তদস্য স্বকর্মাভাবাদন্তর্যামিণো নিত্যমুক্তত্বাৎ পরার্থকর্তব্যতা- স্বভাবত্বাৎ পরস্য যৎ কাৰ্য্যং করণঞ্চ, তদেবাস্য, ন স্বতঃ: তদাহ—যস্য পৃথিবী শরীরমিতি। দেবতাকার্য্য-করণস্য ঈশ্বরসাক্ষিমাত্রসান্নিধ্যেন হি নিয়মেন প্রবৃত্তি- নিবৃত্তী স্যাতাম্; য ঈদৃগীশ্বরো নারায়ণাখ্যঃ পৃথিবীং পৃথিবীদেবতাং যময়তি নিয়ময়তি স্বব্যাপারে অন্তরঃ অভ্যন্তরস্তিষ্ঠন্, এষ তে আত্মা—তে তব, মম চ, সর্ব্ব- ভূতানাং চেত্যুপলক্ষণার্থমেতৎ; অন্তর্যামী, বস্তুয়া পৃষ্টঃ, অমৃতঃ সর্ব্বসংসারধৰ্ম্মবজ্জিত ইত্যেতৎ ॥১৭৪৷৷৩৷৷

টাকা। নিয়ন্তরীশ্বরস্ত লৌকিকনিয়স্ত বৎ কায্যকরণবস্তুমাশঙ্ক্যাহ-যস্ত চেতি। পৃথিব্যাঃ শরীরত্বমেব, ন তু শরীরবত্ত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-পৃথিবীতি। পৃথিব্যা যৎ করণ’, তদেব তস্য করণং চেতি যোজনা। কথঃ পৃথিব্যাঃ শরীরেন্দ্রিয়বত্বং, তদাহ-স্বকন্মে‘ত। অন্তয্যামিণোহপি তথা কি: ন স্যাৎ, তত্রাহ-তদস্তেতি। অস্তান্তয্যামিণস্তদেব কায্য করণ’ চ নান্যদিতাত্র হেতুমাহ-স্বকর্ম্মেতি। তদেব হেত্বন্তরেণ ক্ষোরয়তি-পরার্থেতি। যঃ পৃথিবামিত্যাদি বাক্যস্য তাৎপয্যমাহ-দেবতেতি। তত্র বাক্যমবতায্য ব্যাচষ্টে-অ জদৃগিতি। নিয়মাপৃথিবীদেবতা- কাৰ্য্যকরণাভ্যামেব কায্যকরণবস্তুমীদৃশত্বম্ ॥ ১৭৪ ॥ ৩॥

ভাষ্যানুবাদ।-যিনি পৃথিবীতে অবস্থিত আছেন, তিনিই অন্তর্যামী। ভাল, সকল লোকইত পৃথিবীতে অবস্থান করিতেছে; সুতরাং সকলেই অন্তর্যামী বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে; তন্নিবৃত্ত্যর্থ বিশেষ করিয়া বলিতেছেন-পৃথি- বীর অন্তর অর্থাৎ অভ্যন্তরস্থ। তথাপি পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অন্তর্যামী হইতে পারে; এইজন্য বলিতেছেন-পৃথিবীদেবতাও যাহাকে-যে অন্তর্যামীকে জানে না, অর্থাৎ আমার অভ্যন্তরে যে, ঐরূপ অন্য কেহ রহিয়াছে, ইহা বুঝিতে পারে না। পৃথিবী যাহার শরীর-পৃথিবীই যাহার শরীর, যাহার তদতিরিক্ত শরীর নাই, অর্থাৎ পৃথিবী দেবতার যাহা শরীর, তাহাই যাহার শরীর। শরীর শব্দটি এখানে অন্যান্য করণবর্গেরও উপলক্ষণার্থ প্রযুক্ত হইয়াছে; বুঝিতে হইবে যে, পৃথিবীর ইন্দ্রিয়াদি করণসমুহই তাহার করণ; বিশেষ এই যে, পৃথিবী দেবতার দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি সমস্তই তাহার প্রাক্তন কর্মফলে লব্ধ, কিন্তু নিত্যমুক্ত

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৫৯

অন্তর্যামী পুরুষের প্রাক্তন কর্ম না থাকায় এবং পরার্থপরতাই তাহার স্বাভাবিক ‘ধর্ম বলিয়া, পরের যাহা দেহ ও ইন্দ্রিয়, তাহাই তাহার দেহ ও ইন্দ্রিয়, কিন্তু নিজস্ব কিছুই নাই; এই অভিপ্রায়ই ‘পৃথিবী যাহার শরীর’ কথায় ব্যক্ত করা হইয়াছে। দেবতার যে, শরীর ও ইন্দ্রিয়বর্গ, সাক্ষিস্বরূপ ঈশ্বর-সান্নিধ্যই সে সমুদায়ের প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি ঘটাইয়া থাকে; ঈদৃশ শক্তিসম্পন্ন, নারায়ণনামক যে ঈশ্বর পৃথিবীকে—পৃথিবীর দেবতাকে অন্তরে থাকিয়া যথানিয়মে কর্তব্যবিষয়ে নিয়মিত বা পরিচালিত করিতেছেন; ‘তিনি তোমার আত্মা’, এই কথাটি উপলক্ষণ মাত্র—বুঝিতে হইবে, তিনি তোমার, আমার এবং সর্ব্বভূতের আত্মা। তিনিই তোমার জিজ্ঞাসিত অন্তর্যামী অমৃত অর্থাৎ জরামরণাদি সর্ব্বপ্রকার সংসারধৰ্ম্ম- বর্জিত ॥১৭৪৷৷৩৷৷

যোহপ্সু তিষ্ঠন্নদ্যোহন্তরো যমাপো ন বিদুর্যস্যাপঃ শরীরং যোহপোহন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যামমৃতঃ ॥ ১৭৫ ॥ ৪ ॥

সরলার্থঃ।—[যাজ্ঞবল্ক্যঃ পুনরাহ—] যঃ অপ্সু(জলেষু) তিষ্ঠন্, অন্ত্যঃ অন্তরঃ; আপঃ(অব্দেবতাঃ) যং ন বিদুঃ; আপঃ যস্য শরীরম্; যঃ অন্তরঃ (অভ্যন্তরস্থঃ সন্) অপঃ(জলানি) যময়তি(স্বকার্য্যে পরিচালয়তি), এষঃ তে (তব, সর্ব্বেষাং চ) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা,[ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥১৭৫৷৷৪৷৷

মূলানুবাদ।—যিনি জলে আছেন, জল হইতে পৃথক্; জল- দেবতা যাহাকে জানে না; জল যাহার শরীর এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া জলকে নিজ কর্তব্যবিষয়ে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার এবং সকলের অন্তর্যামী অমৃত আত্মা ॥ ১৭৫ ॥ ৪ ॥

যোহগৌ তিষ্ঠন্নগ্নেরন্তরো যমগ্নিন বেদ যস্যাগ্নিঃ শরীরং যোহগ্নিমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৭৬ ॥ ৫ ॥

সন্নলার্থঃ।—যঃ অগ্নৌ তিষ্ঠন্, অগ্নেঃ অন্তরঃ অগ্নিঃ(অগ্নিদেবতা) যৎ ন বেদ, অগ্নিঃ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ অগ্নিং যময়তি, এষঃ তে[অন্যেষাৎ চ] অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৭৬৷৷৫৷৷

মূলানুবাদ?—যিনি অগ্নিতে আছেন; অগ্নির অভ্যন্তরস্থ; অগ্নিদেবতা যাহাকে জানে না; যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া অগ্নিকে যথানিয়মে পরিচালিত করেন, তিনিই তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা ॥ ১৭৬ ॥ ৫ ॥

৮৬০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যোহন্তরিক্ষে তিষ্ঠন্নরিক্ষাদন্তরো যমন্তরিক্ষং ন বেদ যস্যান্তরিক্ষংশীরং যোহন্তরিক্ষমন্তরো যময়ত্যেষ ত- আত্মান্তর্য্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৭৭ ॥ ৬ ॥

সরলার্থঃ।—যঃ অন্তরিক্ষে তিষ্ঠন্, অন্তরিক্ষাৎ(আকাশাৎ) অন্তরঃ(অভ্য- ন্তরঃ); অন্তরিক্ষং(অন্তরিক্ষদেবতা) যং ন বেদ; অন্তরিক্ষং যস্য শরীরম্; যঃ অন্তরঃ (অভ্যন্তরস্থঃ সন্) অন্তরিক্ষং যময়তি; এষঃ তে অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৭৭৷৷৬৷৷

মূলাসুবাক?—যিনি অন্তরিক্ষে আছেন, অন্তরিক্ষের অভ্যন্তরস্থ; অন্তরিক্ষ-দেবতা যাহাকে জানে না; অন্তরিক্ষই যাহার শরীর, এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া অন্তরিক্ষকে নিয়মিত করেন, তিনিই তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা ॥ ১৭৭ ॥ ৬ ॥

যো বায়ৌ তিষ্ঠন্ বায়োরন্তরো যং বায়ুন বেদ, যস্য বায়ুঃ শরীরং যো বায়ুমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্য্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৭৮॥৭॥

সন্নলার্থঃ।—যঃ বায়ৌ তিষ্ঠন্, বায়োঃ অন্তরঃ, বায়ুঃ(বায়ুদেবতা) যৎ ন বেদ; বায়ুঃ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ বায়ুৎ যময়তি; এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৭৮॥৭॥

মূলানুবাদ?—যিনি বায়ুতে আছেন, বায়ুর অভ্যন্তর, বায়ু যাহাকে জানে না; বায়ু যাহার শরীর এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া বায়ুকে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা ॥ ১৭৮ ॥ ৭ ॥

যো দিবি তিষ্ঠন্ দিবোহন্তরো যং দ্যোন বেদ, যস্য দ্যৌঃ শরীরং, যো দিবমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্য- মৃতঃ ॥ ১৭৯ ॥৮॥

সরলার্থঃ।—যঃ দিবি(দ্যুলোকে) তিষ্ঠন্, দিবঃ অন্তরঃ, দ্যৌঃ(দ্যুলোক- দেবতা) যং ন বেদ; দ্যৌঃ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ দিবৎ যময়তি, এষ তে (তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৭৯৷৷৮৷৷

মূলানুবাদ।—যিনি দ্যুলোকে অবস্থিত এবং দ্যুলোকের’ মধ্যে বর্তমান, দ্যুলোক যাহাকে জানে না, দ্যুলোক যাহার শরীর এবং

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমং ব্রাহ্মণম্।

৮৬১

যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া দ্যুলোককে স্বকার্য্যে নিয়োজিত করেন, তিনিই তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা ॥ ১৭৯ ॥ ৮ ॥

য আদিত্যে তিষ্ঠন্নাদিত্যাদন্তরো যমাদিত্যো ন বেদ, যস্যাদিত্যঃ শরীরং, য আদিত্যমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যা- ম্যমৃতঃ ॥ ১৮০ ॥ ৯ ॥

সরমলার্থঃ।—যঃ আদিত্যে তিষ্ঠন্ আদিত্যাৎ অন্তরঃ, আদিত্যঃ যৎ (অন্তর্য্যামিণং) ন বেদ, আদিত্যঃ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ আদিত্যং যময়তি,- এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৮০৷৷৯৷৷

মূলানুবাদঃ—যিনি আদিত্যমণ্ডলে আছেন, আদিত্যমণ্ডল হইতেও অভ্যন্তর, আদিত্য যাহাকে জানে না, এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া আদিত্যকে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা ॥ ১০০ ॥ ৯ ॥

যো দিক্ষু তিষ্ঠন্ দিগ্ভ্যোহন্তরো যং দিশো ন বিদুর্যস্য দিশঃ শরীরং যো দিশোহন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তরা- ম্যমৃতঃ ॥ ১৮১ ॥ ১০ ॥

সন্নলার্থঃ।—যঃ ‘দক্ষু(পূর্ব্বাদি’দঙ্কমণ্ডলে) তিষ্ঠন্, দিগ্ভ্যঃ অন্তরঃ, দিশঃ যং ন বিদুঃ, দিশঃ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ দিশঃ যময়তি, এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৮১৷৷১০৷৷

মূলানুবাদ?—যিনি দিক্সমূহে অবস্থিত এবং দিক্সমূহ হইতে অভ্যন্তর, দিক্সমূহ যাহাকে জানে না, দিক্সমূহই যাহার শরীর, যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া দিক্সমূহকে নিয়মিতভাবে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা ॥ ১৮১ ॥ ১০ ॥

যশ্চন্দ্রতারকে তিষ্ঠশ্চন্দ্রতারকাদন্তরো যং চন্দ্রতারকং ন বেদ, যস্য চন্দ্রতারকং শরীরং, যশ্চন্দ্রতারকমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৮২ ॥ ১১ ॥

সরমার্থঃ।—যঃ চন্দ্র-তারকে(চন্দ্রে তারকামণ্ডলে চ) তিষ্ঠন্, চন্দ্রতারকাৎ অন্তরঃ, চন্দ্র-তারকং যং ন বেদ, চন্দ্র-তারকং যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ চন্দ্রতারকং যময়তি, এষ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৮২৷৷১১৷৷

৮৬২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মূলানুবাদ:-যিনি চন্দ্রে ও তারকামণ্ডলে অবস্থিত এবং চন্দ্র ও তারকামণ্ডল হইতে অন্তর; চন্দ্র ও তারকামণ্ডল যাহাকে জানে না, অথচ চন্দ্র ও তারকামণ্ডলই যাহার শরীর এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া চন্দ্র ও তারকামণ্ডলকে যথানিয়মে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী মরণরহিত আত্মা ॥ ১৮২ ॥ ১১ ॥

য আকাশে তিষ্ঠন্নাকাশাদন্তরো যমাকাশো ন বেদ, যস্যাকাশঃ শরীরং, য আকাশমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্য- মৃতঃ ॥ ১৮৩ ॥ ১২ ॥

সরলার্থঃ।—যঃ আকাশে তিষ্ঠন্, আকাশাৎ অন্তরঃ, আকাশঃ(আকাশ- দেবতা) যং ন বেদ; আকাশঃ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ আকাশং যময়তি, এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৮৩৷৷১২৷৷

মূলানুবাদ।—যিনি আকাশে অবস্থিত, আকাশ হইতে অন্তর, আকাশ যাহাকে জানে না, অথচ আকাশই যাহার শরীর এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া আকাশকে নিয়মিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা ॥ ১৮৩॥ ১২॥

যস্তমসি তিষ্ঠন্তমসোহন্তরো যং তমো ন বেদ, যস্য তমঃ শরীরং, যস্তমোহন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৮৪ ॥ ১৩ ॥

সরলার্থঃ।—যঃ তমসি(অন্ধকারে) তিষ্ঠন্, তমসঃ অন্তরঃ, তমঃ যং ন বেদ, তমঃ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ তমঃ নিয়ময়তি, এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৮৪৷৷১৩৷৷

মূলানুবাদ?—যিনি অন্ধকারে অবস্থিত, অন্ধকার হইতে অন্তর, অন্ধকার যাহার শরীর এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া অন্ধকারকে স্বকার্য্যে নিয়োজিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী মরণরহিত আত্মা ॥ ১৮৪ ॥ ১৩ ॥

যস্তেজসি তিষ্ঠন্তেজসোহন্তরো যং তেজো ন বেদ, যস্য তেজঃ শরীরং যস্তেজোহন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃত ইত্যধিদৈবতম্, অথাধিভূতম্ ॥ ১৮৫ ॥ ১৪ ॥

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমং ব্রাহ্মণম্।

৮৬৩

সরলার্থঃ।—যঃ তেজসি(প্রকাশে) তিষ্ঠন্, তেজসঃ অন্তরঃ, তেজঃ যৎ ন বেদ, তেজঃ যস্য শরীরং, যঃ অন্তরঃ সন্ তেজঃ যময়তি, এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা; ইতি(এতৎপর্য্যন্তম্) অধিদৈবতং(দেবতামধিকৃত্য প্রবৃত্তম্)। অথ(অনন্তরং) অধিভূতং(ভূতানি অধিকৃত্য)[উচ্যতে]—॥১৮৫৷১৪৷

মূলানুবাদ?—যিনি তেজেতে আছেন, তেজঃ হইতে অন্তর, তেজঃ যাহাকে জানে না, তেজঃ যাহার শরীর, যিনি তেজের মধ্যে থাকিয়া তেজকে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা; এই পর্য্যন্ত দেবতাধিকারের কথা; অতঃপর ভূত সম্বন্ধে কথা বলা হইতেছে ॥ ১৮৫ ॥ ১৪ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।—সমানমন্যৎ। যঃ অপ্স, তিষ্ঠন্, অগ্নাবন্তরিক্ষে বায়ৌ দিবি আদিত্যে দিক্ষু চন্দ্রতারকে আকাশে, যস্তমসি আবরণাত্মকে বাহ্যে তমসি, তেজসি তদ্বিপরীতে প্রকাশসামান্যে, ইত্যেবমধিদৈবতম্ অন্তর্য্যামিবিষয়ং দর্শনং দেবতাসু। অথাধিভূতং—ভূতেষু ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তেষু অন্তর্যামিদর্শনমধিভূতম্ ॥ ১৭৫—১৮৫ ৷ ৪—১৪ ॥

টীকা। পৃথিবীপর্য্যায়ে দর্শিতং ন্যায়ং পর্যায়ান্তরেধতিদিশতি—সমানমিতি ॥ ১৭৫— ১৮৫ ॥ ৪—১৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।—[চতুর্থ হইতে চতুৰ্দ্দশ শ্রুতির অন্যান্য অংশের ব্যাখ্যা] তৎপূর্ব্ব পূর্ব্ব শ্রুতির ব্যাখ্যার অনুরূপ। যিনি জলে, অগ্নিতে, অন্তরিক্ষে, বায়ুতে, দ্যুলোকে, আদিত্যে, চতুর্দিকে, চন্দ্র ও তারকামণ্ডলে এবং আকাশে[অবস্থিত— ইত্যাদি]। যিনি তমে—আবরণস্বভাব বাহ্য অন্ধকারে, তেজে অর্থাৎ সমস্ত প্রকাশময় বস্তুতে(সাধারণতঃ বিদ্যমান), এবংবিধ অন্তর্যামিবিষয়ে অধিদৈবত অর্থাৎ দেবতাবিষয়ক বিজ্ঞান কথিত হইল; অতঃপর অধিভূত অর্থাৎ ব্রহ্মাদি স্থাবরান্ত ভূতবিষয়ে অন্তর্যামি-বিজ্ঞান[অভিহিত হইতেছে—] ১৭৫—১৮৫॥৪—১৪৷৷

যঃ সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্ সর্ব্বেভ্যো ভূতেভ্যোহন্তরো যৎ সর্ব্বাণি ভূতানি ন বিদুর্যস্য সর্ব্বাণি ভূতানি শরীরং যঃ সর্ব্বাণি ভূতান্যন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃত ইত্যধিভূতম্; অথাধ্যাত্মম্ ॥ ১৮৬ ॥ ১৫ ॥

গবর্নমেন্ট।—যঃ সর্ব্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্, সর্ব্বেভ্যঃ ভূতেভ্যঃ অন্তরঃ, সর্ব্বাণি,

৮৬৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ভূতানি যং ন বিদুঃ, সর্ব্বাণি ভূতানি যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ সর্ব্বাণি ভূতানি যময়তি; এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা, ইতি(এতৎপর্য্যন্তং) অধি- ভূতম্; অথ(অতঃপরম্) অধ্যাত্মম্(উচ্যতে) ॥১৮৬৷১৫৷

মূলানুবাদঃ—যিনি সমস্ত ভূতে আছেন, সমস্ত ভূতের অভ্যন্তর, সমস্ত ভূত যাহাকে জানে না; সমস্ত ভূত যাহার শরীর, এবং যিনি সমস্ত ভূতের অভ্যন্তরে থাকিয়া সমস্ত ভূতকে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা; এই পর্য্যন্ত অধিভূত অর্থাৎ ভূতাধিকারের কথা; অতঃপর আত্মাধিকারের কথা বলা হইতেছে ॥ ১৮৬ ॥ ১৫ ॥

যঃ প্রাণে তিষ্ঠন্ প্রাণাদন্তরো যং প্রাণো ন বেদ, যস্য প্রাণঃ শরীরং, যঃ প্রাণমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্য- মৃতঃ ॥ ১৮৭ ॥ ১৬ ॥

সন্নলার্থঃ।-যঃ প্রাণে(পঞ্চবৃত্ত্যাত্মকে) তিষ্ঠন্ প্রাণাৎ অন্তরঃ, প্রাণঃ যং ন বেদ; প্রাণঃ যস্য শরীরম্; যঃ অন্তরঃ সন্ প্রাণং যমতি, এবঃ তে অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা।[ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥১৮৭৷৷১৬৷৷

মূলাসুবাদ।—যিনি প্রাণে আছেন, প্রাণের অভ্যন্তর, প্রাণ যাহাকে জানে না, প্রাণই যাহার শরীর, এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া প্রাণকে স্বকার্য্যে পরিচালিত করেন, তিনিই তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা ॥ ১৮৭ ॥ ১৬ ॥

যো বাচি তিষ্ঠন্ বাচোহন্তরো যং বাঙ্ন বেদ, যস্য বাক্ শরীরং যো বাচমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৮৮ ॥ ১৭ ॥

সরলার্থঃ।—যঃ বাচি তিষ্ঠন্, বাচঃ অন্তরঃ, বাক্ যং ন বেদ, বাক্ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ বাচৎ যময়তি; এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৮৮॥১৭৷৷

মূলানুবাদ।—যিনি বাগিন্দ্রিয়ে আছেন, অথচ বাকের অন্তর; বাক্ যাহাকে জানে না; বাকই যাহার শরীর এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া বাকের সংযমন করিয়া থাকেন; তিনিই তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা॥ ১৮৮॥ ১৭॥

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমং ব্রাহ্মণম্।

বউ

যশ্চক্ষুষি তিষ্ঠংশ্চক্ষুষোহন্তরো যং চক্ষুন বেদ যস্য চক্ষুঃ শরীরং যশ্চক্ষুরন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৮৯৷ ১৮৷

সন্নলার্থঃ।—যঃ চক্ষুষি তিষ্ঠন্, চক্ষুষঃ অন্তরঃ, চক্ষুঃ যৎ ন বেদ; চক্ষুঃ যস্য শরীরম্, যঃ অন্তরঃ সন্ চক্ষুঃ যময়তি, এষঃ তে(তব) অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৮৯৷৷১৮৷৷

মূলানুবাদ?—যিনি চক্ষুতে আছেন, চক্ষু হইতেও অভ্যন্তর; চক্ষু যাহাকে জানে না, চক্ষু যাহার শরীর, এবং যিনি অন্তরে থাকিয়া চক্ষুকে নিয়মিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা ॥ ১৮৯ ॥ ১৮ ॥

যঃ শ্রোত্রে তিষ্ঠন্ শ্রোত্রাদন্তরো যৎ শ্রোত্রং ন বেদ যস্য শ্রোত্রং শরীরং যঃ শ্রোত্রমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্য- মৃতঃ ॥ ১৯০ ॥ ১৯ ॥

সরলার্থঃ।—যঃ শ্রোত্রে তিষ্ঠন্ শ্রোত্রাৎ অন্তবঃ, শ্রোত্রং(কর্তৃ) যৎ ন বেদ, শ্রোত্রং যস্য শরীরম্; যঃ অন্তরঃ(সন্) শ্রোত্রং যময়তি, এষঃ তে অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৯০৷৷১৯৷৷

মূলানুবাদঃ—যিনি শ্রবণেন্দ্রিয়ে আছেন, অথচ শ্রবণেন্দ্রিয়ের অন্তর, শ্রবণেন্দ্রিয় যাহাকে জানে না, শ্রবণেন্দ্রিয় যাহার শরীর, এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া শ্রবণেন্দ্রিয়কে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা ॥ ১৯০ ॥ ১৯ ॥

যো মনসি তিষ্ঠন্মনসোহন্তরো যং মনো ন বেদ যস্য মনঃ শরীরং যো মনোহন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্য- মৃতঃ ॥ ১৯১ ॥ ২০ ॥

সরলার্থঃ।—যঃ মনসি তিষ্ঠন্, মনসঃ অন্তরঃ, মনঃ যং ন বেদ, মনঃ যস্য শরীরম্; যঃ অন্তরঃ(সন্) মনঃ যময়তি, এষঃ তে অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৯১৷২০৷৷

মূলানুবাদ?—যিনি মনে আছেন, অথচ মনের অন্তর, মন যাহাকে জানে না, মন যাহার শরীর, এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া মনকে নিয়মিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা ॥ ১৯১॥২০॥

৮৬৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যস্তুচি তিষ্ঠন্ত্বচোহন্তরো যং ত্বঙ্ ন বেদ যস্য ত্বক্ শরীরং যস্তুচমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৯২ ॥ ২১ ॥

সন্মলার্থঃ।—যঃ ত্বচি(ত্বগিন্দ্রিয়ে) তিষ্ঠন্ ত্বচঃ অন্তরঃ, ত্বক্ যৎ ন বেদ, ত্বক্ যস্য শরীরম্; যঃ অন্তরঃ সন্ ত্বচৎ যময়তি, এষঃ তে অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৯২৷৷২১৷৷

মূলানুবাদ।—যিনি ত্বগিন্দ্রিয়ে আছেন, অথচ ত্বগিন্দ্রিয়ের অভ্যন্তরস্থ, ত্বগিন্দ্রিয় যাহাকে জানে না, ত্বগিন্দ্রিয় যাহার শরীর, এবং যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া ত্বগিন্দ্রিয়কে যথানিয়মে প্রেরণ করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা ॥ ১৯২ ॥ ২১ ॥

যো বিজ্ঞানে তিষ্ঠন্ বিজ্ঞানাদন্তরো যং বিজ্ঞানং ন বেদ যস্য বিজ্ঞানং শরীরং যো বিজ্ঞানমন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্য্যাম্যমৃতঃ ॥ ১৯৩ ॥ ২২ ॥

সরলার্থঃ।—যঃ বিজ্ঞানে(বুদ্ধৌ) তিষ্ঠন্ বিজ্ঞানাৎ(বুদ্ধেঃ) অন্তরঃ, বিজ্ঞানং যং ন বেদ, বিজ্ঞানং যস্য শরীরম্; যঃ অন্তরঃ(সন্) বিজ্ঞানং যময়তি, এষঃ তে অন্তর্যামী অমৃতঃ আত্মা ॥১৯৩৷৷২২৷৷

মূলানুবাদ।—যিনি বুদ্ধিতে অবস্থিত থাকিয়া বুদ্ধি হইতে পৃথক্, বুদ্ধি যাহাকে জানে না, বুদ্ধি যাহার শরীর, এবং যিনি অন্তরে থাকিয়া বুদ্ধির প্রেরণা করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা ॥ ১৯৩॥ ২২॥

যো রেতসি তিষ্ঠন্ রেতসোহন্তরো যৎ রেতো ন বেদ যস্য রেতঃ শরীরং যো রেতোহন্তরো যময়ত্যেষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃতোহ- দৃষ্টো দ্রষ্টাহশ্রুতঃ শ্রোতাহমতো মন্তাহবিজ্ঞাতো বিজ্ঞাতা, নান্যোহতোহস্তি দ্রষ্টা নান্যোহতোহস্তি শ্রোতা নান্যোহতোহস্তি মন্তা নান্যোহতোহস্তি বিজ্ঞাতা, এষ ত আত্মান্তর্যাম্যমৃতোহ- ন্যদার্ত্ম; ততো হোদ্দালক আরুণিরুপররাম ॥ ১৯৪ ॥ ২৩ ॥ ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি তৃতীয়াধ্যায়ে সপ্তমং ব্রাহ্মণম্ ॥ ৩॥৭॥

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমং ব্রাহ্মণম্।

৮৬৭

সরলার্থঃ।—যঃ রেতসি(প্রজননশক্তৌ) তিষ্ঠন্ রেতসঃ অন্তরঃ, রেতঃ য়ং ন বেদ, রেতঃ যস্য শরীরম্; যঃ অন্তরঃ(সন্) রেতঃ যময়তি, এষঃ তে অন্ত- র্যামী অমৃতঃ আত্মা—অদৃষ্টঃ(দর্শনাগোচরঃ সন্) দ্রষ্টা, অশ্রুতঃ(শ্রবণেন্দ্রিয়া- গ্রাহ্যঃ সন্) শ্রোতা(শব্দানুভবসমর্থঃ), অমতঃ(মননাবিষয়ঃ সন্) মন্তা(মনো- বৃত্তিপ্রকাশকঃ), অবিজ্ঞাতঃ(বুদ্ধেরগম্যঃ সন্) বিজ্ঞাতা(বুদ্ধিবিজ্ঞানপ্রকাশকঃ) অতঃ(অস্মাৎ অন্তর্যামিণঃ) অন্যঃ দ্রষ্টা(চক্ষুরিন্দ্রিয়দ্বারকজ্ঞানকর্তা) ন অস্তি; এবং অতঃ অন্যঃ শ্রোতা ন অস্তি; অতঃ অন্যঃ মন্তা(মননকর্তা) ন অস্তি; অতঃ অন্যঃ বিজ্ঞাতা(বুদ্ধেঃ প্রকাশকঃ) ন অস্তি।[হে উদ্দালক] এষঃ(দ্রষ্টৃত্বাদি- লক্ষণঃ) তে(তব—মম অন্যেষাং চ) অন্তর্যামী অমৃতঃ(অবিনাশী) আত্মা; অতঃ(অস্মাৎ অন্তর্যামিণঃ) অন্যৎ(সর্ব্বং বস্তু) আর্ত্তং(বিনাশি)। ততঃ (যাজ্ঞবল্ক্যস্যোত্তরশ্রবণানন্তরং) আরুণিঃ উদ্দালকঃ উপররাম ॥১৯৪৷৷২৩৷৷

মূলানুবাদ?—যিনি রেতে(শুক্রে) অর্থাৎ উৎপাদনশক্তিতে আছেন, অথচ রেতের অন্তর, রেতঃ যাহাকে জানে না, রেত যাহার শরীর, যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া রেতের সংযমন করিয়া থাকেন; তিনি তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা। যিনি নিজে দর্শনগোচর হন না, অথচ সকলের দ্রষ্টা, নিজে শ্রবণেন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য, অথচ সকলের শ্রোতা; নিজে মননের (মনোবৃত্তির) অবিষয়, অথচ মননকর্তা; এবং বুদ্ধিবৃত্তির অগম্য, অথচ বিজ্ঞাতা; ইহার অতিরিক্ত মন্তা নাই, এবং ইহার অতিরিক্ত বিজ্ঞাতা নাই, ইনিই তোমার—কেবল তোমার নহে, সকলেরই অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা; এতদতিরিক্ত যাহা কিছু, সমস্তই আর্ত্ত—বিনাশশীল। ইহার পর অরুণনন্দন উদ্দালক প্রশ্ন হইতে বিরত হইলেন ॥ ১৯৪ ॥ ২৩ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—অথাধ্যাত্মম্—যঃ প্রাণে প্রাণবায়ুসহিতে ঘ্রাণে, যো বাচি, চক্ষুষি, শ্রোত্রে, মনসি, ত্বচি, বিজ্ঞানে বুদ্ধৌ, রেতসি প্রজননে। কস্মাৎ পুনঃ কারণাৎ পৃথিব্যাদিদেবতা মহাভাগাঃ সত্যঃ মনুষ্যাদিবৎ আত্মনি তিষ্ঠন্ত- মাত্মনো নিয়ন্তারমন্ত্যামিণং ন বিদুঃ? ইত্যত আহ—১

অদৃষ্টঃ-ন দৃষ্টঃ ন বিষয়ীভূতশ্চক্ষুর্দর্শনস্য কস্যচিৎ, স্বয়ন্তু চক্ষুষি সন্নিহিতত্বাৎ দৃশিস্বরূপঃ-ইতি দ্রষ্টা। তথা অশ্রুতঃ শ্রোত্রগোচরত্বমনাপন্নঃ কস্যচিৎ, স্বয়ন্তু অলুপ্তশ্রবণশক্তিঃ, সর্ব্বশ্রোত্রেযু সন্নিহিতত্বাৎ শ্রোতা; তথা অমতঃ মনঃসঙ্কল্প- বিষয়তামনাপন্নঃ; দৃষ্ট-শ্রুতে এব হি সর্ব্বঃ সঙ্কল্পয়তি; অদৃষ্টত্বাদশ্রুতত্বাদেব

৮৬৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অমতঃ; অলুপ্তমননশক্তিত্বাৎ সর্ব্বমনঃসু সন্নিহিতত্বাচ্চ মন্তা; তথা অবিজ্ঞাতঃ নিশ্চয়গোচরতামনাপন্নঃ রূপাদিবৎ সুখাদিবদ্বা, স্বয়ন্ত অলুপ্তবিজ্ঞানশক্তিত্বাৎ সান্নিধ্যাচ্চ বিজ্ঞাতা। তত্র যং পৃথিবী ন বেদ, যৎ সর্ব্বাণি ভূতানি ন বিদুরিতি চ-অন্যে নিয়স্তব্যা বিজ্ঞাতারঃ, অন্যো নিয়ন্তা অন্তর্যামীতি প্রাপ্তম্; তদন্যত্বাশঙ্কা- নিবৃত্ত্যর্থমুচ্যতে-নান্যোহতঃ-ন অন্তঃ, অতঃ অস্মাদন্তর্যামিণঃ, নান্যোহস্তি দ্রষ্টা; তথা নান্যোহতোহস্তি শ্রোতা; নান্যোহতোহস্তি মন্তা; নান্যোহতোহস্তি বিজ্ঞাতা। যস্মাৎ পরো নাস্তি দ্রষ্টা শ্রোতা মন্তা বিজ্ঞাতা, যঃ অদৃষ্টঃ দ্রষ্টা, অশ্রুতঃ শ্রোতা, অমতঃ মন্তা, অবিজ্ঞাতঃ বিজ্ঞাতা, অমৃতঃ সর্বসংসারধর্মবর্জিতঃ সর্ব্ব- সংসারিণাৎ কৰ্ম্মফলবিভাগকর্তা, এষঃ তে আত্মা অন্তর্যাম্যমৃতঃ; অস্মাদীশ্বরাদাত্মনঃ অদ্যৎ ‘আর্ত্তম্। ততো হ উদ্দালক আরুণিরুপররাম ॥১৮৬-১৯৪ ॥১৫-২৩৷৷

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ তৃতীয়োঽধ্যায়ে সপ্তমস্কন্ধঃ। ব্রহ্মভাষ্যম্ ॥৩॥

টীকা। সর্বত্র প্রাণাদৌ তিষ্ঠন্নন্তর্যামী তবাত্মেতি সম্বন্ধঃ। বাক্যান্তরং প্রশ্নপূর্ব্বকমুখাপ্য ব্যাচষ্টে—কস্মাদিত্যাদিনা। যথা মনসি, তথা বুদ্ধাবপি সন্নিধানাৎ জ্ঞাতৃতেতি যাবৎ। তত্রেতি পূর্ব্বসন্দর্ভোক্তিঃ। অন্যয়মুপলক্ষয়িতুমতো নান্য ইত্যুক্তম্। পদার্থান্ ব্যাকরোতি— অত ইতি। অন্যো দ্রষ্টা নাস্তীতি সম্বন্ধঃ। এষ ত ইত্যাদি বাক্যার্থমাহ—যস্মাদিত্যা- দিনা॥ ১৮৬—১৯৪॥ ১৫—২৩॥

ই ত বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ভাষ্যং তৃতীয়ধ্যায়ং সপ্তমস্কন্ধং। ॥৭॥

ভাষ্যানুবাদ?—অতঃপর অধ্যাত্ম(দেহ-সম্বন্ধী) অন্তর্যামীর কথা বলা হইতেছে। যিনি প্রাণে অর্থাৎ প্রাণসংযুক্ত ঘ্রাণেন্দ্রিয়, যিনি বাগিন্দ্রিয়ে, চক্ষুতে, শ্রবণেন্দ্রিয়, মনে, ত্বকে, বিজ্ঞানে—বুদ্ধিতে, রেতে অর্থাৎ প্রজননে— উৎপাদনশক্তিতে[বর্তমান]। ভাল কথা, পৃথিবীপ্রভৃতির অধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণ মহাভাগ্যবতী অর্থাৎ অলৌকিক মহিমান্বিত হইয়াও কি কারণে সাধারণ মনুষ্যাদির ন্যায় নিজের অভ্যন্তরে স্থিত নিজেরই পরিচালক অন্তর্যামীকে জানিতে পারে না? এইজন্য বলিতেছেন—। ১

[তিনি] অদৃষ্ট—দৃষ্ট নহেন অর্থাৎ কাহারই চাক্ষুষ দর্শনের বিষয়ীভূত হন না, কিন্তু নিজে স্বপ্রকাশস্বরূপে সর্ব্বদা চক্ষুতে বিদ্যমান থাকেন বলিয়া দ্রষ্টা; সেইরূপ, অশ্রুত অর্থাৎ কাহারই শ্রবণেন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত নহেন, অথচ তাঁহার নিজের শ্রবণশক্তি কখনও বিলুপ্ত হয় না; সকল শ্রবণেন্দ্রিয় তাঁহার সন্নিধান আছে বলিয়া তিনি শ্রোতা। এইরূপ তিনি মানসিক সংকল্প ও বিকল্পের বিষয়ী- ভূত নহেন; কারণ, যাহা চক্ষুঃ দ্বারা দৃষ্ট কিংবা শ্রবণ’ দ্বারা শ্রুত হয়, মনঃ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—সপ্তমং ব্রাহ্মণম্। ৮৬৯

তদ্বিষয়েই সংকল্প করিতে পারে, কিন্তু অন্তর্যামী যখন অদৃষ্ট এবং অশ্রুত, তখন তদ্বিষয়ে মনের সংকল্প করিবার ক্ষমতা নাই; কাজেই তিনি অমত; তাঁহার মনন- শক্তি কখনও বিলুপ্ত হয় না, এবং নিখিল মনেতেই তাঁহার নিত্য সন্নিধান রহি- য়াছে; এই কারণে তিনি মন্তা(মননকর্তা); সেইরূপ তিনি অবিজ্ঞাত, অর্থাৎ বাহ্য রূপরসাদির ন্যায় এবং আন্তর সুখ-দুঃখাদির ন্যায় নিশ্চয়াত্মক জ্ঞানের বিষয়ীভূত হন না, অথচ তাঁহার জ্ঞানশক্তি কখনও বিলুপ্ত না হওয়ায় এবং নিরন্তর বিজ্ঞান- ক্ষেত্র বুদ্ধিতে সন্নিহিত থাকায় তিনি নিজে বিজ্ঞাতা। এখানে পৃথিবী যাহাকে জানে না, এবং সমস্ত ভূত যাহাকে জানে না বলায় শঙ্কা হইতে পারে যে, পৃথিবী- দেবতাপ্রভৃতি যাহারা বিজ্ঞাতার নিয়ন্তব্য—সংযমনের যোগ্য, তাহারা অন্য, আর যিনি সে সমুদয়ের নিয়মনকারী অন্তর্যামী, তিনি অন্য; এইরূপ ভেদাশঙ্কা নিবারণের জন্য বলা হইতেছে যে, ‘নান্যোহতোহস্তি’ ইতি। ২

উক্ত অন্তর্যামীর অতিরিক্ত অন্য কোন দ্রষ্টা নাই, এবং ইহার অতিরিক্ত অপর শ্রোতাও নাই; ইহার অতিরিক্ত অপর কেহ মন্তা—মননকর্ত্তা নাই, এবং এত- দতিরিক্ত আর বিজ্ঞাতাও নাই। যাহার অতিরিক্ত দ্রষ্টা শ্রোতা মন্তা ও বিজ্ঞাতা নাই, যিনি স্বয়ং অপরের অদৃষ্ট অথচ দ্রষ্টা; অপরের অশ্রুত, অথচ শ্রোতা; অপরের অমত, অথচ মন্তা, এবং অন্যের অবিজ্ঞাত হইয়াও স্বয়ং বিজ্ঞাতা অর্থাৎ সাংসারিক সর্ব্বধর্ম্মবিবর্জ্জিত—সংসারিগণের কর্ম্মফল বিভাগ করিয়া দিতেছেন, তিনিই তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা। এই অন্তর্য্যামিসংজ্ঞক আত্মস্বরূপ ঈশ্বরের অতিরিক্ত সমস্ত বস্তুই আর্ত্ত(বিনাশশীল) একথার পর অরুণনন্দন—আরুণি উদ্দালক বিরত হইলেন ॥১৮৬—১৯৪৷৷১৫—২৩৷৷

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদে তৃতীয় অধ্যায়ে সপ্তম অন্তর্য্যামী ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুবাদ ॥৩॥৭॥

অষ্টমঃ ব্রাহ্মণম্।

আভাসভ্যম্যম্।—অতঃ পরম্ অণনায়াদিবিহীনং নিরুপাধিকং সাক্ষাদপরোক্ষাৎ সর্ব্বান্তরং ব্রহ্ম বক্তব্যমিত্যত আরম্ভঃ—

আভাস ভাষ্যের অনুবাদ।—অতঃপর অশনায়াদি সংসার-ধৰ্ম্ম- বজ্জিত নিরুপাধিক সাক্ষাৎ অপরোক্ষ(প্রত্যক্ষ চৈতন্যাত্মক) ব্রহ্মতত্ত্ব নিরূপণ করিতে হইবে; এইজন্য পরবর্তী প্রকরণ আরব্ধ হইতেছে—

অথ হ বাচরব্যুবাচ ব্রাহ্মণা ভগবন্তো হন্তাহমিমং দ্বৌ প্রশ্নৌ প্রক্ষ্যামি, তৌ চেন্মে বক্ষ্যতি, ন বৈ জাতু যুগ্মাকমিমং কশ্চিদ্ ব্রহ্মোদ্যং জেতেতি, পৃচ্ছ গাগীতি ॥ ১৯৫ ॥ ১ ॥

সম্বলার্থঃ।—[ইদানীং সর্ব্বোপাধিবজ্জিতং সাক্ষাদপরোক্ষাদ্ ব্রহ্মস্বরূপং নিরূপয়িতুং প্রকরণমারভ্যতে—‘অথ হ’ ইত্যাদি।]

অথ(অনন্তরম্)[পূর্ব্বং যাজ্ঞবল্ক্যেন বলান্নিবারিতা বাচরুবী গার্গী পুনরপি যাজ্ঞবল্ক্যৎ প্রষ্টুম্ ব্রাহ্মণানুজ্ঞাং প্রার্থয়মানা] উবাচ—ভোঃ ভগবন্তঃ(পূজনীয়াঃ) ব্রাহ্মণাঃ, হস্ত(অনুকম্পায়াম্) অহং ইমং(যাজ্ঞবল্ক্যং) দ্বৌ প্রশ্নৌ প্রক্ষ্যামি;[সঃ] তৌ(প্রশ্নৌ) চেৎ(যদি) বক্ষ্যতি(প্রশ্নোত্তরং কথয়িষ্যতি),[তহি] যুগ্মাকং মধ্যে কশ্চিৎ(কশ্চিদপি) জাতু(কদাচিদপি), ব্রহ্মোদ্যং(ব্রহ্মবাদিনৎ) ইমৎ (যাজ্ঞবল্ক্যং) ন বৈ(নৈব) জেতা(জেষ্যতি) ইতি।[এবমুক্তা ব্রাহ্মণা উচুঃ] হে গার্গি, পৃচ্ছ(প্রশ্নং কুরু) ইতি ॥১৯৫৷১৷

মূলানুবাদ।—এখন সর্ব্বোপাধিরহিত অপরোক্ষ ব্রহ্মস্বরূপ নিরূপণার্থ এই প্রকরণ আরব্ধ হইতেছে। ইতঃপূর্ব্বে যাজ্ঞবল্ক্য গার্গীকে মস্তক-পতনের ভয় প্রদর্শন করিয়া প্রশ্ন হইতে বিরত করিয়াছিলেন; [ সেই কারণে গার্গী এখন প্রথমতঃ ব্রাহ্মণগণকে সম্বোধন করিয়া প্রশ্নের অনুমতি প্রার্থনা করিতেছেন।]

✓ অতঃপর বাচকরবী(গার্গী) বলিলেন—হে পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ, [আপনারা অনুমতি করুন,] আমি যাজ্ঞবল্ক্যকে দুইটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব। যাজ্ঞবল্ক্য যদি আমার সেই প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর দিতে পারেন, তাহা

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রাহ্মণম্।

৮৭১

হইলে আপনাদের মধ্যে কেহ কখনও এই ব্রহ্মবাদী যাজ্ঞবল্ক্যকে পরাজিত করিতে পারিবেন না।[এই কথার পর ব্রাহ্মণগণ বলিলেন-] হে গার্গি, তুমি প্রশ্ন কর ৷ ১৯৫ ॥ ১॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—অথ হ বাচকব্যুবাচ। পূর্ব্বং যাজ্ঞবল্ক্যেন নিষিদ্ধা মূর্দ্ধপাতভয়াদুপরতা সতী পুনঃ প্রষ্টুং ব্রাহ্মণানুজ্ঞাৎ প্রার্থয়তে—হে ব্রাহ্মণাঃ ভগ- বন্তঃ পূজাবন্তঃ, শৃণুত মম বচঃ; হস্ত অহমিমং যাজ্ঞবল্ক্যং পুনদ্বৌ প্রশ্নৌ প্রক্ষ্যামি, যদ্যনুমতির্ভবতামস্তি; তৌ প্রশ্নৌ চেদ্ যদি বক্ষ্যতি কথয়িষ্যতি মে, কথঞ্চিৎ ন বৈ জাতু কদাচিৎ যুগ্মাকং মধ্যে ইমং যাজ্ঞবল্ক্যং কশ্চিদ ব্রহ্মোদ্যং ব্রহ্মবদনং প্রতি জেতা—ন বৈ কশ্চিৎ ভবেৎ—ইতি। এবমুক্তা ব্রাহ্মণা অনুজ্ঞাৎ প্রদদুঃ—পৃচ্ছ গার্গীতি ॥১৯৫৷৷১৷৷

টীকা। পূর্বস্মিন্ ব্রাহ্মণে সূত্রান্তর্য্যামিণৌ প্রশ্নপ্রত্যুক্তিভ্যাং নির্দ্ধারিতৌ, সম্প্রত্যুত্তরব্রাহ্মণ- তাৎপয্যমাহ—অতঃ পরমিতি। সোপাধিকবস্তুনির্ধারণানন্তযামথশব্দার্থঃ। ননু যস্মাদ ভয়াদগার্গী পূর্ব্বানুপরতা, তস্য তদবস্থত্বাৎ কথং পুনঃ সা প্রষ্টুং প্রবর্ত্ততে? তত্রাহ—পূর্ব্বমিতি। হন্তে- ত্যার্থমাহ—যদাতি। ন বৈ জাত্বিতি প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে—কদাচিদিত্যাদিনা। অন্বয়ং দশয়িত্বা কশ্চিতি পুনরুক্তিঃ ॥ ১৯৫ ॥ ১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।-অতঃপর বাচরুবী গার্গী জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি পূর্ব্বে যাজ্ঞবল্ক্যের নিষেধের পর, মস্তক পড়িবার ভয়ে প্রশ্ন হইতে বিরতা হইয়া- ছিলেন। সেই জন্য এখন পুনর্ব্বার প্রশ্ন করিবার অভিপ্রায়ে প্রথমে ব্রাহ্মণগণের অনুমতি প্রার্থনা করিয়া বলিতেছেন—হে পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ, আপনারা আমার কথা শ্রবণ করুন। যদি আপনাদের অনুমতি হয়, তাহা হইলে আমি এই যাজ্ঞ- বন্ধ্যকে দুইটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব; যাজ্ঞবল্ক্য যদি আমার সেই দুইটী প্রশ্নের উত্তর বলিতে পারেন, তাহা হইলে[বুঝিবেন যে,] আপনাদের মধ্যে এমন কেহ নাই, যিনি কখনও কোন প্রকারেও এই ব্রহ্মবাদী যাজ্ঞবল্ক্যকে জয় করিতে পারেন। গার্গী এই কথা বলিলে পর, ব্রাহ্মণগণ অনুজ্ঞা-প্রদানপূর্ব্বক বলিলেন—হে গার্গি, তুমি প্রশ্ন কর ॥১৯৫৷১৷৷

সা হোবাচাহং বৈ ত্বা যাজ্ঞবল্ক্য যথা কাশ্যো বা বৈদেহো বোগ্রপুত্র উজ্জ্যং ধনুরধিজ্যং কৃত্বা দ্বৌ বাণবন্তৌ সপত্নাতি- ব্যাধিনৌ হস্তে কৃত্বোপত্তিষ্ঠেদেবমেবাহং ত্বা দ্বাভ্যাং প্রশ্নাভ্যা- মুপোদস্থাং, তৌ মে ব্রূহীতি, পৃচ্ছ গার্গীতি ॥ ১৯৬॥ ২॥

৮৭২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সক্সলার্থঃ।—সা(ব্রাহ্মণেভ্য এবং লব্ধানুমতিঃ গার্গী) উবাচ হ—হে যাজ্ঞবল্ক্য, কাশ্যঃ(কাশিপ্রদেশীয়ঃ) বা, বৈদেহঃ(বিদেহজঃ) বা উগ্রপুত্রঃ(বীরঃ) যথা উজ্জ্যং(জ্যামুক্তং) ধনুঃ অধিজ্যং(সজ্যং) কৃত্বা সপত্নাতিব্যাধিনৌ(শত্রু- ঘাতিনৌ) দ্বৌ বাণবস্তৌ(ফলকসংযুক্তৌ শরৌ) হস্তে কৃত্বা উপোত্তিষ্ঠেৎ(শত্রুং প্রতি গচ্ছেৎ), এবম্ এব(তদ্বদেব) অহং দ্বাভ্যাং প্রশ্নাভ্যাং ত্বা(ত্বাৎ) উপোদস্থাৎ(উপস্থিতঃ ভবামি)। মে(মম) তৌ(প্রশ্নৌ) ব্রূহি(কথয়)। [এবমুক্তঃ যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হে গার্গি,[ত্বৎ] পৃচ্ছ(প্রশ্নং কুরু) ইতি ॥১৯৬৷৷২৷৷

মূলানুবাদ:-[ব্রাহ্মণগণের নিকট হইতে অনুমতি লাভ করিয়া] গার্গী বলিতে লাগিলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য, কাশীপ্রদেশীয় কিংবা বিদেহদেশীয় উগ্রপুত্র অর্থাৎ বীরসন্তান যেমন গুণমুক্ত ধনুকে গুণযুক্ত করিয়া শত্রুসংহারী ফলকাযুক্ত দুইটা বাণ হস্তে করিয়া[বিপক্ষের অভিমুখে] উপস্থিত হয়, তদ্রূপ আমিও দুইটী প্রশ্ন লইয়া তোমার সম্মুখে উপস্থিত হইতেছি; তুমি আমার সেই প্রশ্ন দুইটীর উত্তর বল। [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হে গার্গি, তুমি প্রশ্ন কর ॥ ১৯৬॥ ২॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—লব্ধানুজ্ঞা যাজ্ঞবল্ক্যম্ সা হ উবাচ—অহং বৈ ত্বা ত্বাং দ্বৌ প্রশ্নৌ—প্রক্ষ্যামীত্যনুষজ্যতে। কৌ তাবিতি জিজ্ঞাসায়াৎ তয়োদুর্রুত্তরত্বং দ্যোতয়িতুং দৃষ্টান্তপূর্ব্বকং তাবাহ—হে যাজ্ঞবল্ক্য, যথা লোকে কাশ্যঃ—কাশিষু ভবঃ কাশ্যঃ; প্রসিদ্ধং শৌর্য্যং কাশ্যে; বৈদেহো বা বিদেহানাং বা রাজা, উগ্রপুত্রঃ শূরান্বয়ঃ ইত্যর্থঃ। উজ্জ্যং অবতারিতজ্যাকং ধনুঃ পুনরধিজ্যম্ আরোপিতজ্যাকং কৃত্বা দ্বৌ বাণবস্তৌ—বাণশব্দেন শরাগ্রে যো বংশখণ্ডঃ সন্ধীয়তে, তেন বিনাপি শরো ভবতীত্যতো বিশিনষ্টি—বাণবস্তাবিতি। তৌ দ্বৌ বাণবস্তৌ শরৌ—তয়ো- রেব বিশেষণম্—সপত্নাতিব্যাধিনৌ শত্রোঃ পীড়াকরাবতিশয়েন, হস্তে কৃত্বা উপোত্তিষ্ঠেৎ—সমীপত আত্মানং দর্শয়েৎ, এবমেব অহং ত্বা ত্বাৎ শরস্থানীয়াভ্যাং প্রশ্নাভ্যাৎ দ্বাভ্যাম্ উপোদস্থাৎ উত্থিতবত্যস্মি ত্বৎসমীপে; তৌ মে ব্রূহীতি— ব্রহ্মবিৎ চেৎ। আহেতরঃ—পৃচ্ছ গার্গীতি ॥১৯৬৷৷২৷৷

টীকা। সন্ধীয়তে, স উচ্যত ইতি শেষঃ। প্রশ্নয়োরবশ্যপ্রত্যুত্তরণীয়ত্বে ব্রহ্মিষ্ঠদ্বাঙ্গীকারো হেতুরিত্যাহ—ব্রহ্মবিচ্চেদিতি ॥১৯৬৷২॥

ভাষ্যানুবাদ?—গার্গী ব্রাহ্মণগণের অনুমতি লাভ করিয়া সম্বোধনপূর্ব্বক যাজ্ঞবল্ক্যকে বলিলেন; হে যাজ্ঞবল্ক্য, আমি তোমাকে দুইটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৭৩

সেই প্রশ্ন দুইটা কি কি? এই আকাঙ্ক্ষায় তাহা নির্দেশ করিতেছেন এবং সেই প্রশ্ন দুইটা যে, দুরুত্তর(উহার উত্তর দেওয়া যে, কঠিন), তাহা বুঝাইবার জন্য দৃষ্টান্ত প্রদর্শনপূর্ব্বক সেই প্রশ্ন দুইটা বলিতেছেন।—হে যাজ্ঞবল্ক্য, জগতে কাশ্য— কাশিপ্রদেশজাত—কাশিপ্রদেশীয় লোকের বীরত্ব জগদ্বিখ্যাত; সেই কাশ্য কিংবা বৈদেহ—বিদেহাধিপতি উগ্রপুত্র—বীরসন্তান যেমন উজ্জ্য—যাহা হইতে গুণ খোলা হইয়াছে, এমন ধনুকে পুনর্ব্বার অধিজ্য করিয়া অর্থাৎ তাহাতে পুনরায় গুণ যোজনা করিয়া, বাণযুক্ত—শরের অগ্রভাগে যে, এক খণ্ড বংশফলক সংযোজিত করা থাকে, এখানে ‘বাণ’ শব্দে তাহাই বুঝিতে হইবে; কারণ, ঐরূপ বংশখণ্ড ছাড়াও শর প্রস্তুত হইতে পারে; এই জন্য এখানে বিশেষ করিয়া ‘বাণবস্তৌ’ শব্দের প্রয়োগ করা হইয়াছে। বাণবন্ত ও সপত্নাতিব্যাধী অর্থাৎ শত্রুর অতিশয় পীড়াদায়ক দুইটী শর হস্তে করিয়া[ বিপক্ষের] সমীপে আত্ম-প্রকাশ করে অর্থাৎ উপস্থিত হয়, ঠিক সেইরূপ শরস্থানীয় দুইটী প্রশ্ন লইয়া আমিও তোমার নিকট উপস্থিত হইতেছি। যদি ব্রহ্মবিৎ হও, তবে আমার সেই প্রশ্ন দুইটীর উত্তর বল। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে গার্গি, তুমি জিজ্ঞাসা কর ॥১৯৬৷৷২৷৷

সা হোবাচ যদূর্দ্ধং যাজ্ঞবল্ক্য দিবো যদবাক্ পৃথিব্যা যদন্তরা দ্যাবাপৃথিবী ইমে, যদ্ভূতঞ্চ ভবচ্চ ভবিষ্যচ্চেত্যাচক্ষতে, কস্মিস্তদোতঞ্চ প্রোতঞ্চেতি ॥ ১৯৭ ॥ ৩ ॥

সরলার্থঃ।—সা(গার্গী) উবাচ হ—হে যাজ্ঞবল্ক্য, যৎ(সূত্রং) দিবঃ (দ্যুলোকাৎ—উর্দ্ধাণ্ডকপালাৎ) ঊর্দ্ধম্, যৎ পৃথিব্যাঃ(অধোহণ্ডকপালাৎ) অবাক্ (অধঃ), যৎ ইমে দ্যাবাপৃথিবী অন্তরা(অনয়োঃ দ্যাবাপৃথিব্যোঃ মধ্যে), যৎ ভূতৎ (অতীতং) চ, ভবৎ(বর্তমানং) চ, ভবিষ্যৎ(পরভাবি) চ—ইতি আচক্ষতে (কথয়ন্তি)[শাস্ত্রবিদঃ], তৎ(সূত্রং) কস্মিন্(বস্তুনি) ওতৎ চ প্রোতৎ চ? ইতি ॥১৯৭৷৷৩৷৷

মূলানুবাদ?—গার্গী জিজ্ঞাসা করিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, পণ্ডিতগণ পূর্ব্বকথিত যে সূত্রকে দ্যুলোকের—ব্রহ্মাণ্ডাবরণ ঊর্দ্ধকপালের উপরে, যে সূত্রকে পৃথিবীর—অধঃকপালের অবাক্ অর্থাৎ নিম্নবর্তী, যাহাকে এই দ্যুলোক ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী এবং যাহাকে ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানস্বরূপ বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন; জিজ্ঞাসা করি, সেই সূত্র আবার কোথায় ওতপ্রোত রহিয়াছে? ॥ ১৯৭ ॥ ৩ ॥

৮৭৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

শাঙ্করভাষ্যম্:-সা হোবাচ-যদুর্দ্ধম্ উপরি দিবোহণ্ডকপালাৎ, যচ্চ অবাক্ অধঃ পৃথিব্যাঃ অধোহণ্ডকপালাৎ, যচ্চ অন্তরা মধ্যে দ্যাবাপৃথিবী দ্যাবা- পৃথিব্যেরণ্ডকপালয়োঃ, ইমে চ দ্যাবাপৃথিবী, যদ্ভূতং, যচ্চাতীতং, ভবচ্চ বর্তমানং স্বব্যাপারস্থং, ভবিষ্যচ্চ বর্তমানাদুদ্ধকালভাবি লিঙ্গগম্যং-যৎ সর্ব্বমেতদাচক্ষতে কথয়ন্তি আগমতঃ, তৎ সর্ব্বং দ্বৈতজাতং যস্মিন্নেকীভবতীত্যর্থঃ। তৎ সূত্রসংজ্ঞং পূর্ব্বোক্তং কস্মিন্ ওতঞ্চ প্রোতঞ্চ-পৃথিবীধাতুরিবাস্পু ॥১৯৭৷৷৩৷৷

টীকা। সূত্রস্যাধারে প্রষ্টব্যে কিমিতি সর্ব্বং জগদনুদ্যতে? তত্রাহ-তৎ সর্ব্বমিতি। পূর্ব্বোক্তং সর্ব্বজগদাত্মকমিতি যাবৎ ॥১৯৭৷৩৷

ভাষ্যানুবাদ।-গার্গী জিজ্ঞাসা করিলেন-যাহা দ্যুলোকের-ব্রহ্মা- ণ্ডাবরণ ঊর্দ্ধকপালের বা ঊর্দ্ধ খণ্ডের উপরে, পৃথিবীর-অর্থাৎ নিম্নবর্তী অণ্ডকপা- লের অবাক্-অধঃ, যাহাকে এই পৃথিবী ও দ্যুলোকের মধ্যবর্তী, এবং যাহাকে ভূত-অতীত, ভবৎ-বর্তমানকালীন-যাহা নিজ নিজ ব্যাপারক্ষম অবস্থায় বর্তমান ও যাহা ভবিষ্যৎ অর্থাৎ বর্তমান কালের পরভাবী-শুধু অনুমানগম্য- যাহাকে এই সর্ব্বময় বলিয়া শাস্ত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন, অর্থাৎ উল্লিখিত সমস্ত দ্বৈত জগৎ যাহাতে যাইয়া একীভূত হইয়া থাকে, পূর্ব্বোক্ত সেই সূত্র কোথায় ওত-প্রোতভাবে-পৃথিবী যেমন জলের মধ্যে আছে, তেমনি সন্নিবিষ্ট রহিয়াছে? ॥১৯৭৷৷৩৷৷

স হোবাচ যদূর্দ্ধং গার্গি দিবো যদবাক্ পৃথিব্যা যদন্তরা দ্যাবাপৃথিবী ইমে, যদ্ ভূতঞ্চ ভবচ্চ ভবিষ্যচ্চেত্যাচক্ষতে, আকাশে তদোতঞ্চ প্রোতঞ্চেতি ॥ ১৯৮ ॥ ৪ ॥

সমলার্থঃ।-[এবং পৃষ্টঃ যাজ্ঞবল্ক্যঃ গার্গীমাহ-] হে গাগি, যৎ(ত্বদুক্তং সূত্রং) দিবঃ উদ্ধম্, যৎ পৃথিব্যাঃ অবাক্(অধঃ), যৎ ইমে দ্বাবাপৃথিবী অন্তরা, যৎ ভূতং চ, ভবৎ চ, ভবিষ্যৎ চ-ইতি আচক্ষতে, তৎ সূত্রং(বায়ুরূপং) আকাশে ওতং চ প্রোতং চ[কৃতব্যাখ্যা‘নমেতৎ সর্ব্বম্] ইতি ॥১৯৮॥:৷৷

মুলাসুন্দক?—যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে গাগি, তোমার, জিজ্ঞাসিত যে সূত্রকে পণ্ডিতগণ দ্যুলোকের উপরে, পৃথিবীর নীচে, দ্যুলোক ও পৃথিবীর মধ্যে এবং ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—সর্ব্ব বস্তুময় বলিয়া নির্দেশ করেন, সেই সূত্র—বায়ুরূপী সূত্র আকাশে ওতপ্রোত- ভাবে রহিয়াছে ॥ ১৯৮ ॥ ৪ ॥

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৭৫

শাঙ্করভাষ্যম্।—স হোবাচেতরঃ—হে গার্গি, যৎ ত্বয়োক্তমূর্দ্ধং দিব- ইত্যাদি, তৎ সর্ব্বং—যৎ সূত্রমাচক্ষতে—তৎ সূত্রম্, আকাশে তদোতঞ্চ প্রোতঞ্চ, যদেতদ্ ব্যাকৃতং সূত্রাত্মকং জগদব্যাকৃতাকাশে অপ্সু ইব পৃথিবীধাতুঃ, ত্রিঘপি কালেষু বর্ত্ততে—উৎপত্তৌ স্থিতৌ লয়ে চ ॥১৯৮৷৷৪৷৷

টীকা। যথাপ্রশ্নমনুষ্য প্রত্যুক্তিমাদত্তে-স হোবাচেতি। তাং ব্যাচষ্টে-যদেতদিতি। যজ্জগদ্ব্যাকৃতং সূত্রাত্মকমেতদব্যাকৃতাকাশে বর্ত্তত ইতি সম্বন্ধঃ। ত্রিষপি কালেধিতি যদুক্তং, তদ্বানক্তি-উৎপত্তাবিতি ॥১৯৮॥৪॥

ভাষ্যানুবাদ।—যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে গার্গি, তুমি যে, বলিয়াছ, “ঊর্দ্ধং দিবঃ”(দ্যুলোকের উপরে) ইত্যাদি, তাহা সেই সূত্র,—যাহাকে সর্ব্বাত্মক সূত্র বলিয়া নির্দেশ করা হয়, সেই সূত্র আকাশে ওতপ্রোত আছে—সূক্ষ্ম পৃথিবী যেরূপ জলের মধ্যে আছে, তদ্রূপ ব্যাকৃত বা অভিব্যক্তাবস্থাপন্ন এই জগৎ-রূপ সূত্রও অব্যাকৃত(অনভিব্যক্ত বা অপঞ্চীকৃত সূক্ষ্ম) আকাশে—উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়, এই অবস্থাত্রয়েই বর্তমান রহিয়াছে ॥১৯৮॥৪॥

সা হোবাচ নমস্তেহস্ত যাজ্ঞবল্ক্য যো ম এতং ব্যবোচোইপরস্মৈ ধারয়স্বেতি, পৃচ্ছ গাগীতি ॥ ১৯৯ ॥ ৫ ॥

সরলার্থঃ।—[যাজ্ঞবল্ক্যেন এবমুক্তা] সা(গার্গী) উবাচ হ—হে যাজ্ঞ- বল্ক্য, তে(তুভ্যং) নমঃ(নমস্কারঃ) অস্তু(অহং ত্বাৎ প্রণমামি ইত্যর্থঃ), যঃ (ত্বং) মে(মম) এতৎ(উক্তং প্রশ্নং) ব্যবোচঃ(বিশেষেণ উক্তবান্ অসি); [অতঃপরং] অপরস্মৈ(দ্বিতীয়স্মৈ) প্রশ্নোয় ধারয়স্ব(মৎপ্রষ্টব্য-দ্বিতীয়প্রশ্নার্থ- ধারণার্থম্ আত্ম’নং দৃঢ়ীকুরু) ইতি।[এবমুক্তঃ যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হে গাগি, পৃচ্ছ(প্রশ্নং প্রকাশয়েত্যর্থঃ) ইতি ॥১৯৯৷৷৫৷৷

মূলানুবাদ?—[যাজ্ঞবল্ক্য প্রশ্নের উত্তর দিলে পর, গার্গী বলিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, তোমার উদ্দেশে নমস্কার করি,—যে তুমি আমার এই প্রশ্নের উত্তম উত্তর দিয়াছ; এখন অপর প্রশ্নের জন্য আপনাকে দৃঢ় কর।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] হে গার্গি, তুমি জিজ্ঞাসা কর ॥ ১৯৯ ॥ ৫ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—পুনঃ সা হোবাচ—নমস্তেহস্তিত্যাদিপ্রশ্নস্য দুর্ব্বচত্ব- প্রদর্শনার্থম্। যো মে মম এতং প্রশ্নং ব্যবোচঃ বিশেষেণোক্তবানসি। এতস্য দুর্ব্বচত্বে কারণম্—সূত্রমেব তাবদগম্যমিতরৈদুর্ভাচ্যম্, কিমুত তৎ যস্মিন্নোতঞ্চ

৮৭৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রোতঞ্চেতি; অতো নমোহস্তু তে তুভ্যম্। অপরস্মৈ দ্বিতীয়ায় প্রশ্নায় ধারয়স্ব দৃঢ়ীকুরু আত্মানমিত্যর্থঃ। পৃচ্ছ গার্গীতি ইতর আহ, ॥১৯৯৷৫৷৷

টিকা। ৪।১।৯।৫।

ভাষ্যানুবাদ।—গার্গী পুনশ্চ বলিতে লাগিলেন। নিজের প্রশ্নের দুর্ব্বচত্ব অর্থাৎ আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়, ইহা বুঝাইবার জন্য বলিলেন—তুমি যখন আমার এই প্রথম প্রশ্ন বলিয়াছ—বিশেষভাবে উহার উত্তর দিয়াছ, তখন তোমার উদ্দেশে নমস্কার। এই প্রশ্নটির দুর্ব্বচনীয়তার(কঠিনত্বের) কারণ এই যে, সাধারণতঃ অপর লোকের পক্ষে সূত্র-তত্ত্বই দুর্ব্বিজ্ঞেয় ও দুর্নিরূপণীয়, তাহাও আবার যাহাতে ওতপ্রোত রহিয়াছে, তাহার ত কথাই নাই;[তুমি তাহা বলিতে পারিয়াছ]; অতএব তোমাকে নমস্কার। এখন অপর দ্বিতীয় প্রশ্নের জন্য আপ- নাকে দৃঢ় কর, অর্থাৎ তদ্বিষয়ে মনোযোগী হও। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে গাগি, তুমি জিজ্ঞাসা কর ॥১৯৯৷৫৷৷

সা হোবাচ যদূর্দ্ধং যাজ্ঞবল্ক্য দিবো যদবাক্ পৃথিব্যা যদন্তরা দ্যাবাপৃথিবী ইমে, যদ্ভূতঞ্চ ভবচ্চ ভবিষ্যচ্চেত্যাচক্ষতে, ‘কস্মিস্তদোতঞ্চ প্রোতঞ্চেতি ॥ ২০০ ॥ ৬॥

সরলার্থঃ।—যাজ্ঞবল্ক্যেন সূত্রস্য যদ্ আকাশ-প্রতিষ্ঠিতত্বমুক্তম্, তদেব দৃঢ়াকারয়িতুং গার্গী উক্তার্থমেব প্রশ্নং পুনঃ প্রাহ—নতু কঞ্চিদমুক্তাংশম্। অতীত- তৃতীয়শ্রুতিবৎ অস্যাঃ শ্রুতের্ব্ব্যাখ্যা বিজ্ঞেয়া ॥২০০॥৬৷৷

মূলানুবাদ?—যাজ্ঞবল্ক্য পূর্ব্বে যে সূত্রকে আকাশে ওত- প্রোত বলিয়াছেন, সেই কথারই দৃঢ়তাসম্পাদনের জন্য গার্গী পুনশ্চ প্রথম প্রশ্নেরই পুনরুল্লেখ করিতেছেন মাত্র; কিন্তু এখানে কোনও নূতন কথা বলিতেছেন না। তৃতীয় শ্রুতিতেই ইহার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদত্ত হইয়াছে ॥ ২০০ ॥ ৬ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—ব্যাখ্যাতমন্যৎ। সা হোবাচ যদুর্দ্ধং যাজ্ঞবল্ক্যেত্যাদি- প্রশ্নঃ, প্রতিবচনং চোক্তস্যৈবার্থস্যাবধারণার্থং পুনরুচ্যতে, ন কিঞ্চিদপূর্ব্বমর্থান্তর- মুচ্যতে ॥২০০॥৬৷৷

টীকা। বক্ষ্যমাণং বাক্যমন্যদিত্যুচ্যতে। তদেব প্রশ্নপ্রতিবচনরূপমনুবদতি-সা হেতি। পুনরুক্তেরকিঞ্চিৎকরত্বং ব্যাবর্ত্তয়তি-উক্তস্যৈবেতি ॥২০০৬৷৷

ভাষ্যানুসারে।—এই শৃতির অন্যান্য অংশ পূর্ব্বেই(পূর্ব্ব তৃতীয় শতির)

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রাহ্মণম্।

৬৭৭

তেই) ব্যাখ্যাত হইয়াছে। ইতঃপূর্ব্বে যাজ্ঞবল্ক্য যে উত্তর প্রদান করিয়াছেন, তাহারই দৃঢ়তা সম্পাদনের নিমিত্ত—“সা হ উবাচ—যদুর্দ্ধং যাজ্ঞবল্ক্য” ইত্যাদি প্রশ্ন ও তাহার প্রত্যুত্তরের এখানে পুনরুল্লেখ করা হইয়াছে মাত্র, কিন্তু এখানে কোনও নূতন বিষয় বলা হয় নাই ॥২০০॥৬৷৷

স হোবাচ যদূর্দ্ধং গার্গি দিবো যদবাক্ পৃথিব্যা যদন্তরা দ্যাবাপৃথিবী ইমে, যদ্ভূতঞ্চ ভবচ্চ ভবিষ্যচ্চেত্যাচক্ষতে, আকাশ- এব তদোতঞ্চ প্রোতঞ্চেতি। কস্মিন্ নু খল্বাকাশ ওতশ্চ প্রোতশ্চেতি ॥ ২০১ ॥ ৭ ॥

সরলার্থঃ।—[‘সহ উবাচ—’ ইত্যাদি—‘ভবিষ্যচ্চেত্যাচক্ষতে’ ইত্যন্তস্য সন্দর্ভস্য ব্যাখ্যা প্রাগেব চতুর্থশ্রুতৌ প্রদর্শিতা; অতঃ পরিশিষ্টস্য ব্যাখ্যা নিরূ- প্যতে—] তৎ(সূত্রং) আকাশে এব(নতু অন্যত্র)।[অত্র ‘এব’-শব্দেন সূত্রস্য আকাশাদন্যত্র স্থিতি-সম্বন্ধো নিবার্য্যতে]।[গার্গী পুনরাহ,] নু(ভোঃ), আকাশঃ (সূত্রাধারঃ) খলু(নিশ্চয়ে) কস্মিন্ ওতঃ চ প্রোতঃ চ? ইতি ॥২০১॥৭৷৷

মূলানুবাদ।—‘স হোবাচ’ হইতে ‘ইত্যাচক্ষতে’ পর্য্যন্ত বাক্যের ব্যাখ্যা পূর্ব্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে। এখানে বিশেষ এই যে, যাজ্ঞবল্ক্য অবধারণ করিয়া বলিলেন—আকাশেই উহা ওত-প্রোত রহিয়াছে,(অন্যত্র নহে)।[গার্গী পুনশ্চ প্রশ্ন করিলেন,] মহাশয়, সেই আকাশ আবার কোথায় ওত-প্রোত আছে? ॥ ২০১ ॥ ৭ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—সর্ব্বং যথোক্তং গার্গ্যা প্রত্যুচ্চার্য্য তমেব পূর্ব্বোক্ত- মর্থমবধারিতবান্ আকাশ এবেতি যাজ্ঞবল্ক্যঃ। গার্গী আহ—কস্মিন্ নু খলু আকাশ ওতশ্চ প্রোতশ্চেতি। আকাশমেব তাবৎ কালত্রয়াতীতত্ত্বাৎ দুর্ব্বাচ্যম্, ততোহপি কষ্টতরমক্ষরম্,—যস্মিন্ আকাশমোতঞ্চ প্রোতঞ্চ; অতোহবাচ্যম্—ইতি কৃত্বা ন প্রতিপদ্যতে, সা অপ্রতিপত্তির্নাম নিগ্রহস্থানং তার্কিকসময়ে। অথ অবাচ্যমপি বদতি, তথাপি বিপ্রতিপত্তির্নাম নিগ্রহস্থানম্, বিরুদ্ধা প্রতিপত্তিহি সা, যদবাচ্যস্য বদনম্; অতো দুর্ব্বচনং প্রশ্নং মন্যতে গার্গী ॥২০১॥৭॥

টীকা। প্রতিবচনানুবাদতাৎপর্য্যমাহ—গার্গ্যেতি। প্রশ্নভিপ্রায়ং প্রকটয়তি—আকাশ- মেবেতি ॥২০১॥

ভাষ্যানুবাদ।—যাজ্ঞবল্ক্য গার্গীর পূর্ব্বোক্ত সমস্ত কথার পুনরুচ্চারণ- পূর্ব্বক ‘আকাশ এব’(আকাশই) ইত্যাদি বলিয়া আপনার পূর্ব্বোক্ত উত্তর

৮৭৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বাক্যেরই দৃঢ়তা স্থাপন করিলেন। গার্গী জিজ্ঞাসা করিলেন-ভাল, আকাশই বা কোথায় ওত-প্রোত রহিয়াছে?[এই প্রশ্নের অভিপ্রায় এই যে,] প্রথমতঃ কালত্রয়ের অতীত-ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকালের অতীত বলিয়া আকাশের তত্ত্ব নিরূপণ করাই কঠিন; সেই আকাশ আবার যাহাতে ওত-প্রোত রহিয়াছে, সেই অক্ষর ব্রহ্ম ত তদপেক্ষাও দুর্ব্বাচ্য; সুতরাং ইহা উত্তরের যোগ্যই হইতে পারে না। তর্কশাস্ত্রে ইহাকে ‘অপ্রতিপত্তি’ নামক ‘নিগ্রহস্থান’ বলা হইয়া থাকে(১); আর যাহা অবাচ্য-বচনযোগ্য নয়, সে কথাও যদি বলা হয়, তাহা হইলেও ‘বিপ্রতিপত্তি’নামক ‘নিগ্রহস্থান’ হইয়া পড়ে; কেননা, উহা হয় বিরুদ্ধ প্রতিপত্তি(বিপ্রতিপত্তি) বা বিরুদ্ধ জ্ঞান; অর্থাৎ যাহা বলিতে নাই, তাহাই বলা হয়; এই কারণে গার্গী মনে করিলেন যে, আমার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভবপর হইবে না ॥২০১৷৭৷৷

স হোবাচৈতদ্বৈ তদক্ষরং গার্গি ব্রাহ্মণা অভিবদন্ত্য- স্থূলমনণুহ্রস্বমদীর্ঘমলোহিতমস্নেহমচ্ছায়মতমোহবায়ুনাকাশমসঙ্গম- রসমগন্ধমচক্ষুষ্কমশ্রোত্রমবাগমনোহতেজস্কমপ্রাণমমুখমমাত্রমনন্তর- মবাহ্যম্, ন তদশ্নাতি কিঞ্চন ন তদশ্নাতি কশ্চন ॥ ২০২॥৮॥

সরলার্থঃ।-সঃ(যাজ্ঞবল্ক্যঃ) উবাচ হ-হে গাগি, ব্রাহ্মণাঃ(ব্রহ্মবাদিনঃ) এতৎ(বক্ষ্যমাণবিশেষণং) অক্ষরং(ন ক্ষরতি স্বভাবাৎ ন প্রচ্যবতে ইতি অক্ষরং অবিকারি) বৈ(এব) তৎ(যৎ ত্বয়া পৃষ্টম্) অভিবদন্তি(কথয়ন্তি)। [‘ব্রাহ্মণা অভিবদন্তি’ ইত্যনেন আত্মনঃ অবাচ্য-বচনাৎ যৎ অপ্রতিপত্তি- বিপ্রতিপত্তিরূপ-দোষদ্বয়মাশঙ্কিতং, তৎ পরিহৃতমিতি ভাবঃ]।[কিংলক্ষণং তদক্ষরম্? ইত্যাহ-] অঙ্গুলং, অনণু(অণুভিন্নং), অহ্রস্বং, অদীর্ঘং, অলোহিতং (লৌহিত্যহীনং), অন্নেহং(জলীয়স্নেহগুণরহিতং), অচ্ছায়ং(ভূমিগুণ- মালিন্যরহিতং), অতমঃ(অন্ধকারশূন্যৎ), অবায়ু, অনাকাশং, অসঙ্গৎ, অরসৎ,

(১) তাৎপয্য—ন্যায়দর্শনে ছল, জাতি, অপ্রতিপত্তিপ্রভৃতি কতকগুলি তর্কাংশকে ‘নিগ্রহস্থান’ বলা হইয়াছে। যে কথার প্রকৃত উত্তর নাই, অথবা সহজবুদ্ধির অগম্য, অর্থাৎ বিপক্ষগণ যে কথার উত্তর দিতে সহজেই কুষ্ঠিত হইয়া পড়ে, সেরূপ কথাকে ‘নিগ্রহস্থান’ বলা হয়। এখানেও, আকাশ যে, কি পদার্থ, প্রথমতঃ তাহা বলাই কঠিন, তাহার উপর আবার সেই আকাশের আশ্রয় নিরূপণ করা ত আরও কঠিন; এইজন্য অতিশয় দুর্জ্জেয়তা নিবন্ধন ইহাকেও ‘অপ্রতিপত্তি’-নামক ‘নিগ্রহস্থান’ বলা হইল।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রাহ্মণম্।

৮৭৯

অগন্ধং, অচক্ষুঙ্কং, অশ্রোত্রং, অবাক্, অমনঃ, অতেজস্কং(অগ্ন্যাদি-তেজঃসম্বন্ধ- রহিতম্), অপ্রাণং(আধ্যাত্মিকবায়ুশূন্যৎ), অমুখং, অমাত্রং(মীয়তে পরিমিতৎ ক্রিয়তে অনেন ইতি মাত্রৎ পরিমাপকং, তদ্ভিন্নং), অনন্তরং(অচ্ছিদ্রং— নিরবকাশম্), অবাহ্যং(অস্য বহিন কিঞ্চিদস্তীত্যর্থঃ); তৎ(অক্ষরং) কিঞ্চন (কিঞ্চিদপি বস্তু) ন অন্নাতি(ন ভুঙক্তে), কশ্চন(কশ্চিদপি জনঃ) তৎ(অক্ষরং) ন অন্নাতি(ন ভুঙক্তে, ভোক্তৃভোগ্যভাববিহীনং তদিত্যর্থঃ) ॥২০২৷৷৮৷৷

মূলানুবাদ:-[যাহাতে পূর্ব্বোক্ত কোন দোষ সম্ভাবিত না হয়, যাজ্ঞবল্ক্য ঠিক সেইরূপে উক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতেছেন-] যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-হে গার্গি,[তুমি যে বিষয়ে প্রশ্ন করিয়াছ,] ব্রাহ্মণগণ (ব্রহ্মবিদ্গণ) তাহাকে এই অক্ষর বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। এই ‘অক্ষর’ বস্তুটি স্থূল নয়, সূক্ষম নয়, হ্রস্ব নয়, দীর্ঘ নয়, রক্তবর্ণ নয়, স্নেহ বা আর্দ্রতাযুক্ত নয়, ছায়াযুক্ত নয়, তমোযুক্ত নয়, বায়ু নয়, আকাশ নয়, আসক্ত নয়, এবং রস, গন্ধ, চক্ষুঃ, শ্রোত্র, বাক্, মনঃ, তেজঃ, প্রাণ নয়, এবং মুখযুক্ত নয়, যাহা দ্বারা কোন বস্তু পরিমিত করা যায়, সেই পরিমাণ গুণযুক্তও নয়, এবং তাহার অন্তর বা বাহির নাই, তাহা কাহাকেও ভক্ষণ করে না, এবং তাহাকেও কেহ ভক্ষণ করে না ॥ ২০২ ॥৮॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তদ্দোষদ্বয়মপি পরিজিহীর্ষন্নাহ—স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ, এতদ্বৈ তৎ, যৎ পৃষ্টবত্যসি—কস্মিন্নু খল্বাকাশ ওতশ্চ প্রোতশ্চেতি। কিং তৎ? অক্ষরং—যন্ন ক্ষীয়তে ন ক্ষরতীতি বা অক্ষরং। তদক্ষরম্—হে গাগি, ব্রাহ্মণা ব্রহ্মবিদঃ অভিবদন্তি; ব্রাহ্মণাভিবদনকথনেন—নাহমবাচ্যং বক্ষ্যামি, ন চ ন প্রতিপদ্যেয় মিত্যেবং দোষদ্বয়ং পরিহরতি। ১

এবমপাকৃতে প্রশ্নে পুনর্গার্গ্যাঃ প্রতিবচনং দ্রষ্টব্যম্-ক্রহি কিং তদক্ষরম্, যদ্ ব্রাহ্মণ। অভিবদন্তি-ইত্যুক্ত আহ-অস্থুলং-তৎ স্থূলাদন্যৎ; এবং তর্হি অণু, অনণু; অস্তু তহি হ্রস্বম্, অহ্রস্বম্, এবং তর্হি দীর্ঘম্, নাপি দীর্ঘম্; এবমেতৈ- শ্চতুর্ভিঃ পরিমাণপ্রতিষেধৈদ্রব্যধৰ্ম্মঃ প্রতিষিদ্ধঃ-ন দ্রব্যৎ তদক্ষরমিত্যর্থঃ। অস্তু তর্হি লোহিতো গুণঃ; ততোহপ্যন্যৎ-অলোহিতম্, আগ্নেয়ো গুণো লোহিতঃ। ভবতু তর্হি অপাৎ স্নেহনম্?-অস্নেহম্; অস্তু তর্হি চ্ছায়া? সর্ব্বথাপ্যনির্দেশ্য- ত্বাৎ ছায়ায়া অপ্যন্যৎ-অচ্ছায়ম্; অস্তু তর্হি তমঃ? অতমঃ; ভবতু বায়ুস্তর্হি, অবায়ু; অস্তু তর্হাকাশম্,-অনাকাশম্; ভবতু তর্হি সঙ্গাত্মকং জতুবৎ, অসঙ্গম্;

৮৮০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রসোহস্তু তর্হি, অরসম্; তথা অগন্ধম্; ‘অস্তু তর্হি চক্ষুঃ, অচক্ষুষ্কম্; ন হি চক্ষুরস্য করণং বিদ্যতে, অতোহচক্ষুস্কৎ “পশ্যত্যচক্ষুঃ” ইতি মন্ত্রবর্ণাৎ; তথা অশ্রোত্রম্ “স শৃণোত্যকর্ণঃ” ইতি; ভবতু তর্হি বাক্-অবাক্; তথা অমনঃ; তথা অতেজস্কম্, অবিদ্যমানং তেজোহস্য, তদতেজস্কম্; ন হি তেজোহগ্ন্যাদি-প্রকাশবদস্য বিদ্যতে; অপ্রাণম্; আধ্যাত্মিকো বায়ুঃ প্রতিষিধ্যতে অপ্রাণমিতি; মুখং, তর্হি দ্বারম্, তদমুখম্; অমাত্রং-মীয়তে যেন, তন্মাত্রম্, অমাত্রং-মাত্রারূপং তন্ন ভবতি, ন তেন কিঞ্চিন্মীয়তে; অস্তু তর্হি ছিদ্রবৎ-অনন্তরং নাস্যান্তরমস্তি; সম্ভবেত্তর্হি বহিস্তস্য-অবাহ্যং, অস্তু তর্হি ভক্ষয়িতৃ তৎ, ন তদশ্নাতি কিঞ্চন; ভবেত্তর্হি ভক্ষ্যৎ কস্যচিৎ, ন তদশ্নাতি কশ্চন; সর্ব্ববিশেষণরহিতমিত্যর্থঃ। একমেবাদ্বিতীয়ং হি তৎ কেন কিং বিশিষ্যতে ॥২০২৷৷৮৷৷

টীকা। অপ্রতিপত্তিবিপ্রতিপত্তিশ্চেতি দোষদ্বয়ং সামান্যেনোক্তং বিশেষতো জ্ঞাতুং পৃচ্ছতি—কিং তদিতি। অস্থূলাদিবাক্যমবতার্য্য ব্যাকরোতি—এবমিত্যাদিনা। ‘যদগ্নে রোহিতং রূপম্’ ইত্যাদিশ্রুতিমাশ্রিত্যাহ—আগ্নেয় ইতি। অবায়ুবিশেষণেনা প্রাণবিশেষণস্য পুনরুক্তি- মাশঙ্ক্যাহ—আধ্যাত্মিক ইতি। অমাত্রমিতি মানমেয়ান্বয়ো নিরাক্রিয়তে। তস্তেত্যাত্মোক্তিঃ। সংপিণ্ডিতমর্থমাহ—সর্ব্বেতি। তদুপপাদয়তি—একমিতি ॥ ২০২ ॥ ৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ।-[যাজ্ঞবল্ক্য গার্গীর আশঙ্কিত দুইটী দোষেরই পরিহার- পূর্ব্বক বলিতেছেন—হে গার্গি,] ইহাই তাহা, যাহার কথা তুমি ‘কস্মিন্ নু খলু আকাশ ওতশ্চ প্রোতশ্চ’ বলিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছ। ‘তাহা’ কি? না, তাহা ‘অক্ষর’, যাহা ক্ষয় প্রাপ্ত হয় না বা স্বভাবচ্যুত হয় না, তাহা অক্ষর; হে গার্গি, ব্রাহ্মণগণ—ব্রহ্মবিদ্গণ তাহাকে ‘অক্ষর বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন।’ এখানে ‘ব্রাহ্মণগণ অভিহিত করিয়া থাকেন’ বলায় বুঝা গেল যে, ‘আমি অবচনীয় কথা বলিব, কিংবা আমি বুঝিতেই পারিব না’ এইরূপ যে, দুইটা দোষ আশঙ্কিত হইয়াছিল, সেই দুইটা দোষই খণ্ডিত হইল। ১

যাজ্ঞবল্ক্য এইরূপে গার্গীর প্রশ্নোত্তর প্রদান করিলে পর, গার্গী পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন—বল ত, ব্রাহ্মণগণ যাহার স্বরূপ বলিয়া থাকেন, সেই অক্ষরটি কিরূপ? এই কথার পর যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—অস্থূল—তাহা স্কুল হইতে ভিন্ন; ভাল, এরূপ যদি হয়, তবে তিনি অণু হইতে পারেন? না—তিনি অনণু অর্থাৎ পরম সূক্ষ্ম হইতেও ভিন্ন; তবে হ্রস্ব হউক? না—অহ্রস্ব; তবে দীর্ঘ হউক? না—দীর্ঘও নয়—অদীর্ঘ। এখানে দ্রব্য-ধর্ম্ম চারিপ্রকার পরিমাণেরই নিষেধ করায়, তাহার দ্রব্যত্বও প্রতিষিদ্ধ হইল, অর্থাৎ সেই অক্ষর কোনও দ্রব্য পদার্থ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রাহ্মণম্।

৮৮১।

নহে। তবে লৌহিত্য গুণযুক্ত হউক? না, তাহা হইতেও পৃথক্,-অলোহিত, লৌহিত্য গুণটি অগ্নির ধর্ম;[সুতরাং অক্ষরে তাহা থাকিতে পারে না]; তাহা হইলেও জলের স্নেহগুণ থাকিতে পারে? না-অস্নেহ অর্থাৎ স্নেহগুণও তাহাতে নাই(১); তবে ছায়া হউক? না-কোন রূপেই যখন তাহার স্বরূপ নির্দেশ করা সম্ভবপর হয় না, তখন উহা ছায়া হইতেও ভিন্ন-অচ্ছায়; তাহা হইলে অন্ধ- কার হউক? না-অতমঃ(অন্ধকারও নয়); তবে বায়ুস্বরূপ হউক? না-অবায়ু (বায়ু নয়); তবে আকাশ হইতে পারে? না-তিনি অনাকাশ; তাহা হইলে লাক্ষা(গালা) যেমন সঙ্গাত্মক অর্থাৎ অন্য বস্তুর সহিত মিলিত হইয়া থাকে, সেরূপ হউক? না-উহা অসঙ্গ; তবে রস হউক? না, অরস; তবে গন্ধ হউক? না-অগন্ধ; তাহা হইলে চক্ষুঃ হউক? না-চক্ষুও নহে; কারণ, মন্ত্রে আছে ‘তিনি চক্ষুরহিত অথচ দর্শন করেন’; সেইরূপ অশ্রোত্র; কারণ, মন্ত্রে আছে ‘তিনি কর্ণহীন, তবু শ্রবণ করেন’; তবে বাগিন্দ্রিয় হউক, না, অবাক্; সেইরূপ তিনি অমনঃ(মনরহিত), এবং অতেজস্ক, তেজঃ যাহাতে বিদ্যমান নাই, তাহা অতেজস্ক; অগ্নি প্রভৃতির যেমন প্রকাশ আছে, ইহার তেমন কোনও তেজঃপ্রকাশ নাই; তিনি অপ্রাণ, এখানে ‘অপ্রাণ’ শব্দে আধ্যাত্মিক বায়ুর(প্রাণবায়ুর) প্রতি- যেধ করা হইতেছে; তাহা হইলে, মুখদ্বার হউক, না, অমুখ; অমাত্র-যাহা দ্বারা অপর বস্তু পরিমিত করা যায়, তাহা ‘মাত্র’; উক্ত অক্ষর মাত্রস্বরূপও নহে; কারণ, তাহাদ্বারা কোন বস্তু পরিমিত হয় না। তাহা হইলে ছিদ্রযুক্ত(রন্ধ্রযুক্ত) হউক; না,-অনন্তর অর্থাৎ তাহার ছিদ্র নাই; তবে তাহার বাহির(বহির্ভাব) থাকা সম্ভব? না, তিনি অবাহ্য অর্থাৎ তাহার বাহ্যাভ্যন্তরভাব নাই। তবে তাহা ভক্ষক হইতে পারে? না-তিনি কিছু ভক্ষণ করেন না; তাহা হইলেও অপরের ভক্ষ্য হইতে পারে? না, কেহ তাহাকে ভক্ষণও করে না; অর্থাৎ তিনি সর্ব্বপ্রকার বিশেষণ বা বিশেষ-ধর্মরহিত; কারণ, তিনি হইতেছেন এক অদ্বিতীয়; সুতরাং তাহাকে কোন গুণ দ্বারা বিশেষিত করিতে পারা যায় না ॥ ২০২॥৮॥

এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি সূর্য্যাচন্দ্রমসৌ বিধৃতৌ তিষ্ঠতঃ, এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি দ্যাবাপৃথিব্যৌ বিধৃতে

৮৮২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তিষ্ঠতঃ। এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি নিমেষা মুহূর্ত্তা অহোরাত্রাণ্যর্দ্ধমাসা মাসা ঋতবঃ সংবৎসরা ইতি বিধৃতাস্তিষ্ঠন্ত্যে- তস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি প্রাচ্যোহন্যা নদ্যঃ স্যন্দন্তে শ্বেতেভ্যঃ পর্ব্বতেভ্য প্রতীচ্যোহন্যা যাং যাঞ্চ দিশমন্বে- তস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি দদতো মনুষ্যাঃ প্রশংসন্তি, যজমানং দেবাঃ, দর্ব্বীং পিতরোহন্বায়তাঃ ॥ ২০৩॥ ৯ ॥

সরলার্থঃ।—[ইদানীং কার্য্যপ্রদর্শনেন অক্ষরস্যাস্তিত্বমুপপাদয়তি “এতস্য বা অক্ষরস্য” ইত্যাদিনা।] হে গার্গি, এতস্য সর্ব্ববিশেষণবিহীনতয়া(প্রাগুক্তস্য) অক্ষরস্য প্রশাসনে(শাসনে) সূর্য্যাচন্দ্রমসৌ(সূর্য্যঃ চন্দ্রশ্চ) বিধৃতৌ(বিশেষেণ রক্ষিতৌ সন্তৌ) তিষ্ঠতঃ(বর্ত্তেতে); তথা, হে গাগি, দ্যাবাপৃথিব্যো(দ্যৌঃ চ পৃথিবী চ), এতস্য অক্ষরস্য প্রশাসনে বিধৃতে(সত্যৌ) তিষ্ঠতঃ; হে গাগি, তথা নিমেষাঃ(অণীয়াৎসঃ কালাবয়বাঃ), মুহূর্তাঃ(দণ্ডদ্বয়াত্মকাঃ কালাবয়বাঃ), অহোরাত্রাণি(অহানি চ রাত্রয়ঃ চ), অর্দ্ধমাসাঃ, মাসাঃ, ঋতবঃ, সৎবৎসরাঃ (দ্বাদশমাসাত্মকাঃ, কদাচিৎ ত্রয়োদশমাসাত্মকাঃ চ) ইতি(এতে কালাবয়বাঃ) এতস্য অক্ষরস্য প্রশাসনে বিধৃতাঃ বৈ তিষ্ঠন্তি; তথা হে গার্গি, প্রাচ্যঃ(পূর্ব্বদিগ্‌- গামিন্ধঃ) অন্যাঃ(দিগন্তরগামিন্ধঃ) চ নদ্যঃ(গঙ্গাদ্যাঃ) এতস্য অক্ষরস্য প্রশা- সনে[বিধৃতাঃ] বৈ শ্বেতেভ্যঃ গিরিভ্যঃ(হিমালয়াদি-পর্ব্বতেভ্যঃ) স্যন্দন্তে (স্রবন্তি); তথা প্রতীচ্যঃ(পশ্চিমদিক্ প্রবাহিন্ধঃ সিন্ধুপ্রভৃতয়ঃ), অন্যাঃ[আপি নদ্যঃ] যাং যাং দিশম্ অনু(অনুগতাঃ),[ভা অপি তাং তাং দিশং ন পরি- ত্যজন্তি ইতি শেষঃ]। হে গাগি, মনুষ্যাঃ এতস্য অক্ষরস্য প্রশাসনে[স্থিতাঃ সন্তঃ] দদতঃ(ধনাদিদাতুন্) প্রশংসন্তি; দেবাঃ(যজ্ঞভাগিনঃ) যজমানম্ (যজ্ঞকর্তারৎ প্রশংসন্তি ইত্যর্থঃ), পিতরঃ(অগ্নিঘাতাদয়ঃ) দর্ব্বীং(দব্বী- হোমং) অন্বায়ত্তাঃ॥২০৩৷৷

মূলানুবাদ।—[এখন কার্য্যদ্বারা অক্ষর পুরুষের অস্তিত্বপ্রতি- পাদন করিতেছেন]।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] হে গার্গি, সূর্য্য ও চন্দ্র উক্ত অক্ষর ব্রহ্মের প্রদীপ্ত শাসনে নিয়মিত হইয়া রহিয়াছে; হে গার্গি, দ্যুলোক ও পৃথিবী এই অক্ষর ব্রহ্মের শাসনেই স্থির রহিয়াছে; হে গার্গি, নিমেষ(ক্ষুদ্রতম কালাংশ), মুহূর্ত্ত, দিবারাত্র, অর্দ্ধমাস(এক পক্ষ),

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রোণম্।

৮৮৩

মাস, ঋতু ও সংবৎসরসমূহ এই অক্ষরের শাসনেই নিয়মিত হইয়া রহিয়াছে। হে গার্গি, এই অক্ষরের শাসনেই পূর্বদিকপ্রবাহিণী এবং অন্যান্য নদীসমূহও শ্বেতপর্বত—হিমালয় প্রভৃতি হইতে যথানিয়মে ক্ষরিত হইতেছে; সেইরূপ পশ্চিমদিকপ্রবাহিণী এবং অন্যান্য নদী সকলও যে যে দিকে যাইয়া থাকে, তাহারা তাহার ব্যতিক্রম করিতেছে না। হে গার্গি, এই অক্ষরের শাসনে আছে বলিয়াই মনুষ্যগণ দানশীল লোকদিগকে, এবং দেবতাগণ যজমানকে(যজ্ঞকর্তাকে) প্রশংসা করিয়া থাকেন, এবং পিতৃগণ দর্ব্বীহোমের অনুগত রহিয়াছেন ॥ ২০৩॥ ৯॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—অনেকবিশেষণপ্রতিষেধ-প্রয়াসাৎ অস্তিত্বং তাবদ- ক্ষরস্যোপগমিতং শ্রুত্যা; তথাপি লোকবুদ্ধিমপেক্ষ্যাশঙ্ক্যতে যতঃ; অতোহস্তি- ত্বায় অনুমানং প্রমাণমুপন্যস্যতি—এতস্য বা অক্ষরস্য। যদেতদধিগতমক্ষরং সর্ব্বান্তরং সাক্ষাদপরোক্ষাদ্ ব্রহ্ম, য আত্মা অশনায়াদিধৰ্মাতীতঃ, এতস্য বৈ অক্ষরস্য প্রশাসনে—যথা রাজ्ञঃ প্রশাসনে রাজ্যমস্ফুটিতং নিয়তং বর্ত্ততে, এব- মেতস্যাক্ষরস্য প্রশাসনে—হে গাগি, সূর্য্যাচন্দ্রমসৌ সূর্য্যশ্চ চন্দ্রমাশ্চ সূর্য্যাচন্দ্রমসৌ অহোরাত্রয়োলোকপ্রদীপৌ,—তাদর্থ্যেন প্রশাসিত্রা তাভ্যাং নির্বর্ত্যমান-লোক- প্রয়োজনবিজ্ঞানবতা নির্মিতৌ বিশ্বতৌ চ স্যাতাম্—সাধারণসর্ব্বপ্রাণিপ্রকাশোপ- কারকত্বাৎ লৌকিকপ্রদীপবৎ। তস্মাদস্তি তৎ, যেন বিশ্বতৌ ঈশ্বরৌ স্বতন্ত্রৌ সন্তৌ নির্মিতৌ তিষ্ঠতঃ—নিয়তদেশ-কাল-নিমিতোদয়াস্তময়-বৃদ্ধিক্ষয়াভ্যাং চ বর্ত্তেতে; তদন্তি এবমেতয়োঃ প্রশাসিতৃ অক্ষরং প্রদীপকর্তৃ-বিধারয়িতৃবৎ। ১ টীকা। অথ যথোক্তয়া নীত্যা প্রত্যৈবাক্ষরাস্তিত্বে জ্ঞাপিতে বক্তব্যভাবাৎ কিমুত্তরেণ গ্রন্থেনেতি, তত্রাহ-অনেকেতি। যদস্তি তৎ সবিশেষণমেবেতি লৌকিকী বুদ্ধিঃ। আশঙ্ক্যতে নাস্ত্যক্ষরং নিব্বশেষণমিতি শেষঃ। অন্তয্যামিণি জগৎকারণে পরস্নিন্ননুমানসিদ্ধে বিবক্ষিতং নিরুপাধ্যক্ষরং সেৎসুতি, জগৎকারণত্বজোগলক্ষণতয়া জন্মাদিসুতে, স্থিতত্বাদুপলক্ষণদ্বারা ব্রহ্মণি স্বরূপলক্ষণপ্রবৃত্তেরন্তযামিশ্যনুমা প্রকৃতোপযুক্তেতি ভাবঃ। অনুমানশ্রুত্যক্ষরাণি ব্যাকরোতি- যদেতদিতি। প্রশাসনে সুষ্যাচন্দ্রমসৌ বিধৃতৌ স্যাতামিতি সম্বধঃ। উক্তমর্থং দৃষ্টান্তেন স্ফোরয়তি-যথোত। অত্রাপি পূর্ব্ববদন্বয়ঃ। জগদ্ব্যবস্থা প্রশাসিতৃপূর্ব্বিকা ব্যবস্থাত্বাদ্রাজ্য- ব্যবস্থাবদিত্যর্থঃ। সুয্যাচন্দ্রমসাবিত্যাদৌ বিবক্ষিতমনুমানমাহ-হযশ্চেত্যাদিনা। তাদর্থ্যেন লোকপ্রকাশার্থত্বন। প্রশাসিত্রা নির্ম্মিতাবিতি সম্বন্ধঃ। নির্ম্মাতুর্ব্বিশিষ্টজ্ঞানবত্ত্বমাচষ্টে- তাভ্যাং নির্ব্বর্ত্যমানেতি। সুয্যাচন্দ্রমসৌ তচ্ছব্দবাচ্যৌ। বিমতৌ বিশিষ্টবিজ্ঞানবতা নির্মিতৌ প্রকাশত্বাৎ প্রদীপবদিত্যর্থঃ। বিমতৌ নিয়ন্তপূর্ব্বকৌ বিশিষ্টচেষ্টাবত্ত্বাদ ভূত্যাদিবদিত্যভি-

৮৮৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রেত্যাহ-বিধৃতাবিতি। প্রকাশোপকারকত্বং তজ্জনকত্বং নির্মাতুর্বিশিষ্টবিজ্ঞানসম্ভাবনার্থং সাধারণেতি বিশেষণং, সাধারণঃ সর্বেষাং প্রাণিনাং যঃ প্রকাশঃ, তস্য জনকত্বাদিতি যাবৎ। দৃষ্টান্তে লৌকিকবিশেষণং প্রাসাদাদিবিশিষ্টদেশনিবিষ্টত্বসিদ্ধ্যর্থম্।

অনুমানফলমুপসংহরতি—তস্মাদিতি। বিশিষ্টচেষ্টাবত্ত্বাদিত্যুপদিষ্টং হেতুং স্পষ্টয়তি— নিয়তেতি। নিয়তো দেশকালৌ নিয়তং চ নিমিত্তং প্রাণ্যদৃষ্টং, তন্বন্তৌ সূর্য্যাচন্দ্রমসাবুদ্যস্তাবস্তং যন্তৌ চ যেন বিধৃতাবুদয়াস্তময়াভ্যাং চ বর্তেতে, উদয়শ্চান্তময়শ্চোদয়াস্তময়ং, বৃদ্ধিশ্চ ক্ষয়শ্চ বৃদ্ধিক্ষয়মিতি দ্বন্দ্বং গৃহীত্বা দ্বিবচনম্। এবং কর্তৃত্বেন চেত্যর্থঃ। ১

এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গাগি দ্যাবাপৃথিব্যৌ—দ্যৌশ্চ পৃথিবী চ সাবয়বত্বাৎ স্ফুটনস্বভাবে অপি সত্যৌ, গুরুত্বাৎ পতনস্বভাবে, সংযুক্তত্বাৎ বিয়োগস্বভাবে, চেতনাবদভিমানি-দেবতাধিষ্ঠিতত্ত্বাৎ স্বতন্ত্রে অপি এতসাক্ষরস্য প্রশাসনে বর্ত্তেতে বিধুতে তিষ্ঠতঃ। এতদ্ধি অক্ষরং সর্ব্বব্যবস্থাসেতুঃ সর্ব্বমর্য্যাদাবিধরণম্; অতো -নাস্যাক্সরস্য প্রশাসনং দ্যাবাপৃথিব্যো অতিক্রামতঃ; তস্মাৎ সিদ্ধমস্যাস্তিত্বমক্ষরস্য; অব্যভিচারি হি তল্লিঙ্গং, যৎ দ্যাবাপৃথিব্যো নিয়তে বর্ত্তেতে; চেতনাবন্তং প্রশাসিতারমসংসারিণমন্তরেণ নৈতদ্ যুক্তম্; “যেন দ্যৌরুগ্রা পৃথিবী চ দৃঢ়া” ইতি মন্ত্রবর্ণাৎ। ২

বিমতে প্রযত্নশতবিধৃতে সাবয়বত্বেহপ্যস্ফুটিতত্বাদ গুরুত্বেহপ্যপতিতত্ত্বাৎ সংযুক্তত্বেহপ্য- বিযুক্তত্বাচ্চেতনাবত্বেহপ্যস্বতন্ত্রত্বাচ্চ হস্তন্যস্তপাষাণাদিবদিতি। দ্বিতীয়পয্যায়স্য তাৎপয্যমাহ- সাবয়বত্বাদিত্যাদিনা। কিমিত্যেতস্থ্য প্রশাসনে দ্বাবাপৃথিব্যো বর্ত্তেতে, তত্রাহ-এতদ্ধীতি। পৃথিব্যাদিব্যবস্থা নিয়ন্তারং বিনাহনুপপন্না তৎকল্লিকেত্যর্থঃ। তথাপি কিমিত্যেতেন বিধৃতে দ্যাবাপৃথিব্যাবিতি, তত্রাহ-সর্ব্বময্যাদেতি। ‘এষ সেতুব্বিধরণঃ’ ইতি শ্রুত্যন্তরমাশ্রিত্য ফলিতমাহ-অতো নাস্ত্যেতি। দ্বিতীয়পয্যায়ার্থমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। তচ্ছব্দোপাত্তমর্থং স্ফোরয়তি-অব্যভিচারীতি। অব্যভিচারিত্বং প্রকটয়তি-চেতনাবন্তমিতি। পৃথিব্যাদেনিয়তত্ত্ব- মেতচ্ছব্দার্থঃ। নিয়ত্ত্বসিদ্ধাবপি কথমীশ্বরসিদ্ধিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-যেনেতি। উগ্রত্বং পৃথিব্যা- দেশ্চেতনাবদভিমানিদেবতাবত্বেন স্বাতন্ত্র্যম্। ‘যেন স্বস্তম্ভিতং যেন নাকো যো অন্তরিক্ষে রজসো বিমানঃ কম্লৈ দেবায় হবিষা বিধেম’ ইত্যত্র হিরণ্যগর্ভাধিষ্ঠাতেশ্বরঃ পৃথিব্যাদেনিয়- স্তোচ্যতে। ন হি হিরণ্যগর্ভমাত্রস্যাস্মিন্ প্রকরণে পূর্ব্বাপরগ্রন্থয়োরুচ্যমানং নিরঙ্কুশং সর্ব্বনিয়ন্তৃত্বং সম্ভবতীতি ভাবঃ। ২

এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গাগি নিমেষা মুহূর্ত! ইত্যেতে কালাবয়বাঃ সর্ব্বস্যাতীতানাগতবর্তমানস্য জনিমতঃ কলয়িতারঃ,-যথা লোকে প্রভুণা নিয়তো -গণকঃ সর্ব্বমায়ং ব্যয়ঞ্চাপ্রমত্তো গণয়তি, তথা প্রভুস্থানীয় এষাৎ কালাবয়বানাৎ নিয়ন্তা। তথা প্রাচ্যঃ প্রাগঞ্চনাঃ পূর্বদিগমনা নদ্যঃ স্যন্দন্তে স্রবন্তি, শ্বেতেভ্যঃ হিমবদাদিভ্যঃ পর্ব্বতেভ্যো গিরিভ্যো গঙ্গাদ্যা নদ্যঃ, তাশ্চ যথাপ্রবর্তিতা এব

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমঃ ব্রাহ্মণম্।
৮৮৫

নিয়তাঃ প্রবর্তন্তে, অন্যথাপি প্রবর্তিতুমুৎসহন্ত্যঃ; তদেতল্লিঙ্গৎ প্রশান্তঃ। প্রতীচ্যোহন্যাঃ প্রতীচীং দিশমঞ্চন্তি সিন্ধাদ্যা নদ্যঃ অন্যাশ্চ যাৎ যাৎ দিশমনু- প্রবৃত্তাস্তাৎ তাং ন ব্যভিচরস্তি; তচ্চ লিঙ্গম্। ৩

এতে কালাবয়বা বিধৃতাস্তিষ্ঠন্তীতি সম্বন্ধঃ। তত্রানুমানং বক্তুং হেতুমাহ-সর্ব্বস্যেতি। যঃ কলয়িতা স নিয়ন্তপূর্ব্বক ইতি ব্যাপ্তিভূমিমাহ-যথেতি। দাষ্টান্তিকং দর্শয়ন্ননুমানমাহ- তথেতি। নিমেষাদয়ো নিয়ন্তপূর্ব্বকাঃ কলয়িতৃত্বাৎ সম্প্রতিপন্নবদিত্যর্থঃ। কান্তা নদ্য ইত্যপেক্ষায়ামাহ-গঙ্গাদ্যা ইতি। অন্যথা প্রবর্ত্তিতুমুৎসহমানত্বং তত্তদ্দেবতানাং চেতনত্বেন স্বাতন্ত্র্যম্। বিমতা নিয়ন্তপূর্ব্বিকা নিয়তপ্রবৃত্তিত্বাদ ভৃত্যাদিপ্রবৃত্তিবদিতি চতুর্থপর্যায়ার্থঃ। নিয়তপ্রবৃত্তিমত্ত্বং তদেতদিত্যুচ্যতে। তচ্চেত্যব্যভিচারিতোক্তিঃ। ৩

কিঞ্চ, দদতঃ হিরণ্যাদীন্ প্রযচ্ছতঃ আত্মপীড়াং কুর্ব্বতোহপি প্রমাণজ্ঞা-অপি মনুষ্যাঃ প্রশংসন্তি; তত্র যচ্চ দীয়তে, যে চ দদতি, যে চ প্রতিগৃহ্নন্তি, তেষামিহৈব সমাগমো বিলয়শ্চ অন্বক্ষো দৃশ্যতে, অদৃষ্টস্তু পরঃ সমাগমঃ। তথাপি মনুষ্যা দদতাৎ দানফলেন সংযোগং পশ্যন্তঃ প্রমাণজ্ঞতয়া প্রশংসন্তি; তচ্চ, কৰ্ম্মফলেন সংযোজয়ি- তরি কর্ত্তুঃ কৰ্ম্মফলবিভাগজ্ঞে প্রশাস্তরি অসতি ন স্যাৎ, দানক্রিয়ায়াঃ প্রত্যক্ষ- বিনাশিত্বাৎ; তস্মাদস্তি দানকর্ত্তৃণাং ফলেন সংযোজয়িতা। ৪

বিমতং বিশিষ্টজ্ঞানবদ্দাতৃকং কৰ্ম্মফলত্বাৎ সেবাফলবদিত্যভিপ্রেত্য পঞ্চমং পর্যায়মুখাপ- রতি-কিঞ্চেতি। দাতা প্রতিগ্রহীতা দানং দেয়ং বা ফলং দাস্যতি কিমিশ্বরেণেত্যাশঙ্ক্যাহ- তত্রেতি। দাত্রাদীনামিহৈব প্রত্যক্ষো নাশো দৃশ্যতে, তেন তৎপ্রযুক্তো দৃষ্টঃ পুরুষার্থো ন কশ্চিদস্তীতার্থঃ। অদৃষ্টং পুরুষার্থং প্রত্যাহ-অদৃষ্টস্থিতি। সমাগমঃ ফলপ্রতিলাভঃ, স খল্বৈহিকো ন ভবতি কিন্তু পারলৌকিকঃ, তথা চ নাসাবিহৈব নষ্ট-দাত্রাদিপ্রযুক্তঃ সম্ভবতীত্যর্থঃ। তহি ফলদাতুরভাবাৎ স্বার্থভ্রংশো হি মূর্খতেতি ন্যায়াদ্দাতৃপ্রশংসৈব মা ভূদিত্যাশঙ্ক্যাহ-তথাহ- পীতি। ফলসংযোগদৃষ্টৌ হেতুমাহ-প্রমাণজ্ঞতয়েতি। ‘হিরণ্যদা অমৃতত্বং ভজন্তে’ ইত্যাদি প্রমাণম্। তথাপি কথমাশ্বরসিদ্ধিস্তত্রাহ-কর্ত্তুরিতি। তদ্ধি দাতৃপ্রশংসনং বিশিষ্টে নিয়ন্তযা- সত্যনুপপন্নং তৎকল্পকমিত্যর্থঃ। দানক্রিয়াবশাদেব তৎফলসিদ্ধৌ কৃতং নিয়ন্ত্রেতি চেন্নেত্যাহ- দানেতি। কর্ম্মণঃ ক্ষণিকত্বাৎ ফলস্য চ কালান্তরভাবিত্বান্ন সাধনত্তোপপত্তিরিত্যর্থঃ। অনু- মানার্থাপত্তিভ্যাং সিদ্ধমর্থমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ৪

অপূর্ব্বমিতি চেৎ; ন, তৎসদ্ভাবে প্রমাণানুপপত্তেঃ। প্রশান্তরপীতি চেৎ; ন আগমতাৎপর্য্যস্য সিদ্ধত্বাৎ; অবোচাম হ্যাগমস্য বস্তুপরত্বম্। কিঞ্চান্যৎ, অপূর্ব্ব- কল্পনায়াঞ্চার্থপত্তেঃ ক্ষয়ঃ, অন্যথৈবোপপত্তেঃ; সেবাফলস্য সেব্যাৎ প্রাপ্তিদর্শনাৎ। সেবায়াশ্চ ক্রিয়াত্বাৎ তৎসামান্যাচ্চ, যাগদানহোমাদীনাং সেব্যাদীশ্বরাদেঃ ফল- প্রাপ্তিরুপপদ্যতে। দৃষ্টক্রিয়াধর্মসামর্থ্যমপরিত্যজ্যৈব ফলপ্রাপ্তিকল্পনোপপতৌ দৃষ্টক্রিয়াধর্মসামর্থ্যপরিত্যাগো ন ন্যায্যঃ। ৫

৮৮৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অপূর্ব্বস্যৈব ফলদাতৃত্বাৎ কৃতমীশ্বরেণেতি-অপূর্ব্বমিতি চেদিতি। স্বয়মচেতনং চেতনা- নধিষ্ঠিতং চাপূর্ব্বং ফলদাতৃ ন কল্লামপ্রামাণিকত্বাদিতি পরিহরতি-নেতি। ঈশ্বরদ্বেষী শঙ্কতে- প্রশাস্তরিতি। সস্তাবে প্রমাণানুপপত্তিরিতি শেষঃ। পরিহরতি-নাগমেতি। কথং কাৰ্য্য- পরস্যাগমন্য বস্তুপরত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-অবোচামেতি। কৰ্ম্মবিধিহি ফলদাত্রতিরেকেণ নোপ- পদ্যতে, ন চ কৰ্মাশুতরবিনাশি কালান্তরভাবিফলানুকূলং, তদর্থাপত্তিসিদ্ধেইপূর্ব্বে কথং মানাসিদ্ধিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-কিং চেতি। ন কেবলং সদ্ভাবে প্রমাণাসত্ত্বমেবাপূর্ব্বে দূষণং, কিন্তুন্যচ্চ কিঞ্চিদন্তীতি যাবৎ। তদেব প্রকটয়তি-অপূর্ব্বেতি। অপূর্বস্থ্য কন্ননায়াং যাথাপত্তিঃ শক্যতে, তস্যাঃ কল্পিতমপূর্ব্বমন্তরেণাপ্যুপপতেঃ ক্ষয়ঃ স্যাদিতি যোজনা। অন্যথাপ্যুপপত্তিং বিবৃণোতি- সেবেতি। যাগাদিফলমপীশ্বরাং সম্ভবতীতি শেষঃ। কথমীশ্বরাধীনা যাগাদিফলপ্রাপ্তিস্তত্রাহ- সেবায়াশ্চেতি। আদিপদেনেন্দ্রাদিদেবতা গৃহ্যন্তে। বিমতা বিশিষ্টজ্ঞানবতা দীয়মানফলবর্তী বিশিষ্টক্রিয়াত্বাৎ সম্প্রতিপন্নবদিতি ভাবঃ। ইতশ্চাপূর্বকল্পনা ন যুক্তেত্যাহ-দুন্থেতি। দৃষ্টং সেবায়া ধর্মত্বেন সামর্থ্যং সেব্যাৎ ফলপ্রাপকত্বং, তদনুসৃত্য যাগাদৌ ফলপ্রাপ্তিসম্ভবে তন্নিরা- সেনাপূর্ব্বাৎ তৎকল্পনা ন্যায্যা, দৃষ্টান্তুসারিণ্যাং কল্পনায়াং তদ্বিরোধিকল্পনাযোগাদিতার্থঃ। ৫

কল্পনাধিক্যাচ্চ,—ঈশ্বরঃ কল্প্যঃ অপূর্ব্বং বা? তত্র ক্রিয়ায়াশ্চ স্বভাবঃ সেব্যাৎ ফলপ্রাপ্তিঃ দৃষ্টা, ন ত্বপূর্ব্বাৎ। নচাপূর্ব্বং দৃষ্টম্; তত্রাপূর্ব্বমদৃষ্টং কল্পয়িতব্যম্; তস্য চ ফলদাতৃত্বে সামর্থ্যম্; সামর্থ্যে চ সতি দানঞ্চাভ্যধিকমিতি; ইহ তু ঈশ্বরস্য সেব্যস্য সম্ভাবমাত্রং কল্প্যং, ন তু ফলদানসামর্থ্যং দাতৃত্বঞ্চ, সেব্যাৎ ফলপ্রাপ্তিদর্শনাৎ। অনুমানঞ্চ দর্শিতম্—“দ্যাবাপৃথিব্যো বিধৃতে তিষ্ঠতঃ” ইত্যাদি। ৬

অপূর্ব্বস্য ফলহেতুত্বে দোষান্তরমাহ—কল্পনেতি। তদাধিক্যং বস্তুঃ পরামৃশতি—ঈশ্বর ইতি। নাপূর্ব্বং কল্প্যং, ক্লুপ্তত্বাত্তন্ন কল্পনাধিক্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ—তত্রেতি। ব্যবহারভূমিঃ সপ্তম্যর্থঃ, ভূমিকাং কৃত্বা কল্পনাধিক্যং স্ফুটয়তি—তত্রেত্যাদিনা। অপূর্ব্বস্যাদৃষ্টত্বে সতীতি যাবৎ। ইতি কল্পনাধিক্যমিতি শেষঃ। ত্বন্মতেহপি তুল্যা কল্পনেত্যাশঙ্ক্যাহ—ইহ ত্বিতি। স্বপক্ষে ধর্ম্মিমাত্রং কল্যং, পরপক্ষে ধর্ম্মশ্চেত্যাধিক্যং, তস্মাৎ ফলমত উপপত্তেরিতি ন্যায়েন পরস্যৈব ফলদাতৃতেতি ভাবঃ। ধর্ম্মিণোহপি প্রামাণিকত্বং ন কল্প্যত্বমিত্যভিপ্রেত্যাহ— অনুমানং চেতি। ৬

তথা চ যজমানং দেবা ঈশ্বরাঃ সন্তো জীবনার্থেহনুগতাঃ চরুপুরোড়াশাদ্যুপ- জীবনপ্রয়োজনেন, অন্যথাপি জীবিতুমুৎসহন্তঃ কৃপণাৎ হীনাৎ বৃত্তিমাশ্রিত্য স্থিতাঃ, তচ্চ প্রশান্তঃ প্রশাসনাৎ স্যাৎ। তথা পিতরোহপি তদর্থং দর্ব্বীং দব্বীহোম্ অন্বায়ত্তা অনুগতা ইত্যর্থঃ। সমানং সর্ব্বমন্যৎ ॥২০৩৷৷৯৷৷

ঈশ্বরাস্তিত্বে হেত্বন্তরমাহ-তথা চেতি। দেবা যজমানমন্বায়ত্তা ইতি সম্বন্ধঃ। জীবনার্থে জীবনং নিমিত্তীকৃত্যেতি যাবৎ। দেবানামীশ্বরাণামপি হব্যার্থিত্বেন মনুষ্যাধীনত্বাখ্য-হীন-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রাহ্মণম্।

৮৮৭

বৃত্তিভাক্বং নিয়ন্ত কল্পকমিত্যর্থঃ। যো ন কস্যচিৎ প্রকৃতিত্বেন বিকৃতিত্বেন বা বর্ত্ততে, স দর্বীহোমঃ। ২০৩। ৯।

ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্ব শ্রুতিবাক্যে ব্রহ্মের স্থূলত্বাদি বহু বিশেষণের প্রত্যাখ্যান করাতেই তাদৃশ নির্বিশেষ অক্ষর ব্রহ্মের অস্তিত্ব একপ্রকার প্রতি- পাদিত হইয়াছে; তথাপি, তদ্বিষয়ে সাধারণ লোকের আশঙ্কা বা সংশয় উপস্থিত হইতে পারে, সেই আশঙ্কা অপনয়নের নিমিত্ত অক্ষরের অস্তিত্ব প্রমাণ করিবার জন্য কার্য্যলিঙ্গক অনুমান প্রদর্শন করা হইতেছে—‘এতস্য বা অক্ষরস্য’ ইত্যাদি(১)।

এই যে সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষরূপী সর্ব্বান্তর অক্ষর ব্রহ্ম নিরূপিত হইল, এবং যাহা ক্ষুধাপিপাসাদি সংসার-ধর্মবর্জিত আত্মা, সেই অক্ষর ব্রহ্মের শাসনে—রাজার শাসনে যেমন রাজ্য অক্ষত ও নিয়মবর্তী হইয়া থাকে, হে গাগি, তেমনি এই অক্ষ- রের সুশাসনে সূর্য্য ও চন্দ্রকে অর্থাৎ দিন ও রাত্রির প্রদীপস্বরূপ সূর্য্য ও চন্দ্রকে— তাহাদের দ্বারা লোকের যেরূপ প্রয়োজন সাধিত হইতে পারে, তাহা সাধন করিবার জন্যই অভিজ্ঞ শাসনকর্তাই তাহাদের নির্মাণ করিয়াছেন; কারণ, প্রদীপের ন্যায় উহারাও সমভাবে সর্ব্বপ্রাণীর সর্ব্বপ্রকার উপকার সাধন করিয়া থাকে। অতএব নিশ্চয়ই তিনি আছেন, যাহা দ্বারা নির্মিত সূর্য্য ও চন্দ্র এত ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন এবং নানাবিষয়ে স্বাধীন হইয়াও বিশেষভাবে ধৃত হইয়া রহিয়াছেন—নিদ্দিষ্ট দেশ, কাল ও প্রয়োজনানুসারে উদয় ও অস্ত দ্বারা হ্রাস বৃদ্ধি ভোগ করিতেছেন। অতএব প্রদীপের যেমন একজন স্রষ্টা ও বারণকত্তা থাকে, তেমনি এই উভয়েরও(সূর্য্য ও চন্দ্রেরও) স্রষ্টা ও শাসনকর্তা অক্ষর ব্রহ্ম নিশ্চয়ই আছেন। ১

হে গাগি, এই অক্ষরের প্রকৃষ্ট শাসনে থাকায় দ্যাবা-পৃথিবী—দ্যুলোক ও পৃথিবী সাবয়বত্বনিবন্ধন স্বভাবভঙ্গুর হইয়াও, গুরুত্ব থাকায় পতনশীল হইয়াও, পরস্পরের সহিত সংযুক্ত থাকায় বিধ্বংসশীল হইয়াও, এবং তদভিমানী চেতন দেবতাকর্তৃক অধিষ্ঠিত থাকায় স্বতন্ত্র বা স্বাধীন হইয়াও এই অক্ষরের শাসনাধীন

(১) তাৎপয্য—যেখানে কারণের প্রত্যক্ষ হয় না, কেবল তাহার কাষটি মাত্র প্রত্যক্ষ হয়; প্রত্যক্ষের বিষয়ীভূত সেই কায্য দ্বারা যে, অপ্রত্যক্ষ তৎকারণের অস্তিত্বানুমান, তাহাই ‘কায্যলিঙ্গক অনুমান।’ এই সুয্য, চন্দ্র প্রভৃতি বস্তু, নচয়, রাজশাসনাধান প্রজামণ্ডলীর ন্যায় যখন নিয়মিত ভাবে নিজ নিজ কর্ত্তবাসাধন করিতেছে, তখন নিশ্চয়ই উহাদেরও শাসনকর্ত্তা একজন আছে, যাহার শাসন লঙ্ঘন করা উহাদের সাধ্যাতীত বুঝিতে হইবে, যিনি উহাদের সেই শাসনকর্ত্তা, তিনিই অক্ষর ব্রহ্ম।

৮৮৮, বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হইয়া বিধৃত রহিয়াছে। এই অক্ষরই হইতেছে সর্ব্বপ্রকার ব্যবস্থার অর্থাৎ- পার্থক্য-রক্ষার সেতুস্বরূপ এবং সমস্ত মর্য্যাদার(নিয়মের) রক্ষাকর্তা; এই জন্যই দ্যুলোক ও পৃথিবী এই অক্ষরের শাসন অমান্য করিতে সমর্থ হয় না। ইহা হইতেই উক্ত অক্ষরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হইল; কেন না, দ্যুলোক ও পৃথিবী যে, নিয়মিত ভাবে বর্তমান রহিয়াছে, ইহাই তাহার অস্তিত্ব-সাধনের অধ্যভিচারী (নির্দোষ) হেতু বা প্রমাণ; কারণ, চৈতন্যসম্পন্ন অসংসারী একজন শাসনকর্তা না থাকিলে যথোক্ত নিয়ম রক্ষা করা কখনই সম্ভবপর হইত না। যে হেতু ‘যাহা দ্বারা দ্যুলোক উগ্র ও শুষ্ক এবং পৃথিবী দৃঢ়তাপন্ন হইয়াছে’ এই মন্ত্রেও ঐ কথারই সমর্থন রহিয়াছে। ২

হে গার্গি, নিমেষ, মুহূর্ত্ত প্রভৃতি কালাবয়বসমূহ—যাহারা ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকালীন জন্মশীল সমস্ত বস্তুর কলয়িতা(বৃদ্ধিহ্রাসাদিজনক),[তাহারা] এই অক্ষরেরই শাসনে[বিধৃত রহিয়াছে]; জগতে প্রভুকর্তৃক নিয়োজিত গণক (হিসাব-রক্ষক) যেমন সাবধান হইয়া প্রভুর আয়-ব্যয়ের হিসাব রক্ষা করে, তেমনি প্রভুস্থানীয় অক্ষর ব্রহ্মও এই সমস্ত কালাবয়বের নিয়ামক অর্থাৎ নিয়মিত- ভাবে পরিচালক। এইরূপ, প্রাচী অর্থাৎ পূর্ব্বদিগভিমুখে গমনশীল যে সমস্ত নদী ক্ষরিত—নিয়ত প্রবাহিত হইতেছে, এবং শ্বেতগিরি হিমালয় প্রভৃতি স্থান হইতে যে সমস্ত নদী বাহির হইয়াছে, সে সমস্ত নদী অন্য পথে চলিতে সমর্থ হইয়াও যে, নিয়মিতভাবে একই পথে চলিতেছে, ইহাও সেই শাসনকর্তার অস্তিত্বানুমাপক; আর যে সমস্ত নদী পশ্চিমদিক্সামিনী—যেমন সিন্ধু প্রভৃতি, এবং আরও যে সমস্ত নদী যে যে দিকে প্রবাহিত হইতেছে; তাহারা যে, কখনও সেই সেই নিদ্দিষ্ট দিক্ পরিত্যাগ করিতেছে না, তাহাও তাহাদের একজন শাসনকর্তার অস্তিত্বসাধক। ৩

অপিচ, যাহারা দান করে—সুবর্ণাদি বস্তু প্রদান করে, তাহারা ঐরূপ দুষ্কর কর্ম্ম করিলেও, বিজ্ঞ মনুষ্যগণ তাহাদের প্রশংসাই করিয়া থাকেন। এখানে বুঝিতে হইবে যে, যাহা দান করা হয়, এবং যাহারা দান করে ও যাহারা তাহা গ্রহণ করে, ইহলোকেই তাহাদের পরস্পর সংযোগ-ধ্বংস প্রত্যক্ষ দেখিতে পাওয়া যায়। তাহাদের যে, পুনর্ব্বার ঐরূপ সংযোগ হইবে, ইহা প্রত্যক্ষের সম্পূর্ণ অগোচর; তথাপি অভিজ্ঞ মনুষ্যগণ যে প্রমাণবলে দানফলের সহিত দাহগণের ভবিষ্যৎ সংযোগ দর্শন করিয়া প্রশংসা করিয়া থাকেন, তাহাও —কর্তার বিভিন্নপ্রকার কর্ম্মফলাভিজ্ঞ একজন শাসনকর্তার—দানাদি ক্রিয়া

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রাহ্মণম্।

৮৮৯

তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হইয়া গেলেও, যিনি কর্মফলের সহিত কর্তার সংযোগ ঘটাইয়া দিতে পারেন, এরূপ একজন শক্তিমান্ চেতনের অনুমাপক; অতএব, যাহারা দান করে, কর্মফলের সহিত তাহাদের সংযোজক একজন নিশ্চয়ই আছেন(১)। ৪

যদি বল, অপূর্ব্বই(অদৃষ্টই) কর্তার ফলসংযোগ ঘটাইয়া থাকে; না,- তাহাও বলিতে পার না;[ঐরূপ শাসনকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার না করিলে,] অপূর্ব্বের(অদৃষ্টের) অস্তিত্বে কোন প্রমাণই উপপন্ন হয় না। যদি বল, প্রশাসিতার সদ্ভাবেও সেই কথা বলা যাইতে পারে; না, তাহা বলিতে পারা যায় না; কারণ, তাঁহার অস্তিত্ব-সাধনেই যে, শ্রুতির তাৎপর্য্য, তাহা পূর্ব্বেই প্রতিপাদিত হইয়াছে। সত্যস্বরূপ ব্রহ্ম-প্রতিপাদনেই যে, শ্রুতির তাৎপর্য্য, [কেবলই কৰ্ম্ম প্রতিপাদনে নহে], এ কথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। আরও এক কথা, উপাসক যখন উপাস্য ব্রহ্ম হইতেই আরাধনার(উপাসনার) ফললাভ করিতে সমর্থ হয়, তখন মধ্যবর্তী একটা অপূর্ব্ব স্বীকার করিবার আবশ্যকতা কি? বরং ‘অপূর্ব্বের’ সদ্ভাব-সাধক ‘অর্থাপত্তি’ প্রমাণই দুর্ব্বল বা অকৃতকার্য্য হইতে পারে(২)। বিশেষতঃ সেবা(উপাসনা) যখন ক্রিয়া ভিন্ন আর কিছুই নহে, তখন তজ্জাতীয় যাগ, দান ও হোমাদি ক্রিয়ার ফলও সেবনীয় ঈশ্বর হইতে লাভ

(১) তাৎপয্য-দানই হউক, আর গ্রহণই হউক, কিম্বা অন্য যে কোনপ্রকার কার্য্যই হউক, ক্রিয়ামাত্রই বিনাশশীল, এবং দাতা ও গ্রহীতা উভয়ই বিনাশশীল; অথচ যে ব্যক্তি আজ কিছু দান করিল, সে ত সঙ্গে সঙ্গে তাহার ফল পাইল না, এবং তাহার অনুষ্ঠিত কর্ম্মের প্রমাণস্বরূপ দত্ত বস্তু ও গ্রহীতা-উভয়েই কালক্রমে বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে; অপচ দাতা পারলৌকিক অপ্রত্যক্ষ ফলের প্রত্যাশায় বসিয়া রহিয়াছে। এখন বিবেচনা করিয়া দেখিলে মনে হয়-যে কাজের ফল হাতে হাতে হয় না, এবং যাহার সাক্ষী প্রমাণও কিছু থাকে না, সেই রকম কায্যেতে লোকে যে ক্লেশার্জিত ধন ত্যাগ করে, লোকের তাহাকে নিন্দা করাই উচিত হয়, কিন্তু অভিজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রই শতমুখে তাহার প্রশংসা করিয়া থাকেন; ইহার কারণ কি? অপক্ষপাত সর্ব্বদর্শী একজন শাসনকর্তার অস্তিত্বই ইহার কারণ; এমনই একজন সুক্ষ্মদর্শী শাসনকর্তা আছেন, যিনি প্রত্যেকের বিভিন্নপ্রকার কর্ম্ম ও তাহার ফল পরিগণিত করিয়া যথাযথভাবে কর্ম্মকর্তাকে প্রদান করিয়া থাকেন। তিনি আছেন বলিয়াই লোকে পারলৌকিক কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে, এবং অপর লোকেও তাহার প্রশংসা করে।

(২) তাৎপর্য্য—অদৃষ্টবাদীরা বলিয়া থাকেন—ক্রিয়ামাত্রই ধ্বংসশীল; সুতরাং মনুষ্যের অনুষ্ঠিত ধর্ম্মকর্মও ধ্বংসশীল; অতএব সুদূর ভবিষ্যতে তাহার ফল কোথা হইতে আসিবে? এই প্রশ্নের উত্তরে তাহারা প্রত্যেক কর্মেরই একটা ‘অপূর্ব্ব’ স্বীকার করিয়া থাকেন; অর্থাৎ অনুষ্ঠিত কর্মগুলি যথানির্দিষ্ট ফলপ্রদানে সক্ষম এমন একটা কিছু রাখিয়া নষ্ট হইয়া যায়, যাহা

৮৯০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

করাই সুসঙ্গত হয়; এবং লোকপ্রসিদ্ধ ক্রিয়ার স্বভাবসিদ্ধ সামর্থ্য উপেক্ষা না করিয়াই যদি শাস্ত্রোক্ত অলৌকিক ক্রিয়ারও ফলপ্রাপ্তি উপপাদন করিতে পারা যায়, তাহা হইলে লৌকিক ক্রিয়ানুযায়ী সামর্থ্য পরিত্যাগ করাও ন্যায়সঙ্গত হয় না। ৫

এ পক্ষে কল্পনার আধিক্যও অপর দোষ;—ফললাভের কারণ কল্পনা করিতে হইলে, ঈশ্বরের সম্ভাব কল্পনা করিতে হইবে? কিম্বা অপূর্ব্বের সম্ভাব কল্পনা করিতে হইবে? তন্মধ্যে দেখা গিয়াছে যে, সেবনীয় বা উপাস্য হইতে ক্রিয়া- ফল প্রাপ্তিই ক্রিয়ার স্বাভাবিক ধর্ম্ম, কিন্তু ‘অপূর্ব্ব’ হইতে যে ফলপ্রাপ্তি হয়, তাহা কোথাও প্রত্যক্ষতঃ দেখা যায় না; আর ‘অপূর্ব্ব’ পদার্থটি দৃষ্টও নয় (চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূতও নয়)। এ পক্ষে প্রথমতঃ অদৃষ্টের ‘অপূর্ব্বের’ অস্তিত্ব কল্পনা করিতে হইবে, তাহার পর, সেই অপূর্ব্বেরই আবার ফলপ্রদান- সামর্থ্য কল্পনা করিতে হইবে; এবং সামর্থ্য সিদ্ধ হইলে পর, দানেরও আবার সমধিক উৎকর্ষ কল্পনা করিতে হইবে; আমার কিন্তু সেবনীয় ঈশ্বরের সম্ভাব- মাত্র কল্পনা করিলেই হয়; কিন্তু তাঁহার ফলদানসামর্থ্য কিম্বা দানকর্তৃত্ব কিছুই কল্পনা করিতে হইবে না; কেন না, সেবনীয় হইতে যে, ফললাভ হইয়া থাকে, ইহা প্রত্যক্ষ দেখা যায়; তাহার উপর আবার এ বিষয়ে “দ্যাবাপৃথিব্যো বিধুতে তিষ্ঠতঃ” ইত্যাদি বলবৎ প্রমাণও রহিয়াছে; সুতরাং প্রত্যক্ষ ও অনুমান প্রমাণে সিদ্ধ বলিয়া আমার পক্ষেই নূতন করিয়া কল্পনার বিষয় অতি অল্প। ৬

দেবতাগণ এইরূপ শক্তিসম্পন্ন হইয়াও যে, জীবনাধায়ক চরু ও পুরোডাশ প্রভৃতির জন্য যজমানের অনুগত থাকেন, অর্থাৎ তাঁহারা অন্য প্রকারে জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াও যে, দয়াধীন দীনবৃত্তি অবলম্বন করিয়া থাকেন, তাহাও শাসনকর্তার তীব্র শাসনেই হইতে পারে। সেইরূপ, পিতৃগণ জীবিকার জন্য দর্ব্বীহোমের অনুগত হইয়া আছেন ॥ ২০৩॥ ৯॥

কৰ্ম্মকর্ত্তাকে নির্দিষ্ট ফল প্রদান না করা পর্য্যন্ত বিনষ্ট হয় না, কৰ্ম্মফল উৎপন্ন হইবামাত্র ‘অপূর্ব্ব’ আপনিই নষ্ট হইয়া যায়। ‘অপূর্ব্বের’ অপর নাম ‘অদৃষ্ট’-পাপ ও পুণ্য। উদয়নাচার্য্য বলিয়াছেন ‘চিরধ্বস্তং ফলায়ালং ন কৰ্ম্মাতিশয়ং বিনা।’ অর্থাৎ বহুকাল পূর্ব্বে যে কৰ্ম্ম ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে, মধ্যবর্তী অতিরিক্ত আর একটা কিছু না থাকিলে তাহা কখনই ফলপ্রদানে সমর্থ হইতে পারে না; অতএব কর্মের অতিরিক্ত একটা ‘অপূর্ব্ব পদার্থ’ অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। এই ‘অপূর্ব্ব’ অনুসারেই ঈশ্বর জীবের কৰ্ম্মফল প্রদান করিয়া থাকেন।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৯১

যো বা এতদক্ষরং গার্গ্যবিদিত্বাহস্মিল্লোকে জুহোতি যজতে তপস্তপ্যতে বহুনি বর্ষসহস্রাণ্যন্তবদেবাস্য তদ্ভবতি, যো বা এতদক্ষরং গার্গ্যবিদিত্বাস্মাল্লোকাৎ প্রৈতি, স কৃপণোহথ য এত- দক্ষরং গার্গি বিদিত্বাস্মাল্লোকাৎ প্রৈতি স ব্রাহ্মণঃ ॥ ২০৪ ॥ ১০ ॥

সরলার্থঃ।—হে গার্গি, অস্মিন্ লোকে(জগতি) যঃ(সাধকঃ বৈ এতৎ যথোক্তং) অক্ষরং অবিদিত্বা(অবিজ্ঞায়) জুহোতি(যথাবিধি দেবানুদ্দিশ্য অগ্নৌ হবিঃ প্রক্ষিপতি), যজতে(দেবানুদ্দিশ্য দ্রব্যং দদাতি), বহুনি বর্ষসহস্রাণি [ব্যাপ্য] তপঃ তপ্যতে, অন্য(হোমাদিকর্ত্তুঃ) তৎ(হোমাদিকং—তৎফল- মিত্যর্থঃ) অন্তবৎ(বিনাশশীলং) এব ভবতি। হে গার্গি, যঃ বৈ এতৎ অক্ষরং অবিদিত্বা অস্মাৎ লোকাৎ প্রৈতি(প্রয়াতি—ম্রিয়তে), সঃ(পরেতঃ) কৃপণঃ (দীনঃ, দুঃখভাগিত্বাৎ); অথ(পক্ষান্তরে) হে গার্গি, যঃ এতৎ অক্ষরং বিদিত্বা অস্মাৎ লোকাৎ প্রৈতি, সঃ(বিদ্বান্) ব্রাহ্মণঃ(ব্রহ্মনিষ্ঠ ইত্যর্থঃ) ॥২০৪৷৷১০॥

মূলানুবাদ।—হে গারি, যে লোক এই অক্ষর ব্রহ্মকে না জানিয়া হোম করে, যজ্ঞ করে, অথবা বহু সহস্র বর্ষব্যাপী তপস্যা করে, তাহার সে সমস্ত কর্ম্মের ফল নিশ্চয়ই অন্তবান্ অর্থাৎ পরিমিত ও ধ্বংসশীল হইয়া থাকে; এবং হে গার্গি, যে লোক এই অক্ষরকে না জানিয়া ইহলোক হইতে প্রয়াণ করে অর্থাৎ মরে, সে লোক রূপণ অর্থাৎ দুঃখভাগী অতি দীন; পক্ষান্তরে হে গার্গি, যে লোক এই অক্ষর ব্রহ্মকে জানিয়া এই জগৎ হইতে প্রয়াণ করে, সে লোক ব্রাহ্মণ বা ব্রহ্মনিষ্ঠ ॥ ২০৪ ॥ ১০ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—ইতশ্চাস্তি তদক্ষরম্, যস্মাৎ তদজ্ঞানে নিয়তা সংসা- রোপপত্তিঃ; ভবিতব্যং তু তেন, যদ্বিজ্ঞানাৎ তদ্বিচ্ছেদঃ, ন্যায়োপপত্তেঃ। ননু ক্রিয়াত এব তদ্বিচ্ছিত্তিঃ স্যাদিতি চেৎ, ন, যো বা এতদক্ষরং হে গার্গি, অবিদিত্বা অবিজ্ঞায় অস্মিন্ লোকে, জুহোতি যজতে তপস্তপ্যতে—যদ্যপি বহুনি বর্ষসহস্রাণি, অন্তবদেবাস্য তৎফলং ভবতি, তৎফলোপভোগান্তে ক্ষীয়ন্ত এবাস্য কর্ম্মাণি।

অপি চ, যদ্বিজ্ঞানাৎ কার্পণ্যাত্যয়ঃ সংসারবিচ্ছেদঃ, যদ্বিজ্ঞানাভাবাচ্চ কর্ম্মকৃৎ কৃপণঃ কৃতফলস্যৈবোপভোক্তা জননমরণ-প্রবন্ধারূঢ়ঃ সংসরতি,-তদন্ত্যক্ষরং প্রশাসিত্। তদেতদুচ্যতে-যো বা এতদক্ষরং গাগি, অবিদিত্বা অস্মাল্লোকাৎ

৮৯২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রৈতি, স কৃপণঃ পণক্রীত ইব দাসাদিঃ। অথ য এতদক্ষরৎ গার্গি, বিদিত্বা অস্মাল্লোকাৎ প্রৈতি, স ব্রাহ্মণঃ ॥২০৪৷৷১০৷৷

টীকা। ঈশ্বরাস্তিত্বে হেত্বন্তরমাহ—ইতশ্চেতি। মোক্ষহেতুজ্ঞানবিষয়ত্বেনাপি তদন্তীত্যাহ— ভবিতব্যমিতি। ‘যদজ্ঞানাৎ প্রবৃত্তির্যা তজ জ্ঞানাৎ সা নিবর্ত্ততে’ ইতি ন্যায়ঃ। কর্ম্মবশাদেব মোক্ষসিদ্ধেস্তদ্ধেতুজ্ঞানবিষয়ত্বেনাক্ষরং নাভ্যুপেয়মিতি শঙ্কতে—নম্বিতি। উত্তরবাক্যে- নো(ণো)ত্তরমাহ—নেত্যাদিনা। যস্যাজ্ঞানাদসকৃদনুষ্ঠিতানি বিশিষ্টফলান্যপি সর্ব্বাণি কর্ম্মাণি সংসারমেব ফলয়ন্তি, তদজ্ঞাতমক্ষরং নাস্তীত্যযুক্তং, সংসারাভাবপ্রসঙ্গাদিতি ভাবঃ। অক্ষরাস্তিত্বে হেত্বন্তরমাহ—অপি চেতি। পূর্ব্ববাক্যং জীবদবস্থপুরুষবিষয়মিদং তু পরলোক- বিষয়মিতি বিশেষং মত্বোত্তরবাক্যমবতার্য্য ব্যাচষ্টে—তদেতদিত্যাদিনা ॥২০৪॥১০॥

ভাষ্যানুবাদ।—এই কারণেও সেই অক্ষরের অস্তিত্ব অবশ্যস্বীকার্য্য। যেহেতু তাহাকে না জানিলে জীবের সংসারপ্রাপ্তি—জন্ম-মরণ প্রবাহভোগ ধ্রুব বা সুনিশ্চিত; সেইহেতু নিশ্চয়ই এমন একটি কিছু থাকা আবশ্যক হয়, যাঁহাকে ভাল করিয়া জানিলে, সেই সংসারের উচ্ছেদ হইতে পারে; আর একথা যুক্তিবিরুদ্ধও হয় না। যদি বল, শাস্ত্রোক্ত ক্রিয়া হইতেই যখন সংসারের উচ্ছেদ(মুক্তি) হইতে পারে,[ তখন আর অক্ষর-বিজ্ঞানের] প্রয়োজন কি? না—একথাও বলিতে পার না; কারণ শ্রুতি বলিতেছেন—‘হে গার্গি, যে ব্যক্তি এই জগতে এই অক্ষর ব্রহ্মকে না জানিয়া—অনুভব-গোচর না করিয়া হোম করে, যজ্ঞ করে ও তপস্যা করে—যদি সহস্র বৎসরও করে, তাহার ফল নিশ্চয়ই অন্তবান্ হইয়া থাকে, অর্থাৎ সেই ফলের ভোগ শেষ হইলেই তাহার অনুষ্ঠিত সমস্ত কর্ম্ম ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া থাকে’ ইত্যাদি।

আরও এক কথা, যাহাকে জানিলে কার্পণ্যের অবসান হয়, অর্থাৎ দুঃখময় সংসারের উচ্ছেদ বা নিবৃত্তি হয়; পক্ষান্তরে যাঁহাকে না জানার ফলে কর্মী পুরুষ কৃপণ-পদবাচ্য হয়—কেবল স্বকৃত কর্মফলমাত্রের ভোক্তা ও জন্ম-মরণ-প্রবাহে পতিত হইয়া সংসারী হয়, নিশ্চয়ই সর্ব্বশাসনকর্তা সেই অক্ষর ব্রহ্ম আছেন। এখন তাহাই বিশেষ করিয়া বলা হইতেছে যে,—‘হে গার্গি, যে ব্যক্তি এই অক্ষরকে না জানিয়া এই জগৎ হইতে প্রস্থান করে(মরে), সে ব্যক্তি কৃপণ—যেন মূল্যক্রীত দাস—অর্থাৎ ক্রীতদাসের মত; আর ‘হে গার্গি, যে ব্যক্তি এই অক্ষরকে জানিয়া এই জগৎ হইতে প্রস্থান করেন, তিনিই ব্রাহ্মণ(ব্রহ্মনিষ্ঠ)’ ইত্যাদি ॥২০৪৷৷১০৷৷

আভাসভাষ্যম্।—অগ্নির্দ্দহন-প্রকাশকত্বং স্বাভাবিকমস্য প্রশান্তত্বম্। অচেতনস্যৈবেত্যত আহ—

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৯৩

আভাস-ভাষ্যানুবাদ?—অগ্নির যেমন দাহ ও প্রকাশ কার্য্য স্বভাবসিদ্ধ, তেমনি এই প্রশাসনকর্তৃত্বও অক্ষর-শব্দবাচ্য অচেতন প্রধান বা প্রকৃতিরই স্বভাবসিদ্ধ হউক? এই আশঙ্কায় বলিতেছেন—

তদ্বা এতদক্ষরং গার্গ্যদৃষ্টং দ্রষ্টশ্রুতশ্রোত্রমতং মন্ত্রবিজ্ঞাতং বিজ্ঞাতৃ, নান্যদতোহস্তি দ্রষ্টু নান্যদতোহস্তি শ্রোতৃ নান্যদতোহস্তি মন্তৃ নান্যদতোহস্তি বিজ্ঞাতৃ এতস্মিন্ন খল্বক্ষরে গার্গ্যাকাশ ওতশ্চ প্রোতশ্চেতি ॥ ২০৫ ॥ ১১ ॥

সমলার্থঃ।—হে গার্গি, তৎ এতৎ(প্রকৃতং) অক্ষরং বৈ অদৃষ্টং(অন্যেন ন দৃষ্টচরম্),[স্বয়ং তু] দ্রষ্টু(দর্শনকর্তৃ); তথা, অশ্রুতং(অন্যেষাং শ্রবণে- ন্দ্রিয়াগ্রাহ্যং)[স্বয়ং তু] শ্রোতৃ(শ্রবণকর্তৃ); অমতং(অন্যেষাৎ মনসা অগৃহীতং) [স্বয়ং তু] মন্তৃ(মননকর্তৃ); অবিজ্ঞাতং(বুদ্ধিবৃত্তেঃ অগোচরত্বাৎ বিজ্ঞাতং ন ভবতি),[স্বয়ং তু] বিজ্ঞাতৃ(অন্যেষাং বিশেষেণ জ্ঞাতৃ);[কিং বহুনা,] অতঃ(অস্মাৎ অক্ষরাৎ) অন্যং দ্রষ্টু(দর্শনকর্তৃ) ন অস্তি; অতঃ অন্যৎ শ্রোতৃ ন অস্তি; অতঃ অন্যং মন্ত্র ন অস্তি; অতঃ অন্যৎ বিজ্ঞাতৃ ন অস্তি; হে গার্গি, এতস্মিন্ অক্ষরে মুখলু আকাশঃ ওতঃ চ প্রোতঃ চ(সর্বথা অনুস্যূত ইত্যর্থঃ) ॥২০৫৷৷১১৷৷

মূলানুবাদ?—হে গার্গি,[যে অক্ষর ব্রহ্মের কথা বলা হইল,] সেই এই অক্ষর হইতেছেন অপরের অদৃষ্ট, অথচ নিজে সকলের দ্রষ্টা; অপরের অশ্রুত(শ্রুতিগোচর হন না), অথচ নিজে সকলের শ্রোতা; এইরূপ অপরের মনোবৃত্তির অগোচর, কিন্তু নিজে সকলকে মনন করেন; বুদ্ধিবৃত্তির অগোচর বলিয়া অবিজ্ঞাত, অথচ নিজে সকলের বিজ্ঞাতা; এই অক্ষর ভিন্ন আর কেহ দ্রষ্টা নাই; আর কেহ শ্রোতা নাই; আর কেহ মননকর্তা নাই, এবং অপর কেহ বিজ্ঞাতা নাই। হে গার্গি, এই অক্ষর ব্রহ্মেই আকাশ ওতপ্রোতভাবে রহিয়াছে ॥ ২০৫ ॥ ১১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তদ্বা এতদক্ষরং গার্গ্যদৃষ্টং ন কেনচিৎ দৃষ্টম্ অবিষয়- ত্বাৎ, স্বয়ং তু দ্রষ্টু, দৃশিস্বরূপত্বাৎ; তথা অশ্রুতং, শ্রোত্রাদ্যবিষয়ত্বাৎ, স্বয়ং শ্রোতৃ, শ্রুতিস্বরূপত্বাৎ; তথা অমৃতম্, মনসোহবিষয়ত্বাৎ; স্বয়ং মস্তু মতিস্বরূপত্বাৎ;- তথা অবিজ্ঞাতং, বুদ্ধেরবিষয়ত্বাৎ, স্বয়ং বিজ্ঞাত্, বিজ্ঞানস্বরূপত্বাৎ।

৮৯৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

কিঞ্চ, ন অন্যৎ অতঃ অস্মাদক্ষরাৎ অস্তি-নাস্তি কিঞ্চিদ্রষ্টু দর্শনক্রিয়াকর্তৃ সর্ব্বত্র। তথা নান্যদতোহস্তি শ্রোতৃ; তদেবাক্ষরং শ্রোতৃ সর্ব্বত্র। নান্যদতো- হস্তি মন্তৃ; তদেবাক্ষরং মন্তৃ সর্বত্র সর্ব্বমনোদ্বারেণ। নান্যদতোহস্তি বিজ্ঞাতৃ বিজ্ঞানক্রিয়াকর্তৃ; তদেবাক্ষরং সর্ব্ববুদ্ধিদ্বারেণ বিজ্ঞানক্রিয়াকর্তৃ, ন অচেতনং প্রধানম্, অন্যদ্বা। এতস্মিন্ খলু অক্ষরে গার্গি, আকাশ ওতশ্চ প্রোতশ্চেতি, যদেব সাক্ষাদপরোক্ষাদ্ ব্রহ্ম, য আত্মা সর্ব্বান্তরঃ অশনায়াদি-সংসার-ধৰ্ম্মাতীতঃ, যস্মিন্নাকাশ ওতশ্চ প্রোতশ্চ, এষা পরা কাষ্ঠা, এষা পরা গতিঃ, এতৎ পরং ব্রহ্ম, এতৎ পৃথিব্যাদেরাকাশান্তস্য সত্যস্য সত্যম্ ॥২০৫৷৷১১৷৷

টীকা। প্রধানব দিনঃ শঙ্কামনুদ্যোত্তববাক্যন নিরাকরোতি-অগ্নেরিত্যাদিনা। ইতশ্চাক্ষরস্য নাচেতনত্বমিত্যাহ-কিঞ্চেতি। নাস্তীত্যন্বয়প্রদর্শনম্। অতোহন্যদিতি বিশেষণ- সিদ্ধমর্থমাহ-এতদিতি। অন্যদ্বা পূর্ব্বোক্তমব্যাকৃতাদিপৃথিব্যন্তং নিগমনবাক্যমুদাহৃত্য তস্য তাৎপয্যমাহ-এতস্মিন্নিতি। পরা কাঠা পরং পয্যাবসানং নাম্মাদুপরিষ্টাদধিষ্ঠানং কিঞ্চিদস্তী- ত্যর্থঃ। তস্যৈব পরমপুরুষার্থত্বমাহ-এষেতি। ‘পুরুষান্ন পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরা গতিঃ’ ইতি হি প্রত্যন্তরম্। ব্রহ্মাস্মদক্ষরাদন্তদস্তীতি চেয়েত্যাহ-এতদিতি। ননু চতুর্থে সত্যস্য সত্যং ব্রহ্ম ব্যাখ্যাতমক্ষরং তু নৈবমিতি চেত্তন্নাহ-এতৎ পৃথিব্যাদেরিতি ॥২০৫৷১১৷

ভাষ্যানুবাদ।—হে গাগি, সেই এই অক্ষর বস্তুটি অদৃষ্ট—দৃষ্টির বিষয় নয়, এইজন্য কেহ তাঁহাকে দেখিতে পায় না; অথচ নিজে দৃষ্টিস্বরূপ বলিয়া সকলের দ্রষ্টা। সেইরূপ, শ্রবণেন্দ্রিয়ের গ্রহণযোগ্য নয় বলিয়া অশ্রুত, অথচ নিজে শ্রুতিস্বরূপ বলিয়া শ্রোতা। সেইরূপ, মনের অগোচর বলিয়া অমত, কিন্তু নিন্দে মতিস্বরূপ; এইজন্য সকল বিষয়ের মননকারী; সেইরূপ, বুদ্ধির অবিষয় বলিয়া অবিজ্ঞাত, অথচ নিজে জ্ঞানস্বরূপ বলিয়া বিজ্ঞাতা বিশেষ- রূপে জ্ঞাতা।

অপিচ, এই অক্ষর ব্রহ্ম ভিন্ন অপর কোনও দ্রষ্টা—দর্শনকর্তা নাই; পরন্তু এই অক্ষর ব্রহ্মই সমস্ত দর্শন-ক্রিয়ার একমাত্র কর্তা; এইরূপ এই অক্ষর ভিন্ন অপর কিছু শ্রোতা নাই, পরন্তু এই অক্ষরই সর্ব্বত্র শ্রবণ-ক্রিয়ার কর্তা; এতদতি- রিক্ত কেহ মন্তা—মননের—নানাবিধ চিন্তার কর্তা নাই; পরন্তু এই অক্ষরই সর্ব্বত্র নিখিল মনোবৃত্তিদ্বারা মনন করিয়া থাকেন; অক্ষরই বিজ্ঞাতা বুদ্ধিবৃত্তি- রূপ বিজ্ঞানের কর্তা, এতদতিরিক্ত আর কেহ বিজ্ঞাতা নাই; পরন্তু উক্ত অক্ষরই বুদ্ধিসমষ্টির সাহায্যে বিজ্ঞান-ক্রিয়া সম্পাদন করিয়া থাকেন; কিন্তু অচেতন প্রধান(সাংখ্যোক্ত প্রকৃতি) বা অন্য কেহ বিজ্ঞাতা নহে। হে গার্গি, আকাশ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমঃ ব্রাহ্মণম্।

৮৯৫

এই অক্ষরেই ওত ও প্রোত রহিয়াছে। নিশ্চয়ই যাহা সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষস্বরূপ ব্রহ্ম, এবং যাহা অশনায়াদি সমস্ত সংসার-ধর্মবিবর্জিত সর্ব্বান্তর আত্মা, এবং আকাশ যাহাতে ওত-প্রোত রহিয়াছে; ইহাই জ্ঞাতব্যের পরা কাষ্ঠা বা চরম সীমা, ইহাই পরা গতি অর্থাৎ জীবের সর্বোৎকৃষ্ট শেষ গন্তব্য স্থান; ইহাই পর ব্রহ্ম; ইহাই—এই অক্ষরই আকাশ হইতে পৃথিবী পর্য্যন্ত সমস্ত সত্যেরও(আপেক্ষিক সত্য বস্তুরও) সত্যস্বরূপ অর্থাৎ তাহার আশ্রয়ে থাকিয়াই অপর সকল বস্তু সত্যবৎ প্রতিভাত হইতেছে ॥২০৫৷৷১১৷৷

সা হোবাচ ব্রাহ্মণা ভগবন্তস্তদেব বহু মন্যেধ্বং যদস্মান্নমস্কারেণ মুচ্যেধ্বম্, ন বৈ জাতু যুগ্মাকমিমং কশ্চিদ্ ব্রহ্মোদ্যং জেতেতি, ততো হ বাচরব্যুপররাম ॥ ২০৬ ॥ ১২ ॥

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্তৃতীয়াধ্যায়েহষ্টমঃ ব্রাহ্মণম্ ॥৩॥

সরলার্থঃ।—সা(বাচক্রবী গার্গী)[ব্রাহ্মণান্ সম্বোধয়ন্তী] উবাচ হ— হে ভগবন্তঃ ব্রাহ্মণাঃ,[যূসং] তৎ এব বহু মন্যেধ্বং(সবহমানং অবগচ্ছত), যৎ নমস্কারেণ(পণিপাতমাত্রেণ) অস্মাৎ(যাজ্ঞবল্ক্যাৎ) মুচ্যেষ্বং(বিমুক্তা ভবত); [কৃতঃ? যতঃ] যুগ্মাকং মধ্যে কশ্চিৎ(কশ্চিদপি) ইমং ব্রহ্মোদ্যং(ব্রহ্মবাদিনং যাজ্ঞবল্ক্যং) জাতৃ(কদাচিদপি) ন বৈ(নৈব) জেতা(বিজেষ্যতি) ইতি। ততঃ (অনন্তরং) বাচক্রবী(বচক্রকন্যা গার্গী) উপররাম হ ॥১০৬৷৷১৷৷

মূলানুবাদ।—সেই গার্গী ব্রাহ্মণগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলি- লেন—হে পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ, তোমরা ইহাই যথেষ্ট মনে কর যে, কেবল নমস্কার করিয়াই তোমরা ইহার নিকট হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিলে; অর্থাৎ ইহাকে জয় করার আশা দুরাশা মাত্র। কারণ, তোমাদের মধ্যে এমন কেহ নাই, যিনি কখনও এই ব্রহ্মবাদী যাজ্ঞ- বল্ক্যকে বিচারে পরাজিত করিতে পারেন। ইহার পর বাচরুবী (গার্গী) নিবৃত্ত হইলেন ॥ ২০৬॥ ১২॥

ইতি তৃতীয়োহধ্যায়ঃ অষ্টম ব্রাহ্মণ ব্যাখ্যা ॥ ৩ ॥ ৮ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—সা হোবাচ—হে ব্রাহ্মণা ভগবন্তঃ শৃণুত মদীয়ং বচঃ— তদেব বহু মন্যেধ্বং(মন্যধ্বম্?), কিং তৎ? যদস্মাদ্ যাজ্ঞবল্ক্যাৎ নমস্কারেণ মুচ্যোধ্বম—অস্মৈ নমস্কারং কৃত্বা, তদেব বহু মন্যধ্বমিত্যর্থঃ; জয়স্বস্য মনসাপি

৮৯৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

নাশৎনীয়ঃ, কিমুত কার্য্যতঃ। কম্মাৎ? ন বৈ যুগ্মাকং মধ্যে জাতু কদাচিদপি ইমং যাজ্ঞবল্ক্যৎ ব্রহ্মোদ্যৎ প্রতি জেতা। প্রশ্নৌ চেন্মহ্যং বক্ষ্যতি, ন বৈ জেতা ভবিতা—ইতি পূর্ব্বমেব ময়া প্রতিজ্ঞাতম্; অদ্যাপি মমায়মের নিশ্চয়ঃ ব্রহ্মোদ্যৎ প্রতি এতত্তুল্যো ন কশ্চিৎ বিদ্যত ইতি। ততো চ বাচক্লব্যুপররাম। ১

অত্রান্তর্য্যামিব্রাহ্মণে এতদুক্তম্—যৎ পৃথিবী ন বেদ, যৎ সর্ব্বাণি ভূতানি ন বিদু- রিতি চ, যমন্তর্য্যামিণং ন বিদুঃ, যেচন বিদুঃ, যচ্চ তদক্ষরং দর্শনাদি ক্রিয়াকর্তৃত্বেন সর্ব্বেষাং চেতনাধাতুরিত্যুক্তম্; কস্তু এষাং বিশেষঃ? কিং বা সামান্যম্? ইতি। ২ তত্র কেচিদাচক্ষতে—পরস্য মহাসমুদ্রস্থানীয়স্য ব্রহ্মণোহক্ষরস্যাপ্রচলিতস্বরূপস্য ঈষৎপ্রচলিতাবস্থা অন্তর্যামী; অত্যন্তপ্রচলিতাবস্থা ক্ষেত্রজ্ঞঃ,—যস্তৎ ন বেদ অন্তর্য্যামিণম্! তথা অন্যাঃ পঞ্চাবস্থাঃ পরিকল্পয়ন্তি; তথা অষ্টাবস্থা ব্রহ্মণো ভবন্তীতি বদন্তি। অন্যে অক্ষরস্য শক্তয় এতা ইতি বদন্তি, অনন্তশক্তিমদক্ষরমিতি চ। অন্যে ত অক্ষরস্য বিকারা ইতি বদন্তি। ৩

চ। যদ্যপি তু পশ্যতি বিকারা ইতি বর্হিণী। ৩

অবস্থা-শক্তী তাবন্নোপপদ্যেতে, অক্ষরস্য অশনায়াদি-সংসারধৰ্ম্মাতীতত্বশ্রুতেঃ; নহি অশনায়াদ্যতীতত্বম্ অশনায়াদিধর্মবদবস্থাবত্ত্বং চৈকস্য যুগপদুপপদ্যতে; তথা শক্তিমত্ত্বঞ্চ। বিকারাবয়বত্বে চ দোষাঃ প্রদর্শিতাশ্চতুর্থে; তস্মাদেতা অসত্যাঃ সর্ব্বাঃ কল্পনাঃ। ৪

কস্তহি ভেদ এষাম্? উপাধিকৃত ইতি ক্রমঃ; ন স্বত এষাং ভেদঃ অভেদো বা, সৈন্ধবঘনবৎ প্রজ্ঞানঘনৈকরসস্বাভাব্যাৎ, “অপূর্ব্বমনপরমনন্তরমবাহ্যম্” “অয়- মাত্মা ব্রহ্ম” ইতি চ শ্রুতেঃ; “স বাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ” ইতি চাথর্ব্বণে। তস্মান্নিরু- পাধিকস্যাত্মনো নিরুপাখ্যত্বাৎ নিবিশেষত্বাৎ একত্বাচ্চ “নেতি নেতি” ইতি ব্যপ- দেশো ভবতি; অবিদ্যা-কাম-কর্মবিশিষ্টকার্য্য-করণোপাধিরাত্মা সংসারী জীব উচ্যতে; নিত্যনিরতিশয়জ্ঞানশক্ত্যুপাধিরাত্মান্তর্যামীশ্বর উচাতে; স এব নিরু- পাধিঃ কেবলঃ শুদ্ধঃ স্বেন স্বভাবেন অক্ষরং পর উচ্যতে। তথা হিরণ্যগর্ভা- ব্যাকৃতদেবতাজাতিপিণ্ডমনুষ্যতির্য্যপ্রেতাদিকার্য্যকরণোপাধিবিশিষ্টস্তদাখ্যস্তদ্রূপো ভবতি। তথা “তদেজতি” ইতি ব্যাখ্যাতম্। তথা “এষ ত আত্মা” “এষ সর্ব্ব- ভূতান্তরাত্মা” “এষ সর্ব্বেযু ভূতেষু গূঢ়ঃ” “তত্ত্বমসি” “অহমেবেদং সর্ব্বম্” “আত্মৈবেদং সর্ব্বম্” “নান্যোহতোহস্তি দ্রষ্টা” ইত্যাদিশ্রুতয়ো ন বিরুধ্যন্তে; কল্পনান্তরেঘেতাঃ শ্রুতয়ো ন গচ্ছন্তি। তস্মাদুপাধিভেদেনৈবৈষাং ভেদঃ, নান্যথা, “একমেবাদ্বিতীয়ম্” ইত্যবধারণাৎ সর্ব্বোপনিষৎসু ॥২০৬৷৷১২৷৷

ইতি বৃন্দাবনে কোপনিধি তৃতীয়োঽধ্যায়ঃ। বাণম্ ॥ ৩ ॥ ৮ ॥

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রাহ্মণম্। ৮৯৭

টীকা। কিং তদ্বচনং, তদাহ-তদেবেতি। বহুমানবিষয়ভূতং বস্তু পৃচ্ছতি-কিং তদিতি। যদাদৌ মদীয়ং বচনং, তদেব বহুমানযোগ্যমিত্যাহ-যদিতি। তদ্ব্যাকরোতি-অস্মা ইতি। নমস্কারং কৃত্বাহম্মাদনুজ্ঞাং প্রাপ্যেতি শেষঃ। তদেবেতি প্রাথমিকবচেনাক্তিঃ। কিমিতি ত্বদীয়ং পূর্ব্বং বচো বহু মন্যামহে, জেতুং পুনরিমমাশাস্মহে, নেত্যাহ-জয়স্থিতি। তত্র প্রশ্ন- পূর্ব্বকং পূর্ব্বোক্তমেব বহুমানবিষয়ভূতং বাক্যমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-কম্মাদিত্যাদিনা। পরাজিতায়া গার্গ্যা বচো নোপাদেয়মিত্যাশঙ্ক্যাহ-প্রশ্নৌ চেদিতি। ততশ্চ প্রশ্ননির্ণয়াদ্ যাজ্ঞবন্ধ্যস্যাপ্রকল্প্যত্বং প্রতিপাদ্য ব্রাহ্মণান্ প্রতি হিতং চোক্তেত্যর্থঃ। ১

অন্তর্যামী ক্ষেত্রজ্ঞোহক্ষরমিত্যেতেষামবান্তরবিশেষপ্রদর্শনার্থং প্রকৃতত্বং দর্শয়তি-অত্রান্ত- র্যামীতি। তত্রান্তর্যামিণঃ প্রকৃতত্বং প্রকটয়তি-যানীতি। ক্ষেত্রজ্ঞস্য প্রকৃতত্বং স্ফুটয়তি- যে চেতি। অক্ষরস্য প্রস্তুতত্বং প্রত্যায়য়তি-যচ্চেতি। সর্বেষাং বিষয়াণাং দর্শনশ্রবণাদিক্রিয়া- কর্তৃত্বেন চেতনাধাতুরিতি যত্তদক্ষরমুক্তমিত্যন্বয়ঃ। তেষু বিচারমবতারয়তি-কস্তিতি। ২

তস্মিন্ বিচারে স্বযূখ্যমতমুখাপয়তি—তত্রেতি। ক্ষেত্রজ্ঞস্যাপ্রস্তুতত্বশঙ্কাং বারয়তি— যস্তমিতি। যথা পরস্যাত্মনোহন্তর্যামী জীবশ্চেত্যবস্থে যে কল্লেতে, তথা তস্যৈবান্যাঃ পঞ্চাবস্থাঃ পিণ্ডো জাতিবিরাট্ সূত্রং দৈবমিত্যেবংলক্ষণা মহাভূতসংস্থানভেদেন কল্পয়ন্তীত্যাহ—তথেতি। উক্তরীত্যা কল্পনায়াং পিণ্ডো জাতিবিরাট্ সূত্রং দৈবমব্যাকৃতং সাক্ষী ক্ষেত্রজ্ঞশ্চেত্যষ্টাবস্থা ব্রহ্মণো ভবন্তীতি বদন্তঃ পরিকল্পয়ন্তীতি সম্বন্ধঃ। অবস্থাপক্ষমুক্তা শক্তিপক্ষমাহ—অন্য ইতি। তুশব্দেনাবয়বপক্ষং দর্শয়ন্ বিকারপক্ষং নিক্ষিপতি—অন্যে ত্বিতি। ৩

তত্র পক্ষদ্বয়ং প্রত্যাহ—অবস্থেতি। অন্তর্যামিপ্রভৃতীনামিতি শেষঃ। তস্য সাংসারিক- ধর্মাতীতত্বশ্রুতাবপি কথমবস্থাবত্ত্বং বা ন সিধ্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ—ন হীতি। অবশিষ্টপক্ষদ্বয়নিরা- করণং প্রাগেব প্রবৃত্তং স্মারয়তি—বিকারেতি। পরপক্ষনিরাকরণমুপসংহরতি—তস্মাদিতি। ৪

পরকীয়কল্পনাসম্ভবে পৃচ্ছতি-কস্তহীতি। উত্তরমাহ-উপাধীতি। আত্মনি স্বতো বিশেষাভাবে হেতুমাহ-সৈন্ধবেতি। তত্রৈব হেহন্তরমাহ-অপূর্ব্বমিতি। বাহং কার্য্যমাভ্যন্তরং করণং তাভ্যাং কল্পিতাভ্যাং সহাধিষ্ঠানত্বেন সত্তাস্ফূর্ত্তিপ্রদতয়া বর্ততে ব্রহ্ম, স্বভাবতত্ত্ব জন্মাদিসর্ব্ববিক্রিয়াশূন্যং কূটস্থং তদিত্যাখর্ব্বণশ্রুতেরর্থঃ। আত্মনি স্বতো বিশেষানবগমে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। নিরুপাখ্যত্বং বাচাং মনসাং চাগোচরত্বম্। তত্র নির্বিশেষত্বমেকত্বং চ হেতুঃ। নিরুপাধিকস্যেতি নির্বিশেষত্বং সাধরিতুমুক্তম্। তত্র চ বীন্সাবাক্যং প্রমাণং কৃতম্। কথং পুনরেবম্বিধন্য বস্তুনঃ সংসারিত্বং, তত্রাহ-অবিদ্যেতি। তৈর্বিশিষ্টং যৎ কাৰ্য্য- করণং, তেনোপাধিনোপহিতঃ পরমাত্মা জীবঃ সংসারীতি চ ব্যপদেশভাগ্ভবর্তীত্যর্থঃ। তথাপি কথং তস্যান্তযামিত্বং, তদাহ-নিত্যেতি। নিত্যং নিরতিশয়ং সর্ব্বত্রাপ্রতিবন্ধং জ্ঞানং, তস্মিন্ সত্ত্বপরিণামে সত্ত্বপ্রধানা মায়াশক্তিরুপাধিত্বেন বিশিষ্টঃ সন্ন্যাত্মেশ্বরোহস্তযামীতি চোচ্যত- “ইত্যর্থঃ। ৫

কথং তর্হি তস্মিন্নক্ষরশব্দপ্রবৃত্তিস্তত্রাহ-স এবেতি। নিরুপাধিত্বং শুদ্ধত্বে হেতুঃ কেবলত্বম্- দ্বিতীয়ত্বম্। তথাপি কথং তত্র হিরণ্যগর্ভাদিশব্দপ্রত্যয়াবিত্যাশঙ্ক্যাহ-তথেতি। যথৈকস্মিন্নেব

8

৮৯৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

পরস্মিন্নাত্মনি কল্পিতোপাধিপ্রযুক্তং নানাত্বং, তথা তদেজতি তন্নৈজতীত্যাদি বাক্যমাশ্রিত্য প্রাগেবোক্তমিত্যাহ—তথেতি। কল্পনয়া পরস্য নানাত্বং বস্তুতস্থৈকরস্যমিত্যত্র শ্রুতীরুদ্য- হরতি—তথেত্যাদিনা। অবস্থাশক্তিবিকারাবয়বপক্ষেষপি যথোক্তশ্রুতীনামুপপত্তিমাশঙ্ক্যাহ— কল্পনান্তরেধিতি। ঔপাধিকোহন্তর্য্যাম্যাদিভেদো ন স্বাভাবিক ইত্যুপসংহরতি—তস্মাদিতি। স্বতো বস্তুনি নাস্তি ভেদঃ, কিম্বৈকরস্যমেবেত্যত্র হেতুমাহ—একমিতি ॥২০৬৷১২॥

ইতি কৃষ্ণদাসদেবপণ্ডিতশ্রীকৃষ্ণদাসদেবঃ শ্রীমদ্ভাগবতং।

ভাষ্যানুবাদ।—সেই গার্গী ব্রাহ্মণগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন— হে পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ, তোমরা আমার কথা শ্রবণ কর,—তোমরা ইহাই যথেষ্ট মনে কর। ইহা কি? না, তোমরা যে, এই যাজ্ঞবল্ক্যের নিকট কেবল নমস্কার মাত্রেই—ইঁহাকে কেবল নমস্কার করিয়াই পরিত্রাণ পাইয়াছ, ইহাই খুব বেশী মনে কর; ইঁহাকে জয় করিবার আশা মনেও করিও না, জয় করা ত দূরের কথা; কারণ? যেহেতু তোমাদের মধ্যে কেহ কখনও এই যাজ্ঞবল্ক্যের ব্রহ্মব্যাখ্যা সম্বন্ধে বিজেতা নাই। আমি পূর্ব্বেই প্রতিজ্ঞাপূর্ব্বক বলিয়াছি যে, যাজ্ঞবল্ক্য যদি আমার এই প্রশ্ন দুইটির উত্তর দিতে পারে, তাহা হইলে আর কেহই ইঁহাকে জয় করিতে পারিবে না; এখনও আমার স্থির বিশ্বাস যে, ব্রহ্মবাদিত্বে—ব্রহ্মতত্ত্ব ব্যাখ্যানে ইহার তুল্য কেহ নাই। তাহার পর বাচরুবী নিবৃত্ত হইলেন। ১

এই অন্তর্যামী ব্রাহ্মণে উক্ত হইয়াছে যে, পৃথিবী যাহাকে জানে না এবং সমস্ত ভূতবর্গও যাহাকে জানে না ইত্যাদি। এখানে, যে অন্তর্যামীকে যাহারা জানে না, এবং যাহা সেই অক্ষর-সকলের দর্শনাদি ক্রিয়া নির্ব্বাহ করেন বলিয়া সকলের চৈতন্যাধায়ক নামে কথিত হইলেন; জিজ্ঞাসা করি-এ সমস্তের মধ্যে পরস্পর বিশেষত্ব-পার্থক্যই বা কি আছে? এবং সামান্য বা সাধারণ ধর্মই বা কি আছে? ২

ইহার উত্তরে কেহ কেহ বলেন—অচঞ্চলাবস্থ অক্ষরসংজ্ঞক পরব্রহ্ম হইতেছেন --মহাসমুদ্রস্থানীয়; তাহারই যে, কিঞ্চিৎ পরিস্পন্দনাবস্থা, তাহার নাম— অন্তর্যামী; তাহার যে অত্যন্ত বিক্ষুব্ধাবস্থা, যাহা সেই অন্তর্যামীকে জানে না, তাহার নাম—ক্ষেত্রজ্ঞ(জীব)। তাঁহারা এইরূপ আরও পাঁচটা অবস্থা কল্পনা করিয়া থাকেন; এবং বলেন যে, ব্রহ্মের এইরূপ আট প্রকার অবস্থা ঘটিয়া থাকে। আবার অপর শ্রেণীর লোকেরা বলেন—একমাত্র অক্ষর ব্রহ্মই অনন্ত- শক্তিসম্পন্ন; অপর সমস্তই তাঁহার বিশেষ বিশেষ শক্তিমাত্র। অন্য সম্প্রদায় আবার বলেন—এ সমস্তই অক্ষর ব্রহ্মের বিকার বা পরিণতিবিশেষ মাত্র। ৩

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—অষ্টমং ব্রাহ্মণম্।

৮৯৯

এ সম্বন্ধে বক্তব্য এই যে, প্রথমতঃ ব্রহ্মের অবস্থা বা শক্তি কল্পনাই সঙ্গত হয় না; কেন না, শ্রুতি বলিতেছেন যে, এই অক্ষর ব্রহ্ম সাংসারিক সর্ব্ব-ধৰ্ম্ম- বিবর্জিত; কারণ, একই পদার্থে একই সময়ে অশনায়াদি সংসারধর্ম্মের অভাব ও সম্ভাব কখনই উপপন্ন হইতে পারে না; সেইরূপ, শক্তি-পক্ষও সঙ্গত হয় না; আর বিকার বা অবয়ব কল্পনার পক্ষে, যে সমস্ত দোষের সম্ভাবনা হয়, তাহা চতুর্থ শ্রুতিতেই কথিত হইয়াছে। অতএব উপরে, যে সমস্ত কল্পনার উল্লেখ হইল, সে সমস্তই অসত্য বা অসঙ্গত। ৪

ভাল, তাহা হইলে, অক্ষর ও অন্তর্যামী প্রভৃতির মধ্যে প্রভেদ কি? আমরা বলি কেবল উপাধি দ্বারা উহাদের ভেদ, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে উহাদের মধ্যে ভেদ বা অভেদ কিছুই নাই; কারণ, ‘তাঁহার আদি নাই, অন্ত নাই, এবং অন্তর নাই ও বাহির নাই’, ‘এই আত্মা ব্রহ্মস্বরূপ’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে এবং ‘তিনি বাহ্য ও আন্তর সর্ব্ববিধ সম্বন্ধশূন্য ও জন্মরহিত’ এই আথর্বণ বাক্য হইতেও জানা যায় যে, সৈন্ধবখণ্ডের ন্যায় জ্ঞানই তাঁহার একমাত্র স্বাভাবিক রূপ। অতএব উপাধিরহিত আত্মা বা ব্রহ্ম নির্বিশেষ(নির্গুণ) নিরুপাখ্য ও বাক্যের অগোচর অর্থাৎ ‘তিনি এই প্রকার’ এই বলিয়া নির্দেশের অযোগ্য, এবং এক অদ্বিতীয়; এই জন্য “নেতি নেতি” অর্থাৎ ইহা নহে-ইহা নহে এই প্রকারে তাঁহার নির্দেশ করা হইয়া থাকে। আর অবিদ্যা, কাম ও তদনুগত কর্মবিশিষ্ট দেহেন্দ্রিয়াদি- উপাধিযুক্ত আত্মা সংসারী-জন্ম-মরণাদি-সম্পন্ন জীব নামে অভিহিত হইয়া থাকে; সেই আত্মাই আবার নিত্য নিরতিশয়(যাহা অপেক্ষা অধিক হইতে পারে না, তাদৃশ) শক্তি সংযোগে অন্তর্যামী ঈশ্বর বলিয়া কথিত হন; সেই আত্মাই আবার যখন সর্ব্বোপাধিরহিত শুদ্ধ স্বস্বরূপে নিদ্দিষ্ট হন, তখন ‘অক্ষর’ পরমাত্মা বলিয়া উক্ত হন; এইরূপ, জাতি ও দেহ-বিশেষের সহিত সম্বন্ধানুসারেও বিভিন্ন নাম ও বিভিন্ন আকৃতিসম্পন্ন হিরণ্যগর্ভ অব্যাকৃত(প্রধান) ও দেবতা- নামে অভিহিত হইয়া থাকেন। ‘তিনি সক্রিয় হইয়াও নিষ্ক্রিয়’ একথার ব্যাখ্যা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। বিশেষতঃ এইরূপ ব্যাখ্যা গ্রহণ করিলেই- ‘তিনিই তোমার আত্মা’, ‘ইনি সর্ব্বভূতের আত্মা’, ‘ইনি সর্ব্বভূতের অভ্যন্তরে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থিত’, ‘তুমি তৎস্বরূপ’, ‘আমিই-আত্মাই এই সমস্ত’ ‘আত্মাই এই সমস্ত বস্তু’, ‘ইঁহার অন্য কোনও দ্রষ্টা নাই’ ইত্যাদি শ্রুতিসমূহও বিরুদ্ধ হয় না; কিন্তু অন্যান্য কল্পনাপক্ষে এই সমস্ত শ্রুতির কিছুতেই সামঞ্জস্য রক্ষা হয় না। অতএব স্বীকার করিতে হইবে যে, উপাধিভেদেই এ সমস্তের ভেদ,

বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

೩೦೦

কিন্তু স্বরূপতঃ নহে; কারণ, সমস্ত উপনিষৎশাস্ত্রে ব্রহ্মের এক অদ্বিতীয়ভাবই অবধ্যরিত হইয়াছে ৷ ২০৬ ॥ ১২ ॥

তৃতীয়োঽধ্যায়ঃ। অষ্টম অধ্যায়ঃ। তত্রৈব সমাপ্তঃ॥ ৩ ॥ ৮ ॥

নমঃ শ্রীকৃষ্ণায়।

আভাসভাষ্যম্।—অথ হৈনং বিদগ্ধঃ শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ। পৃথিব্যাদীনাৎ সূক্ষ্মতারতম্যক্রমেণ পূর্ব্বস্য পূর্ব্বস্যোত্তরস্মিন্নত্তরস্মিন্ ওতপ্রোতভাবৎ কথয়ন্ সর্ব্বান্তরং ব্রহ্ম প্রকাশিতবান্। তস্য চ ব্রহ্মণো ব্যাকৃতবিষয়ে সূত্রভেদেষু নিয়ন্তত্ব- মুক্তম্—ব্যাকৃতবিষয়ে ব্যক্ততরং লিঙ্গমিতি। তস্যৈব ব্রহ্মণঃ সাক্ষাদপরোক্ষত্বে নিয়ন্তব্যদেবতাভেদ সঙ্কোচবিকাশদ্বারেণাধিগন্তব্যে—ইতি তদর্থং শাকল্য- ব্রাহ্মণমারভ্যতে—

আভাসভাষ্য-টীকা। ব্রাহ্মণান্তরমুখাপয়তি—অথেতি। গার্গিপ্রশ্নে নির্ণীতে তয়া ব্রহ্মবদনং প্রত্যেতত্তুল্যো নাস্তীতি সর্ব্বান্ প্রতি কথনানন্তর্যমথশব্দার্থঃ। সঙ্গতিং বক্তুং বৃত্তং কীর্ত্তয়তি— পৃথিব্যাদীনামিতি। যৎ সাক্ষাদিত্যাদি প্রস্তুত্য সর্ব্বান্তরত্বনিরূপণদ্বারা সাক্ষিত্বাদিকমার্থিকং ব্রাহ্মণত্রয়ে নির্দ্ধারিতমিত্যর্থঃ। অন্তর্যামিব্রাক্ষণে মুখতো নিদ্দিষ্টমর্থমুদ্রবতি—তস্য চেতি। নামরূপাভ্যাং ব্যাকৃতো বিষয়ো দ্বৈতপ্রপঞ্চস্তত্র সূত্রস্য ভেদা যে পৃথিব্যাদয়স্তেষু নিয়ম্যেযু নিয়ন্তৃত্বং তস্যোক্তমিতি যোজনা। কিমিতি ব্যাকৃতবিষয়ে নিয়ন্তত্বমুক্তমিতি, তত্রাহ— ব্যাকৃতেতি। তত্র হি পরতন্ত্রস্য পৃথিব্যাদেগ্রহণং নিয়ম্যত্বে স্পষ্টতরং লিঙ্গমিতি তত্রৈব নিয়ন্তত্বমুক্তমিত্যর্থঃ। বৃত্তমনুদ্যোত্তরস্য ব্রাহ্মণস্য তাৎপর্য্যমাহ—তস্যৈবেতি। নিয়ন্তব্যানাং দেবতাভেদানাং প্রাণান্তঃ সঙ্কোচে। বিকাসশ্চানন্ত্যপর্যন্তঃ, তদ্বারা প্রকৃতস্যৈব ব্রহ্মণঃ সাক্ষাৎপবোক্ষত্বে স এব নেতি নেত্যাত্মেত্যাদিনাধিগন্তব্যে ইতি কৃত্বা প্রথমং দেবতাসঙ্কোচ- বিকাসোক্তিরনন্তরং বস্তুনির্দেশ ইত্যেতদর্থমেতদ্‌ব্রাহ্মণমিত্যর্থঃ।

আভাসভাষ্যানুবাদ।—“অথ হৈনৎ বিদগ্ধঃ শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ” ইত্যাদি[ব্রাহ্মণ আরম্ভের তাৎপর্য্য এই]—সূক্ষ্মতার তারতম্যানুসারে অর্থাৎ ভূতমাত্রই তদপেক্ষা সূক্ষ্ম ভূতের মধ্যে নিহিত থাকে; এই নিয়মানুসারে পৃথি- ব্যাদি পদার্থগুলির মধ্যে পূর্ব্ব পূর্ব্ব ভূতগুলির পরবর্তী ভূতসমূহে ওতপ্রোত ভাবে অবস্থিতি নির্দেশ করাতেই ব্রহ্মের সর্ব্বান্তরভাব জ্ঞাপন করা হইয়াছে; তাহার পর, স্থূল জগতে নিয়ম্য-নিয়ামকভাব বুঝিবার উপায় সুস্পষ্ট থাকায় প্রথমে বিভিন্নপ্রকার স্থূল পদার্থে ব্রহ্মের নিয়ন্তৃত্ব বলা হইয়াছে। অতঃপর নিয়ন্তব্য দেবতাগণের যে বিভাগ প্রসিদ্ধ আছে, তাহার সংকোচন ও প্রসারণ দ্বারা সেই ব্রহ্মেরই সাক্ষাৎসম্বন্ধ ও অপরোক্ষভাব অর্থাৎ অব্যবহিতত্ব ও প্রত্যক্ষত্ব প্রদর্শন করা আবশ্যক হইয়াছে; এই জন্য এই ‘শাকল্য-ব্রাহ্মণ’ আরব্ধ হইতেছে—

৯০২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অথ হৈনং বিদগ্ধঃ শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ—কতি দেবা যাজ্ঞ- বল্ক্যেতি, স হৈতয়ৈব নিবিদা প্রতিপেদে, যাবন্তো বৈশ্বদেবস্য নিবিদ্যুচ্যন্তে—ত্রয়শ্চ ত্রী চ শতা, ত্রয়শ্চ ত্রী চ সহস্রেতি, ওমিতি হোবাচ। কত্যেব দেবা যাজ্ঞবল্ক্যেতি, ত্রয়স্ত্রিংশদিত্যোমিতি হোবাচ; কত্যেব দেবা যাজ্ঞবল্ক্যেতি ষড়িতি, ওমিতি হোবাচ; কত্যেব দেবা যাজ্ঞবল্ক্যেতি, ত্রয় ইতি, ওমিতি হোবাচ, কত্যেব দেবা যাজ্ঞবল্ক্যেতি, দ্বাবিতি, ওমিতি হোবাচ; কত্যেব দেবা যাজ্ঞ- বল্ক্যেতি, অধ্যর্দ্ধ ইতি, ওমিতি হোবাচ; কত্যেব দেবা যাজ্ঞ- বল্ক্যেতি, এক ইতি, ওমিতি হোবাচ। কতমে তে ত্রয়শ্চ ত্রী চ শতা ত্রয়শ্চ ত্রী চ সহস্রেতি ॥ ২০৭ ॥ ১ ॥

সরলার্থঃ?-অথ(গার্গীবিরামানন্তরম্) বিদগ্ধঃ(বিদ্বান্) শাকল্যঃ (তন্নামকঃ ব্রাহ্মণঃ) পপ্রচ্ছ-হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবাঃ কতি(কিয়ৎসংখ্যকাঃ)? ইতি। সঃ(এবং পৃষ্টঃ যাজ্ঞবল্ক্য:) এতয়া(বক্ষ্যমাণয়া) নিবিদা-(নিবিৎ নাম-বৈশ্বদেবযাগ-প্রকরণস্থানি দেবতাসংখ্যাবাচকানি কানিচিৎ মন্ত্রপদানি, তয়া) এব প্রতিপেদে(প্রতিজ্ঞাতবান্-তদুত্তরং দত্তবানিত্যর্থঃ)।[কিং তদিত্যাহ-] বৈশ্বদেবস্য(বৈশ্বদেবাখ্যযাগস্য) নিবিদি(দেবতাসংখ্যাবাচকে শস্ত্রাখ্যে মন্ত্রে) যাবন্তঃ(যাবৎসংখ্যকাঃ দেবাঃ) উচ্যন্তে-ত্রয়ঃ চ(ত্রিত্বসংখ্যাবন্তঃ দেবাঃ), ত্রী(ত্রীণি) শতা(শতানি) চ[দেবানাম্], তথা ত্রয়ঃ চ ত্রী(ত্রীণি) সহস্রা(সহস্রাণি) চ[দেবানাম্; এতাবন্তঃ দেবা ইত্যর্থঃ]। ততশ্চ শাকল্যঃ ওম্-ইতি উবাচ(তদুক্তমঙ্গীচকার ইত্যর্থঃ)।[এবমেষাৎ মধ্যমা সংখ্যা উক্তা। সম্প্রতি ততোহপি ন্যূনসংখ্যাৎ জিজ্ঞাসতে শাকল্য:-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবাঃ কতি(কিয়ৎসংখ্যকাঃ) এব(নিশ্চয়ে)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] ত্রয়স্ত্রিংশৎ (ত্রয়স্ত্রিংশৎসংখ্যকা দেবা ইত্যর্থঃ) ইতি।[শাকল্যঃ উবাচ]-ওম্ ইতি(ত্বয়া যদুক্তং, তৎ সত্যমিত্যর্থঃ)।[ততোহপি ন্যূনসংখ্যাৎ জিজ্ঞাসিতুং পৃচ্ছতি শাকল্যঃ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবাঃ কতি এব? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] ষট্(ষট্- সংখ্যকা দেবাঃ) ইতি;[শাকল্যঃ] ওম্-ইতি উবাচ।[শাকল্যঃ পুনর- প্যাহ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবাঃ কতি এব? ইতি;[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] ত্রয়ঃ ইতি;[শাকল্যঃ] ওম্ ইতি উবাচ হ।[পুনঃ প্রশ্নঃ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবাঃ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯০৩

কতি এব? ইতি;[উত্তরম্-] দ্বৌ এব ইতি;[শাকল্যঃ] ওম্-ইতি উবাচ হ।[পুনরপি প্রশ্নঃ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবাঃ কতি এব? ইতি;[উত্তরং-] অধ্যর্দ্ধঃ (অর্দ্ধাধিক একঃ-সার্দ্ধ ইত্যর্থঃ),[শাকল্যঃ] ওম্ ইতি উবাচ হ।[পুনঃ প্রশ্নঃ] হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবাঃ কতি এব? ইতি;[উত্তরং-] একঃ(এক এব দেব ইত্যর্থঃ);[শাকল্যঃ] ওম্-ইতি উবাচ হ।[পূর্ব্বং দেবানাৎ সংখ্যাবিষয়কঃ প্রশ্ন উক্তঃ, সম্প্রতি তু সংখ্যের-বিষয়কঃ প্রশ্নঃ প্রবর্ত্ততে।][হে যাজ্ঞবল্ক্য,] তে (ত্বদুক্তাঃ দেবাঃ] কতমে “ত্রয়শ্চ ত্রীচ শতা, ত্রয়শ্চ ত্রীচ সহস্রা-ইতি”(ত্বয়া যে দেবাঃ উক্তাঃ, তে নামতঃ স্বরূপশ্চ কে কে? ইত্যর্থঃ) ॥২০৭৷১৷

মূলানুবাদ:-গার্গী নিবৃত্ত হইলে পর, পণ্ডিত শাকল্যনামক ঋষি প্রশ্ন করিলেন। -হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবতার সংখ্যা কত? যাজ্ঞবল্ক্য পশ্চাদুক্ত নিবিদের সাহায্যেই ইহার উত্তর স্থির করিলেন।[নিবিদ্ অর্থ-বৈশ্বদেব যাগোক্ত দেবতা-সংখ্যাবাচক কতকগুলি মন্ত্র]।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] বৈশ্বদেব প্রকরণে ‘নিবিদে’(মন্ত্রে) যে পরিমাণ দেবতা- সংখ্যা উক্ত আছে,[সেই পরিমাণ হইতেছে-] তিন ও তিন শত এবং তিন হাজার তিন। শাকল্য বলিলেন-ওম্(হ্যাঁ, সত্য)।[শাকল্য পুনর্ব্বার দেবতা সংখ্যার ন্যূন পরিমাণ লক্ষ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবতার সংখ্যা কত?[তিনি বলিলেন-] তেত্রিশ; শাকল্য বলিলেন-ওম্। পুনশ্চ শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবতার সংখ্যা কত? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-ছয়;[শাকল্য বলিলেন-] ওম্(হ্যাঁ, ইহা সত্য)।[শাকল্য পুনর্বার জিজ্ঞাসা করিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য দেবতার সংখ্যা কত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] তিন; [শাকল্য বলিলেন-] ওম্।[শাকল্য পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবতার সংখ্যা কত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] দুই; [শাকল্য] ‘ওম্’ বলিয়া স্বীকার করিলেন।[শাকল্য] আবার জিজ্ঞাসা করিলেন--হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবতার সংখ্যা কত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] অর্দ্ধাধিক-দেড়; শাকল্য এবারও ‘ওম্’ বলিয়া সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন।[শাকল্য পুনশ্চ] জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য; দেবতার সংখ্যা কত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] এক;[শাকল্য

৯০৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তাহাও] ‘ওম্’ বলিয়া স্বীকার করিলেন।[ অতঃপর যথোক্ত সংখ্যা- বিশিষ্ট দেবতাগণের স্বরূপ জিজ্ঞাসায়] প্রশ্ন করিলেন—[ হে যাজ্ঞবল্ক্য, তোমার কথিত] সেই তিন শত তিন ও তিন সহস্র তিন দেবতা কে কে ॥ ২০৭॥ ১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—অথ হৈনং বিদগ্ধ ইতি নামতঃ, শকলস্যাপত্যং শাকল্যঃ, পপ্রচ্ছ—কতিসঙ্খ্যাকা দেবাঃ, হে যাজ্ঞবল্ক্যেতি। স যাজ্ঞবল্ক্যঃ, হ কিল, এতয়ৈব বক্ষ্যমাণয়া নিবিদা প্রতিপেদে সঙ্খ্যাম্, যাৎ সঙ্খ্যাৎ পৃষ্টবান্ শাকল্যঃ। যাবন্তঃ যাবৎসঙ্খ্যকা দেবাঃ বৈশ্বদেবস্য শস্ত্রস্য নিবিদি—নিবিন্নাম দেবতাসঙ্খ্যাবাচকানি মন্ত্রপদানি কানিচিৎ বৈশ্বদেবে শস্ত্রে শস্যন্তে, তানি নিবিৎসংজ্ঞকানি; তস্যাং নিবিদি যাবন্তো দেবাঃ শ্রীয়ন্তে, তাবন্তো দেবা ইতি।

কা পুনঃ সা নিবিদ্—ইতি তানি নিবিৎপদানি প্রদর্শ্যন্তে—ত্রয়শ্চ ত্রী চ শতা, ত্রয়শ্চ দেবাঃ, দেবানাং ত্রী চ ত্রীণি চ শতানি; পুনরপ্যেবং, ত্রয়শ্চ ত্রী চ সহস্রা সহস্রাণি, এতাবন্তো দেবা ইতি, শাকল্যোহপি ওমিতি হোবাচ। এবমেষাং মধ্যমা সংখ্যা সম্যক্তয়া জ্ঞাতা, পুনস্তেষামের দেবানাং সঙ্কোচবিষয়াৎ সঙ্খ্যাৎ পৃচ্ছতি —কত্যেব দেবা যাজ্ঞবল্ক্যেতি। ত্রয়স্ত্রিংশৎ, ষট্, ত্রয়ঃ, দ্বৌ, অধ্যর্দ্ধঃ, এক ইতি। দেবতাসঙ্কোচবিকাশবিষয়াৎ সংখ্যাৎ পৃষ্ঠা পুনঃ সংখ্যেয়স্বরূপং পৃচ্ছতি—কতমে তে ত্রয়শ্চ ত্রী চ শতা, ত্রয়শ্চ ত্রী চ সহস্রেতি ॥২০৭৷১৷৷

টীকা। ব্রাহ্মণারম্ভমেবমুক্তা তদক্ষরাণি ব্যাকরোতি—অখেত্যাদিনা। নিবিদি ক্রয়ন্তে তাবস্তো দেবা ইত্যুত্তরত্র সম্বন্ধঃ। কেয়ং নিবিদিতি পৃচ্ছতি—নিবিন্নামেতি। উত্তরমাহ— দেবতেতি। পদার্থমুক্তা বাক্যার্থং কথয়তি—তস্যামিতি। যদ্যপি ভাষ্যে নিবিদ্ব্যাখ্যাতা, তথাপি প্রশ্নদ্বারা শ্রুত্যা তাং ব্যাখ্যাতি—কা পুনরিত্যাদিনা। অনুজ্ঞাবাক্যং ব্যাকরোতি— এবমিতি। মধ্যমা সংখ্যা ষড়ধিকত্রিশতাধিক-ত্রিসহস্রলক্ষণা। কত্যেবেত্যাদিপ্রশ্নানাং পূর্ব্বপ্রশ্নেন পৌনরুক্ত্যমাশঙ্ক্য পরিহরতি—পুনরিত্যাদিনা। কতমে তে ত্রয়শ্চেত্যাদিপ্রশ্নস্য বিষয়ভেদং দর্শয়তি—দেবতেতি ॥২০৭॥১॥

ভাষ্যানুবাদ?—অতঃপর বিদগ্ধ(পণ্ডিত) শাকল্য—শকল ঋষির পুত্র প্রশ্ন করিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবতা কতগুলি? অর্থাৎ দেবতার সংখ্যা কত? সেই যাজ্ঞবল্ক্য বক্ষ্যমাণ নিবিদের দ্বারাই শাকল্যের জিজ্ঞাসিত দেবতা- সংখ্যা বুঝিয়াছিলেন অর্থাৎ স্থির করিয়াছিলেন। ‘নিবিদ’ অর্থ—বৈশ্বদেব- নামক যাগের শস্ত্রক্রিয়ায় পঠনীয় দেবতা-সংখ্যাবাচক কতিপয় মন্ত্র, সেই মন্ত্র- গুলিকে ‘নিবিদ’ নামে অভিহিত করা হয়। বৈশ্বদেব যাগের সেই নিবিদের

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

১০৫

মধ্যে যে পরিমাণ দেবতা-সংখ্যা কথিত আছে, দেবতার সংখ্যা সেই পরিমাণই বটে,(তাহার কম বেশী নয়)। সেই নিবিদ্যটি যে কি, অতঃপর তাহা প্রদর্শন করা হইতেছে—দেবতার সংখ্যা তিন শত তিন; পুনশ্চ, তিন হাজার তিন,— এই পরিমাণ দেবতার সংখ্যা; ইহা শুনিয়া শাকল্য ‘ওম্’ বলিয়া তাহা স্বীকার করিয়া লইলেন। এইরূপ দেবতাগণের মধ্যম পরিমাণ উত্তমরূপে পরিজ্ঞাত হইবার পর শাকল্য পুনশ্চ সংখ্যার সংকোচবিষয়ক প্রশ্ন অর্থাৎ পূর্ব্বাপেক্ষা ন্যূন সংখ্যা জিজ্ঞাসা করিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, দেবতার সংখ্যা ঠিক কত?[যাজ্ঞবল্ক্য প্রশ্নোত্তরক্রমে বলিলেন,] তেত্রিশ, ছয়, তিন, দুই, দেড় ও এক। শাকল্য প্রথমে দেবতার ন্যূনাধিক সংখ্যা জিজ্ঞাসা করিয়া, পুনর্ব্বার সংখ্যের বিষয়ে অর্থাৎ ঐ সমস্ত সংখ্যাযুক্ত দেবতাগণের স্বরূপ সম্বন্ধে প্রশ্ন করিলেন যে, সেই তিন শত তিন ও তিন হাজার তিন দেবতা কে কে? অর্থাৎ তাঁহাদের নাম ও স্বরূপ কিরূপ? ॥২০৭৷১৷

স হোবাচ মহিমান এবৈষামেতে, ত্রয়স্ত্রিংশত্ত্বেব দেবা ইতি, কতমে তে ত্রয়স্ত্রিংশদিত্যষ্টৌ বসব একাদশ রুদ্রা দ্বাদশাদিত্যান্ত- একত্রিশদিন্দ্রশ্চৈব প্রজাপতিশ্চ ত্রয়স্ত্রিংশাবিতি ॥ ২০৮ ॥ ২ ॥

সরলার্থঃ।—[এবং পৃষ্টঃ] সঃ(যাজ্ঞবল্ক্যঃ) উবাচ হ—এতে(ত্র্যধিক- ত্রিশতাদ্যাঃ দেবাঃ) এষাং(বক্ষ্যমাণানাং দেবানাং) মহিমানঃ(বিভূতয়ঃ) এব; দেবাঃ তু(পুনঃ) ত্রয়স্ত্রিংশৎ ইতি।[শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ] কতমে তে ত্রয়স্ত্রিংশৎ? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—], অষ্টৌ, বসবঃ একাদশ রুদ্রাঃ, দ্বাদশ আদিত্যাঃ, তে(বহুপ্রভৃতয়ঃ মিলিতাঃ) একত্রিংশৎ, ইন্দ্রঃ এব প্রজাপতিঃ চ(এতৌ দ্বৌ) ত্রয়স্ত্রিংশৌ(ত্রয়স্ত্রিংশৎপূরকৌ ইত্যর্থঃ) ইতি ॥২০৮৷৷২॥

মূলানুবাদ:-[শাকল্য এইরূপ প্রশ্ন করিলে পর, তদুত্তরে] যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-ইহারা অর্থাৎ উক্ত তিন শত তিন প্রভৃতি দেবতাগণ-ইহাদের অর্থাৎ পশ্চাদুল্লিখিত দেবগণেরই মহিমা বা বিভূতি- স্বরূপ; প্রকৃতপক্ষে দেবতা হইতেছেন-তেত্রিশটি।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন-ভাল,] সেই তেত্রিশটি দেবতাই বা কে কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য-এই একত্রিশ, আর ইন্দ্র ও প্রজাপতি দুই-মিলিত হইয়া তেত্রিশ হইল ॥ ২০৮॥২॥

৯০৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

শাঙ্করভাষ্যম্।—স হোবাচ ইতরঃ—মহিমানঃ বিভুতয়ঃ, এষাং ত্রয়স্ত্রিংশতঃ দেবানাম্, এতে ত্রয়শ্চ ত্রী চ শতেত্যাদয়ঃ; পরমার্থতন্তু ত্রয়স্ত্রিংশৎ তু এব দেবা ইতি। কতমে তে ত্রয়স্ত্রিংশৎ? ইত্যুচ্যতে—অষ্টৌ বসবঃ, একাদশ রুদ্রাঃ, দ্বাদশ আদিত্যাঃ, তে একত্রিংশৎ, ইন্দ্রশ্চৈব প্রজাপতিশ্চ ত্রয়স্ত্রিশাবিতি ত্রয়স্ত্রিংশতঃ পুরণৌ ॥২০৮৷৷ ২৷৷

টীকা। কতি তহি দেবা নিবিদি ভবন্তি, তত্রাহ-পরমার্থতস্থিতি। এয়স্ত্রিংশতো দেবানাং স্বরূপং প্রশ্নদ্বারা-নিদ্ধারয়তি-কতমে ত ইতি ॥২০৮।২॥

ভাষ্যানুবাদ।—যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—এই যে, তিন শত তিন প্রভৃতি দেবতা, ইঁহারা হইতেছেন—এই তেত্রিশটি দেবতারই মহিমা—বিভূতিস্বরূপ; সুতরাং দেবতা তেত্রিশই সত্য। সেই তেত্রিশটি দেবতা যে, কে কে, তাহা বলা হইতেছে—আট জন বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য,— এই একত্রিশ, আর ইন্দ্র ও প্রজাপতি এই দুই,—সমষ্টিতে তেত্রিশ পূর্ণ হইল ॥২০৮৷৷২৷৷

কতমে বসব ইত্যগ্নিশ্চ পৃথিবী চ বায়ুশ্চান্তরিক্ষঞ্চাদিত্যশ্চ দ্যৌশ্চ চন্দ্রমাশ্চ নক্ষত্রাণি চৈতে বসবঃ, এতেষু হীদং সর্ব্বং হিতমিতি তস্মাদ্ বসব ইতি॥ ২০৯॥ ৩॥

সৰ্বলার্থঃ।—[বিশেষজিজ্ঞাসয়া শাকল্যঃ পুনরপ্যাহ—] বসবঃ(ত্বদুক্তঃ বসুগণঃ) কতমে?(তে ব্যক্ত্যা কে কে?) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] অগ্নিঃ চ, পৃথিবী চ, বায়ুঃ চ, অন্তরিক্ষং চ, আদিত্যঃ চ, দ্যৌঃ চ, চন্দ্রমাঃ চ, নক্ষত্রাণি চ, —এতে বসবঃ(যথোক্তাগ্ন্যাদ্যষ্টকো গণঃ বসুসংজ্ঞয়া—অভিধীয়তে)। হি (যস্মাৎ) এতেষু(অগ্নিপ্রভৃতিষু) ইদৎ(অনুভূয়মানং) সর্ব্বং(বস্তু) হিতৎ (নিহিতং)[অন্তি] ইতি; তস্মাৎ(সর্ব্বনিধানাৎ সর্ব্ববস্তুনাং বাসহেতুত্বাদিত্যর্থঃ) বসবঃ(সর্ব্বে বসন্তি এষু, সর্ব্বান্ বা বাসয়ন্তি—ইতি বসবঃ—ইতি ব্যুৎপত্তি- যোগাদিতি ভাবঃ, ইতি ॥২০৯৷৷৩৷৷

মূলানুবাদ:-বসুগণের বিশেষ পরিচয় জানিবার জন্য শাকল্য পুনর্ব্বার প্রশ্ন করিলেন যে, তোমার কথিত অষ্ট বসু কাহারা অর্থাৎ তাঁহাদের নাম কি কি? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যুলোক, চন্দ্র ও নক্ষত্র-এই আটটির নাম-বসু। যেহেতু বর্তমান সমস্ত জগৎ এই অগ্নিপ্রভৃতিতে নিহিত রহিয়াছে, অর্থাৎ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯০৭

যেহেতু এই অগ্নি প্রভৃতি আটটি দেবতাই সমস্ত জগৎকে স্থান দিয়াছেন; সেই হেতু ইহারা ‘বসু’-পদবাচ্য ॥ ২০৯॥৩॥

শাঙ্করভাষ্যম্—কতমে বসবঃ? ইতি—তেষাং স্বরূপং প্রত্যেকং পৃচ্ছাতে। অগ্নিশ্চ পৃথিবী চেতি অগ্ন্যাদ্যা নক্ষত্রান্তা এতে বসবঃ—প্রাণিনাং কর্ম্ম- ফলাশ্রয়ত্বেন কার্য্যকরণসঙ্ঘাতরূপেণ তন্নিবাসত্বেন চ বিপরিণময়ন্তঃ জগদিদৎ সর্ব্বং বাসয়ন্তি বসন্তি চ; তে যম্মাদ্বাসয়ন্তি তস্মাদ্বসব ইতি ॥২০৯৷৷৩৷৷

টীকা। উত্তরপ্রশ্নপ্রপঞ্চপ্রতীকং গৃহীত্বা তস্য তাৎপর্য্যমাহ—কতম ইতি। তেষাং বস্বাদীনাং প্রত্যেকং বস্বাদিত্রয়ে প্রতিগণমিন্দ্রে প্রজাপতৌ চৈকৈকস্যেত্যর্থঃ। তেষাং বহুত্বমেতেষু হীত্যাদিবাক্যাবষ্টন্তেন স্পষ্টয়তি—প্রাণিনামিতি। তেষাং কর্ম্মণস্তৎফলস্য চাশ্রয়ত্বেন তেষামের নিবাসত্বেন চ শরীরেন্দ্রিয়সমুদায়াকারেণ বিপরিণমন্তোইগ্ন্যাদয়ো জগ- দেতদ্বাসয়ন্তি স্বয়ং চ তত্র বসন্তি, তস্মাদ যুক্তং তেষাং বহুত্বমিত্যর্থঃ। বহুত্বং নিগময়তি—তে বম্মাদিতি ॥২-৯॥৩॥

ভাষ্যানুবাদ।—“কতমে তে বসবঃ” বলিয়া বসুগণের নাম ও ব্যক্তি সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হইতেছে। অগ্নি এবং পৃথিবী—অগ্নি হইতে নক্ষত্রপর্য্যন্ত যে সমস্ত দেবতার উল্লেখ করা হইল, ইঁহারা বসু; ইঁহারা প্রাণিগণের কর্ম্মলভ্য ফলের আশ্রয়রূপে এবং দেহেন্দ্রিয়রূপে পরিণত হইয়া সমস্ত জগৎকে বাস করাইতেছেন; সেই হেতু তাঁহারা ‘বসু’ নামে অভিহিত ॥২০৯৷৷৩৷৷

কতমে রুদ্রা ইতি, দশেমে পুরুষে প্রাণা আত্মৈকাদশঃ, তে যদাস্মাচ্ছরীরান্মর্ত্যাদুৎক্রামন্ত্যথ রোদয়ন্তি, তদ্যদ্ রোদয়ন্তি, তস্মাদ রুদ্রা ইতি ॥ ২১০ ॥ ৪ ॥

সম্বলার্থঃ।—[শাকল্যঃ পুনরাহ—] রুদ্রাঃ(ত্বদুক্তা একাদশসংখ্যকাঃ) কতমে(কিংস্বরূপাঃ কিন্নামকাশ্চ)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] পুরুষে (জীবদেহে বর্তমানাঃ) ইমে প্রাণাঃ(জ্ঞানেন্দ্রিয়পঞ্চকং, কর্ম্মেন্দ্রিয়পঞ্চকং চ), আত্মা(আত্মা চাত্র মনঃ, ইন্দ্রিয়প্রকরণাৎ)—একাদশঃ(একাদশানাৎ পূরকঃ),[এতে রুদ্রপদবাচ্যা ইত্যর্থঃ)। তে(একাদশ রুদ্রাঃ) যদা(যস্মিন্ কালে) অস্মাৎ(দৃশ্যমানাৎ) মর্ত্যাৎ(ধ্বংসশীলাৎ) শরীরাৎ উৎক্রামন্তি (নির্গচ্ছন্তি), অথ(তদা) রোদয়ন্তি(তৎস্বজনান্ ক্রন্দয়ন্তি); যৎ(যস্মাৎ) তৎ[তে] রোদয়ন্তি, তস্মাৎ রুদ্রাঃ[উচ্যন্তে], ইতি ॥২১০॥৪॥

মূল্যবান্দর।—[শৈলজা জিজ্ঞাসা করিলেন—] একাদশ

৯০৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রুদ্র কে কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] পুরুষের দশ প্রাণ অর্থাৎ জ্ঞানেন্দ্রিয় পাঁচ, কর্ম্মেন্দ্রিয় পাঁচ—এই দশ, আর আত্মা অর্থাৎ মন তাহাদের একাদশ। এই একাদশটি পদার্থ—যখন মরণশীল দেহ হইতে চলিয়া যায়, তখন স্বজনবর্গকে কাঁদাইয়া থাকে; এই কারণে ইহারা ‘রুদ্র’-শব্দবাচ্য ॥ ২১০ ॥ ৪ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কতমে রুদ্রা ইতি। দশ ইমে পুরুষে, কর্ম্মবুদ্ধীন্দ্রিয়াণি প্রাণাঃ, আত্মা মন একাদশঃ—একাদশানাৎ পুরণঃ; তে এতে প্রাণা যদা অস্মাচ্ছরীরাৎ মর্ত্যাৎ প্রাণিনাৎ কর্ম্মফলোপভোগক্ষয়ে উৎক্রামন্তি, অথ তদা রোদয়ন্তি তৎসম্বন্ধিনঃ। তৎ তত্র যস্মাৎ রোদয়ন্তি তে সম্বন্ধিনঃ, তস্মাদ রুদ্রা ইতি ॥২১০৷৷৪৷৷

টীকা। প্রাণশব্দার্থমাহ-কর্ম্মেতি। তে যদাস্মাদিত্যাদি বাক্যমনুসৃত্য তেষাং রুদ্রত্ব- মুপপাদয়তি-ত এতে প্রাণা ইতি। মরণকালঃ সপ্তম্যর্থঃ ॥২১০৪॥

ভাষ্যানুবাদ।—“কতমে রুদ্রাঃ” ইত্যাদি। পুরুষের(জীবনবিশিষ্ট দেহের) এই দশটি প্রাণ—কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয় দশ, আর আত্মা—মন হইতেছে—একাদশ অর্থাৎ একাদশের পূরণ। সেই এই একাদশ প্রাণ, যে সময় প্রাণিগণের কর্মফলভোগ-ক্ষয়ে ধ্বংসোন্মুখ দেহ হইতে বাহির হইয়া যায়, সে সময় উক্ত প্রাণসমুহই যেহেতু পরিত্যক্ত দেহসম্পর্কিত লোকদিগকে কাঁদায়, সেই হেতু তাহারা ‘রুদ্র’ নামে অভিহিত হয় ॥২১০৷৷৪৷৷

কতম আদিত্যা ইতি, দ্বাদশ বৈ মাসাঃ সংবৎসরস্যৈত- আদিত্যাঃ, এতে হীদৎসর্বমাদদানা যন্তি, তে যদিদৎসর্বমাদদানা যন্তি, তস্মাদাদিত্যা ইতি ॥ ২১১ ॥ ৫ ॥

সন্মলার্থঃ।—[শাকল্যঃ পুনরাহ—] আদিত্যাঃ কতমে? ইতি।[যাজ্ঞ- বন্ধ্য আহ—] বৈ(প্রসিদ্ধৌ) সংবৎসরস্য এতে দ্বাদশ মাসাঃ ‘আদিত্যাঃ’। হি(যস্মাৎ) এতে(যাজ্ঞবল্ক্যোক্তাঃ দ্বাদশ মাসাঃ) ইদং সর্ব্বং(জগৎ) আদ- দানাঃ(প্রাণিনাম্ আয়ুৎসি গৃহ্নন্তঃ) যস্তি(পুনঃ পুনঃ আবর্ত্তমানাঃ সন্তঃ প্রাণি- নাম্ আয়ুঃক্ষয়ং কুর্ব্বন্তি)। যৎ(যস্মাৎ) তে(মাসাঃ) ইদং সর্ব্বং আদবানাঃ সন্তঃ যস্তি(গচ্ছন্তি), তস্মাৎ আদিত্যাঃ(আদিত্যপদবাচ্যাঃ) ইতি ॥২১১৷৫

মূলানুবাদ:-[শাকল্য পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন-] আদিত্য কাহারা?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] সংবৎসরের প্রসিদ্ধ দ্বাদশ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

వెంకట్రావు

মাসই আদিত্য; কারণ, ইহারা সমস্ত জগৎকে আদান করিয়া অর্থাৎ প্রাণিগণের আয়ুর অংশ গ্রহণ করিয়া গমন করিয়া থাকে। যেহেতু তাহারা সমস্তের আয়ুঃ গ্রহণ করিয়া চলিয়া যায়, সেই হেতু তাহারা আদিত্যপদবাচ্য ॥ ২১১ ॥ ৫ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কতম আদিত্যা ইতি। দ্বাদশ বৈ মাসাঃ সংবৎসরস্য কালস্যাবয়বাঃ প্রসিদ্ধাঃ, এতে আদিত্যাঃ। কথম্? এতে হি যস্মাৎ পুনঃ পুনঃ পরিবর্তমানাঃ প্রাণিনামায়ুংষি কর্ম্মফলঞ্চ আদদানাঃ গৃহ্ণন্তঃ উপাদদতঃ যস্তি গচ্ছন্তি, তে যদ্ যম্মাদেবমিদৎ সর্ব্বমাদদানা যন্তি, তম্মাদাদিত্যা ইতি ॥২১১॥

টাকা। তেষামাদিত্যত্বমপ্রসিদ্ধমিতি। শঙ্কতে-কথমিতি। এতে হীত্যাদিবাক্যেনোত্তর- মাহ-এতে হীতি ॥২১১৪৫॥

ভাষ্যানুবাদ।—“কতমে আদিত্যাঃ” ইত্যাদি। সংবৎসরের অবয়ব বা অংশরূপে প্রসিদ্ধ এই দ্বাদশ মাস হইতেছে ‘আদিত্য’। কি প্রকারে? যেহেতু ইহারা পুনঃ পুনঃ আবর্তন বা যাতায়াত করত প্রাণিগণের আয়ুঃ ও কর্ম্ম- ফল গ্রহণ করিয়া গমন করে; যেহেতু তাহারা এই প্রকারে এই সমস্তকে লইয়া চলিয়া যায়, সেই হেতু ইহারা আদিত্য ॥২১১॥৫॥

কতম ইন্দ্রঃ কতমঃ প্রজাপতিরিতি, স্তনয়িতুরেবেন্দ্রো যজ্ঞঃ প্রজাপতিরিতি, কতমঃ স্তনয়িতুরিত্যশনিরিতি, কতমো যজ্ঞ ইতি পশব ইতি ॥ ২১২ ॥ ৬ ॥

সক্সলার্থঃ।—[শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ—] ইন্দ্রঃ কতমঃ? প্রজাপতিঃ[চ] কতমঃ? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] স্তনয়িতুঃ(অশনিঃ-বজ্রং) এব ইন্দ্রঃ, যজ্ঞঃ(যজ্ঞসাধনানি পশবঃ)[এব] প্রজাপতিঃ ইতি। স্তনয়িতুঃ কতমঃ? ইতি, অশনিঃ(অশনির্ব্বজ্রং স্তনয়িতু-পদবাচ্য ইত্যর্থঃ); যজ্ঞঃ কতমঃ? ইতি; পশবঃ(যজ্ঞসাধনানি পশবঃ যজ্ঞশব্দার্থঃ) ইতি ॥২১২৷৷৬৷৷

মূলানুবাদ?—[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন—] ইন্দ্র কে? এবং প্রজাপতিই বা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] স্তনয়িতুই ইন্দ্র, আর যজ্ঞই প্রজাপতি।[পুনঃ প্রশ্ন হইল—] স্তনয়িতুই বা কে? এবং যজ্ঞই বা কে?[যথাক্রমে উত্তর হইল—] স্তনয়িতু হইতেছে অশনি (বজ্র), আর যজ্ঞ হইতেছে তৎসাধন পশু ॥ ২১২ ॥ ৬ ॥

শৈশবকাব্যম্।—কথম্ ইক্ষুঃ, কতম্ প্রমাদিতিমিতি; কতম্-

৯১০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রেবেন্দ্রঃ যজ্ঞঃ প্রজাপতিরিতি। কতমঃ স্তনয়িত্ব রিতি? অশনিরিতি; অশনিঃ বজ্রং বীর্যৎ বলম্, যৎ প্রাণিনঃ প্রমাপয়ন্তি, স ইন্দ্রঃ; ইন্দ্রস্য হি তৎ কৰ্ম্ম। কতমো যজ্ঞ ইতি; পশব ইতি—যজ্ঞস্য হি সাধনানি পশবঃ। যজ্ঞস্যারূপত্বাৎ পশু-সাধনা- শ্রয়ত্বাচ্চ পশবো যজ্ঞ ইত্যুচ্যতে ॥২১২৷৷৬৷৷

টীকা। প্রসিদ্ধং বজ্রং ব্যাবর্ত্তয়তি-বীর্য্যামিতি। তদেব সঙ্ঘাতনিষ্ঠত্বেন স্ফুটয়তি- বলমিতি। কিং তম্বলমিতি চেত্তত্রাহ-যৎ প্রাণিন ইতি। প্রমাপণং হিংসনম্, কথং তন্যেন্দ্রত্বম্? উপচারাদিত্যাহ-ইন্দ্রস্য হীতি। পশূনাং যজ্ঞত্বমপ্রসিদ্ধমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যজ্ঞস্য হীতি। কারণে কার্যোপচারং সাধয়তি-যজ্ঞস্যেতি। অমূর্তত্বাৎ সাধনব্যতিরিক্তরূপাভাবাদ যজ্ঞস্য পশ্বাশ্রয়ত্বাচ্চ পশবো যজ্ঞ ইত্যুচ্যত ইত্যর্থঃ ॥২১২৪৬॥

ভাষ্যানুবাদ।—ইন্দ্র কে? এবং প্রজাপতিইবা কে? স্তনয়িত্ব হই- তেছে ইন্দ্র, আর যজ্ঞ হইতেছে প্রজাপতি।[পুনঃ প্রশ্ন হইল—] স্তনয়িত্ব কে? আর যজ্ঞই বা কে?[উত্তর হইল—] অশনি—বজ্র অর্থাৎ বল-বীর্য্য, যাহা প্রাণিগণকে সংহার করিয়া থাকে, তাহাই স্তনয়িত্ব; কেন না, উহাই ইন্দ্রের কর্ম্ম। যজ্ঞ কে? পশুগণ; কেন না, পশুই যজ্ঞের সাধন। যেহেতু যজ্ঞের কোনও আকৃতি নাই, এবং যেহেতু যজ্ঞমাত্রই পশুরূপ সাধনের অধীন অর্থাৎ যেহেতু পশুব্যতিরেকে যজ্ঞ নিষ্পন্ন হয় না, সেই হেতু পশুগণ ‘যজ্ঞ’ নামে কথিত হইয়া থাকে ॥২১২৷৷৬৷৷

কতমে ষড়িত্যগ্নিশ্চ পৃথিবী চ বায়ুশ্চান্তরিক্ষঞ্চাদিত্যশ্চ দ্যৌশ্চিতে ষট্, এতে হীদংসর্ব্বং ষড়িতি ॥ ২১৩ ॥ ৭ ॥

সক্সলার্থঃ।—[শাকল্যঃ পুনরাহ] ষট্(ত্বদুক্তাঃ ষট্সংখ্যকা দেবাঃ) কতমে(কিংস্বরূপাঃ)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] অগ্নিঃ চ, পৃথিবী চ, বায়ুঃ চ, অন্তরিক্ষৎ চ, আদিত্যঃ চ, দ্যৌঃ চ,—এতে(অগ্ন্যাদয়ঃ) ষট্[দেবাঃ]। হি(যস্মাৎ) ইদং সর্ব্বং(ত্রয়স্ত্রিংশদাদি-ভেদভিন্নং) এতে ষট্(এতেষু ষট্যু অন্তর্ভবতি);[অতঃ এতে এব ষট্ ইত্যভিপ্রায়ঃ] ॥২১৩৷৷৭৷৷

মুলাসুবাদ?—[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন—] সেই ছয়টি দেবতা কাহারা?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য ও দ্যুলোক, ইহারা সেই ছয় দেবতা; কেন না, পূর্ব্বে যে, তেত্রিশ প্রভৃতি দেবতা বিভাগ কথিত হইয়াছে, তাহারা এই ছয়টিরই অন্তর্ভুক্ত; অতএব ইহারাই সেই ছয় দেবতা ॥ ২১৩॥ ৭॥

শৈলকং।—কষায়ং বর্দ্ধিতম্। তে এবং পিত্তদোষে। কফঘ্নং।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

৯১১

পঠিতাঃ চন্দ্রমসং নক্ষত্রাণি চ বর্জয়িত্বা যট্ ভবন্তি-যট্সখ্যাবিশিষ্টাঃ। এতে হি যস্মাৎ ত্রয়স্ত্রিংশদাদি যদুক্তম্, ইদং সর্ব্বম্ এতে এব যট্ ভবন্তি; সর্ব্বো হি বস্বাদিবিস্তর এতেঘেব ষট্স্বন্তর্ভবতীত্যর্থঃ ॥২১৩৷৭৷৷

টীকা। এতে হীতি প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে-যম্মাদিতি। যত্রয়স্ত্রিংশদাদ্যুক্তং, তৎ সর্ব্বমেত এব যস্মাৎ, তস্মাদেতে ষটভবন্তীতি যোজনা। অক্ষরার্থমুক্ত। বাক্যার্থমাহ-সর্ব্বা হীতি ॥২১৩॥৭॥

ভাষ্যানুবাদ।—কতমে ষট্—ইতি। পূর্ব্বে বসুরূপে যাহাদের উল্লেখ করা হইয়াছে; তন্মধ্যে চন্দ্র ও নক্ষত্র বাদে, সেই অগ্নি প্রভৃতিই অত্রত্য ছয় দেবতা, অর্থাৎ অগ্নিপ্রভৃতি দেবতাই এখানকার ষট্‌সংখ্যক দেবতা। কেন না, পূর্ব্বে যে, তেত্রিশ প্রভৃতি বিভাগ উক্ত হইয়াছে, তাহারা এই ছয়টিরই অন্তর্ভুক্ত। অভিপ্রায় এই যে, উক্ত বসু প্রভৃতি দেবতাবিস্তার এই ছয়টির মধ্যেই রহিয়াছে ॥২১৩৷৷৭৷৷

কতমে তে ত্রয়ো দেবা ইতি, ইম এব ত্রয়ো লোকাঃ, এবু হীমে সর্ব্বে দেবা ইতি, কতমৌ তৌ দ্বৌ দেবাবিত্যন্ন- ঞ্চৈব প্রাণশ্চেতি। কতমোহধ্যর্দ্ধ ইতি, যোহয়ং পবত- ইতি ॥ ২১৪ ॥৮॥

সম্বলার্থঃ।—[শাকল্যঃ প্রপচ্ছ—] তে(ত্বদুক্তাঃ) ত্রয়ঃ(দেবাঃ) কতমে? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] ইমে(অনুভূয়মানাঃ) ত্রয়ঃ লোকাঃ (ভূভুবঃস্বরাখ্যাঃ) এব[ত্রয়ো দেবা ইতি শেষঃ]। হি(যস্মাৎ) এষু(ত্রিযু লোকেষু) ইমে(পূর্ব্বোক্তাঃ সর্ব্বে দেবাঃ)[অন্তর্ভূতা ইত্যর্থঃ] ইতি।[শাকল্যঃ পুনরাহ] তৌ(ত্বদুক্তৌ) দেবৌ কতমৌ? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] অন্নৎ চ, প্রাণঃ চ এব(এতৌ এব তৌ দ্বৌ দেবৌ ইত্যর্থঃ)।[পুনঃ শাকল্য আহ—] অধ্যর্দ্ধঃ(ত্বদুক্তঃ সার্দ্ধঃ) কতমঃ? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] যঃ অয়ং পবতে [বায়ুঃ ইত্যর্থঃ] ইতি ॥২১৪৷৷৮৷৷

মূলানুবাদ:-[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন-] তুমি যে, তিন দেবতার কথা বলিয়াছ, সেই তিনটি দেবতা কে কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] এই তিন লোক-ভূঃ ভুবঃ ও স্বঃ। কারণ, অপর সমস্ত দেবতা এই তিন দেবতারই অন্তর্ভূত।[শাকল্য পুনর্বার জিজ্ঞাসা করিলেন-] সেই দুইটি দেবতা কে কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] অন্ন ও প্রাণ।[শাকল্য পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন-] সেই অধ্যর্দ্ধ

৯১২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অর্থাৎ অর্দ্ধেক আর এক—দেড়খানি দেবতাকে?[উত্তর—] এই যিনি প্রবাহিত হইতেছেন অর্থাৎ বায়ু ॥ ২১৪ ॥ ৮॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কতমে তে ত্রয়ো দেবা ইতি। ইমে এব ত্রয়ো লোকা ইতি—পৃথিবীমগ্নিঞ্চ একীকৃত্য একো দেবঃ, অন্তরিক্ষং বায়ুঞ্চৈকীকৃত্য দ্বিতীয়ঃ, দিবমাদিত্যঞ্চৈকীকৃত্য তৃতীয়ঃ—তে এব ত্রয়ো দেবা ইতি। এযু হি যস্মাৎ ত্রিষু দেবেষু সর্ব্বে অন্তর্ভবন্তি, তেনৈত এব দেবাস্ত্রয় ইতি—এব নৈরুক্তানাৎ কেষাঞ্চিৎ পক্ষঃ। কতমৌ তৌ দ্বৌ দেবাবিতি—অন্নঞ্চৈব প্রাণশ্চ—এতৌ দ্বৌ দেবৌ; অনয়োঃ সর্ব্বেষামুক্তানামন্তর্ভাবঃ। কতমোহধ্যর্দ্ধ ইতি—যোহয়ৎ পরতে বায়ুঃ ॥২১৪৷৷৮৷৷

টীকা। প্রতিজ্ঞাসমাপ্তাবিতিশব্দঃ। তত্র হেতুঃ—এষু হীতি। দেবলক্ষণকৃতাং কেষাঞ্চিদেব পক্ষো দর্শিতোহন্যেষাং তু ত্রয়ো লোকা ইত্যস্য যথাশ্রুতোহর্থ ইত্যাহ—ইত্যেব ইতি ॥২১৪॥৮৷৷

ভাষ্যানুবাদ।—তুমি যে তিন দেবতার কথা বলিয়াছ, সেই তিনটি দেবতা কে কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] এই ত্রিলোকই[সেই তিন দেবতা]; পৃথিবী ও অগ্নিকে এক ধরিয়া এক দেবতা, বায়ু ও অন্তরিক্ষকে এক ধরিয়া দ্বিতীয় দেবতা, এবং দ্যুলোক ও আদিত্যকে এক ধরিয়া হইল তৃতীয় দেবতা—ইহারাই সেই তিন দেবতা। যেহেতু এই তিন দেবতাতেই অপর সমস্ত দেবতা অন্তর্ভূত, সেই হেতু এই তিনই সেই তিন দেবতা; ইহা হইতেছে কোন কোন ‘নিরুক্ত’ মতাবলম্বীদিগের সিদ্ধান্ত(১)।[অন্য সকলের মতে ‘লোক’ শব্দের সহজলভ্য ত্রিলোক অর্থই গ্রহণীয়]।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কথিত] সেই দুইটি দেবতা কে কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] অন্ন ও প্রাণ; ইহারাই সেই দুই দেবতা; পূর্ব্বোক্ত সমস্ত দেবতা এই দুই দেবতাতেই অন্তর্ভূত।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] তোমার কথিত সেই অধ্যর্দ্ধ(অর্দ্ধাধিক) দেবতাটি কে? [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] এই যিনি প্রবাহিত হইতেছেন, সেই বায়ু ॥২১৪॥৮॥

তদাহুর্যদয়মেক ইবৈব পবতেহথ কথমধ্যর্দ্ধ ইতি, যদস্মিন্নিদং- সর্ব্বমধ্যার্ঘোত্তেনাধ্যর্দ্ধ ইতি, কতম একো দেব ইতি, প্রাণ ইতি, স ব্রহ্ম ত্যদিত্যাচক্ষতে ॥ ২১৫ ॥ ৯ ॥

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

৯১৩

সরলার্থঃ?—তৎ(তত্র) একে(কেচিৎ) আহুঃ(কথয়ন্তি) যৎ, অয়ং (বায়ুঃ) একঃ(দ্বিতীয়রহিতঃ) এব(নিশ্চয়ে) পবতে(নিরন্তরং চলতি), অথ (অতঃ) কথং(কেন প্রকারেণ) ইব(সম্ভাবনায়াং—কথমিব)[সঃ] অধ্যর্দ্ধঃ [ভবেৎ?] ইতি।[অত্রোত্তরম্,] যৎ[যস্মাৎ] ইদং সর্ব্বং(জগৎ) অস্মিন্ (বায়ৌ সতি) অধ্যায়োৎ[অধি—অধিকাৎ ঋদ্ধিং আপ্নোৎ—প্রাপ্তবদিত্যর্থঃ] ইতি।[শাকল্যঃ পুনরাহ—] একঃ দেবঃ কতমঃ? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ,] প্রাণঃ ইতি। সঃ(প্রাণঃ) ব্রহ্ম(বৃহত্ত্বাৎ সর্বাত্মকত্বাৎ চ);[তৎ ব্রহ্ম] ত্যৎ ইতি(পরোক্ষতয়া) আচক্ষতে(বর্ণয়ন্তি পণ্ডিতাঃ) ॥২১৫৷৷৯৷৷

মূলানুবাদ?—বায়ুকে যে ‘অধ্যর্দ্ধ’ বলা হইল, তৎসম্বন্ধে অজ্ঞ লোকে আপত্তি করিয়া বলেন যে, এই বায়ুকে যেন এককই চলাফেরা করে বলিয়া বোধ হয়; অতএব বায়ু আবার ‘অধ্যর্দ্ধ’(অর্দ্ধাধিক) হয় কি প্রকারে?[উত্তর—] যেহেতু এই বায়ুর সদ্ভাবেই সমস্ত জগৎ ঋদ্ধি—কল্যাণ লাভ করিয়া থাকে, সেই হেতু এই বায়ু অধ্যর্দ্ধ।[পুনশ্চ শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] সেই একটি দেবতা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] তাহা প্রাণ; সেই প্রাণই ব্রহ্মস্বরূপ। পণ্ডিতগণ অপ্রত্যক্ষ বস্তুবোধক ‘ত্যৎ’ শব্দে তাঁহার নির্দেশ করিয়া থাকেন ॥ ২১৫ ॥ ৯ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তৎ তত্র আহুশ্চোদয়ন্তি—যদয়ং বায়ুঃ এক ইবৈব এক এব পরতে, অথ কথমধ্যর্দ্ধ ইতি। যৎ অস্মিন্নিদং সর্ব্বম্ অধ্যার্থোৎ— অস্মিন্ বায়ৌ সতি ইদং সর্ব্বম্ অধ্যার্থোৎ—অধি ঋদ্ধিং প্রাপ্নোতি, তেনাধ্যর্দ্ধ ইতি। কতম একো দেব ইতি; প্রাণ ইতি। সপ্রাণো ব্রহ্ম—সর্ব্বদেবাত্মকত্বাৎ মহব্রহ্ম, তেন স ব্রহ্ম ত্যদিত্যাচক্ষতে। ত্যদিতি তদ্‌ব্রহ্মাচক্ষতে—পরো- ক্ষাভিধায়কেন শব্দেন। দেবানামেতদেকত্বং নানাত্বঞ্চ—অনন্তানাং দেবানাং নিবিৎসঙ্খ্যাবিশিষ্টেস্বন্তর্ভাবঃ, তেষামপি ত্রয়স্ত্রিংশদাদিষু উত্তরোত্তরেষু যাবদে- কস্মিন্ প্রাণে; প্রাণস্যৈব চৈকস্য সর্ব্বোহনন্তসঙ্খ্যাতো বিস্তরঃ। এবমেকশ্চানন্তশ্চ অবান্তরসঙ্খ্যাবিশিষ্টশ্চ প্রাণ এব। তত্র চ দেবস্যৈকস্য নামরূপকর্মগুণশক্তিভেদঃ, অধিকারভেদাৎ ॥২১৫৷৷৯৷৷

টীকা। একস্যাধ্যর্দ্ধত্বমাক্ষিপতি—তত্তত্রেতি। ইবশব্দস্তু কথমিত্যত্র সম্বধ্যতে। পরি- হরতি—যদস্মিন্নিতি। প্রাণস্য ব্রহ্মত্বং সাধয়তি—সর্ব্বেতি। তেন মহত্বেনেতি যাবৎ। তস্য পরোক্ষত্বপ্রতিপত্তৌ প্রযত্নগৌরবার্থং কথয়তি—ত্যদিতীতি। উত্তমর্থং প্রতিপত্তিসৌকর্য্যার্থং

৯১৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সংগৃহ্লাতি-দেবানামিতি। একত্বং প্রাণে পর্যবসানম্। নানাস্থমানস্ত্যম্। ষড়ধিকত্রিশ- তাথিকত্রিসহস্রসংখ্যকানামের দেবানামত্রোক্তত্বাৎ কথং তদানন্ত্যমিত্যাশঙ্ক্য শতসহস্রশব্দাভ্যা- মনন্ততাহপ্যুক্তৈবেত্যাশয়েনাহ-অনস্তানামিতি। একস্মিন্ প্রাণে পর্যবসানং যাবস্তবতি, তাবৎপর্য্যন্তমুত্তরোত্তরেষু ত্রয়স্ত্রিংশদাদিয় তেষামপ্যস্তর্ভাব ইত্যাহ-তেষামপীতি। প্রাণস্য কস্মিন্নন্তর্ভাবস্তত্রাহ-প্রাণস্যৈবেতি। সংগৃহীতমর্থমুপসংহরতি-এবমিতি। একস্যানেকধাভাবে কিং নিমিত্তমিত্যাশঙ্ক্যাহ-উক্তরীত্যা প্রাণস্বরূপে স্থিতে সতীতি যাবৎ। দেবস্যৈকন্য প্রকৃতস্য প্রাণস্যৈবেত্যর্থঃ। প্রাণিনাং জ্ঞানে কর্মণি চাধিকারস্য স্বামিত্বস্থ্য ভেদোহধিকারভেদস্তন্নিমিত্তত্বেন দেবস্তানেকসংস্থানপরিণামসিদ্ধিঃ। প্রাণিনো হি জ্ঞানং কৰ্ম্ম চানুষ্ঠায় সূত্রাংশমগ্ন্যাদিরূপমা- পদ্যন্তে, তদ্যুক্তো যথোক্তো ভেদ ইত্যর্থঃ ॥২১৫।৯৷

ভাষ্যানুবাদ।-তদ্বিষয়ে এক সম্প্রদায়ের পণ্ডিতগণ আপত্তি উত্থাপন করিয়া বলেন যে, এই বায়ু ত এককই প্রবাহিত হইয়া থাকে; তবে ‘অধ্যর্দ্ধ’ হয় কিরূপে?(উত্তর,) যেহেতু এই বায়ু বিদ্যমান থাকিলেই উক্ত সমস্ত দেবতা সমধিক ঋদ্ধি-সম্পদ অর্থাৎ কল্যাণ লাভ করিতে সমর্থ হয়; সেই হেতু বায়ু ‘অধ্যর্দ্ধ’ নামে অভিহিত।(শাকল্য পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন,) সেই একটি দেবতা কে?(যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,) সেই দেবতাটি হইতেছে প্রাণ। সেই প্রাণই অপর সর্ব্ব দেবতাময় বলিয়া মহৎ ব্রহ্ম; সেই কারণে উক্ত প্রাণরূপী ব্রহ্ম ‘ত্যৎ’ শব্দে অভিহিত হইয়া থাকেন; অর্থাৎ পণ্ডিতগণ পরোক্ষবোধক(অপ্র- ত্যক্ষ বস্তুবোধক) ‘ত্যৎ’ শব্দে তাঁহার নির্দেশ করিয়া থাকেন। দেবতাগণের এইরূপে একত্ব ও নানাত্ব উভয়ই আছে। অভিপ্রায় এই যে, দেবতাগণ সংখ্যায় অনন্ত হইলেও, ‘নিবিং’-কথিত সংখ্যাবিশিষ্ট দেবতার অন্তনিবিষ্ট, তাহাদেরও আবার পর পর তেত্রিশ প্রভৃতি স্বল্পসংখ্যক দেবতার মধ্যে অন্তর্ভাব হইতে-হইতে প্রাণে তাহার পরিসমাপ্তি হইয়াছে; বুঝিতে হইবে যে, এক প্রাণেরই উক্ত অনন্তসংখ্যক বিস্তার। এইরূপে এক ও অনন্ত যাহা কিছু, তৎসমস্ত প্রাণই বটে। তন্মধ্যেও আবার অধিকারভেদানুসারে একই দেবতার নাম, রূপ, কৰ্ম্ম ও গুণানুসারে বিস্তর প্রভেদ হইয়া থাকে,[বস্তুতঃ মূলীভূত দেবতা একই, অতিরিক্ত নহে] ॥২১৫৷৷৯৷৷

আভাসভাষ্যম্।—ইদানীং তস্যৈব প্রাণস্য ব্রহ্মণঃ পুনরষ্টধা ভেদ উপদিশ্যতে—

পৃথিব্যেব যস্যায়তনমগ্নির্লোকো মনোজ্যোতিঃ, যো বৈ তং পুরুষং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং স বৈ বেদিতা স্যাৎ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৯১৫

যাজ্ঞবল্ক্য, বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং যমাথ, য এবায়ং শারীরঃ পুরুষঃ স এষঃ, বদৈব শাকল্য তস্য কা দেবতেত্যমৃতমিতি হোবাচ ॥ ২১৬ ॥ ১০ ॥

সরলার্থঃ।—[ইদানীং তস্যৈব প্রাণস্য অষ্টবিধো ভেদ উচ্যতে—‘পৃথিব্যেব’ ইত্যাদিনা।] হে যাজ্ঞবল্ক্য, যস্য(প্রাণব্রহ্মণঃ) পৃথিবী এব আয়তনম্(আশ্রয়ঃ); অগ্নিঃ লোকঃ(লোক্যতে—দৃশ্যতে অনেনেতি লোকঃ—চক্ষুঃ); মনঃ(অন্তঃ- করণম্) জ্যোতিঃ(দৃষ্টিসহায়ঃ প্রকাশ ইত্যর্থঃ)। যঃ(জনঃ) বৈ(এব) সর্ব্বস্য আত্মনঃ(জীবসংঘাতস্য) পরায়ণং(প্রধানম্ আশ্রয়ম্) তৎ(যথোক্ত- গুণসম্পন্নং) পুরুষৎ(প্রাণং) বিদ্যাৎ(বিশেষেণ জানীয়াৎ), সঃ (বিজ্ঞাতা) বৈ বেদিতা(পণ্ডিতঃ) স্যাৎ;(ত্বং তু তং পুরুষং ন জানাসীতি ভাবঃ)।

(যাজ্ঞবল্ক্য আহ-) হে শাকল্য, ত্বং যৎ(পুরুষম্) আখ(কথয়সি), অহং বৈ তং সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণং পুরুষং বেদ(বেদ্মি-জানামি ইত্যর্থঃ)। (কোহসৌ?) যঃ এব অসৌ(অনুভূয়মানঃ) শারীরঃ(শরীরে ভবঃ-লোম- লোহিতমাংসরূপঃ পুরুষঃ, সঃ)।(এষঃ) ত্বৎপৃষ্টঃ(শারীরঃ পুরুষঃ)। বদ এব(ভূয়োহপি যদ্বক্তব্যমস্তি, তৎ পৃচ্ছ ইত্যর্থঃ)।(এবমুক্তঃ শাকল্য আহ-) তস্য(শারীরস্য পুরুষস্য) দেবতা কা? ইতি[এবং পৃষ্টঃ যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ], অমৃতম্(ভুক্তান্নজো রসঃ) ইতি ॥২১৬৷৷১০৷৷

মূলানুবাদ:-[ অতঃপর পূর্বোক্ত প্রাণ-ব্রহ্মের অষ্টপ্রকার বিভাগ ক্রমশঃ প্রদর্শন করিতেছেন-] ।[শাকল্য বলিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, পৃথিবীই যাহার আয়তন অর্থাৎ আশ্রয়, অগ্নি যাহার লোক (চক্ষু), মনঃ যাহার জ্যোতিঃ অর্থাৎ দর্শনোপযোগী প্রকাশ, সমস্ত দেবতার একমাত্র আশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে(প্রাণ ব্রহ্মকে) যিনি জানেন, তিনিই যথার্থ জ্ঞানী।[অভিপ্রায় এই যে, হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি তাহাকে জান না, অতএব তোমার জ্ঞানাভিমান বৃথা। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] হে শাকল্য, তুমি যে পুরুষের কথা বলিতেছ, আমি নিশ্চয়ই তাঁহাকে জানি; এই যে, শারীর পুরুষ, ইহাই সেই পুরুষ। তুমি পুনশ্চ তদ্বিষয়ে প্রশ্ন কর।(শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন-)

৯১৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সেই শারীর পুরুষের দেবতা কে? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—অমৃত অর্থাৎ ভুক্ত অন্নের পরিণামসম্ভূত রস ॥ ২১৬ ॥ ১০ ॥ শাঙ্করভাষ্যম্।—পৃথিব্যের যস্য দেবস্য আয়তনম্ আশ্রয়ঃ, অগ্নি- লোকো যস্য,—লোকয়ত্যনেনেতি লোকঃ পশ্যতীতি—অগ্নিনা পশ্যতীত্যর্থঃ; মনোজ্যোতিঃ—মনসা জ্যোতিষা সঙ্কল্পবিকল্পাদি কার্য্যং করোতি যঃ, সোহয়ং মনোজ্যোতিঃ; পৃথিবীশরীরোহগ্নিদর্শনঃ মনসা সঙ্কল্পয়িতা পৃথিব্যভিমানী কার্য্য- করণসঙ্ঘাতবান্ দেব ইত্যর্থঃ। য এবং বিশিষ্টং বৈ তৎ পুরুষৎ বিদ্যাৎ বিজা- নীয়াৎ, সর্ব্বস্যাত্মনঃ আধ্যাত্মিকস্য কার্য্যকরণসঙ্ঘাতস্যাত্মনঃ, পরম্ অয়নং পর আশ্রয়ঃ, তং পরায়ণম্,—মাতৃজেন ত্বাত্মাসরুধিররূপেণ ক্ষেত্রস্থানীয়েন বীজ- স্থানীয়স্য পিতৃজস্যান্থিমজ্জাশুক্ররূপস্য পরময়নম্, করণাত্মনশ্চ, স বৈ বেদিতা স্যাৎ—য এতদেবং বেত্তি, স বৈ বেদিতা পণ্ডিতঃ স্যাদিত্যভিপ্রায়ঃ। যাজ্ঞবল্ক্য, ত্বং তম্ অজানন্নেব পণ্ডিতাভিমানীত্যভিপ্রায়ঃ। যদি তদ্বিজ্ঞানে পাণ্ডিত্যং লভ্যতে, বেদ বৈ অহং তৎ পুরুষং-সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণম্, যমাথ যৎ কথয়সি, তমহং বেদ। তত্র শাকল্যস্য বচনং দ্রষ্টব্যম্- যদি ত্বং বেথ তৎ পুরুষম্, ক্রহি কিংবিশেষণোহসৌ? শৃণু-যদ্বিশেষণঃ সঃ, য এবায়ং শারীরঃ-পার্থিবাংশে শরীরে ভবঃ শারীরঃ মাতৃজ-কোশত্রয়রূপ ইত্যর্থঃ; স এষ দেবঃ, যত্ত্বয়া পৃষ্টঃ, হে শাকল্য; কিন্তুস্তি তত্র বক্তব্যং বিশেষণান্তরম্; তদ্বদৈব পৃচ্ছৈবেত্যর্থঃ, হে শাকল্য। স এবং প্রক্ষোভিতোহমর্ষবশগ আহ- তোত্রাদিত ইব গজঃ-তস্য দেবস্য শারীরস্য কা দেবতা?-যম্মান্নিস্পদ্যতে, যঃ “সা তস্য দেবতা” ইত্যস্মিন্ প্রকরণে বিবক্ষিতঃ। অমৃতমিতি হোবাচ; অমৃত- মিতি যো ভুক্তস্যান্নস্য রসঃ মাতৃজন্য লোহিতস্য নিষ্পত্তিহেতুঃ, তস্মাদ্ধি অন্নরসা- লোহিতং নিষ্পদ্যতে স্ত্রিয়াং শ্রিতম্; ততশ্চ লোহিতময়ং শরীরং বীজাশ্রয়ম্। সমানমন্যৎ ॥২১৬৷৷১০৷৷ টাকা। সঙ্কোচবিকাসাভ্যাং প্রাণস্বরূপোক্ত্যনন্তরমবসরপ্রাপ্তিরিদানীমিত্যুচ্যতে। উপ- দিশ্যতে ধ্যানার্থমিতি শেষঃ। অবয়বশো বাক্যং যোজয়তি-পৃথিবীতি। সংপিণ্ডিতং বাক্যত্রয়ার্থং কথয়তি-পৃথিবীত্যাদিনা। বৈশব্দোহবধারণার্থঃ। তং পরায়ণং য এব বিজানীয়াৎ, স এব বেদিতা স্যাদিতি সম্বন্ধঃ। অথ কেন রূপেণ পৃথিবীদেবস্য কার্যকরণসঙ্ঘাতং প্রত্যাশ্রয়ত্বং, তদাহ-মাতৃজেনেতি। পৃথিব্যা মাতৃশব্দবাচ্যত্বাদ য এব এযোহহং পৃথিব্যস্মীতি মন্যতে, স এব শরীরারম্ভকমাতৃজ-কোশত্রয়াভিমানিতয়া বর্ত্ততে। তথা চ তন্য তেন রূপেণ পিতৃজত্রিতয়ং কাৰ্য্যং লিঙ্গং চ করণং প্রত্যাশ্রয়ত্বং সম্ভবতীত্যর্থঃ। পৃথিবীদেবস্য পরায়ণত্বমুপপাদ্যানন্তর- বাক্যমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-সবৈ বেদিতেতি। তথাপি মম কিমায়াতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যাজ্ঞবন্ধ্যেতি।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

৯১৭

স পুরুষো যেন বিশেষগেন বিশিষ্টস্তদ্বিশেষণমুচ্যমানং শৃঙ্খিত্যুক্ত। তদেবাহ-য এবেতি। শরীরং হি পঞ্চভূতাত্মকং, তত্র পার্থিবাংশে জনকত্বেন স্থিতঃ শারীর ইতি যাবৎ। তস্য জীবত্বং বারয়তি-মাতৃজেতি। পৃথিবীদেবন্য নির্ণীতত্বশঙ্কাং বারয়তি-কিং ত্বিতি। যাজ্ঞবন্ধ্যো বক্তা সন্ প্রষ্টারং শাকল্যং প্রতি কথং বদৈবেতি কথয়তি, তত্রাহ-পৃচ্ছেতি। ক্ষোভিতস্যা- মর্ষবশগত্বে দৃষ্টান্তঃ-তোত্রেতি। প্রাকরণিকং দেবতাশব্দার্থমাহ-যস্মাদিতি। পুরুষো নিষ্পত্তিকর্তা ষষ্ঠ্যোচ্যতে। লোহিতনিষ্পত্তিহেতুত্বমন্নরসস্যানুভবেন সাধয়তি-তস্মাদ্ধীতি। তস্য কার্য্যমাহ-ততশ্চেতি। লোহিতাদদ্বিতীয়পদার্থনিষ্ঠাত্তৎকার্য্যং ত্বদ্মাংসরুধিররূপং বীজস্যান্থিমজ্জাশ্রুতাত্মকস্যাশ্রয়ভূতং ভবতীত্যর্থঃ। পর্যায়সপ্তকমাদ্যপর্যায়েণ তুল্যার্থত্বান্ন পৃথগ্যাখ্যানাপেক্ষমিত্যাহ-সমানমিতি ॥২১৬॥১০॥

ভাষ্যানুবাদ।—পৃথিবীই যে দেবতার আয়তন—আশ্রয়; অগ্নি যাহার লোক;—লোক অর্থ—যাহা দ্বারা অবলোকন—দর্শন করা হয়; অর্থাৎ যে দেবতা অগ্নি দ্বারা দর্শন করেন; মন যাহার জ্যোতিঃ, অর্থাৎ যে দেবতা মনোময় জ্যোতির সাহায্যে সঙ্কল্প-বিকল্পাদির বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা করেন। অভিপ্রায় এই যে, মনোরূপ জ্যোতিঃসম্পন্ন, পৃথিবীময় দেহধারী, অগ্নিরূপ নয়নযুক্ত সেই দেবতা মনের দ্বারা ভাল মন্দ চিন্তা করিয়া থাকেন; এবং পৃথিবীকেই আপনার শরীর বলিয়া মনে করেন। যে লোক ঈদৃশ বিশিষ্ট গুণসম্পন্ন, এবং সমস্ত আত্মার—আত্মসম্পর্কিত দেহেন্দ্রিয়সমষ্টির প্রধান আশ্রয় অর্থাৎ দেহবর্তী মাতৃঙ্গ ত্বক্, মাংস ও রুধিররূপে বীজস্বরূপ পিতৃজ অস্থি মজ্জা শুক্রের(১) ও ইন্দ্রিয়বর্গের সর্ব্বোত্তম আশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে জানেন, তিনিই যথার্থ জ্ঞানী। অভিপ্রায় এই যে, এইরূপ জ্ঞান লাভ করিলেই লোক দেবতা বিষয়ে যথার্থ পণ্ডিত-পদবাচ্য হইতে পারেন; হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি তাহা না জানিয়াই বৃথা পাণ্ডিত্যাভিমান করিতেছ!(যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, ভাল,) তাহাকে জানিলেই যদি পাণ্ডিত্য লাভ হয়, তবে আমিও সর্ব্ব আত্মার পরায়ণ সেই পুরুষকে জানি—তুমি যাহার কথা বলিতেছ, অর্থাৎ তুমি যে পুরুষের কথা বলিতেছ, আমি তাঁহাকে জানি।

(১) তাৎপর্য্য—আমাদের স্থূল শরীরের প্রধান উপাদান ছয়টা পদার্থ—ত্বক্, মাংস, রুধির, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র। তন্মধ্যে প্রথমোক্ত তিনটা—ত্বক্, মাংস ও রুধির মাতৃ-দেহ হইতে, আর অস্থি, মজ্জা ও শুক্র, এই তিনটা পিতৃদেহ হইতে উৎপন্ন হয়। উক্ত ছয়টা পদার্থকেই কোশ বলে। তাহা দ্বারা রচিত বলিয়া স্থূল শরীরকে ‘ষাটকৌশিক’ বলে। উক্ত ছয়টি কোশের মধ্যে মাতৃদেহজ প্রাথমিক তিনটী(ত্বক্, রুধির ও মাংস) ক্ষেত্রস্বরূপ, আর পিতৃদেহজ অস্থি, মজ্জা ও শুক্র, এই তিনটা বীজস্বরূপ; বীজ যেমন মাটীতে মিলিত হইয়া অঙ্কুর জন্মায়, তদ্রূপ অস্থিপ্রভৃতি বীজ ও ত্বক্ প্রভৃতি ক্ষেত্রে পতিত হইয়া স্থূল শরীর উৎপাদন করে।

৯১৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

(ইহার পর শাকল্যের উক্তি ধরিয়া লইতে হইবে; শাকল্য যেন বলি- লেন-) তুমি যদি সেই পুরুষকে জান, তাহা হইলে বল দেখি-সেই পুরুষ কিরূপ বিশেষণে বিশেষিত?(যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-) তাহার যাহা বিশেষণ, তাহা বলিতেছি; শ্রবণ কর,-এই যে, শারীর-পার্থিব শরীর হইতে সমুৎ- পন্ন, অর্থাৎ মাতৃশরীর হইতে উৎপন্ন কোশত্রয়-ত্বক্, মাংস ও রুধির, ইহাই তোমার জিজ্ঞাসিত দেবতার স্বরূপ। হে শাকল্য, তাঁহার আরও বিশেষণ আছে, তাহাও জানা আবশ্যক; তুমি তৎসম্বন্ধে আরও প্রশ্ন কর। শাকল্য তখন যাজ্ঞবল্ক্যের কথায় চঞ্চলচিত্ত হইয়া-অঙ্কুশ-তাড়িত হস্তীর ন্যায় আর সহ্য করিতে না পারিয়া বলিলেন-ভাল, সেই শারীর পুরুষের দেবতা কে?(১) অর্থাৎ যাহা হইতে শারীর পুরুষ প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে, এবং ‘সা তস্য দেবতা’ বাক্যে যাহার কথা বলিতে ইচ্ছা করা হইয়াছে, সেই দেবতাটি কে? তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-তাহা অমৃত। এখানে অমৃত অর্থ ভুক্ত অন্নের পরিপাকজ রস, যাহা হইতে মাতৃজ রুধির নিষ্পন্ন হয় এবং যাহা হইতে আবার পিতৃজ বীজের আশ্রয়ভূত রুধিরময় শরীর সমুৎপন্ন হয়। ইহার অন্যাংশের ব্যাখ্যা পূর্ব্বের অনুরূপ ॥ ২১৬॥ ১০ ॥

কাম এব যস্যায়তনং হৃদয়ং লোকো মনো জ্যোতিঃ, যো বৈ তং পুরুষং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং স বৈ বেদিতা স্যাদ্ যাজ্ঞবল্ক্য, বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং যমাথ, য এবায়ং কামময়ঃ পুরুষঃ, স এষঃ, বদৈব শাকল্য, তস্য কা দেবতেতি, স্ত্রিয় ইতি হোবাচ ॥ ২১৭ ॥ ১১ ॥

সরলার্থঃ।—[শাকল্যঃ পুনরাহ—] কামঃ এব যস্য(দেবস্য) আয়তনং, হৃদয়ং লোকঃ(চক্ষুঃ), মনঃ জ্যোতিঃ; হে যাজ্ঞবল্ক্য, যঃ বৈ(এব) সর্ব্বস্য আত্মনঃ(দেহেন্দ্রিয়সংঘাতস্য) পরায়ণৎ(পরমাশ্রয়ভূতং) তৎ পুরুষং বিদ্যাৎ (বিজানীয়াৎ), সঃ বৈ(এব) বেদিতা(বিদ্বান্—জ্ঞানী) স্যাৎ;(ত্বং তু তৎ পুরুষং ন বেৎসি ইত্যভিপ্রায়ঃ)।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হে শাকল্য, ত্বং যং

(১) তাৎপর্য্য—এখানে দেবতা শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহা এই—যাহার আশ্রয়ে বা সাহায্যে যাহার স্থিতি ও বৃদ্ধি বা পুষ্টি হয়, তাহাই তাহার দেবতা। ভুক্ত অন্নের পরিণতি রস দ্বারা দেহের পুষ্টি ও স্থিতি হইয়া থাকে, এই জন্য অন্নরস শারীর পুরুষের দেবতা বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। পরবর্তী শ্রুতিতেও এইরূপ অভিপ্রায় বুঝিয়া লইতে হইবে।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৯১৯

(পুরুষৎ) আখ(কথয়সি), অহং বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণৎ তৎ পুরুষং বেদ(জানামি)।[কোহসৌ? ইত্যাহ-] যঃ এব অয়ং কামময়ঃ পুরুষঃ, সঃ এষঃ(ত্বৎপৃষ্ঠঃ কামময়ঃ পুরুষঃ);(পুনরপি তদ্বিশেষং) পৃচ্ছ এব। (শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ-) তস্য(পুরুষস্য) কা দেবতা? ইতি;[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] স্ত্রিয়ঃ(উক্তঃ কামময়ঃ পুরুষঃ স্ত্রীযু প্রতিষ্ঠিত ইত্যর্থঃ) ইতি ॥২১৭৷৷১১৷৷

মুলাসুবাদ:-কামই যাহার আয়তন(শরীর),[কাম অর্থ-স্ত্রীসঙ্গাভিলাষ], হৃদয় যাহার চক্ষুঃ, এবং মন যাহার জ্যোতিঃ, সমস্ত দেহসঙ্ঘাতের একমাত্র আশ্রয় সেই পুরুষকে যিনি জানেন, তিনিই জ্ঞানী হইতে পারেন;[হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি তাহাকে জাননা; সুতরাং তোমার পাণ্ডিত্যাভিমান বৃথা]।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] হে শাকল্য, তুমি যাহার কথা বলিতেছ, আমি সর্ব্বাত্ম-পরায়ণ সেই পুরুষকে জানি। [তাহা কি?] যিনি এই কামময় পুরুষ, তিনিই তাহা;[তাহার সম্বন্ধে যদি আরও জানিতে ইচ্ছা থাকে, তাহা হইলে] স্বচ্ছন্দে জিজ্ঞাসা কর। [শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন-] এই পুরুষের দেবতা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] স্ত্রীসমূহ; কারণ, স্ত্রী হইতেই কামবৃত্তির উদ্দীপনা হইয়া থাকে ॥ ২১৭ ॥ ১১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কাম এব যস্যায়তনম্। স্ত্রীব্যতিকরাভিলাষঃ কামঃ, কামশরীর ইত্যর্থঃ। হৃদয়ং লোকঃ, হৃদয়েন বুদ্ধ্যা পশ্যতি। য এবায়ৎ কামময়ঃ পুরুষঃ, অধ্যাত্মমপি কামময় এব, তস্য কা দেবতেতি? স্ত্রিয় ইতি হোবাচ; স্ত্রীতো হি কামস্য দীপ্তির্জায়তে ॥২১৭৷৷১১৷৷

টীকা উত্তরপর্যায়েষু যেষাং পদানামর্থভেদস্তেষাং তৎকলনার্থং প্রতীকং গৃহ্লাতি-কাম ইতি। বাক্যার্থমাহ-কামশরীর ইত্যর্থ ইতি। স চ হৃদয়দর্শনো মনসা সঙ্কল্পয়িতেতি পূর্ব্ববৎ। তস্য বিশেষণং দর্শয়তি-য এবেতি। আধ্যাত্মিকস্য কামময়স্য পুরুষস্য কারণং পৃচ্ছতি- তস্যেতি। তন্যান্তৎকারণত্বমনুভবেন ব্যনক্তি-স্ত্রীতো হীতি ॥২১৭।১১॥

ভাষ্যানুবাদ।—“কাম এব যস্যায়তনম্” ইত্যাদি। এখানে কাম অর্থ —স্ত্রীসংসর্গাভিলাষ; উক্ত পুরুষ সেই কামশরীরসম্পন্ন। হৃদয় তাহার লোক (চক্ষু); কারণ, তিনি হৃদয়—বুদ্ধি দ্বারা দর্শন করেন। এই যে কামময় পুরুষ, অধ্যাত্ম কামময় পুরুষও তিনিই; তাহার দেবতা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] স্ত্রী; কারণ, স্ত্রী হইতেই কামবৃত্তির উদ্দীপনা হইয়া থাকে ॥২১৭৷৷১১৷৷

৯২০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রূপাণ্যেব যস্যায়তনং চক্ষুর্লোকো মনো জ্যোতিঃ, যো বৈ তং পুরুষং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং স বৈ বেদিতা স্যাদ্ যাজ্ঞবল্ক্য, বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং, যমাখ, য এবাসাবাদিত্যে পুরুষঃ স এষঃ, বদৈব শাকল্যা তস্য কা দেবতেতি, সত্যমিতি হোবাচ ॥ ২১৮ ॥ ১২ ॥

সরলার্থঃ।—[শাকল্যঃ পুনঃ পৃচ্ছতি] রূপাণি(শুক্লকৃষ্ণাদীনি) যস্য (পুরুষস্য) আয়তনং(আশ্রয়ঃ), চক্ষুঃ লোকঃ(দৃষ্টিসাধনম্), মনঃ জ্যোতিঃ; হে যাজ্ঞবল্ক্য, যঃ বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণৎ তং পুরুষং বিদ্যাৎ; স বৈ বেদিতা স্যাৎ।(যাজ্ঞবল্ক্য আহ—) হে শাকল্য, অহং বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণৎ তৎ পুরুষং বেদ(জানামি); ত্বং যৎ(পুরুষৎ) আথ(কথয়সি)। [কোহসৌ?] যঃ এব অসৌ আদিত্যে পুরুষঃ, সঃ(আদিত্যপুরুষঃ) এব (নিশ্চয়ে) এষঃ(রূপ-পুরুষঃ)।[যদি অন্যদপি তে প্রষ্টব্যমস্তি, তর্হি] বদ (পৃচ্ছ) এব।[শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ—] তস্য(রূপ-পুরুষস্য) দেবতা কা? ইতি।(যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ—) সত্যম্—ইতি।(অত্র সত্যশব্দেন চক্ষুরুচ্যতে, যতঃ চক্ষুষ এব আধিদৈবিকস্য আদিত্যস্য স্বরূপনিষ্পত্তিঃ শ্রয়তে ইতি ভাবঃ।) ॥২১৮৷৷১২৷৷

মূলানুবাদ:-রূপসমূহ যাহার আয়তন(শরীর), চক্ষু যাহার লোক, এবং মন যাহার জ্যোতিঃ, সমস্ত আত্মার(দেহসংঘাতের) একমাত্র আশ্রয় সেই পুরুষকে যিনি জানেন, তিনিই জ্ঞানী হইতে পারেন;[হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি তাহাকে জান না; সুতরাং তোমার পাণ্ডিত্যাভিমান বৃথা]।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হে শাকল্য, তুমি যাহার কথা বলিতেছ, আমি সর্বাত্ম-পরায়ণ সেই পুরুষকে জানি।[তাহা কি?] যিনি এই আদিত্য-পুরুষ, তিনিই তাহা।[তাহার সম্বন্ধে যদি আরও জানিতে ইচ্ছা থাকে, তাহা হইলে,] স্বচ্ছন্দে জিজ্ঞাসা কর।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] এই পুরুষের দেবতা কে? [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] সত্য অর্থাৎ চক্ষুঃ; কারণ, চক্ষু হইতেই আদিত্যের অভ্যুদয় হইয়া থাকে ॥ ২১৮ ॥ ১২ ॥

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৩২১

শাঙ্করভাষ্যম্।—রূপাণ্যেব যস্যায়তনম্; রূপানি শুক্লকৃষ্ণাদীনি। য এবাসৌ আদিত্যে পুরুষঃ—সর্ব্বেষাৎ হি রূপাণাং বিশিষ্টং কার্য্যমাদিত্যে পুরুষঃ, তস্য কা দেবতেতি। সত্যমিতি হোবাচ; সত্যমিতি চক্ষুরুচ্যতে, চক্ষুষো হি অধ্যাত্মত আদিত্যস্যাধিদৈবতস্য নিষ্পত্তিঃ ॥২১৮৷৷১২৷৷

টীকা। রূপশরীরস্য চক্ষুর্দর্শনস্য মনসা সঙ্কল্পয়িতুদেবস্য কথমাদিত্যে পুরুষো বিশেষণ- মিত্যাশঙ্ক্যাহ—সর্ব্বেষাং হীতি। রূপমাত্রাভিমানিনো দেবস্যাদিত্যে পুরুষো বিশেষাবচ্ছেদঃ। স চ সর্ব্বরূপপ্রকাশকত্বাৎ সর্ব্বৈ রূপৈঃ স্বপ্রকাশনায়ারব্ধঃ। তস্মাদ যুক্তং যথোক্তং বিশেষণ- মিত্যর্থঃ। কথং চক্ষুষঃ সকাশাদাদিত্যস্যোৎপত্তিরিত্যাশঙ্ক্য ‘চক্ষোঃ সূর্য্যো অজায়ত’ ইতি শ্রুতিমাশ্রিত্যাহ—চক্ষুষো হীতি ॥২১৮৷১২॥

ভাষ্যানুবাদ।--“রূপানি এব যস্য আয়তনম্” ইত্যাদি। রূপ অর্থ শুক্ল কৃষ্ণাদি বর্ণ। ‘এই যে আদিত্যমণ্ডলে পুরুষ,’ একথার অর্থ এই যে, যতপ্রকার রূপ আছে, আদিত্যমণ্ডলে অধিষ্ঠিত পুরুষ হইতেছেন সে সমুদয়ের বিশেষ কার্য্য বা ফলস্বরূপ। তাঁহার দেবতা কে? তাহার দেবতা ‘সত্য’। এখানে চক্ষুকে ‘সত্য’ বলা হইতেছে; কারণ, অধ্যাত্ম চক্ষু হইতেই আধিদৈবিক আদিত্যের অভিব্যক্তি হইয়া থাকে ॥২১৮৷৷১২৷৷

আকাশ এব যস্যায়তন শ্রোত্রং লোকো মনোজ্যোতিঃ, যো বৈ তং পুরুষং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং স বৈ বেদিতা স্যাদ্ যাজ্ঞবল্ক্য, বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং, যমাখ, য এবায়শ্রৌত্রঃ প্রাতিশ্রুৎকঃ পুরুষঃ স এষঃ, বদৈব শাকল্য, তস্য কা দেবতেতি, দিশ ইতি হোবাচ ॥ ২১৯ ॥ ১৩ ॥

সরলার্থঃ।—তথা, আকাশঃ এব যস্য(পুরুষস্য) আয়তনম্, শ্রোত্রং লোকঃ, মনঃ জ্যোতিঃ; হে যাজ্ঞবল্ক্য, যঃ(জনঃ) সর্ব্বস্য আত্মনঃ(দেহেন্দ্রিয়- সংঘাতস্য) পরায়ণং তৎ(আকাশশরীরং পুরুষং) বিদ্যাৎ, সঃ বৈ বেদিতা (জ্ঞানী) স্যাৎ।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হে শাকল্য, অহং বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণং তৎ পুরুষং বেদ(বেদ্মি), ত্বং যং(পুরুষম্) আথ(কথয়সি)। [কোহসৌ? ইত্যত আহ—] য এব অয়ং।শ্রৌত্রঃ(শ্রোত্রে ভবঃ শ্রবণেন্দ্রি- রোপলক্ষিতঃ),[তত্রাপি] প্রাতিশ্রুৎকঃ(প্রতেকশ্রুতৌ বিশেষতঃ অভিব্যজ্যতে ইত্যর্থঃ) পুরুষঃ, সঃ এষঃ(ত্বৎপৃষ্টঃ পুরুষ ইত্যর্থঃ)।[শাকল্য আহ—]

৯২২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তস্য(আধ্যাত্মিকস্য) কা দেবতা?[যাজ্ঞবল্ক্যঃ] উবাচ হ-দিশঃ ইতি, (দিশামেব তদভিব্যঞ্জকত্বাদিতি ভাবঃ) ॥২১৯৷৷১৩৷৷

মূলানুবাদ:-[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, আকাশই যাহার আয়তন(শরীর), শ্রবণেন্দ্রিয় যাহার লোক(চক্ষুঃ), এবং মনঃ যাহার জ্যোতিঃ, সমস্ত আত্মার পরমাশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে যিনি জানেন, তিনিই যথার্থ বিদ্বান্-পদবাচ্য হন।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হে শাকল্য, তুমি যে পুরুষের কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছ; সমস্ত আত্মার পরমাশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে আমি জানি। যিনি এই শ্রোত্রাধিষ্ঠিত প্রাতিশ্রুৎক অর্থাৎ প্রত্যেক শব্দশ্রুতিতে সমধিক প্রকটিত হন, তিনিই সেই পুরুষ। তুমি তাহার সম্বন্ধে আরও কিছু জিজ্ঞাসা কর। [শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] তাহার দেবতা কে? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, দিক্সমূহ অর্থাৎ অধিদৈবত দিক্সমূহ হইতে সেই অধ্যাত্ম পুরুষের আবির্ভাব হয় ৷ ২১৯ ॥ ১৩ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—আকাশ এব যস্যায়তনম্। য এবায়ং শ্রোত্রে ভবঃ শ্রৌত্রঃ, তথাপি প্রতিশ্রবণবেলায়াৎ বিশেষতো ভবতীতি প্রাতিশ্রুৎকঃ, তস্য কা দেবতেতি; দিশ ইতি হোবাচ; দিগ্ভ্যো হি অসাবাধ্যাত্মিকো নিষ্পদ্যতে ॥২১৯৷৷১৩৷৷

টীকা। তত্রাপীতি শ্রৌত্রোক্তিঃ। প্রতিশ্রবণং সংবাদঃ প্রতিবিষয়ং শ্রবণং বা, সর্ব্বাণি শ্রবণানি বা তদ্দশায়ামিতি যাবৎ। দিশস্তত্রাধিদৈবতমিতি শ্রুতিমাশ্রিত্যাহ-দিগভ্যো হীতি ॥২১৯।১৩॥

ভাষ্যানুবাদ।—“আকাশ এব যস্যায়তনম্” ইত্যাদি। যিনি (পুরুষ) এই শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রকটিত—শ্রৌত্র পুরুষ; এবং প্রত্যেক শ্রবণসময়ে বিশেষরূপে ব্যক্ত হন বলিয়া প্রাতিশ্রুংক, তাহার দেবতা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য] বলিলেন—দিক্সমূহ; কারণ, এই আধ্যাত্মিক পুরুষ দিক্সমূহ হইতেই নিষ্পন্ন হইয়া থাকে ॥২১৯৷৷১৩৷৷

তম এব যস্যায়তনহৃদয়ং লোকো মনোজ্যোতির্যো বৈ তং পুরুষং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং স বৈ বেদিতা স্যাদ্ যাজ্ঞবল্ক্য, বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং,

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৯২৩

যমাথ, য এবায়ং ছায়াময়ঃ পুরুষঃ স এষঃ, বদৈব শাকল্য, তস্য কা দেবতেতি, মৃত্যুরিতি হোবাচ ॥ ২২০ ॥ ১৪ ॥

সরলার্থঃ।—তমঃ(অন্ধকারঃ) এব যস্য আয়তনং(আশ্রয়ঃ শরীরম্), হৃদয়ৎ(অন্তঃকরণম্) লোকঃ(চক্ষুঃ), মনঃ জ্যোতিঃ(প্রকাশঃ), হে যাজ্ঞবল্ক্য, যঃ বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণং তং পুরুষং বিদ্যাৎ, সঃ বৈ বেদিতা স্যাৎ,[নতু অন্যঃ]।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হে শাকল্য, অহং বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণং তং পুরুষং বেদ(বেদ্মি),[ত্বং] যং(পুরুষং) আখ(কথয়সি)।[কোহসৌ?] যঃ এব অয়ং ছায়াময়ঃ(অধ্যাত্মং ছায়াত্মকঃ) পুরুষঃ, সঃ(ছায়াময়ঃ পুরুষঃ) এষঃ(ত্বয়া যঃ পৃষ্টঃ)। হে শাকল্য, বদ এব(তদ্‌গতং বিশেষম্ এব পৃচ্ছ ইত্যর্থঃ)।[শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ—] তস্য(ছায়াময়স্য পুরুষস্য) কা দেবতা? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্যঃ] উবাচ হ—মৃত্যুঃ ইতি ॥২২০৷৷১৪৷৷

মূলানুবাদ:-[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, তমঃ-অন্ধকারই যাহার আয়তন-আশ্রয়ভূত শরীর, হৃদয় যাহার লোক, এবং মন যাহার জ্যোতিঃ(প্রকাশক), সমস্ত দেহের পরমাশ্রয়- ভূত সেই পুরুষকে যিনি জানেন, তিনিই যথার্থ জ্ঞানি-পদবাচ্য হইতে পারেন;[তুমি কি তাহাকে জান?][যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] তুমি যাহার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছ, সমস্ত আত্মার পরমাশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে আমি জানি; এই যে, দেহমধ্যে ছায়াময় পুরুষ, তাহাই সেই পুরুষ। হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি তাহার সম্বন্ধে আরও যাহা হয়, জিজ্ঞাসা কর।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] সেই পুরুষের দেবতা কে? অর্থাৎ সেই আধ্যাত্ম ছায়াময় পুরুষের অধিদৈবত রূপটি কি? [যাজ্ঞবল্ক্য] বলিলেন, তাহা মৃত্যু;[কারণ, মৃত্যুই পুরুষরূপে দেহ মধ্যে প্রকটিত হয়] ॥ ২২০ ॥ ১৪ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তম এব যস্যায়তনম্; তম ইতি শার্বরাদ্যন্ধকারঃ পরিগৃহ্যতে, আধ্যাত্মং ছায়াময়ঃ অজ্ঞানময়ঃ পুরুষঃ; তস্য কা দেবতেতি, মৃত্যুরিতি হোবাচ। মৃত্যুরধিদৈবতং, তস্য নিষ্পত্তিকারণং ॥২২০৷১৪৷৷

টীকা। অধিদৈবতং মৃত্যুরীশ্বরো মৃত্যুনৈবেদমাবৃতমাসীদিতি শ্রুতেঃ। স চ তস্যাজ্ঞান- ময়স্যাধ্যাত্মিকস্য পুরুষস্যোৎপত্তিকারণমবিবেকিপ্রবৃত্তেরীশ্বরাধীনত্বাৎ “ঈশ্বরপ্রেরিতো গচ্ছেৎ স্বর্গং বা স্বভ্রমেব বা“ইতি হি পঠন্তি, তদাহ—মৃত্যুরিতি ॥২২০।১৪॥

৯২৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রূপাণ্যেব যস্যায়তনং চক্ষুর্লোকো মনোজ্যোতির্যো বৈ তং পুরুষং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণস্ স বৈ বেদিতা স্যাদ্ যাজ্ঞ- বল্ক্য, বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং যমাথ, য এবায়মাদর্শে পুরুষঃ, স এষঃ, বদৈব শাকল্য, তস্য কা দেবতেত্য- সুরিতি হোবাচ ॥ ২২১ ॥ ১৫ ॥

সরলার্থঃ।—[শাকল্যঃ পুনঃ পপ্রচ্ছ] হে যাজ্ঞবল্ক্য, রূপাণি(প্রকাশ- ময়ানি) এব যস্য আয়তনং(অধিষ্ঠানং), চক্ষুঃ লোকঃ, মনঃ জ্যোতিঃ, যঃ বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণৎ তৎ পুরুষং বিদ্যাৎ, সঃ বেদিতা স্যাৎ।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ,] হে শাকল্য, ত্বং যং(পুরুষং) আথ(ব্রবীষি), অহং বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণৎ তং পুরুষং বেদ(জানামি)।[কোহসৌ?] যঃ এব অয়ম্ আদর্শে(দর্পণে) পুরুষঃ(প্রতিবিম্ব-পুরুষঃ দৃশ্যতে), সঃ এষঃ(ত্বৎপৃষ্ঠঃ)। বদ এব(ভূয়ো- হপি পৃচ্ছ ইত্যর্থঃ)।[শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ—] তস্য(পুরুষস্য) কা দেবতা? ইতি;[যাজ্ঞবল্ক্য:] উবাচ হ—অনুঃ(প্রাণঃ) ইতি,[প্রাণোপেতশরীরাৎ তন্নিষ্পত্তেরিতি ভাবঃ] ॥২২১৷৷১৫৷৷

মূলানুবাদ:-[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, বিশেষ বিশেষ রূপসমূহ যাহার আয়তন, চক্ষু যাহার লোক, মন যাহার জ্যোতিঃ, সকল আত্মার চরম আশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে যিনি জানেন, তিনিই যথার্থ বিদ্বান্ হইতে পারেন।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হে শাকল্য, তুমি যাহার কথা বলিতেছ, সর্ব্বভূতের একমাত্র আশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে আমি জানি; এই যে দর্পণে প্রতিবিম্বিত ছায়াময় পুরুষ, ইহাই তোমার জিজ্ঞাসিত সেই পুরুষ।[তোমার যদি এবিষয়ে আরও কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে, তাহা] জিজ্ঞাসা কর।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] সেই পুরুষের দেবতা কে? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-অসু, অর্থাৎ বলসাধ্য দর্পণাদি-ঘর্ষণ কার্য্য এই প্রাণের দ্বারা নিষ্পন্ন হয়, এবং ঘর্ষণে প্রতি- বিম্বাধার দর্পণাদি নির্মূল করা হয়; তাই তাহাতে প্রতিবিম্বপাত হয়; এই কারণে প্রাণকেই উহার দেবতা বলা হইয়াছে ॥ ২২১ ॥ ১৫ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—রূপাণ্যের যস্যায়তনম্। পূর্ব্বং সাধারণানি রূপাণ্যু- ক্তানি, ইহ তু প্রকাশকানি বিশিষ্টানি রূপানি গৃহ্যন্তে। রূপায়তনস্য দেবস্য

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

৯৩৫

বিশেষায়তনং প্রতিবিম্বাধারমাদর্শাদি। তস্য কা দেবতেতি, অসুরিতি হোবাচ, তস্য প্রতিবিম্বাখ্যস্য পুরুষস্য নিষ্পত্তিঃ অসোঃ প্রাণাৎ ॥২২১৷১৫৷৷

টীকা। পুনরুক্তিং প্রত্যাহ—পূর্ব্বমিতি। আধারশব্দো ভাবপ্রধানস্তথা চ প্রতিবিম্বস্থা- ধারত্বং যত্র তদিত্যুক্তং ভবতি। আদিশব্দেন স্বচ্ছস্বভাবং খড়গাদি গৃহ্যতে। প্রাণেন হি নিঘৃষ্যমাণে দর্পণাদৌ প্রতিবিম্বাভিব্যক্তিযোগ্যে রূপবিশেষো নিষ্পদ্যতে। ততো যুক্তং প্রাণস্য প্রতিবিম্বকারণত্বমিত্যভিপ্রেত্যাহ—তস্যেতি ॥ ২২১৷১৫৷

ভাষ্যানুবাদ।—‘রূপাণি এব যস্যায়তনম্’ ইত্যাদি। অতীত দ্বাদশ শ্রুতিতে যে রূপের কথা বলা হইয়াছে, তাহা সাধারণ শ্বেত-পীতাদি রূপ, আর এখানে যে রূপের কথা বলা হইতেছে, ইহা তদপেক্ষা বিশেষ রূপ গ্রহণ করিতে হইবে;(নচেৎ পুনরুক্তি দোষ ঘটে)। রূপায়তন দেবতারও বিশেষ আশ্রয় হইতেছে প্রতিবিম্বাধার দর্পণ ও খড়্গ প্রভৃতি; তাহার দেবতা কে? এই প্রশ্নের উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,[তাহার দেবতা] অনু(প্রাণ); কেননা, প্রাণের সাহায্যেই সেই প্রতিবিম্ব-পুরুষের অভিব্যক্তি হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, বলরূপী প্রাণের সাহায্যে ঘর্ষণদ্বারা প্রতিবিম্বাধার নির্ম্মলীকৃত হইলেই তাহাতে প্রতিবিম্ব পতিত হইয়া থাকে ॥২২১৷৷১৫৷৷

আপ এব যস্যায়তনং হৃদয়ং লোকো মনোজ্যোতির্যো বৈ তং পুরুষং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং স বৈ বেদিতা স্যাদ্ যাজ্ঞবল্ক্য, বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং যমাখ, য এবায়মপ্সু পুরুষঃ স এষঃ। বদৈব শাকল্য, তস্য কা দেবতেতি, বরুণ ইতি হোবাচ ॥ ২২২ ॥ ১৬ ॥

সরলার্থঃ?—হে যাজ্ঞবল্ক্য, যঃ বৈ আপ এব যস্য আয়তনং, হৃদয়ং লোকঃ, মনঃ জ্যোতিঃ, সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণং তং পুরুষং বিদ্যাৎ, সঃ বৈ বেদিতা স্যাৎ। [যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হে শাকল্য, ত্বং যং আথ(কথয়সি), সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণং তং পুরুষং বেদ(বেদ্মি)[অহম্]।[কোহসৌ?] যঃ এব অয়ং অপ্সু পুরুষঃ, সঃ এষঃ(ত্বৎপৃষ্টঃ পুরুষঃ)।[ইচ্ছসি চেৎ, ভূয়োহপি] বদ(পৃচ্ছ) এব ইতি। [শাকল্যঃ পপ্রচ্ছ—] তস্য(অপ্সুরুষস্য) কা দেবতা? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য:] উবাচ—বরুণ ইতি,[বরুণঃ হি অপাং দেবতা প্রসিদ্ধা ইতি ভাবঃ] ২২২৷৷১৬৷৷

মুলাদুবাদ।—জলই যাহার শরীর, হৃদয় যাহার লোক (চক্ষু), এবং মন যাহার জ্যোতিঃ, হে যাজ্ঞবল্ক্য, সমস্ত আত্মার

৯২৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

পরমাশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে যিনি জানেন, তিনিই যথার্থ বিদ্বান্ হইতে পারেন।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হে শাকল্য, সমস্ত আত্মার পরমাশ্রয়- ভূত সেই পুরুষকে আমি জানি, তুমি যাহার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছ। এই যে জলাধিষ্ঠিত পুরুষ, তিনিই তোমার জিজ্ঞাসিত সেই পুরুষ; যদি তোমার ইচ্ছা হয়, তবে এ সম্বন্ধে আরও জিজ্ঞাসা কর।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] সেই পুরুষের দেবতা কে? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, বরুণ[তাহার দেবতা;[কারণ, বরুণই জল-দেবতা বলিয়া জগতে প্রসিদ্ধ] ॥ ২২২ ॥ ১৬॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—আপ এব যস্যায়তনম্। সাধারণাঃ সর্ব্বা আপ আয়তনম্ বাপীকূপতড়াগাদ্যাশ্রয়াস্বপ্সু বিশেষাবস্থানম্। তস্য কা দেবতেতি? বরুণ ইতি; বরুণাৎ সঙ্ঘাতকর্ত্র্যোহধ্যাত্মমাপ এব বাপ্যাদ্যপাৎ নিষ্পত্তি- কারণম্ ॥২২২৷৷১৬৷৷

টীকা। আপ’এব যস্যায়তনং, য এবায়মপু পুরুষ ইত্যুভয়ত্র সামান্যবিশেষভাবো ন প্রতিভাতীতি শক্যমানং প্রত্যাহ-সাধারণা ইতি। কথং পুনর্ব্বাপীকূপাদিবিশেষায়তনস্য বরুণো দেবতা? ন হি দেবতাত্মনো বরুণস্থ্য তদধিষ্ঠাতুস্তৎকারণত্বং, তত্রাহ-বরুণাদিতি। আপো বাপীকুপাদ্যাঃ পীতাঃ সত্যোহধ্যাত্মং শরীরে মূত্রাদিসঙ্ঘাতং কুর্ব্বস্তি। তাশ্চ বরুণা- স্তবন্তি। বরুণশব্দেনাপ এব রশ্মিদ্বারা ভূমিং পতন্ত্যোহভিধীয়স্তে। তথা চ তা এব বরুণাত্মিকা বাপ্যাদ্যপাং পীয়মানানামুৎপত্তিকারণমিতি যুক্তং বরুণস্থ্য বাপীতড়াগাদ্যায়তনং পুরুষং প্রতি কারণত্বমিত্যর্থঃ ॥২২২॥১৬৪

ভাষ্যানুবাদ।—‘আপ এব যস্য আয়তনম্’ ইত্যাদি। এখানে সাধারণতঃ জলমাত্রই আয়তন; বাপী, কূপ ও তড়াগাদিগত জল তাহারই অবস্থা- বিশেষ মাত্র। সেই জলের দেবতা কে?[উত্তর—] বরুণ। দেহপিণ্ড-নির্মাণ- কারক আধ্যাত্মিক জলই বরুণের প্রেরণায় বাপী-কুপাদিগত জলোৎপত্তির কারণ; অর্থাৎ যে জলদ্বারা দেহপিণ্ড রচিত হয়, বরুণদেব সেই জলকেই বাপী-কুপাদিতে বিভিন্নাবস্থায় পরিণত করেন;[অতএব বরুণই জলের দেবতা] ॥২২২৷৷১৬৷৷

রেত এব যস্যায়তনহৃদয়ং লোকো মনো জ্যোতির্যো বৈ তং পুরুষং বিদ্যাৎ সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং স বৈ বেদিতা স্যাদ্ যাজ্ঞ- বল্ধ্য, বেদ বা অহং তং পুরুষং সর্ব্বস্যাত্মনঃ পরায়ণং যমাথ। য

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৫২৭

এবায়ং পুত্রময়ঃ পুরুষঃ স এষঃ। বদৈব শাকল্য, তস্য কা দেব- তেতি; প্রজাপতিরিতি হোবাচ ॥ ২২৩ ॥ ১৭ ॥

সরলার্থঃ।-হে যাজ্ঞবল্ক্য, রেতঃ(শুক্রং) এব যস্য আয়তনম্, হৃদয়ৎ লোকঃ, মনঃ জ্যোতিঃ; যঃ বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণং তং পুরুষং বিদ্যাৎ, সঃ বৈ বেদিতা স্যাৎ।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] হে শাকল্য, ত্বং যম্ আথ, অহং, বৈ সর্ব্বস্য আত্মনঃ পরায়ণং তৎ পুরুষং বেদ;-যঃ এব অয়ং পুত্রময়ঃ(পুত্ররূপঃ) পুরুষঃ, এষঃ সঃ(ত্বৎপৃষ্টঃ পুরুষঃ)।[হে শাকল্য, ইচ্ছসি চেৎ, ভূয়োহপি] বদ এব।[শাকল্য আহ-] তস্য(পুত্রময়পুরুষস্য) কা দেবতা? ইতি। যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ হ-প্রজাপতিঃ(পিতা) ইতি,[পিতুরেব পুত্রোৎপত্তিহেতুত্বাদিতি ভাবঃ] ॥২২৩৷৷১৭৷৷

মূলাসুবাদ:-রেতঃ অর্থাৎ শুক্রই যাহার আয়তন, হৃদয় যাহার লোক, এবং মন যাহার জ্যোতিঃ; হে যাজ্ঞবল্ক্য, যে ব্যক্তি দেহেন্দ্রিয়-সমষ্টির আশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে জানেন, তিনিই যথার্থ জ্ঞানী হইতে পারেন।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হে শাকল্য, তুমি যাহার কথা বলিলে, সকল আত্মার আশ্রয়ভূত সেই পুরুষকে আমি জানি;- যাহা এই পুত্রময়(পুত্ররূপী) পুরুষ, তাহাই সেই পুরুষ।[হে শাকল্য, আরও যদি জিজ্ঞাস্য থাকে, তাহা] অবশ্য জিজ্ঞাসা কর।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] সেই পুরুষের দেবতা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য] বলিলেন, প্রজাপতি[তাহার দেবতা]। এখানে প্রজাপতি অর্থ- জনক পিতা ॥ ২২৩॥ ১০ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্?—রেত এব যস্যায়তনম্; য এবায়ং পুত্রময়ঃ, বিশেষা- য়তনং বেত আয়তনস্য—পুত্রময় ইতি চাস্থিমজ্জাশুক্রাণি পিতুর্জ্জাতানি। তস্য কা দেবতেতি? প্রজাপতিরিতি হোবাচ; প্রজাপতিঃ পিতোচ্যতে; পিতৃতো হি পুত্রস্যোৎপত্তিঃ ॥২২৩৷১৭৷৷

টাকা। বাক্যদ্বয়ং গৃহীত্বা তাৎপয্যমাহ—বিশেষেতি। পুত্রময়শব্দার্থং ব্যাচষ্টে-পুত্রময় ইতি ॥২২৩৷১৭॥

ভাষ্যানুবাদ।—‘রেত এব যস্যায়তনম্’ ইত্যাদি। এই যে, শুক্রময় শরীরের বিশেষ আশ্রয়স্বরূপ পুত্র। এখানে ‘পুত্রময়’ অর্থ—পিতা হইতে উৎ- পন্ন অস্থি, মজ্জা ও শুক্র ধাতু; তাহার দেবতা কে? এই প্রশ্নের উত্তরে যাজ্ঞ-

৯২৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বল্ক্য বলিলেন, তাহার দেবতা প্রজাপতি। পিতা হইতে পুত্রের উৎপত্তি হয় বলিয়া পিতাকে প্রজাপতি বলা হইয়াছে ॥ ২২৩৷১৭ ॥

শাকল্যেতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যস্থং স্বিদিমে ব্রাহ্মণা অঙ্গারা- বক্ষয়ণমক্রতা ৩ ইতি ॥ ২২৪ ॥ ১৮ ॥

সৰ্বলার্থঃ।—[অতঃপরং লব্ধোত্তরতয়া তুষ্ণীভূতং শাকল্যৎ সম্বোধয়ন্] [যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ—] হে শাকল্য, ইমে(সভাসদঃ) ব্রাহ্মণাঃ স্বিৎ(বিতর্কে) ত্বাৎ অঙ্গারাবক্ষয়ণং(অঙ্গারা যেন সন্দংশাদিনা অবক্ষীয়ন্তে দহ্যন্তে, তৎ অঙ্গারাবক্ষয়ণম্) অক্রতা(কৃতবন্তঃ),[এতদ্ অববুধ্যসে কিং? ইতি ভাবঃ] ॥২২৪৷৷১৮

মূলানুবাদ:-[যাজ্ঞবল্ক্যের উত্তর শুনিয়া শাকল্য নির্বাক্ হইলে পর,] যাজ্ঞবল্ক্য সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন-হে শাকল্য, এই সভাস্থ ব্রাহ্মণগণ যে, তোমাকে অঙ্গারদাহক সাঁড়াশীর ন্যায়[আমার তেজে] দগ্ধ করিতেছে, তাহা তুমি বুঝিতে পারিতেছ কি? ॥২২৪৷১৮৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্?—অষ্টধা দেবলোক-পুরুষভেদেন ত্রিধা ত্রিধাত্মানং প্রবিভজ্যাবস্থিত একৈকো দেবঃ প্রাণভেদ এবোপাসনার্থং ব্যপদিষ্টঃ; অধুনা দিগ্বিভাগেন পঞ্চধা প্রবিভক্তস্যাত্মনি উপসংহারার্থমাহ। তুষ্ণীভূতং শাকল্যং যাজ্ঞবল্ক্যঃ গ্রহেণেবাবেশয়ন্নাহ—শাকল্যেতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ; ত্বাৎ, স্বিদিতি বিতর্কে, ইমে নূনং ব্রাহ্মণা অঙ্গারাবক্ষয়ণং—অঙ্গারা অবক্ষীয়ন্তে যস্মিন্ সন্দংসাদৌ, তদঙ্গারাবক্ষয়ণং, তৎ নূনং ত্বামক্রুত কৃতবন্তঃ ব্রাহ্মণাঃ, ত্বন্তু তন্ন বুধ্যসে—আত্মানং ময়া দহ্যমানমিত্যভিপ্রায়ঃ ॥২২৪৷৷১৮৷৷

টীকা। শাকল্যেতি হোবাচেত্যাদিগ্রন্থস্য তাৎপয্যং বক্তুং বৃত্তং কীর্তয়তি—অষ্টধেতি। লোকঃ সামান্যাকারঃ, পুরুষো বিশেষ্যাবচ্ছেদঃ, দেবস্তৎকারণম্, অনেন প্রকারেণ ত্রিধা ত্রিধাত্মানং প্রবিভজ্য স্থিতো য একৈকো দেব উক্তঃ, স প্রাণ এব সূত্রাত্মা, তদ্ভেদত্বাৎ পূর্ব্বোক্তস্য সর্ব্বস্য, স চোপাসনার্থমষ্টধোপদিষ্টোহধস্তাদিত্যর্থঃ। উত্তরস্য তাৎপর্য্যং দর্শয়তি—অধুনেতি। প্রবিভক্তস্য জগতঃ সর্ব্বস্যেতি শেষঃ। আত্মশব্দো হৃদয়বিষয়ঃ। যাজ্ঞবল্ক্যবাক্যস্য শাকল্যে প্রষ্টর্য্যবুদ্ধিপূর্ব্বকারিত্বাপাদকত্বং দর্শয়তি—গ্রহেণেতি॥ ২২৪॥ ১৮॥

ভাষ্যানুবাদ।—এক একটি দেবতাই আপনাকে দেবতা, লোক ও পুরুষ, এই তিন তিনভাগে বিভক্ত করিয়া উপাসনার সুবিধার জন্য আট রকমে প্রকটিত হইয়াছেন। প্রাণভেদ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াদি করণসমূহই সেই দেবতা; কেবল উপাসনার জন্য ঐরূপ বিভাগের উপদেশ করা হইয়াছে মাত্র; প্রকৃত পক্ষে

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯২৯

উহাদের এক একটি প্রাণবিশেষ ভিন্ন আর কিছুই নহে।(১) এখন আবার বিভিন্ন দিক্ অনুসারে পাঁচভাগে বিভক্ত করিয়া আত্মাতেই তাহার উপসংহার বা পুনঃ প্রতিলয়ের জন্য বাক্যের অবতারণা করিতেছেন।

[যাজ্ঞবল্ক্যের প্রদত্ত উত্তর শ্রবণ করিয়া] শাকল্য নির্ব্বাক্ হইলে পর, যাজ্ঞ- বন্ধ্য শাকল্যকে গ্রহাবিষ্ট লোকের ন্যায় বিবশ করত বলিলেন, হে শাকল্য, এই সভাসদ্ ব্রাহ্মণগণ যে, তোমাকে নিশ্চয়ই অঙ্গারাবক্ষয়ণের ন্যায় অর্থাৎ লোকে অঙ্গার পোড়াইবার সময় যেমন সাঁড়াশীকে অগ্নিতে ক্ষয় করিয়া থাকে, তেমনি তোমাকেও যে ক্ষয় করিতেছেন, তাহা তুমি বুঝিতেছ না। অভিপ্রায় এই যে, তুমি যে, আমার তেজে নিয়ত দগ্ধ হইতেছ, তাহা তুমি বুঝিতেছ না(২) ॥২২৪৷১৮৷৷

যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ শাকল্যো যদিদং কুরুপাঞ্চালানাং ব্রাহ্মণানত্যবাদীঃ কিং ব্রহ্ম বিদ্বানিতি, দিশো বেদ সদেবাঃ স- প্রতিষ্ঠা ইতি, যদ্দিশো বেথ সদেবাঃ সপ্রতিষ্ঠাঃ ॥ ২২৫ ॥ ১৯ ॥

সরলার্থঃ।—[এবমধিক্ষিপ্তঃ] শাকল্যঃ যাজ্ঞবল্ক্যেতি সম্বোধয়ন্ উবাচ হ— কুরুপাঞ্চালানাং ব্রাহ্মণান্(কুরুপঞ্চালদেশীয়ান্ ব্রাহ্মণান্) যৎ ইদম্ অত্যবাদীঃ (‘ইমে ব্রাহ্মণাঃ স্বয়ং ভীতিমাপন্নাঃ সন্তঃ ত্বাৎ অঙ্গারাবক্ষয়ণম্ অকরুত’ ইত্যেবম্ অধিক্ষিপ্তবান্ অসি;[হে যাজ্ঞবল্ক্য, পৃচ্ছামি ত্বাং—] ত্বং কিং(কিং-স্বরূপং) ব্রহ্ম বিদ্বান্(জানন্)[এবমধিক্ষিপ্তবান্ অসি?] ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ, অহং] সদেবাঃ সপ্রতিষ্ঠাঃ দিশঃ বেদ[বেদ্মি], ন কেবলং দিশ এব বেদ্মি, অপি তু তাসাৎ দেবতাঃ প্রতিষ্ঠাঃ—আশ্রয়াংশ বেদ্মীত্যর্থঃ) ইতি।[শাকল্য আহ—] যৎ(যদি) সদেবাঃ সপ্রতিষ্ঠাঃ দিশঃ বেথ(জানাসি)[ত্বম্];[তর্হি কথয়—] ॥২২৫৷৷১৯৷৷

(১) তাৎপর্য্য—ইতঃপূর্ব্বে একই প্রাণনামক সূত্রাত্মাকে(যিনি মালার সূত্রের ন্যায় সর্ব্বত্র অনুস্যুত রহিয়াছেন, তাহাকে) লোক, পুরুষ ও দেবতা—এই তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া উপাসনার নিমিত্ত তাঁহাকেই আবার আট প্রকারে বিভক্ত করা হইয়াছে। তন্মধ্যে ‘লোক’ অর্থ সাধারণ বস্তু মাত্র; ‘পুরুষ’ অর্থ—বিশেষ বিশেষ দেহাশ্রিত চেতন; আর ‘দেবতা’ অর্থ—উহাদের কারণ। উক্ত ত্রিবিধ ভেদবিশিষ্ট ঐ আটপ্রকার উপাস্যই প্রাণরূপে এক অভিন্ন। এখন আবার পূর্ব্বাদি দিক্‌বিভাগানুসারে পাঁচভাগে বিভক্ত সমস্ত জগৎকেও একরূপ বুদ্ধিতে সংকলন করিবার জন্য প্রকারান্তরে নির্দেশ করিবার অভিপ্রায়ে যাজ্ঞবল্ক্য নিজেই শাকল্যকে সম্বোধন করিয়া বলিবার উপক্রম করিতেছেন।

(২) তাৎপর্য্য—শ্রুতির ‘অঙ্গারাবক্ষয়ণ’ কথার অভিপ্রায় এই যে, লোকে যেরূপ অগ্নিতে অঙ্গার পোড়াইবার আবশ্যক হইলে, অগ্নিতে হাত পুড়িবার ভয়ে সাড়াশী দ্বারা অঙ্গারটী

C

৯৩০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মূলানুবাদ।—শাকল্য ঐরূপে তিরস্কৃত হইয়া যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি যে, কুরু-পঞ্চালদেশীয় ব্রাহ্মণগণকে এইরূপে নিন্দা করিতেছ;[জিজ্ঞাসা করি, তুমি নিজে] কিরূপ ব্রহ্মতত্ত্ব অবগত হইয়াছ? যাজ্ঞবল্ক্য তদুত্তরে বলিলেন—আমি দিক্সমূহকে জানি; শুধু তাহা নহে; দিক্সমূহের যে যে দেবতা, এবং যাহা আশ্রয়, সে সমস্তই আমি জানি।[শাকল্য বলিলেন—] তুমি যদি দিক্সমূহ এবং তাহাদের দেবতা ও আশ্রয়সমূহ জান,[তাহা হইলে বল ত]॥ ২২৫॥ ১৯॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—যাজ্ঞবল্ক্যেতি হোবাচ শাকল্যঃ—যদিদং কুরুপাঞ্চা- লানাং ব্রহ্মাণ্ অত্যবাদীঃ অত্যুক্তবানসি—স্বয়ং ভীতাস্ত্বামঙ্গারাবক্ষয়ণং কৃতবন্ত ইতি। কিং ব্রহ্ম বিদ্বান্ সন্ এবমধিক্ষিপসি ব্রাহ্মণান্? যাজ্ঞবল্ক্য আহ— ব্রহ্মবিজ্ঞানং তাবদিদং মম; কিং তৎ? দিশঃ বেদ(দিগ্বিষয়ৎ বিজ্ঞানং জানে); তচ্চ ন কেবলং দিশ এব, সদেবাঃ দেবৈঃ সহ দিগধিষ্ঠাতৃভিঃ; কিঞ্চ, সপ্রতিষ্ঠাঃ প্রতিষ্ঠাভিশ্চ সহ। ইতর আহ—যদ্ যদি দিশো বেথ— সদেবাঃ সপ্রতিষ্ঠা ইতি; সফলং যদি বিজ্ঞানং ত্বয়া প্রতিজ্ঞাতম্ ॥২২৫৷৷১৯৷৷

টীকা। সর্ব্বেষামেব ব্রাহ্মণানাং প্রায়েণ হন্তব্যত্বেন সংমতো ভবানিতি মুনেরভিসংহিতম্। শাকল্যস্ত কালচোদিতত্বাত্তদনুরোধিনীমন্যথা প্রতিপত্তিমেবাদায় চোদয়তীত্যাহ—যদিদমিতি। দিগ্নিধয়ং বিজ্ঞানং জানে তন্মমাস্তীত্যর্থঃ। তচ্চ বিজ্ঞানং কেবলং দিঘাত্রস্য ন ভবতি, কিন্তু দেবৈঃ প্রতিষ্ঠাভিশ্চ সহিতা দিশো বেদেত্যাহ—তচ্চেতি। অবতারিতস্য বাক্যস্থার্থং সংক্ষিপতি—সফলমিতি ॥২২৫॥১৯৷

ভাষ্যানুবাদ।-যাজ্ঞবল্ক্যকে সম্বোধন করিয়া শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি যে, কুরু-পঞ্চালদেশীয় এই সমস্ত ব্রাহ্মণকে লক্ষ্য করিয়া অত্যুক্তি করিয়াছ, অর্থাৎ ইঁহারা নিজে ভীত হইয়া আমাকে অঙ্গারাব- ক্ষয়ণের ন্যায় দগ্ধ করিতেছে বলিয়াছ;[জিজ্ঞাসা করি,] তুমি কোন্ ব্রহ্মতত্ত্ব অধিগত হইয়া এই ব্রাহ্মণগণকে এইরূপে অবজ্ঞা করিতেছ? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন- আমার এই পর্য্যন্তই ব্রহ্মবিজ্ঞান। তাহা কি? আমি দিক্সমূহ জানি, অর্থাৎ

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

১৩১

দিক্সম্বন্ধে আমার বিশেষ জ্ঞান আছে। কেবল যে, শুধু দিক্সমুহই আমি জানি, তাহা নহে; পরন্তু দিগদেবতাসমূহকেও আমি জানি, এবং দিক্সমূহের প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়ও আমি জানি। শাকল্য বলিলেন—ভাল, তুমি যদি দেবতা ও প্রতিষ্ঠা সহকারে দিক্সমূহ অবগত থাক, অর্থাৎ তুমি যদি তোমার বিজ্ঞানকে সফল বলিয়াই নিশ্চয় জান,[তাহা হইলে বল দেখি—] ॥২২৫৷১৯৷

কিংদেবতোহস্যাং প্রাচ্যাং দিশ্যসীত্যাদিত্যদেবত ইতি, স আদিত্যঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি, চক্ষুষীতি, কস্মিন্নু চক্ষুঃ প্রতিষ্ঠিতমিতি, রূপেন্বিতি, চক্ষুষা হি রূপানি পশ্যতি, কস্মিন্নু রূপানি প্রতিষ্ঠিতানীতি, হৃদয়ে ইতি হোবাচ, হৃদয়েন হি রূপানি জানাতি, হৃদয়ে হ্যেব রূপানি প্রতিষ্ঠিতানি ভবন্তীত্যেবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥ ২২৬ ॥ ২০ ॥

সরলার্থঃ।-অস্যাং প্রাচ্যাং দিশি কিংদেবতঃ(কা দেবতা অন্য- আত্মানমেব দিগরূপতয়া ভাবয়তস্তব-ইতি কিংদেবতঃ) অসি(ভবসি)[ত্বং]? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] আদিত্যদেবত ইতি।[শাকল্য আহ-] সঃ আদিত্যঃ কস্মিন্(বস্তুনি) প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি[প্রতিষ্ঠা-বিজ্ঞানবিষয়কঃ প্রশ্নঃ]। (যাজ্ঞবল্ক্য আহ-) চক্ষুষি ইতি। চক্ষুঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতম্? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] রূপেষু ইতি; হি(যস্মাৎ) চক্ষুষা রূপৎ পশ্যতি,(যস্মাৎ, রূপমেব চক্ষুষঃ, অবলম্বনং, তস্মাৎ তদেব প্রতিষ্ঠা চক্ষুষ ইতি ভাবঃ) ইতি।[শাকল্য আহ-] রূপাণি কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতানি? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ হ] হৃদয়ে ইতি; হি(যস্মাৎ) হৃদয়ে(অন্তঃকরণে) এব রূপাণি জানাতি(অনুভবতি); হি(তস্মাৎ) হৃদয়ে এব(নিশ্চয়ে) রূপাণি প্রতিষ্ঠিতানি ভবন্তি ইতি। [শাকল্য আহ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতৎ এবম্ এব(ত্বয়া যদুক্তং, তৎ তথৈবেত্যর্থঃ) ॥২২৬৷৷২০৷৷

মূলানুবাদ।—[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি আপনার হৃদয়কে দিকরূপে বিভক্ত করিয়া নিজেই দিকস্বরূপ হইয়াছ,[অতএব বল দেখি,] এই পূর্বদিগ্বভাগে তোমার অধিদেবতা কে?(যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—) আদিত্য।(শাকল্য পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন—) সেই আদিত্য কোথায় অবস্থিত আছেন?(যাজ্ঞবল্ক্য

৯৩২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বলিলেন-) চক্ষুতে।(শাকল্য আবার জিজ্ঞাসা করিলেন-) চক্ষু কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] চক্ষুঃ রূপসমূহে প্রতিষ্ঠিত; কেননা, লোকে চক্ষু-দ্বারাই শ্বেত-পীতাদি রূপসমূহ দর্শন করিয়া থাকে। সেই রূপসমূহ আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?(যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-) হৃদয়ে; কারণ, লোকে হৃদয়ের সাহায্যেই রূপ উপলব্ধি করিয়া থাকে; অতএব রূপসমূহ হৃদয়মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত আছে।[এ কথার পর শাকল্য বলিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা ঠিক এইরূপই বটে ॥ ২২৬ ॥ ২০ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কিংদেবতঃ—কা দেবতা অন্য তব দিগ্ভূতস্য। অসৌ হি যাজ্ঞবল্ক্যঃ হৃদয়মাত্মানং দিক্ষু পঞ্চধা বিভক্তং দিগাত্মভূতম্, তদ্বারেণ সর্ব্বং জগৎ আত্মত্বেনোপগম্য, অহমস্মি দিগাত্মেতি ব্যবস্থিতঃ পূর্ব্বাভিমুখঃ—সপ্রতিষ্ঠা- বচনাৎ; যথা যাজ্ঞবল্ক্যস্য প্রতিজ্ঞা, তথৈব পৃচ্ছতি—কিংদেবতত্ত্বমস্যাৎ দিশ্যসীতি। সর্ব্বত্র হি বেদে যাং যাং দেবতামুপাস্তে, ইহৈব তদ্‌ভূতস্তাং তাৎ প্রতিপদ্যত ইতি। তথাচ বক্ষ্যতি—“দেবো ভূত্বা দেবানপ্যেতি” ইতি। অস্যাং প্রাচ্যাং কা দেবতা দিগাত্মনস্তব অধিষ্ঠাত্রী?—কয়া দেবতয়া ত্বং প্রাচীদিরূপেণ সম্পন্নঃ? ইত্যর্থঃ। ইতর আহ—আদিত্যদেবত ইতি; প্রাচ্যাৎ দিশি মম আদিত্যো দেবতা, সোহহমাদিত্যদেবতঃ।

সদেবা ইত্যেতদুক্তম্। সপ্রতিষ্ঠা ইতি তু বক্তব্যমিত্যাহ-স আদিত্যঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি; চক্ষুষীতি; অধ্যাত্মতশ্চক্ষুষ আদিত্যো নিষ্পন্ন ইতি হি মন্ত্রব্রাহ্মণবাদাঃ-“চক্ষোঃ সূর্য্যো অজায়ত” “চক্ষুষঃ সূর্য্যঃ” ইত্যাদয়ঃ; কার্য্যং হি কারণে প্রতিষ্ঠিতৎ ভবতি। কস্মিন্ন চক্ষুঃ প্রতিষ্ঠিতমিতি; রূপেঘিতি; রূপগ্রহণায় হি রূপাত্মকং চক্ষুঃ রূপেণ প্রযুক্তম্; যৈর্হি রূপৈঃ প্রযুক্তম্, তৈরাত্ম- গ্রহণায় আরব্ধং চক্ষুঃ, তস্মাৎ সাদিত্যং চক্ষুঃ সহ প্রাচ্যা দিশা, সহ তৎস্থৈঃ সর্ব্বৈঃ রূপেষু প্রতিষ্ঠিতম্। চক্ষুষা সহ প্রাচী দিক্ সর্ব্বা রূপভূতা; তানি চ কস্মিন্ন রূপাণি প্রতিষ্ঠিতানীতি; হৃদয় ইতি হোবাচ; হৃদয়ারন্ধানি রূপাণি; রূপাকারেণ হি হৃদয়ং পরিণতম্। যস্মাৎ হৃদয়েন হি রূপাণি সর্ব্বো লোকো জানাতি। হৃদয়মিতি বুদ্ধি-মনসী একীকৃত্য নির্দেশঃ। তস্মাৎ হৃদয়ে হ্যেব রূপাণি প্রতিষ্ঠা- তানি; হৃদয়েন হি স্মরণং ভবতি রূপাণাং বাসনাত্মনাম্; তস্মাৎ হৃদয়ে রূপাণি প্রতিষ্ঠিতানীত্যর্থঃ। এবমেবৈতদ্যাজ্ঞবল্ক্য ॥২২৬৷৷২০৷৷

টীকা। আষাঢ়, দিদি কা দেবকী বলিয়া কথমক্ষী, পুষ্কর, কষায়—অগ্নি, হিতৈ।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

೧೩೭

আত্মানমাত্মীয়মিতি যাবৎ। যথোক্তং হৃদয়মাত্মত্বেনোপগম্যেতি সম্বন্ধঃ। তথাপি প্রথমং প্রাচীং দিশমধিকৃত্য প্রশ্নে কো হেতুরিতি চেত্তত্রাহ-পূর্বাভিমুখ ইতি। যদ্যপি দিগাত্মাহহমস্মীতি স্থিতস্তথাপি কথং সর্ব্বং জগদাত্মত্বেনোপগম্য তিষ্ঠতীত্যবগম্যতে, তত্রাহ- সপ্রতিষ্ঠেতি।

সপ্রতিষ্ঠা দিশো বেদেতি বচনাৎ সর্বমপি হৃদয়দ্বারা জগদাত্মত্বেনোপগম্য স্থিতো মুনিরিতি প্রতিভাতীত্যর্থঃ। প্রতিজ্ঞানুসারিত্বাচ্চায়ং প্রশ্নো যুক্তিমানিত্যাহ-যথেতি। অহমস্রি দিগাত্মেতিপ্রতিজ্ঞানুসারিণ্যপি প্রশ্নে দেহপাতোত্তরভাবী দেবতাভাবঃ পৃচ্ছাতে, সতি দেহে ধ্যাতুস্তদ্ভাবাযোগাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-সর্ব্বত্র হীতি। ইতি ন ভাবিদেবতাভাবঃ প্রশ্নগোচর ইতি শেষঃ। উত্তেহর্থে বাক্যশেষমনুকুলয়তি-তথা চেতি। প্রশ্নার্থমুপসংহরতি-অস্যামিতি। আদিত্যস্য চক্ষুধি প্রতিষ্ঠিতত্বং প্রকটহিতুং কার্যকারণভাবং তয়োরাদর্শয়তি-অধ্যাত্মতশ্চক্ষুষ ইতি। ‘চক্ষেঃ সূর্য্যো অজায়ত’ ইত্যাদয়ো মন্ত্রবাদাস্তদনুসাবিণশ্চ ব্রাহ্মণবাদাঃ। ভবতু কাৰ্য্য- কারণভাবস্তথাপি কথং চক্ষস্যাদিত্যস্য প্রতিষ্ঠিতত্ব’, তত্রাহ-কার্য্যং হীতি। কথং চক্ষুষো রূপেষু প্রতিষ্ঠিতত্ব’, তত্রাহ-রূপগ্রহণেতি। তথাপি কথং যথোক্তমাধারাধেয়ত্বমত আহ- যৈহীতি। চক্ষুষো রূপ’ধারত্বে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। উপসর্গতমর্থং সংগৃহ্নাতি-চক্ষুর্যেতি। হৃদয়ারকত্বং রূপাণাং স্ফুটয়তি-রূপাকারেণেতি। হৃদয়ে রূপাণাং প্রতিষ্ঠিতত্বে হেত্বন্তরমাহ- যম্মাদিতি। হৃদয়শব্দস্য মাংসখণ্ডবিষয়ত্বং ব্যাবর্তয়তি-হৃদয়মিতি। কথং পুনর্বহির্মুখানি রূপাণ্যস্থহৃদয়ে স্থাতৃং পারযন্তি, তত্রাহ-হৃদয়েন হীতি। তথাপি কথং তেষাং হৃদয়প্রতিষ্ঠিতত্বং, তাহ-বাসনাত্মনামিতি ॥২২৬৷৷০॥

ভাষ্যানুবাদ:-‘কিংদেবতঃ’ অর্থ-দিগভাবাপন্ন যে তুমি, তোমার দেবতা কে? অভিপ্রায় এই যে, এই যাজ্ঞবল্ক্য দিগবিভাগানুসারে আপনার হৃদয়কে পাঁচভাগে বিভক্ত করিয়াছেন; এবং হৃদয়ের দিগভাব দ্বারা নিজেও সমস্ত জগৎকে আপনার অভিন্নরূপে উপলব্ধি করত ‘আমিই দিক্স্বরূপ’ এই ভাবে অবস্থান করিতেছিলেন। যাজ্ঞবন্ধ্য পূর্ব্বমুখ হইয়া ‘প্রতিষ্ঠা’ বিজ্ঞানের কথা বলিয়াছিলেন; এই কারণে, যাজ্ঞবন্ধ্যের প্রতিজ্ঞানুসারেই শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন-এই পূর্ব্বদিগভিমানী তোমার দেবতা কে? সাধারণতঃ বেদের সর্ব্বত্রই দেখিতে পাওয়া যায় যে, উপাসক যে যে দেবতার উপাসনা করেন, ইহলোকেই তদ্‌ভাবাপন্ন হইয়া, শেষে সেই সেই দেবতাকে লাভ করিয়া থাকেন; শ্রুতিও একথা পরে বলিবেন-‘উপাসক এখানেই দেবতা হইয়া পরে দেবত্ব লাভ করিয়া থাকেন’ ইত্যাদি। অভিপ্রায় এই যে, তুমি ত উপাসনাবলে দিগাত্মভাব প্রাপ্ত হইয়াছ; জিজ্ঞাসা করি, তোমার এই পূর্ব্বদিকের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা কে? অর্থাৎ কোন্ দেবতার সহযোগে তুমি আপনাকে পূর্ব্বদিকস্বরূপ বলিয়া অনুভব করিতেছ? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-আদিত্যদেবতারূপে, অর্থাৎ আদিত্য

১৩৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হইতেছেন—আমার পূর্ব্বদিকে অধিদেবতা; এই কারণে আমি ঐ দিকে আদিদেবতক।

ইতঃ পূর্ব্বে—যাজ্ঞবল্ক্য আপনাকে দেবতা ও ‘প্রতিষ্ঠা’বিষয়ক জ্ঞানসম্পন্ন বলিয়া পরিচয় দিয়াছিলেন; তন্মধ্যে দেবতার কথা বলা হইল, এখন প্রতিষ্ঠার কথা বলা আবশ্যক; এইজন্য জিজ্ঞাসা হইতেছে যে, সেই আদিত্য কোথায় অবস্থিত আছেন?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] চক্ষুতে; বক্ষ্যমাণ মন্ত্রসমূহও আদিত্যকে দেহসম্বন্ধী চক্ষুঃ হইতে নিষ্পন্ন বা অভিব্যক্ত বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন; যথা—‘চক্ষু হইতে সূর্য্য জন্মিয়াছেন’, এবং ‘আদিত্য চক্ষুঃ হইতে’ ইত্যাদি। কার্য্য বা উৎপন্ন পদার্থমাত্রই নিজ নিজ কারণে প্রতিষ্ঠিত থাকে;[সুতরাং চক্ষু হইতে উৎপন্ন সূর্য্যেরও চক্ষুতে অবস্থিতি যুক্তিযুক্ত হইতেছে।]

[শাকল্য পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন,] চক্ষুঃ আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত? [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] রূপসমূহে; কেন না, চক্ষুঃ নিজে রূপাত্মক, অর্থাৎ রূপপ্রধান তেজের পরিণাম, এবং রূপগ্রহণের জন্যই উহার উৎপত্তি; যখন যে রূপের সান্নিধ্য লাভ করে, তখন সেই বাহ্যরূপাকারেই আপনাকে গ্রহণ করিয়া থাকে; এইজন্য আদিত্যাধিষ্ঠিত চক্ষু পূর্ব্বাদি দিক্ ও দিক্স্থিত বস্তু নিচয় সমস্তই রূপে প্রতিষ্ঠিত বুঝিতে হইবে। সমস্ত পূর্ব্বদিক্টি চক্ষুর সহিত একীভূত শ্বেতপীতাদি-রূপাত্মক; সেই রূপসমষ্টি আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর-] রূপসমূহ হৃদয়ে(বুদ্ধিতে) প্রতিষ্ঠিত; কারণ, রূপমাত্রই হৃদয়ের সৃষ্টি; হৃদয়ই দৃশ্যমান রূপাকারে পরিণত হইয়া থাকে; কেন না, লোকে হৃদয়ের বলেই রূপ-বিজ্ঞান লাভ করিয়া থাকে। এখানে হৃদয় অর্থ—বুদ্ধি ও মন। লোকের হৃদয়ে রূপবিষয়ক যে যে সংস্কার নিহিত থাকে, উপযুক্ত উদ্বোধক উপস্থিত হইলে হৃদয়ই সেই সেই সুপ্তসংস্কারকে জাগ্রৎ করিয়া দেয়(স্মরণ করে); অতএব রূপসমষ্টি যে, হৃদয়ে অবস্থিত, একথা সুসঙ্গতই বটে।[অতঃপর শাকল্য বলিলেন—] হাঁ, ইহা এইরূপই বটে ॥২২৬৷৷২০॥

কিংদেবতোহস্যাং দক্ষিণায়াং দিশ্যসীতি, যমদেবত ইতি, স যমঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি, যজ্ঞ ইতি, কস্মিন্ যজ্ঞঃ প্রতিষ্ঠিত ইতি, দক্ষিণায়ামিতি, কস্মিন্ নু দক্ষিণা প্রতিষ্ঠিতেতি, শ্রদ্ধায়া- মিতি, যদা হ্যেব শ্রদ্ধত্তেহথ দক্ষিণাং দদাতি, শ্রদ্ধায়াহ্ হ্যেব দক্ষিণা প্রতিষ্ঠিতেতি, কস্মিন্ন শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিতেতি, হৃদয় ইতি

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

৯৭৫

হোবাচ, হৃদয়েন হি শ্রদ্ধাং জানাতি, হৃদয়ে হ্যেব প্রতিষ্ঠিতা ভবতীত্যেবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥ ২২৭ ॥ ২১ ॥

সরলার্থঃ।--[শাকল্যঃ পুনঃ পপ্রচ্ছ-হে যাজ্ঞবল্ক্য,] অস্যাং দক্ষিণায়াং দিশি কিংদেবতঃ(কা দেবতা অন্য-দিগাত্মভূতস্য তব-ইতি কিংদেবতঃ), অসি (ভবসি)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] যমদেবতঃ(যমঃ দেবতা অন্য-মম, যমাধিষ্ঠিতত্বাৎ দক্ষিণস্যা দিশ ইত্যর্থঃ)। সঃ(দক্ষিণদিগদেবতা) যমঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি।[উত্তরম্-] যজ্ঞে(বিহিতে কর্মণি) ইতি। যজ্ঞঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি;[উত্তরং-] দক্ষিণায়াম্,(যজ্ঞফল-নিষ্পাদকত্বাৎ দক্ষিণ’য়াঃ) ইতি। দক্ষিণা কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতা? ইতি;[উত্তরম্-] শ্রদ্ধায়াম্,[ভক্তি- সহিতা আস্তিক্যবুদ্ধিঃ শ্রদ্ধা, তদধীনত্বাৎ দক্ষিণায়াঃ) ইতি; হি(যতঃ) যদা (যস্মিন্ কালে) এব শ্রদ্ধত্তে(শ্রদ্ধালুঃ ভবতি), অথ(তদা) দক্ষিণাং দদাতি (ঋত্বিগ্ভ্যঃ প্রচ্ছতি)[যজমান:];[অতঃ] দক্ষিণা শ্রদ্ধায়াম্ এব হি প্রতিষ্ঠিতা, (ন অন্যত্র) ইতি। নু(ভোঃ) শ্রদ্ধা কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতা ইতি,[উত্তরম্-] হৃদয়ে[প্রতিষ্ঠিতা] ইতি হ উবাচ[যাজ্ঞবল্ক্য]:; হি(যস্মাৎ) হৃদয়েন এব শ্রদ্ধাৎ জানাতি(অবগচ্ছতি);[তস্মাৎ] হৃদয়ে এব হি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিতা ভবতি ইতি।[অতঃপরং শাকল্য আহ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতৎ এবম্ এব(যৎ ত্বয়োক্তম্, তৎ তথৈবেত্যর্থঃ) ॥২২৭৷৷২১৷

মূলানুবাদ:-হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই দক্ষিণদিকে তোমার দেবতা কে?[উত্তর-] যম আমার দেবতা। সেই যম দেবতা আবার কোথায় অবস্থিত আছেন?[উত্তর-] যজ্ঞে অর্থাৎ শাস্ত্রবিহিত যজ্ঞক্রিয়ায়। [পুনঃ প্রশ্ন-] সেই যজ্ঞ আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর-] দক্ষিণাতে অর্থাৎ যজ্ঞসমাপ্তির জন্য যে দক্ষিণা দিতে হয়, সেই দক্ষি- ণাতে। সেই দক্ষিণা কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর-] শ্রদ্ধাতে; [শ্রদ্ধা অর্থ শাস্ত্রোক্ত বিষয়ে দৃঢ়বিশ্বাস ও ভক্তি।] কেন না, লোক যখনই শ্রদ্ধাবান্ হয়, তখনই দক্ষিণা প্রদান করে; অতএব শ্রদ্ধাতেই দক্ষিণা প্রতিষ্ঠিত। সেই শ্রদ্ধা কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর-] হৃদয়ে অর্থাৎ বুদ্ধিতে; কারণ, হৃদয়েই শ্রদ্ধার অনুভূতি হইয়া থাকে; অতএব শ্রদ্ধা হৃদয়েই অবস্থান করে।[শাকল্য বলিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য,

৯৩৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ইহা এইরূপই বটে, অর্থাৎ তুমি যেরূপ ভাবে দেবতাদির বিষয় বর্ণনা করিলে, তাহা ঠিকই হইয়াছে ॥ ২২৭ ॥ ২১॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কিংদেবতোহস্যাৎ দক্ষিণায়াং দিশ্যসীতি পূর্ব্ববৎ। দক্ষিণায়াং দিশি কা দেবতা তব? যমদেবত ইতি, যমো দেবতা মম দক্ষিণদিগ্- ভূতস্য। স যমঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি; যজ্ঞে ইতি—যজ্ঞে কারণে প্রতিষ্ঠিতো যমঃ সহ দিশা। কথং পুনর্যজ্ঞস্য কার্য্যং যমঃ? ইতি; উচ্যতে—ঋত্বিগ্ভি- নিষ্পাদিতো যজ্ঞঃ; দক্ষিণয়া যজমানস্তেভ্যো যজ্ঞং নিষ্ক্রীয় তেন যজ্ঞেন দক্ষিণাং দিশং সহ যমেনাভিজয়তি; তেন যজ্ঞে যমঃ কার্য্যত্বাৎ প্রতিষ্ঠিতঃ সহ দক্ষিণয়া দিশা। কস্মিন্নু যজ্ঞঃ প্রতিষ্ঠিত ইতি, দক্ষিণায়ামিতি, দক্ষিণয়া স নিষ্ক্রীয়তে, তেন দক্ষিণাকার্য্যং যজ্ঞঃ। কস্মিন্নু দক্ষিণা প্রতিষ্ঠিতেতি; শ্রদ্ধায়ামিতি, শ্রদ্ধা নাম দিংসুত্বমাস্তিক্যবুদ্ধির্ভক্তিসহিতা। কথং তস্যাৎ প্রতিষ্ঠিতা দক্ষিণা? যম্মাৎ যদা হ্যেব শ্রদ্ধত্তে, অথ দক্ষিণাং দদাতি, নাশ্রদ্দধৎ দক্ষিণাং দদাতি; তস্মাৎ শ্রদ্ধায়াং হ্যেব দক্ষিণা প্রতিষ্ঠিতেতি। কস্মিন্নু শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিতেতি; হৃদয় ইতি হোবাচ; হৃদয়স্য হি বৃত্তিঃ শ্রদ্ধা; যস্মাৎ হৃদয়েন হি শ্রদ্ধাং জানাতি; বৃত্তিশ্চ বৃত্তিমতি প্রতিষ্ঠিতা ভবতি। তস্মাৎ হৃদয়ে হ্যেব শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা প্রতিষ্ঠিতা ভবতি। এবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥২২৭৷৷২১৷৷

টীকা। পূর্ববদিত্যুক্তমেব ব্যনক্তি-দক্ষিণায়ামিতি। যমস্য যজ্ঞকার্য্যত্বমপ্রসিদ্ধমিতি শঙ্কিত্বা ব্যুত্থাপয়তি-কথমিত্যাদিনা। তস্য যজ্ঞকার্য্যত্বে ফলিতমাহ-তেনেতি। যজ্ঞস্থ দক্ষিণায়াং প্রতিষ্ঠিতত্বং সাধয়তি-দক্ষিণয়েতি। কার্য্যং চ কারণে প্রতিষ্ঠিতমিতি শেষঃ। দক্ষিণায়াঃ শ্রদ্ধায়াং প্রতিষ্ঠিতত্বং প্রকটয়তি-যস্মাদিতি। হৃদয়ে সা প্রতিষ্ঠিতেত্যত্র হেতুমাহ- হৃদয়স্যেতি। হৃদয়ব্যাপ্যত্বাচ্চ শ্রদ্ধায়াস্তৎপ্রতিষ্ঠিতত্বমিত্যাহ-হৃদয়েন হীতি। হৃদয়স্য শ্রদ্ধা বৃত্তিরস্ত, তথাপি প্রকৃতৈ কিমায়াতং, তদাহ-বৃত্তিশ্চেতি। ২২৭।২১।

ভাষ্যানুবাদ।—হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই দক্ষিণ দিকে তোমার দেবতা কে? ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্ব শ্রুতির ব্যাখ্যার অনুরূপ।[শাকল্য যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন—] এই দক্ষিণদিকে তোমার দেবতা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] দক্ষিণদিকের সহিত আত্মভাবাপন্ন আমার দেবতা হইতেছেন—যম। সেই যম আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর] যজ্ঞেতে, অর্থাৎ যম নিজের আশ্রয়ভূত দক্ষিণদিকের সহিত স্বকারণীভূত যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত আছেন। ভাল, যমকে যজ্ঞের কার্য্য অর্থাৎ যজ্ঞ হইতেছে কারণ, আর যম হইতেছেন যজ্ঞের কার্য্য বা ফল, একথা বলা হইতেছে কিরূপে? হাঁ, বলিতেছি—ঋত্বিকগণ যজ্ঞ সম্পাদন করিয়া

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

೩೦೭

থাকেন, যজমান দক্ষিণা দিয়া তাহাদের নিকট হইতে সেই যজ্ঞফল ক্রয় করিয়া সেই যজ্ঞের প্রভাবে দক্ষিণদিক্ ও তদধিপতি যমকে জয় বা আয়ত্ত করিয়া থাকেন; এই কারণে, যমকে যজ্ঞের কার্য্য বা ফল বলা হইয়াছে, এবং যম ও দক্ষিণদিক্কে কারণীভূত যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত বলা হইয়াছে(১)।

[পুনঃ প্রশ্ন হইল-] সেই যজ্ঞ কোথায় অবস্থিত?[উত্তর-] দক্ষিণাতে; কারণ,[যজমান, গো-হিরণ্যাদিরূপ] দক্ষিণা দ্বারা সেই যজ্ঞ ক্রয় করিয়া থাকেন; এই জন্য যজ্ঞকে দক্ষিণার কার্য্য বা অধীন বলা হইল।(পুনঃ প্রশ্ন-) সেই দক্ষিণা কোথায় প্রতিষ্ঠিত? শ্রদ্ধাতে; শ্রদ্ধা অর্থ-দানেচ্ছা ও ভক্তির সহিত আস্তিক্য-বুদ্ধি, অর্থাৎ শাস্ত্রে যে সমস্ত অলৌকিক বিষয়ের উল্লেখ আছে, সে সমস্ত বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস ও ভক্তি থাকা। ভাল, দক্ষিণা শ্রদ্ধায় প্রতিষ্ঠিত থাকে কিরূপে?(উত্তর-) যেহেতু, যখনই লোকের শ্রদ্ধা হয়, তখনই দক্ষিণা দিয়া থাকে, শ্রদ্ধাবিহীন লোক তাহা দেয় না;(অশ্রদ্ধালুর দান ঠিক দক্ষিণাপদ-বাচ্য হয় না); এই জন্য শ্রদ্ধাতেই দক্ষিণা প্রতিষ্ঠিত।(২) সেই শ্রদ্ধা আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?(উত্তর-) হৃদয়ে(মনে)। শ্রদ্ধা হইতেছে হৃদয়ের বৃত্তি বা ধর্ম; হৃদয়েই শ্রদ্ধার প্রতীতি হইয়া থাকে। যেহেতু বৃত্তি বা ধৰ্ম্মমাত্রই বৃত্তিমানে(যাহার বৃত্তি, তাহাতে) প্রতিষ্ঠিত থাকে; অতএব হৃদয়ই শ্রদ্ধার প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়স্থান।(এ কথা শুনিয়া শাকল্য বলিলেন-) হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা ঠিক এইরূপই বটে ॥২২৭৷৷২১৷৷

কিং দেবতোহস্যাং প্রতীচ্যাং দিশ্যসীতি, বরুণদেবত ইতি,

৯৩৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

স বরুণঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইত্যপ্সিতি, কস্মিন্নাপঃ প্রতিষ্ঠিতা ইতি, রেতসীতি, কস্মিন্নু রেতঃ প্রতিষ্ঠিতমিতি, হৃদয় ইতি, তস্মাদপি প্রতিরূপং জাতমাহুহৃদয়াদিব সৃষ্টো হৃদয়াদিব নিৰ্ম্মিত ইতি, হৃদয়ে হ্যেব রেতঃ প্রতিষ্ঠিতং ভবতীত্যেবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥ ২২৮ ॥ ২২ ॥

সরলার্থঃ।—[শাকল্যঃ পুনঃ পপ্রচ্ছ—হে যাজ্ঞবল্ক্য, ত্বং] অস্যাৎ প্রতীচ্যাং (পশ্চিমায়াং) দিশি কিংদেবতঃ(কা দেবতা অন্য—তব) অসি ইতি;[যাজ্ঞ- বল্ক্য আহ—] বরুণদেবত ইতি। স বরুণঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি। অপৃস্থু(জলেষু) ইতি। আপঃ(জলানি) কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতাঃ? ইতি; [উত্তরং—] রেতসি(শুক্রে) ইতি। রেতঃ(শুক্রং) কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতং? ইতি; হৃদয়ে(বুদ্ধৌ) ইতি। তস্মাৎ(রেতসঃ হৃদয়প্রতিষ্ঠিতত্বাৎ হেতোঃ) অপি(চ) প্রতিরূপং(পিতুরনুরূপং) জাতং(উৎপন্নং পুত্রম্) আহুঃ (কথয়ন্তি)[জনাঃ]—[অয়ং পুত্রঃ] হৃদয়াৎ ইব সৃপ্তঃ(নির্গতঃ) হৃদয়াৎ ইব (সম্ভাবনায়াম্) নির্ম্মিতঃ ইতি।[যুজ্যতে চৈতৎ] হি(যতঃ) হৃদয়ে এব হি(নিশ্চয়ে) রেতঃ প্রতিষ্ঠিতং ভবতি—ইতি।[এতৎ শ্রুত্বা শাকল্য আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতৎ ত্বয়া যদুক্তং, তৎ) এবম্ এব(ন অন্যথা ইতি ভাবঃ) ॥২২৮৷৷২২॥

মূলানুবাদ:-[শাকল্য পুনর্বার জিজ্ঞাসা করিলেন-] এই পশ্চিম দিকে তোমার দেবতা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] বরুণ আমার দেবতা।[পুনঃ প্রশ্ন হইল-] সেই বরুণ কোথায় অবস্থিত? [উত্তর হইল-] জলে। সেই জল আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত? [উত্তর-] রেতে(শুক্রে); অভিপ্রায় এই যে, শুক্ররূপে পরিণত হওয়াই জলের শেষ পরিণাম। সেই শুক্রের প্রতিষ্ঠা বা অবস্থান কোথায়?(উত্তর-) হৃদয়ে; অভিপ্রায় এই যে, রেতঃসেক কাম- বৃত্তির অধীন, সেই কামবৃত্তি হৃদয়ের ধর্ম্ম; এই কারণে শুক্রকে হৃদয়- প্রতিষ্ঠিত বলা হয়। এই জন্যই পিতার অনুরূপ আকৃতিসম্পন্ন পুত্রকে লোকে বলিয়া থাকে যে, এই পুত্রটি যেন পিতার হৃদয় হইতেই নির্গত হইয়াছে, যেন হৃদয় দিয়াই নির্ম্মিত হইয়াছে; এই হেতু বুঝিতে হইবে

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৩৩৯

যে, হৃদয়ই রেতের আশ্রয়স্থান। শাকল্য এ কথা শুনিয়া বলিলেন যে, হে যাজ্ঞবল্ক্য, হাঁ, ইহা এইরূপই বটে ॥ ২২৮ ॥ ২২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কিংদেবতোহস্যাং প্রতীচ্যাং দিশ্যসীতি। তস্যাৎ বরুণোহধিদেবতা মম। স বরুণঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি; অপ্সু ইতি, অপাৎ হি বরুণঃ কার্য্যম্, “শ্রদ্ধা বা আপঃ।” “শ্রদ্ধাতো বরুণমসৃজত” ইতি শ্রুতেঃ। কস্মিন্ আপঃ প্রতিষ্ঠিতা ইতি; রেতসীতি,—“রেতসা হ্যাপঃ সৃষ্টাঃ” ইতি শ্রুতেঃ। কস্মিন্নু রেতঃ প্রতিষ্ঠিতমিতি; হৃদয় ইতি। যস্মাৎ হৃদয়স্য কার্য্যং রেতঃ, কামো হৃদয়স্য বৃত্তিঃ; কামিনো হি হৃদয়াৎ রেতোহধিস্কন্দতি, তস্মাদপি প্রতিরূপমনুরূপং পুত্রং জাতমাহুঃ লৌকিকাঃ—অন্য পিতুহৃদয়াদিব অয়ং পুত্রঃ সৃষ্টঃ বিনিঃসৃতঃ, হৃদয়াদিব নির্ম্মিতঃ,—যথা সুবর্ণেন নির্ম্মিতং কুণ্ডলম্। তস্মাৎ হৃদয়ে হ্যেব রেতঃ প্রতিষ্ঠিতং ভবতীতি। এবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥২২৮৷৷২২॥

টীকা। রেতসো হৃদয়কাৰ্য্যত্বং সাধয়তি—কাম ইতি। তথাপি কথং রেতো হৃদয়স্য কায্যং, তদাহ—কামিনো হীতি। তত্রৈব লোকপ্রসিদ্ধিং প্রমাণয়তি—তস্মাদিতি। অপিশব্দঃ সম্ভাবনার্থোহবধারণার্থো বা ॥২২৮।২২।

ভাষ্যানুবাদ।-[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি] এই পশ্চিমদিকে কোন্ দেবতাকর্তৃক অধিষ্ঠিত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] ঐ দিকে বরুণদেব আমার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। সেই বরুণ কোথায় অবস্থিত? [উত্তর-] জলে অধিষ্ঠিত; কারণ, ‘শ্রদ্ধাই জল,’ এবং ‘শ্রদ্ধা হইতে বরুণের সৃষ্টি করিলেন’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, বরুণদেব জল হইতে প্রাদুর্ভূত। সেই জল আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর-] রেতে(শুক্রে); কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন যে, ‘রেতঃ হইতে জল উৎপন্ন হইয়াছে,’ সেই রেতঃ আবার কোথায় অবস্থিত?[উত্তর-] হৃদয়ে; কারণ, রেতঃক্ষরণ হৃদয়েরই কার্য্য; কাম(সম্ভোগবাসনা) হৃদয়ের ধর্ম; কামার্ত লোকই হৃদয় হইতে রেতঃসেক করিয়া থাকে; এই জন্যই পিতার অনুরূপ পুত্র জন্মিলে, তাহাকে লক্ষ্য করিয়া লোকে বলিয়া থাকে যে, এই পুত্রটী যেন ইহার পিতার হৃদয় হইতেই নিঃসৃত হইয়াছে,-যেন সুবর্ণনিৰ্ম্মিত কুণ্ডলের ন্যায় হৃদয় দ্বারাই নির্মিত হইয়াছে, অর্থাৎ সুবর্ণ দ্বারা নিৰ্ম্মিত কুণ্ডল যেমন সুবর্ণময়ই হয়, তেমনি এই পুত্রটাও পিতার অনুরূপ রূপসম্পন্ন হইয়াছে(১)। অতএব হৃদয়ই রেতের যথার্থ প্রতিষ্ঠা

(১) তাৎপর্য্য—পুত্র যে, হৃদয়নিঃসৃত, ইহা শ্রৌত সিদ্ধান্ত। পুত্র-সংস্কারক মন্ত্রেতে আছে—“অঙ্গাদঙ্গাৎ প্রখলসি হৃদয়াদভিজায়সে। আত্মা বৈ পুত্রনামাসি—” এখানে বলা

৯৪০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বা আশ্রয় স্থান।[ইহা শুনিয়া শাকল্য বলিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এই- রূপই বটে ॥২২৮৷৷২২৷৷

কিংদেবতোহস্যামুদীচ্যাং দিশ্যসীতি, সোমদেবত ইতি, স সোমঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি, দীক্ষায়ামিতি, কস্মিন্নু দীক্ষা প্রতিষ্ঠিতেতি, সত্য ইতি, তস্মাদপি দীক্ষিতমাহুঃ সত্যং বদেতি, সত্যে হ্যেব দীক্ষা প্রতিষ্ঠিতেতি, কস্মিন্নু সত্যং প্রতিষ্ঠিতমিতি, হৃদয় ইতি হোবাচ, হৃদয়েন হি সত্যং জানাতি, হৃদয়ে হ্যেব সত্যং প্রতিষ্ঠিতং ভবতীত্যেবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥ ২২৯ ॥ ২৩ ॥

সরলার্থঃ।—[শাকল্য পুনঃ পপ্রচ্ছ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য,[ত্বং] অস্যাং উদীচ্যাং (উত্তরস্যাং) দিশি কিংদেবতঃ অসি? ইতি;[যাজ্ঞবল্ক্য আহ] সোমদেবতঃ(সোমঃ চন্দ্রঃ সোমাখ্যা লতা চ দেবতা অন্য মম, ইত্যর্থঃ)। সঃ সোমঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি; দীক্ষায়াং(যজ্ঞাদিনিয়মগ্রহণে) ইতি। দীক্ষা কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতা? ইতি; সত্যে(বাক্যস্য মনসশ্চ যথার্থা প্রবৃত্তিঃ সত্যম্, তস্মিন্) ইতি। তস্মাৎ(দীক্ষায়াঃ সত্যপ্রতিষ্ঠিতত্ত্বাৎ হেতোঃ) অপি(চ) দীক্ষিতং(দীক্ষাগ্রাহিণং জনম্ আহুঃ (কথয়ন্তি)[জনাঃ]—সত্যং বদ, ইতি; হি(যতঃ) সত্যে এব দীক্ষা প্রতিষ্ঠিতা ইতি। নু(ভোঃ) সত্যং কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতম্? ইতি;[যাজ্ঞবল্ক্য:] উবাচ—হৃদয়ে ইতি। হি(যস্মাৎ) হৃদয়েন এব সত্যং জানাতি;[তস্মাৎ] হৃদয়ে এব সতৎ প্রতিষ্ঠিতং ভবতি ইতি।[শাকল্য আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতৎ এবম্ এব[ইতি] ॥১২৯৷৷২৩৷৷

মূলানুবাদ।—শাকল্য পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন—যাজ্ঞ- বল্ধ্য, এই উত্তর দিকে তোমার অধিদেবতা কে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] সোম আমার অধিদেবতা; এখানে সোম অর্থ—চন্দ্র ও সোমলতা। [পুনঃ প্রশ্ন হইল—] সেই সোম কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর—]

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

১৪১

দীক্ষাতে; দীক্ষা অর্থ—যজ্ঞের পূর্ব্বকর্ত্তব্য নিয়মগ্রহণ। দীক্ষা কোথায় প্রতিষ্ঠিত? দীক্ষা সত্যে প্রতিষ্ঠিত; সেই হেতুই দীক্ষিত ব্যক্তিকে লোকে বলিয়া থাকে যে, ‘তুমি সত্য বলিবে’; কারণ, সত্যই দীক্ষার প্রতিষ্ঠান। সেই সত্য আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হৃদয়ে; কেন না, লোকে হৃদয়েই সত্য উপলব্ধি করিয়া থাকে; অতএব হৃদয়েই সত্য প্রতিষ্ঠিত থাকে।[শাকল্য বলিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এই- রূপই বটে ॥ ২২৯ ॥ ২৩ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কিংদেবতোহস্যামুদীচাং দিশ্যসীতি। সোমদেবত ইতি। সোম ইতি লতাং সোমং দেবতাঞ্চৈকীকৃত্য নির্দেশঃ। স সোমঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি; দীক্ষায়ামিতি। দীক্ষিতো হি যজমানঃ সোমৎ ক্রীণাতি; ক্রীতেন সোমেনেষ্টু। জ্ঞানবানুত্তরাং দিশং প্রতিপদ্যতে—সোমদেবতাধিষ্ঠিতাং সৌম্যাম্। কস্মিন্নু দীক্ষা প্রতিষ্ঠিতেতি; সত্য ইতি। কথম্? যস্মাৎ সত্যে দীক্ষা প্রতি- ষ্ঠিতা, তস্মাদপি দীক্ষিতমাহুঃ—সত্যং বদেতি,—কারণভ্রেষে কার্য্যভ্রেষো মা ভূদিতি। সত্যে হোব দীক্ষা প্রতিষ্ঠিতেতি। কস্মিন্নু সত্যং প্রতিষ্ঠিতমিতি; হৃদয় ইতি হোবাচ, হৃদয়েন হি সত্যং জানাতি। তস্মাৎ হৃদয়ে হোব সত্যৎ প্রতিষ্ঠিতং ভবতীতি। এবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥২১৯৷৷২৩৷৷

টীকা। দীক্ষায়াং সোমস্য প্রতিষ্ঠিতত্বং সাধয়তি—দীক্ষিতো হীত্যাদিনা। দীক্ষায়াঃ সত্যে প্রতিষ্ঠিতত্বমপ্রসিদ্ধমিতি শঙ্কিত্বা সমাধত্তে—কথমিত্যাদিনা। অপিশব্দোহবধারণার্থঃ। সত্যং বদেতি বদতামভিপ্রায়মাহ—কারণেতি। ভ্রেযো ভ্রংশো নাশঃ; ইতি তেষামভিপ্রায় ইতি শেষঃ। প্রকৃতোপসংহারঃ—সত্যে হীতি ॥২২৯৷২৩৷

ভাষ্যানুবাদ?-[শাকল্য পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি এই উত্তর দিকে কোন্ দেবতাকর্তৃক অধিষ্ঠিত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] সোমদেবতাকর্তৃক; এখানে সোম লতা ও সোম দেবতা(চন্দ্র), এই উভয়কেই এক করিয়া সোম-শব্দে নির্দেশ করা হইয়াছে। সেই সোম কোথায় প্রতিষ্ঠিত? [উত্তর-] দীক্ষাতে;[দীক্ষা অর্থ-যজ্ঞাদি-নিয়ম গ্রহণ।] যজমান(যাগকর্তা) দীক্ষা গ্রহণের পর সোম ক্রয় করিয়া থাকেন, এবং সেই ক্রীত সোম দ্বারা যজ্ঞ ও যজ্ঞাঙ্গ উপাসনা করিয়া সোমদেবতার অধিষ্ঠিত-সৌম্য দিক্(উত্তর দিক্) প্রাপ্ত হন।[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন,] দীক্ষা কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর-] সত্যে। কিরূপে? যে হেতু দীক্ষা কার্য্যটি সত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত, সেই হেতুই দীক্ষিত ব্যক্তিকে উপদেশ করা হয় যে, ‘তুমি সত্যবাদী হও’; অভিপ্রায়

৯৪২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

এই যে, সত্যরূপ আশ্রয়ের অপচয়ে তদাশ্রিত দীক্ষারও অপচয় ঘটিতে পারে, তাহা না হউক। ইহা হইতেও বুঝা যাইতেছে যে, সত্যই দীক্ষার প্রকৃত আশ্রয়।[পুনঃ প্রশ্ন হইল,] সেই সত্য আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হৃদয়ে; কেন না, হৃদয়েই সত্যের অনুভূতি হইয়া থাকে; অতএব হৃদয়ই সত্যের প্রতিষ্ঠাস্থান।[শাকল্য বলিলেন,] যাজ্ঞবল্ক্য, হাঁ, ইহা এইরূপই বটে ॥২২৯৷৷২৩৷৷

কিংদেবতোহস্যাং ধ্রুবায়াং দিশ্যসীত্যগ্নিদেবত ইতি, সোহগ্নিঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি, বাচীতি; কস্মিন্নু বাক্ প্রতিষ্ঠিতেতি, হৃদয় ইতি; কস্মিন্নু হৃদয়ং প্রতিষ্ঠিতমিতি ॥ ২৩০ ॥ ২৪ ॥

সরলার্থঃ।—[হে যাজ্ঞবল্ক্য, ত্বম্] অস্যাং ধ্রুবায়াৎ(ঊর্দ্ধায়াৎ) দিশি কিংদেবতঃ অসি? ইতি;[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] অগ্নিদেবতঃ(অগ্নিঃ প্রকাশরূপং তেজঃ দেবতা অন্য ইতি অগ্নিদেবতঃ) ইতি।[শাকল্যঃ পুনরাহ—] সঃ অগ্নিঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] বাচি(বাগিন্দ্রিয়ে) ইতি। নু (ভোঃ) বাক্ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতা? ইতি; হৃদয়ে ইতি। হৃদয়ং কস্মিন্ নু প্রতি- ষ্ঠিতম্? ইতি ॥২৩০॥২৪৷৷

মূলানুবাদ:-[শাকল্য পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য,] এই ধ্রুবা দিকে অর্থাৎ ঊর্দ্ধদিকে তোমার দেবতা কে? [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] ঐ দিকে অগ্নি আমার দেবতা।(পুনঃ প্রশ্ন,) সেই অগ্নি কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর-] বাগিন্দ্রিয়ে। বাগিন্দ্রিয় কোথায় অবস্থিত?[উত্তর-] হৃদয়ে। সেই হৃদয় কোথায় অবস্থিত? [উত্তর-] ॥ ২৩০ ॥ ২৪ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কিংদেবতোহস্যাৎ ধ্রুবায়াং দিশ্যসীতি। মেরোঃ সমন্ততো বসতামব্যভিচারাৎ ঊর্দ্ধা দিগ্ ধ্রুবেত্যুচ্যতে। অগ্নিদেবত ইতি— ঊর্দ্ধায়াৎ হি প্রকাশভূয়ত্বম্; প্রকাশশ্চাগ্নিঃ, সোহগ্নিঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি, বাচীতি। কস্মিন্নু বাক্ প্রতিষ্ঠিতেতি, হৃদয় ইতি। তত্র যাজ্ঞবল্ক্যঃ সর্ব্বাসু দিক্ষু বিপ্রসূতেন হৃদয়েন সর্ব্বা দিশ আত্মত্বেনাভিসম্পন্নঃ, সদেবাঃ সপ্রতিষ্ঠা দিশশ্চাত্মভূতাস্তস্য নামরূপকৰ্ম্মাত্মভূতস্য যাজ্ঞবল্ক্যস্য। যৎ রূপং, তৎ প্রাচ্যা দিশা সহ হৃদয়ভূতং যাজ্ঞবল্ক্যস্য; যৎ কেবলং কৰ্ম্ম—পুত্রোৎপাদনলক্ষণং চ জ্ঞানসহিতং চ সহ ফলেনাধিষ্ঠাত্রীভিশ্চ দেবতাভিঃ দক্ষিণা-প্রতীচ্যুদীচ্যঃ কৰ্ম্মফলাত্মিকা হৃদয়-

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

১৪৩

মেবাপন্নাস্তস্য। ধ্রুবয়া দিশা সহ নাম সর্ব্বং বাগদ্বারেণ হৃদয়মেবাপন্নম্। এতা- বন্ধীদৎ সর্ব্বম্; যৎ রূপৎ বা কৰ্ম্ম বা নাম বেতি তৎ সর্ব্বং হৃদয়মের; তৎ সর্ব্বাত্মকৎ হৃদয়ৎ পৃচ্ছ্যতে—কস্মিন্নু হৃদয়ং প্রতিষ্ঠিতমিতি ॥২৩০৷৷২৪৷৷

টীকা। কথং পুনরূদ্ধা দিগবস্থিতা ধ্রুবেত্যুচ্যতে, তত্রাহ-মেরোরিতি। তত্রাগ্নেদেবতাত্বং প্রকটয়তি-উর্দ্ধায়াং হীতি। ‘দিশো বেদ’ ইত্যাদি শ্রত্যা জগতো বিভাগেন পঞ্চধাত্বং ধ্যানার্থমুক্তমিদানীং বিভাগবাদিন্যাঃ শ্রুতেরভিপ্রায়মাহ-তত্রেতি। যথোক্তে বিভাগে সতীতি যাবৎ। উক্তমর্থং সংক্ষিপতি-সদেবা ইতি। তত্রাবান্তরবিভাগমাহ-যদ্রূপমিতি। আদ্যে পর্যায়ে হৃদয়ে রূপপ্রপঞ্চোপসংহারো দর্শিত: ‘হৃদয়ে হ্যেব রূপানি’ ইতি শ্রুতেরিত্যর্থঃ। দক্ষিণায়ামিল্যাদি- পর্যায়ত্রয়েণ তত্রৈব কর্মোপসংহার উক্ত ইত্যাহ-যৎ কেবলমিতি। যদ্ধি কেবলং কৰ্ম্ম, তৎ ফলাদিভিঃ সহ দক্ষিণাদিগাত্মকং হৃদ্যুপসংহ্রিয়তে, যজ্ঞস্য দক্ষিণাদিদ্বারা হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত- ত্বোক্তের্দ্দক্ষিণস্যা দিশন্তৎফলত্বাৎ, পুত্রজন্মাখ্যং চ কৰ্ম্ম প্রতীচ্যাত্মকং তত্রৈবোপসংহৃতম্, ‘হৃদয়ে হ্যেব রেতঃ প্রতিষ্ঠিতম্’ ইতি শ্রতেঃ। পুত্রজন্মনশ্চ তৎকার্য্যত্বাজজ্ঞানসহিতমপি কৰ্ম্মফলপ্রতিষ্ঠা- দেবতাভিঃ সহোদীচ্যাত্মকং তত্রৈবোপসংহৃতং, সোমদেবতায়া দীক্ষাদিদ্বারা তৎপ্রতিষ্ঠত্বশ্রুতেঃ। এবং দিক্‌ত্রয়ে সর্ব্বং কৰ্ম্ম হৃদি সংহৃতমিত্যর্থঃ। পঞ্চমপর্যায়স্য তাৎপর্য্যমাহ-ধ্রুবয়েতি। নামরূপ- কর্মসূপসংহৃতেষপি কিঞ্চিদুপসংহর্ত্তব্যান্তরমবশিষ্টমস্তীত্যাশঙ্ক্য নিরাকরোতি-এতাবন্ধীতি। প্রশ্নান্তরমুখাপয়তি-তৎ সর্ব্বাত্মকমিতি ॥২৩০॥২৪॥

ভাষ্যানুবাদ।—[শাকল্য জিজ্ঞাসা করিলেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য,] এই ধ্রুবা দিকে অর্থাৎ ঊর্দ্ধদিকে তোমার দেবতা কে? সুমেরুর চতুদ্দিগ্বাসী সমস্ত লোকের পক্ষেই সমান বা একই ভাবে প্রতীত হয় বলিয়া ঊর্দ্ধদিক্কে ‘ধ্রুবা’ বলা হয়(১)।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—ঐ দিকে] অগ্নি আমার দেবতা, কারণ, ঊর্দ্ধদিক্ স্বতই প্রকাশবহুল; অগ্নিও প্রকাশাত্মক;[এই কারণে, যাজ্ঞবল্ক্য ঊর্দ্ধ- দিকে আপনাকে অগ্নিদেবতাধিষ্ঠিত বলিলেন]।[শাকল্য পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন—] সেই অগ্নি আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] বাগিন্দ্রিয়ে[প্রতিষ্ঠিত]।[পুনঃ প্রশ্ন হইল—] সেই বাক্ আবার কোথায় প্রতি- ষ্ঠিত?[উত্তর হইল—] হৃদয়ে।

(১) তাৎপয্য—সূর্যদেব প্রতিনিয়ত সুমেরু পর্বতকে প্রদক্ষিণ করিতেছেন, সুমেরুর চতুষ্পার্শ্ববর্তী লোকেরা প্রথমে সম্মুখে যে দিকে সূর্য্য দর্শন করে, তাহাকে পূর্ব্বদিক্, তাহার পশ্চাৎভাগকে পশ্চিম দিক্, নিজের দক্ষিণ ভাগকে দক্ষিণ দিক্ এবং বাম ভাগকে উত্তর দিক্ বলিয়া ব্যবহার করিয়া থাকে; সুতরাং সুমেরুর এক পার্শ্ববর্তী লোকদিগের যাহা পূর্ব্বদিক্, অপর পার্শ্ববর্তী লোকদিগের পক্ষে তাহাই পশ্চিম, দক্ষিণ বা উত্তর দিক্ বলিয়া ব্যবহৃত হইতে পারে, কিন্তু ঊর্দ্ধ দিক্টি সকলের পক্ষেই সমান; এই জন্য উহার নাম ধ্রুবা।

৯৪৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যথোক্ত বিভাগানুসারে দেখা যাইতেছে যে, সমস্ত দিকের সহিতই হৃদয়ের সম্বন্ধ রহিয়াছে; যাজ্ঞবল্ক্য নিজেও সেই সর্বদিক্সম্বদ্ধ হৃদয় দ্বারা সমস্ত দিকের সহিত-অভিন্নভাব প্রাপ্ত হইয়াছেন। যাজ্ঞবল্ক্য জ্ঞানবলে জাগতিক নাম, রূপ ও কর্মনিচয়কে আত্মস্বরূপে গ্রহণ করিয়াছেন; দিক্সমূহও আবার নিজ নিজ আশ্রয় ও দেবতা সহকারে যাজ্ঞবল্ক্যের আত্মভূত হইয়াছে; তন্মধ্যে রূপ-ভাগটি পূর্ব্বদিকের সহিত, যাজ্ঞবল্ক্যের হৃদয়স্বরূপ হইয়াছে; আর যাহা জ্ঞানরহিত— কেবল সন্তানসমুৎপাদনাত্মক কৰ্ম্ম, এবং যাহা জ্ঞানসহকৃত কৰ্ম্ম, তাহাও ফল ও তদধিষ্ঠাত্রী দেবতার সহিত কৰ্ম্মফলরূপে পরিণত—দক্ষিণ, উত্তর, পশ্চিম দিক্ ও যাজ্ঞবল্ক্যের হৃদয়ের সহিত সম্বদ্ধ, এবং যত রকম নাম(শব্দ) আছে, সে সমুদয়ও ধ্রুবা দিকের সহিত যাজ্ঞবল্ক্যের হৃদয়ে সংবদ্ধ; বাক্ হইতেছে নামের দ্বার বা অভিব্যক্তির উপায়। এই যে, নাম, রূপ ও কর্মের কথা বলা হইল, জগতে এতদতিরিক্ত আর কিছুই নাই; অথচ এই নাম, রূপ ও কৰ্ম্ম সমস্তই হৃদয়াত্মক; এখন সেই সর্ব্বাত্মক হৃদয়ের সম্বন্ধে প্রশ্ন হইতেছে যে, সেই হৃদয় কোথায় প্রতিষ্ঠিত? ॥২৩০৷৷২৪৷৷

অহল্লিকেতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যো যত্রৈতদন্যত্রাস্মন্মন্যাসৈ, যদ্ধ্যেতদন্যত্রাস্মৎ স্যাচ্ছানো বৈনদদ্যুর্ব্বয়াংসি বৈনদ্বিমথ্নীর- ন্নিতি ॥ ২৩১ ॥ ২৫ ॥

সরমার্থঃ।—[যাজ্ঞবল্ক্যঃ স্বোক্তিসমর্থনায় অহল্লিকেতি নামান্তরেণ শাকল্যমেব সম্বোধয়ন্] উবাচ হ—[হে শাকল্য, ত্বং] এতৎ(মদুক্তং হৃদয়ম্ আত্মা) অস্মৎ[অস্মত্তঃ শরীরাৎ] অন্যত্র যত্র(দেশে কালে বা)[বর্তমানং] মন্যাসৈ (মন্যসে);[তত্র এতদবগচ্ছ,] যৎ(যদি) হি(নিশ্চয়ে) এতৎ(হৃদয়ং— আত্মা) অস্মৎ(অস্মদীয়শরীরাৎ) অন্যত্র স্যাৎ(ভবেৎ),[তহি] শ্বানঃ(সার- মেয়াঃ) বা এনৎ[এতৎ শরীরং] অদ্যুঃ(ভক্ষয়েযুঃ), বয়াৎসি(পক্ষিণঃ) বা এনৎ (শরীরং) বিমথ্নীরন্(বিমদ্দয়েযুঃ);[তস্মাৎ হৃদয়াখ্যস্যাত্মনঃ শরীরপ্রতি- ষ্ঠিতত্বমবগন্তব্যমিতি ভাবঃ] ॥২৩১৷৷২৫৷৷

মূলানুবাদ?—[ দেহ যে, হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত, ইহা বুঝাইবার উদ্দেশ্যে যাজ্ঞবল্ক্য অহল্লিকা নামে সম্বোধন করিয়া শাকল্যকেই বলিলেন—হে অহল্লিক,] তুমি যে, মনে করিতেছ, এই হৃদয়(আত্মা) আমাদের শরীরের অন্যত্র অবস্থিত থাকে;[তাহার উত্তরে বলিতেছি—]

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

১৪৫

আত্মা যদি আমাদের শরীরের বাহিরে অন্য কোথাও থাকিত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই এই শরীরকে কুকুরে ভক্ষণ করিত, কিংবা পক্ষিগণ ছিন্ন ভিন্ন করিত;[তাহা যখন করিতেছে না, তখন বুঝিতে হইবে, আত্মা ইহার মধ্যেই বর্তমান আছে] ॥ ২৩১ ॥ ২৫ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—অহল্লিকেতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ নামান্তরেণ সম্বোধনং কৃতবান্। যত্র যস্মিন্ কালে এতদ্ হৃদয়মাত্মা অন্য শরীরস্যান্যত্র কচিৎ দেশান্তরে অস্মত্তো বর্ত্তত ইতি মন্যাসৈ মন্যসে—যদ্ধি যদি হি এতৎ হৃদয়ম্ অন্যত্রাস্মৎ স্যাৎ ভবেৎ, শ্বানো বা এনৎ শরীরং তদা অদ্যুঃ, বয়াৎসি বা পক্ষিণো বা এনৎ বিমথ নীরন্ বিলোড়য়েয়ুঃ বিকর্ষেরন্নিতি; তস্মান্ময়ি শরীরে হৃদয়ং প্রতিষ্ঠিতমিত্যর্থঃ। শরীরস্যাপি নামরূপকর্মাত্মকত্বাদ হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিতত্বম্ ॥২৩১৷২৫৷

টীকা। হৃদয়পদেন নামাদ্যাধারবদহল্লিক-শব্দেনাপি হৃদয়াধিকরণং বিবক্ষ্যতে, বাক্য- চ্ছায়াসাম্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—নামান্তরেণেতি। অহনি লীয়ত ইতি বিগৃহ্য প্রেতবাচিনেতি শেষঃ। দেহে হৃদয়ং প্রতিষ্ঠিতমিতি ব্যুৎপাদয়তি—যত্রেত্যাদিনা। তস্মিন্ কালে শরীরং মৃতং স্যাদিতি শেষঃ। শরীরস্য হৃদয়াশ্রয়ত্বং বিশদয়তি—যদ্ধীত্যাদিনা। দেহাদন্যত্র হৃদয়স্তাব- স্থানে যথোক্তং দোষমিতিশব্দেন পরামৃণ্য ফলিতমাহ—ইতীত্যাদিনা। দেহস্তহি কুত্র প্রতিষ্ঠিত ইত্যত আহ—শরীরস্যেতি ॥২৩১॥২৫॥

ভাষ্যানুবাদ।—যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি শাকল্যকে অহল্লিক-নামে সম্বোধন করিয়া বলিলেন—তুমি যে, মনে করিতেছ—এই হৃদয়(আত্মা) আমাদের এই শরীরের বাহিরে যে কোন স্থানে বর্তমান থাকে;[কিন্তু তুমি নিশ্চয় জানিও,] এই হৃদয়- নামক আত্মা যদি এই শরীরের বাহিরেই থাকিত, তাহা হইলে, তৎক্ষণাৎ এই শরীরকে কুকুরে ভক্ষণ করিত, অথবা বায়সাদি পক্ষিগণ বিমথিত করিত(চঞ্চুদ্বারা ক্ষতবিক্ষত করিত); অতএব বুঝিতে হইবে যে, উক্ত হৃদয় মদীয় শরীরমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত আছে। এই শরীরও নাম-রূপাত্মক এবং কর্ম্মময়; সুতরাং তাহাও উক্ত হৃদয়নামক আত্মাতেই প্রতিষ্ঠিত আছে ॥২৩১৷৷২৫৷৷

কস্মিন্নু ত্বঞ্চাত্মা চ প্রতিষ্ঠিতৌ স্থ ইতি, প্রাণ ইতি, কস্মিন্ন প্রাণঃ প্রতিষ্ঠিত ইত্যপান ইতি, কস্মিন্ স্বপানঃ প্রতিষ্ঠিত ইতি, ব্যান ইতি, কস্মিন্ন ব্যানঃ প্রতিষ্ঠিত ইত্যদান ইতি, কস্মিন্ন দানঃ প্রতিষ্ঠিত ইতি, সমান ইতি, স এষ নেতি নেত্যাত্মাহগৃহ্যো নহি গৃহ্যতেহশীৰ্য্যো নহি শীৰ্য্যতেহসঙ্গো নহি সজ্যতেহসিতো ন

৯৪৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ব্যথতে ন রিষ্যতি, এতান্যষ্টাবায়তনান্যষ্টৌ লোকাঃ, অষ্টৌ দেবাঃ, অষ্টৌ পুরুষাঃ, স যস্তান্ পুরুষান্নিরুহ্য প্রত্যুহ্যাত্যক্রামৎ, তং ত্বোপনিষদং পুরুষং পৃচ্ছামি, তঞ্চেন্মে ন বিবক্ষ্যসি, মূর্দ্ধা তে বিপতিষ্যতীতি। তহহ ন মেনে শাকল্যস্তস্য হ মূর্দ্ধা বিপপা- তাপি হাস্য পরিমোষিণোহস্থীন্যপজহ্র রন্যন্মন্যমানাঃ ॥ ২৩২ ॥ ২৬॥

সরলার্থঃ।-[হৃদয়-শরীরয়োরেবম্ অন্যোন্যপ্রতিষ্ঠিতত্বৎ শ্রুত্বা তদ্বিশেষ- বুভূৎসয়া শাকল্যঃ পুনঃ প্রষ্টুমারভতে-“কস্মিন্ নু” ইত্যাদি।] নু(ভোঃ) ত্বং (ত্বৎপদবাচ্যং শরীরং) আত্মা(হৃদয়ং) চ কস্মিন্(কিন্নামকে অধিকরণে) প্রতিষ্ঠিতৌ স্থঃ(ভবথঃ)? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ-] প্রাণে(প্রাণবৃত্তৌ) ইতি। নু(ভোঃ) প্রাণঃ কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি;[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] অপানে(অপানবৃত্তৌ) ইতি। অপানঃ কস্মিন্ নু প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি; ব্যানে ইতি। ব্যানঃ কস্মিন্ নু প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি; উদানে ইতি। উদানঃ কস্মিন্ নু প্রতিষ্ঠিতঃ? ইতি; সমানে ইতি,(এতাঃ প্রাণাদিবৃত্তয়ঃ সাক্ষাৎ পরম্পরয়া বা এতস্মিন্ সমানে প্রতিষ্ঠিতা ইত্যর্থঃ)।

[ইদানীং সর্ব্বাশ্রয়ভূতং ব্রহ্ম নির্দ্দিষ্টমাহ-] স এষ নেতি নেতীতি। স এষ নেতি নেতীতি[কৃত্বা মধুকাণ্ডে উক্তো যঃ, সঃ] এষঃ আত্মা অগৃহ্যঃ (অগ্রাহ্যঃ-চক্ষুরাদীন্দ্রিয়াগোচরঃ);[কুতঃ?] হি(যতঃ) ন গৃহ্যতে(কেনচন ইন্দ্রিয়েন ন বিষয়ীক্রিয়তে); অশীৰ্য্যঃ(নিরবয়বত্বাদ অপরিচ্ছিন্নত্বাচ্চ বিশর- ণানহঃ);[অতঃ] নহি শীৰ্য্যতে; অসঙ্গঃ(বিকারকারণীভূত-সংযোগরহিতঃ); [অতঃ] নহি সজ্যতে(পদ্মপত্রবৎ নিঃসঙ্গ ইত্যর্থঃ); অসিতঃ[অবদ্ধঃ, ন সূক্ষ্মতাৎ নীতো বা);[অতঃ] নহি ব্যথতে[মূর্ত্তঃ সাবয়বো হি ব্যথতে, অয়ৎ তু তদ্বিপরীতত্বাৎ ন ব্যথতে ইতি ভাবঃ];[অতশ্চ] ন রিষ্যতি(ন হিংসাৎ প্রাপ্নোতি)।

এতানি(‘পৃথিব্যেব যস্যায়তনম্’ ইত্যেবমুক্তানি) অষ্টৌ আয়তনানি (আশ্রয়াঃ), অষ্টৌ লোকাঃ(অগ্নিলোকপ্রভৃতয়ঃ), অষ্টৌ দেবাঃ(‘অমৃতমিতি হোবাচ’ ইত্যাদয়ঃ), অষ্টৌ পুরুষাঃ(‘শারীরঃ’ ইত্যাদিয়ঃ); সঃ যঃ পুরুষঃ তান্ (আয়তনাদি-শব্দোক্তান্) পুরুষান্ নিরুহ্য(অষ্ট-চতুষ্কাদিভেদেন বিভজ্য), তথা প্রত্যুহ্য(প্রাচ্যাদিদিক্স্বরূপেণ স্বাত্মনি উপসংহৃত্য) অত্যক্রামৎ(উপাধিধর্মানতি- ক্রান্তঃ), তৎ ঔপনিষদং(উপনিষদ্বেদ্যং পুরুষং) মে(মহ্যৎ) ন বিবক্ষ্যসি

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

৯৪৭

(বিশেষেণ ন বক্তুমর্হসি, ত্বম্,)[তর্হি] তে(তব) মূর্দ্ধা(শিরঃ) বিপতিষ্যতি (বিস্পষ্টং পতিষ্যতি) ইতি। শাকল্যঃ তৎ(ঔপনিষদৎ পুরুষৎ) ন মেনে (ন বিজ্ঞাতবান্); তস্য(শাকল্যস্য) মূর্দ্ধা বিপপাত(শিরঃপাতো বভূব)। পরিমোষিণঃ(তস্করাঃ) তস্য(শাকল্যস্য) অস্থীনি অপি(সৎকারার্থং নীয়মানানি)—অন্যৎ(ধনাদিকং) মন্যমানাঃ(সম্ভাবয়ন্তঃ সন্তঃ) অপজহ্রুঃ (অপহৃতবস্তুঃ) হ।[আখ্যায়িকা তু এতদ্বিদ্যাপ্রশংসার্থং পরিকল্পিতেতি মন্তব্য- মিতি] ॥২৩২৷৷২৬৷৷

মূলানুবাদ:-[শাকল্য যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন- বল দেখি,] তুমি অর্থাৎ তোমার শরীর ও আত্মা(হৃদয়) কোথায় অব- স্থান করিতেছে?[শাকল্য বলিলেন-] প্রাণেতে। আচ্ছা, সেই প্রাণ কোথায় অবস্থিত? অপানেতে[অবস্থিত]; সেই অপান আবার কোথায় অবস্থিত আছে? ব্যানেতে; সেই ব্যানবায়ু কোথায় অবস্থিত? উদানবায়ুতে; উদান কোথায় প্রতিষ্ঠিত? সমান বায়ুতে।

[উক্ত প্রাণাদি সমস্ত জগৎ যাহাতে ওতপ্রোত রহিয়াছে,] এবং পূর্ব্বোক্ত মধুকাণ্ডে “নেতি নেতি” বলিয়া[যাহার উল্লেখ করা হইয়াছে;] সেই এই আত্মা অগৃহ্য—অগ্রাহ্য; অতএব কোন ইন্দ্রিয় দ্বারা তাহাকে গ্রহণ করা যায় না; অশীৰ্য্য(শীর্ণ হইবার অযোগ্য); এই কারণে, শীর্ণ হয় না; অসঙ্গ[নির্লেপ], এই জন্য কোথাও আসক্ত হয় না;[নিরবয়ব বলিয়া] অসিত(অ-বদ্ধ), এই হেতু কিছু দ্বারা ব্যথিত(আবদ্ধ) হয় না, এবং কোন প্রকারে হিংসিতও হয় না।

পূর্ব্বে যে, পৃথিব্যাদি আটপ্রকার আয়তন, অগ্নি প্রভৃতি আটপ্রকার লোক, অমৃত প্রভৃতি আটপ্রকার দেবতা, এবং শারীরাদি আটপ্রকার পুরুষকে বিভিন্নরূপে(পৃথকভাবে) বিভক্ত করিয়া এবং প্রাচ্যাদিদিগ- ভাবে আপনাতেই উপসংহৃত(একীভূত) করিয়া, সে সমুদয়কেও অতি- ক্রম করিয়াছেন, অর্থাৎ সে সমুদয়ের অতীত হইয়াছেন; আমি তোমার নিকট সেই ঔপনিষদ অর্থাৎ একমাত্র উপনিষদেই যাহার তত্ত্ব জানিতে পারা যায়, সেই পুরুষের তত্ত্ব জিজ্ঞাসা করিতেছি। তুমি যদি তাহা আমাকে বলিতে না পার, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তোমার মস্তক খসিয়া

৯৪৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

পড়িবে। শাকল্য সেই ঔপনিষদ পুরুষের তত্ত্ব জানিতেন না; সেই জন্য তাঁহার মস্তক খসিয়া পড়িল। তাহার পর, শিষ্যগণ অস্থিগুলি সৎকারের জন্য লইয়া যাইতেছিল; ‘আর কিছু লইয়া যাইতেছে’ মনে করিয়া তস্কর- গণ তাহাও অপহরণ করিল।[আলোচ্য বিদ্যার মহিমাখ্যাপনার্থ এইরূপ একটি আখ্যায়িকা রচিত হইয়াছে, মনে করিতে হইবে] ॥ ২৩২ ॥ ২৬॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—হৃদয়-শরীরয়োরেবমন্যোন্য প্রতিষ্ঠা উক্তা কার্য্য-কর- ণয়োঃ; অতত্ত্বাৎ পৃচ্ছামি—কস্মিন্ নু ত্বং চ শরীং, আত্মা চ তব হৃদয়ং প্রতিষ্ঠিতৌ স্থ ইতি; প্রাণইতি; দেহাত্মানৌ প্রাণে প্রতিষ্ঠিতৌ স্যাতাৎ প্রাণবৃত্তৌ; কস্মিন্ নু প্রাণঃ প্রতিষ্ঠিত ইতি, অপানইতি, সাপি প্রাণবৃত্তিঃ প্রাগেব প্রেয়াৎ, অপান- বৃত্ত্যা চেন্ন নিগৃহ্যেত। কস্মিন্ নু অপানঃ প্রতিষ্ঠিত ইতি; ব্যান ইতি,—সাপ্য- পানবৃত্তিরধ এব যায়াৎ, প্রাণবৃত্তিশ্চ প্রাগেব, মধ্যস্থয়া চেদ্ ব্যানবৃত্ত্যা ন নিগৃ- হেত। কস্মিন্ নু ব্যানঃ প্রতিষ্ঠিত ইতি, উদান ইতি—সর্ব্বাস্তিস্রোইপি বৃত্তয়- উদানে কীলস্থানীয়ে চেন্ন নিবদ্ধাঃ, বিষগেবেয়ুঃ। কস্মিন্ন উদানঃ প্রতিষ্ঠিত ইতি, সমান ইতি; সমানপ্রতিষ্ঠা হোতাঃ সর্ব্বা বৃত্তয়ঃ। এতদুক্তং ভবতি— শরীরহৃদয়-বায়বোহন্যোন্ন প্রতিষ্ঠাঃ সঙ্ঘ’তেন নিয়তা বর্তন্তে বিজ্ঞানময়ার্থপ্রযুক্তা ইতি। সর্ব্বমেতৎ যেন নিয়তম্, যস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতম্ আকাশান্তমোতঞ্চ প্রোতঞ্চ, তস্য নিরুপাধিকস্য সাক্ষাদপরোক্ষাদ্‌ ব্রহ্মণো নির্দেশঃ কর্তব্য ইত্যয়মারম্ভঃ। ১

টীকা।—বৃত্তমনুদ্য প্রশ্নান্তবমুপাদত্তে—হৃদয়েতি। প্রাণশব্দস্য সূত্রবিষয়ত্বং ব্যবচ্ছেতুং বৃত্তিবিশেষণম্। প্রাণস্যাপানে প্রতিষ্ঠিতত্বং ব্যতিরেকদ্বারা স্ফোরয়তি—সাপীতি। প্রাণা- পানয়োরুভয়োরপি ব্যানাধীনত্বং সাধয়তি—সাপ্যপানেতি। তিসৃণাং বৃত্তীনামুক্তানামুদানে নিবদ্ধত্বং দর্শয়তি—সর্ব্বা ইতি। বিঘ্নিতি নানাগতিত্বোক্তিঃ। কস্মিন্ নু হৃদয়মিত্যাদেঃ সমানান্তস্থ্য তাৎপর্য্যমাহ—এতদিতি। তেষাং প্রবর্ত্তকং দর্শয়তি—বিজ্ঞানময়েতি। স এষ ইত্যাদেস্তাৎপর্য্যমাহ—সর্ব্বমিতি। ১

স এষঃ-স যঃ “নেতি নেতি” ইতি নিদ্দিষ্টো মধুকাণ্ডে, এষ সঃ; সোহয়- মাত্মা অগৃহ্যঃ-ন গৃহ্যঃ; কথম্? যস্মাৎ সর্ব্বকার্য্যধৰ্মাতীতঃ, তস্মাদগৃহ্যঃ। কুতঃ; যস্মাৎ নহি গৃহ্যতে; যদি করণগোচরং ব্যাকৃতৎ বস্তু, তদ্‌গ্রহণ-গোচরম্, ইদন্ত তদ্বিপরীতমাত্মতত্ত্বম্। তথা অশীর্য্যঃ-যদি মূর্ত্তং সংহতৎ শরীরাদি, তৎ শীৰ্য্যতে; অয়ন্তু তদ্বিপরীতঃ; অতো নহি শীৰ্য্যতে। তথা অসঙ্গঃ-মূর্ত্তো মূর্ত্তান্তরেণ লম্বধ্যমানঃ সজ্যতে, অয়ঞ্চ তদ্বিপরীতঃ; অতো নহি সজ্যতে। তথা অসিতঃ অবদ্ধঃ-যদি মূর্ত্তং, তদ্‌ বধ্যতে; অয়ন্তু তদ্বিপরীতত্বাদসিতঃ; অবদ্ধত্বাৎ ন

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯৪১

ব্যথতে; অতো ন রিষ্যতি,-গ্রহণ-বিশরণ-সঙ্গ-বন্ধ-কার্য্যধর্মরহিতত্বান্ন রিষ্যতি- ন হিংসামাপদ্যতে ন বিনশ্যতীত্যর্থঃ। ২

যস্য কূটস্থদৃষ্টিমাত্রস্যান্তর্য্যামিত্বকল্পনাধিষ্ঠানস্যাজ্ঞানবশাৎ প্রশাসনে দ্বাবাপৃথিব্যাদি স্থিতং, স পরমাত্মৈব প্রত্যগাত্মৈবেতিপদয়োরর্থং বিবক্ষিত্বাহ-স এষ ইতি। নিষেধদ্বয়ং মূর্তামূর্ত্ত- ব্রাহ্মণে ব্যাখ্যাতমিত্যাহ-স যো নেতি। যো মধুকাণ্ডে: চতুর্থে নেতি নেতীতি নিষেধমুখেন নিদ্দিষ্টঃ, স এষ কুর্চ্চব্রাহ্মণে তন্মুখেনৈব বক্ষ্যত ইতি যোজনা। নিষেধদ্বারা নির্দিষ্টমেব স্পষ্টয়তি-সোহরমিতি। কায্যধৰ্ম্মাঃ শব্দাদয়োহশনায়াদয়শ্চ। শ্রুত্যুক্তং হেতুমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-কুত ইত্যাদিনা। তদ্বিপরীতত্বং করণগোচরত্বং, ন চক্ষুষেত্যাদিশ্রুতেঃ। তদ্বিপরীত- ত্বাদমূর্ত্তহাদিতি যাবৎ। পূর্বত্রাপ্যুভয়ত্র তদ্বৈপরীত্যমেতদেব। অতঃশব্দার্থং স্ফুটয়ন্নক্তমুপ- পাদয়তি-গ্রহেণেতি। কায্যধৰ্ম্মাঃ শব্দাদয়োহশনায়াদয়শ্চ প্রাগুক্তাঃ। ২

ক্রমমতিক্রম্য ঔপনিষদস্য পুরুষস্য আখ্যায়িকাতোহপসৃত্য শ্রুত্যা স্বেন রূপেণ ত্বরয়া নির্দেশঃ কৃতঃ; ততঃ পুনরাখ্যায়িকামেবাশ্রিত্যাহ-এতানি যানু- ক্তানি অষ্টাবায়তনানি-“পৃথিব্যেব যস্যায়তনম্” ইত্যেবমাদীনি, অষ্টৌ লোকা অগ্নিলোকাদয়ঃ, অষ্টৌ দেবাঃ “অমৃত’মিতি হোবাচ” ইত্যেবমাদয়ঃ, অষ্টৌ পুরুষাঃ “শারীরঃ পুরুষঃ” ইত্যাদয়ঃ-স যঃ কশ্চিৎ তান্ পুরুষান্ শারীরপ্রভৃতীন্ নিরুহ্য নিশ্চয়েনোহ্য গময়িত্বা অষ্টচতুষ্কভেদেন লোকস্থিতিমুপপাদ্য, পুনঃ প্রাচী-দিগাদি- দ্বারেণ প্রত্যুহ্য উপসংহৃত্য স্বাত্মনি হৃদয়ে অত্যক্রামৎ অতিক্রান্তবান্-উপাধিধৰ্ম্মং হৃদয়াদ্যাত্মত্বম্; স্বেনৈবাত্মনা ব্যবস্থিতো য ঔপনিষদঃ পুরুষোহশনায়াদিবজ্জিতঃ উপনিষৎস্বেব বিজ্ঞেয়ঃ নান্য প্রমাণগম্যঃ, তৎ ত্বা ত্বাং বিদ্যাভিমানিনং পুরুষং পৃচ্ছামি; তং চেৎ যদি, মেন বিবক্ষ্যসি বিস্পষ্টং ন কথয়িষ্যসি, মুদ্ধা তে বিপতি- ষ্যতীত্যাহ যাজ্ঞবল্ক্যঃ। তত্ত্বোপনিষদং পুরুষং শাকল্যঃ ন মেনে হ ন বিজ্ঞাতবান্ কিল। তস্য হ মূর্দ্ধা বিপপাত বিপপিতঃ। সমাপ্তাখ্যায়িকা; শ্রুতের্ব্বচনং-তৎ হন মেনে ইত্যাদি।৩

ননু শাকল্যযাজ্ঞবল্কায়োঃ সংবাদাত্মিকেয়মাখ্যায়িকা, তত্র কথং শাকল্যেণাপৃষ্টমাত্মানং যাজ্ঞবল্ক্যো ব্যাচষ্টে, তত্রাহ-ক্রমমিতি। বিজ্ঞানাদিবাক্যে বক্ষ্যমাণত্বাৎ কিমিত্যত্র নির্দেশ ইত্যাশঙ্ক্যাহ-ত্বরয়েতি। এতান্যষ্টাবিত্যাদিবাক্যস্য পূর্ব্বেণাসঙ্গতিমাশঙ্ক্যাহ-ততঃ পুনরিতি। নিশ্চয়েন গময়িত্বেত্যেতদেব স্পষ্টয়তি-অষ্টেতি। প্রত্যুহ্যোপসংহৃত্যেতি যাবৎ। ঔপনিষদত্বং পুরুষস্য ব্যুৎপাদয়তি-উপনিষৎস্বেবেতি। তৎ হেতাদি যাজ্ঞবল্ক্যস্য বা মধ্যস্থস্য বাক্যমিতি শঙ্কাং বারয়তি-সমাপ্তেতি। ৩

কিঞ্চ, অপি হাস্য পরিমোষিণঃ তস্করা অস্থীন্যপি সংস্কারার্থৎ শিষ্যৈর্নীয়- মানানি গৃহান্ প্রতি, অপজহ্রুঃ অপহৃতবন্তঃ। কিংনিমিত্তম্? অন্যৎ-ধনং

৯৫০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

নীয়মানং মন্যমানাঃ। পূর্ব্ববৃত্তা হ্যাখ্যায়িকেহ সূচিতা, অষ্টাধ্যায্যাৎ কিল শাক- ল্যেন যাজ্ঞবন্ধ্যস্য সমানান্ত এব সংবাদো নির্বৃত্তঃ; তত্র যাজ্ঞবন্ধ্যেন শাপো দত্তঃ— ‘পুরেহতিথ্যে মরিষ্যসি, ন তেহস্থীনি চন গৃহান্ প্রাপ্স্যন্তি’ ইতি, সহ তথৈব মমার। তস্য হাপ্যন্যন্মন্যমানাঃ পরিমোষিণোহস্থীন্যপজহ্রুঃ; “তস্মান্নোপবাদী স্যাদুত হ্যেবংবিৎপরো ভবতীতি”। সৈষাখ্যায়িকা আচারার্থং সূচিতা, বিদ্যাস্তুতয়ে চেহ ॥২৩২৷৷২৬৷৷

ব্রহ্মবিদ্বিদ্বেষে পরলোকবিরোধোহপি স্যাদিত্যাহ—কিংচেতি। মূর্দ্ধা তে বিপতিষ্যতীতি মূর্ধি পাতিতে শাপেন কিমিত্যাগ্নিহোত্রাগ্নিসংস্কারমপি শাকল্যো ন প্রাপ্তবানিত্যাশঙ্ক্যাহ— পূর্ব্ববৃত্তেতি। তামেবাখ্যায়িকামনুক্রামতি—অষ্টাধ্যায্যামিতি। অষ্টাধ্যায়ী বৃহদারণ্যকাৎ প্রাচীনা কর্মবিষয়া। পুরে পুণ্যক্ষেত্রাতিরিক্তে দেশে। অতিথ্যে পুণ্যতিথিশূন্যে কালে। অস্থীনি চনেত্যত্র চনশব্দোহপ্যর্থঃ। উপবাদী পরিভবকর্ত্তা। তচ্ছব্দার্থমাহ—উত হীতি। কিমিতীয়মাখ্যায়িকাহত্র বিদ্যাপ্রকরণে সূচিতেত্যাশঙ্ক্যাহ—সৈষেতি। ব্রহ্মবিদি বিনীতেন ভবিতব্যমিত্যাচারঃ। মহতী হীয়ং ব্রহ্মবিদ্যা, যত্তন্নিষ্ঠাবজ্ঞায়ামৈহিকামুষ্মিকবিরোধঃ স্যাদিতি বিদ্যাস্তুতিঃ ॥২৩২॥২৬॥

ভাষ্যানুবাদ।—কারণীভূত হৃদয় ও তৎকার্য্যস্বরূপ শরীর, এতদুভয়ের যথোক্তক্রমে আশ্রয়াশ্রয়িভাব কথিত হইয়াছে; অতএব আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি যে, তুমি অর্থাৎ তোমার এই শরীর এবং হৃদয় অর্থাৎ তোমার আত্মা কোথায় প্রতিষ্ঠিত আছে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] প্রাণেতে, অর্থাৎ দেহ ও আত্মা উভয়ই প্রাণে—প্রাণ-বৃত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আছে।[পুনঃ প্রশ্ন হইল যে,] সেই প্রাণ আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর—] অপানে; অভিপ্রায় এই যে, অপানবৃত্তি দ্বারা নিরুদ্ধ না থাকিলে ঐ প্রাণবৃত্তি অগ্রেই বহির্গত হইয়া পড়িত। [পুনঃ প্রশ্ন হইল—] সেই অপান আবার কোথায় প্রতিষ্ঠিত?[উত্তর হইল—] ব্যানে; ঐ অপানবৃত্তি নিশ্চয়ই নীচের দিকে সরিয়া পড়িত, এবং প্রাণবৃত্তিও উপরের দিকে বাহির হইয়া যাইত, যদি মধ্যবর্তী ব্যানবৃত্তি দ্বারা উভয়ে নিরুদ্ধ না থাকিত।[পুনঃ প্রশ্ন—] উক্ত ব্যানবায়ু আবার কোথায় অবস্থিত?[উত্তর—] উদানবৃত্তিতে; উক্ত তিনটি বৃত্তিই যদি কীলস্থানীয়(বন্ধনের খুঁটী স্বরূপ) উক্ত উদানবৃত্তি দ্বারা নিয়মিত না থাকিত, তাহা হইলে উহারা সকলেই চতুদ্দিকে ছড়িয়া পড়িত।[পুনঃ প্রশ্ন—] উক্ত উদানবৃত্তি আবার কোন্ স্থানে অবস্থান করে?[উত্তর—] সমানসংজ্ঞক প্রাণবৃত্তিতে; কেন না, উক্ত সমস্ত বৃত্তিগুলিই উক্ত সমাননামক প্রাণের মধ্যে বিদ্যমান রহিয়াছে, বুঝিতে হইবে। ইহাদ্বারা এই কথাই বলা হইতেছে যে, শরীর, হৃদয় ও প্রাণবায়ুসমূহ পরস্পরে আশ্রিত

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

১৫১

রহিয়াছে, এবং সম্মিলিতভাবে থাকিয়া বিজ্ঞানময় আত্মার প্রয়োজন সম্পাদন করিতেছে। আকাশপর্যন্ত এই সমস্ত পদার্থ যাহার দ্বারা নিয়মিত বা পরিচালিত এবং যাহার মধ্যে ওত-প্রোতভাবে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে, সর্ব্বোপাধিবিবর্জিত সেই সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষরূপী ব্রহ্মের স্বরূপ নির্দেশের জন্য পরবর্তী গ্রন্থের অবতারণা হইতেছে। ১

সেই ইনি-যিনি পূর্ব্বোক্ত মধুব্রাহ্মণে ‘নেতি নেতি’ বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়া- ছেন; তাহাই হইতেছেন-‘স এষ’ কথার অর্থ। সেই এই আত্মা অগৃহ্য গ্রহণ- যোগ্য নয়, যেহেতু তিনি কার্য্যধর্মের(উৎপত্তিশীল পদার্থের যাহা যাহা ধৰ্ম্ম- গুণক্রিয়াদি), সে সমুদয়ের অতীত; সেই হেতু অগৃহ্য; তাহাকে কখনও গ্রহণ করা যায় না; কেন না, যে পদার্থ চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত, তাহাই গ্রহণ- যোগ্য হয়, এই আত্মার স্বরূপটি সেরূপ নহে, কিন্তু তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত; কাজেই তাহা গ্রহণযোগ্য নহে। সেইরূপ, এই আত্মা অশীর্য্য-যাহা মূর্ত- অবয়বসমূহ দ্বারা বিরচিত-শরীরপ্রভৃতি, তাহাই শীর্ণতা প্রাপ্ত হয়; এই আত্মা যখন তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত, তখন কোন মতেই শীর্ণ হইতে পারে না। এইরূপ, তাহা অসঙ্গও বটে; কারণ, মূর্ত্তিমান্ বা আকারবিশিষ্ট পদার্থ ই অপর মূর্ত্ত পদার্থের সহিত সম্মিলিত হইয়া তাহার সহিত সংযুক্ত হয়, অর্থাৎ সম্মিলিত পদার্থের গুণে অনুরঞ্জিত হয়; এই আত্মা যখন তাহার বিপরীত-অমূর্ত্ত পদার্থ, তখন তাহার সঙ্গ হওয়া সম্ভব হয় না। পুনশ্চ এই আত্মা ‘অসিত’ অর্থাৎ আবদ্ধ নয়; কারণ, যাহার মূর্ত্তি বা আকৃতি আছে, তাহাই অপরের সহিত সম্বন্ধ প্রাপ্ত হয়; এই আত্মা যখন তাহার বিপরীতস্বভাব, তখন তাহা কখনও অপরের সহিত সম্বদ্ধ হয় না; সম্বদ্ধ হয় না বলিয়াই ব্যথিতও হয় না, এবং এই কারণেই হিংসিতও হয় না; অভিপ্রায় এই যে, আত্মা যেহেতু পূর্ব্বোক্ত গ্রহণ, বিশরণ, সঙ্গ ও বন্ধ প্রভৃতি কার্য্য-ধর্ম্মের অতীত, সেই হেতুই তাহা কোন প্রকারেও হিংসা প্রাপ্ত হয় না। ২

[এখানে আশঙ্কা হইতে পারে যে, শাকল্য ও যাজ্ঞবল্ক্যের কথোপকথ- কথনচ্ছলে এই আখ্যায়িকাটি আরব্ধ হইয়াছে। শাকল্য যাহা যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, যাজ্ঞবল্ক্য সে সমুদয়েরই উত্তর প্রদান করিতেছিলেন; সুতরাং এখনও, শাকল্যের জিজ্ঞাসিত বিষয়ের উত্তর প্রদান করাই যাজ্ঞ- বল্ক্যের উচিত; কিন্তু তাহা না করিয়া—আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে কথা বলেন কেন? ইহাতে ত আখ্যায়িকার ক্রম বা প্রণালী উল্লঙ্ঘন করা হইতেছে। তাহার

৯৫২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

উত্তরে ভাষ্যকার বলিতেছেন যে,] শ্রুতি আত্মতত্ত্ব নির্দেশে এতই ব্যগ্র হইয়া পড়িয়াছেন যে, মধ্যস্থলে সেই কথোপকথনের ক্রম লঙ্ঘন করিয়া- আখ্যায়িকাভাব পরিত্যাগ করিয়া নিজরূপেই আত্মস্বরূপ নির্দেশ করিয়াছেন; এখন আবার সেই আখ্যায়িকা অবলম্বন করিয়াই জিজ্ঞাসা করিতেছেন-এই যে সমস্ত কথা বলা হইয়াছে-‘পৃথিবীই যাহার আয়তন’ ইত্যাদি বাক্যে যে আটপ্রকার আয়তনের উল্লেখ করা হইয়াছে, অগ্নিপ্রভৃতি যে আটপ্রকার লোক ও ‘অমৃতম্-ইতি হোবাচ’ ইত্যাদি বাক্যে যে আটপ্রকার দেবতা এবং ‘শারীরঃ’ ইত্যাদি বাক্যে যে আটপ্রকার পুরুষের কথা বলা হইয়াছে; যিনি উক্ত শারীর প্রভৃতি পুরুষসমূহকে নিরুহ করিয়া-আটপ্রকার প্রভৃতি বিভাগক্রমে লোকরক্ষার উপযোগী বিস্তৃতভাবে পরিণত করিয়া, পুনর্ব্বার সে সমুদায়কে পূর্ব্বাদি দিগবিভাগানুসারে সঙ্কোচিত করিয়া অর্থাৎ আপনাতে উপ- সংহৃত করিয়া হৃদয়াদি-ভাবাত্মক ঔপাধিক সমস্ত ধৰ্ম্ম অতিক্রম করিয়াছেন; যিনি সর্ব্বদা আপনার অপ্রচ্যুতস্বরূপে অবস্থিত ও অশনায়াদি-সংসারধর্মের অতীত পুরুষ(আত্মা), এবং যিনি ঔপনিষদ অর্থাৎ একমাত্র উপনিষৎ-প্রমাণের সাহায্যেই যাহাকে জানিতে পারা যায়, যাহাকে জানিবার আর দ্বিতীয় কোন প্রমাণ নাই; হে শাকল্য, বিদ্যাভিমানী তোমাকে আমি সেই পুরুষের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি; যদি তুমি আমার জিজ্ঞাসিত সেই পুরুষের স্বরূপ পরিষ্কার- ভাবে বলিতে না পার, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তোমার মস্তক খসিয়া পড়িবে। যাজ্ঞবল্ক্য এইরূপ প্রশ্ন করিলে পর, শাকল্য তাহা বুঝিতে পারিলেন না; তাহার ফলে শাকল্যের মস্তক খসিয়া পড়িল। এখানেই আখ্যায়িকা সমাপ্ত হইল; “তং হ ন মেনে” ইত্যাদি বাক্যটি শ্রুতির উক্তি বুঝিতে হইবে। ৩

আর এক কথা, ইহার শিষ্যগণ যখন অগ্নিসংস্কারের জন্য ইহার অস্থিসমূহ গৃহে লইয়া যাইতেছিল, তখন পথিমধ্যে তস্করগণ—‘ইহা আর কিছু’ মনে করিয়া অর্থাৎ ‘ইহারা বোধ হয়, ধনরত্ন লইয়া যাইতেছে’ এইরূপ সম্ভাবনা করিয়া সেই অস্থিগুলিও অপহরণ করিল। শ্রুতি ইহা দ্বারা এখানে পূর্ব্বতন একটা আখ্যায়িকার কথা সূচনা করিয়াছিলেন; কারণ, অষ্টাধ্যায়ীনামক গ্রন্থে শাকল্য ও যাজ্ঞবল্ক্যের সম্বন্ধে ঠিক এইরূপই একটি আখ্যায়িকা উল্লিখিত আছে। সেখানে কথিত আছে যে, যাজ্ঞবল্ক্য এই বলিয়া শাকল্যের প্রতি শাপ প্রদান করিয়াছিলেন যে, ‘হে শাকল্য, তুমি অতিথ্যে মরিবে, অর্থাৎ কোনও পবিত্র স্থানে মরিবে না, এবং তোমার অস্থিগুলিও বাড়ী পৌঁছিবে না।’ তিনি সেইরূপেই মরিলেন, এবং

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

১৫৩

‘তস্করগণ ‘আর কিছু নীত হইতেছে’ মনে করিয়া তাহার অস্থিগুলিও অপহরণ করিল; অতএব কেহই উপবাদী হইবে না, অর্থাৎ পরকে পরিভব করিবার চেষ্টা করিবে না; পরন্তু এবংবিধ জ্ঞানীর অনুগত থাকিবে ইতি। ব্রহ্মবিদ্যার প্রশংসার্থ সেই পুরাতন আখ্যায়িকাটির এখানে পুনর্ব্বার অবতারণা করা হইয়াছে ॥২৩২৷৷২৬৷৷

আভাসভাষ্যম্।—যস্য নেতি নেতীত্যন্যপ্রতিষেধদ্বারেণ ব্রহ্মণো নির্দেশঃ কৃতঃ, তস্য বিধিমুখেন কথং নির্দেশঃ কর্তব্য ইতি পুনরাখ্যায়িকামেবা- শ্রিত্যাহ—মূলঞ্চ জগতো বক্তব্যমিতি। আখ্যায়িকাসম্বন্ধস্তু অব্রহ্মবিদো ব্রাহ্মণান্ জিত্বা গোধনং হর্ত্তব্যমিতি। ন্যায়ং মত্বাহ—

আভাসভাষ্য টীকা।—অথ হেত্যাদ্যুত্তরগ্রন্থমবতারয়তি—যস্তেত্যাদিনা। জগতো মূলং চ বক্তব্যমিত্যাখ্যায়িকামেবাশ্রিত্যাহেতি সম্বন্ধঃ। আখ্যায়িকা কিমর্থেত্যত আহ—আখ্যায়িকেতি। ইতিশব্দঃ সম্বন্ধসমাপ্ত্যর্থঃ। ননু ব্রাহ্মণেষু তূকীংভূতেষু প্রতিষেধ রভাবাদেগাধনং হর্ত্তব্যং, কিমিতি তান্ প্রতি যাজ্ঞবল্ক্যো বদতীত্যত আহ—ন্যায়ং মত্বেতি। ব্রহ্মস্বং হি ব্রাহ্মণানুমতিমনাপাদ্য নীয়মানমনর্থায় স্যাদিতি ন্যায়ঃ।

আভাসভাষ্যানুবাদ।—ইতঃ পূর্ব্বে “নেতি নেতি” করিয়া অপর সমস্ত পদার্থের ব্রহ্মত্ব প্রতিষেধ দ্বারা, যে ব্রহ্মের স্বরূপ নির্দেশ করা হইয়াছে, এখন বিধি- মুখে বা প্রত্যক্ষতঃ কিরূপে তাহার স্বরূপ নির্দেশ করা যাইতে পারে; এইজন্য, এবং জগতের মূল কারণ নির্দেশের জন্য পুনশ্চ একটি আখ্যায়িকা অবলম্বন করিয়া বক্তব্য নির্দেশ করিতেছেন। আখ্যায়িকার তাৎপর্য্য হইল এই যে, অব্রহ্মজ্ঞ ব্রাহ্মণগণকে পরাজিত করিয়া গোধন গ্রহণের ন্যায্যতা প্রদর্শন করা। এখন যাজ্ঞবল্ক্য শিষ্ট নিয়মের অনুসরণ করত জিজ্ঞাসা করিতেছেন—

অথ হোবাচ ব্রাহ্মণা ভগবন্তঃ যো বঃ কাময়তে স মা পৃচ্ছতু, সর্ব্বে বা মা পৃচ্ছত, যো বঃ কাময়তে তং বঃ পৃচ্ছামি, সর্ব্বান্ বা বঃ পৃচ্ছামীতি, তে হ ব্রাহ্মণা ন দধূষুঃ ॥ ২৩৩ ॥ ২৭ ॥

সরলার্থঃ।—অথ(অনন্তরং)[যাজ্ঞবল্ক্যঃ] উবাচ হ—ভোঃ ভগবন্তঃ (পূজনীয়াঃ) ব্রাহ্মণাঃ, বঃ(যুগ্মাকং মধ্যে) যঃ কাময়তে(ইচ্ছতি), সঃ মা (মাং) পৃচ্ছতু, বা(অথবা) সর্ব্বে(মিলিতাঃ সন্তঃ) মা(মাং) পৃচ্ছত(প্রশ্নং কুরুত);[তথা] বঃ(যুগ্মাকং মধ্যে) যঃ কাময়তে(মম প্রষ্টব্যতাম্ ইচ্ছতি), [অহৎ] বঃ(যুগ্মাকং মধ্যে) তৎ পৃচ্ছামি, বা(অথবা) বঃ(যুগ্মান্) সর্ব্বান্ (সম্মিলিতান্)[যুগপদেব] পৃচ্ছামি ইতি।[এতৎ শ্রুত্বা] তে(সভাস্থাঃ)

৯৫৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ব্রাহ্মণাঃ ন দধূযুঃ[প্রশ্নকরণে প্রশ্নগ্রহণে চ ন মনো দধুরিত্যর্থঃ),[তে পরাজয়ৎ স্বীকৃতবস্তু ইতি ভাবঃ] ॥২৩৩৷৷২৭৷৷

মুলাসুবাদ?—অতঃপর যাজ্ঞবল্ক্য সভাস্থ ব্রাহ্মণগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন—হে পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ, আপনাদের মধ্যে যিনি ইচ্ছা করেন, তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করুন, অথবা আপনারা সকলে মিলিত হইয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করুন; আর যদি আপনাদের মধ্যে কেহ ইচ্ছা করেন, তবে আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করি, অথবা আপনাদের সকলকে আমি জিজ্ঞাসা করি। একথা শুনিয়া সভাস্থ ব্রাহ্মণ- গণ প্রশ্ন করিতে বা প্রশ্ন লইতে আর সাহস করিলেন না ॥ ২৩৩॥২৭॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—অথ হোবাচ। অথ অনন্তরং তুষ্ণীৎভূতেষু ব্রাহ্মণেষু হ উবাচ—হে ব্রাহ্মণা ভগবন্ত ইত্যেবং সম্বোধ্য—যো বঃ যুগ্মাকং মধ্যে কাময়তে ইচ্ছতি—যাজ্ঞবল্ক্যং পৃচ্ছামীতি, স মা মাম্ আগত্য পৃচ্ছতু; সর্ব্বে বা যুয়ৎ মা মাং পৃচ্ছত। যো বঃ কাময়তে—যাজ্ঞবল্ক্যো মাং পৃচ্ছত্বিতি; তৎ বঃ পৃচ্ছামি; সর্ব্বান্ বা যুগ্মানহং পৃচ্ছামি। তে হ ব্রাহ্মণা ন দধূযুঃ, তে ব্রাহ্মণা এবমুক্তা অপি ন প্রগল্ভাঃ সংবৃত্তাঃ কিঞ্চিদপি প্রত্যুত্তরং বক্তুম্ ॥২৩৩৷৷২৭৷৷

টাকা।—সম্বোধ্যোবাচেতি সম্বন্ধঃ। যো ব ইতি প্রতীকমাদায় ব্যাচষ্টে—যুষ্মাকমিতি। ব্যাখ্যাতং ভাগমনুদ্য ব্যাখ্যেয়মাদায় ব্যাকরোতি—যো ব ইত্যাদিনা। যথোক্তপ্রশ্নানন্তরং ব্রাহ্মণানামপ্রতিভাং দর্শয়তি—তে হেতি ॥২৩৩॥২৭॥

ভাষ্যানুবাদ।—‘অথ হ উবাচ’ ইতি। অতঃপর—ব্রাহ্মণগণ তুষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলে পর, যাজ্ঞবল্ক্য সম্বোধনপূর্ব্বক বলিলেন—হে পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ, আপনাদের মধ্যে যে কেহ ইচ্ছা করেন—‘আমি যাজ্ঞবল্ক্যকে জিজ্ঞাসা করিব’ এইরূপ অভিলাষ করেন, তিনি আমার নিকট আসিয়া প্রশ্ন করুন; অথবা আপনারা সকলে মিলিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করুন। অথবা আপনাদের মধ্যে যিনি ইচ্ছা করেন যে,—‘যাজ্ঞবল্ক্য আমার নিকট প্রশ্ন করুক’, আমি আপনাদের তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, অথবা আপনাদের সকলের নিকটই আমি প্রশ্ন করিতেছি। ব্রাহ্মণগণকে এ কথা বলিলেও, তাঁহারা প্রত্যুত্তর দিবার জন্য কোন প্রকার প্রগল্ভতা প্রকাশ করিলেন না(চুপ করিয়া রহিলেন)॥ ২৩৩ ॥ ২৭ ॥

তানু হৈতঃ শ্লোকঃ পদ্যঞ্চ—

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৯৫০

যথা বৃক্ষো বনস্পতিস্তথৈব পুরুষোহমৃষা। তস্য লোমানি পর্ণানি ত্বগস্যোৎপাটিকা বহিঃ ॥২৩৪৷৷২৮৷৷(১)

সরলার্থঃ।—[ব্রাহ্মণেষু এবং তুষ্টভূতেষু সৎসু যাজ্ঞবল্ক্যঃ] এতৈঃ (বক্ষ্যমাণৈঃ) শ্লোকৈঃ তান্(সভাস্থান্) ব্রাহ্মণান্ পপ্রচ্ছ(পৃষ্টবান্)—

বনস্পতিঃ(মহত্ত্বাদিগুণসম্পন্নঃ) বৃক্ষঃ যথা(যাদৃশঃ), পুরুষঃ(জীবদেহঃ) [অপি] তথা এব(তাদৃশ-ধর্ম্মসম্পন্ন এব)—[ইত্যেতৎ] অমুষা(সত্যম্)। [পুরুষস্য বৃক্ষসাদৃশ্যং প্রকটয়তি—] তস্য(পুরুষস্য) লোমানি[সন্তি, বৃক্ষস্য চ] পর্ণানি(পত্রাণি—)[সন্তি], অন্য(পুরুষস্য) ত্বক্(চর্ম্ম)[অস্তি],[বৃক্ষস্য চ] বহিঃ(বহির্দেশে) উৎপাটিকা(নীরসা ত্বক্)[অস্তি] ইতি ॥২৩৪৷৷২৮৷৷(১)

মূলানুবাদ।—ব্রাহ্মণগণ নির্ব্বাক হইলে পর, যাজ্ঞবল্ক্য নিম্নলিখিত সাতটি শ্লোক দ্বারা প্রশ্ন করিয়াছিলেন—

বনস্পতি(মহান) বৃক্ষ যেরূপ, জীবদেহও ঠিক তদনুরূপ; পুরুষের লোমসমূহ বৃক্ষের পত্রস্থানীয়, এবং পুরুষের ত্বক্ বৃক্ষের বহিস্ত নীরস বল্কলের সমান ॥ ২৩৪ ॥ ২৮ ॥(১)

শাঙ্করভাষ্যম্।—তেষপ্রগল্ভভূতেষু ব্রাহ্মণেষু তান্ হ এতৈর্ব্বক্ষ্যমাণৈঃ শ্লোকৈঃ পপ্রচ্ছ পৃষ্টবান্—যথা লোকে বৃক্ষো বনস্পতিঃ; বৃক্ষস্য বিশেষণং বনস্পতিরিতি, তথৈব পুরুষোহমৃষা—অমৃষা সত্যমেতৎ। তস্য লোমানি— তস্য পুরুষস্য লোমানি; ইতরস্য বনস্পতেঃ পর্ণানি; ত্বগস্যোৎপাটিকা বহিঃ— ত্বক্ অন্য পুরুষস্য, ইতরস্যোৎপাটিকা বনস্পতেঃ ॥২৩৪৷৷২৮৷৷(১)

টীকা।—স্বকীয়জ্ঞানপ্রকর্ষপ্রকটনার্থমেব প্রশ্নান্তরমবতারয়তি—তেষিতি। বৃক্ষো বন- স্পতিরিতি পয্যায়ত্বাৎ পুনরুক্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ—বৃক্ষস্যেতি। তচ্চ তস্য মহত্ত্বমাহেত্যপুনরুক্তিঃ। পুরুষস্য বৃক্ষসাধর্ম্মামেতদিত্যুচ্যতে। সাধর্ম্ম্যমের স্পষ্টয়তি—তস্যেত্যাদিনা। নীরসা ত্বক্ উৎ- পাটিকেত্যুচ্যতে ॥২৩৪॥২৮॥(১)

ভাষ্যানুবাদ।—সভাস্থ ব্রাহ্মণগণ বাচালতা পরিত্যাগ করিয়া নির্ব্বাক্ হইলে পর, যাজ্ঞবল্ক্য পরবর্তী শ্লোকসমূহ দ্বারা প্রশ্ন করিয়াছিলেন—

জগতে বনস্পতি বৃক্ষ যেরূপ, পুরুষও(জীবদেহও) ঠিক তাহার অনুরূপ, এ কথা মিথ্যা নহে—সত্য। পুরুষের লোমসমূহ আর বৃক্ষের পত্রসমূহ সমান; পুরুষের চর্ম্ম আর বৃক্ষের উৎপাটিকা(বাহিরের নীরস বকল) সমান। এখানে ‘বনস্পতি’ শব্দটি বৃক্ষের বিশেষণ—মহত্ত্বাদি গুণবিশেষসূচক ॥২৩৪৷৷২৮৷৷(১)

৯৫৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ষট এবাখ্যং ক্বচিৎ প্রথমিষু ষট উৎপটঃ।

তস্মাৎপাদপদ্মং ত্যজেৎ রসে বৃক্ষাদিবাহুতাৎ ॥ ২৩৫ ॥২৯॥(২)

সরলার্থঃ।—[অন্যচ্চ,] অন্য পুরুষস্য ত্বচঃ(সকাশাৎ) এব রুধিরং প্রস্থ্যন্দি(রুধিরং ক্ষরতীত্যর্থঃ);[বৃক্ষস্য চ] ত্বচঃ(সকাশাৎ) উৎপটঃ (নির্যাসঃ)[ক্ষরতীতি শেষঃ]। তস্মাৎ(বৃক্ষপুরুষয়োঃ সাদৃশ্যাৎ হেতোঃ) আহতাৎ(আঘাতং প্রাপ্তাৎ) বৃক্ষাৎ রসঃ(নির্যাসঃ) ইব, আতৃগ্নাৎ(হিংসিতাৎ পুরুষাৎ) তৎ(রুধিরং) প্রৈতি(নির্গচ্ছতি) ॥২৩৪॥২৯৷৷(২)

মূলানুবাদ।—অপি চ, পুরুষের যেমন ত্বক্ হইতেই রুধির ক্ষরিত হয়, তেমনি বৃক্ষেরও ত্বক হইতেই রস নিঃসৃত হয়; বৃক্ষ ও পুরুষের মধ্যে এইরূপ সাদৃশ্য আছে বলিয়াই আহত বৃক্ষ হইতে যেরূপ রস বহির্গত হয়, আহত পুরুষ-দেহ হইতেও তদ্রূপ রুধির নির্গত হয় ॥ ২৩৫ ॥ ২৯ ॥(২)

শাঙ্করভাষ্যম্।—ত্বচ এব সকাশাদস্য রুধিরং প্রষ্যন্দি বনস্পতেঃ। ত্বচ উৎপটঃ—ত্বচ এবোৎস্ফুটতি যস্মাৎ; এবং সর্ব্বং সমানমেব বনস্পতেঃ পুরুষস্য চ; তস্মাৎ আতৃন্নাৎ হিংসিতাৎ প্রৈতি রুধিরং নির্গচ্ছ’ত বৃক্ষাদিবাহতাৎ ছিন্নাৎ রসঃ ॥২৩৫৷৷২৯৷৷(২)

শ্রীশ্রীদুর্গা সহায়।

ভাষ্যানুবাদ।—যেহেতু, এই পুরুষের যেমন ত্বক্ হইতেই রুধির নিঃসৃত হয়, তেমনি বনস্পতিরও ত্বক হইতেই উৎপন্ন অর্থাৎ নির্যাস(রস) নির্গত হয়। বনস্পতি ও পুরুষের এ সমস্তই সমান; সেই হেতু আহত—ছিন্ন বৃক্ষ হইতে রসের ন্যায়, হিংসিত পুরুষ হইতেও রুধির নির্গত হয় ॥২৩৫৷৷২৯৷(২)

মাংসান্যস্য শকরাণি কিনাটস্নাব তৎ স্থিরম্। অস্থীন্যন্তরতো দারুণি মজ্জা মজ্জোপমা কৃতা ॥ ২৩৬॥৩০ ॥(৩)

সরলার্থঃ।—তথা অস্য(পুরুষস্য) মাংসানি,[বৃক্ষস্য চ] শকরাণি (শকলানি—খণ্ডানি);[পুরুষস্য], স্নাব(স্নায়ুঃ),[বৃক্ষস্য চ] কিনাটং (শকলেভ্যোহপি অভ্যন্তরস্থং বক্কলং), তচ্চ স্থিরং(স্নাববৎ সুদৃঢ়ম্);[পুরুষস্য] অন্তরতঃ(স্নাবাভ্যন্তরে) অস্থীনি,[বৃক্ষস্য চ] দারূণি(কাষ্ঠানি)[সন্তি]; মজ্জা মজ্জোপমা কৃতা(বৃক্ষ-পুরুষয়োঃ মজ্জা তু অন্যোন্যসমানরূপা ইত্যর্থঃ)॥২৩৬৷৷৩০৷(৩)

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

೨೦೪

মূলানুবাদ?—পুরুষের দেহে মাংস আর বৃক্ষের শকরসমূহ (ত্বকের পরবর্তী অংশবিশেষ) সমান, পুরুষের স্নায়ু আর বৃক্ষের কিনাট(শকরের অভ্যন্তরস্থ অংশবিশেষ), উভয়ই বেশ দৃঢ়। পুরু- ষের যেমন কিনাটের পর অস্থিসমূহ, বৃক্ষেরও তেমনি বল্কলের পরে দারু বা কাষ্ঠভাগ সমান; আর মজ্জা অংশ উভয়েরই তুল্য রূপ ॥ ২৩৬ ॥ ৩০ ॥(৩)

শাঙ্করভাষ্যম্।—এবং মাংসান্যস্য পুরুষস্য, বনস্পতেঃ তানি শকরাণি শকলানীত্যর্থঃ। কিনাটম্ বৃক্ষস্য, কিনাটং নাম শকলেভ্যোহভ্যন্তরং বক্করূপং কাঠসংলগ্নম্, তৎ স্নাব পুরুষস্য; তৎ স্থিরম্, তচ্চ কিনাটং, স্নাববৎ দৃঢ়ৎ হি তৎ। অস্থীনি পুরুষস্য, স্নানোহন্তরতোহস্থীনি ভবন্তি, তথা কিনাটস্যাভ্যন্তরতঃ দারূণি কাষ্ঠানি, মজ্জা--মজ্জৈব বনস্পতেঃ পুরুষস্য চ মজ্জোপমা, মজ্জায়া উপমা মজ্জোপমা, নান্যো বিশেষোহস্তীত্যর্থঃ। যথা বনস্পতের্ম্মজ্জা, তথা পুরুষস্য, যথা পুরুষস্য তথা বনস্পতেঃ ॥২৩৬৷৷৩০৷(৩)

টীকা।—বিংশতিঃ শ্লোকঃ।—যশঃ। ১৩৬। ১০॥(১)

ভাষ্যানুবাদ।-এহরূপ, এই পুরুষের যেমন মাংস, তেমনি বনস্পতিরও শকর বা ভিতরের অংশগুলিই মাংসস্থানীয়। বৃক্ষের যাহা কিনাট, তাহা পুরুষের স্নায়ুস্থানীয়; বৃক্ষের কিনাট অর্থ-শকলেরও অভ্যন্তরবর্তী কাঠসংলগ্ন বল্কল; তাহাও স্নায়ুর ন্যায় দৃঢ়তর; এই জন্য স্নায়ু ও কিনাটের মধ্যে সাদৃশ্য কল্পিত হইয়াছে। পুরুষের যেমন অস্থি,-অস্থিসমূহ যেমন স্নায়ুর পরবর্তী হইয়া থাকে, তেমনি বৃক্ষেরও কিনাটের পরেই দারু-কাঠভাগ থাকে। তাহার পর মজ্জার কথা; পুরুষ ও বৃক্ষ উভয়ের মজ্জাই অনুরূপভাবাপন্ন। ‘মজ্জোপমা’ অর্থ -উভয়ের মজ্জাই এক রকম, কিছুমাত্র বিশেষ নাই; অর্থাৎ বনস্পতির মজ্জা যেরূপ, পুরুষের মজ্জাও ঠিক তদ্রূপ, আবার পুরুষের মজ্জা যেরূপ, বনস্পতির মজ্জাও ঠিক সেইরূপ ॥২৩৬৷৷৩৬৷(৩)

যদ্বৃক্ষো বৃক্‌ণো রোহতি মূলান্নবতরঃ পুনঃ। মর্ত্যঃ স্বিন্মৃত্যুনা বৃক্‌ণঃ কস্মান্মলাৎ প্ররোহতি ॥২৩৭৷৷৩১৷(৪)

সন্মলার্থঃ।—[ এবং যদি বৃক্ষ-পুরুষয়োঃ সাম্যমস্তি, তর্হি—] বৃকঃ(ছিন্নঃ) বৃক্ষঃ যৎ(যদি) নবতরঃ(অভিনবঃ সন্) মূলাৎ পুনঃ(ভূয়োহপি) প্ররোহতি (জায়তে)[তর্হি তৎসদৃশঃ] মর্ত্যঃ(মানবঃ—উপলক্ষণং চৈতৎ জঙ্গমানাম্)

১৫৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মৃত্যুনা বৃক্ণঃ(বিনাশিতঃ সন্) কস্মাৎ(কিংলক্ষণাৎ) মূলাৎ প্ররোহতি(পুনঃ জায়তে) স্বিৎ?[তৎ মূলং তু ন বিজ্ঞায়তে ইতি ভাবঃ। অভিপ্রায়জ্ঞাপনে স্বিৎপদম্] ॥২৩৭৷৷৩১৷(৪)

মূলানুবাদ:-[বৃক্ষ ও পুরুষের মধ্যে যখন এইরূপ সৌসাদৃশ্য রহিয়াছে, তখন-] বৃক্ষ যেমন ছিন্ন হইয়া মূল হইতে পুনর্ব্বার নূতন হইয়া জন্মলাভ করে, মর্ত্য অর্থাৎ মরণশীল মানব মৃত্যু- গ্রস্ত হইয়া বৃক্ষের ন্যায় কোন মূল হইতে পুনঃ প্রাদুর্ভূত হয়?[সেই মূলটি ত জ্ঞানগোচর হইতেছে না] ॥ ২৩৭ ॥ ৩১ ॥(৪)

শাঙ্করভাষ্যম্।—যদি বৃক্ষো বৃক্ণশিন্নঃ পুনঃ রোহতি পুনঃপুনঃ প্ররো- হতি প্রাদুর্ভবতি, মুলাৎ পুনঃ নবতরঃ পূর্ব্বস্মাদভিনবতরঃ। যদেতস্মাদ্বিশেষণাৎ প্রাক্ বনস্পতেঃ পুরুষস্য চ সর্ব্বং সামান্যমবগতম্, অয়ন্ত বনস্পতৌ বিশেষো দৃশ্যতে—যৎ ছিন্নস্য প্ররোহণম্, ন তু পুরুষে মৃত্যুনা বৃকণে পুনঃ প্ররোহণং দৃশ্যতে; ভবিতব্যঞ্চ কুতশ্চিৎ প্ররোহণেন। তস্মাদ্বঃ পৃচ্ছামি—মর্ত্যঃ মনুষ্যঃ স্বিৎ মৃত্যুনা বৃক্ণঃ কম্মাৎ মূলাৎ প্ররোহতি? মৃতস্য পুরুষস্য কুতঃ প্ররোহণ- মিত্যর্থঃ ॥২৩৭৷৷৩১৷৷(৪)

টীকা।—সাধর্ম্ম্যে সতি বৈধৰ্য্যং বক্তৃমশক্যমিত্যাশয়েনাহ—যদ্ যদীতি। ইদমপি সাধর্ম্ম্য- মেব কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—যদেতস্মাদিতি। এতস্মাদ্বিশেষণাৎ প্রাক্ যদ্বিশেষণমুক্তং, তৎ সর্ব্বমুভয়োঃ সামান্যমবগতমিতি সম্বন্ধঃ। বৃক্‌নস্যাঙ্গস্যেতি শেষঃ। মা ভূত্তস্য প্ররোহণমিতি চেন্নেত্যাহ—ভবিতব্যং চেতি। ‘ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ’ ইতি স্মৃতেরিত্যর্থঃ ॥২৩৭॥৩১॥(৪)

ভাষ্যানুবাদ।—বৃক্ষ যদি ছেদনের পর পুনর্ব্বার নবতর হইয়া—পূর্ব্বাপেক্ষা অভিনব হইয়া মূল হইতে বারংবার প্রাদুর্ভূত হয়, তবে এই মর্ত্য(প্রাণিগণ) মৃত্যুগ্রস্ত হইয়া কোন মূল হইতে পুনর্ব্বার প্রাদুর্ভূত হয়? অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির পুনর্জন্ম কোথা হইতে হয়?

অভিপ্রায় এই যে, ইতঃপূর্ব্বে বৃক্ষ ও পুরুষের মধ্যে সম্পূর্ণ সাম্য জানা গিয়াছে; কিন্তু বৃক্ষেতে এই একটা মাত্র বিশেষ বা পার্থক্য দেখা যাইতেছে যে, ছিন্ন বৃক্ষেরও পুনর্ব্বার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, কিন্তু পুরুষ মৃত্যুকর্তৃক কবলিত হইলে, তাহার আর প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হয় না; অথচ তাহারও কোন মূল হইতে প্রাদুর্ভাব হওয়া উচিত; অতএব তোমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেছি যে, মৃত্যুর পর কোথা হইতে পুনর্ব্বার প্রাদুর্ভূত হয়? ॥২৩৭৷৷৩১৷(৪)

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

১৫৯

রেতস ইতি মা বোচত জীবতস্তৎ প্রজায়তে। ধানারূহ ইব বৈ বৃক্ষোহঞ্জসা প্রেত্য সম্ভবঃ ॥ ২৩৮॥ ৩২॥(৫)

সক্সলার্থঃ।—[স্বয়মেব তদবধায়িতুং বিচার্য্যতে—‘রেতসঃ’ ইত্যাদিভিঃ।] রেতসঃ(শুক্রাৎ)[প্রজায়তে] ইতি মা বোচত(নৈবৎ বক্তুমর্হত);[যস্মাৎ] তৎ (রেতঃ) জীবতঃ[জীবনবিশিষ্টাৎ পুরুষাৎ) প্রজায়তে,(নতু মৃতাৎ)। কিঞ্চিৎ, বৃক্ষঃ ধানারূহঃ(বীজসম্ভূতঃ) ইব(অপি ভবতি, ন কেবলং কাণ্ডরূহ ইতি ভাবঃ) প্রেত্য(মৃত্বা—মরণানন্তরং) অঞ্জসা(প্রত্যক্ষত এব) সম্ভবঃ(সমুৎপন্নঃ)[ভবেৎ, নৈবং পুরুষস্য দৃশ্যতে ইত্যাশয়ঃ] ॥২৩৮৷৷৩২৷৷(৫)

মূলানুবাদ:-যদি বল, শুক্র হইতে[প্রাদুর্ভূত হয়] না, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, জীবিত ব্যক্তি হইতেই শুক্রের উৎপত্তি হয়, মৃত ব্যক্তি হইতে হয় না। বিশেষতঃ বীজসম্ভূত বৃক্ষ ধ্বংসের পরও যথাযথরূপে প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, বৃক্ষ যে কেবল বীজ হইতেই হয়, তাহা নহে, কাণ্ডদেশ হইতেও হইয়া থাকে; সুতরাং কেবল শুক্রকেই পুরুষোৎপত্তির কারণ বলিতে পারা যায় না ॥ ২৩৮ ॥ ৩২ ॥(৫)

শাঙ্করভাষ্যম্।—যদি চেদেবং বদথ—রেতসঃ প্ররোহতীতি মা বোচত মৈবং বক্তুমর্হত; কস্মাৎ? যস্মাজ্জীবতঃ পুরুষাৎ তদ্রেতঃ প্রজায়তে, ন মৃতাৎ। অপি চ, ধানারূহঃ—ধানা বীজং, বীজরূহোহপি বৃক্ষো ভবতি, ন কেবলং কাণ্ডরূহ এব। ইবশব্দোহনর্থকঃ; বৈ বৃক্ষোহঞ্জসা সাক্ষাৎ প্রেত্য মৃত্যু সম্ভবঃ; ধানাতোহপি প্রেত্য সম্ভবো ভবেৎ অঞ্জসা পুনর্বনস্পতেঃ ॥২৩৮৷৷৩২৷(৫)

টীকা।—জীবতো হি রেতো জায়তে, স এব কুতো ভবতীতি বিচার্য্যতে। ন চাসিদ্ধে- নাসিদ্ধস্য সাধনং, ন চ পুরুষান্তরাদিতি বাচ্যমেকাসিদ্ধাবন্যতরপ্রয়োগানুপপত্তেরিতি মম্বানো হেতুমাহ—যস্মাদিতি। বৈধর্ম্যান্তরমাহ—অপি চেতি। কাণ্ডরূহোঽপীত্যপেরর্থঃ। বৈশব্দঃ প্রসিদ্ধিদ্যোতক ইত্যভিপ্রেত্যাহ—বৈ বৃক্ষ ইতি। অঞ্জসেত্যাদেরর্থমুক্তা বাক্যার্থমাহ— ধানাতোহপীতি ॥২৩৮॥৩২॥(৫)

ভাষ্যানুবাদ।-তোমরা যদি এইরূপ বল যে, শুক্র হইতে সমুৎপন্ন হয়; না, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, শুক্র জীবিত পুরুষ হইতেই সম্ভূত হয়, কিন্তু মৃত পুরুষ হইতে হয় না। আর এক কথা,-ধানা অর্থ-বীজ;[বৃক্ষ বীজ হইতে হয় বলিয়া ‘ধানারূহ’-পদবাচ্য]; বৃক্ষ যে, কেবল কাণ্ডদেশ হইতেই

১৬০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

জন্মে, তাহা নহে—বীজ হইতেও জন্মে। শ্রুতির ‘ইব’ শব্দটির কোন অর্থ নাই। বৃক্ষ মরিয়া যে, ধানা হইতেও পুনঃ প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে, ইহা প্রত্যক্ষ সিদ্ধ,(কিন্তু পুরুষের প্রাদুর্ভাব সেরূপ প্রত্যক্ষসিদ্ধ নহে) ॥২৩৮৷৷৩২৷৷(৫)

যৎ সমূলমাধুর্ব্বং ন পুনরাভবেৎ।

মর্ত্তঃ সিন্ধুভূনা বৃকণঃ কস্মান্মূলাৎ প্ররোহতি ॥ ২৩৯ ॥ ৩৩ ॥(৬)

সরলার্থঃ।—বৃক্ষং যৎ(যদি) সমুলং(মুলেন সহ) আবহেয়ুঃ(সম্যক্ ছিন্দেয়ুঃ),[তহি সঃ] পুনঃ ন আভবেৎ(ন উৎপদ্যতে);[তস্মাৎ বঃ পৃচ্ছামি—] মর্ত্যঃ মৃত্যুনা বৃক্‌ণঃ সন্ কস্মাৎ মূলাৎ প্ররোহতি স্বিৎ? ॥২৩৯৷৷৩৩৷(৬)

মূলানুবাদ?—কেহ যদি বৃক্ষকে সমূলে ছেদন করিয়া ফেলে, তাহা হইলে তাহা আর পুনর্ব্বার প্রাদুর্ভূত হয় না;[অতএব জিজ্ঞাসা করি—] মর্ত্য ব্যক্তি মৃত্যু-কর্তৃক বিনাশিত হইয়া কোন্ মূল কারণ হইতে পুনর্ব্বার প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে ॥ ২৩৯ ॥ ৩৩ ॥(৬)

শাঙ্করভাষ্যম্।—যৎ যদি, সহ মূলেন ধানয়া বা আবহেয়ুঃ উদ্‌দ্বচ্ছে- য়ুরুৎপাটয়েয়ুঃ বৃক্ষম্, ন পুনরাভবেৎ পুনরাগত্য ন ভবেৎ। তস্মাদ্বঃ পৃচ্ছামি, সর্ব্বস্যৈব জগতো মূলং—মর্ত্যঃ স্বিন্মৃত্যুনা বৃক্ণঃ কস্মাৎ মূলাৎ প্ররো- হতি? ॥২৩৯৷৷৩৩৷(৬)

টীকা।—তথাপি কথং বৈধর্ম্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ—যদ্যদীতি। পুরুষস্যাপি পুনরুৎপত্তিঃ মাভূদিত্যাশঙ্ক্য পূর্ব্বোক্তং নিগময়তি—তস্মাদিতি ॥২ ৩৯।৩৩॥(৬)

ভাষ্যানুবাদ?—বৃক্ষকে যদি মূলের সহিত কিংবা বীজের সঙ্গে সম্পূর্ণ- রূপে উৎপাটিত করিয়া ফেলে, তাহা হইলে সেই বৃক্ষ আর পুনর্ব্বার আসিয়া স্থিতিলাভ করে না; অতএব তোমাদিগকে সর্ব্ব জগতের মুলীভূত কারণ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিতেছি যে, মর্ত্য ব্যক্তি মৃত্যুগ্রস্ত হইয়া কোন্ মূল কারণ হইতে পুনঃ প্রাদুর্ভূত হয়? ॥২৩৯৷৷৩৩৷(৬)

জাত এবং ন জায়তে কো যেনং জনয়েৎ পুনঃ।

বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম রাতির্দ্দাতুঃ পরায়ণম্।

তিষ্ঠানস্য তদ্বিদ ইতি ॥ ২৪০ ॥ ৩৪ ॥(৭)

সত্ত্বলার্থঃ।—[যদি মন্যসে—অয়ং মর্ত্যঃ] জাত এব(নিত্যং পরিনিষ্পন্ন এব),[অতঃ] ন জায়তে(ন উৎপদ্যতে),[তস্মাৎ তদ্বিষয়ে প্রশ্ন এব নোপ- পদ্যতে ইতি; মৈবম্, যতঃ পুনরপি জায়তে এবায়ম্];[তস্মাৎ পৃচ্ছামি—] নু

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯৬১

(ভোঃ) কঃ এনং(মর্ত্যং) পুনঃ জনয়েৎ?[অথবা, অয়ং মর্ত্যঃ জাত এব নিত্যৎ নিষ্পন্ন এব; অতঃ ন জায়তে; অতএব চ কঃ নু এনং(মর্ত্যং) পুনঃ জনয়েৎ?— ন কোহপি—ইত্যাক্ষেপঃ।]

[ইদানীং শ্রুতিরেব জগতো মূলং উপদিশন্ত্যাহ-] বিজ্ঞানৎ আনন্দৎ (আভ্যাৎ বিশেষণাভ্যাং বৃত্তিজ্ঞান-বিষয়সুখয়োর্ব্যাবৃত্তিঃ,) রাতিঃ(রাতেঃ- ধনস্য, ষষ্ঠ্যর্থ প্রথমা,) দাতুঃ(ধনদাতুঃ কর্ম্মিণঃ), তিষ্ঠমানস্য(অকর্ম্মিণঃ) তদ্বিদঃ(ব্রহ্মবিদশ্চ) পরায়ণং(পরমাশ্রয়ভূতং) ব্রহ্ম,(ঈদৃশং ব্রহ্মৈব তৎ মূলমিতি ভাবঃ) ইতি ॥২৪০॥৩৪॥(৭)

ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে নবমং ব্রাহ্মণম্ ॥ ৩ ॥ ৯ ॥ ইতি তৃতীয়াধ্যায়-ব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥ ৩ ॥

মূলানুবাদ।—[যদি মনে কর,] মর্ত্য নিত্যই জাত; সুতরাং পুনরায় আর জন্মে না।[না, সে কথাও বলিতে পার না; কেন না, মর্ত্য নিশ্চয়ই জন্মিয়া থাকে; অতএব জিজ্ঞাসা করি;] কে ইহাকে উৎপাদন করে?[অথবা, যদি মনে কর, মর্ত্য নিত্যই জাত; সুতরাং জন্মে না; কাজেই ইহাকে আবার জন্মাইবে কে?]

[ অতঃপর শ্রুতি নিজেই জগতের মূল কারণ নির্দেশ করিয়া বলিতে- ছেন—] জ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ, এবং ধনদাতা কর্মীর ও ব্রহ্মনিষ্ঠ জ্ঞানীর পরমাশ্রয়ভূত ব্রহ্মই[মূল কারণ] ॥ ২৪০ ॥ ৩৪ ॥(৭)

ইতি তৃতীয়াধ্যায়ে নবম ব্রাহ্মণের মূলানুবাদ ॥ ৩ ॥ ৯ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—জাত এবেতি মন্যধ্বং যদি, কিমত্র প্রষ্টব্যমিতি; জনিষ্যতো হি সম্ভবঃ প্রষ্টব্যঃ, ন জাতস্য; অয়ং তু জাত এব, অতোহস্মিন্ বিষয়ে প্রশ্ন এব নোপপদ্যত ইতি চেৎ; ন; কিন্তুহি? মৃতঃ পুনরপি জায়ত এব, অন্যথা অকৃতাভ্যাগম-কৃতনাশপ্রসঙ্গাৎ; অতো বঃ পৃচ্ছামি—কো নু এনং মৃতৎ পুনর্জ্জনয়েৎ? তন্ন বিজজ্ঞুব্রাহ্মণাঃ—যতো মৃতঃ পুনঃ প্ররোহতি, জগতো মূলৎ ন বিজ্ঞাতং ব্রাহ্মণৈঃ। অতো ব্রহ্মিষ্ঠত্বাৎ হৃতা গাবো যাজ্ঞবল্ক্যেন, জিতা ব্রাহ্মণাঃ। সমাপ্তাখ্যায়িকা। ১

টীকা।—স্বভাববাদমুখাপয়তি—জাত ইতি। ইতিশব্দশ্চোদ্যসমাপ্ত্যর্থঃ। তদেব স্ফুটয়তি— জনিষ্যমানস্তু হীতি। ন জায়ত ইতি ভাগেনোত্তরমাহ—নেত্যাদিনা। স্বভাববাদে দোষ- মাহ—অন্যখেতি। স্বভাবাসম্ভবে ফলিতমাহ—অত ইতি। উক্তমেব স্ফুটয়তি—জগত ইতি।

৯৬২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ব্রহ্মবিদাং শ্রেষ্ঠত্বে যাজ্ঞবন্ধ্যস্থ্য সিদ্ধে ফলিতমাহ—অত ইতি। সমাপ্তাখ্যায়িকেতি। ব্রাহ্মণশ্চ সর্ব্বে যথাযথং জন্মুরিত্যর্থঃ। ১

যজ্জগতো মূলং, যেন চ শব্দেন সাক্ষ্যাদ্ব্যপদিশ্যতে ব্রহ্ম, যৎ যাজ্ঞবন্ধ্যো ব্রাহ্ম- ণান্ পৃষ্টবান্, তৎ স্বেন রূপেণ শ্রুতিরস্মভ্যমাহ-বিজ্ঞানং বিজ্ঞপ্তিঃ, বিজ্ঞানং তচ্চা- নন্দং, ন বিষয়বিজ্ঞানবদ্দুঃখানুবিদ্ধম্, কিন্তর্হি? প্রসন্নং-শিবমতুলমনায়াসং নিত্য- তৃপ্তমেকরসমিত্যর্থঃ। কিং তদ্ ব্রহ্ম উভয়বিশেষণবৎ, রাতিঃ-রাতেঃ ষষ্ঠ্যর্থে প্রথমা, ধনস্যেত্যর্থঃ; ধনস্য দাতুঃ কৰ্ম্মকৃতো যজমানস্য, পরময়নং পরা গতিঃ, কৰ্ম্ম- ফলস্য প্রদাতৃত্বাৎ। কিঞ্চ, ব্যুখায়ৈষণাভ্যস্তস্মিন্নেব ব্রহ্মণি তিষ্ঠত্যকৰ্ম্মকৃৎ, তদ্‌ব্রহ্ম বেত্তীতি তদ্বিচ্চ তস্য তিষ্ঠমানস্য চ তদ্বিদো ব্রহ্মবিদ ইত্যর্থঃ, পরায়ণমিতি।২

বিজ্ঞানাদিবাক্যমুখাপয়তি-যজ্জগত ইত্যাদিনা। বিজ্ঞানশব্দস্য করণাদিবিষয়ত্বং বারয়তি -বিজ্ঞপ্তিরিতি। আনন্দবিশেষণস্থ্য কৃত্যং দর্শয়তি-নেত্যাদিনা। প্রসন্নং দুঃখহেতুনা কাম- ক্রোধাদিনা সম্বন্ধরহিতম্। শিবং কামাদিকারণেনাজ্ঞানেনাপি সম্বন্ধশূন্যম্। সাতিশয়ত্ব- প্রযুক্তদুঃখরাহিত্যমাহ-অতুলমিতি। সাধনসাধ্যত্বাধীনদুঃখবৈধুর্য্যমাহ-অনায়াসমিতি। দুঃখ- নিবৃত্তিমাত্রং সুখমিতি পক্ষং প্রতিক্ষিপতি-নিত্যতৃপ্তমিতি। আনন্দো জ্ঞানমিতি ব্রহ্মণ্যা- কারভেদমাশঙ্ক্যাহ-একরসমিতি। ফলমত উপপত্তেরিতি ন্যায়েন ব্রহ্মণো জগন্মূলত্বমাহ- রাতিরিত্যাদিনা। ‘ব্রহ্মসংস্থোহমৃতত্বমেতি’ ইতি শ্রুত্যন্তরমাশ্রিত্য তস্যৈব মুক্তোপসুপ্যত্বমুপ- দিশতি-কিংচেতি। অক্ষরব্যাখ্যানসমাপ্তাবিতি শব্দঃ। ২

অত্রেদং বিচার্য্যতে—আনন্দশব্দো লোকে সুখবাচী প্রসিদ্ধঃ; অত্র চ ব্রহ্মণো বিশেষণত্বেন আনন্দশব্দঃ ক্রয়তে—আনন্দৎ ব্রহ্মেতি। শ্রুত্যন্তরে চ—“আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ” “আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান্”, “যদেব আকাশ আনন্দো ন স্যাৎ।” “যো বৈ ভূমা তৎ সুথম্” ইতি চ; “এযোহস্য পরম আনন্দঃ” ইত্যেবমাদ্যাঃ, সংবেদ্যে চ সুখে আনন্দশব্দঃ প্রসিদ্ধঃ; ব্রহ্মানন্দশ্চ যদি সংবেদ্যঃ স্যাৎ, যুক্তা এতে ব্রহ্মণ্যানন্দশব্দাঃ।৩

সচ্চিদানন্দাত্মকং ব্রহ্ম বিদ্যাবিদ্যাভ্যাং বন্ধমোক্ষাস্পদমিত্যুক্তমিদানীং ব্রহ্মানন্দে বিচার- মবতারয়ন্নবিগীতমর্থমাহ—অত্রেতি। তথাপি প্রকৃতে বাক্যে কিমায়াতমিতি, তদাহ—অত্র চেতি। ন চ কেবলমত্রৈবানন্দশব্দো ব্রহ্মবিশেষণার্থকত্বেন শ্রুতঃ, কিন্তু তৈত্তিরীয়কাদাব- পীত্যাহ—শ্রুভ্যন্তরে চেতি। ব্রহ্মণো বিশেষণত্বেনানন্দশব্দঃ শ্রয়ত ইতি সম্বন্ধঃ। অন্যাঃ শ্রুতীরেবোদাহরতি—আনন্দ ইত্যাদিনা। এবমাদ্যাঃ শ্রুতয় ইতি শেষঃ। তথাপি কথং বিচারসিদ্ধিস্তত্রাহ—সংবেদ্য ইতি। লোকপ্রসিদ্ধেরদ্বৈতশ্রুতেশ্চ ব্রহ্মণ্যানন্দঃ সংবেদ্যোহসং- বেদ্যো বেতি বিচারঃ কর্তব্য ইত্যর্থঃ। উভয়ত্র ফলং দর্শয়তি—ব্রহ্মানন্দশ্চেতি। অন্যথা লোকবেদয়োঃ শব্দার্থভেদাদবিশিষ্টস্ত বাক্যার্থ ইতি ন্যায়রিবোধঃ, অসংবেদ্যত্বে পুনরদ্বৈতশ্রুতি- রবিরুদ্ধেতি ভাবঃ। ৩

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

১৯৬৭

ননু চ শ্রুতিপ্রামাণ্যাৎ সংবেদ্যানন্দস্বরূপমেব ব্রহ্ম, কিং তত্র বিচার্য্যম্? ইতি; ন, বিরুদ্ধশ্রুতিবাক্যদর্শনাৎ। সত্যম্, আনন্দশব্দো ব্রহ্মণি শ্রয়তে, বিজ্ঞান- প্রতিষেধশ্চৈকত্বে-“যত্র ত্বস্য সর্ব্বমাত্মৈবাভূত্তৎ কেন কং পশ্যেৎ তৎ কেন কং বিজানীয়াৎ”, “যত্র নান্যৎ পশ্যতি নান্যৎ শূণোতি নান্যদ্বিজানাতি স ভূষা” “প্রাজ্ঞেনাত্মনা সম্পরিঘক্তো ন বাহ্যং কিঞ্চন বেদ” ইত্যাদিবিরুদ্ধশ্রুতিবাক্য- দর্শনাৎ; তেন কর্তব্যো বিচারঃ। তস্মাদযুক্তং বেদবাক্যার্থনির্ণয়ায় বিচারয়ি- তুম্। -মোক্ষবাদিবিপ্রতিপত্তেশ্চ; সাঙ্খ্যা বৈশেষিকাশ্চ মোক্ষবাদিনঃ-নাস্তি মোক্ষে সুখং সংবেদ্যমিত্যেবং বিপ্রতিপন্নাঃ; অন্যে-নিরতিশয়সুখং স্বসংবেদ্য- মিতি।৪

বিচারমাক্ষিপতি—নন্বিতি। বিরুদ্ধশ্রুত্যর্থনির্ণয়ার্থং বিচারকর্তব্যতাং দর্শয়তি—নেতি। সংগ্রহবাক্যং বিবৃণোতি—সত্যমিত্যাদিনা। একত্বে সতি বিজ্ঞানপ্রতিষেধশ্রুতিমেবোদাহরতি —যত্রেত্যাদিনা। ইত্যাদি শ্রবণমিতি শেষঃ। ফলিতমাহ—বিরুদ্ধশ্রুতীতি। শ্রুতিবিপ্রতি- পত্তের্বিচারকর্তব্যতামুপসংহরতি—তস্মাদিতি। তত্রৈব হেত্বন্তরমাহ—মোক্ষেতি। তামেব বিপ্রতিপত্তিংশ বিবৃণোতি—সাংখ্যা ইতি। ৪

কিং তাবদ্যুক্তম্? আনন্দাদিশ্রবণাং “জক্ষৎ ক্রীড়ন্ রমমাণঃ”, “স যদি পিতৃ- লোককামো ভবতি” “স সর্বজ্ঞঃ সর্ব্ববিৎ”, “সর্ব্বান্ কামান্ সমশ্নুতে” ইত্যাদি- শ্রুতিভ্যো মোক্ষে সুখং সংবেদ্যমিতি। নম্বেকত্বে কারকবিভাগাভাবাদ বিজ্ঞানা- নুপপত্তিঃ; ক্রিয়ায়াশ্চানেককারকসাধ্যত্বাৎ, বিজ্ঞানস্য চ ক্রিয়াত্বাৎ। নৈষ দোষঃ, শব্দপ্রামাণ্যাৎ ভবেদ্বিজ্ঞানমানন্দবিষয়ে; ‘বিজ্ঞানমানন্দম্’ ইত্যাদীন্যানন্দস্বরূপ- স্যাসংবেদ্যত্বেহমুপপন্নানি বচনানীত্যবোচাম। ৫

বিমর্শপূর্ব্বকং পূর্বপক্ষং গৃহাতি-কিং তাবদিত্যাদিনা। আনন্দাদিশ্রবণাদ্বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্মেতি শ্রুতের্মোক্ষে সুখং সংবেদ্যমিতি যুক্তমিতি সম্বন্ধঃ। তত্রৈব বাক্যান্তরাণুদাহরতি- জক্ষদিত্যাদিনা। পূর্ব্বপক্ষমাক্ষিপতি-নন্বিতি। মোক্ষে চেদিষ্যতে সুখজ্ঞানং, তর্হি তদনেক- কারকসাধ্যং বাচ্যং, ক্রিয়াত্বাৎ পাকাদিবৎ, সর্ব্বৈকত্বে চ মোক্ষে কারকবিভাগাভাবান্ন সুখ- সংবেদনং সম্ভবতীত্যর্থঃ। জন্যস্য কারকাপেক্ষায়ামপি সুখজ্ঞানস্যাজন্যত্বান্ন তদপেক্ষেত্যাশঙ্ক্যাহ -ক্রিয়ায়াশ্চেতি। যা ক্রিয়া সাহনেককারকসাধ্যেতি ব্যাপ্তের্গমনাদাববগতত্বাজজ্ঞানস্যাপি ধাত্বর্থত্বেন ক্রিয়াত্বাদনেককারকসাধ্যতা সিদ্ধৈবেত্যর্থঃ। শ্রুতিপ্রামাণ্যমাশ্রিত্য পূর্ব্ববাদী পরিহরতি-নৈষ দোষ ইতি। তদেব স্ফুটয়তি-বিজ্ঞানমিতি। ৫

ননু বচনেনাপ্যগ্নেঃ শৈত্যম্, উদকস্য চৌষ্ণ্যৎ ন ক্রিয়ত এব, জ্ঞাপকত্বাদ্বচনা- নাম্। ন চ দেশান্তরেহগ্নিঃ শীতঃ ইতি শক্যত এব জ্ঞাপয়িতুম্, অগম্যে বা দেশান্তর উষ্ণমুদকমিতি। ন; প্রত্যগাত্মন্যানন্দবিজ্ঞানদর্শনাৎ, ন ‘বিজ্ঞানমান-

৯৬৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

নম্ ইত্যেবমাদীনং বচনানাং ‘শীতোহগ্নিঃ’ ইত্যাদিবাক্যবৎ প্রত্যক্ষাদিবিরুদ্ধার্থ- প্রতিপাদকত্বম্। ৬

অদ্বয়ে ব্রহ্মণি শ্রুতিপ্রামাণ্যাদানন্দজ্ঞানমুক্তমাক্ষিপতি-নন্বিতি। অদ্বৈতশ্রুতিবিরোধাৎ ব্রহ্মণি বিজ্ঞানক্রিয়াকারকবিভাগাপেক্ষা নোপপদ্যতে। নহি বিজ্ঞানমানন্দমিত্যাদিবচনানি মানান্তরবিরোধেন বিজ্ঞানক্রিয়াং ব্রহ্মণুৎপাদয়ন্তি, তেষাং জ্ঞাপকত্বাৎ, জ্ঞাপকস্য চাবিরোধা- পেক্ষত্বাৎ, অন্যথাহতিপ্রসঙ্গাদিত্যর্থঃ। লৌকিকজ্ঞানস্য ক্রিয়াত্বেহপি মোক্ষসুখজ্ঞানং ক্রিয়ৈব ন ভবতি; তন্ন, বিজ্ঞানাদিবাক্যস্যাদ্বৈতশ্রুতিবিরোধোহস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। পয়ঃ- পাবকয়োঃ সর্ব্বত্রৈকরূপ্যবদ্বিজ্ঞানস্যাপি লোকবেদয়োরেকরূপত্বমেবেতি ভাবঃ। মানান্তর- বিরোধাদাত্মন্যানন্দজ্ঞানস্য সত্ত্বমের বা নিষিদ্ধ্যতে, তস্য ক্রিয়াত্বং বা নিরাক্রিয়তে? তত্রান্তং দূষয়তি-নেত্যাদিনা। তদেব স্পষ্টয়তি-ন বিজ্ঞানমিতি। ৬

অনুভূয়তে ত্ববিরুদ্ধার্থতা,—সুখ্যহমিতি সুখাত্মকমাত্মানং স্বয়মেব বেদয়তে; তস্মাৎ সুতরাং প্রত্যক্ষাবিরুদ্ধার্থতা; তস্মাদানন্দৎ ব্রহ্ম বিজ্ঞানাত্মকং সং স্বয়মেব বেদয়তে। তথা আনন্দপ্রতিপাদিকাঃ শ্রুতয়ঃ সমঞ্জসাঃ স্যুঃ—“জক্ষৎ ক্রীড়ন্ রমমাণঃ” ইত্যেবমাদ্যাঃ পূর্ব্বোক্তাঃ ।৭

সুখজ্ঞানস্য গুণত্বাঙ্গীকারাৎ ক্রিয়াত্বনিরাকরণমিষ্টমেবেতি মত্বাহ-অনুভূয়তে ত্বিতি। অনু- ভবমেবাভিনয়তি-সুখ্যহমিতি। তথাপি শ্রুতিবিরোধঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্য প্রত্যক্ষানুসারেণ সাপি নেতব্যেত্যাশয়েনাহ-তস্মাদিতি। আত্মন্যানন্দজ্ঞানস্য ক্রিয়াত्वानঙ্গীকারাৎ কারকভেদাপেক্ষা- ভাবাদিত্যর্থঃ। গুণত্বপক্ষে চ প্রত্যক্ষস্যানুগুণত্বাদাগমস্য বিরোধিনস্তদনুসারেণ নেয়ত্বা- দবিরুদ্ধাগমস্য ভূয়স্বাদিত্যতিশয়ঃ। অবিরুদ্ধার্থতা বিজ্ঞানাদিশ্রুতেরিতি শেষঃ। গুণগুণি- ভাবেহপি নান্বৈতশ্রুতিঃ শক্যা নেতুমিত্যাশঙ্ক্য স্ববেদ্যত্বপক্ষমাশ্রিত্যাহ-তস্মাদানন্দমিতি। যথাকথঞ্চিদ ব্রহ্মণ্যানন্দস্য বেদ্যত্বে শ্রুতীনামানুগুণ্যমস্তীত্যাহ-তথেতি। ৭

ন, কার্য্যকরণাভাবেহমুপপত্তের্বিজ্ঞানস্য। শরীরবিয়োগো হি মোক্ষ আত্য- ন্তিকঃ; শরীরাভাবে চ করণানুপপত্তিরাশ্রয়াভাবাৎ; ততশ্চ বিজ্ঞানানুপপত্তি- রকার্য্যকরণত্বাৎ। দেহাদ্যভাবে চ বিজ্ঞানোৎপত্তৌ সর্বেষাং কার্য্যকরণোপাদানান- র্থক্যপ্রসঙ্গঃ। একত্ববিরোধাচ্চ—পরঞ্চেৎ ব্রহ্ম আনন্দাত্মকম্, আত্মানং নিত্য- বিজ্ঞানত্বান্নিত্যমেব বিজানীয়াৎ; তন্ন; সংসার্য্যপি সংসারবিনির্মুক্তঃ স্বাভাব্যৎ প্রতিপদ্যেত; জলাশয় ইবোদকাঞ্জলিঃ ক্ষিপ্তো ন পৃথক্তেন ব্যবতিষ্ঠতে, আনন্দা- ত্মকব্রহ্মবিজ্ঞানায়; তদা মুক্ত আনন্দাত্মকমাত্মানং বেদয়ত ইত্যেতদনর্থকং বাক্যম্। ৮

আনন্দো বেদ্যো ব্রহ্মণীতি চোদিতে সিদ্ধান্তমাহ—নেতি। আগন্তুকমনাগন্তুকং বা জ্ঞানং মুক্তাবানন্দং গোচরয়তি? নাদ্য ইত্যাহ—কার্য্যেতি। অনুপপত্তিমেব ক্ষোরয়তি—শরীরেতি। কার্য্যকরণরোরভাবেহপি মোক্ষে ব্রহ্মানন্দজ্ঞানং জনিষ্যতে, সংসারে হি হেতৃপেক্ষেত্যাশঙ্ক্যাহ—

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯৬৫

দেহাদীতি। দ্বিতীয়ং দূষয়তি—একত্বেতি। ন হি ব্রহ্মস্বরূপজ্ঞানেনৈব বেদ্যানন্দরূপং ভবিতুমুৎসহতে, বিষয়বিবরিণোরেকত্ববিরোধাৎ, ততশ্চানাগন্তকমপি জ্ঞানং মুক্তৌ নানন্দমধি- করোতীত্যর্থঃ।

কিঞ্চ, ব্রহ্ম বা মুক্তো বা সংসারী বা ব্রহ্মানন্দং গোচরয়েৎ? তত্রান্তমনুবদতি-পরং চেদিতি। তস্মিন্পক্ষে ন ব্রহ্ম স্বরূপানন্দং বেত্তি তেনৈক্যাৎ, একত্র বিষয়বিষয়িত্বানুপপত্তেরুক্তত্বা- দিতি দুষয়তি-তন্নেতি। নাপি সংসারী ব্রহ্মানন্দং গোচরয়তি, স খল্বনিবৃত্তে সংসারে সংসারিণমাত্মানমভিমন্যমানো ন ব্রহ্মানন্দমাকলয়িতুমলং, সংসারে নিবৃত্তে তু ততো বিনির্মুক্তো ব্রহ্মস্বাভাব্যং প্রতিপদ্যমানস্তদানন্দং তদ্বদেব বিষয়ীকর্ত্তুং নার্হতীতি তৃতীয়ং প্রত্যাহ-সংসার্য্য- পীতি। মুক্তোহপি ব্রহ্মণোহভিন্নো ভিন্নো বেতি বিকল্প্যাভেদপক্ষমনুভাষতে-জলেতি। ব্রহ্মাভিন্নস্য মুক্তস্য তদানন্দবিষয়ীকরণমুক্তন্যায়েন নিরস্যতি-তদেতি। ৮

অথ ব্রহ্মানন্দম্ অন্যঃ সন্ মুক্তো বেদয়তে, প্রত্যগাত্মানং চ—‘অহমম্ম্যানন্দ- স্বরূপঃ’ ইতি, তদৈকত্ববিরোধঃ; তথা চ সতি সর্ব্বশ্রুতিবিরোধঃ। তৃতীয়া চ কল্পনা নোপপদ্যতে। কিঞ্চান্যৎ—ব্রহ্মণশ্চ নিরন্তরাত্মানন্দবিজ্ঞানে বিজ্ঞানা- বিজ্ঞানকল্পনানর্থক্যম্; নিরন্তরং চেৎ আত্মানন্দবিষয়ং ব্রহ্মণো বিজ্ঞানম্, তদেব তস্য স্বভাব ইতি আত্মানন্দং বিজানাতীতি কল্পনা অনুপপন্না; অতদ্বিজ্ঞানপ্রসঙ্গে হি কল্পনায়া অর্থবত্ত্বম্, যথা আত্মানং পরঞ্চ বেত্তীতি। ন হি ইঘাদ্যাসক্তমনসো নৈরন্তর্য্যেণ ইষু-জ্ঞানাজ্ঞানকল্পনায়া অর্থবত্ত্বম্।৯

ভেদপক্ষমনুবদতি-অথেতি। ব্রহ্মানন্দং প্রত্যগাত্মানমিতি সম্বন্ধঃ। বেদনপ্রকার- মভিনয়তি-অহমিতি। তত্ত্বমস্যাদিশ্রুতিবিরোধেন নিরাকরোতি-তদেতি। মুক্তো ব্রহ্মণঃ সকাশান্তিন্নোহভিন্নো বা মা ভূৎ, ভিন্নাভিন্নস্ত স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-তৃতীয়েতি। সর্বত্র ভেদাভেদ- বাদস্য দূষিতত্বাদিত্যর্থঃ। ব্রহ্মণঃ স্বানন্দস্যাবেদ্যত্বে হেত্বন্তরমাহ-কিংচান্যদিতি। তদেবোপ- পাদয়তি-নিরন্তরং চেদিতি। আখ্যাতপ্রয়োগস্থ্য তর্হি কুত্রার্থবত্ত্ব, তত্রাহ-অতদ্বিজ্ঞানেতি। দেবদত্তো হি বুদ্ধিপূর্ব্বকারিত্বাবস্থায়াং স্বাত্মানমন্যং চ বিবিচ্য জানাতি, নান্যদেত্যুভয়খাত্ব- দর্শনাত্তত্রাখ্যাতপ্রয়োগো যুজ্যতে, নৈবং ব্রহ্মণ্যজ্ঞানপ্রসঙ্গোহস্তি, নিত্যাজ্ঞানস্বভাবত্বাৎ, তথা চ তত্রাখ্যাতপ্রয়োগো নার্থবানিত্যর্থঃ। ব্রহ্মণ্যাখ্যাতপ্রয়োগানর্থক্যং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি- ন হীতি।৯

অথ বিচ্ছিন্নমাত্মানন্দং বিজানাতীতি-বিজ্ঞানস্যাত্মবিজ্ঞানচ্ছিদ্রে অন্যবিষয়ত্ব- প্রসঙ্গে আত্মনশ্চ বিক্রিয়াবত্ত্বম্; ততশ্চানিত্যত্বপ্রসঙ্গঃ। তস্মাদ্বিজ্ঞানমানন্দমিতি স্বরূপাম্বাখ্যানপরৈব শ্রুতির্নাত্মানন্দসংবেদ্যত্বার্থা। “জক্ষৎ ক্রীড়ন্” ইত্যাদিশ্রুতি- বিরোধোহসংবেদ্যত্ব ইতি চেৎ; ন; সর্ব্বাত্মৈকত্বে যথাপ্রাপ্তানুবাদিত্বাৎ-মুক্তস্য সর্ব্বাত্মভাবে সতি যত্র কচিৎ যোগিষু দেবেষু বা জক্ষণাদি প্রাপ্তম্, তদ্ যথা- প্রাপ্তমেবানুদ্যতে-তত্তস্যৈব সর্ব্বাত্মভাবাদিতি সর্ব্বাত্মভাব-মোক্ষন্ততরে।১০

৯৬৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রত্যগাত্মনি নিত্যজ্ঞানত্বাসিদ্ধিং শঙ্কয়তি-অথেতি। বিচ্ছিন্নমিতি ক্রিয়াবিশেষণম্। পরিহরতি-বিজ্ঞানস্যেতি। আত্মনো বিজ্ঞানস্য ছিদ্রমন্তরালমসত্ত্বাবস্থা, তদাহপি বিজ্ঞান- মস্তি চেৎ, তস্যান্যবিষয়ত্ব প্রসঙ্গঃ, তথা চ ‘যত্রান্যৎপশ্যতি’ ইত্যাদিশ্রুতেরাত্মনো মর্ত্যত্বাপত্তিঃ; ন চেত্তদা বিজ্ঞানং, তদা পাষাণবদচেতনত্বং, বিজ্ঞপ্তিরূপত্বানঙ্গীকারাদিত্যর্থঃ। আত্মনো- হনিত্যজ্ঞানবত্বে দোষান্তরমাহ-আত্মনশ্চেতি। আনন্দজ্ঞানে ব্রহ্মণি বিষয়বিষয়িত্বাযোগশ্চেৎ কথং বিজ্ঞানাদিবাক্যমিত্যাশঙ্ক্যোপসংহরতি-তস্মাদিতি। ব্রহ্মণ্যানন্দস্যাবেদ্যত্বে শ্রুতি- বিরোধমুক্তং স্মারয়তি-জক্ষদিতি। সর্বত্রাত্মনো মুক্তস্যৈক্যে সতি যোগ্যাদিযু যথা জক্ষণাদি প্রাপ্তং, তথৈব তদনুবাদিত্বাদস্যাঃ শ্রুতেন বিরোধোহস্তীতি পরিহরতি-নেত্যাদিনা। তদেব প্রপঞ্চয়তি-মুক্তস্যেতি। কিমনুবাদে ফলমিতি চেত্তদাহ-তত্তস্যেতি। মুক্তস্য যোগ্যাদিযু সর্বত্রাত্মভাবাদেব তত্র প্রাপ্তং জক্ষণাদ্যত্র মুক্তিস্তুতয়েহনুদ্যতে, তন্নানুবাদবৈয়র্থমিত্যর্থঃ। ১০

যথাপ্রাপ্তানুবাদিত্বে দুঃখিত্বমপীতি চেৎ,-যোগ্যাদিযু যথাপ্রাপ্ত-জক্ষণাদিবৎ স্থাবরাদিযু যথাপ্রাপ্তদুঃখিত্বমপীতি চেৎ; ন, নামরূপকৃতকার্য্যকরণোপাধিসম্পর্ক- জনিত-ভ্রান্ত্যধ্যারোপিতত্বাৎ সুখিত্ব-দুঃখিত্বাদিবিশেষস্যেতি পরিহৃতমেতৎ সর্ব্বম্। বিরুদ্ধশ্রুতীনাঞ্চ বিষয়মবোচাম। তস্মাৎ “এযোহস্য পরম আনন্দঃ” ইতিবৎ সর্ব্বাণ্যানন্দবাক্যানি দ্রষ্টব্যানি ॥২৪০৷৩৪৷(৭)

ইতি তৃতীয়াধ্যায়স্য নবমং ব্রাহ্মণম্ ॥৩৷৷৯৷৷ শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদ- শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ বৃহদারণ্যকভাষ্যে তৃতীয়োহধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥

বিদুষঃ সার্ব্বাত্ম্যেন যোগ্যাদিষু প্রাপ্তজক্ষণাদ্যনুবাদে স্যাদতি প্রসক্তিরিতি শঙ্কতে-যথা- প্রাপ্তেতি। অতিপ্রসঙ্গমের প্রকটয়তি-যোগ্যাদিধিতি। অবিদ্যাত্মকনামরূপবিরচিতো!- পাধিদ্বয়সম্বন্ধনিবন্ধনমিথ্যাজ্ঞানাধীনত্বাদাত্মনি দুঃখিত্বাদিপ্রতীতেঃ ন তত্র বস্তুতো দুঃখিত্বং, ন চ জক্ষণাদ্যপি বাস্তবমাবিদ্যস্যৈব মুক্তিস্তুতয়েহনুবাদাৎ, দুঃখিত্বস্য হি নানুবাদোহতিহীনত্বপ্রাপ্তে- রিতি পরিহরতি-নেত্যাদিনা। যৎ তু বিরুদ্ধশ্রুতিদৃষ্টেনাগমার্থো নির্ণীতো ভবতীতি, তত্রাহ -বিরুদ্ধেতি। বেদ্যত্বাবেদ্যত্বাদিশ্রুতীনাং সোপাধিকনিরুপাধিকবিষয়ত্বেন মধুকাণ্ডে ব্যবস্থোক্তেত্যর্থঃ। ব্রাহ্মণার্থমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ব্রহ্মণ্যানন্দস্য বেদ্যতায়া দুর্নিরূপত্বং তচ্ছব্দার্থঃ। যথৈবোহস্যেত্যত্র ভেদো ন বিবক্ষিতঃ, সর্ব্বাত্মভাবস্য প্রকৃতত্বাত্তখা বিজ্ঞানাদি- বাক্যেযানন্দস্য বেদ্যতা ন বিবক্ষিতা। উত্তরীত্যা তদ্বেদ্যতায়া দুষ্প্রতিপাদত্বাৎ, তস্মাদতি- শয়ানন্দং চিদেকতানং বস্তু সিদ্ধমিত্যর্থঃ। ২৪০। ৩৪।(৭)

ইতি বৃন্দাবনে শ্রীনিবাসদেবায়ং পূজয়েৎ নবমঃ প্রদীপঃ। ৫। ৯।

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

৯৬৭

ভাষ্যানুবাদ।—যদি মনে কর যে, মর্ত্য ত স্বভাবতই জাত; সুতরাং তৎসম্বন্ধে আর জিজ্ঞাস্য কি আছে?—যাহা জন্মিবে, তাহারই জন্ম বিষয়ে প্রশ্ন করা যাইতে পারে, কিন্তু জাত পদার্থের সম্বন্ধে নহে; এই আত্মা যখন চিরদিনই উৎপন্ন রহিয়াছে,(আর পুনরুৎপন্ন হইবে না,) তখন এবিষয়ে ত প্রশ্নই সঙ্গত হয় না; না, একথা বলিতে পার না; কারণ, মৃত্যুর পরও নিশ্চয়ই জন্ম হইয়া থাকে; তাহা না হইলে কৃতনাশ ও অকৃতাভ্যাগম নামক দুইটা দোষ ঘটিতে পারে(১)। অতএব তোমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেছি—মৃত্যুর পরে এই মর্ত্যকে পুনর্ব্বার কে জন্মায়? সভাস্থ ব্রাহ্মণগণ তাহা বুঝিতে পারিলেন না, অর্থাৎ মৃত্যুর পর যাহা হইতে পুনরায় জন্ম লাভ হয়, সেই মূল কারণ নিরূপণ করিতে পারিলেন না; অতএব ব্রহ্মিষ্ঠত্ব নিবন্ধন যাজ্ঞবল্ক্যের নিকট সকলে পরাজিত হইলেন; তিনি গোধন লইয়া গেলেন। এখানেই আখ্যায়িকা সমাপ্ত হইল। ১।

অতঃপর—যাহা জগতের মূল কারণ, সাক্ষাৎ সম্বন্ধে শব্দ দ্বারা ব্রহ্মের যেরূপ নির্দেশ হইয়া থাকে এবং স্বয়ং যাজ্ঞবল্ক্যও ব্রাহ্মণগণকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়া- ছিলেন; স্বয়ং শ্রুতিই তাহা আমাদিগকে বলিয়া দিতেছেন—‘বিজ্ঞানং’—বিশিষ্ট জ্ঞানস্বরূপ, তাহাই আবার আনন্দ স্বরূপও বটে, কিন্তু উহা বিষয়জ জ্ঞানের ন্যায় দুঃখমিশ্রিত নহে; তবে কি না, উহা শিব(কল্যাণময়), অনুপম—সর্ব্ববিধ ক্লেশসম্পর্ক-বজ্জিত, নিত্যতৃপ্ত ও একরস(একস্বভাব)। উক্ত উভয়বিধ বিশেষণ- বিশিষ্ট ব্রহ্ম কি প্রকার?—ধনদাতার—কর্মানুষ্ঠাতা যজমানের পরায়ণ—পরম আশ্রয় অর্থাৎ কর্মফলপ্রদাতা। অপিচ, যাহারা লোকৈষণা, বিত্তৈষণা ও পুত্রৈষণা, এই ত্রিবিধ কামনা হইতে সম্পূর্ণ বিরত হইয়া সেই ব্রহ্মেতেই স্থিতি লাভ করেন; অকর্মী(জ্ঞানী) এবং ব্রহ্মবিৎ—যিনি সেই ব্রহ্মতত্ত্ব সম্যক্ অবগত হন, তাঁহাদেরও পরমাশ্রয়স্বরূপ। ২

(১) তাৎপর্য্য—কৃতনাশ অর্থ—যে সমস্ত কর্ম্ম করা হয়, সে সমস্ত কর্ম্মের নিষ্ফলতা, আর অকৃতাভ্যাগম অর্থ—যেরূপ কর্ম্ম করা হয় নাই, সেরূপ কর্ম্মের ফলভোগ করা। অভিপ্রায় এই যে, মর্ত্য পুরুষ যদি মৃত্যুর পর, পুনরায় জন্ম লাভ না করে, প্রত্যেক জন্মই যদি অভিনব— স্বভাবজাত হয়, তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, কোন জীবই স্বকৃত কর্ম্মের ফলভোগ করে না এবং সেরূপ ভোগের সম্ভাবনাও থাকে না; সুতরাং স্বকৃত কর্ম্মগুলি নষ্ট—বিফল হইয়া যায়, আর প্রত্যেকের পক্ষেই অকৃত—যাহা নিজে করে নাই, এরূপ ফলের ভোগ সম্ভাবিত হয়। তাহার ফলে জগতের দৃশ্যমান বৈচিত্র্য রক্ষা পাইতে পারে না ইত্যাদি।

৯৬৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অতঃপর, এ বিষয়ে এইরূপ আলোচনা করা যাইতেছে—জগতে ‘আনন্দ’ শব্দ সুখবাচক বলিয়া প্রসিদ্ধ; অথচ এখানে “আনন্দং ব্রহ্ম” এইবাক্যে আনন্দ- শব্দটি ব্রহ্মের বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে; এবং অন্যান্য শ্রুতিতেও ব্রহ্ম- বিশেষণরূপে ‘আনন্দ’ শব্দের উল্লেখ রহিয়াছে দেখা যায়; যথা—‘ব্রহ্মকে আনন্দ- স্বরূপ বলিয়া জানিয়াছিলেন,’ ‘আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মকে জানিলে’, ‘এই আকাশ (ব্রহ্ম) যদি আনন্দস্বরূপ না হইত,’ ‘যাহা ভূমা(পরম মহৎ ব্রহ্ম), তাহাই সুখস্বরূপ’, ‘এই পরমাত্মাই পরম আনন্দস্বরূপ’ ইত্যাদি। ‘আনন্দ’ শব্দ সাধারণতঃ অনুভবযোগ্য সুখেই প্রসিদ্ধ; অতএব ব্রহ্মানন্দও যদি অনুভব- যোগ্য হয়, তাহা হইলেই ব্রহ্মবিষয়ে প্রযুক্ত উক্ত ‘আনন্দ’ শব্দ যুক্তিযুক্ত হয়, (নচেৎ সঙ্গত হয় না)। ৩

ভাল কথা, স্বয়ং শ্রুতি যখন ব্রহ্মকে আনন্দস্বরূপ বলিতেছেন, তখন ব্রহ্মও অনুভবযোগ্য আনন্দস্বরূপই হউক; ইহাতে আর বিচার্য্য বিষয় কি আছে? না-একথাও বলিতে পারা যায় না; কেন না, এ বিষয়ে বিরুদ্ধ শ্রুতিবাক্যও পরিলক্ষিত হইতেছে। হাঁ সত্য বটে, ব্রহ্মবিষয়ে যেমন আনন্দশব্দের প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়, তেমনি ব্রহ্মৈকত্বপক্ষে বিজ্ঞানেরও(অনুভবেরও) প্রতিষেধ শুনিতে পাওয়া যায়; যথা-‘যখন মুমুক্ষুর সমস্তই আত্মস্বরূপ হইয়া যায়, তখন কে কাহাকে কিসের দ্বারা দর্শন করিবে? কিসের দ্বারা কাহাকে জানিবে?’ ‘যাহাতে অন্য কিছু দর্শন করে না, অন্য কিছু শ্রবণ করে না, এবং অন্য কিছু জানে না, তাহাই ভূমা(ব্রহ্ম)’ ‘জীব প্রাজ্ঞ পরমাত্মার সহিত সম্মিলিত হইয়া বাহ্য বা আভ্যন্তর কিছুই জানে না’ ইত্যাদি। অতএব পরস্পর বিরুদ্ধার্থ-বোধক শ্রুতি থাকায় বিচার করা আবশ্যক হইতেছে; সুতরাং বেদবাক্যের প্রকৃতার্থ নিরূপণের জন্য বিচার করা উচিত। বিশেষতঃ মোক্ষবাদিগণের মধ্যে বিরুদ্ধ মত দর্শনেও বিচারের আবশ্যকতা আছে,-সাংখ্য ও বৈশেষিক উভয়েই মোক্ষবাদী; তাঁহারা বলেন-মুক্তিতে অনুভবযোগ্য কোন সুখ থাকে না; অন্য সম্প্রদায় বলেন যে, মুক্তিতেও নিরতিশয়-যাহা অপেক্ষা আর অধিক নাই, এইরূপ আনন্দ অনুভব হইয়া থাকে। অতএব বিচারের যথেষ্ট প্রয়োজন রহিয়াছে। ৪

এমত অবস্থায় কোন্ পক্ষ অবলম্বন করা উচিত? না, আনন্দ প্রভৃতি শব্দের স্পষ্ট উল্লেখ দর্শনে এবং ‘মুক্ত পুরুষ হাস্য ক্রীড়া ও রমণ করতঃ’, ‘তিনি যদি পিতৃলোককামী হন’, ‘যিনি সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্ববিদ’, ‘সমস্ত কাম(বিষয়)

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯৬৯

উপভোগ করেন’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যানুসারে স্বীকার করিতে হয় যে, মুক্তিতেও সুখ-সংবেদন হইয়া থাকে। ভাল, একত্ব সিদ্ধান্তপক্ষে কারক-বিভাগ যখন থাকে না, তখন সে পক্ষে সুখ-বিজ্ঞান হইবে কিরূপে? কারণ, ক্রিয়ামাত্রই বহুকারক- সাধ্য; বিজ্ঞানও যখন একটি ক্রিয়া, তখন একত্ব-পক্ষে আনন্দানুভব হইবে কি প্রকারে? না, ইহা দোষাবহ হয় না; কারণ, এবিষয়ে যখন স্পষ্ট শ্রুতিপ্রমাণ রহিয়াছে, তখন ব্রহ্মানন্দের অনুভবেও বিরোধ হইতে পারে না; আর আনন্দ অনুভবগোচর না হইলে যে, “বিজ্ঞানমানন্দম্” প্রভৃতি বাক্যই অসঙ্গত হয়, সেকথাও আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। ৫

ভাল, জিজ্ঞাসা করি, বচন থাকিলেই কি হয়?—বচনে ত নিশ্চয়ই অগ্নির শীতলতা, কিম্বা জলের উষ্ণতা জন্মাইতে পারে না; কারণ, বচন(শব্দ প্রমাণ) কেবল বস্তুর স্বভাব জ্ঞাপন করে মাত্র, কিন্তু অন্যদেশে অগ্নি শীতল, অথবা অগম্য কোনও স্থানে জল স্বভাবতঃ উষ্ণ—উহা জ্ঞাপন করিতে পারে না;[জ্ঞাপন করিলেও, সে বাক্য প্রমাণরূপে গ্রাহ্য হয় না]। না—এ আপত্তিও হইতে পারে না; কেন না, পরমাত্মগত আনন্দের যে, অনুভব হয়, ইহা প্রত্যক্ষতঃ দেখিতে পাওয়া যায়; বিশেষতঃ ‘অগ্নি শীতল’ ইত্যাদি বাক্য যেমন প্রত্যক্ষের বিরুদ্ধার্থ- প্রকাশক, ‘বিজ্ঞানম্ আনন্দম্’ এবম্বিধ বাক্যগুলি সেরূপ কোনপ্রকার বিরুদ্ধার্থ- প্রকাশক নহে। ৬

আর ঐ সকল শ্রুতিবাক্যের যে, অর্থগত বিরোধ নাই, তাহা অনুভবসিদ্ধও বটে,—‘আমি সুখী’ ইত্যাদিরূপে আত্মার সুখরূপত্ব সকলেই অনুভব করিয়া থাকে;(১) সুতরাং আত্মার আনন্দস্বরূপত্ব কথাটা প্রত্যক্ষের বিরুদ্ধ হইতেছে না; অতএব আনন্দস্বরূপ ব্রহ্ম বিজ্ঞানাত্মক বলিয়াই আপনি আপনাকে অনুভব করিয়া থাকে। এইরূপ হইলেই আত্মার আনন্দস্বরূপত্ব-প্রতিপাদক পূর্ব্বোদাহৃত “জক্ষৎ ক্রীড়ন্ রমমাণঃ” ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যেরও সামঞ্জস্য রক্ষা পাইতে পারে। ৭

৯৭০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

না-একথা হইতে পারে না; কারণ, দেহেন্দ্রিয়াদির অভাবে বিজ্ঞানোৎ- পত্তি কখনই সম্ভবপর হয় না; কেন না, আত্যন্তিক মোক্ষদশায় ইন্দ্রিয়াশ্রয় শরীর থাকে না; শরীর রূপ আশ্রয় না থাকায় ইন্দ্রিয় থাকাও সম্ভব হয় না; অতএব দেহেন্দ্রিয়াদি না থাকায় আনন্দবিষয়ে বিজ্ঞানোৎপত্তি একেবারেই সম্ভব হয় না। আর যদি দেহেন্দ্রিয়াদির অভাবেও বিজ্ঞানোৎপত্তি স্বীকার করা হয়, তাহা হইলেও এই দেহেন্দ্রিয়াদি পরিগ্রহের কিছুমাত্র প্রয়োজন দেখা যায় না; একথা একত্ব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধও বটে; কারণ, পরব্রহ্ম নিত্য বিজ্ঞানস্বরূপ বলিয়া যদি আপনার আনন্দাত্মক স্বভাব প্রকাশ করিতেন, তাহা হইলে ত সর্ব্বদাই প্রকাশ করিতেন; কিন্তু তাহা ত কখনই করেন না; আর সংসারী আত্মাও যখন সংসার হইতে বিনির্মুক্ত হয়, তখন সে আপনার প্রকৃত স্বরূপই প্রাপ্ত হয়; সুতরাং সংসারীর পক্ষেও ব্রহ্মানন্দ উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। তাহার পর, মুক্ত আত্মা ত-জলাশয়ে নিক্ষিপ্ত জলাঞ্জলির ন্যায় ব্রহ্মের সঙ্গে মিশিয়া এক হইয়া যায়, কিন্তু আনন্দাত্মক ব্রহ্মবিজ্ঞানের জন্য কখনই পৃথক্ হইয়া থাকে না; অতএব ‘মুক্তিদশায় জীব আনন্দাত্মক আত্ম’কে অনুভব করিয়া থাকে’ এ কথার কোন অর্থই থাকে না। ৮

আর যদি বল, মুক্ত আত্মা পৃথক্ থাকিয়াই ব্রহ্ম’নন্দ উপলব্ধি করিয়া থাকে; এবং ‘আমি আনন্দস্বরূপ’ বলিয়া প্রত্যগাত্মাকে(আপনাকে) অনুভব করিয়া থাকে, তাহা হইলেও একত্বসিদ্ধান্তের বিরোধ ঘটে, এবং সমস্ত শ্রুতি- বাক্যেরও বাধা ঘটে, অথচ এতদতিরিক্ত আর তৃতীয় কোন কল্পনা করাও সম্ভব হয় না। আরও এক কথা, ব্রহ্ম যদি সর্ব্বদাই আত্মানন্দ অনুভব করিতে থাকে, তাহা হইলে, বিজ্ঞান ও অবিজ্ঞান-বিভাগ কল্পনা করা নিরর্থক হইয়া পড়ে; আত্মার আনন্দবিষয়ক বিজ্ঞান যদি সর্ব্বদাই বিদ্যমান থাকে, তাহা হইলে, বলিতে হইবে যে, তাহাই তাহার স্বভাব; সুতরাং ‘আত্মা আনন্দ অনুভব করে’ এইরূপ নূতন করিয়া অনুভব কল্পনা করা সঙ্গত হইতে পারে না। অতএব যদি তাহার আগন্তুক বিজ্ঞানের সম্ভাবনা থাকে, তাহা হইলেই ঐরূপ কল্পনার সার্থকতা হইতে পারে, যেমন ‘আপনাকে ও অপরকে জানে’ ইত্যাদি বাক্যের সার্থকতা হয়, তদ্রূপ, অবিচ্ছিন্নভাবে যাহার মন কেবল ইষুতে একান্ত নিবিষ্ট, তাহার সম্বন্ধে যেমন ইযুবিষয়ে জ্ঞান ও অজ্ঞানের কল্পনা অর্থহীন, তেমনি বিজ্ঞানাত্মক আত্মা কখনও জ্ঞানকে জানে, কখনও জানে না, এইরূপ কল্পনারও কোনই অর্থ থাকে না। ৯

তৃতীয়োহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৯৭১

এই দোষ পরিহারের জন্য যদি বল, আত্মা বিচ্ছিন্নভাবেই স্বীয় আনন্দের অনুভব করিয়া থাকে; তাহা হইলেও আত্মবিজ্ঞানের ছিদ্রে, অর্থাৎ যে সময় আত্মানন্দবিষয়ে জ্ঞান না থাকে, সেই সময়ে অন্য বিষয়ে বিজ্ঞান হইতে পারে; তাহা হইলেও আত্মার নির্বিকারভাব নষ্ট হয়; নির্বিকারত্ব নষ্ট হইলেই তাহার অনিত্যত্ব আসিয়া পড়ে। অতএব বলিতে হইবে যে, ব্রহ্মের কেবল স্বরূপমাত্র প্রতিপাদন করাই “বিজ্ঞানমানন্দম্” এই শ্রুতির মুখ্য উদ্দেশ্য, কিন্তু ব্রহ্মানন্দের অনুভাব্যতা প্রতিপাদন করা উহার মুখ্য উদ্দেশ্য নহে। আপত্তি হইতে পারে যে, ব্রহ্মানন্দ যদি অনুভবগোচরই না হয়, তাহা হইলে ‘জক্ষৎ ক্রীড়ন্’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য বিরুদ্ধ হইয়া পড়ে? না, সে আপত্তিও হইতে পারে না; কারণ, ব্রহ্ম ও নিখিল আত্মা যখন একই বস্তু, তখন ঐ শ্রুতিটি যথাপ্রাপ্তার্থানুবাদক অর্থাৎ যাহা স্বতই সম্ভবপর হয়, ঐ শ্রুতিটি তাহাই প্রতিপাদন করিতেছে মাত্র। অভি- প্রায় এই যে, মুক্তাত্মা যখন সমস্ত আত্মার সঙ্গে এক-অভিন্ন হইয়া যায়, তখন যোগী বা দেবতা প্রভৃতি যে কোনও আত্মাতে হাস্যক্রীড়াদি যাহা কিছু হয়, তাহাই সেই মুক্ত পুরুষের হাস্যক্রীড়াদিরূপে পরিগণিত হয়; কারণ, তখন তিনি সর্ব্বাত্মভাব প্রাপ্ত হইয়াছেন; অতএব বুঝিতে হইবে যে, সর্ব্বাত্মভাবরূপ মোক্ষের প্রশংসার জন্যই স্বতঃপ্রাপ্ত হাস্যক্রীড়া প্রভৃতি ব্যাপার ঐ সমস্ত শ্রুতিতে কথিত হইয়াছে মাত্র, কিন্তু অন্য কোনও নূতন বিষয় জ্ঞাপন করিতেছে না। ১০

ভাল কথা, ঐ সকল শ্রুতি যদি স্বতঃপ্রাপ্ত বিষয়েরই অনুবাদক মাত্র হয়, তাহা হইলেও সর্ব্বাত্মভাবাপন্ন মুক্ত পুরুষের হাস্যক্রীড়াদি প্রাপ্তির ন্যায় দুঃখাদি প্রাপ্তিও ত হইতে পারে—উৎকৃষ্ট দেহে যেমন হাস্যক্রীড়াদি সম্ভাবিত হয়, তেমনি স্থাবরাদি দেহে আবার নিরতিশয় দুঃখসম্বন্ধও তাহার হইতে পারে? না, এরূপ আপত্তি হইতে পারে না; কারণ, যত কিছু সুখ-দুঃখাদি-সম্বন্ধ, তৎ সমস্তই নামরূপকৃত কার্য্য-করণরূপ(দেহেন্দ্রিয়াদিরূপ) উপাধি-সম্পর্কজনিত ভ্রান্তি-বিজ্ঞানে অধ্যারোপিত মাত্র—কোনটিই সত্য নহে; এই প্রণালীতে পূর্ব্বেই উক্ত আপত্তির পরিহার করা হইয়াছে। ইহার বিরুদ্ধার্থ-বোধক শ্রুতি- সমূহেরও প্রতিপাদ্য বিষয় যে, কি হইতে পারে, তাহা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। অতএব, “এযোহস্য পরম আনন্দঃ”(ইহাই ইহার—জীবের পরম আনন্দ) এই শ্রুতিগত ‘আনন্দ’ শব্দের ন্যায় আনন্দবোধক অন্যান্য শ্রুতিবাক্যেরও তুল্য অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে ॥ ২৪০ ॥ ৩৪ ॥

৯৭২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্। ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদে তৃতীয়াধ্যায়ের ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥আ৯॥ ইতি তৃতীয়াধ্যায়স্য নবমং ব্রাহ্মণম্ ॥ ৩ ॥ ৯ ॥ ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি তৃতীয়োহধ্যায়ঃ ॥ ৩ ॥ [ ব্রাহ্মণক্রমেণ তু পঞ্চমোহধ্যায়ঃ।]

চতুর্থোহধ্যায়ঃ।

আভাসভাষ্যম্?—জনকো হ বৈদেহ আসাঞ্চক্রে। অন্য সম্বন্ধঃ— শারীরাদ্যানষ্টৌ পুরুষান্ নিরুহ্য প্রত্যুহ্য, পুনর্হৃদয়ে দিগ্‌ভেদেন চ পুনঃ পঞ্চধা ব্যূহ্য, হৃদয়ে প্রত্যুহ্য, হৃদয়ং শরীরঞ্চ পুনরন্যোন্যপ্রতিষ্ঠং প্রাণাদিপঞ্চবৃত্ত্যাত্মকে সমানাখ্যে জগদাত্মনি সূত্র উপসংহৃত্য, জগদাত্মানং শরীরহৃদয়সূত্রাবস্থমতিক্রান্ত- বান্ য ঔপনিষদঃ পুরুষঃ—নেতি নেতীতি ব্যপদিষ্টঃ, স সাক্ষাচ্চ উপাদানকারণ- স্বরূপেণ চ নির্দিষ্টঃ “বিজ্ঞানমানন্দম্” ইতি। তস্যৈব বাগাদিদেবতাদ্বারেণ পুনরধিগমঃ কর্তব্য—ইত্যধিগমনোপায়ান্তরার্থোহয়মারম্ভো ব্রাহ্মণদ্বয়স্য। আখ্যা- য়িকা তু আচারপ্রদর্শনার্থা।—

আভাসভাষ্যানুবাদ।—‘জনকো হ বৈদেহ আসাঞ্চক্রে’ ইত্যাদি। অতীত তৃতীয়াধ্যায়ের সহিত ইহার সম্বন্ধ এইরূপ—পূর্ব্ব অধ্যায়ের শেষে শারীর- প্রভৃতি অষ্টবিধ পুরুষের স্বরূপ নিরূপণ করিয়া, পুনশ্চ হৃদয় মধ্যে তাহাদের উপসংহার করিয়া, আবার দিগ্‌ভেদানুসারে তাহাদের পাঁচভাগে বিভক্ত করিয়া পুনশ্চ হৃদয়ে তাহাদের উপসংহার প্রদর্শন করা হইয়াছে। তাহার পর, পরস্পর পরস্পরে আশ্রিত হৃদয় ও শরীরকে প্রাণাপানাদি পঞ্চবিধ বৃত্তিবিশিষ্ট ‘সমান’ সংজ্ঞক জগদাত্মাস্বরূপ ‘সূত্রে’ উপসংহার করিয়া, আবার শরীর, হৃদয় ও সূত্রস্থ সেই জগদাত্মাকে, ‘সমানের’ও অতীত যে ঔপনিষদ পুরুষ ‘নেতি নেতি’ বাক্যে নিদ্দিষ্ট হইয়াছেন, তাহাকেই ‘বিজ্ঞানম্ আনন্দম্’ বাক্যে সাক্ষাৎসম্বন্ধে ও উপা- দান কারণরূপে নির্দেশ করা হইয়াছে। এখন আবার বাক্প্রভৃতির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা দ্বারা তাহার উপলব্ধি করান আবশ্যক; এই জন্য তাহাকে লাভ করিবার পক্ষে আরো যে সমস্ত উপায় আছে, তৎপ্রতিপাদনার্থ পরবর্তী ব্রাহ্মণদ্বয় আরব্ধ হইতেছে। পূর্ব্বের ন্যায় এখানেও বিদ্যাগ্রহণের নিয়ম বা আচার প্রদর্শনার্থ একটি আখ্যায়িকা প্রদর্শিত হইতেছে।

ওঁম্ জনকো হ বৈদেহ আসাঞ্চক্রেহথ হ যাজ্ঞবল্ক্য আবব্রাজ। তং হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্য কিমর্থমচারীঃ পশূনিচ্ছন্নন্বন্তানিতি। উভয়মেব সম্রাড়িতি হোবাচ ॥ ২৪১ ॥ ১ ॥

মদনাভৈঃ।—ধনকঃ(তদুর্দ্ধিকঃ) বৈদেহঃ(বিদেহার্থিভিঃ)

৯৭৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

আসাঞ্চক্রে(আগন্তুকানাৎ দর্শনযোগ্যৎ স্থানং অধিষ্ঠিতবান্), হ(ঐতিহ্যে) অথ(অনন্তরং) যাজ্ঞবল্ক্যঃ(তন্নামক ঋষিঃ) আবব্রাজ(তত্রাগতঃ)।(জনকঃ) তৎ(যাজ্ঞবল্ক্যৎ) উবাচ হ—হে যাজ্ঞবল্ক্য,[ত্বং] কিমর্থৎ অচারীঃ?(মমান্তিকম্ আগতোহসি?) পশূন্(গবাদীন) ইচ্ছুক, অন্বস্তান্(সূক্ষ্মান্তান্ দুর্বিজ্ঞেয়ার্থান্) [বা জ্ঞাতুম্]? ইতি।[এবং পৃষ্টঃ যাজ্ঞবল্ক্যঃ] উবাচ হ—হে সম্রাট্, উভয়- মেব(পশূনপি ইচ্ছুক, দুর্বিজ্ঞেয়ানর্থানপি জ্ঞাতুমিত্যর্থঃ) ॥২৪১৷৷১৷৷

মূলানুবাদ:-বিদেহদেশাধিপতি জনক মহারাজ একদা লোকের দর্শনোপযুক্ত স্থানে অবস্থান করিতেছিলেন। অনন্তর যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়াছিলেন। জনক তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি কি উদ্দেশ্যে আমার নিকট আসিয়াছ?- পুনশ্চ পশুলাভের ইচ্ছায়? অথবা আমার নিকট বহুবিধ সূক্ষ্ম তত্ত্ব জানিবার ইচ্ছায়? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-হে সম্রাট্, উভয়ের ইচ্ছায়ই, অর্থাৎ পশুলাভের ইচ্ছায়ও আসিয়াছি এবং সূক্ষ্ম তত্ত্ববিষয়ক প্রশ্ন শুনিবার ইচ্ছায়ও আসিয়াছি ॥ ২৪১ ॥ ১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।-জনকো হ বৈদেহ অসাঞ্চক্রে আসনং কৃতবান্ আস্থায়িকাৎ দত্তবানিত্যর্থঃ, দর্শনকামেভ্যো রাজ্ঞঃ। অথ হ তস্মিন্নবসরে যাজ্ঞ- বন্ধ্য আবব্রাজ আগতবান্ আত্মনো যোগক্ষেমার্থম্, রাজ্ঞো বা বিবিদিষাং দৃষ্টা অনুগ্রহার্থম্। তমাগতং যাজ্ঞবল্ক্যৎ যথাবৎ পূজাৎ কৃত্বা উবাচ হ উক্তবান্ জনকঃ-হে যাজ্ঞবল্ক্য কিমর্থম্ অচারীঃ আগতোহসি? কিং পশূনিচ্ছন্ পুনরপি, আহোস্বিৎ অন্বন্তান্ সুক্ষ্মান্তান্ সুক্ষ্মবস্তুনির্ণয়ান্তান্ প্রশ্নান্ মত্তঃ শ্রোতুমিচ্ছন্নিতি। উভয়মেব-পশূন্ প্রশ্নাংশ্চ, হে সম্রাট্। সম্রাড়িতি বাজপেয়যাজিনো লিঙ্গম্; যশ্চাজ্ঞয়া রাজ্যং প্রশান্তি, স সম্রাট্, তস্যামন্ত্রণং হে সম্রাড়িতি, সমস্তস্য বা ভার- তস্য বর্ষস্য রাজা ॥২৪১৷৷১৷৷

টীকা। পূর্ব্বস্মিন্নধ্যায়ে জল্পন্যায়েন সচ্চিদানন্দং ব্রহ্ম নির্দ্ধারিতম্। ইদানীং বাদন্যায়েন তদেব নির্দ্ধাররিতুমধ্যায়ান্তরমবতারয়তি—জনক ইতি। তত্র ব্রাহ্মণদ্বয়স্যাবাত্তরসম্বন্ধং প্রতি- জানীতে—অস্যেতি। তমেব বক্তুং বৃত্তং কীর্ত্তয়তি—শারীরাজ্ঞানিতি। নিরুহ্য প্রত্যুহ্যেতি বিস্তার্য্য ব্যবহারমাপাদ্যেত্যর্থঃ। প্রত্যুহ্য হৃদয়ে পুনরুপসংহৃত্যেতি যাবৎ। জগদাত্মনীত্য- ব্যাকৃতোক্তিঃ। সূত্রশব্দেন তৎকারণং গৃহ্যতে। অতিক্রমণং তদ্‌গুণদোষাসম্পৃষ্টত্বম্। অনন্তর- ব্রাহ্মণদ্বয়তাৎপর্য্যমাহ—তস্যৈবেতি। বাগান্তধিষ্ঠাত্রীধগ্ন্যাদিষু দেবতাসু ব্রহ্মদৃষ্টিদ্বারেত্যর্থঃ। পূর্ব্বোক্তান্বয়ব্যতিরেকাদিসাধনাপেক্ষয়াস্তরশব্দঃ। আচার্য্যবতা শ্রদ্ধাদিসম্পন্নেন বিদ্যা

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নরমং ব্রাহ্মণম্।

৯৭৫

লব্ধব্যেত্যাচারঃ। অপ্রাপ্তপ্রাপ্তির্যোগঃ, প্রাপ্তস্য রক্ষণং ক্ষেম ইতি বিভাগঃ। ভারতস্থ্য বর্ষস্থ্য হিমবৎসেতুপর্য্যন্তস্য দেশস্যেতি যাবৎ ॥ ২৪১। ১॥

ভাষ্যানুবাদ।-বিদেহাধিপতি জনক আসন করিয়া বসিয়াছিলেন, অর্থাৎ যাহারা রাজদর্শনের অভিলাষে আগমন করে, তাহাদের দর্শনোপযুক্ত স্থানে উপবেশন করিয়াছিলেন। সেই অবসরে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি, আপনার যোগ- ক্ষেমের জন্যই হউক, অথবা রাজার তত্ত্বজিজ্ঞাসা-দর্শনে অনুগ্রহপ্রকাশার্থই হউক আসিয়াছিলেন। মহারাজ জনক সমাগত যাজ্ঞবল্ক্যকে যথাবিধি অর্চ্চনা করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,-হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি কি উদ্দেশ্যে আগমন করিয়াছ?-পুন- র্ব্বারও পশুলাভের প্রত্যাশায়? কিংবা আমার নিকটে অন্বন্ত-অর্থাৎ সূক্ষ্ম তত্ত্ব- নির্ণায়ক নানাপ্রকার প্রশ্ন শুনিবার ইচ্ছায়? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-হে সম্রাট্, উভয়ের ইচ্ছায়ই অর্থাৎ পশুলাভ ও প্রশ্ন শ্রবণ উভয়ের জন্যই আসিয়াছি। ‘সম্রাট’ শব্দটি বাজপেয়যাজীর চিহ্ন, অর্থাৎ সম্রাট্ শব্দে সম্বোধন করায় বুঝা যাইতেছে যে, জনক মহারাজ বাজপেয়নামক যজ্ঞ করিয়াছিলেন, এবং তিনি আজ্ঞাক্রমে অপরা- পর রাজাদেরও শাসন করিতেন; অথবা তিনি সমস্ত ভারতবর্ষের অধিপতি ছিলেন; এই জন্য তিনি সম্রাট্ শব্দে সম্বোধনের যোগ্য ॥২৪১৷৷১৷৷

যৎ তে কশ্চিদব্রবীৎ তচ্ছৃণবামেতি, অব্রবীন্মে জিত্বা শৈলিনির্বাগ্ বৈ ব্রহ্মেতি, যথা মাতৃমান্ পিতৃমানাচার্য্যবান্ ক্রয়াৎ, তথা তচ্ছৈলিনিরব্রবীদ্ বাথৈ ব্রহ্মেত্যবদতো হি কিংস্যা- দিতি, অব্রবীত্তু তে তস্যায়তনং প্রতিষ্ঠান্, ন মেহব্রবীদিত্যেক- পাদ্বা এতৎ সম্রাড়িতি, স বৈ নো ক্রহি যাজ্ঞবল্ক্য।

বাগেবায়তনমাকাশঃ প্রতিষ্ঠা প্রজ্ঞেত্যেনদুপাসীত। কা প্রজ্ঞতা যাজ্ঞবল্ক্য। বাগেব সম্রাড়িতি হোবাচ। বাচা বৈ সম্রাড্ বন্ধুঃ প্রজ্ঞায়ত ঋগ্বেদো যজুর্ব্বেদঃ সামবেদোহথর্ব্বাঙ্গিরস ইতি- হাসঃ পুরাণং বিদ্যা উপনিষদঃ শ্লোকাঃ সূত্রাণ্যনুব্যাখ্যানানি ব্যাখ্যানানীষ্টং হুতমাশিতং পায়িতময়ঞ্চ লোকঃ পরশ্চ লোকঃ সর্ব্বাণি চ ভূতানি বাচৈব সম্রাট্ প্রজ্ঞায়ন্তে, বাথৈ সম্রাট্ পরমং ব্রহ্ম। নৈনং বাগ্জহাতি, সর্ব্বাণ্যেনং ভূতান্যভিক্ষরন্তি, দেবো ভূত্বা দেবানপ্যেতি, য এবং বিদ্বানেতদুপাস্তে। হস্ত্যষভৎসহস্রং

৯৭৬. বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

দদামীতি হোবাচ জনকো বৈদেহঃ। স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ পিতা মেহমন্যত নাননুশিষ্য হরেতেতি ॥ ২৪২ ॥ ২॥

সরলার্থঃ।-[যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ-হে সম্রাট,] কশ্চিৎ(আচার্য্যঃ) তে (তুভ্যং) যৎ অব্রবীৎ(উক্তবান), তৎ[বয়ং] শৃণবাম(শ্রোতুমিচ্ছাম) ইতি। [জনক আহ] শৈলিনিঃ(শিলিনস্যাপত্যৎ পুমান্) জিত্বা(জিত্বাখ্য আচার্য্যঃ) মে(মহাং) অব্রবীৎ(অকথয়ৎ)-বাক্(বাগদেবতা) বৈ(এব) ব্রহ্ম ইতি। [যাজ্ঞবল্ক্য আহ-যুক্তমুক্তমেতৎ]; যথা মাতৃমান্(অনুশাসনক্ষমা মাতা যস্যাস্তি, সঃ), পিতৃমান্(উপদেশপ্রদানোচিতঃ পিতা যস্যাস্তি, সঃ), আচাৰ্য্যবান্(উপ- নয়নাৎ পরং সমাবর্তনপর্যন্তং উপদেষ্টা গুরুঃ যস্যাস্তি, সঃ এবংবিধ আচার্য্যঃ] যথা ক্রয়াৎ(উপদিশেৎ)[শিষ্যং], তথা শৈলিনিঃ তৎ অব্রবীৎ-বাক্ বৈ ব্রহ্ম ইতি; হি(যতঃ) অবদতঃ(বাগ বিধুরস্য মুকস্য) কিং স্যাৎ?(ঐহিকং পারত্রিকং বা ন কিমপীত্যর্থঃ)। তু(পুনঃ)[সঃ] তস্য(বাগব্রহ্মণঃ) আয়তনং প্রতিষ্ঠাৎ (আশ্রয়ং) তে(তুভ্যং) অব্রবীৎ?[জনক আহ-][স আচার্য্যঃ] মে(মহাং) ন অব্রবীৎ(আয়তনবিজ্ঞানং ন উপদিষ্টবান্) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] হে সম্রাট, এতৎ(বাগব্রহ্ম) একপাদ(পাদ ত্রয়শূন্যমিত্যর্থঃ) বৈ(এব)। হে যজ্ঞ- বল্ক্য, সঃ[আচার্য্যত্বেন কল্পিতঃ ত্বং) নঃ(অস্মান্) ব্রূহি(কথয়)[আয়তনমিতি শেষ]:]।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] বাক্(বাগিন্দ্রিয়ম্); এব আয়তনং(শরীরম্), আকাশঃ প্রতিষ্ঠা(ত্রৈকালিক আশ্রয়ঃ); এনৎ(এতৎ বাগব্রহ্ম) ‘প্রজ্ঞা’ ইতি (প্রজ্ঞারূপেণ) উপাসীত।[অন্য বাগব্রহ্মণ: বাগিন্দ্রিয়ং দ্বিতীয়ঃ পাদঃ, আকাশঃ তৃতীয়ঃ পাদঃ, প্রজ্ঞা চ চতুর্থঃ পাদঃ ইতি ভাবঃ]।[জনকঃ পপ্রচ্ছ] হে যাজ্ঞ- বল্ক্য, কা প্রজ্ঞতা?(কিং প্রজ্ঞৈব প্রজ্ঞতা, উত প্রজ্ঞাতঃ অতিরিক্তঃ কশ্চিৎ ধৰ্ম্মঃ?) হে সম্রাট, বাক্ এব[প্রজ্ঞতা] ইতি হ[যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ]।[কণম্?] হে সম্রাট্ বৈ(যতঃ) বাচা বন্ধুঃ প্রজ্ঞায়তে(অয়ং মম বন্ধুরিতি বাচা এব পরি- চীয়তে ইত্যর্থঃ), তথা হে সম্রাট, ঋগ্বেদ:, যজুর্ব্বেদ:, সামবেদঃ, অথর্বাঙ্গিরসঃ (অথর্ববেদঃ), ইতিহাসঃ, পুরাণম্, বিদ্যা, উপনিষদঃ, শ্লোকাঃ, সূত্রাণি, অনুব্যা- খ্যানানি, ব্যাখ্যানানি, ইষ্টং,(যাগজনিতৎ{ধর্মজাতম্), হুতং(হোমজৎ ধৰ্ম্ম- জাতং), আশিতং(অন্ন-দানকৃতৎ), পায়িতং,(পানীয়দানকৃতং), অয়ং(বর্তমানঃ) চ লোকঃ(জন্ম), পরঃ(ভবিষ্যন্) চ লোকঃ(জন্ম),[কিং বহুনা,] সর্বাণি চ ভূতানি বাচা এব প্রজ্ঞায়ন্তে,[অতঃ] হে সম্রাট, বাক্ বৈ(এব) পরমং ব্রহ্ম। যঃ(যঃ

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

৯৭৭.

কশ্চিৎ জনঃ) এবং বিদ্বান্(জানন্ সন্) এতৎ(বাগব্রহ্ম) উপাস্তে, বাক্ এনং (বাগব্রহ্মবিদৎ) ন জহাতি; সর্ব্বাণি ভূতানি এনং(বাগব্রহ্মবিদৎ) অভি (লক্ষ্যীকৃত্য) ক্ষরন্তি(স্বং স্বমর্থম্ উপহরন্তি); ইহ(অস্মিন্নেব দেহে) দেবঃ ভূত্বা(দেবত্বং প্রাপ্য) দেবান্ অপ্যেতি(দেহপাতোত্তরকালং চ দেবত্বম্ অভি- সম্পদ্যতে ইত্যর্থঃ)।[এতৎ শ্রুত্বা] বৈদেহঃ জনকঃ উবাচ হ—[বিদ্যামূল্যং] হস্ত্যষভং(হস্তিতুল্যঃ ঋষভঃ যত্র, তৎ তথাভূতৎ) সহস্রং(গোসহস্রং)[তুভ্যং] দদামি ইতি।[এবমুক্তঃ] সঃ যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ—শিষ্যান্ অননুশিষ্য(উপ- দেশেন কৃতার্থান্ অকৃত্বা) ন হরেত(কিঞ্চিদপি ন গৃহীয়াৎ) ইতি মে(মম) পিতা অমন্যত, মমাপি তথৈব(মতমিত্যভিপ্রায়ঃ) ইতি ॥২৪২৷৷২৷৷

মূলানুবাদ:-[যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি বিদেহাধিপতি জনক মহা- রাজকে বলিলেন-] তোমার বহু আচার্য্য আছে; তন্মধ্যে কোন এক আচার্য্য তোমাকে যাহা বলিয়াছেন, তাহা আমি শুনিতে ইচ্ছা করি। [জনক বলিলেন,] শিলিনের পুত্র-শৈলিনি জিত্বানামক আচার্য্য আমাকে বলিয়াছিলেন-‘বাক্ই ব্রহ্ম’। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, একথা খুব সত্য; উপযুক্ত পিতা, মাতা ও গুরুর নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত আচার্য্য যেরূপ উপদেশ দিয়া থাকেন, শৈলিনি জিত্বাও তোমাকে ঠিক সেইরূপই উপদেশ দিয়াছেন-“বাগবৈ ব্রহ্ম” ইতি; কেন না, যে লোক বাগবিহীন, তাহার কোন্ কার্য্য সম্পন্ন হয়?-ঐহিক বা পারলৌকিক কোন কার্য্যই সম্পন্ন হয় না। কিন্তু তোমাকে সেই বাগব্রহ্মের আয়তন(শরীর) ও প্রতিষ্ঠা (নিয়ত আশ্রয়) সম্বন্ধে উপদেশ দিয়াছেন কি?[জনক বলিলেন,] না, তিনি আমাকে তাহা বলেন নাই।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] হে সম্রাট, ইহা হইতেছে ব্রহ্মের একপাদ, অর্থাৎ একটি মাত্র অংশ;[এখনও অপর তিনটি পাদ তোমার অবিজ্ঞাত রহিয়াছে]।[জনক বলিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, তদ্বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা আছে; অতএব আপনিই আমাকে তাহা বলুন।[জনক বলিলেন,] বাগিন্দ্রিয়ই ইহার আয়তন, এবং আকাশ ইহার প্রতিষ্ঠা; ইহাকে ‘প্রজ্ঞা’ বলিয়া উপাসনা করিবে। [জনক জিজ্ঞাসা করিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই ‘প্রজ্ঞা’ কথার অর্থ কি? প্রজ্ঞা অর্থ কি বাক্? না তাহার ধর্ম?[যাজ্ঞবল্ক্য

৯৭৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বলিলেন-] হে সম্রাট, বাক্ই, অর্থাৎ বাক্ই এখানে প্রজ্ঞাশব্দের অর্থ। কেন না, হে সম্রাট, বাকদ্বারাই বন্ধুকে উত্তমরূপে জানা যায়, এবং ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ, ইতিহাস, পুরাণ, বিদ্যা, উপনিষদ্(বেদরস্য), শ্লোক, সূত্র, অনুব্যাখ্যান, ব্যাখ্যান, ইষ্ট(যজ্ঞ- জনিত ধৰ্ম্ম), হোমজ ধর্ম, অন্নপানপ্রদানজনিত ধৰ্ম্ম, ইহ জন্ম, পর জন্ম, এবং সমস্ত ভূতবর্গ এই বাক্যের সাহায্যেই জানিতে পারাযায়; অতএব, হে সম্রাট, বাকই পরব্রহ্ম। যিনি এইরূপে বাব্রহ্মের উপাসনা করেন, বাক্ কখনও তাহাকে পরিত্যাগ করে না; সমস্ত ভূতবর্গ ইহাকে উপহার প্রদান করে, এবং তিনি এই দেহেই দেবত্ব লাভ করিয়া দেহ- পাতের পর দেবতাতে মিলিয়া যান। বিদেহপতি জনক[একথা শুনিয়া] বলিলেন-আমি বিদ্যার মূল্যস্বরূপ হস্তিতুল্য বৃষভযুক্ত গোসহস্র তোমাকে প্রদান করিতেছি। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-আমার পিতা মনে করিতেন- শিষ্যকে উপদেশ দ্বারা কৃতার্থ না করিয়া[তাহার নিকট হইতে কিছুই] গ্রহণ করিতে নাই,[আমারও তাহাই মত] ॥ ২৪২ ॥ ২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কিন্তু, যৎ তে তুভ্যং কশ্চিদরবীৎ আচার্য্যঃ—অনেকা- চার্য্যসেবী হি ভবান্, তৎ শৃণবামেতি। ইতর আহ—অব্রবীদুক্তবান্ মে মম আচার্য্যো জিত্বা নামতঃ শিলিনস্যাপত্যং শৈলিনিঃ—বাগ্বৈ ব্রহ্মেতি বাগদেবতা ব্রহ্মেতি। আহেতরঃ—যথা মাতৃমান্ মাতা যস্য বিদ্যতে পুত্রস্য সম্যগনুশাস্ত্রী অনু- শাসনকর্ত্রী, স মাতৃমান্। অত ঊর্দ্ধং পিতা যস্যানুশাস্তা, স পিতৃমান্। উপনয়নাদুর্দ্ধম্ আ সমাবর্ত্তনাদাচার্য্যঃ যস্যানুশাস্তা, স আচার্য্যবান্; এবং শুদ্ধিত্রয়হেতুসংযুক্তঃ স সাক্ষাদাচার্য্যঃ স্বয়ং ন কদাচিদপি প্রামাণ্যাদ্ ব্যভিচরতি; স যথা ক্রয়াৎ শিষ্যায়, তথাহসৌ জিত্বা শৈলিনিরুক্তবান্—বাগ্বৈ ব্রহ্মেতি। অবদতো হি কিং স্যাদিতি। ন হি মুকস্যেহার্থমমুত্রার্থং বা কিংচন স্যাৎ।১

কিং তু অব্রবীদুক্তবান্, তে তুভ্যৎ, তস্য ব্রহ্মণ আয়তনং প্রতিষ্ঠাঞ্চ? আয়তনং নাম শরীরম্; প্রতিষ্ঠা ত্রিঘপি কালেষু য আশ্রয়ঃ। আহেতরঃ-ন মে অব্রবী- দিতি। ইতর আহ-যদ্যেবম্, একপাদ বৈ এতৎ-একঃ পাদো যস্য ব্রহ্মণঃ, তদিদ- মেকপাদ ব্রহ্ম ত্রিভিঃ পাদৈঃ শূন্যম্ উপাস্যমানমপি ন ফলায় ভবতীত্যর্থঃ। যদ্যেবং স ত্বং বিদ্বান্ সন্ নঃ অস্মভ্যৎ ব্রূহি, হে যাজ্ঞবল্ক্যেতি। স চাহ-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯৭৯

বাগেব আয়তনং, বাগদেবস্য ব্রহ্মণো বাগেব করণম্ আয়তনং শরীরম্; আকাশঃ অব্যাকৃতাখ্যঃ প্রতিষ্ঠা উৎপত্তি-স্থিতি-লয়কালেষু। প্রজ্ঞেত্যেনৎ উপাসীত— প্রজ্ঞেতীয়মুপনিষদ্ ব্রহ্মণশ্চতুর্থঃ পাদঃ, প্রজ্ঞেতি কৃত্বা এনদ্ ব্রহ্মোপাসীত। ২

কা প্রজ্ঞতা যাজ্ঞল্ক্য? কিং স্বয়মেব প্রজ্ঞা? উত প্রজ্ঞানিমিত্তা-যথা আয়তনপ্রতিষ্ঠে ব্রহ্মণো ব্যতিরিক্তে, তদ্বৎ কিম্? ন; কথং তর্হি? বাগেব সম্রাড়িতি হোবাচ; বাগেব প্রজ্ঞেতি হ উবাচ উক্তবান্, ন ব্যতিরিক্তা প্রজ্ঞেতি। কথৎ পুনর্ব্বাগেব প্রজ্ঞেতি? উচ্যতে-বাচা বৈ সম্রাট্ বন্ধুঃ প্রজ্ঞায়তে- অস্মাকং বন্ধুরিত্যুক্তে প্রজ্ঞায়তে বন্ধুঃ; তথা ঋগ্বেদাদি, ইষ্টং যাগনিমিত্তৎ ধৰ্ম্মজাতং, হুতৎ হোমনিমিত্তঞ্চ, আশিতম্ অন্নদাননিমিত্তং, পায়িতৎ পানদাননিমিত্তম্, অয়ঞ্চ লোকঃ ইদঞ্চ জন্ম, পরশ্চ লোকঃ প্রতিপত্তব্যঞ্চ জন্ম, সর্ব্বাণি চ ভূতানি বাচৈব সম্রাট্, প্রজ্ঞায়ন্তে, অতো বাগৈ সম্রাট্, পরমৎ ব্রহ্ম। নৈনৎ যথোক্তব্রহ্মবিদং বাগ্‌ জহাতি। সর্ব্বাণ্যেনং ভূতান্যভিক্ষরন্তি বলিদানাদিভিরিহ। দেবো ভূত্বা পুনঃ শরীরপাতোত্তরকালং দেবানপ্যেতি-অপিগচ্ছতি, য এবং বিদ্বানেতদুপান্তে। ৩

বিদ্যা-নিষ্ক্রয়ার্থৎ হস্তিতুল্য ঋষভঃ—হস্ত্যুষভো যস্মিন্ গোসহস্রে, তৎ হস্ত্যুষভং সহস্রং দদামীতি হোবাচ জনকো বৈদেহঃ। সঃ হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—অননুশিষ্য শিষ্যং কৃতার্থমকৃত্বা শিষ্যাৎ ধনং ন হরেতেতি মে মম পিতা অমন্যত; মমাপ্যয়- মেবাভিপ্রায়ঃ ॥২৪২৷৷২৷৷

টীকা। তত্র রাজানং প্রতি প্রশ্নমুখাপয়তি-কিত্তিিতি। কশ্চিদিতি বিশেষণস্য তাৎপৰ্য্যমাহ-অনেকেতি। প্রামাণ্যমাপ্তত্বম্। যথোক্তার্থানুমোদনে যুক্তিমাহ-ন হীতি। ১

যথোক্তব্রহ্মবিদ্যয়া কৃতকৃত্যত্বং মন্থানং রাজানং প্রত্যাহ-কিস্তিতি। আয়তনপ্রতিষ্ঠয়োরেক- ত্বাৎ পুনরুক্তিমাশঙ্ক্য বিভজতে-আয়তনং নামেতি। একপাদত্বেহপি ব্রহ্মণস্তদুপাসনাদিষ্ট- সিদ্ধিরিতি চেন্নেত্যাহ-ত্রিভিরিতি। ক্রহি প্রতিষ্ঠামায়তনং চেতি শেষঃ। ২

প্রশ্নমেব বিবৃণোতি—কিং স্বয়মেবেতি। প্রজ্ঞা নিমিত্তং যস্যা বাচঃ সা তথা। দ্বিতীয়পক্ষং বিশদয়তি—যথেতি। ব্যতিরেকপক্ষং নিষেধতি—নেতি। আকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকং পক্ষান্তরং গৃহ্লাতি—কথং তহীতি। বলিদানমুপহারসমর্পণম্। আদিশব্দেন স্রচন্দনবস্ত্রালঙ্কারাদিগ্রহঃ। বিদ্যানিক্ষয়ার্থমুবাচেতি সম্বন্ধঃ। পিতুরেতন্মতমস্তু, তব কিমায়াতং, তদাহ—মমাপীতি ॥২৪২॥২॥

ভাষ্যানুবাদ?—হে মহারাজ, তুমি অনেক আচার্য্যের সেবা করিয়াছ; তন্মধ্যে কোন এক আচার্য্য তোমাকে যাহা বলিয়াছেন, উপদেশ দিয়াছেন, আমরা তাহা শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি। অপরে(জনক) বলিলেন—শৈলিনি— শিলিনের পুত্র জিত্বানামক আচার্য্য আমাকে বলিয়াছেন—‘বাগ্‌বৈ ব্রহ্ম’ অর্থাৎ বাগ্‌দেবতাই ব্রহ্ম ইতি। অপরে বলিলেন—মাতৃমান্—যে পুত্রের যথা-

৯৮০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যথভাবে অনুশাসনসমর্থা মাতা বিদ্যমান থাকে, তিনি মাতৃমান; তাহার পর, পিতা যাহাকে শাসন করেন, তিনি পিতৃমান্; অতঃপর উপনয়ন হইতে আরম্ভ করিয়া সমাবর্তনকালপর্যন্ত আচার্য্য যাহার অনুশাসন করিয়া থাকেন, তিনি আচার্য্যবান্। যে আচার্য্য, এবংবিধ ত্রিপ্রকার শুদ্ধিসমন্বিত, তিনি নিজে কখনই সাক্ষাৎসম্বন্ধে অপ্রামাণ্যভাষী বা অনাপ্তপদ-বাচ্য হইতে পারেন না। ঐরূপ প্রমাণ- ভূত আচার্য্য শিষ্যকে যেরূপ উপদেশ দিয়া থাকেন, এই জিত্বানামক শৈলিনি আচার্য্যও তোমাকে ঠিক সেইরূপই যথার্থ উপদেশ দিয়াছেন যে, বাগ বৈ ব্রহ্মেতি; কেন না, যে ব্যক্তি বলিতে পারে না—মুক, তাহার কি হয়?—মুক ব্যক্তির ঐহিক বা পারলৌকিক কোন কার্য্যই নিষ্পন্ন হয় না।[অতএব তিনি ঠিক উপদেশই দিয়াছেন] ১

কিন্তু তিনি কি তোমাকে উহার আয়তন ও প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে কিছু বলিয়া- ছেন? আয়তন অর্থ—শরীর; আর প্রতিষ্ঠা অর্থ—যাহা ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্ত- মান, এই কালত্রয়স্থায়ী আশ্রয়। জনক বলিলেন—না, আমাকে তিনি তাহা বলেন নাই। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, যদি এইরূপই হইয়া থাকে, তাহা হইলে [ জানিবে যে,] ইহা একপাদ ব্রহ্ম—অর্থাৎ চতুষ্পাদ ব্রহ্মের ইহা একটি পাদ মাত্র; অবশিষ্ট পাদত্রয় এখনও তোমার অবিজ্ঞাত রহিয়াছে; সুতরাং পাদত্রয়হীন এক- পাদ মাত্র বাক্রহ্মের উপাসনা করিলেও সম্যক্ ফলের সম্ভাবনা নাই।[জনক বলিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, যদি এরূপই হয়, তাহা হইলে, তুমি যখন জান, তখন তুমিই তাহা আমাকে বল। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, বাক্ই ইহার আয়তন, অর্থাৎ বাগিন্দ্রিয়ই বাকদেবতা ব্রহ্মের আয়তন—শরীর; এবং অব্যাকৃত আকাশ(১) তাহার প্রতিষ্ঠা—উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়, এই কালত্রয়ব্যাপী আশ্রয়; ‘প্রজ্ঞা’ এই উপনিষদটি হইতেছে ব্রহ্মের চতুর্থ পাদ; অতএব ‘প্রজ্ঞা’ বলিয়াই এই ব্রহ্মের উপাসনা করিবে। ২

[জনক জিজ্ঞাসা করিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, প্রজ্ঞতা কি? অর্থাৎ এখানে প্রজ্ঞা অর্থ কি প্রজ্ঞাই? অথবা প্রজ্ঞাজনিত অন্য কিছু? যেমন আয়তন ও

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

৯৮১

প্রতিষ্ঠা ব্রহ্ম হইতে স্বতন্ত্র পদার্থ, ইহাও কি সেইরূপই স্বতন্ত্র কোন পদার্থ? [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] না, তাহা নহে; তবে কি? হে সম্রাট্, উহা বাক্ই, প্রজ্ঞা বাকের অতিরিক্ত নহে। ভাল, বাক্যকেই প্রজ্ঞা বলা হইতেছে কিরূপে? হে সম্রাট্, যে হেতু বাক্য দ্বারাই বন্ধুকে জানা যায়—‘ইনি আমাদের বন্ধু’ বলিলে, তাহাকে বন্ধু বলিয়া জানিতে পারা যায়। সেইরূপ, ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ, সামবেদ, অথর্ব্ববেদ, ইষ্ট—যাগলব্ধ ধর্মসমূহ, হুত—হোমোৎপন্ন ধর্মসমূহ, অশিত(অন্ন- দানোৎপন্ন ধর্ম), পায়িত পেয়দ্রব্য প্রদানজনিত ধর্ম, ইহ জন্ম, পরজন্ম এবং সমস্ত ভূত, এই বাক্যের সাহায্যেই জানা যায়। হে সম্রাট্, অতএব বাক্ই ব্রহ্ম। যিনি এই তত্ত্ব জানিয়া বাগব্রহ্মের উপাসনা করেন, বাক্য কখনও সেই বাগ্ ব্রহ্মবিদ্ পুরুষকে পরিত্যাগ করে না, এবং সমস্ত ভূতবর্গ ইহাকে উপহার প্রদান করে। তিনি এই শরীরেই দেবত্ব লাভ করেন, এবং দেহপাতের পর দেবতাতে মিলিত হন। ৩

বিদেহাধিপতি জনক বলিলেন—আমি এই বিদ্যার মূল্যস্বরূপ হস্তিতুল্য বৃষযুক্ত সহস্র গো তোমাকে প্রদান করিতেছি। তদুত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য বলি- লেন, আমার পিতা মনে করিতেন যে, শিষ্যকে উপদেশ না দিয়া অর্থাৎ শিষ্যকে কৃতার্থ না করিয়া, তাহার নিকট হইতে ধন গ্রহণ করিবে না। অভিপ্রায় এই যে, আমার পিতার যাহা অভিমত, আমারও তাহাই মত ॥২৪২৷৷২৷৷

যদেব তে কশ্চিদব্রবীৎ তচ্ছৃণবামেতি, অব্রবীন্ম উদঙ্কঃ শৌল্বায়নঃ প্রাণো বৈ ব্রহ্মেতি, যথা মাতৃমান্ পিতৃমানাচার্য্যবান্ ক্রয়াৎ তথা তচ্ছোল্বায়নোহব্রবীৎ—প্রাণো বৈ ব্রহ্মেতি, অপ্রাণতো হি কিঞ্চ স্যাদিতি, অব্রবীত্তু তে তস্যায়তনং প্রতিষ্ঠাম্? ন মেহব্রবীদিতি, একপাদ্বা এতৎ সম্রাড়িতি, সবৈ নো ক্রহি যাজ্ঞবল্ক্য। প্রাণ এবায়তনমাকাশঃ প্রতিষ্ঠা প্রিয়মিত্যেনদুপাসীত, কা প্রিয়তা যাজ্ঞবল্ক্য, প্রাণ এব সম্রাড়িতি হোবাচ, প্রাণস্য বৈ সম্রাট্ কামায়াযাজ্যং যাজয়ত্যপ্রতিগৃহ্যস্য প্রতিগৃহ্লাত্যপি, তত্র বধাশঙ্কং ভবতি, যাং দিশমেতি প্রাণস্যৈব সম্রাট্ কামায়, প্রাণো বৈ সম্রাট্ পরমং ব্রহ্ম। নৈনং প্রাণো জহাতি, সর্ব্বাণ্যেনং ভূতান্য- ভিক্ষরন্তি, দেবো ভূত্বা দেবানপ্যেতি, য এবং বিদ্বানেতদুপাস্তে;

৯৮২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হস্ত্যষভং সহস্রং দদামীতি হোবাচ জনকো বৈদেহঃ, স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ পিতা মেহমন্যত নাননুশিষ্য হরেতেতি ॥ ২৪৩ ॥ ৩ ॥

সরলার্থঃ।—[যাজ্ঞবল্ক্যঃ পুনরাহ—হে সম্রাট্,] কশ্চিৎ(আচার্য্যঃ) যৎ এব(তত্ত্বং) তে(তুভ্যম্) অব্রবীৎ; তৎ শৃণবাম ইতি।[জনক আহ—] শৌদ্বায়নঃ(শুল্বস্যাপত্যং পুমান্) উদঙ্কঃ(তন্নামকঃ আচার্য্যঃ) মে(মহাং) অব্রবীৎ —প্রাণঃ বৈ ব্রহ্ম-ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] মাতৃমান্ পিতৃমান্ আচার্য্যবান্ (ঈদৃশগুণসম্পন্ন আচার্য্যঃ) যথা ক্রয়াৎ(কথয়েৎ], শৌদ্বায়নঃ তথা তৎ অব্রবীৎ— প্রাণঃ ব্রহ্মেতি।[যুক্তঞ্চৈতৎ]—হি(যস্মাৎ) অপ্রাণতঃ(প্রাণব্যাপারমকুর্ব্বতঃ প্রাণরহিতস্য) কিং স্যাৎ?(ন কিমপীত্যর্থঃ)। হে সম্রাট্, তু(পুনঃ) তস্য আয়তনং প্রতিষ্ঠাং চ তে(তুভ্যম্) অগ্রবীৎ?[আচার্য্যঃ]।[জনক আহ—] মে(মহ্যাং) ন অব্রবীৎ ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হে সম্রাট্, একপাদ বৈ এতৎ(পাদত্রয়রহিতং পাদমাত্রং ব্রহ্মণ এতদিত্যর্থঃ)।[জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, স বৈ নঃ ক্রহি[ইতি]।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] প্রাণ এব আয়তনং, আকাশঃ প্রতিষ্ঠা(আশ্রয়ঃ), প্রিয়মিতি এনৎ(প্রাণব্রহ্ম) উপাসীত।[জনক আহ—] প্রিয়তা কা? হে সম্রাট্, প্রাণ এব ইতি হ যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ; হে সম্রাট্, প্রাণস্য কামায়(প্রাণতৃপ্ত্যর্থং) বৈ অযাজ্যং(যাজনানর্হং যাজয়তি), অপ্রতিগৃহ্যাস্থ্য (যস্মাৎ প্রতিগ্রহো ন কর্তব্যঃ, তস্মাদপি) প্রতিগৃহ্লাতি(দ্রব্যাদিকং স্বীক- রোতি); তথা প্রাণস্যৈব কামায়(তৃপ্তয়ে) যাং দিশৎ এতি(গচ্ছতি), তত্র (তস্যাং দিশি) বধাশঙ্কং(বধাশঙ্কা—মরণ-ত্রাসঃ) ভবতি;[অতঃ] হে সম্রাট্, প্রাণঃ বৈ পরমং ব্রহ্ম। যঃ এবং বিদ্বান্(জানন্ সন্) এতৎ(প্রাণব্রহ্ম) উপাস্তে; এনং(উপাসকং) প্রাণঃ ন জহাতি(অন্য অকালমৃত্যুর্ন ভবতি); সর্ব্বাণি ভূতানি এনং অভিক্ষরন্তি(উপহরন্তি); দেবঃ ভূত্বা দেবান্ অপ্যেতি। বৈদেহঃ জনক উবাচ হ—[বিদ্যানিষ্ক্রয়ার্থং] হস্ত্যষভৎ সহস্রৎ দদামি ইতি। যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ হ—শিষ্যং অননুশিষ্য[শিষ্যাৎ] ন হরেত ইতি মে পিতা অমন্যত;[মমাপি তদেব মতমিতি ভাবঃ] ॥২৪৩৷৷৩

মুলাসুবাক:-[পুনশ্চ যাজ্ঞবল্ক্য জনককে জিজ্ঞাসা করি- লেন-] অপর কোন আচার্য্য তোমাকে যাহা বলিয়াছেন, তাহা শুনিতে ইচ্ছা করি।[জনক বলিলেন-] উদঙ্কনামক শৌল্বায়ন-শুল্বের পুত্র আমাকে বলিয়াছেন যে, প্রাণই ব্রহ্ম।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] মাতৃমান্

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯৮৩

পিতৃমান্ ও আচার্য্যোপদিষ্ট আচার্য্য যেরূপ বলিয়া থাকেন, শৌল্বায়ন উদঙ্কও তোমাকে ঠিক সেইরূপই প্রাণব্রহ্মের উপদেশ দিয়াছেন; কেন না, যে ব্যক্তি প্রাণহীন, তাহার ঐহিক বা পারলৌকিক কোন কার্য্যই নিষ্পন্ন হয় না। কিন্তু হে সম্রাট, তোমাকে সেই প্রাণব্রহ্মের আয়তন (শরীর) ও আশ্রয়ের উপদেশ দিয়াছেন কি?[জনক বলিলেন-] না, তাহা আমাকে বলেন নাই; আপনি যখন জানেন, তখন আপনিই আমাকে তাহা বলুন।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] প্রাণ ইহার আয়তন, আকাশ ইহার প্রতিষ্ঠা বা আশ্রয়, ইহাকে ‘প্রিয়’ বলিয়া উপাসনা করিবে।[জনক জিজ্ঞাসা করিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই প্রিয়তা কি?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] হে সম্রাট, প্রাণই প্রিয়তা,(তদতিরিক্ত কিছু নহে); কেননা, লোকে এই প্রাণের পরিতৃপ্তিসাধনের জন্যই অযাজ্য-যাজন করে, অপ্রতিগ্রাহ্য লোকের নিকট প্রতিগ্রহ করে, এবং যেদিকে যায়, সেই দিকেই আপনার বধাশঙ্কা করে,-এ সমস্তই প্রাণের প্রিয়তার ফল; অতএব, হে সম্রাট, প্রাণই পরমব্রহ্ম। যে লোক এই প্রকারে প্রাণব্রহ্ম অবগত হইয়া উপাসনা করে, প্রাণ কখনই [অসময়ে] তাহাকে ত্যাগ করে না; এবং সমস্ত ভূত ইহাকে উপহার প্রদান করে; সেব্যক্তি এই দেহেই দেবত্ব লাভ করে, এবং দেহপাতের পর সেই দেবতাকে প্রাপ্ত হয়। বিদেহাধিপতি জনক বলিলেন, আমি তোমাকে হস্তিতুল্য বৃষসমন্বিত সহস্র গো দান করিতেছি। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-আমার পিতার অভিমত এই যে, শিষ্যকে কৃতার্থ না করিয়া তাহার নিকট হইতে কিছু গ্রহণ করিবে না;[আমারও তাহাই মত] ॥২৪৩৷৷৩৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্।—যদেব তে কশ্চিদব্রবীৎ—উদঙ্কো নামতঃ, শুবস্যা- পত্যং শৌঘায়নোহব্রবীৎ—প্রাণো বৈ ব্রহ্মেতি, প্রাণো বায়ুর্দেবতা, পূর্ব্ববৎ। প্রাণ এবায়তনমাকাশঃ প্রতিষ্ঠা; উপনিষদ্—প্রিয়মিত্যেনদুপাসীত। কথং পুনঃ প্রিয়ত্বম্? প্রাণস্য বৈ, হে সম্রাট্, কামায় প্রাণস্যার্থায় অযাজ্যং যাজয়তি পতি- তাদিকমপি; অপ্রতিগৃহ্যান্যুগ্রাদেঃ প্রতিগৃহ্লাত্যপি; তত্র তস্যাৎ দিশি বধ- নিমিত্তমাশঙ্কং বধাশঙ্কা ইত্যর্থঃ, যাৎ দিশমেতি তস্করাদ্যাকীর্ণাঞ্চ, তস্যাৎ দিশি

৯৮৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বধাশঙ্কা; তচ্চৈতৎ সর্ব্বং প্রাণস্য প্রিয়ত্বে ভবতি, প্রাণস্যৈব সম্রাট্ কামায়। তস্মাৎ প্রাণো বৈ সম্রাট্, পরমং ব্রহ্ম, নৈনং প্রাণো জহাতি। সমান- মন্যুৎ ॥২৪৩৷৷৩৷৷

টীকা। যথা বাগগ্নিদেবতা, তদ্বদিত্যাহ—পূর্ব্ববদিতি। প্রাণ এবায়তনমিতাত্র প্রাণশব্দঃ করণবিষয়ঃ। পতিতাদিকমিত্যাদিপদমকুলীনগ্রহার্থম্। উগ্রো জাতিবিশেষঃ। আদিশব্দেন ম্লেচ্ছগণো গৃহ্যতে ॥২৪৩৷৷৩॥

ভাষ্যানুবাদ।—“যদেব তে কশ্চিদ্ অব্রবীৎ”[ইত্যাদি প্রশ্ন; তদুত্তরে জনক বলিলেন—] উদঙ্কনামক শৌদ্বায়ন(শূলের পুত্র) বলিয়াছেন,—প্রাণই ব্রহ্ম। পূর্ব্বের ন্যায় এখানেও প্রাণ অর্থ—বায়ু দেবতা। প্রাণ তাহার আয়তন (শরীর), আকাশ তাহার প্রতিষ্ঠা(আশ্রয়); ‘প্রিয়’ তাহার উপনিষদ্‌—রহস্য নাম; ‘প্রিয়’ বলিয়াই ইহার উপাসনা করিবে।

প্রাণের প্রিয়ত্ব কিরূপে? হে সম্রাট, যেহেতু প্রাণের কামনায় অর্থাৎ প্রাণের তৃপ্তির জন্য লোকে অযাজ্য পতিতাদিরও যাজন করে; যাহাদের নিকট প্রতিগ্রহ—দানগ্রহণ করিতে নাই, সেই উগ্র প্রভৃতি জাতির(১) নিকট হইতেও প্রতিগ্রহ করিয়া থাকে; এবং তস্কর ও দস্যুপ্রভৃতিতে পরিপূর্ণ যে কোন দিকে গমন করে, সেই দিকেই আপনার বধাশঙ্কা করিয়া থাকে, অর্থাৎ অনিষ্টপাতের সম্ভাবনা করিয়া থাকে। হে সম্রাট, প্রাণই পরম ব্রহ্ম; প্রাণ কখনই তাহাকে[অকালে] ত্যাগ করে না। অন্যাংশের ব্যাখ্যা পূর্ব্ব শ্রুতির অনুরূপ ॥২৪৩৷৷৩

যদেব তে কশ্চিদব্রবীৎ তচ্ছৃণবামেতি, অব্রবীন্মে বকু র্ব্বার্ফ- শ্চক্ষুর্ব্বে ব্রহ্মেতি, যথা মাতৃমান্ পিতৃমানাচার্য্যবান্ ক্রয়াৎ, তথা তদ্বাঙ্কোহব্রবীচ্চক্ষুর্ব্বেব্রহ্মেতি, অপশ্যতো হি কিংস্যাদিতি, অব্র- বীৎ তু তে তস্যায়তনং প্রতিষ্ঠাং, ন মেহব্রবীদিতি, একপাদ্বা এতৎ

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

১৮৫

সম্রাড়িতি, স বৈ নো ব্রূহি যাজ্ঞবল্ক্য, চক্ষুরেবায়তনমাকাশঃ প্রতিষ্ঠা সত্যমিত্যেনদুপাসীত, কা সত্যতা যাজ্ঞবল্ক্য, চক্ষুরেব সম্রাড়িতি হোবাচ, চক্ষুযা বৈ সম্রাট্ পশ্যন্তমাহুরদ্রাক্ষীরিতি, স আহাদ্রাক্ষমিতি, তৎ সত্যং ভবতি, চক্ষুর্বৈ সম্রাট্ পরমং ব্রহ্ম; নৈনং চক্ষুর্জহাতি সর্বাণ্যেনং ভূতান্যভিক্ষরন্তি দেবো ভূত্বা দেবানপ্যেতি য এবং বিদ্বানেতদুপাস্তে। হস্ত্যষভৎ সহস্রং দদামীতি হোবাচ জনকো বৈদেহঃ। স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ পিতা মেহমন্যত নাননুশিষ্য হরেতেতি ॥ ২৪৪ ॥ ৪ ॥

সরলার্থঃ।-[যাজ্ঞবল্ক্য: পুনরপি জনকমাহ-] কশ্চিৎ(আচার্য্যঃ) তে(তুভ্যং) যৎ এব অব্রবীৎ, তৎ শৃণবাম ইতি।[জনক আহ-] বাষ্ণঃ (বৃষ্ণস্য অপত্যং) বকুঃ মে অব্রবীৎ-চক্ষুঃ বৈ ব্রহ্ম-ইতি।(যুক্তমুক্তমেতৎ-) মাতৃমান্ পিতৃমান্ আচার্য্যবান্[আচার্য্যঃ] যথা ক্রয়াৎ, তথা বকুঃ তৎ অব্রবীৎ -চক্ষুঃ বৈ ব্রহ্ম ইতি। হি(যতঃ) অপশ্যতঃ(দর্শনশক্তিবিহীনস্য) কিং স্যাৎ? (ন কিমপীত্যর্থঃ) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] তস্য(চক্ষুব্রহ্মণঃ) আয়তনং প্রতিষ্ঠাৎ চ তে(তুভ্যং) অব্রবীৎ[আচার্য্যঃ]?[জনক আহ-] মে(মহ্যাং) ন অব্রবীৎ-ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] হে সম্রাট্, এতৎ(চক্ষুব্রহ্ম) বৈ একপাদ (পাদত্রয়হীনং ব্রহ্মেত্যর্থঃ)।[জনক আহ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, সঃ(তদ্বিজ্ঞানবান্ ত্বং) নঃ(অস্মান্) ব্রূহি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] চক্ষুঃ এব আয়তনং, আকাশঃ প্রতিষ্ঠা, সত্যম্ ইতি(সত্যনাম্না) এনৎ(চক্ষুব্রহ্ম) উপাসীত।[জনক আহ-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, কা সত্যতা?[যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ]-হে সম্রাট্, চক্ষুঃ এব ইতি। হে সম্রাট্, চক্ষুষা পশ্যন্তং বৈ আহুঃ-[ত্বম্] অদ্রাক্ষীঃ?(দৃষ্টবান্ অসি কিম্?) ইতি; সঃ(দ্রষ্টা) আহ(কথয়তি)-অদ্রাক্ষম্(দৃষ্টবান্ অস্মি) ইতি; তৎ (তদুক্তৎ) সত্যৎ(অব্যভিচারি) ভবতি;[অতঃ] হে সম্রাট্, চক্ষুঃ বৈ পরমৎ ব্রহ্ম ইতি। য এবং বিদ্বান্(জানন্) ‘এতৎ(চক্ষুব্রহ্ম) উপাস্তে, চক্ষুঃ এনৎ ন জহাতি; সর্ব্বাণি ভূতানি এনং অভিক্ষরন্তি; তথা দেবঃ ভূত্বা দেবান্ অপ্যেতি। বৈদেহঃ জনকঃ উবাচ হ-হস্ত্যষভৎ সহস্রং দদামীতি।[তৎ শ্রুত্বা] সঃ -যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ-অননুশিষ্য হরেত-ইতি যে পিতা অমন্যত ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ ॥২৪৪৷৷

৯৮৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মূলানুবাদ:-[যাজ্ঞবল্ক্য জনককে জিজ্ঞাসা করিলেন-] অপর কোন আচার্য্য তোমাকে যাহা উপদেশ দিয়াছেন, তাহা শুনিতে ইচ্ছা করি।[জনক বলিলেন-] বৃষ্ণের পুত্র বকু আমাকে বলিয়াছেন যে, ‘চক্ষুঃ বৈ ব্রহ্ম’(চক্ষু হইতেছে ব্রহ্ম) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] তিনি ঠিক বলিয়াছেন; মাতা পিতা ও গুরুর নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত আচার্য্য যেরূপ বলিয়া থাকেন, বাষ্ণও ঠিক সেইরূপই তোমাকে বলিয়াছেন-‘চক্ষুঃ বৈ ব্রহ্ম’ ইতি; কেন না, যে লোক দেখিতে পায় না -চক্ষুহীন, তাহার কোন্ কার্য্য সাধিত হয়?(কোন কার্য্যই নহে), কিন্তু[জিজ্ঞাসা করি, তিনি] তোমাকে উহার আয়তন(শরীর) ও প্রতিষ্ঠা(আশ্রয়) বলিয়াছেন কি?[জনক বলিলেন-] না-তিনি আমাকে তাহা বলেন নাই।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] হে সম্রাট, ইহা ব্রহ্মের এক পাদ বা একাংশ মাত্র,(এখনও অপর তিন পাদ অবিজ্ঞাত রহিয়াছে)।[জনক বলিলেন,] হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি যখন তাহা জান, তখন তুমিই আমাকে তাহা বল।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] চক্ষু ইহার আয়তন, আকাশ ইহার প্রতিষ্ঠা, ‘সত্য’ ইহার রহস্য নাম; অতএব সত্য বলিয়াই ইহার উপাসনা করিবে।[জনক জিজ্ঞাসা করিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই সত্যতা কাহাকে বলে? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, হে সম্রাট, উহা চক্ষুই(তদতিরিক্ত কিছু নহে); কেন না, হে সম্রাট, যে ব্যক্তি চক্ষু দ্বারা দর্শন করিতে সমর্থ, তাহাকে লোকে জিজ্ঞাসা করিয়া থাকে যে, তুমি দেখিয়াছ কি? সে ব্যক্তি তদুত্তরে বলিয়া থাকে যে, হাঁ, আমি দেখিয়াছি। তাহার সে কথা সত্য বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে; অতএব হে সম্রাট, চক্ষুই পরম ব্রহ্ম। যে ব্যক্তি এইরূপ জানিয়া চক্ষু-ব্রহ্মের উপাসনা করে, চক্ষু কখনও তাহাকে ত্যাগ করে না; এবং সমস্ত ভূতই তাহাকে উপহার প্রদান করে, এবং তিনি এই দেহেই দেবত্ব লাভ করিয়া দেহপাতের পর দেবতার সাযুজ্য লাভ করেন।[এ কথার পর] বিদেহ- পতি জনক বলিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, আমি তোমাকে হস্তিতুল্য বৃষভযুক্ত সহস্র গো প্রদান করিতেছি।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] আমার পিতা

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নবমঃ ব্রাহ্মণম্।

১৮৭

মনে করিতেন যে, শিষ্যকে উপদেশ দ্বারা কৃতার্থ না করিয়া, তাহার নিকট হইতে কিছু গ্রহণ করিবে না;(আমারও তাহাই ইচ্ছা) ॥ ২৪৪ ॥ ৪ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—যদেব তে কশ্চিৎ বকুরিতি নামতঃ বৃষ্ণস্যাপত্যৎ বাঙ্কঃ অব্রবীৎ চক্ষুর্বৈ ব্রহ্মেতি, আদিত্যো দেবতা চক্ষুষি। উপনিষৎ—সত্যম্। যস্মাৎ শ্রোত্রেণ শ্রুতমনৃতমপি স্যান্নতু চক্ষুষা দৃষ্টম্। তস্মাদ্বৈ সম্রাট্, পশ্যন্তমাহুঃ— অদ্রাক্ষীস্তং হস্তিনমিতি, স চেৎ অদ্রাক্ষমিত্যাহ, তৎ সত্যমেব ভবতি। যস্তন্যো ক্রয়াৎ—অহমশ্রৌষমিতি, তদ্ব্যভিচরতি। যত্তু চক্ষুষা দৃষ্টম্, তদব্যভিচারিত্বাৎ সত্যমেব ভবতি ॥২৪৪॥৪॥

টীকা। চতুর্ব্বর্ণঃ সত্যত্বং সাধয়তি—যস্মাদিতি। উক্তমেবোপপাদয়তি—যস্তিতি ॥২৪৪॥৪॥

ভাষ্যানুবাদ।—“যদেব তে কশ্চিৎ” ইত্যাদি। বকু নামক, বৃষ্ণের পুত্র—বাঞ্চ। ‘চক্ষুই ব্রহ্ম’ একথার অর্থ এই যে, চক্ষুর অধিদেবতা সূর্য্যঃ। তাহার উপনিষৎ(গোপনীয় নাম হইতেছে)—সত্য; যেহেতু শ্রবণেন্দ্রিয় দ্বারা যাহা শ্রবণ করা হয়, তাহা অসত্যও হইতে পারে, কিন্তু চক্ষু দ্বারা দৃষ্ট বস্তু সেরূপ হয় না; সেই হেতু, হে সম্রাট্, চক্ষু দ্বারা দর্শনকারীকে লক্ষ্য করিয়া লোকে বলিয়া থাকে যে, তুমি হস্তী দেখিয়াছ? সে যদি বলে হাঁ, আমি দেখিয়াছি; তাহা হইলে, উহা সত্যই হইয়া থাকে; কিন্তু অন্যে যদি বলে, আমি হস্তীর কথা শুনিয়াছি মাত্র,(কিন্তু কখনও দেখি নাই), তাহা হইলে, সে কথা অন্যথা হইতে পারে; কিন্তু যাহা চক্ষু দ্বারা দৃষ্ট হয়, তাহার কখনই অন্যথা হয় না,(সত্যই হয়) ॥২৩৪৷৷৪৷৷

যদেবতে কশ্চিদব্রবীৎ তচ্ছূণবামেতি, অব্রবীন্মে গর্দভীবিপীতো ভারদ্বাজঃ শ্রোত্রং বৈ ব্রহ্মেতি, যথা মাতৃমান্ পিতৃমানাচার্য্যবান্ ক্রয়াৎ তথা তদ্দ্বারদ্বাজোহব্রবীচ্ছোত্রং বৈ ব্রহ্মেত্যশৃণ্বতো হি কিং স্যাদিতি, অব্রবীত্তু তে তস্যায়তনং প্রতিষ্ঠাম্, ন মেহব্রবীদিত্যে- কপাদ্বা এতৎ সম্রাড়িতি, সবৈ নো ক্রহি যাজ্ঞবল্ক্য, শ্রোত্র- মেবায়তনমাকাশঃ প্রতিষ্ঠাহনন্ত ইত্যেনদুপাসীত। কাহনন্ততা যাজ্ঞবল্ক্য, দিশ এব সম্রাড়িতি হোবাচ, তস্মাদ্বৈ সম্রাড়পি যাং কাঞ্চ দিশং গচ্ছতি, নৈবাস্যা অন্তং গচ্ছত্যনন্তা হি দিশো দিশো বৈ সম্রাট্ শ্রোত্রং শ্রোত্রং বৈ সম্রাট্ পরমং ব্রহ্ম, নৈনশ্রোত্রং জহাতি সর্ব্বাণ্যেনং ভূতান্যভিক্ষরন্তি দেবো ভূত্বা দেবানপ্যেতি,

৯৮৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

য এবং বিদ্বানেতদুপাস্তে। হস্ত্যষভং সহস্রং দদামীতি হোবাচ জনকো বৈদেহঃ, সহোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ পিতা মেহমন্যত নাননুশিষ্য হরেতেতি ॥২৪৫॥৫৷৷

সন্মলার্থঃ।—[যাজ্ঞবল্ক্যঃ পুনরপি জনকং প্রত্যাহ—] যদেব তে কশ্চিৎ- (আচার্য্যঃ) অব্রবীৎ, তৎ শূণবাম ইতি পূর্ব্ববৎ।[জনক আহ—] গর্দভীবিপীতঃ ভারদ্বাজঃ(ভরদ্বাজস্যাপত্যৎ) মে অব্রবীৎ—শ্রোত্রং(শ্রবণেন্দ্রিয়ং) বৈ ব্রহ্ম ইতি। যথা মাতৃমান্ পিতৃমান্ আচার্য্যবান্ ক্রয়াৎ, তথা তৎ অব্রবীৎ—শ্রোত্রং বৈ ব্রহ্ম- ইতি; হি(ধস্মাৎ) অশৃণতঃ(শ্রবণম্ অকুর্ব্বতঃ জনস্য) কিং স্যাৎ?(ন কিম- পীত্যর্থঃ) ইতি। তু(কিন্তু) তস্য(শ্রোত্রব্রহ্মণঃ) আয়তনং প্রতিষ্ঠাৎ[চ] তে (তুভ্যং) অব্রবীৎ?[জনক আহ—] ন মে অব্রবীৎ ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] হে সম্রাট্, একপাদ বৈ এতৎ(শ্রোত্র-ব্রহ্ম) ইতি।[জনক আহ—] হে যাজ্ঞ- বল্ক্য, সঃ(ত্বং) নঃ(অস্মান্) বৈ ব্রহি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] শ্রোত্রং এব আয়- তনম্, আকাশঃ প্রতিষ্ঠা, অনন্ত ইতি এনৎ(শ্রোত্রব্রহ্ম) উপাসীত। জনক আহ— হে যাজ্ঞবল্ক্য, অনন্ততা কা?[যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ]—হে সম্রাট্, দিশ এব ইতি। তস্মাৎ বৈ সম্রাট্ অপি যাৎ কাং চ দিশং গচ্ছতি, অস্যাঃ(দিশঃ) অন্তং (সমাপ্তিং) নৈব গচ্ছতি(প্রাপ্নোতি); হি(যস্মাৎ) দিশঃ অনন্তাঃ(অন্তরহিতাঃ)। হে সম্রাট্, দিশঃ বৈ(এব) শ্রোত্রং(দিগধিষ্ঠিতং শ্রোত্রমিত্যর্থঃ); হে সম্রাট্- [অতএব] শ্রোত্রং বৈ পরমং ব্রহ্ম। যঃ এবং বিদ্বান্(জানন্) এতৎ(শ্রোত্র- ব্রহ্ম) উপাস্তে, শ্রোত্রং এনং(বিদ্বাংসং) ন জহাতি; সর্বাণি ভূতানি এনং অভিক্ষরন্তি; সঃ দেবঃ ভূত্বা[দেহপাতানন্তরৎ] দেবান্ অপ্যেতি।[হে যাজ্ঞ- বল্ক্য,] হস্ত্যষভং সহস্রং(গোসহস্রং) দদামি—ইতি হ বৈদেহঃ জনক উবাচ। লঃ যাজ্ঞবল্ক্য উবাচ হ—মে(মম) পিতা অমন্যত—অননুশিষ্য ন হরেত(শিষ্যাৎ- কিঞ্চিদপি ন গৃহ্লীয়াৎ) ইতি;[মমাপি তদভিমতমিতি ভাবঃ] ॥২৪৫৷৷

মূলানুবাদ।—[যাজ্ঞবল্ক্য জিজ্ঞাসা করিলেন—] তোমাকে অপর আচার্য্য যাহা বলিয়াছেন, তাহা আমরা শুনিতে ইচ্ছা করি।[জনক বলিলেন—] গর্দভীবিপীতনামক ভরদ্বাজপুত্র আমাকে বলিয়াছেন— ‘শ্রোত্রই ব্রহ্ম’।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] মাতৃমান্ পিতৃমান্ ও আচার্য্যবান্ গুরু যেরূপ বলিয়া থাকেন; ভরদ্বাজপুত্রও ঠিক সেইরূপই উপদেশ দিয়াছেন যে, ‘শ্রোত্রই ব্রহ্ম’; কেন না, যে ব্যক্তি শুনিতে পায় না, তাহার

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্।

১৯৯

কোন্ কার্য্য সম্পন্ন হয়?(কোন কার্য্যই নহে)।[যাজ্ঞবল্ক্য জিজ্ঞাসা করিলেন-] তাহার আয়তনও প্রতিষ্ঠা তোমাকে বলিয়াছেন কি?[জনক বলিলেন,] না-তাহা আমাকে বলেন নাই।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] হে সম্রাট, ইহা ব্রহ্মের একটি পাদ বা একাংশ মাত্র।[জনক বলিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমিই আমাকে তাহা বল।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] শ্রোত্রই ইহার আয়তন, আকাশ ইহার প্রতিষ্ঠা এবং ‘অনন্ত’ ইহার উপনিষদ্; অতএব ‘অনন্ত’ বলিয়া ইহার উপাসনা করিবে। হে যাজ্ঞবল্ক্য, সেই অনন্তত্ব কি? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-হে সম্রাট্, দিক্সমূহই অনন্ত; সেই হেতুই সম্রাটও যে কোন দিকে গমন করে, নিশ্চয়ই তিনিও ইহার অন্ত পান না; কেন না, দিক্সমূহ অনন্ত; সেই দিক্কই শ্রোত্র, এবং পরম ব্রহ্ম।

যে ব্যক্তি এইরূপ অবগত হইয়া শ্রোত্র-ব্রহ্মের উপাসনা করেন; শ্রোত্র কখনই তাহাকে ত্যাগ করে না; সমস্ত ভূত ইহার উদ্দেশে বলি উপহার দেয়, এবং এই দেহেই দেবত্ব লাভ করিয়া দেহপাতের পর দেবভাব প্রাপ্ত হন। বিদেহপতি জনক বলিলেন—আমি তোমাকে হস্তিতুল্য বৃষভযুক্ত সহস্র গো দান করিতেছি। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, আমার পিতার অভিমত ছিল এই যে, শিষ্যকে কৃতার্থ না করিয়া কিছু গ্রহণ করিবে না;(আমারও তাহাই মত) ॥ ২৪৫ ॥ ৫ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—যদেব তে গর্দভীবিপীত ইতি নামতঃ; ভারদ্বাজো গোত্রতঃ। শ্রোত্রং বৈ ব্রহ্মেতি। শ্রোত্রে দিগদেবতা; অনন্ত ইত্যেনদুপাসীত। কা অনন্ততা শ্রোত্রস্য? দিশ এব শ্রোত্রস্যানন্ত্যৎ যস্মাৎ, তস্মাদ্বৈ সম্রাট্, প্রাচী- মুদীচীৎ বা যাৎ কাঞ্চিদপি দিশৎ গচ্ছতি, নৈব অন্যা অন্তং গচ্ছতি কশ্চিদপি। অতোহনন্তা হি দিশঃ, দিশো বৈ সম্রাট্ শ্রোত্রম্; তস্মাদ্দিগানন্ত্যমেব শ্রোত্র- স্যানন্ত্যম্ ॥২৪৫॥৫৷৷

টীকা। দিবাগতরাত্রিদি যোনিয়াং কিমাত্মা, তত্র—দিবা বা রাত্রি। ২৪৫।৫।

ভাষ্যানুবাদ।—গর্দভীবিপীতনামক ভারদ্বাজ—ভরদ্বাজগোত্রজ ঋষি— [আমাকে বলিয়াছেন,] ‘শ্রোত্রই ব্রহ্ম’[এ কথার অভিপ্রায়—] দিক্ই শ্রবণে- ন্দ্রিয়ের দেবতা। ইহাকে ‘অনন্ত’ বলিয়া উপাসনা করিবে। শ্রোত্রের অনন্তত্ব কিরূপ? যেহেতু দিক্ সমুহই শ্রবণেন্দ্রিয়ের আনন্ত্য(অসীমতা); হে সম্রাট,

৯৯০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সেই হেতু পূর্ব্ব ও উত্তর কিংবা অন্য যে কোন দিকে গমন করুক না কেন, কেহই সেই দিকের অন্ত পায় না; এই কারণে দিক্সমূহ অনন্ত। হে সম্রাট্, দিক্- সমূহই শ্রোত্র; অতএব দিকের অনন্ততাই শ্রবণেন্দ্রিয়ের অনন্ততা বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে ॥২৪৫৷৷৫৷৷

যদেব তে কশ্চিদব্রবীৎ তচ্ছৃণবামেতি, অব্রবীন্মে সত্যকামো জাবালো মনো বৈ ব্রহ্মেতি, যথা মাতৃমান্ পিতৃমানাচার্য্যবান্ ক্রয়াৎ, তথা তজ্জাবালোহব্রবীন্মনো বৈ ব্রহ্মেত্যমনসো হি কিং স্যাদিতি, অব্রবীত্তু তে তস্যায়তনং প্রতিষ্ঠাম্, ন মেহব্রবীদিত্যে- কপাদ্বা এতৎ সম্রাড়িতি, স বৈ নো ক্রহি যাজ্ঞবল্ক্য, মন এবায়- তনমাকাশঃ প্রতিষ্ঠানন্দ ইত্যেনদুপাসীত, কানন্দতা যাজ্ঞবল্ক্য, মন এব সম্রাড়িতি হোবাচ, মনসা বৈ সম্রাট্ স্ত্রিয়মভিহার্য্যতে, তস্যাং প্রতিরূপঃ পুত্রো জায়তে স আনন্দো মনো বৈ সম্রাট্ পরমং ব্রহ্ম, নৈনং মনো জহাতি সর্ব্বাণ্যেনং ভূতান্যভিক্ষরন্তি দেবো ভূত্বা দেবানপ্যেতি য এবং বিদ্বানেতদুপাস্তে, হস্ত্যষভং সহস্রং দদামীতি হোবাচ জনকো বৈদেহঃ, স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ পিতা মেহমন্যত নাননুশিষ্য হরেতেতি ॥ ২৪৬ ॥ ৬ ॥

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—নবমং ব্রাহ্মণম্। ৯৯১

নন্দতা ইত্যর্থঃ); হে সম্রাট, বৈ(যতঃ) মনসা স্ত্রিয়ৎ(স্ত্রী) অভিহার্য্যতে(প্রার্থ্যতে), তস্যাৎ(প্রার্থিতায়াৎ স্ত্রিয়াৎ) প্রতিরূপঃ(আত্মানুরূপঃ) পুত্রঃ জায়তে; সঃ(পুত্রঃ) আনন্দঃ(আনন্দকরঃ); অতএব হে সম্রাট, মনঃ বৈ পরমং ব্রহ্ম। যঃ বিদ্বান্ এতৎ(মনোব্রহ্ম) এবং উপাস্তে, মনঃ এনৎ(বিদ্বাৎসং) ন জহাতি, সর্ব্বাণি ভূতানি এনং অভিক্ষরন্তি;[সঃ] দেবঃ ভূত্বা দেবান্ অপ্যেতি। বৈদেহঃ জনক উবাচ হ—[হে যাজ্ঞবল্ক্য,] হস্ত্যুষভৎ সহস্রং দদামি ইতি। সঃ যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ—অননুশিষ্য ন হরেত ইতি মে পিতা অমন্যত।[অন্যৎ সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ] ॥২৪৬৷৷৬

মূলানুবাদ।—যাজ্ঞবল্ক্য পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন—হে সম্রাট, তোমাকে অপর কোন আচার্য্য যাহা বলিয়াছেন, তাহা শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি।[জনক বলিলেন,] সত্যকামনামক জাবাল(জবালার পুত্র) আমাকে বলিয়াছেন যে, মনই ব্রহ্ম। মাতা পিতা ও আচার্য্যের নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত আচার্য্য যেরূপ বলিয়া থাকেন, জাবালও ঠিক সেইরূপই মনোব্রহ্মের উপদেশ দিয়াছেন; কারণ, যাহার মন নাই, তাহার কোন কার্য্যই হইতে পারে না; কিন্তু তিনি তাহার ‘আয়তন’ ও ‘প্রতিষ্ঠা’ বলিয়াছেন কি?[জনক বলিলেন,] না, তাহা আমাকে বলেন নাই। [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] হে সম্রাট, ইহা হইতেছে ব্রহ্মের একটিমাত্র পাদ, (আরো তিন পাদ তোমার জ্ঞাতব্য রহিয়াছে)।[জনক বলিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমিই আমাকে তাহা বল।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] মনই আয়তন, আকাশ তাহার প্রতিষ্ঠা, ইহাকে ‘আনন্দ’ বলিয়াউপাসনা করিবে। [জনক জিজ্ঞাসা করিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই আনন্দতা কি? [যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন]—হে সম্রাট, মনই; কেন না, মনের সাহায্যেই অভিমত স্ত্রীকে প্রার্থনা করা হইয়া থাকে; এবং তাহাতে আত্মানুরূপ পুত্র জন্মলাভ করে; সেই পুত্রই আনন্দ—আনন্দের কারণ হয়; অত- এব হে সম্রাট, ইহাই পরমব্রহ্ম। যে বিদ্বান্ ইহাকে এইরূপে উপাসনা করেন, মন কখনই তাহাকে ত্যাগ করে না; সমস্ত ভূততাঁহাকে উপহার প্রদান করে; এবংতিনি দেবতা হইয়া দেহপাতের পরদেব-সাযুজ্য লাভ করেন। বিদেহপতি জনক বলিলেন—তোমাকে আমি হস্তিতুল্য বৃষভযুক্ত সহস্র গো প্রদান করিতেছি। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে সম্রাট,

৯৯২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

আমার পিতা মনে করিতেন—শিষ্যকে কৃতার্থ না করিয়া কিছু গ্রহণ করিবে না,(আমারও তাহাই অভিমত) ॥ ২৪৬ ॥ ৬ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—সত্যকাম ইতি নামতঃ, জবালায়া অপত্যৎ জাবালঃ। চন্দ্রমা মনসো দেবতা, আনন্দ ইত্যুপনিষৎ; যস্মান্মন এবানন্দঃ, তস্মান্মনসা বৈ সম্রাট্, স্ত্রিয়মভিকাময়মানোহভিহার্য্যতে প্রার্থয়তে ইত্যর্থঃ। তস্মাৎ যাৎ স্ত্রিয়- মভিকাময়মানোহভিহার্য্যতে, তস্যাৎ প্রতিরূপঃ অনুরূপঃ পুত্রো জায়তে; স আনন্দহেতুঃ পুত্রঃ; স যেন মনসা নির্ব্বর্ত্যতে, তন্মন আনন্দঃ ॥২৪৬৷৷৬৷৷

টীকা। তথাপি কথমানন্দত্বং মনসঃ সম্ভবতি, তত্রাহ—ন যেনতি ॥২৪৬॥

ভাষ্যানুবাদ?—জবালার পুত্র জাবাল ঋষি ‘সত্যকাম’ নামে প্রসিদ্ধ। চন্দ্র হইতেছেন মনের দেবতা; আনন্দ তাহার ‘উপনিষদ্’; যেহেতু মনই আনন্দ (আনন্দের কারণ); সেই হেতু, হে সম্রাট্, স্ত্রীকামুক পুরুষ স্ত্রীকে প্রার্থনা করিয়া থাকে। অতএব যে স্ত্রীকে কামনা করিয়া অভিহার বা প্রার্থনা করিয়া থাকে, সেই স্ত্রীতে প্রতিরূপ(কামনানুরূপ) পুত্র জন্ম লাভ করে; সেই পুত্রই আনন্দের হেতুভূত(আনন্দকর) হয়। সেই পুত্র যে মনের দ্বারা নিষ্পাদিত হয়, সেই মন নিশ্চয়ই আনন্দস্বরূপ ॥২৪৬৷৷৬৷৷

যদেব তে কশ্চিদব্রবীৎ তচ্ছৃণবামেতি, অব্রবীন্মে বিদগ্ধঃ শাকল্যো হৃদয়ং বৈ ব্রহ্মেতি, যথা মাতৃমান্ পিতৃমানাচার্য্যবান্ ক্রয়াৎ তথা তচ্ছাকল্যোহব্রবীদ্ হৃদয়ং বৈ ব্রহ্মেত্যহৃদয়স্য হি কিঞ্চ স্যাদিতি, অব্রবীত্তু তে তস্যায়তনং প্রতিষ্ঠাম্, ন মেহব্রবীদিত্যেক- পাদ্বা এতৎ সম্রাড়িতি স বৈ নো ক্রহি যাজ্ঞবল্ক্য, হৃদয়মেবায়- তনমাকাশঃ প্রতিষ্ঠা স্থিতিরিত্যেনদুপাসীত, কা স্থিততা যাজ্ঞবল্ক্য, হৃদয়মেব সম্রাড়িতি হোবাচ, হৃদয়ং বৈ সম্রাট্ সর্ব্বেষাং ভূতানাং আয়তনং হৃদয়ং বৈ সম্রাট্ সর্ব্বেষাং ভূতানাং প্রতিষ্ঠা, হৃদয়ে হ্যেব সম্রাট্ সর্ব্বাণি ভূতানি প্রতিষ্ঠিতানি ভবন্তি, হৃদয়ং বৈ সম্রাট্ পরমং ব্রহ্ম, নৈনং হৃদয়ং জহাতি সর্ব্বাণ্যেনং ভূতান্যভিক্ষরন্তি দেবো ভূত্বা দেবানপ্যেতি য এবং বিদ্বানে- তদুপাস্তে, হস্ত্যষভসহস্রং দদামীতি হোবাচ জনকো

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—প্রথমং ব্রাহ্মণম্।

১৯৩

বৈদেহঃ, স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ পিতা মেহমন্যত নাননুশিষ্য হরেতেতি ॥ ২৪৭ ॥ ৭ ॥

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদি চতুর্থ্যাধ্যায়স্য প্রথমং ব্রাহ্মণম্ ॥৪॥১॥

সরলার্থঃ।—[যাজ্ঞবল্ক্য: পুনরপি আহ—] যৎ এব তে কশ্চিৎ অব্রবীৎ, তৎ শূণবাম ইতি।[জনক আহ—] বিদগ্ধঃ(পণ্ডিতঃ) শাকল্যঃ মে অব্রবীৎ,— হৃদয়ং বৈ ব্রহ্ম ইতি। যথা মাতৃমান্ পিতৃমান্ আচার্য্যবান্(পুরুষঃ) ক্রয়াৎ, তথা শাকল্যঃ তৎ অব্রবীৎ—হৃদয়ং ব্রহ্ম ইতি। হি(যস্মাৎ) অহৃদয়স্য(হৃদয়- রহিতস্য) কিং স্যাৎ? ইতি; তু(পুনঃ) তে(তুভ্যং) তস্য(হৃদয়-ব্রহ্মণঃ) আয়- তনং প্রতিষ্ঠাৎ চ অব্রবীৎ?[জনক আহ—] মে(মহাং) ন অব্রবীৎ ইতি। [যাজ্ঞবল্ক্য: আহ—] হে সম্রাট্, এতৎ বৈ একপাদ(ব্রহ্মণ একাংশমাত্রম্) ইতি। [জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, সঃ(বিদ্বান্ ত্বং) নঃ(অস্মান্) ক্রহি[ইতি]। [যাজ্ঞবল্ক্য: আহ—] হৃদয়ম্ এব আয়তনং, আকাশঃ প্রতিষ্ঠা; স্থিতিরিতি এনৎ (হৃদয়-ব্রহ্ম) উপাসীত।[জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, কা স্থিততা?[যাজ্ঞ- বল্ক্য:] উবাচ হ—হে সম্রাট্, হৃদয়ম্ এব(স্থিততা ইত্যর্থঃ)। হে সম্রাট্, হৃদয়ং বৈ সর্ব্বেষাং ভূতানাং প্রতিষ্ঠা, হে সম্রাট্, হৃদয়ে হি এব সর্ব্বাণি ভূতানি প্রতিষ্ঠিতানি ভবন্তি; হে সম্রাট্, হৃদয়ং বৈ পরমং ব্রহ্ম। যঃ বিদ্বান্ এতৎ(হৃদয়ং) এবং(যথোক্তেন প্রকারেণ) উপাস্তে, হৃদয়ং এনৎ(বিদ্বাংসং) ন জহাতি, সর্ব্বাণি ভূতানি এনং অভিক্ষরন্তি;[সঃ] দেবঃ ভূত্বা দেবান্ অপ্যেতি। বৈদেহঃ জনকঃ উবাচ হ—হস্ত্যষভৎ সহস্রং দদামি ইতি। সঃ যাজ্ঞবল্ক্য:[উবাচ হ—] অননু- শিষ্য ন হরেত ইতি মে পিতা অমন্যত;[মমাপি তথৈব মতমিত্যভিপ্রায়ঃ। অন্যৎ সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ] ॥২৪৭৷৷৭৷৷

মূলানুবাদ।—যাজ্ঞবল্ক্য পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন—অপর কোন আচার্য্য তোমাকে যাহা বলিয়াছেন, তাহা শুনিতে ইচ্ছা করি। [ জনক বলিলেন—] বিদগ্ধ(পণ্ডিত) শাকল্য আচার্য্য আমাকে বলিয়া- ছেন—হৃদয়ই ব্রহ্ম; মাতা, পিতা ও আচার্য্যোপদিষ্ট গুরু যেরূপ উপদেশ দিয়া থাকেন, শাকল্যও সেইরূপই বলিয়াছেন যে, হৃদয়ই ব্রহ্ম; কেন না, অহৃদয়ের কোন্ কার্য্য হইতে পারে? ভাল, তিনি তোমাকে তাহার আয়তন ও প্রতিষ্ঠা বলিয়াছেন কি? না—তিনি তাহা আমাকে বলেন নাই। হে

৯৯৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সম্রাট, ইহা ব্রহ্মের একটি মাত্র পাদ।[জনক বলিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, আমাকে তাহা বল।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] হৃদয়ই ইহার আয়তন, আকাশ ইহার প্রতিষ্ঠা, ‘স্থিতি’ বলিয়া ইহার উপাসনা করিবে।[জনক বলিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, স্থিততা কি?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] হে সম্রাট, হৃদয়ই[স্থিততা]; কারণ, হে সম্রাট, হৃদয়ই সমস্ত ভূতের আয়তন, হৃদয়ই সমস্ত ভূতের প্রতিষ্ঠা, হে সম্রাট, হৃদয়েই সমস্ত ভূত অবস্থিতি করে; অতএব হে সম্রাট, হৃদয়ই পরম ব্রহ্ম। হে সম্রাট, যে বিদ্বান্ এইরূপে ইহার উপাসনা করে, হৃদয় কখনই তাহাকে ত্যাগ করে না; সমস্ত ভূত তাহার জন্য উপহার প্রদান করে, এবং তিনি এই দেহেই দেবত্ব লাভ করিয়া দেহপাতের পর দেবসাযুজ্য লাভ করেন। বিদেহাধিপতি জনক বলিলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য, আমি তোমাকে হস্তিতুল্য ঋষভযুক্ত সহস্র সহস্র গো দান করিতেছি। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, আমার পিতা মনে করিতেন যে, শিষ্যকে কৃতার্থ না করিয়া কিছু গ্রহণ করিতে নাই,(আমারও তাহাই মত) ॥ ২৪৭ ॥ ৭ ॥

ইতি চতুর্থ্যাধ্যায় প্রথম অধ্যায়ের ব্যাখ্যা। ॥ ৪ ॥ ১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—বিদগ্ধঃ শাকল্যঃ—হৃদয়ং বৈ ব্রহ্মেতি। হৃদয়ং বৈ সম্রাট্, সর্ব্বেষাং ভূতানামায়তনম্; নামরূপকর্ম্মাত্মকানি হি ভূতানি হৃদয়াশ্রয়াণীত্য- বোচাম শাকল্যব্রাহ্মণে হৃদয়প্রতিষ্ঠানি চেতি। তস্মাদ হৃদয়ে হ্যেব, সম্রাট্, সর্ব্বাণি ভূতানি প্রতিষ্ঠিতানি ভবন্তি। তস্মাদ হৃদয়ং স্থিতিরিত্যুপাসীত। হৃদয়ে চ প্রজাপতির্দেবতা ॥২৪৭॥৭॥

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ চতুর্থোঽধ্যায়ঃ প্রথম-ব্রাহ্মণভাষ্যম্ ॥১॥

টীকা। কথং হৃদয়স্য সর্ব্বভূতায়তনত্বং তৎপ্রতিষ্ঠাত্বং চ, তদাহ-নামরূপেতি। তস্মাদিতি শাকল্যন্যায়পরামর্শঃ। ভূতানাং হৃদয়প্রতিষ্ঠত্বে ফলিতমাহ-তস্মাদ হৃদয়- মিতি ॥২৪৭॥৭॥

ইতি কৃষ্ণায় নমোঽপি মহাদেৱায় নমোঃ। চতুর্থ্যাধ্যায়ঃ প্রথমঃ॥১॥

ভাষ্যানুবাদ।—‘বিদগ্ধ শাকল্য’[বলিয়াছেন যে,] হৃদয়ই ব্রহ্ম। হে সম্রাট্, হৃদয়ই সমস্ত ভূতের আয়তন। নাম রূপ ও কর্ম্মাত্মক ভূতনিবহ যে, হৃদয়াশ্রিত এবং হৃদয়ে অবস্থিত, একথা আমরা পূর্ব্বে শাকল্য ব্রাহ্মণে প্রতি- পাদন করিয়াছি। অতএব হে সম্রাট্, সমস্ত ভূত হৃদয়েই প্রতিষ্ঠিত আছে।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—প্রথমং ব্রাহ্মণম্। ৯৯৫

অতএব হৃদয়কে ‘স্থিতি’ বলিয়া(স্থিতিগুণসম্পন্ন বলিয়া) উপাসনা করিবে। হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হইতেছেন প্রজাপতি((ব্রহ্মা)) ॥২৪৭॥৭৷৷

ইতি চতুর্থ্যাধ্যায়ং প্রথম ব্রাহ্মণের ভাষ্যানুসারে ॥৪॥১॥

[Redacted][Redacted][Redacted]

দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

জনকো হ বৈদেহঃ কুর্চ্চাদুপাবসর্পনুবাচ নমস্তেহস্ত যাজ্ঞ- বল্ক্যানু মা শাধীতি, স হোবাচ যথা বৈ সম্রাড় মহান্তমধ্বানমেয্যন্ রথং বা নাবং বা সমাদদীতৈবমেবৈতাভিরুপনিষদ্ভিঃ সমাহিতাত্মা- স্যেবং বৃন্দারক আঢ্যঃ সন্নধীতবেদ উক্তোপনিষৎক ইতো বিমুচ্য- মানঃ ক গমিষ্যসীতি, নাহং তদ্ভগবন্ বেদ যত্র গমিষ্যামীতি, অথ বৈ তেহহং তদ্বক্ষ্যামি যত্র গমিষ্যসীতি, ব্রবীতু ভগবানিতি ॥২৪৮৷৷১৷৷

সরলার্থঃ।—বৈদেহঃ(বিদেহপতিঃ) জনকঃ কুর্চ্চাৎ(আসনবিশেষাৎ) [উত্থায়] উপ(যাজ্ঞবল্ক্যসমীপং) অবসর্পন্(শিষ্যভাবেন গচ্ছন্) উবাচ হ— হে যাজ্ঞবল্ক্য, তে(তুভ্যৎ) নমঃ(নমস্কারঃ) অন্ত; মা(মাং) অনুশাধি (শিক্ষয়) ইতি। সঃ(যাজ্ঞবল্ক্যঃ) উবাচ(জনকম্ উক্তবান্) হ—হে সম্রাট্, যথা মহান্তং(দূরগামিনং) অধ্বানং(পন্থানং) এষ্যন্(গমিষ্যন্)[জনঃ] রথং বা নাবং(নৌকাং) বা সমাদদীত(উপায়ত্বেন গৃহ্লীয়াৎ); এবম্(তদ্বৎ) এব এতাভিঃ(উক্তাভিঃ) উপনিষদ্ভিঃ[উক্তলক্ষণানি ব্রহ্মাণি উপাসীনঃ ত্বং] সমাহিতাত্মা(সমাহিতচিত্তঃ) অসি(ভবসি); এবং(ন কেবলং সমাহিতাত্মা, অপিতু) বৃন্দারকঃ(দেববৎ মান্যঃ), আঢ্যঃ(ধনাধিপঃ), অধীতবেদঃ(বেদ- বিদ), উক্তোপনিষৎকঃ(আচার্য্যেভ্যঃ লব্ধোপনিষদ্বিদ্যঃ চ ত্বং) ইতঃ(অস্মাৎ দেহাৎ) বিমুচ্যমানঃ(দেহং পরিত্যজন্) ক(কস্মিন্ স্থানে) গমিষ্যসি? ইতি। [জনক আহ—] হে ভগবন্,(পূজনীয়), অহং তৎ(দেহপাতানন্তরগন্তব্য- স্থানং) ন বেদ(ন জানামি) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] অহং তে(তুভ্যং) তৎ বক্ষ্যামি(কথয়িষ্যামি), যত্র গমিষ্যসি ইতি।[জনক আহ—] ভগবান্ (পূজনীয়ঃ ভবান্) ব্রবীতু(তৎ মাম্ উপদিশতু) ইতি ॥ ২৪৮ ॥ ১ ॥

মূলানুবাদ।—বিদেহাধিপতি জনক আপনার আসন হইতে উঠিয়া শিষ্যভাবে যাজ্ঞবল্ক্যের সমীপে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, হে যাজ্ঞ- বল্ধ্য, আপনার উদ্দেশ্যে নমস্কার; আপনি আমাকে শিক্ষাপ্রদান করুন। একথার পর যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, হে সম্রাট্, লোকে দূরগামী পথে যাইবার

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১৯৭

জন্য যেরূপ রথ বা নৌকা সংগ্রহ করিয়া থাকে; আপনিও তদ্রূপ পূর্ব্বোক্ত পদ্ধতিক্রমে উপাসনা করত সমাহিতচিত্ত হইয়াছেন; অর্থাৎ আপনি এ পর্যন্ত যাহা কিছু করিয়াছেন, সে সমস্ত কেবল সাধারণ উপায় মাত্র, কিন্তু কোনটিই সিদ্ধিক্ষেত্র নহে। আপনি এইরূপে লোকপূজ্য ঐশ্বর্য্যশালী, বেদবিৎ ও উপনিষদ্-রহস্য অবগত হইয়াছেন সত্য, কিন্তু এই দেহত্যাগের পর কোথায় যাইবেন,[তাহা জানেন কি?]।[জনক বলিলেন—] হে ভগবন্, দেহত্যাগ করিয়া যেখানে যাইব, তাহা আমি জানি না। অনন্তর[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,] আপনি যেখানে যাইবেন, তাহা আমি আপনাকে বলিয়া দিতেছি। [জনক বলিলেন,] পূজনীয় আপনি তাহা উপদেশ করুন ॥ ২৪৮॥ ১॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—জনকো হ বৈদেহঃ। যস্মাৎ সবিশেষণানি সর্ব্বাণি ব্রহ্মাণি জানাতি যাজ্ঞবল্ক্যঃ, তস্মাদাচাৰ্য্যত্বং হিত্বা জনকঃ কুর্চ্চাদাসনবিশেষাদু- খায়, উপ সমীপম্ অবসর্পন্ পাদয়োঃ নিপতন্নিত্যর্থঃ, উবাচ উক্তবান্, নমস্তে তুভ্যম্ অস্তু, হে যাজ্ঞবল্ক্য; অনু মা শাধি অনুশাধি মামিত্যর্থঃ। ইতিশব্দো বাক্যপরি- সমাপ্ত্যর্থঃ। স হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—যথা বৈ লোকে, হে সম্রাট্, মহান্তং দীর্ঘ- মধ্বানম্ এষ্যন্ গমিষ্যন্, রথং বা স্থলেন গমিষ্যন্, নাবং বা জলেন গমিষ্যন্ সমা- দদীত, এবমেব এতানি ব্রহ্মাণি এতাভিরুপনিষন্তিযুক্তানি উপাসীনঃ সমাহিতাত্মা অসি, অত্যন্তমেতাভিরুপনিষদ্ভিঃ সংযুক্তাত্মা অসি; ন কেবলমুপনিষৎসমাহিতঃ, এবং বৃন্দারকঃ পূজ্যশ্চ, আঢ্যশ্চেশ্বরঃ ন দরিদ্র ইত্যর্থঃ, অধীতবেদঃ অধীতো বেদো যেন স ত্বম্ অধীতবেদঃ, উক্তাশ্চোপনিষদ আচার্য্যৈস্তভ্যম্, স ত্বমুক্তোপ- নিষৎকঃ, এবং সর্ব্ববিভূতিসম্পন্নোহপি সন্ ভয়মধ্যস্থ এব—পরমাত্মজ্ঞানেন বিনা অকৃতার্থ এব তাবদিত্যর্থঃ, যাবৎ পরং ব্রহ্ম ন বেৎসি। ইতঃ অস্মাদ্দেহাদ্বিমুচ্যমান এতাভিঃ নৌরথস্থানীয়াভিঃ সমাহিতঃ ক কস্মিন্ গমিষ্যসি কিং বস্তু প্রাপ্স্যসীতি? নাহং তদ্বস্তু ভগবন্ পূজাবন্, বেদ জানে,—যত্র গমিষ্যামীতি। অথ যদ্যেবং ন জানীষে যত্র গতঃ কৃতার্থঃ স্যাঃ, অহং বৈ তে তুভ্যং তদ্বক্ষ্যামি, যত্র গমিষ্যসীতি। ব্রবীতু ভগবানিতি, যদি প্রসন্নো মাং প্রতি। শৃণু—॥২৪৮৷৷১৷৷

টীকা। পূর্ব্বস্মিন্ ব্রাহ্মণে কানিচিদুপাসনানি জ্ঞানসাধনান্যুক্তানি। ইদানীং ব্রহ্মণ- স্তৈজ্ঞেয়স্য জাগরাদিদ্বারা জ্ঞানার্থং ব্রাহ্মণান্তরমবতারয়তি—জনকো হেতি। রাজ্ঞো জ্ঞানিত্বাভিমানে শিষ্যত্ববিরোধিন্যপনীতে মুনিং প্রতি তস্য শিষ্যত্বেনোপসত্তিং দর্শয়তি—

৯৯৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যম্মাদিতি। নমস্কারোক্তেরুদ্দেদ্যমুপন্যস্তুতি-অনু মেতি। অভীষ্টমনুশাসনং কর্তৃং প্রাচীন- জ্ঞানস্য ফলাভাসহেতুত্বোক্তিদ্বারা পরমফলহেতুরাত্মজ্ঞানমেবেতি বিবক্ষিত্বা তত্র রাজ্ঞো জিজ্ঞাসামাপাদয়তি-স হেত্যাদিনা। যথোক্তগুণসম্পন্নশ্চেদহং, তর্হি কৃতার্থত্বান্ন মে কর্তব্য- মস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-এবমিতি। যাজ্ঞবন্ধ্যো রাজ্ঞো জিজ্ঞাসামাপাদ্য পৃচ্ছতি-ইত ইতি। পর- বস্তুবিষয়ে গতেরযোগাৎ প্রশ্নবিষয়ং বিবক্ষিতং সঙ্ক্ষিপতি-কিং বস্তিতি। রাজ্ঞা স্বকীয়মজ্ঞত্ব- মুপেত্য শিষ্যত্বে স্বীকৃতিমবতারয়তি-অথেতি। তত্রাপেক্ষিতমথশব্দসূচিতং পুরয়তি- যদ্যেবমিতি। আজ্ঞাপনমনুচিতমিতি শঙ্কাং বারয়তি-যদীতি। প্রসাদাভিমুখ্যমাত্মনঃ সুচয়তি-শৃণ্বিতি ॥২৪৮৷১৷

ভাষ্যানুবাদ।—“জনকঃ হ বৈদেহঃ” ইত্যাদি। যেহেতু যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি সমস্ত ব্রহ্মতত্ত্ব ও তদগত বিশেষভাব সমুদয় অবগত আছেন, সেই হেতুই জনক মহারাজ আপনার আচার্য্যভাব পরিত্যাগ করিয়া—কুর্চ্চাসন হইতে উঠিয়া সমীপে উপস্থিত হইলেন অর্থাৎ যাজ্ঞবল্ক্যের চরণে নিপতিত হইলেন, এবং বলি- লেন—হে যাজ্ঞবল্ক্য, আপনাকে নমস্কার; এখন আপনি আমাকে উপদেশ প্রদান করুন। শ্রুতির ‘ইতি’ শব্দটি জনকের বাক্যসমাপ্তিওতক। যাজ্ঞবল্ক্য এইরূপে অনুরুদ্ধ হইয়া বলিলেন—হে সম্রাট্, ব্যবহার-জগতে দেখিতে পাওয়া যায় যে, কোন লোককে দীর্ঘ পথ যাইতে হইলে, যদি স্থলপথে যাইবার আবশ্যক হয়, তাহা হইলে সে যেমন রথ অবলম্বন করে, আর যদি জলপথে যাইতে হয়, তাহা হইলে যেমন নৌকার আশ্রয় গ্রহণ করে; পূর্ব্বোক্ত উপনিষদ্-সহযোগে নানাবিধ ব্রহ্মো- পাসনা করতঃ তুমিও ঠিক সেইরূপই সমাহিতাত্মা হইয়াছ, অর্থাৎ উক্ত উপনিষদ্ সমূহযোগে তুমি অত্যন্ত সংযতচিত্তমাত্র হইয়াছ; কেবল যে, উপনিষদেই সমা- হিতচিত্ত হইয়াছ, তাহা নহে, পরন্তু বৃন্দারক—লোকপূজ্য, আঢ্য ধনৈশ্বর্য্যসম্পন্ন, অর্থাৎ দারিদ্র্যরহিত, এবং অধীতবেদ—বেদবিদ্যাও অবগত হইয়াছ। তাহার পর আচার্য্যগণও তোমাকে বেদসার—উপনিষদ্ উপদেশ করিয়াছেন। তুমি এই প্রকারে সর্ব্ববিধ ঐশ্বর্য্যসমন্বিত হইয়াও ভয়ের(মৃত্যুর) অধিকার-মধ্যেই বর্তমান রহিয়াছ, অর্থাৎ আত্মজ্ঞানের অভাবে ততক্ষণ তুমি নিশ্চয়ই অকৃতার্থ, যতক্ষণ পরব্রহ্ম অবগত না হইতেছ।[ভাল, জিজ্ঞাসা করি,] নৌকা ও রথস্থানীয় ঐ সমস্ত উপনিষদে সমাহিতচিত্ত তুমি জান কি?—এই দেহ হইতে বিমুক্ত হইয়া অর্থাৎ দেহত্যাগের পর কোথায় গমন করিবে?—কোন্ বস্তু প্রাপ্ত হইবে?

[জনক বলিলেন—] হে ভগবন্—পূজনীয়, আমি তাহা জানি না, যেখানে আমাকে যাইতে হইবে। যেখানে যাইয়া কৃতার্থ হইবে, তাহা যদি তুমি না

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

వనవ

জান, তবে আমিই তোমাকে তাহা বলিব—তুমি ইতঃপর যেখানে গমন করিবে। [জনক বলিলেন—] আপনি যদি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তাহা হইলে আপনিই আমাকে তাহা উপদেশ দিন।[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—বলি- তেছি,] শ্রবণ কর—॥২৪৮৷৷১৷৷

ইন্ধো হ বৈ নামৈষ যোহয়ং দক্ষিণেহক্ষন্ পুরুষস্তং বা এত- মিন্ধসন্তমিন্দ্র ইত্যাচক্ষতে পরোক্ষেণৈব, পরোক্ষপ্রিয়া ইব হি দেবাঃ প্রত্যক্ষদ্বিষঃ ॥২৪৯৷২৷৷

সরলার্থঃ।—এষঃ(বক্ষ্যমাণঃ) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) ইন্ধঃ(ইন্ধনামা) হ; [কঃ?] যঃ অয়ং(“চক্ষুঃ বৈ ব্রহ্ম” ইত্যুক্তঃ) দক্ষিণে অক্ষন্(অক্ষিণি)[বিশে- ষেণ অবস্থিতঃ] পুরুষঃ। ইন্ধং(দীপ্তিমত্ত্বাৎ প্রত্যক্ষং) সন্তং, তৎ এতৎ(পুরুষং) ইন্দ্র-ইতি পরোক্ষেণ(পরোক্ষবস্তুবাচিনা ইন্দ্রশব্দেন) এব আচক্ষতে(কথয়ন্তি) [তত্ত্বদর্শিনঃ];[কুতঃ?] হি(যস্মাৎ) দেবাঃ পরোক্ষপ্রিয়াঃ(পরোক্ষার্থকং নাম প্রিয়ং যেষাৎ, তে তথোক্তাঃ) ইব(সম্ভাবনায়াম্)[সন্তঃ] প্রত্যক্ষদ্বিষঃ (প্রত্যক্ষনামগ্রহণং দ্বিষত্তি ইত্যর্থঃ) ॥২৪৯৷২৷৷

মূলানুবাদঃ—এই যে, দক্ষিণ চক্ষুতে সন্নিহিত পুরুষ, ইনি ইন্ধ নামে প্রসিদ্ধ, অর্থাৎ দীপ্তিগুণ থাকায় ইঁহার নাম হইতেছে ইন্ধ। ইনি ইন্ধ হইলেও অর্থাৎ প্রত্যক্ষবোধক ইন্ধ নামে প্রসিদ্ধ হইলেও তত্ত্বদর্শী পণ্ডিতগণ ইঁহাকে পরোক্ষবোধক ইন্দ্র-নামেই নির্দেশ করিয়া থাকেন; কারণ, দেবতারা যেন, পরোক্ষ নাম গ্রহণেই সন্তোষ লাভ করেন, এবং প্রত্যক্ষভাবে নাম গ্রহণকে বিদ্বেষ করিয়া থাকেন ॥ ২৪৯ ॥ ২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—ইন্ধো হ বৈ নাম। ইন্ধ ইত্যেবংনামা, যঃ চক্ষুর্ব্বে ব্রহ্মেতি পুরোক্ত আদিত্যান্তর্গতঃ পুরুষঃ, স এষঃ, যোহয়ৎ দক্ষিণেহক্ষন্ অক্ষণি বিশেষেণ ব্যবস্থিতঃ, স চ সত্যনামা, তৎ বৈ এতৎ পুরুষং; দীপ্তিগুণত্বাৎ প্রত্যক্ষং নামাস্য ইন্ধ ইতি; তমিন্ধং সন্তম্ ইন্দ্র ইত্যাচক্ষতে পরোক্ষেণ; যস্মাৎ পরোক্ষ- প্রিয়া ইব হি দেবাঃ প্রত্যক্ষদ্বিষঃ প্রত্যক্ষনামগ্রহণং দ্বিষন্তি। এষ ত্বং বিশ্বানর- মাত্মানং সম্পন্নোহসি ॥ ২৪৯ ॥ ২ ॥

টীকা। বিশ্বতৈজসপ্রাজ্ঞানুবাদেন তুরীয়ং ব্রহ্ম দর্শয়িতুমাদৌ বিশ্বমনুবদতি-ইন্ধ ইতি। কোহসাবিন্ধনামেতি চেৎ, তমাহ-যশ্চক্ষুরিতি। অধিদৈবতং পুরুষমুক্তাহধ্যাত্মং তং দর্শয়তি- যোহয়মিতি। তন্য পূর্বস্মিন্নপি ব্রাহ্মণে প্রস্তুতত্বমাহ-স চেতি। প্রকৃতে পুরুষে বিদুষাং

১০০০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সম্মতিমাহ-তং বা এতমিতি। ইন্ধত্বং সাধয়তি-দীপ্তীতি। প্রত্যক্ষস্য পরোক্ষেণাখ্যানে হেতুমাহ-যন্মাদিতি ॥২৪৯।২॥

ভাষ্যানুবাদ।—‘ইন্ধো হ বৈ নাম’ ইতি। পূর্ব্বে ‘চক্ষুঃ বৈ ব্রহ্ম’ ইত্যাদি বাক্যে আদিত্যমণ্ডনান্তর্গত যে পুরুষের উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহার প্রসিদ্ধ নাম ইন্ধ; আবার অধ্যাত্ম দক্ষিণ চক্ষুতে বিশেষরূপে বিদ্যমান যে পুরুষ, তাহার প্রসিদ্ধ নাম—সত্য; প্রত্যক্ষগ্রাহ্য দীপ্তিগুণসম্পন্ন বলিয়া সেই এই পুরুষ ‘ইন্ধ’ নামে প্রসিদ্ধ হইলেও, ঋষিগণ ইহাকে পরোক্ষবাচী ‘ইন্দ্র’নামে অভিহিত করিয়া থাকেন; কারণ, দেবগণ পরোক্ষ নাম গ্রহণেই যেন সন্তুষ্ট, এবং প্রত্যক্ষবিদ্বেষী, অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে নাম গ্রহণ করিলে তাঁহারা অসন্তুষ্ট হন।[হে জনক,] এইরূপে তুমি বৈশ্বানর আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়াছ(১) ॥২৪৯৷৷২৷৷

অথৈতদ্বামেহক্ষণি পুরুষরূপমেষাস্য পত্নী বিরাট্, তয়োরেষ সংস্তাবো য এষোহন্তহৃদয় আকাশোহথৈনয়োরেতদন্নং য এষো- হন্তহৃদয়ে লোহিতপিণ্ডোহথৈনয়োরেতৎ প্রাবরণং যদেতদন্ত- হৃদয়ে জালকমিবাথৈনয়োরেষা স্মৃতিঃ সঞ্চরণী, যৈষা হৃদয়াদূদ্ধা নাড্যুচ্চরতি, যথা কেশঃ সহস্রধা ভিন্ন এবমস্যৈতা হিতা নাম নাড্যোহন্তহৃদয়ে প্রতিষ্ঠিতা ভবন্ত্যেতাভির্ব্বা এতদাস্র- বদাস্রবতি তস্মাদেষ প্রবিবিক্তাহারতর ইবৈব ভবত্যস্মাচ্ছারী- রাদাত্মনঃ ॥২৫০৷৷৩৷৷

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০০১

সন্মলার্থঃ।-অথ(প্রকারান্তরে) বামে অক্ষণি(অক্ষিণি)[যৎ] এতৎ পুরুষরূপম্, এষা(এষঃ বামাক্ষিপুরুষঃ) অন্য(বিশ্বপুরুষস্থ্য) পত্নী(ভোগ্যা অন্নরূপা), বিরাট্(বিরাট্সংজ্ঞকঃ পুরুষঃ); তয়োঃ(ইন্দ্রস্য ইন্দ্রাণ্যাঃ চ) এষঃ সংস্তাবঃ(যত্র দ্বৌ মিলিত্বা অন্যোন্যৎ সংস্তবং কুর্ব্বাতে, সঃ)।[কঃ সঃ?] যঃ এষঃ অন্তহৃদয়ে হৃদয়মধ্যে আকাশঃ(ছিদ্রং)। অথ এনয়োঃ(ইন্দ্রস্য ইন্দ্রাণ্যাঃ চ) এতৎ(বক্ষ্যমাণং) অন্নং(রক্ষাহেতুঃ);[কিং তৎ?] যঃ এষঃ অন্তহৃদয়ে লোহিতপিণ্ডঃ(ভুক্তান্নস্য সূক্ষ্মঃ পরিণামবিশেষঃ)। অথ এনয়োঃ (ইন্দ্রস্য ইন্দ্রাণ্যাঃ চ) এতৎ(বক্ষ্যমাণং) প্রাবরণম্(আচ্ছাদনম্);[কিং তৎ?], যৎ এতৎ অন্তহৃদয়ে জালকম্ ইব(জালবৎ শিরাসন্ততিঃ); অথ এনয়োঃ এষা সঞ্চরণী(গমনাগমনোপায়ঃ) স্মৃতিঃ(পন্থাঃ);[এষা কা?] যা এষা নাড়ী হৃদয়াৎ উর্দ্ধা(ঊর্দ্ধমুখী সতী) উচ্চরতি(উদগচ্ছতি);[কীদৃশী সা?] সহস্রধা ভিন্নঃ কেশঃ যথা(সহস্রভাগ-বিভক্তকেশবৎ সূক্ষ্মা) অন্য(শরীরস্য) ‘হিতাঃ’ নাম(হিতেতি নায়া প্রসিদ্ধাঃ) নাড্যঃ অন্তহৃদয়ে প্রতিষ্ঠিতাঃ ভবন্তি। এতৎ(অন্নং) আস্রবৎ(গলৎ) এতাভিঃ(নাড়ীভিঃ) বৈ আস্রবতি(গচ্ছতি -রসাদিভাবমাপদ্যতে)। তস্মাৎ(অন্নস্য সূক্ষ্মভাগপরিপোষিতত্বাৎ হেতোঃ) এষঃ(তৈজসঃ আত্মা) অস্মাৎ শারীরাৎ আত্মনঃ(পূর্ব্বোক্তং বৈশ্বানরাখ্যম্ আত্মা- নম্ অপেক্ষ্য) প্রবিবিক্তাহারতরঃ(অতিশয়েন প্রবিবিক্তাহার:-দেহপিণ্ডঃ, অয়ৎ তু তস্মাদপি সূক্ষ্মতরাহার ইত্যর্থঃ) ইব ভবতি ॥২৫০৷৷৩৷৷

মূলানুবাদ:-আর এই যে, বাম চক্ষুতে পুরুষ আছেন, তিনিপূর্বোক্তদক্ষিণাক্ষিস্থিত ইন্দ্রনামকপুরুষের পত্নী অর্থাৎ ভোগ্যা- অন্ন স্বরূপ বিরাট্; ইহাই সেই ইন্দ্র ও ইন্দ্রাণীর সংস্তাব,(সংস্তাব অর্থ- যাহাতে উভয়ে উভয়ের স্তুতি করে); তাহা এই হৃদয়ান্তর্গত আকাশ। উক্ত ইন্দ্র ও ইন্দ্রাণীর ইহাই অন্ন,-যাহা এই হৃদয়মধ্যে স্থিত লোহিত- পিণ্ড; এই লোহিত-পিণ্ডটি(ভুক্ত অন্নের সূক্ষম পরিণতি); ইহাই ইহাদের উভয়ের প্রাবরণ বা আচ্ছাদন, যাহা এই হৃদয়মধ্যে জালের ন্যায় শিরাসমূহ; এবং ইহাই তাহাদের সঞ্চরণের পথ, যাহা এই হৃদয়প্রদেশ হইতে ঊর্দ্ধগামিনী নাড়ী; একটি কেশকে সহস্রভাগে বিভক্ত করিলে যেরূপ হয়, ঠিক সেইরূপ সূক্ষম এই হিতানামক নাড়ীসমূহও দেহপিণ্ডের হৃদয়মধ্যে বিদ্যমান রহিয়াছে। যে সময় অন্নরস ক্ষরিত হয়, তখন এই

১০০২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সমস্ত নাড়ীপথেই ক্ষরিত হয়; সেই জন্যই এই শারীর-পূর্ব্বোক্ত বিশ্বনামক শরীরময় আত্মা অপেক্ষা এই তৈজসসংজ্ঞক আত্মা অতিশয় সূক্ষ্মবিষয়ভোগী বলিয়াই যেন প্রতীত হয় ॥ ২৫০ ॥ ৩॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—অথৈতদ্বামেহক্ষণি পুরুষরূপম্, এযাস্য পত্নী—যৎ ত্বং বৈশ্বানরমাত্মানং সম্পন্নোহসি, তস্যাস্য ইন্দ্রস্য ভোক্তুর্ভোগ্যৈষা পত্নী, বিরাট্ অন্নৎ ভোগ্যত্বাদেব। তদেতদন্নঞ্চ অত্তা চ একং মিথুনং স্বপ্নে। কথম্? তয়ো- রেষঃ—ইন্দ্রাণ্যা ইন্দ্রস্য চ এব সংস্তাবঃ,—সম্ভূয় যত্র সংস্তবং কুর্ব্বাতে অন্যোন্যম্, স এব সংস্তাবঃ। কোহসৌ? য এযোহন্তহৃদয়ে আকাশঃ, অন্তহৃদয়ে—হৃদয়স্য মাংসপিণ্ডস্য মধ্যে, অথৈনয়োরেতৎ বক্ষ্যমাণম্ অন্নৎ ভোজ্যৎ স্থিতিহেতুঃ। কিন্তুৎ? য এযোহন্তহৃদয়ে লোহিতপিণ্ডঃ—লোহিত এব পিণ্ডাকারাপন্নো লোহিতপিণ্ডঃ। অন্নৎ জঘং দ্বেধা পরিণমতে—যৎ স্কুলং, তদধো গচ্ছতি; যদন্যৎ, তৎ পুনরগ্নিনা পচ্যমানং দ্বেধা পরিণমতে—যো মধ্যমো রসঃ, স লোহিতাদিক্রমেণ পাঞ্চভৌতিকং পিণ্ডং শরীরমুপচিনোতি; যোহণিষ্ঠো রসঃ, স এষ লোহিতপিণ্ড ইন্দ্রস্য লিঙ্গা- ত্মনো হৃদয়ে মিথুনীভূতস্য; যৎ তৈজসমাচক্ষতে, স তয়োরিন্দ্রেন্দ্রাণ্যোঃ হৃদয়ে মিথুনীভূতয়োঃ সূক্ষ্মাসু নাড়ীঘনুপ্রবিষ্টঃ স্থিতিহেতুর্ভবতি, তদেতদুচ্যতে—অথৈ- নয়োরেতদন্নমিত্যাদি। ১

কিঞ্চান্যৎ; অথৈনয়োরেতৎ প্রাবরণম্; ভুক্তবতোঃ স্বপতোশ্চ প্রাবরণং ভবতি লোকে, তৎসামান্যৎ হি কল্পয়তি শ্রুতিঃ। কিং তদিহ প্রাবরণম্? যদেত- দন্তহৃদয়ে জালকমিব অনেকনাড়ীচ্ছিদ্রবহুলত্বাৎ জালকমিব। অথৈনয়োরেষা স্মৃতিঃ মার্গঃ, সঞ্চরতোহনয়েতি সঞ্চরণী, স্বপ্নাজ্জাগরিত-দেশাগমনমার্গঃ। কা সা স্মৃতিঃ? যা এষা হৃদয়াৎ হৃদয়দেশাদ উর্দ্ধাভিমুখী সতী উচ্চরতি নাড়ী। তস্যাঃ পরিমাণমিদমুচ্যতে—যথা লোকে কেশঃ সহস্রধা ভিন্নোহত্যন্তসুক্ষ্মো ভবতি, এবং সূক্ষ্মা অন্য দেহস্য সম্বন্ধিন্যো হিতা নাম—হিতা ইত্যেবং খ্যাতা নাড্যঃ, তাশ্চান্ত- হৃদয়ে মাংসপিণ্ডে প্রতিষ্ঠিতা ভবন্তি; হৃদয়াদ্বিপ্ররূঢ়াস্তাঃ সর্ব্বত্র কদম্বকেসরবৎ; এতাভির্নাড়ীভিরত্যন্তসূক্ষ্মাভিরেতদন্নম্ আস্রবৎ গচ্ছদ্ আস্রবতি গচ্ছতি। তদে- তদ্দেবতাশরীরম্ অনেনান্নেন দামভূতেনোপচীয়মানং তিষ্ঠতি। ২

তস্মাৎ-যস্মাৎ স্থলেনানেনোপচিতঃ পিণ্ডঃ, ইদন্তু দেবতাশরীরৎ লিঙ্গং সূক্ষ্মেণান্নেনোপচিতং তিষ্ঠতি, পিণ্ডোপচয়করমপ্যন্নৎ প্রবিবিক্তমেব মুত্রপুরীযাদি- স্কুলমপেক্ষ্য, লিঙ্গস্থিতিকরং তু অন্নং, ততোহপি সূক্ষ্মতরম্, অতঃ প্রবিবিক্তাহারঃ

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৩৩

পিণ্ডং, তস্মাৎ প্রবিরিক্তাহারাদপি প্রবিবিক্তাহারতর এষ লিঙ্গাত্মা ইবৈব ভবতি, অস্মাচ্ছারীরাৎ-শরীরমেব শারীরম্, তস্মাচ্ছারীরাদাত্মনঃ বৈশ্বানরাৎ-তৈজসঃ সূক্ষ্মাস্নোপচিতো ভবতি ॥২৫০৷৷৩৷৷

টীকা। একস্যৈব বৈশ্বানরস্যোপাসনার্থং প্রাসঙ্গিকমিন্দ্রশ্চেন্দ্রাণী চেতি মিথুনং কল্পয়তি- অথেত্যাদিনা। প্রাসঙ্গিকধ্যানাধিকারার্থোহথশব্দঃ। যদেতন্মিথুনং জাগরিতে বিশ্বশব্দিতং, তদেবৈকং স্বপ্নে তৈজসশব্দবাচ্যমিত্যাহ-তদেতদিতি। তচ্ছন্দিতং তৈজসমধিকৃত্য পৃচ্ছতি- কথমিতি। কিং তস্য স্থানং পৃচ্ছ্যতে? অন্নং বা? প্রাবরণং বা? মার্গো বা? ইতি বিকল্প্যাদ্যং প্রত্যাহ-তয়োরিতি। সম্ভবং সঙ্গতিমিতি যাবৎ। দ্বিতীয়ং প্রত্যাহ-অখেতি। অন্নাতিরেকেণ স্থিতেরসম্ভবাত্তস্য বক্তব্যত্বাদিত্যথশব্দার্থঃ। লোহিতপিণ্ডং সুক্ষ্মান্নরসং ব্যাখ্যাতুং ভক্ষিতন্যান্নস্য তাবদ্বিভাগম্যহ-অন্নমিতি। যদন্যৎ পুনরিতি’ যোজনীয়ম্। তত্রেত্যধ্যাহৃত্য যো মধ্যম ইত্যাদিগ্রন্থো যোজ্যঃ। উপাধ্যুপহিতয়োরেকত্বমাশ্রিত্যাহ-যং তৈজসমিতি। তস্যান্নত্বমুপপাদয়তি-স তয়োরিতি। ব্যাখ্যাতেহর্থে বাক্যস্যান্বিতাবয়বত্বমাহ-তদেতদিতি। ১

যদি প্রাবরণং পৃচ্ছ্যতে, তত্রাহ-কিঞ্চান্যদিতি। ভোগস্বাপানন্তর্য্যমথশব্দার্থঃ। প্রাবরণ- প্রদর্শনস্য প্রয়োজনমাহ-ভুক্তবতোরিতি। ইহেতি ভোক্তভোগ্যরোরিন্দ্রেন্দ্রাণ্যেরুক্তিঃ। হৃদয়জালকয়োরাধারাধেয়ত্বমবিবক্ষিতং, তস্যৈব তদ্ভাবাৎ। মার্গশ্চেৎ পৃচ্ছ্যতে, তত্রাহ- অথেতি। নাড়ীভিঃ শরীরং ব্যাপ্তস্যান্নস্য প্রয়োজনমাহ-তদেতদিতি। ২

তস্মাদিত্যাদিবাক্যমাদায় ব্যাচষ্টে-যম্মাদিতি। তথাপি প্রবিবিক্তাহার ইত্যেব বক্তব্যে প্রবিবিক্তাহারতর ইতি কম্মাদুচ্যতে? তত্রাহ-পিণ্ডেতি। যম্মাদিত্যস্যাপেক্ষিতং কথয়তি- অত ইতি। শারীরাদিতি ক্রয়তে, কথং শরীরাদিত্যুচ্যতে; তত্রাহ-শরীরমেবেতি। উক্ত- মর্থং সঙ্ক্ষিপ্যোপসংহরতি-আত্মন ইতি ॥২৫০॥৩৷৷

ভাষ্যানুবাদ।-তাহার পর, এই যে, বামচক্ষুতে পুরুষ আছেন, তিনি ইঁহার পত্নী অর্থাৎ তুমি পূর্ব্বশ্রুত্যুক্ত যে বৈশ্বানর আত্মাকে লাভ করিয়াছ, সেই ইন্দ্রনামক ভোক্তার ইহা ভোগ্যরূপা পত্নী বিরাট্স্বরূপ অন্ন; ভোগ্য বলিয়াই ইহাকে অন্ন বলা হইল। স্বপ্নাবস্থায় উক্ত ভোক্তা ও ভোগ্য এতদুভয়ের সম্মিলনে এক মিথুনীভাব সম্পন্ন হয়। কিরূপে হয়?-উক্ত ইন্দ্রাণী ও ইন্দ্রের ইহাই সংস্তাব-যাহাতে উভয়ে সম্মিলিত হইয়া পরস্পর পরস্পরের স্তুতিগান করিয়া থাকে, তাহাকে সংস্তাব বলে। এখানে সেই সংস্তাব কি?[যাজ্ঞবল্ক্য বলি- লেন,] যাহা এই হৃদয়মধ্যবর্তী আকাশ,[তাহাই সংস্তাব;]-এখানে ‘অন্ত হৃদয়ে’ অর্থ হৃদয়নামক মাংসপিণ্ডের মধ্যে। উক্ত উভয়ের ইহাই হইতেছে অন্ন -অর্থাৎ রক্ষার হেতুভূত ভোগ্য। ইহা কি? যাহা এই হৃদয়মধ্যবর্তী লোহিত- পিণ্ড অর্থাৎ পিণ্ডাকার লোহিত খণ্ড। অভিপ্রায় এই যে, ভুক্ত অন্ন দুইভাগে পরিণত হয়,-যাহা স্থূলভাগ, তাহা অধোগামী হয়, আর যাহা সূক্ষ্মভাগ, তাহাও

১০০৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

জাঠরাগ্নি দ্বারা পরিপাক পাইয়া দুইভাগে পরিণত হয়,—যাহা মধ্যম ভাগ— স্কুলও নয়, সূক্ষ্মও নয়, এমন রসভাগ, সেই রসভাগই লোহিতাদি পরম্পরাক্রমে পাঞ্চভৌতিক দেহের পরিপুষ্টি সাধন করে। আর যাহা সূক্ষ্মতম রস, তাহাই হৃদয়স্থ মিথুনীভূত লিঙ্গসংজ্ঞক ইন্দ্রের—পণ্ডিতগণ যাহাকে ‘তৈজস’ নামে অভি- হিত করিয়া থাকেন, তাহার লোহিতপিণ্ড। এই লোহিতপিণ্ডই সূক্ষ্ম নাড়ীপথে প্রবেশপূর্ব্বক হৃদয়গত মিথুনীভূত ইন্দ্র ও ইন্দ্রাণীর স্থিতিসাধন করিয়া থাকে। ১

আরও এক কথা,-ইহাই তাহাদের উভয়ের প্রাবরণ, ব্যবহারজগতে দেখিতে পাওয়া যায়, যাহারা ভোজন করে ও নিদ্রা যায়, তাহাদের গাত্রে আব- রণবস্ত্র থাকে; শ্রুতি ইহাদের সম্বন্ধেও সেইরূপ অবস্থা পরিকল্পনা করিতেছেন। এখানে সেই প্রাবরণটি কি? অন্তহৃদয়ে-হৃদয়াভ্যন্তরে যে, জালের মত নাড়ী- সমূহ আছে, তাহা;-নাড়ীর সংখ্যা অনেক, এবং সে সমস্ত নাড়ীর ছিদ্ররন্ধ্রও বহু; এইজন্য নাড়ীসমষ্টিকে জালের সদৃশ বলা হইয়াছে। তাহার পর, এই হৃদয়স্থ ইন্দ্র ও ইন্দ্রাণীর ইহাই সঞ্চরণী স্মৃতি; ‘সঞ্চরণী’ অর্থ-যাহা দ্বারা যাতায়াত করা হয়, অর্থাৎ ইহাই তাহাদের স্বপ্নাবস্থা হইতে জাগ্রৎ-অবস্থায় আসিবার পথ। সেই পথটি কি? উক্ত হৃদয়প্রদেশ হইতে যে নাড়ীটি ঊর্দ্ধমুখে উদগত, সেই নাড়ী। সেই নাড়ীর পরিমাণ এইরূপ বলা হইতেছে-জগতে একটি কেশকে সহস্রভাগে বিভক্ত করিলে, তাহা যেমন অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয়, ঠিক তেমনি; এই দেহগত হিতা- নামে প্রসিদ্ধ নাড়ীসমূহও অতিশয় সূক্ষ্ম, সেই সূক্ষ্ম নাড়ীগুলি আবার হৃদয়- মধ্যবর্তী উক্ত মাংসপিণ্ডের মধ্যে সন্নিবিষ্ট থাকে; শেষে কদম্ব-কুসুমের কেশর- রাশির ন্যায় ঐ নাড়ীসমূহ হৃদয় হইতে নির্গত হইয়া সর্ব্বদেহে প্রসূত হইয়া থাকে। ভুক্ত অন্ন যখন অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয়, তখন ঐ সমস্ত সূক্ষ্ম নাড়ীপথেই গমন করিয়া থাকে। এই যে, দেবতা-শরীর, তাহা রজ্জুম্বরূপ ঐ অন্ন দ্বারা পরি- রক্ষিত হইয়া বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়,(নচেৎ শরীর বিনষ্ট হইয়া যাইত)। ২

সেইহেতু—যেহেতু দৃশ্যমান দেহপিণ্ড উপভুক্ত স্থূল অন্ন দ্বারা বর্দ্ধিত হয়, কিন্তু লিঙ্গাত্মক সূক্ষ্ম দেবতাশরীরটি সূক্ষ্ম অন্নরসে বর্দ্ধিত হইয়া থাকে। তাহার পর, দেহপিণ্ডের পরিবর্দ্ধক অন্ন স্থূল হইলেও মূত্রপুরীষাদির তুলনায় সূক্ষ্মই বটে, কিন্তু লিঙ্গশরীরের পুষ্টি ও স্থিতিসাধন যে অন্ন, তাহা তদপেক্ষাও অধিক সূক্ষ্ম; এই হেতু দেহপিণ্ড সাধারণতঃ প্রবিবিক্তাহার; এই লিঙ্গাত্মক দেহ যেন সেই প্রবিবিক্তাহার(সুক্ষ্মগ্রাহী) দেহপিণ্ড অপেক্ষাও অধিকতর প্রবিবিক্তাহার

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

৩০০৫

(সুক্ষ্মতরাহার) বলিয়া প্রতীত হয়; অভিপ্রায় এই যে, বৈশ্বানরসঙ্জ্ঞক এই শারীর আত্মা—শরীর অপেক্ষা সূক্ষ্মতর অন্নে উপচিত হইয়া থাকে ॥ ২৫০ ॥ ৩॥

তস্য প্রাচী দিক্ প্রাঞ্চঃ প্রাণাঃ, দক্ষিণা দিগ্ দক্ষিণে প্রাণাঃ, প্রতীচী দিক্ প্রত্যঞ্চঃ প্রাণাঃ, উদীচী দিগুদঞ্চঃ প্রাণাঃ, উর্দ্ধা দিগূর্দ্ধাঃ প্রাণাঃ, অবাচী দিগবাঞ্চঃ প্রাণাঃ, সর্ব্বা দিশঃ সর্ব্বে প্রাণাঃ, স এষ নেতি নেত্যাত্মাহগৃহ্যো নহি গৃহ্যতেহশীৰ্য্যো নহি শীৰ্য্যতেহসঙ্গো নহি সজ্যতেহসিতো ন ব্যথতে ন রিষ্যত্যভয়ং বৈ জনক প্রাপ্তোহসীতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ। স হোবাচ জনকো বৈদেহোহভয়ত্ত্বা গচ্ছতাদ্ যাজ্ঞবল্ক্য; যো নো ভগবন্নভয়ং বেদয়সে, নমস্তেহস্ত্বিমে বিদেহা অয়মহমস্মি ॥ ২৫১ ॥ ৪ ॥

ইতি চতুর্থ্যাধ্যায়শ্চ দ্বিতীয়ঃ ব্রাহ্মণম্ ॥৪॥২॥

সরলার্থঃ।—অন্য(তৈজসত্বং প্রাপ্তস্য বিদুষঃ) প্রাচী(পূর্ব্বা) দিক্, প্রাঞ্চঃ(প্রাগ্‌গমনশীলাঃ) প্রাণাঃ; দক্ষিণা দিক্ দক্ষিণে(দক্ষিণদিগ্‌গামিনঃ) প্রাণাঃ; প্রতীচী(পশ্চিমা) দিক্ প্রত্যঞ্চঃ(পশ্চিমাভিমুখাঃ) প্রাণাঃ; উদীচী (উত্তরা) দিক্ উদঞ্চঃ প্রাণাঃ, উর্দ্ধা দিক্ উর্দ্ধাঃ প্রাণাঃ; অবাচী দিক্ অবাঞ্চঃ প্রাণাঃ; সর্ব্বাঃ দিশঃ সর্ব্বে প্রাণাঃ। সঃ এষঃ(যথোক্তগুণসম্পন্নঃ) নেতি নেতি (নেতি নেতীতিনিষেধপর্য্যন্তভূমিঃ) আত্মা অগৃহ্যঃ নহি গৃহ্যতে, অশীর্য্যঃ নহি শীর্ষ্যতে; অসঙ্গঃ নহি সজ্যতে; অসিতঃ, ন ব্যথতে; ন রিষ্যতি। হে জনক, [ ত্বং] বৈ অভয়ং(জন্মমরণাদিভয়রহিতৎ ব্রহ্ম) প্রাপ্তঃ অসি(ভবসি) ইতি যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ। সঃ(বৈদেহঃ) জনকঃ উবাচ হ—হে ভগবন্ যাজ্ঞবল্ক্য, যঃ ত্বং নঃ(অস্মান্) অভয়ং ব্রহ্ম বেদয়সে(জ্ঞাপয়সি), তং ত্বা(ত্বাৎ) অভয়ং গচ্ছ- তাৎ(গচ্ছতু; সর্ব্বথা ভয়রহিতো ভবেত্যর্থঃ)। তে(তুভ্যৎ) নমঃ(নমস্কারঃ) অন্তু, ইমে বিদেহাঃ(বিদেহাখ্যজনপদাঃ) অয়ং অহং(চ)[ তব অধীনঃ] অস্মি ॥ ২৫১ ॥ ৪ ॥

মূলানুবাদ।—বৈশ্বানরভাব হইতে ক্রমে তৈজসভাবাপন্ন সেই বিদ্বানের পূর্ব্বদিক হইতেছে অগ্রগামী প্রাণ; দক্ষিণ দিক হইতেছে

১০০৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

দক্ষিণদিক্বর্তী প্রাণ; পশ্চিম দিক্ হইতেছে পশ্চিমদিগ্‌বর্তী প্রাণ; উত্তর দিক্ হইতেছে উত্তরদিকগামী প্রাণ; ঊর্দ্ধদিক্ হইতেছে ঊর্দ্ধদিগ্বর্ত্তী প্রাণ; অধোদিক্ হইতেছে অধোগামী প্রাণ; এবং সাধারণ দিক্ সমূহ হইতেছে সর্ব্বপ্রাণ।[পূর্ব্বে ‘নেতি নেতি’রূপে] উক্ত সেই এই আত্মা অগ্রাহ্য—কোন ইন্দ্রিয়ের দ্বারা গৃহীত হয় না; অশীর্য্য—কোনরূপে শীর্ণ হয় না; অসঙ্গ—কোথাও আসক্ত হয় না; অসিত(অনবরুদ্ধ); কিছু দ্বারা আবদ্ধ হয় না, এবং কোনরূপে হিংসাও প্রাপ্ত হয় না। যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—হে জনক, তুমি অভয়(জন্মমরণাদিভয়রহিত ব্রহ্ম) প্রাপ্ত হইয়াছ। এ কথায় বিদেহপতি জনক বলিলেন—হে পূজনীয় যাজ্ঞবল্ক্য, যে তুমি আমাকে অভয় ব্রহ্ম-স্বরূপ বুঝাইতেছ, সেই তোমাকেও অভয় ব্রহ্ম প্রাপ্ত হউক, অর্থাৎ আমার ন্যায় তুমিও অভয় ব্রহ্ম লাভ কর। তোমার উদ্দেশ্যে নমস্কার করি; এই সমস্ত বিদেহ দেশ এবং এই আমি তোমার[অধীন] আছি ॥ ২৫১ ॥ ৪ ॥

ইতি চতুর্থ্যাধ্যায় দ্বিতীয় ব্রাহ্মণ ॥ ৪ ॥ ২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।-স এষ হৃদয়ভূতস্তৈজসঃ সূক্ষ্মভূতেন প্রাণেন বিধ্রিয়- মাণঃ প্রাণ এব ভবতি, তস্যাস্য বিদুষঃ ক্রমেণ বৈশ্বানরাৎ তৈজসং প্রাপ্তস্থ্য হৃদয়া- জ্ঞানমাপন্নস্য হৃদয়াত্মনশ্চ প্রাণাত্মানমাপন্নস্য প্রাচী দিক্ প্রাঞ্চঃ প্রাগ্‌গতাঃ প্রাণাঃ; তথা দক্ষিণা দিগ দক্ষিণে প্রাণাঃ; তথা প্রতীচী দিক্ প্রত্যঞ্চঃ প্রাণাঃ, উদীচী দিক্ উদঞ্চঃ প্রাণাঃ; উর্দ্ধা দিক্ ঊর্দ্ধাঃ প্রাণাঃ; অবাচী দিক্ অবাঞ্চঃ প্রাণাঃ; সর্ব্বা দিশঃ সর্ব্বে প্রাণাঃ; এবং বিদ্বান্ ক্রমেণ সর্বাত্মকং প্রাণমাত্মত্বে- নোপগতো ভবতি, তৎ সর্ব্বাত্মানং প্রত্যগাত্মন্যুপসংহৃত্য দ্রষ্টুহি দ্রষ্টৃভাবং নেতি নেত্যাত্মানং তুরীয়ং প্রতিপদ্যতে; যমেধ বিদ্বান্ অনেন ক্রমেণ প্রতিপদ্যতে। স এষ নেতি নেত্যাত্মেত্যাদি ন রিষ্যতীত্যন্তং ব্যাখ্যাতমেতৎ। অভয়ং বৈ জন্ম- মরণাদিনিমিত্তভয়শূন্যম্, হে জনক, প্রাপ্তোহসি-ইতি এবং কিল উবাচ উক্তবান্ যাজ্ঞবল্ক্যঃ। তদেতদুক্তম্-অথ বৈ তেহহং তদ্‌ বক্ষ্যামি, যত্র গমিষ্যসীতি। স হোবাচ জনকো বৈদেহঃ-অভয়মেবত্বা ত্বামপি গচ্ছতাদগচ্ছতু, যত্ত্বং নঃ অস্মান্, হে যাজ্ঞবল্ক্য, ভগবন্ পূজাবন্ অভয়ং ব্রহ্ম বেদয়সে জ্ঞাপয়সি প্রাপিতবান্ উপাধি- কৃতাজ্ঞানব্যবধানাপনয়নেনেত্যর্থঃ। কিমন্যৎ, অহং বিদ্যানিশ্রয়ার্থং প্রযচ্ছামি,

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—দ্বিতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৭

সাক্ষাদাত্মানমেব দত্তবতে; অতো নমস্তেহস্ত; ইমে বিদেহাঃ তব, যথেষ্টৎ ভুজ্যন্তাম্; অয়ঞ্চাহমস্মি দাসভাবে স্থিতঃ; যথেষ্টং মাৎ রাজ্যঞ্চ প্রতি- পদ্যস্বেত্যর্থঃ ॥২৫১॥৪৷৷

ইতি বৃন্দাবনে কোপনিবৃতো চতুর্থাধ্যায়ঃ দ্বিতীয়ঃ বাচস্তু ॥৪॥২॥

টীকা। তস্য প্রাচী দিগিত্যাদ্যবতারয়িতুং ভূমিকাং করোতি-স এষ ইতি। প্রাণ- শব্দেনাজ্ঞাতঃ প্রত্যগাত্মা প্রাজ্ঞো গৃহ্যতে। এবং ভূমিকাং কৃত্বা বাক্যমাদায় ব্যাকরোতি- তস্যেত্যাদিনা। তৈজসং প্রাপ্তস্যেত্যন্য ব্যাখ্যানং হৃদয়াত্মানমাপন্নস্যেতি। উক্তমর্থং সঙ্ক্ষিপ্যাহ-এবং বিদ্বানিতি। বিশ্বস্ত জাগরিতাভিমানিনস্তৈজসে তস্য চ স্বপ্নাভিমানিনঃ সুপ্ত্যভিমানিনি প্রাজ্ঞে ক্রমেণান্তর্ভাবং জানন্নিত্যর্থঃ। স এষ নেতি নেত্যাত্মেত্যাদেভূমিকাং করোতি-তং সর্বাত্মানমিতি। তত্র বাক্যমবতার্য্য পূর্ব্বোক্তং ব্যাখ্যানং স্মারয়তি-যমেব ইতি। তুরীয়াদপি প্রাপ্তব্যমন্যদভয়মস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-অভয়মিতি। গন্তব্যং বক্ষ্যামীত্যুপক্রম্যা- বস্থাত্রয়াতীতং তুরীয়মুপদিশন্নাঘ্রান্ পৃষ্টঃ কোবিদারানাচষ্ট ইতি ন্যায়বিষয়তাং নাতিবর্ত্তেতেত্যা- শঙ্ক্যাহ-তদেতদিতি। বিদ্যায়া দক্ষিণান্তরাভাবমভিপ্রেত্যাহ-স হোবাচেতি। কথং পুনরন্যস্য স্থিতস্য নষ্টস্য বাহন্যপ্রাপণমিত্যাশঙ্ক্যাহ-উপাধীতি। পশ্বাদিকং দক্ষিণান্তরং সম্ভবতীত্যাশঙ্ক্য তস্যোক্তবিদ্যানুরূপত্বং নাস্তীত্যাহ-কিমন্যদিতি। বস্তুতো দক্ষিণান্তরাভাবমুক্ত। প্রতীতিমাশি- ত্যাহ-অত ইতি। অক্ষরার্থমুক্ত। বাক্যার্থমাহ-যথেষ্টমিতি। ২৫১। ৪।

ইতি কৃষ্ণপুরাণং সমাপ্তং। চতুর্থোঽধ্যায়ঃ। দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ॥ ৪॥২॥

ভাষ্যানুবাদ।-এই যে, এই হৃদয়স্বরূপ তৈজস, ইহা সূক্ষ্ম প্রাণ দ্বারা বিশেষভাবে বিধৃত হইয়া ‘প্রকৃতপক্ষে প্রাণই হয়; অর্থাৎ প্রাণরূপেই পর্য্যবসিত হয়; সেই যে, এই বিদ্বান্, যিনি বৈশ্বানরভাব(স্থূলভাব) হইতে ক্রমে তৈজসত্ব ও হৃদয়াত্মভাব প্রাপ্ত হইয়া হৃদয়াত্মক হইয়াছেন; তাহার পূর্ব্ব দিক্ হইতেছে পূর্ব্বদিগগামী প্রাণ; পশ্চিম দিক্ পশ্চিমভাগবর্তী প্রাণ; উত্তর দিক্ উত্তরদিগ- বর্তী প্রাণ; ঊর্দ্ধ দিক্ ঊর্দ্ধগামী প্রাণ; অধোদিক্ অধোগামী প্রাণ; এবং সমস্ত দিক্ সমষ্টিভূত প্রাণ। এবম্বিধ জ্ঞানসম্পন্ন পুরুষ ক্রমে ক্রমে সর্ব্বাত্মক প্রাণকে আত্মারূপে লাভ করেন; সেই সর্ব্বাত্মা প্রাণকেও আবার পরমাত্মাতে পর্য্যবসিত করিয়া, পশ্চাৎ ‘নেতি নেতি’ রূপে তুরীয়(বিশ্ব, বৈশ্বানর ও তৈজস অপেক্ষা চতুর্থ) আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। ‘স এষ নেতি নেতি’ ইত্যাদি হইতে ‘ন রিষ্যতি’ পর্যন্ত অংশ পূর্ব্বেই ব্যাখ্যাত হইয়াছে।

হে জনক, তুমি অভয়—জন্মমরণাদিজনিত ভীতিশূন্য(ব্রহ্মকে) প্রাপ্ত হইয়াছ —এই কথা যাজ্ঞবল্ক্য বলিয়াছিলেন। এই কথাই পূর্ব্বে উক্ত হইয়াছে যে, ‘তুমি মৃত্যুর পর যেখানে গমন করিবে, তাহা তোমাকে বলিব’ ইতি। তখন বিদেহা-

১০০৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ধিপতি জনক বলিলেন—ভগবন্ যাজ্ঞবল্ক্য, যে তুমি আমাদিগকে অভয় ব্রহ্ম বলিয়াছ, উপাধিকৃত অজ্ঞানজ ব্যবধান অর্থাৎ অব্রহ্মভাব অপনয়নপূর্ব্বক প্রকৃত ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত করিয়াছ, সেই তোমাকে অভয় ব্রহ্ম প্রাপ্ত হউক; অধিক কি, তুমি যখন আমাকে সাক্ষাৎ আত্মবস্তু প্রদান করিয়াছ, তখন তোমাকে আমি বিদ্যার মূল্যস্বরূপ আর কি প্রদান করিতে পারি; অতএব তোমার উদ্দেশ্যে আমার নমস্কার হউক; এই বিদেহদেশ তোমার যথেষ্ট উপভোগ্য হউক; আর এই আমিও তোমার দাসরূপে আছি; এই রাজ্য এবং আমাকে তুমি ইচ্ছামত গ্রহণ কর ॥ ২৫১৷৪৷৷

ইতি চতুর্থ্যাধ্যায় দ্বিতীয় ব্রাহ্মণের ভাষ্যঅনুবাদ ॥৪॥২॥

তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

আভাসভাষ্যম্।—জনকং হ বৈদেহং যাজ্ঞবল্ক্যো জগামেত্যস্যাভি- সম্বন্ধঃ। বিজ্ঞানময় আত্মা সাক্ষাদপরোক্ষাদ ব্রহ্ম সর্ব্বান্তরঃ পর এব—“নান্যো- হতোহস্তি দ্রষ্টা, নান্যদতোহস্তি দ্রষ্টু” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। স এষ ইহ প্রবিষ্টঃ বদনাদিলিঙ্গঃ অস্তি ব্যতিরিক্ত ইতি মধুকাণ্ডে অজাতশত্রুসংবাদে প্রাণনাদিকর্তৃত্ব- ভোক্তৃত্বপ্রত্যাখ্যানেনাধিগতোহপি সন্, পুনঃ প্রাণনাদিলিঙ্গমুপন্যস্য ঔষস্ত্যপ্রশ্নে প্রাণনাদিলিঙ্গো যঃ সামান্যেনাধিগতঃ “প্রাণেন প্রাণিতি” ইত্যাদিনা, “দৃষ্টের্দ্রষ্টা” ইত্যাদিনা অলুপ্তশক্তিস্বভাবোহধিগতঃ। ১।

আভাসভাষ্য-টীকা। পূর্ব্বস্মিন্ ব্রাহ্মণে জাগরাদিদ্বারা তত্ত্বং নির্দ্ধারিতং, সম্প্রতি ব্রাহ্মণান্তরমবতার্য্য তস্য পূর্ব্বেণ সম্বন্ধং প্রতিজানীতে-জনকমিতি। তমেব বক্তুং তৃতীয়ে বৃত্তং কীর্তয়তি-বিজ্ঞানময় ইতি। তদ্‌ব্রহ্ম সাক্ষাদপরোক্ষাৎ সর্ব্বান্তর আত্মা, স পর এষ বিজ্ঞানময় আত্মেত্যত্র হেতুমাহ-নান্য ইতি। বিজ্ঞানময়ঃ পর এবেত্যত্র বাক্যান্তরং পঠতি- স এষ ইতি। বদদ্বাগিত্যাদাবুক্তমনুবদতি-বদনাদীতি। তার্তীয়মর্থমনুদ্য চাতুর্থিকমর্থমনু- বদতি-অস্তীতি। যদি মধুকাণ্ডে গার্গ্যকাশ্যসংবাদে প্রাণাদীনাং কর্তৃত্বাদিনিরাকরণেন তেভ্যো ব্যতিরিক্তোহস্তি বিজ্ঞানাত্মেতি সোহধিগতঃ, তর্হি কিমিতি পঞ্চমে তৎসম্ভাবো ব্যুৎপাদ্যতে, তত্রাহ-পুনরিতি। যদ্যপি বিজ্ঞানময়সম্ভাবশ্চতুর্থে স্থিতস্তথাপি পুনরৌযস্ত্যে প্রশ্নে যঃ প্রাণেন প্রাণিতীত্যাদিনা প্রাণাদিলিঙ্গমুপন্যস্য তল্লিঙ্গগম্যঃ সামান্যেনাধিগতঃ, স দৃষ্টের্ডষ্টেত্যাদিনা কূটস্থ- দৃষ্টিস্বভাবো বিশেষতো নিশ্চিতস্তথা চ পঞ্চমেহপি তদ্যুৎপাদনমুচিতমিত্যর্থঃ। ১

তস্য চ পরোপাধিনিমিত্তঃ সংসারঃ—যথা রজ্জুষর-শুক্তিকা-গগনাদিষু সর্পো- দক-রজতমলিনত্বাদি পরাধ্যারোপণনিমিত্তমেব, ন স্বতঃ; তথা; নিরুপা- ধিকো নিরুপাখ্যঃ ‘নেতি নেতি’ ইতি ব্যপদেশ্যঃ সাক্ষাদপরোক্ষাৎ সর্ব্বান্তর আত্মা ব্রহ্ম অক্ষরম্ অন্তর্যামী প্রশাস্তা ঔপনিষদঃ পুরুষঃ বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্মেত্যধি- গতম্। ২

আত্মা কূটস্থদৃষ্টিস্বভাবশ্চেৎ কথং তস্য সংসারঃ, তত্রাহ-তস্য চেতি। অজ্ঞানং তৎকাৰ্য্যং চান্তঃকরণাদি পরোপাধিশব্দার্থঃ। সংসারস্যাত্মন্যৌপাধিকত্বে দৃষ্টান্তমাহ-যথেতি। দাষ্টান্তিক- স্তানেকরূপত্বাদনেকদৃষ্টান্তোপাদানমিত্যভিপ্রেত্য দাষ্টান্তিকমাহ-তথেতি। যথোক্তদৃষ্টান্তানু- সারেণাত্মন্যপি পরোপাধিঃ সংসার ইতি যাবৎ। সোপাধিকস্যাত্মনঃ সংসারিত্বমুক্ত। নিরুপাধিকস্য নিত্যমুক্তত্বমাহ-নিরুপাধিক ইতি। নিরুপাখ্যত্বং বাচাং মনসাং চাগোচরত্বম্। কথং তর্হি তত্রাগমপ্রামাণ্যং, তত্রাহ-নেতি নেতীতি ব্যপদেশ্য ইতি। কহোলপ্রশ্নোক্তমনুদ্রবতি-

১০১০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সাক্ষাদিতি। অক্ষরব্রাহ্মণোক্তং স্মারয়তি-অক্ষরমিতি। অন্তর্যামিত্রাহ্মণোক্তং স্মারয়তি- অন্তর্যামীতি। শাকল্যব্রাহ্মণোক্তমনুসন্দধাতি-ঔপনিষদ ইতি। ২

তদেব পুনরিন্ধসংজ্ঞঃ প্রবিবিক্তাহারঃ; ততোহন্তহৃদয়ে লিঙ্গাত্মা প্রবিবিক্তা- হারতরঃ; ততঃ পরেণ জগদাত্মা প্রাণোপাধিঃ; ততোহপি প্রবিলাপ্য জগদাত্মা- নমুপাধিভূতৎ রজ্জাদাবিব সর্পাদিকং বিদ্যয়া “স এষ নেতি নেতি” ইতি সাক্ষাৎ- সর্ব্বান্তরং ব্রহ্মাধিগতম্। এবমভয়ং পরিপ্রাপিতো জনকঃ যাজ্ঞবল্ক্যেন আগমতঃ সঙ্ক্ষেপতঃ। অত্র চ জাগ্রৎস্বপ্নসুযুপ্ততুরীয়াণ্যুপন্যস্তানি অন্যপ্রসঙ্গেন—ইন্ধঃ, প্রবিবিক্তাহারতরঃ, সর্ব্বে প্রাণাঃ, স এষ নেতি নেতীতি। ৩

পাঞ্চমিকমর্থমিথমনুদ্যাতীতে ব্রাহ্মণদ্বয়ে বৃত্তমনুভাষতে-তদেবেতি। যৎ সাক্ষাদপরোক্ষাৎ সর্ব্বান্তরং ব্রহ্ম, তদেবাধিগমনোপায়বিশেষোপদর্শনপুরঃসরং পুনরধিগতমিতি সম্বন্ধঃ। ষড়াচাৰ্য্যব্রাহ্মণার্থং সঙ্ক্ষিপ্য কুর্চ্চব্রাহ্মণার্থং সঙ্ক্ষিপতি-ইন্ধ ইত্যাদিনা। ইন্ধস্য বিশেষণং প্রবিবিক্তাহার ইতি। হৃদয়েহস্তযো লিঙ্গাত্মা স ততো বৈশ্বানরাদিদ্ধাৎ প্রবিবিক্তাহারতর ইতি যোজনা। বিশ্বতৈজসাবুক্তৌ প্রাজ্ঞতুরীয়ে প্রদর্শয়তি-ততঃ পরেণেতি। ততস্তস্মান্বিশ্বাত্তৈজসাচ্চ পরেণ ব্যবস্থিতো যো জগদাত্মা প্রাণোপাধিরব্যাকৃতাখ্যঃ প্রাজ্ঞস্ততোহপি তমপ্যুপাধিভূতং জগদাত্মানং কেবলে প্রতীচি বিদ্যয়া প্রবিলাপ্য স এব নেতি নেতীতি যতুরীয়ং ব্রহ্ম তদধিগত- মিতি সম্বন্ধঃ। বিদ্যয়োপাধিবিলাপনে দৃষ্টান্তমাহ-রজ্জাদাবিতি। অভয়ং বৈ জনকেত্যাদা- যুক্তমনুবদতি-এবমিতি। কুর্চ্চব্রাহ্মণোক্তমর্থমনুভাষিতং সঙ্ক্ষিপ্যাহ-অত্র চেতি। অন্য- প্রসঙ্গেনোপাসনানাং ক্রমমুক্তিফলত্বপ্রদর্শনপ্রসঙ্গেনেতি যাবৎ। তেষামুপন্যাসমেবাভিনয়তি- ইন্ধ ইত্যাদিনা। ৩

ইদানীং জাগ্রৎস্বপ্নাদিদ্বারেণৈব মহতা তর্কেণ বিস্তরতোহধিগমঃ কর্তব্যঃ; অভয়ং প্রাপয়িতব্যম্; সম্ভাবশ্চাত্মনো বিপ্রতিপত্যাশঙ্কানিরাকরণদ্বারেণ-ব্যতি- রিক্তত্বং শুদ্ধত্বম্ স্বয়ংজ্যোতিষ্টুম্ অলুপ্তশক্তিস্বরূপত্বং নিরতিশয়ানন্দস্বাভাব্যম্ অদ্বৈতত্বঞ্চ অধিগন্তব্যমিতি ইদমারভ্যতে। আখ্যায়িকা তু বিদ্যাসম্প্রদান-গ্রহণ- বিধিপ্রকাশনার্থা, বিদ্যাস্তুতয়ে চ বিশেষতঃ, বরদানাদিসূচনাৎ। ৪

বৃত্তমনুদ্যোত্তরব্রাহ্মণস্য তাৎপর্য্যমাহ-ইদানীমিতি। আদিশব্দঃ সুষুপ্তিতুরীয়সংগ্রহার্থঃ। তর্কস্থ্য মহত্ত্বং চতুর্বিধদোষরাহিত্যেনাবাধিতত্বম্। অধিগমস্তস্যৈব প্রস্তুতস্য ব্রহ্মণ ইতি শেষঃ। কর্তব্য ইতীদমিদানীমারভ্যত ইতি সম্বন্ধঃ। কিমিদং ব্রহ্মণোহধিগমন্য কর্তব্যত্বং নাম, তদাহ- অভয়মিতি। অধিগন্তব্যমর্থান্তরমাহ-সম্ভাবশ্চেতি। প্রাগপি সম্ভাবস্তস্যাধিগতস্তৎকিমর্থং পুনস্তাদর্থ্যেন প্রযত্যতে, তত্রাহ-বিপ্রতিপত্তীতি। বাহ্যানাং বিপ্রতিপত্যা নাস্তিত্বশঙ্কায়াং তন্নিরাসদ্বারাত্মনঃ সম্ভাবোহধিগন্তব্য ইত্যর্থঃ। আত্মনোহস্তিত্বেহপি কেচিদ্দেহাদৌ তদন্তর্ভাব- মভ্যুপযন্তি, তান্ প্রত্যাহ-ব্যতিরিক্তত্বমিতি। দেহাদিব্যতিরিক্তোহপ্যাত্মা কর্তা ভোক্তা চেত্যেকে, ভোক্তৈব কেবলমিত্যপরে, তান্ প্রত্যুক্তম্-শুদ্ধত্বমিতি। তস্য জড়ত্বপক্ষং প্রত্যাচষ্টে-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১০১১

স্বয়ংজ্যোতিষ্টমিতি। তত্র কুটস্থদৃষ্টিস্বভাবত্বং হেতুমাহ-অলুপ্তেতি। এতেন বিজ্ঞানস্য গুণত্বপক্ষোহপি প্রত্যুক্তো যেদিতব্যঃ। যে স্বানন্দমাত্মগুণমাহস্তান্ প্রত্যাহ--নিরতিশয়েতি। আত্মনঃ সপ্রপঞ্চত্বপক্ষং প্রত্যাদিশতি-অদ্বৈতত্বং চেতি।

ব্রাহ্মণতাৎপর্য্যমভিধায়াখ্যায়িকা তাৎপর্য্যমাহ—আখ্যায়িকা ত্বিতি। বিদ্যায়াঃ সম্প্রদানং শিষ্যঃ, তস্য গ্রহণবিধিঃ শ্রদ্ধাদিপ্রকারঃ, তস্য প্রকাশনার্থেয়মাখ্যায়িকেতি। যাবৎ। প্রয়োজনান্তরং তস্যা দর্শয়তি—বিদ্যেতি। কথং কৰ্ম্মভ্যো বিশেষতো বিদ্যায়াঃ স্তুতিরত্র লক্ষ্যতে, তত্রাহ— বরেতি। কামপ্রশ্নাধ্যস্য বরস্য যাজ্ঞবল্ক্যেন রাজ্ঞে দত্তত্বাত্তেন চাবসরে ব্রহ্মজ্ঞানস্যৈব পৃষ্টত্বাদনেন বিধিনা বিদ্যাস্তুতেঃ সূচনাৎ সাপ্যত্র বিবক্ষিতেত্যর্থঃ। ৪

আভাসভাষ্যানুবাদ।-অতীত দ্বিতীয় ব্রাহ্মণের সহিত ‘জনকং হ বৈদেহং যাজ্ঞবন্ধ্যো জগাম’ ইত্যাদি তৃতীয় ব্রাহ্মণের সম্বন্ধ কথিত হইতেছে- “নান্যদ্ অতোহস্তি দ্রষ্টা” “নান্যদতোহস্তি দ্রষ্ট” ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা গিয়াছে যে, বিজ্ঞানময় জীবাত্মা প্রকৃতপক্ষে সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষরূপী সর্ব্বান্তর পরমাত্মাই বটে। তাহার পর, মধুকান্ডে অজাতশত্রু-সংবাদে সেই আত্মাই দেহমধ্যে প্রবিষ্ট ও বচন-শ্রবণাদি ক্রিয়াদর্শনে দেহাতিরিক্তরূপে অনুমানগম্য এবং আপাতপ্রতীত প্রাণনাদিক্রিয়ার কর্তৃত্ব-ভোক্তৃত্বাদি ধর্ম্মের নিরাসপূর্ব্বক যথার্থ- রূপেও প্রতিপাদিত হইয়াছে; কিন্তু উষন্তের প্রশ্নে আবার সামান্যরূপে অবগত সেই আত্মারই-“প্রাণেন প্রাণিতি” ইত্যাদি ও “দৃষ্টেন্দ্রষ্টা” ইত্যাদি বাক্যে বিশেষরূপে প্রতিপাদন করা হইয়াছে যে, কোন অবস্থাতেই তাহার জ্ঞানপ্রকাশ- শক্তি বিলুপ্ত হয় না। ১

আরও বলা হইয়াছে যে, যেমন আগন্তুক দোষবশতঃ রজ্জুতে সর্প, ঊষর- ভূমিতে উদক, শুক্তিতে রজত ও গগনে মালিন্য আরোপিত হইয়া থাকে, কিন্তু ঐ সমস্ত ধৰ্ম্ম উহাদের স্বাভাবিক নহে, তেমনি অলুপ্তশক্তি সেই আত্মার যে, সংসার—জন্ম মরণ ও সুখদুঃখাদি সম্বন্ধ, সে সমুদয়ও উপাধিকৃত—অন্যের সহিত সম্বন্ধবশতঃ উৎপন্ন হয়, কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ নহে। তাহা হইতে ইহাই প্রতিপন্ন হইয়াছে যে, আত্মা স্বভাবতঃ নিরুপাধিক, নির্বিশেষ, ‘নেতি নেতি’ রূপে নিষেধমুখে নির্দেশযোগ্য, সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষরূপী, সর্ব্বান্তর, অন্তর্যামী, সর্ব্বশাসনকর্তা ও উপনিষৎ- প্রতিপাদ্য অক্ষর পুরুষ এবং বিজ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ ব্রহ্ম। ২

সেই আত্মাকেই আবার ইন্ধ-সংজ্ঞায় অভিহিত করিয়া, তাহার সূক্ষ্ম বিষ- য়োপভোগ নির্দেশ করা হইয়াছে, তদপেক্ষাও সূক্ষ্মবিষয়গ্রাহী হৃদয়মধ্যে নিহিত লিঙ্গাত্মার স্বরূপ কথিত হইয়াছে; পরে তদপেক্ষাও উত্তম প্রাণোপাধিসমন্বিত জগদাত্মার কথা বলা হইয়াছে; শেষে অবিদ্যাপ্রসূত রজ্জুগত লর্পের ন্যায়

১০১২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

উপাধিভূত জগদ্বাত্মভাব জ্ঞানবলে বিলীন করিয়া “স এষ নেতি নেতি” বলিয়া সাক্ষাৎ সর্ব্বান্তর্যামী ব্রহ্মতত্ত্ব বিশেষিত করা হইয়াছে। যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি এইরূপে শাস্ত্রোপদেশানুসারে জনককে সঙ্ক্ষেপতঃ অভয় ব্রহ্ম বিজ্ঞাপিত করিয়াছেন। এখানে ইন্ধ, প্রবিবিক্তাহারতর ও প্রাণব্যূহের বিষয় বর্ণিত হইয়াছে এবং ‘স এষ নেতি নেতি’ বাক্যে প্রসঙ্গক্রমে জাগ্রৎ, স্বপ্ন, সুষুপ্ত ও তুরীয় আত্মারও স্বরূপ নিরূপিত হইয়াছে। ৩

এখন সাক্ষাৎ সম্বন্ধে জাগ্রৎ-স্বপ্নাদি অবস্থায় তর্ক দ্বারাও বিশেষভাবে তাহাকে জানিতে হইবে, অভয় লাভ করাইতে হইবে, এবং যত রকম আশঙ্কা উত্থিত হইতে পারে, তৎসমস্ত খণ্ডন করিয়া দেহাদির অতিরিক্ত আত্মার সম্ভাব, শুদ্ধত্ব,(সদা পাপপুণ্যশূন্যত্ব), স্বপ্রকাশত্ব, অলুপ্তশক্তিস্বভাবত্ব, সর্ব্বাতিশয় আনন্দ- রূপত্ব এবং অদ্বিতীয়ত্ব জ্ঞাপন করিবার জন্য এই প্রকরণ আরব্ধ হইতেছে। কিরূপে বিদ্যাদান করিতে হয়, কিরূপেইবা বিদ্যা গ্রহণ করিতে হয়, তাহা জ্ঞাপনের জন্য আখ্যায়ার অবতারণা করা হইয়াছে; বিশেষতঃ বরদান প্রভৃতি কার্য্য হইতে বুঝা যায় যে, বিদ্যার মহিমা কীর্তন করাও আখ্যায়িকার আর একটি প্রধান উদ্দেশ্য। ৪

জনকং হ বৈদেহং যাজ্ঞবল্ক্যো জগাম, স মেনে ন বদিষ্য- ইতি, অথ হ যজ্জনকশ্চ বৈদেহো যাজ্ঞবল্ক্যশ্চাগ্নিহোত্রে সমুদাতে, তস্মৈ হ যাজ্ঞবল্ক্যো বরং দদৌ, স হ কামপ্রশ্নমেব বব্রে, তং হাস্মৈ দদৌ, তংহ সম্রাড়েব পূর্ব্বং পপ্রচ্ছ ॥ ২৫২ ॥ ১ ॥

সরলার্থঃ।—যাজ্ঞবল্ক্যঃ বৈদেহং জনকং জগাম হ। সঃ(যাজ্ঞবল্ক্যঃ) [গচ্ছন্] মেনে(চিন্তিতবান্)—ন বদিষ্যে(রাজ্ঞে কিমপি ন কথয়িষ্যামি ইত্যর্থঃ) ইতি। অথ(তথাপি) যৎ[যাজ্ঞবল্ক্যঃ জনকস্য প্রশ্নোত্তরং দত্তবান্, তস্য কারণ- মেতৎ—] বৈদেহঃ জনকঃ যাজ্ঞবল্ক্যশ্চ পূর্ব্বং অগ্নিহোত্রে সমুদাতে(বিচারিত- বস্তৌ); যাজ্ঞবল্ক্যঃ হ(ঐতিহ্যে) তস্মৈ(জনকায়) বরং দদৌ; সঃ(জনকঃ) হ কামপ্রশ্নং(ইচ্ছানুরূপং প্রশ্নং) বব্রে(প্রার্থিতবান্)।[যাজ্ঞবল্ক্যশ্চ] অস্মৈ (জনকায়) তৎ(কামপ্রশ্নরূপং বরং) দদৌ;[অতঃ] সঃ সম্রাট্(জনকঃ) এব পূর্ব্বং(প্রথমং) তৎ পপ্রচ্ছ(পৃষ্টবান্) ॥২৫২৷৷২॥

মুলাসুবাদ?—যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি কোন সময়ে বিদেহপতি জনকের নিকট গিয়াছিলেন। তিনি যাইবার সময় মনে মনে স্থির

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০১৩

করিয়াছিলেন—আমি কিছুই বলিব না; তথাপি যে[যাজ্ঞবল্ক্য জনকের প্রশ্নোত্তর দিয়াছিলেন, তাহার কারণ—] পূর্ব্বে বিদেহপতি জনক ও যাজ্ঞবল্ক্য অগ্নিহোত্র যজ্ঞসম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছিলেন, ইতঃপূর্ব্বে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি জনক মহারাজকে একটি বর প্রদান করিয়াছিলেন; তাহাতে জনক কামপ্রশ্নই প্রার্থনা করিয়াছিলেন; যাজ্ঞবল্ক্যও তাঁহাকে সেই বরই দিয়াছিলেন; এই জন্য সম্রাট্ জনকই প্রথমে প্রশ্ন করিয়া- ছিলেন ॥ ২৫২ ॥ ১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—জনকং হ বৈদেহং যাজ্ঞবল্ক্যো জগাম। স চ গচ্ছন্ এবং মেনে চিন্তিতবান্—ন বদিষ্যে কিঞ্চিদপি রাজ্ঞে, গমনপ্রয়োজনং তু যোগ- ক্ষেমার্থম্। ন বদিষ্যে ইত্যেবৎসঙ্কলোহপি যাজ্ঞবল্ক্যঃ যদ্ যদ্ জনকঃ পৃষ্টবান্, তৎ তৎ প্রতিপেদে। তত্র কো হেতুঃ সঙ্কল্পিতস্যান্যথাকরণে—ইত্যত্রাখ্যায়িকামাচষ্টে।

পূর্ব্বত্র কিল জনক-যাজ্ঞবল্ক্যয়োঃ সংবাদ আসীদগ্নিহোত্রে নিমিত্তে; তত্র জনকস্যাগ্নিহোত্রবিষয়ৎ বিজ্ঞানমুপলভ্য পরিতুষ্টো যাজ্ঞবল্ক্যঃ তস্মৈ জনকায় হ কিল বরং দদৌ। স চ জনকো হ কামপ্রশ্নমেব বরং বব্রে বৃতবান্; তঞ্চ বরং হাম্মৈ দদৌ যাজ্ঞবল্ক্যঃ, তেন বরপ্রদানসামর্থ্যেন অব্যাচিখ্যাসুমপি যাজ্ঞবল্ক্যং তুষ্ণীং- স্থিতমপি সম্রাড়েব জনকঃ পূর্ব্বং পপ্রচ্ছ। তত্রৈবানুক্তিঃ, ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ কৰ্ম্মণা বিরুদ্ধত্বাৎ, বিদ্যায়াশ্চ স্বাতন্ত্র্যাৎ,-স্বতন্ত্রা হি ব্রহ্মবিদ্যা সহকারিসাধনান্তর- নিরপেক্ষা পুরুষার্থসাধনেতি চ ॥২৫২৷১৷৷

টীকা।—তাৎপয্যমেবমুক্তা ব্যাখ্যামক্ষরাণামারভতে—জনকমিত্যাদিনা। সংবাদং ন করোমীতি ব্রতং চেৎ, কিমিতি গচ্ছতীত্যাশঙ্ক্যতে—গমনেতি। উত্তরমাহ—যোগেতি। অথ হেত্যাদ্যবতারয়তি—নেত্যাদিনা। অত্রোত্তরত্বেনেতি শেষঃ। পূর্ব্বত্রেতি কর্মকাণ্ডোক্তিঃ। নম্বগ্নিহোত্রপ্রকরণে কামপ্রশ্নো বরো দত্তশ্চেৎ, কিমিতি তত্রৈবাত্মযাথাত্ম্যপ্রশ্ন-প্রতিবচনে নাসুচিষাতাং, তত্রাহ—তত্রৈবেতি। কর্মনিরপেক্ষায়া ব্রহ্মবিদ্যায়া মোক্ষহেতুত্বাদপি কৰ্ম্ম- প্রকরণে তদমুক্তিরিত্যাহ—বিদ্যায়াশ্চেতি। সর্ব্বাপেক্ষাধিকরণন্যায়ান্ন তস্যাঃ স্বাতন্ত্র্যমিত্যা- শঙ্ক্যাহ—স্বতন্ত্রা হীতি। সাহি স্বোৎপত্তৌ স্বফলে বা কর্মাণ্যপেক্ষতে? নাদ্যোহভ্যুপগমাৎ। ন দ্বিতীয়ঃ, অত এব চাগ্নীন্ধনাদ্যনপেক্ষেতি ন্যায়বিরোধাদিত্যভিপ্রেত্যাহ—সহকারীতি। ইত্যস্মাচ্চ হেতোস্তত্রৈবানুক্তিরিতি সম্বন্ধঃ ॥২৫২॥১॥

ভাষ্যানুবাদ।—পুরাকালে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি বিদেহাধিপতি জনকের সমীপে গিয়াছিলেন। তিনি যাইতে যাইতে এইরূপ মনে করিয়াছিলেন—চিন্তা করিয়াছিলেন যে, আমি রাজাকে কিছুই বলিব না, অর্থাৎ আমার গমনের প্রয়ো-

১০১৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

জন যে, যোগক্ষেম, তাহা তাহাকে বলিব না(১)। অথচ ‘আমি বলিব না’ এইরূপ স্থিরসঙ্কল্প হইয়াও যাজ্ঞবল্ক্য, জনক মহারাজ তাঁহাকে যাহা যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তিনি সে সমস্তের উত্তর দিয়াছিলেন। যাজ্ঞবল্ক্যের সেই পূর্ব্বসঙ্কল্প পরিত্যাগের কারণ যে কি, তাহা জানাইবার নিমিত্ত এই আখ্যায়িকার অবতারণা করিতেছেন।

ইতঃপূর্ব্বে জনক ও যাজ্ঞবন্ধ্যের অগ্নিহোত্র নামক যজ্ঞসংবন্ধে কথোপকথন হইয়াছিল; তাহাতে যাজ্ঞবন্ধ্য ঋষি অগ্নিহোত্র যজ্ঞবিষয়ে জনকের উত্তম বিজ্ঞান দর্শনে পরিতুষ্ট হইয়া জনককে বর দিতে সম্মত হন। জনক তখন কাম-প্রশ্নই ইচ্ছানুযায়ী বররূপে প্রার্থনা করিয়াছিলেন, যাজ্ঞবন্ধ্যও তাঁহাকে সেই বরই প্রদান করিয়াছিলেন। সেইরূপ বর প্রদত্ত হইয়াছিল বলিয়াই এখন যাজ্ঞবন্ধ্য কোন তত্ত্ব ব্যাখ্যান করিতে ইচ্ছা না করিলেও-চুপ করিয়া থাকিলেও সম্রাট্ নিজেই তাঁহাকে প্রথমে জিজ্ঞাসা করিলেন। পূর্ব্বে যে, অগ্নিহোত্র যজ্ঞপ্রসঙ্গেই এ তত্ত্ব বলেন নাই কেন, তাহার কারণ-ব্রহ্মবিদ্যা স্বভাবতই কর্ম্মের বিরোধী বা প্রতিকূল, এবং স্বতন্ত্রভাবে বিজ্ঞেয়; কারণ, ব্রহ্মবিদ্যা স্বতন্ত্রভাবে-অপর কোনও সাধনের সাহায্য না লইয়াই পুরুষার্থ(মোক্ষ) সাধন করিয়া থাকে ॥ ২৫২ ॥ ১ ॥

যাজ্ঞবল্ক্য কিংজ্যোতিরয়ং পুরুষ ইতি, আদিত্যজ্যোতিঃ সম্রাড়িতি হোবাচ, আদিত্যেনৈবায়ং জ্যোতিষাস্তে পল্যয়তে কৰ্ম্ম কুরুতে বিপল্যেতীত্যেবমেবৈতদযাজ্ঞবল্ক্য ॥ ২৫৩ ॥ ২॥

সরলার্থঃ।—[ইদানীং জনকস্য প্রশ্নং প্রকটীকর্তুমাহ—যাজ্ঞবল্ক্যেত্যাদি]। হে যাজ্ঞবল্ক্য, অয়ং পুরুষঃ(ব্যবহারিকঃ জীবঃ) কিংজ্যোতিঃ?(যেন জ্যোতিষা ব্যবহরতি, কিং তজ্জ্যোতিঃ?) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্যঃ] উবাচ হ—হে সম্রাট্, আদিত্যজ্যোতিঃ(আদিত্যেন জ্যোতিষা ব্যবহারতীত্যর্থঃ) ইতি। অয়ং(পুরুষঃ) আদিত্যেন(চক্ষুষোহনুগ্রাহকেন) জ্যোতিষা এব আস্তে(ব্যবহারে বর্ত্ততে), পলায়তে(ক্ষেত্রাদৌ পরিভ্রমতি), কর্ম্ম(স্বব্যাপারৎ) কুরুতে, বিপল্যেতি(প্রত্যা- গচ্ছতি চ) ইতি।[এবমুক্তঃ জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতৎ এবম্ এব (ত্বয়া যদুক্তম্, তৎ তথৈবেত্যর্থঃ) ॥২৫৩॥২॥

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০১৫

, মুলাসুবাদ।—[ এখন জনকের প্রশ্ন বলা হইতেছে—জনক জিজ্ঞাসা করিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এই যে হস্তপদাদিযুক্ত ব্যবহারিক পুরুষ, এই পুরুষ কোন্ জ্যোতির সাহায্যে ব্যবহার সম্পাদন করিয়া থাকে?[যাজ্ঞবল্ক্য] বলিলেন—হে সম্রাট্, আদিত্যরূপ জ্যোতির সাহায্যে। এই পুরুষ আদিত্য জ্যোতির সাহায্যেই ব্যবহার সম্পাদন করে—নানাস্থানে গমন করে, তথা হইতে আগমন করে, এবং আবশ্যক কৰ্ম্ম নিষ্পাদন করে।[জনক বলিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এইরূপই বটে, অর্থাৎ তুমি যাহা বলিলে, তাহা সেইরূপই সত্য॥ ২৫৩॥ ২॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—হে যাজ্ঞবল্ক্যেত্যেবং সম্বোধ্য অভিমুখীকরণায়; কিংজ্যোতিরয়ং পুরুষ ইতি—কিমস্য পুরুষস্য জ্যোতিঃ, যেন জ্যোতিষা ব্যবহারতি, সোহয়ং কিংজ্যোতিঃ? অয়ং প্রাকৃতঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতরূপঃ শিরঃপাণ্যাদিমান্ পুরুষঃ পৃচ্ছ্যতে—কিময়ং স্বাবয়বসঙ্ঘাত-বাহেন জ্যোতিরন্তরেণ ব্যবহারতি? আহোস্বিৎ স্বাবয়বসಂಘাতমধ্যপাতিনা জ্যোতিষা জ্যোতিঃকার্য্যম্ অয়ং পুরুষো নির্বর্ত্তয়তি? ইত্যেতদভিপ্রেত্য পৃচ্ছতি। কিঞ্চাতঃ—যদি ব্যতিরিক্তেন যদি বা অব্যতিরিক্তেন জ্যোতিষা জ্যোতিঃকার্য্যং নির্ব্বর্ত্তয়তি? শৃণু তত্র কারণম্।— যদি ব্যতিরিক্তেনৈব জ্যোতিষা জ্যোতিঃকার্য্যনির্ব্বর্ত্তকত্বমস্য স্বভাবো নির্দ্ধারিতো ভবতি, ততোহদৃষ্টজ্যোতিঃকার্য্যবিষয়েহপ্যনুমাস্যামহে, ব্যতিরিক্তজ্যোতিন্নিমিত্তমে- বেদং কার্য্যমিতি; অথাব্যতিরিক্তেনৈব স্বাত্মনা জ্যোতিষা ব্যবহারতি, ততঃ অপ্রত্যক্ষেহপি জ্যোতিষি জ্যোতিঃকার্য্যদর্শনে অব্যতিরিক্তমেব জ্যোতিরনুমেয়ম্। অথানিয়ম এব—ব্যতিরিক্তমব্যতিরিক্তং বা জ্যোতিঃ পুরুষস্য ব্যবহারহেতুঃ, ততোহনধ্যবসায় এব জ্যোতির্বিষয়ে—ইত্যেবং মন্থানঃ পৃচ্ছতি জনকো যাজ্ঞবল্ক্যং —“কিংজ্যোতিরয়ং পুরুষঃ” ইতি। ১

টীকা।—যাজ্ঞবন্ধ্যব্রতভঙ্গে হেতুমুক্তা জনকস্য প্রশ্নমুখাপয়তি—হে যাজ্ঞবল্ক্যেতি। অক্ষরার্থমুক্তা প্রশ্নবাক্যে বিবক্ষিতমর্থমাহ—কিময়মিত্যাদিনা। সশব্দো যথোক্তপুরুষবিষয়ঃ। জ্যোতিষ্কাৰ্য্যমিত্যাসনাদিব্যবহারোক্তিঃ। ইত্যেতদিতি কল্পদ্বয়ং পরামৃশ্যতে। পক্ষদ্বয়েহপি ফলং পৃচ্ছতি—কিং চেতি। সপ্তমার্থে তসিঃ। উত্তরমাহ—শৃণ্বিতি। তত্রেতি পক্ষদ্বয়োক্তিঃ। কারণং ফলমিতি যাবৎ। প্রথমপক্ষমনুদ্য স্বপক্ষসিদ্ধিফলমাহ—যদীত্যাদিনা। ষষ্ঠী পুরুষমধি- করোতি। যত্র কারণভূতং জ্যোতিন দৃশ্যতে, তৎ কাৰ্য্যং ত্বাসনাদ্যুপলভ্যতে, তত্রাপি বিষয়ে স্বপ্নাদাবিতি যাবৎ। অনুমানমেবাভিনয়তি—ব্যতিরিক্তেতি। বিমতমতিরিক্তজ্যোতিরধীনং ব্যবহারত্বাৎ সংমতবদিত্যর্থঃ।

১০১৬. বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

পক্ষান্তরমনুষ্য লোকায়তপক্ষসিদ্ধিফলমাহ—অথেত্যাদিনা। অপ্রত্যক্ষেংপীভ্যব্যতিরিক্তমিতি চ্ছেদঃ। কল্পান্তরমাহ—অথেতি। অনিয়মং ব্যাকরোতি—ব্যতিরিক্তমিতি। তস্মিন্ পক্ষে ব্যবহারহেতৌ জ্যোতিষ্যনিশ্চয়াত্তদ্বিকারো ব্যবহারোহপি ন স্থৈর্য্যমালম্বেতেত্যাহ—তত ইতি। ব্যাখ্যাতং প্রশ্নমুপসংহরতি—ইত্যেবমিতি। ১

নম্বেবম্ অনুমানকৌশলে জনকস্য কিং প্রশ্নেন? স্বয়মেব কস্মান্ন প্রতিপদ্যতে ইতি। সত্যমেতৎ; তথাপি লিঙ্গ-লিঙ্গি-সম্বন্ধবিশেষাণামত্যন্তসৌক্ষ্মাৎ দুরববোধ্যতাং মন্যতে বহুনামপি পণ্ডিতানাম্, কিমুতৈকস্য; অতএব হি ধৰ্ম্মসূক্ষ্মনির্ণয়ে পরিষদ্ব্যাপার ইষ্যতে, পুরুষবিশেষশ্চাপেক্ষ্যতে—দশাবরা পরিষৎ, ত্রয়ো বৈকো বেতি; তস্মাদ যদ্যপ্যনুমানকৌশলং রাজ্ঞস্তথাপি তু যুক্তো যাজ্ঞবল্ক্যঃ প্রষ্টুম্, বিজ্ঞানকৌশলতার- তম্যোপপত্তেঃ পুরুষাণাম্। ২

প্রশ্নমাক্ষিপতি-নস্থিতি। ব্যতিরিক্তজ্যোতির্বুভুৎসয়া প্রশ্নো ভবিষ্যতীতি চেৎ, তত্রাহ- স্বয়মেবেতি। রাজ্ঞোহনুমানকৌশলমঙ্গী করোতি-সত্যমিতি। কিমিতি তর্হি পৃচ্ছতীত্যাশঙ্ক্যাহ -তথাহপীতি। ব্যাপ্যব্যাপকয়োস্তৎসম্বন্ধস্য চাতিসূক্ষ্মত্বাদেকেন দুর্জ্জনত্বাত্তজ, জ্ঞানে যাজ্ঞবন্ধ্যো- হপ্যপেক্ষিত ইত্যর্থঃ। কথং তেষামতিসূক্ষ্মত্বং, তত্রাহ-বহুনামপীতি। লিঙ্গাদিধনেকেষামপি বিবেকিনাং দুর্বোধতাস্তি, কিমুতৈকস্য তেষু দুর্বোধতা বাচ্যেত্যর্থঃ। তেষামত্যন্তসৌক্ষ্যে মানবীং স্মৃতিং প্রমাণয়তি-অত এবেতি। কুশলস্যাপি সূক্ষ্মার্থনির্ণয়ে পুরুষান্তরাপেক্ষায়া: সত্ত্বাদেবেতি যাবৎ। পুরুষবিশেষো বেদবিদধ্যাত্মবিদিত্যাদিঃ। তত্র স্মৃত্যর্থং সংক্ষিপতি-দশেতি। উক্তং হি-

“ধর্ম্মেণাধিগতো যৈস্তু বেদঃ সপরিবৃংহণঃ। তে শিষ্টা ব্রাহ্মণা জ্ঞেয়াঃ শ্রুতিপ্রত্যক্ষহেতবঃ ॥ দশাবরা বা পরিষদ যং ধৰ্ম্মং পরিচক্ষতে। এ্যবরা বাপি বৃত্তস্থাস্তং ধর্ম্মং ন বিচারয়েৎ ॥ ত্রৈবিদ্যো হৈতুকন্তর্কী নৈরুক্তো ধৰ্ম্মপাঠকঃ। ত্রয়শ্চাশ্রমিণঃ পূর্ব্বে পর্যদেষা দশাবরা ॥ ঋগ্বেদবিদ্ যজুর্বিচ্চ সামবেদবিদেব চ। এ্যবরা পরিষজুজ্ঞেয়া ধর্ম্মসংশয়নির্ণয়ে” ইতি ॥

একো বেত্যধ্যাত্মবিদুচ্যতে। কুশলস্যাপি রাজ্ঞো যাজ্ঞবল্ক্যং প্রতি প্রশ্নোপপত্তিমুপসংহরতি— তস্মাদিতি। সুক্ষ্মার্থনির্ণয়ে পুরুষান্তরাপেক্ষায়া বৃদ্ধসংমতত্বাদিতি যাবৎ। তত্রৈব হেত্বন্তরমাহ— বিজ্ঞানেতি। ২

অথবা শ্রুতিঃ স্বয়মেব আখ্যায়িকাব্যাজেন অনুমানমার্গমুপন্যস্য অস্মান্ বোধয়তি পুরুষমতিমনুসরন্তী। যাজ্ঞবল্ক্যোহপি জনকাভিপ্রায়াভিজ্ঞতয়া ব্যতিরিক্তমাত্ম- জ্যোতির্বোধয়িষ্যন্ জনকং ব্যতিরিক্তত্বপ্রতিপাদকমের লিঙ্গৎ প্রতিপেদে, যথা—

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৭৯

প্রসিদ্ধম্ আদিত্যজ্যোতিঃ সম্রাড়িতি হোবাচ। কথম্? আদিত্যেনৈব স্বাবয়ব- সঙ্ঘাতব্যতিরিক্তেন চক্ষুযোহমুগ্রাহকেণ জ্যোতিষা অয়ং প্রাকৃতঃ পুরুষ আস্তে— উপবিশতি, পল্যয়তে পর্যেতি ক্ষেত্রমরণ্যৎ বা, তত্র গত্বা কৰ্ম্ম কুরুতে, বিপল্যেতি বিপর্য্যেতি চ যথাগতম্। অত্যন্তব্যতিরিক্তজ্যোতিষ্টপ্রসিদ্ধতা প্রদর্শনার্থমনেক বিশে- ষণম্; বাহ্যানেকজ্যোতিঃপ্রদর্শনঞ্চ লিঙ্গস্যাব্যভিচারিত্বপ্রদর্শনার্থম্। এবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥২৫৩৷৷২৷৷

রাজ্ঞো যাজ্ঞবল্ক্যাপেক্ষামুপপাদ্য পক্ষান্তরমাহ—অথ বেতি। তথা চাত্র রাজ্ঞো মুনের্ব্বা বিবক্ষিতত্বাভাবাৎ কিমিতি রাজা মুনিমনুসরতীতি চোদ্যং নিরবকাশমিতি শেষঃ।

প্রশ্নোপপত্তৌ প্রতিবচনমুপপন্নমেবেতি মম্বানস্তদুত্থাপয়তি-যাজ্ঞবন্ধ্যোহপীতি। অতিরিক্তে জ্যোতিষি প্রষ্ট, রাজ্ঞোহভিপ্রায়স্তদভিজ্ঞতয়া তথাবিধং জ্যোতি রাজানং বোধয়িষ্যন্ যথাতিরিক্ত- জ্যোতিরাবেদকং বক্ষ্যমাণং লিঙ্গং গৃহীতব্যাপ্তিকং প্রসিদ্ধং ভবতি, তথা তদ্ ব্যাপ্তিগ্রহণস্থলমাদিত্য- জ্যোতিরিত্যাদিনা মুনিরপি প্রতিপন্নবানিত্যর্থঃ। ব্যাপ্তিং বুভুৎসমানঃ পৃচ্ছতি-কথমিতি। যো ব্যবহারঃ সোহতিরিক্তজ্যোতিরধীনো যথা সবিত্রধীনো জাগ্রদ্ব্যবহার ইতি ব্যাপ্তিং ব্যাকরোতি -আদিত্যেনেতি। এবকারং ব্যাচষ্টে-স্বাবয়বেতি। আদিত্যাপেক্ষামন্তরেণ চক্ষুর্ব্বশাদেবায়ং ব্যবহারঃ সেৎস্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ-চক্ষুষ ইতি। আসনাদ্যন্যতমব্যাপারদেশে ব্যাপ্তিসিদ্ধেরূথা বিশেষণবহুত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-অত্যন্তেতি। আসনাদীনামেকৈকব্যভিচারে দেহস্যান্যথাভাবেহপি নানুগ্রাহকং জ্যোতিরন্যথা ভবতি। অতস্তদনুগ্রাহ্যাদত্যন্তবিলক্ষণমিতি বিবক্ষিত্বা ব্যাপারচতুষ্টয়- মুপদিষ্টমিত্যর্থঃ। তথাপি কিমর্থমাদিত্যাদ্যনেকপর্যায়োপাদানম্, একেনৈব ব্যাপ্তিগ্রহসম্ভবাদিত্যা- শঙ্ক্যাহ-বাহ্যেতি। দেহেন্দ্রিয়মনোব্যাপাররূপং কৰ্ম্ম লিঙ্গং, তন্য ব্যতিরিক্তজ্যোতিরব্যভিচার- সাধনার্থমনেকপয্যায়োপন্যাসঃ, বহবো হি দৃষ্টান্তা ব্যাপ্তিং দ্রঢ়য়ন্তীত্যর্থঃ ॥২৫৩।২৷

ভাষ্যানুবাদ।-জনক যাজ্ঞবল্ক্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন যে, এই পুরুষ(ব্যবহারিক জীব) কিংজ্যোতিঃ? অর্থাৎ এই পুরুষের সেই জ্যোতিটি কি, যে জ্যোতির সাহায্যে ব্যবহার নির্ব্বাহ করিয়া থাকে? এখানে লোকপ্রসিদ্ধ দেহেন্দ্রিয়সমষ্টিভূত হস্ত-মস্তকাদিযুক্ত পুরুষের সম্বন্ধে প্রশ্ন হইতেছে যে, এই পুরুষ কি স্বীয় অবয়ব-সমষ্টির অতিরিক্ত অপর কোনও জ্যোতির সাহায্যে ব্যবহার করিয়া থাকে? অথবা স্বীয় অবয়বান্তর্গত কোন জ্যোতির সাহায্যেই জ্যোতির কার্য্য(আলোকের কার্য্য) নির্ব্বাহ করিয়া থাকে? এই অভিপ্রায়ে জনকের প্রশ্ন। এই প্রশ্নের ফল কি?—পুরুষ যদি অবয়বাতিরিক্ত জ্যোতির দ্বারা জ্যোতির কার্য্য নির্ব্বাহ করে, যদিবা অনতিরিক্ত জ্যোতির দ্বারাই জ্যোতির কার্য্য নির্ব্বাহ করে, তাহাতে বিশেষ কি? তাহার ফল শ্রবণ কর—যদি ব্যতিরিক্ত জ্যোতি দ্বারা জ্যোতির কার্য্য নির্ব্বাহ করাই পুরুষের স্বভাব হয়, তাহা হইলে, যেখানে কোন জ্যোতিঃপদার্থ দেখিতে পাওয়া যায় না, অথচ জ্যোতির

১০১৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

কার্য্য—প্রকাশমাত্র দেখিতে পাওয়া যায়, সে স্থলেও, আমরা তাহা অতিরিক্ত জ্যোতির কার্য্য বা ফল বলিয়া অনুমান করিতে পারি; আর যদি অব্যতিরিক্ত— স্বাবয়বমধ্যবর্তী জ্যোতির দ্বারা ব্যবহার করাই পুরুষের স্বভাব হয়, তাহা হইলেও, অদৃশ্য জ্যোতিস্থানে জ্যোতির কার্য্য দর্শন করিয়া, অনতিরিক্ত জ্যোতির অনুমান করিতে পারি। আর যদি কোন নিয়মই না থাকে—যথালম্ভব অতিরিক্ত ও অনতিরিক্ত উভয়প্রকার জ্যোতিই পুরুষের ব্যবহার-নির্ব্বাহের হেতু হয়, তাহা হইলেও জ্যোতির বা প্রকাশের সম্বন্ধে কোন একটা স্থিরনিশ্চয় সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না; এইরূপ সংশয়সমাকুল হইয়া জনক মহারাজ প্রশ্ন করিতেছেন যে, “কিংজ্যোতিঃ অয়ং পুরুষঃ” ইতি। ১

ভাল কথা, জনকের যদি এতটাই অনুমান-কৌশল থাকে, তাহা হইলে আর প্রশ্নের প্রয়োজন কি?—তিনি নিজেই তাহা নিরূপণ করেন না কেন? হাঁ, এ কথা সত্যই বটে; কিন্তু তাহা হইলেও, হেতু-হেতুমদ্ভাবঘটিত সম্বন্ধ বা ব্যক্তি- নিরূপণ এতই দুরূহ যে, সমবেত বহু পণ্ডিতের পক্ষেও তাহা নিতান্ত দুর্বোধ্য বলিয়া মনে হয়, একজনের পক্ষে আর কথা কি? এই কারণেই কোনও সূক্ষ্ম ধৰ্ম্মতত্ত্ব নিরূপণস্থলে জ্ঞানিগণ পরিষদ্ব্যবস্থা স্বীকার করিয়া থাকেন; এবং ধৰ্ম্ম- নিরূপক ব্যক্তির গুণগত উৎকর্ষের অপেক্ষা করিয়া থাকেন—যেমন দশজন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে লইয়া, তিনজনকে লইয়া অথবা একজনকে লইয়াও বিচার-সভা সংঘটিত হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, বিশিষ্টগুণসম্পন্ন হইলে একজন ব্যক্তি দ্বারাও ধর্মনিরূপণ হইতে পারে, তদপেক্ষা হীনগুণ হইলে তিনজন, আর তদপেক্ষাও হীনগুণ হইলে, সভায় দশজন সভ্যের উপস্থিতি থাকা আবশ্যক হয়(১)। অতএব বুঝিতে হইবে, যদিও রাজা জনের অনুমান-নৈপুণ্য থাকুক, তথাপি যাজ্ঞবল্ক্যের নিকট জিজ্ঞাসা করা যুক্তিযুক্তই হইয়াছে;—

(১) তাৎপর্য্য—মনু বলিয়াছেন—“ধর্ম্মেণাধিগতো যৈস্তু বেদঃ সপরিবৃংহণঃ। তে শিষ্টা ব্রাহ্মণা জ্ঞেয়াঃ শ্রুতিপ্রত্যক্ষহেতবঃ। দশাবরা বা পরিষদ্ যং ধর্ম্মং পরিচক্ষতে। এ্যবরা বাপি বৃত্তস্থা, তং ন ভূয়ো বিচারয়েৎ” ইতি। অর্থাৎ যাঁহারা ধর্মানুসারে বেদ ও বেদাঙ্গ অবগত হইয়াছেন, শ্রুত্যর্থপ্রত্যক্ষকারী সেই সমুদয় ব্রাহ্মণ ‘শিষ্ট’ পদবাচ্য। তাদৃশ গুণসম্পন্ন দশজন সদস্যযুক্ত অথবা তিনজন সদস্যযুক্ত অথবা একজন সদস্যযুক্ত ধর্ম্মসভাও যাহা ধর্ম্ম বলিয়া নিরূপণ করেন, তাহাই প্রকৃত ধর্ম্ম; সেরূপ ধর্ম্মসম্বন্ধে আর পুনর্ব্বার বিচার করিবে না। এখানে বুঝিতে হইবে যে, গুণাধিক্য হইলে একজন, তদপেক্ষা হীনগুণস্থলে তিনজন, আর তাহা অপেক্ষাও হীনগুণ হইলে দশজন সদস্যের আবশ্যক হয়।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০১৯

কারণ, বিভিন্ন ব্যক্তির অনুমানকৌশল বিভিন্ন প্রকার—উৎকর্ষাপকর্ষ- যুক্ত হয়। ২

অথবা, শ্রুতি নিজেই মানববুদ্ধির বা লোকব্যবহারের অনুবর্তিনী হইয়া প্রথমতঃ আখ্যায়িকাচ্ছলে অনুমানপ্রণালী প্রদর্শন করিয়া আমাদিগকে তত্ত্বো- পদেশ দিতেছেন। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যও মহারাজ জনকের অভিপ্রায় পরিজ্ঞাত থাকায় দেহাতিরিক্ত আত্মজ্যোতিঃ বুঝাইবার জন্য, জনকের প্রতি দেহাতিরিক্ত জ্যোতির অস্তিত্বজ্ঞাপক হেতুর উপন্যাস করিয়া বলিলেন-হে সম্রাট্, আদিত্য একটি প্রসিদ্ধ জ্যোতিঃ। কিরূপ? না, চক্ষুর অনুগ্রাহক অর্থাৎ চাক্ষুষ প্রত্য- ক্ষের সহকারী কারণ-দেহাতিরিক্ত আদিত্য জ্যোতির সাহায্যে এই প্রাণি- সমুদায় উপবেশন করিয়া থাকে, ক্ষেত্র বা অরণ্যাদি স্থানে গমন করিয়া থাকে, সেখানে যাইয়া কৰ্ম্ম করে, এবং যে ভাবে যায়, সেই ভাবেই প্রত্যাগমন করে। ব্যবহারনিষ্পাদক জ্যোতিঃপদার্থটি যে, দেহাবয়ব হইতে অত্যন্ত পৃথক্, ইহা জ্ঞাপন করিবার জন্য এখানে বহু বিশেষণ বা অনেকগুলি কার্য্যের উল্লেখ করা হইয়াছে। বাহ্য বহু জ্যোতিঃ প্রদর্শনের অভিপ্রায় এই যে, উক্ত হেতুনিচয় অব্যভিচারী অর্থাৎ উল্লিখিত জ্যোতিঃসমূহই যে, ব্যবহার-নিষ্পাদনের অব্যভি- চারী সাধন, ইহা জ্ঞাপন করা। জনক বলিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এইরূপই বটে ॥২৫৩৷২৷

অস্তমিত আদিত্যে যাজ্ঞবল্ক্য কিংজ্যোতিরেবায়ং পুরুষ ইতি, চন্দ্রমা এবাস্য জ্যোতির্ভবতীতি, চন্দ্রমসৈবায়ং জ্যোতি- যাস্তে পল্যয়তে কৰ্ম্ম কুরুতে বিপল্যেতীত্যেবমেবৈতদ্ যাজ্ঞ- বল্ক্য ॥ ২৫৪ ॥ ৩ ॥

সরলার্থঃ?—[ জনকঃ পুনঃ পপ্রচ্ছ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, আদিত্যে অন্ত- মিতে(সতি) অয়ং পুরুষঃ কিংজ্যোতিঃ এব[ভবতি]? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—][তদা] চন্দ্রমাঃ(চন্দ্রঃ) এব অস্য(পুরুষস্য) জ্যোতিঃ ভবতি ইতি। [তদা] অয়ং(পুরুষঃ) চন্দ্রমসা জ্যোতিষা এব আস্তে, পল্যয়তে, কৰ্ম্ম কুরুতে, বিপল্যেতি ইতি।[জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতদ্ এবম্ এব ইতি ॥২৫৪৷৷৩৷৷

মূলানুবাদ।—[পুনশ্চ জনক জিজ্ঞাসা করিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, আদিত্য জ্যোতির অস্তময়ে(অভাবে) এই ব্যবহারী পুরুষ কোন্ জ্যোতির দ্বারা ব্যবহার করিয়া থাকে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—]

১০২০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তখন চন্দ্রই তাহার জ্যোতিঃস্বরূপ হয়; চন্দ্ররূপ জ্যোতির সাহায্যেই তখন এই পুরুষ স্থিতিলাভ করে, গমন করে, কৰ্ম্ম করে, এবং স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করে।[ জনক বলিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা ঠিক এইরূপই বটে ॥ ২৫৪ ॥ ৩ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তথাস্তমিতি আদিত্যে যাজ্ঞবল্ক্য কিংজ্যোতিরেবায়ং পুরুষ ইতি। চন্দ্রমা এবাস্য জ্যোতিঃ ॥২৫৪৷৷৩৷৷

টীকা। ১০।১৫৪।৩।

ভাষ্যানুবাদ।—হে যাজ্ঞবল্ক্য, আদিত্য জ্যোতি অস্তমিত হইলে, কোন্ পদার্থটি এই পুরুষের জ্যোতিঃস্বরূপ হয়?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] তখন চন্দ্রই তাহার জ্যোতিঃস্বরূপ হইয়া থাকে॥২৫৪৷৷৩৷৷

অস্তমিত আদিত্যে যাজ্ঞবল্ক্য চন্দ্রমস্যস্তমিতে কিংজ্যোতি- রেবায়ং পুরুষ ইতি, অগ্নিরেবাস্য জ্যোতির্ভবতীত্যগ্নিনৈবায়ং জ্যোতিষাস্তে পল্যয়তে কৰ্ম্ম কুরুতে বিপল্যেতীত্যেবমেবৈতদ্- যাজ্ঞবল্ক্য ॥ ২৫৫ ॥ ৪ ॥

সরলার্থঃ।—[জনকঃ পপ্রচ্ছ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, আদিত্যে অস্তমিতে, চন্দ্র- মসি(চন্দ্রে চ) অস্তমিতে(সতি) অয়ং পুরুষঃ কিংজ্যোতিঃ এব? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—][তদা] অগ্নিঃ(দীপালোকাদিঃ) এব অন্য জ্যোতিঃ(বস্তুপ্রকাশকঃ) ভবতি ইতি; অয়ং পুরুষঃ অগ্নিনা জ্যোতিষা এব আস্তে, পল্যয়তে, কৰ্ম্ম কুরুতে, বিপ- ল্যেতি ইতি।[জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতৎ এবম্ এব ইতি ॥২৫৫৷৪৷৷

মূলানুবাদ?—জনক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য, সূর্য্য ও চন্দ্র অস্তমিত হইলে পর, এই পুরুষ(দেহী) কোন্ জ্যোতিঃ অবলম্বন করে?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] তখন অগ্নিই তাহার জ্যোতিঃ হয়। তখন অগ্নিরূপ জ্যোতির সাহায্যেই লোকে স্থিতি লাভ করে, অভীষ্ট স্থানে গমন করে, কর্ম্ম করে, এবং কর্ম্মান্তে প্রত্যাগমন করে। [জনক বলিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এইরূপই বটে॥ ২৫৫॥৪॥ শাঙ্করভাষ্যম্?—অস্তমিতে আদিত্যে, চন্দ্রমস্যস্তমিতে অগ্নি শাঙ্করভাষ্যম্।—অস্তমিতে আদিত্যে, চন্দ্রমস্যস্তমিতে অগ্নি- জ্যোতিঃ ॥২৫৫॥৪৷৷ টীকা। ০৪২৫৫॥৪৷৷

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০২১

ভাষ্যানুবাদ।—আদিত্য অস্তমিত হইলে এবং চন্দ্র অস্তমিত হইলে অগ্নিই পুরুষের জ্যোতিঃস্বরূপ হইয়া থাকে ॥ ২৫৫ ॥ ৪ ॥

অস্তমিত আদিত্যে যাজ্ঞবল্ক্য চন্দ্রমস্যস্তমিতে শান্তেহগ্নৌ কিংজ্যোতিরেবায়ং পুরুষ ইতি, বাগেবাস্য জ্যোতির্ভবতীতি, বাচৈবায়ং জ্যোতিষাস্তে পল্যয়তে কৰ্ম্ম কুরুতে বিপল্যেতীতি, তস্মাদ্বৈ সম্রাড়পি যত্র স্বঃ পাণির্ন বিনিজ্ঞায়তেহথ যত্র বাগুচ্চ- রত্যুপৈব তত্র ন্যেতীতি, এবমেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য ॥ ২৫৬ ॥ ৫ ॥

সরলার্থঃ?—[জনকঃ পপ্রচ্ছ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, আদিত্যে অস্তমিতে, চন্দ্রমসি অস্তমিতে, অগ্নৌ চ শান্তে(নির্ব্বাণং গতে সতি) অয়ং পুরুষঃ কিং- জ্যোতিঃ এব? ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ—] বাক্ এব অন্য জ্যোতিঃ ভবতি ইতি;[তদা] অয়ং পুরুষঃ বাচা(বাক্যরূপেণ) জ্যোতিষা এব আস্তে, পল্য- য়তে, কৰ্ম্ম কুরুতে, বিপল্যেতি ইতি। হে সম্রাট্, তস্মাৎ(বাগজ্যোতিষ্কত্বাৎ) বৈ(এব) যত্র(যস্মিন্ দেশে কালে বা) স্বঃ(স্বীয়ঃ) পাণিঃ অপি ন বিনি- জ্ঞায়তে(প্রত্যক্ষীক্রিয়তে), অথ(তদা) যত্র(যস্মিন্ স্থানে) বাক্ উচ্চরতি (শব্দঃ প্রকাশতে), তত্র এব উপন্যেতি(নিশ্চয়েন উপগচ্ছতি) ইতি;[জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতৎ এবমেব ইতি ॥২৫৬৷৷৫৷৷

মূলানুবাদ?—[জনকজিজ্ঞাসা করিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, সূর্য্য ও চন্দ্র অস্তমিত হইলে, এবং অগ্নি নির্ব্বাপিত হইলে এই পুরুষ কোন্ জ্যোতির সাহায্যে ব্যবহার করে? যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, তখন বাক্যই ইহার জ্যোতিঃস্বরূপ হইয়া থাকে; তখন বাক্যরূপ জ্যোতির দ্বারাই ব্যবহার করে, গমনাগমন করে, এবং কর্ম্ম করে। হে সম্রাট্, এই কারণেই, যে সময়[অন্ধকারে] নিজের হস্তপর্য্যন্ত দেখিতে পাওয়া যায় না, সেই সময়, যেখানে শব্দ উচ্চারিত হয়, লোকে সেখানেই সত্বর উপস্থিত হইয়া থাকে।[জনক বলিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এইরূপই বটে ॥২৫৬৷৷৫॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—শান্তেহগৌ বাক্ জ্যোতিঃ; বাগিতি শব্দঃ পরি- গৃহাতে, শব্দেন বিষয়েণ শ্রোত্রমিন্দ্রিয়ৎ দীপ্যতে; শ্রোত্রেন্দ্রিয়ে সম্প্রদীপ্তে মনসি

১০২২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বিবেক উপজায়তে, তেন মনসা বাহ্যাৎ চেষ্টাৎ প্রতিপদ্যতে, “মনসা হ্যেব পশ্যতি, মনসা শূণোতি” ইতি ব্রাহ্মণম্। কথং পুনর্ব্বাগ্জ্যোতিরিতি, বাচো জ্যোতিষ্টম- প্রসিদ্ধমিত্যত আহ—তস্মাদ্বৈ সম্রাট্, যম্মাদ্বাচা জ্যোতিষা অনুগৃহীতোহয়ং পুরুষো ব্যবহরতি, তস্মাৎ প্রসিদ্ধমেতদ্বাচো জ্যোতিষ্টম্। কথম্? অপি—যত্র যস্মিন্ কালে প্রাবৃষি প্রায়েণ মেঘান্ধকারে সর্ব্বজ্যোতিঃপ্রত্যস্তময়ে স্বোহপি পাণির্হস্তো ন বিস্পষ্টং নির্জ্ঞায়তে, অথ তস্মিন্ কালে সর্ব্বচেষ্টানিরোধে প্রাপ্তে বাহ্যজ্যোতি- যোহভাবাৎ যত্র বাগুচ্চরতি, শ্বা বা ভষতি, গর্দভো বা রৌতি, উপৈব তত্র ন্যেতি —তেন শব্দেন জ্যোতিষা শ্রোত্রমনসোর্নৈ রন্তর্য্যং ভবতি; তেন জ্যোতিঃকার্য্যত্বং বাক্ প্রতিপদ্যতে; তেন বাচা জ্যোতিষা উপন্যেত্যেব—উপগচ্ছত্যেব তত্র সন্নি- হিতো ভবতীত্যর্থঃ। তত্র চ কৰ্ম্ম কুরুতে বিপল্যেতি। ২

তত্র বাগজ্যোতিষো গ্রহণৎ গন্ধাদীনামুপলক্ষণার্থম্। গন্ধাদিভিরপি হি ঘ্রাণাদিঘনুগ্রহীতেষু প্রবৃত্তিনিবৃত্ত্যাদয়ো ভবন্তি; তেন তৈরপ্যনুগ্রহো ভবতি কার্য্যকরণসঙ্ঘাতস্য। এবমেবৈতদ্যাজ্ঞবল্ক্য ॥২৫৬৷৷৫৷৷

টীকা। ইন্দ্রিয়ং ব্যাবর্তয়তি-বাগিতীতি। শব্দস্য জ্যোতিষ্টুং স্পষ্টয়িতুং পাতনিকাং করোতি-শব্দেনেতি। তন্দীপনকার্য্যমাহ-শ্রোত্রেতি। মনসি বিষয়াকারপরিণামে সতি কিং স্যাত্তদাহ-তেনেতি। তত্র প্রমাণমাহ-মনসা হীতি। এবং পাতনিকাং কৃত্বা বাচো জ্যোতিষ্টসাধনার্থং পৃচ্ছতি-কথমিতি। কা পুনরত্রানুপপত্তিস্তত্রাহ-বাচ ইতি। তত্রানন্তর- বাক্যমুত্তরত্বেনোত্থাপ্য ব্যাকরোতি-অত আহেত্যাদিনা। প্রসিদ্ধমেবাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকং স্ফুটয়তি-কথমিত্যাদিনা। উপৈবেত্যাদি ব্যাচষ্টে-তেন শব্দেনেতি। জ্যোতিষ্কাৰ্য্যত্বং তজ্জন্যব্যবহাররূপকার্য্যবস্তুমিতি যাবৎ। তত্র বাগজ্যোতিষ ইত্যত্র চতুর্থপর্যায়ঃ সপ্তম্যর্থঃ। কিমিতি গন্ধাদয়ঃ শব্দেনোপলক্ষ্যন্তে, তত্রাহ-গন্ধাদিভিরিতি। প্রশ্নান্তরমুখাপয়তি- এবমেবেতি। তথাপি স্বপ্নাদৌ তস্য প্রবৃত্তিদর্শনাত্তৎকারণীভূতং জ্যোতির্বক্তব্যমিতি শেষঃ ।২৫৬।৫।

ভাষ্যানুবাদ।—অগ্নি অস্তমিত হইলে পর, বাক্ হয় জ্যোতিঃস্বরূপ। এখানে ‘বাক্’ অর্থে শব্দ বুঝিতে হইবে। প্রথমতঃ শব্দ দ্বারা শ্রবণেন্দ্রিয় প্রদীপ্ত হয়, শ্রবণেন্দ্রিয় প্রদীপ্ত হইলে পর, মনেতে বিবেক(কর্তব্যাকর্তব্য) জ্ঞান উপ- স্থিত হয়; তখন সেই মনের সাহায্যে বাহিরে চেষ্টা(কার্য্য) করিতে থাকে; ‘মনঃ দ্বারা দর্শন করে, মনদ্বারা শ্রবণ করে’, এই ‘ব্রাহ্মণ’-বাক্যও এ বিষয়ে প্রমাণ।

ভাল, বাক্(শব্দ) জ্যোতিঃস্বরূপ হয় কিরূপে?—বাক্যের যে, জ্যোতিঃ- স্বরূপতা, তাহা ত কোথাও প্রসিদ্ধ নাই? তদুত্তরে বলিতেছেন—হে সম্রাট্,

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০২৩

যে হেতু ব্যবহারী পুরুষ বাক্যরূপ জ্যোতির অনুগ্রহ লাভ করিয়া আবশ্যকমত ব্যবহার নির্ব্বাহ করিয়া থাকে, সেই হেতু বাক্যের এই জ্যোতিঃস্বরূপত্ব সুপ্রসিদ্ধই বটে। কি প্রকারে?—যে সময়ে—বর্ষাকালে, প্রায়শই অন্ধকারময় ঘন-ঘটায় সমস্ত জ্যোতিঃপদার্থ অস্তমিত—অদৃশ্য হইয়া যায়, তখন নিজের হাতটা পর্যন্ত সুস্পষ্টরূপে দৃষ্ট হয় না; সেই সময় বাহিরে অন্য কোনও জ্যোতিঃ না থাকায় লোকের সর্ব্বপ্রকার ব্যবহার বিলুপ্ত হইবার উপক্রম হয়; তখন যেখানে বাক্য উচ্চারিত হয়—শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়,—কুকুরে চীৎকার করে, অথবা গর্দভে শব্দ করে, লোক সেখানেই যাইয়া উপস্থিত হয়। সেই শব্দময় জ্যোতির সহিত মন ও শ্রবণেন্দ্রিয়ের গাঢ় সম্বন্ধ সংঘটিত হয়; তাহাতেই সেই শব্দ- জ্যোতির কার্যকারিতা হইয়া থাকে; সেই শব্দরূপ জ্যোতির দ্বারাই লোক সমীপগত হয়, অর্থাৎ শব্দস্থলে উপস্থিত হয়। সেখানে উপস্থিত হইয়া কর্ম্ম করে ও ইতস্ততঃ গমনাগমন করে। ২

এখানে বাক্-জ্যোতির কথাতে গন্ধাদি-জ্যোতির কথাও গ্রহণ করিতে হইবে; কেননা, গন্ধাদি গুণের সহিত ঘ্রাণাদি ইন্দ্রিয়ের সম্বন্ধ হইলেও লোকের যথাযোগ্য প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি হইয়া থাকে; অতএব বাক্যের ন্যায় গন্ধাদি গুণ- সমূহ দ্বারাও দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতের উপকার সংঘটিত হইয়া থাকে।[জনক বলিলেন—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এইরূপই বটে ॥২৫৬৷৷৫৷৷

অস্তমিত আদিত্যে যাজ্ঞবল্ক্য চন্দ্রমস্যস্তমিতে শান্তেহগৌ শান্তায়াং বাচি কিংজ্যোতিরেবায়ং পুরুষ ইতি, আত্মৈবাস্য জ্যোতির্ভবতীত্যাত্মনৈবায়ং জ্যোতিষান্তে পল্যয়তে কৰ্ম্ম কুরুতে বিপল্যেতীতি ॥ ২৫৭ ॥ ৬॥

সরলার্থঃ।—[পুনশ্চ জনকঃ পপ্রচ্ছ] হে যাজ্ঞবল্ক্য, আদিত্যে অস্তমিতে, চন্দ্রমসি অস্তমিতে, অগ্নৌ শান্তে, বাচি[ চ শান্তায়াং সত্যাং; অত্র বাক্পদৎ ঘ্রাণাদীনামপি উপলক্ষণম্।] অয়ং পুরুষঃ কিংজ্যোতিঃ এব[ভবতি] ইতি। [যাজ্ঞবল্ক্য আহ—][তদা] আত্মা(দেহাদিব্যতিরিক্তং চৈতন্যং) এব অন্য (পুরুষস্য) জ্যোতিঃ ইতি।[যতঃ] অয়ং আত্মনা এব জ্যোতিষা আস্তে, পল্য- য়তে, কৰ্ম্ম কুরুতে, বিপল্যেতি ইতি,[অন্যৎ সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ] ॥২৫৭৷৷৬৷৷

মূল্যবান্দর।—[পুনশ্চ জনক জিজ্ঞাসা করিলেন—] যে

১০২৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যাজ্ঞবল্ক্য, আদিত্য অস্তমিতাহইলে, চন্দ্র অস্তমিত হইলে, অগ্নি নির্ব্বাপিত হইলে এবং বাক্প্রভৃতি বাহ্য জ্যোতিঃ প্রশমিত হইলে, কোন্ বস্তু এই পুরুষের জ্যোতিঃ হয়?[ যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন—] আত্মাই তখন ইহার জ্যোতিঃস্বরূপ হয়; তখন এই পুরুষ আত্মজ্যোতির সাহায্যেই বৃত্তিলাভ করে, কর্ম্ম করে এবং গমনাগমন করে ইতি ॥ ২৫৭ ॥ ৬ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—শান্তায়াৎ পুনর্ব্বাচি, গন্ধাদিঘপি চ শান্তেষু বাহ্যেঘনু- গ্রাহকেষু, সর্ব্বপ্রবৃত্তিনিরোধঃ প্রাপ্তোহস্য পুরুষস্য। এতদুক্তং ভবতি—জাগ্রদ্বিষয়ে বহির্মুখানি করণানি চক্ষুরাদীনি আদিত্যাদিজ্যোতিভিরনুগৃহ্যমাণানি যদা, তদা স্ফুটতরঃ সংব্যবহারোহস্য পুরুষস্য ভবর্তীতি। এবং তাবৎ জাগরিতে স্বাবয়ব- সঙ্ঘাতব্যতিরিক্তেনৈব জ্যোতিষা জ্যোতিঃকার্য্যসিদ্ধিরস্য পুরুষস্য দৃষ্টা; তস্মাৎ তে বয়ৎ মন্যামহে—সর্ব্ববাহ্যজ্যোতিঃপ্রত্যস্তময়েহপি স্বপ্ন-সুষুপ্তিকালে জাগরিতে চ, তাদৃগবস্থায়াং স্বাবয়বসঙ্ঘাতব্যতিরিক্তেনৈব জ্যোতিষা জ্যোতিঃকার্য্যসিদ্ধিরস্যেতি। দৃশ্যতে চ স্বপ্নে জ্যোতিঃকার্য্যসিদ্ধিঃ—বন্ধুসঙ্গমন-বিয়োগদর্শনং দেশান্তরগমনাদি চ: সুষুপ্তাচ্চোত্থানম্—‘সুখমহমস্বাপ্সম্, ন কিঞ্চিদবেদিষম্’ইতি; তস্মাদস্তি ব্যতিরিক্তং কিমপি জ্যোতিঃ। ১

টীকা। কথং পুনরত্র পৃচ্ছতে জ্যোতিরন্তরমিত্যাশঙ্ক্য প্রষ্টুরভিপ্রায়মাহ-এতদুক্তং ভবতীতি। যো ব্যবহারঃ সোহতিরিক্তজ্যোতির্নিমিত্তো যথাদিত্যাদির্নিমিত্তো জাগ্রদব্যবহার ইতি ব্যাপ্তিমুক্তাং নিগময়তি-এবং তাবদিতি। ব্যাপ্তিজ্ঞানকার্য্যমনুমানমাহ-তস্থাদিতি। তাদৃগবস্থায়াং সর্ব্বজ্যোতিঃপ্রত্যস্তময়দশায়ামিতি যাবৎ। বিমতো ব্যবহারোহতিরিক্ত- জ্যোতিরধীনো ব্যবহারত্বাৎ সম্প্রতিপন্নবদিত্যধস্তাদেবানুমানমার্বেদিতমিতি ভাবঃ। হেতোরা- শ্রয়াসিদ্ধিমাশঙ্ক্য পরিহরতি-দৃশ্যতে চেতি। আদিশব্দেন দেশান্তরাদৌ কর্মকরণং গৃহ্যতে। আশ্রয়ৈকদেশাসিন্ধিমাশঙ্ক্যাহ-সুষুপ্তাচ্চেতি। ধ্যানদশায়ামিষ্টদেবতাদর্শনং চকারার্থঃ। অনু- মানফলং নিগময়তি-তস্মাদিতি। যথোক্তানুমানাজ্যোতিঃ সিদ্ধং চেৎ কিং প্রশ্নেনেত্যা- শঙ্ক্যাহ-কিং পুনরিতি। সর্ব্বজ্যোতিরুপশমে দৃশ্যমানস্য ব্যবহারস্য কারণতয়ানুমানতো জ্যোতির্মাত্রসিদ্ধাবপি তদ্বিশেষবুভুৎসায়াং প্রশ্নোপপত্তিরিত্যর্থঃ। ১

কিং পুনস্তচ্ছান্তায়াং বাচি জ্যোতির্ভবতীতি? উচ্যতে,-আত্মৈবাস্য জ্যোতির্ভবতীতি। আত্মেতি কার্যকরণস্বাবয়বসঙ্ঘাতব্যতিরিক্তৎ কার্যকরণাব- ভাসকম্ আদিত্যাদি-বাহ্যজ্যোতির্ব্বৎ স্বয়মন্যেনানবভাস্যমানমভিধীয়তে জ্যোতিঃ; অন্তঃস্থং চ তৎ পারিশেষ্যাৎ। কার্যকরণব্যতিরিক্তৎ তদিতি তাবৎ সিদ্ধম্। যচ্চ কার্যকরণব্যতিরিক্তৎ কার্যকরণসঙ্ঘাতানুগ্রাহকং চ জ্যোতিঃ, তদ্বাহ্যৈশ্চক্ষুরাদি- করণৈরুপলভ্যমানং দৃষ্টম্; ন তু তথা তচ্চক্ষুরাদিভিরুপলভ্যতে, আদিত্যাদি-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০২৫

জ্যোতিঃযূপরতেষু; কার্য্যন্ত জ্যোতিষো দৃশ্যতে যস্মাৎ, তস্মাৎ আত্মনৈবায়ৎ জ্যোতিষা আস্তে পল্যয়তে কৰ্ম্ম কুরুতে বিপল্যেতীতি; তস্মান্ন নমন্তঃস্থং জ্যোতি- রিত্যবগম্যতে। কিঞ্চ, আদিত্যাদিজ্যোতির্বিলক্ষণং তদভৌতিকং চ; স এব হেতুর্যচ্চক্ষুরাদ্যগ্রাহ্যত্বমাদিত্যাদিবৎ। ২

প্রতিবচনমবতার্য্য ব্যাকরোতি—উচ্যত ইত্যাদিনা। অবভাসকত্বে দৃষ্টান্তমাহ— আদিত্যাদীতি। তত্র ব্যতিরিক্তত্বং সাধয়তি—কার্য্যেতি। অনুগ্রাহকত্বাদাদিত্যাদিবদিতি শেষঃ। তচ্চান্তঃস্থং পারিশেষ্যাদিত্যুক্তমুপপাদয়তি—যচ্চেতি। উপরতেঘাত্মজ্যোতিরিতি শেষঃ। তদেব তর্হি মা ভূদিতি চেন্নেত্যাহ—কার্য্যং ত্বিতি। স্বপ্নাদৌ দৃশ্যমানং ব্যবহারং হেতু- কৃত্য ফলিতমাহ—যস্মাদিত্যাদিনা। বিমতমন্তঃস্থমতীন্দ্রিয়ত্বাদাদিত্যবদিতি ব্যতিরেকীত্যর্থঃ। ব্যতিরেকান্তরমাহ—কিং চেতি। ২

ন, সমানজাতীয়েনৈবোপকারদর্শনাৎ-যদাদিত্যাদিবিলক্ষণৎ জ্যোতিরান্তরং সিদ্ধমিতি, এতদসৎ; কস্মাৎ? উপক্রিয়মাণ-সমানজাতীয়েনৈবাদিত্যাদিজ্যোতিষা কার্য্যকরণসঙ্ঘাতস্য ভৌতিকস্য ভৌতিকেনৈবোপকারঃ ক্রিয়মাণো দৃশ্যতে; যথা- দৃষ্টঞ্চেদমনুমেয়ম্; যদি নাম কার্য্যকরণাদথান্তরৎ তদুপকারকম্ আদিত্যাদিব- জ্যোতিঃ, তথাপি কার্য্যকরণসঙ্ঘাত-সমানজাতীয়মেবানুমেয়ম্, কার্য্যকরণসঙ্ঘা- তোপকারকত্বাৎ, আদিত্যাদিজ্যোতির্ব্বৎ। যৎ পুনরন্তঃস্থত্বাদপ্রত্যক্ষত্বাচ্চ বৈলক্ষণ্য- মুচ্যতে, তৎ চক্ষুরাদিজ্যোতিভিরনৈকান্তিকম্; যতোহপ্রত্যক্ষাণ্যন্তঃস্থানি চ চক্ষু- রাদিজ্যোতীংষি ভৌতিকান্যেব; তস্মাত্তব মনোরথমাত্রম্-বিলক্ষণমাত্মজ্যোতিঃ সিদ্ধমিতি। ৩

সংপ্রতি লোকায়তশ্চোদয়তি-নেত্যাদিনা। তত্র নঞর্থং ব্যাচষ্টে-যদিতি। উক্তং হেতুং প্রশ্নপূর্ব্বকং বিভজতে-কস্মাদিত্যাদিনা। যদ্যপি দেহাদেরুপকার্য্যাদুপকারকমাদিত্যাদি সজাতীয়ং দৃষ্টং, তথাপি নাম্মজ্যোতিরুপকাৰ্য্যসজাতীয়মনুমেয়মিত্যাশঙ্ক্যাহ-যথাদৃষ্টং চেতি। তদেব স্পষ্টয়তি-যদি নামেতি। বিমতমন্তঃস্থমতিরিক্তং চাতীন্দ্রিয়ত্বাদাদিত্যবদিতি পরোক্তং ব্যতিরেক্যনুমানমনুদ্য দূষয়তি-যৎ পুনরিত্যাদিনা। অনৈকান্তিকত্বং ব্যনক্তি-যত ইতি। অন্তঃস্থান্যব্যতিরিক্তানি চ সঙ্ঘাতাদিতি দ্রষ্টব্যম্। ব্যভিচারফলমাহ-তস্মাদিতি। বিলক্ষণ- মন্তঃস্থং চেতি মন্তব্যম্। ৩

কার্য্যকরণসঙ্ঘাত-ভাবভাবিত্বাচ্চ সঙ্ঘাতধৰ্ম্মত্বমনুমীয়তে জ্যোতিষঃ। সামান্য- তোদৃষ্টস্য চানুমানস্য ব্যভিচারিত্বাদপ্রামাণ্যম্। সামান্যতোদৃষ্টবলেন হি ভবান্ আদিত্যাদিবদ্ব্যতিরিক্তং জ্যোতিঃ সাধয়তি কার্য্যকরণেভ্যঃ। নচ প্রত্যক্ষমনু- মানেন বাধিতুৎ শক্যতে; অয়মেব তু কার্য্যকরণসঙ্ঘাতঃ প্রত্যক্ষৎ পশ্যতি শূণোতি মনুতে বিজানাতি চ; যদি নাম জ্যোতিরন্তরমস্যোপকারকং স্যাদ আদিত্যাদি-

১০২৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বৎ, ন তদাত্মা স্যাৎ জ্যোতিরন্তরম্, আদিত্যাদিবদেব। য এব তু প্রত্যক্ষং দর্শনাদিক্রিয়াৎ করোতি, স এবাত্মা স্যাৎ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতঃ, নান্যঃ, প্রত্যক্ষ- বিরোধেহনুমানস্যাপ্রামাণ্যাৎ। ৪

কিঞ্চ, চৈতন্যং শরীরধর্মস্তদ্ভাবভাবিত্বাদ রূপাদিবদিত্যাহ-কার্যকরণেতি। বিমতং সঙ্ঘাতান্তিন্নং তদ্ভাসকত্বাদাদিত্যবদিত্যনুমানাৎ ন সঙ্ঘাতধৰ্ম্মত্বং চৈতন্যস্যেত্যাশঙ্ক্যাহ- সামান্যতো দৃষ্টস্যেতি। লোকায়তস্য হি দেহাবভাসকমপি চক্ষুস্ততো ন ভিদ্যতে, তথা চ ব্যভিচারান্ন ত্বদনুমানপ্রামাণ্যমিত্যর্থঃ। মনুষ্যোইহং জানামীতি প্রত্যক্ষবিরোধাচ্চ ত্বদনুমান- মমানমিত্যাহ-সামান্যতো দৃষ্টেতি। ননু তেন প্রত্যক্ষমুৎসার্য্যতামিতি চেন্নেত্যাহ-ন চেতি। ইতশ্চ দেহস্যৈব চৈতন্যমিত্যাহ-অয়মেবেতি। জ্যোতিষো দেহব্যতিরেকমঙ্গীকৃত্যাপি দূষয়তি-যদি নামেতি। বিমতং জ্যোতিরনাত্মা দেহোপকারকত্বাদাদিত্যবদিত্যর্থঃ। আত্মত্বং তর্হি কন্যেত্যাশঙ্ক্যাহ-য এব ত্বিতি। অনুমানাদাত্মনো দেহব্যতিরিক্তত্বমুক্তমিত্যাশঙ্ক্যাহ- প্রত্যক্ষেতি। নান্য আত্মেতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। ৪

ননু অয়মেব চেৎ দর্শনাদিক্রিয়াকর্তা আত্মা সঙ্ঘাতঃ, কথমবিকলস্যৈবাস্য দর্শনাদিক্রিয়াকর্তৃত্বং কদাচিদ্ভবতি কদাচিন্নেতি? নৈষ দোষঃ, দৃষ্টত্বাৎ। ন হি দৃষ্টেহণুপপন্নং নাম; ন হি খদ্যোতে প্রকাশাপ্রকাশকত্বেন দৃশ্যমানে কারণান্তর- মনুমেয়ম্; অনুমেয়ত্বে চ কেনচিৎ সামান্যাৎ সর্ব্বং সর্ব্বত্রানুমেয়ং স্যাৎ; তচ্চা- নিষ্টম্। ন চ পদার্থস্বভাবো নাস্তি; নহি অগ্নেরুষ্ণস্বাভাব্যমন্যনিমিত্তং উদকস্য বা শৈত্যম্। প্রাণিধর্মাধর্মাদ্যপেক্ষমিতি চেৎ; ধর্মাধৰ্মাদের্নিমিত্তান্তরাপেক্ষ- স্বভাব প্রসঙ্গঃ; অস্তিত্বি চেৎ; ন; তদানবস্থাপ্রসঙ্গঃ; ন চানিষ্টঃ। ৫

দেহস্যাত্মত্বে কাদাচিৎকং দ্রষ্টত্বশ্রোতৃত্বাদ্যযুক্তমিতি শঙ্কতে-নন্বিতি। স্বভাববাদী পরি- হরতি-দৈষ দোষ ইতি। কাদাচিৎকে দর্শনাদর্শনে সম্ভবতো দেহস্বাভাব্যাদিত্যত্র দৃষ্টান্তমাহ- ন হীতি। বিমতং কারণান্তরপূর্ব্বকং কাদাচিৎকত্বাদ্ ঘটবদিত্যনুমানং দৃষ্টান্তে ভবিষ্যতীত্যা- শঙ্ক্যাগ্নিরুষ্ণ ইতিবদুষ্কমুদকমিত্যপি দ্রব্যত্বাদিনানুমীয়েতেত্যতিপ্রসঙ্গমাহ-অনুমেয়ত্বে চেতি। ননু যদ্ভবতি তৎ সনিমিত্তমেব, ন স্বভাবাৎ ভবৎ কিঞ্চিদস্মাকং প্রসিদ্ধং, তত্রাহ-ন চেতি। অগ্নেরৌক্ষ্যমুদকস্য শৈত্যমিত্যাদ্যপি ন নির্নিমিত্তং, কিন্তু প্রাণ্যদৃষ্টাপেক্ষমিতি শঙ্কতে-প্রাণীতি। আদিশব্দেনেশ্বরাদি গৃহ্যতে। গূঢ়াভিসন্ধিঃ স্বভাববাদ্যাহ-ধর্ম্মেতি। প্রসঙ্গস্যেষ্টত্বং শঙ্কিত্বা স্বাভিপ্রায়মাহ-অস্তিত্যাদিনা। ৫

ন, স্বপ্নস্থত্যোঃ দৃষ্টস্যৈব দর্শনাৎ,-যদুক্তং স্বভাববাদিনা দেহস্যৈব দর্শনাদি- ক্রিয়া, ন ব্যতিরিক্তস্যেতি; তন্ন, যদি হি দেহস্যৈব দর্শনাদিক্রিয়া, স্বপ্নে দৃষ্টস্যৈব দর্শনৎ ন স্যাৎ; অন্ধঃ স্বপ্নং পশ্যন্ দৃষ্টপূর্ব্বমেব পশ্যতি, ন শাকদ্বীপাদিগতমদৃষ্ট- পূর্ব্বম্। ততশ্চৈতৎ সিদ্ধং ভবতি-যঃ স্বপ্নে পশ্যতি দৃষ্টপূর্ব্বং বস্তু, স এব পূর্ব্বৎ বিদ্যমানে চক্ষুষ্যদ্রাক্ষীৎ, ন দেহ ইতি; দেহশ্চেদ দ্রষ্টা, ল যেনাদ্রাক্ষীৎ তস্মিন্ন-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০২৭

দ্ধতে চক্ষুষি, স্বপ্নে তদেব দৃষ্টপূর্ব্বং ন পশ্যেৎ; অস্তি চ লোকে প্রসিদ্ধিঃ-পূর্ব্বং দৃষ্টং ময়া হিমবতঃ শৃঙ্গম্ অদ্যাহং স্বপ্নেহদ্রাক্ষম্-ইত্যুদ্ধতচক্ষুষামন্ধানামপি; তস্মা- দনুদ্ধতেহপি চক্ষুষি যঃ স্বপ্নদৃক্, স এব দ্রষ্টা, ন দেহ ইত্যবগম্যতে। ৬

সিদ্ধান্তী স্বপ্নাদিসিদ্ধ্যনুপপত্যা দেহাতিরিক্তমাত্মানমভ্যুপগময়ন্নুত্তরমাহ-নেত্যাদিনা। তত্র নঞর্থং বিভজতে-যদুক্তমিতি। স্বপ্নে দৃষ্টস্যৈব দর্শনাদিতি হেতুভাগং ব্যতিরেকদ্বারা বিবৃণোতি-যদি হীতি। জাগ্রদ্দেহস্য দ্রষ্টুঃ স্বপ্নে নষ্টত্বাদতীন্দ্রিয়স্য চ সংস্কারস্য চানিষ্টত্বাদন্য- দৃষ্টে চান্যস্থ স্বপ্নাযোগান্ন স্বপ্নে দৃষ্টস্যৈব দর্শনং দেহাত্মবাদে সম্ভবতীত্যর্থঃ। মা ভূৎ দৃষ্টস্যৈব স্বপ্নে দৃষ্টিঃ; অন্ধস্যাপি স্বপ্নদৃষ্টেরিত্যাশঙ্ক্যাহ-অন্ধ ইতি। অপিশব্দোহধ্যাহর্তব্যঃ; পূর্বদৃষ্টস্যৈব স্বপ্নে দৃষ্টত্বেইপি কুতো দেহব্যতিরিক্তো দ্রষ্টা সিদ্ধতীত্যাশঙ্ক্যাহ-ততশ্চেতি। অথোভয়ত্র দেহস্যৈব দ্রষ্টৃত্বে কা হানিরিতি চেদত আহ-দেহশ্চেদিতি। তত্র সহকারিচক্ষুরভাবাচ- ক্ষুরন্তরস্য চোৎপত্তৌ দেহান্তরস্যাপি সমুৎপত্তিসম্ভবাদন্যদৃষ্টেহন্যস্য ন স্বপ্নঃ স্যাদিত্যর্থঃ। মা ভূৎ পূর্বদৃষ্টে স্বপ্নো হেত্বভাবাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-অস্তি চেতি। কথং তে জাত্যদ্ধানামীদৃগদর্শনমিতি চেৎ, জন্মান্তরানুভববশাদিতি ক্রমঃ। অন্ধস্য দেহস্যাদ্রষ্ট ত্বেহপি চক্ষুস্মতন্তস্য স্যাদেব দ্রষ্টত্বমিত্যা- শঙ্ক্যাহ-তস্মাদিতি। *

তথা স্মৃতৌ দ্রষ্টস্মন্ত্রোরেকত্বে সতি, য এব দ্রষ্টা, স এব স্মর্তা; যদা চৈবং, তদা নিমীলিতাক্ষোহপি স্মরন্ দৃষ্টপূর্ব্বং যদ্রূপম্, তদ্ দৃষ্টবদেব পশ্যতীতি। তস্মাদ যন্নিমীলিতং, তন্ন দ্রষ্টু; যন্নিমীলিতে চক্ষুষি স্মরৎ রূপং পশ্যতি, তদেব অনি- মীলিতেহপি চক্ষুষি দ্রষ্টু আসীদিত্যবগম্যতে। মৃতে চ দেহে অবিকলস্যৈব চ রূপাদিদর্শনাভাবাৎ—দেহস্যৈব দ্রষ্টৃত্বে মৃতেহপি দর্শনাদিক্রিয়া স্যাৎ; তস্মাৎ যদপায়ে দেহে দর্শনৎ ন ভবতি, যদ্ভাবে চ ভবতি, তৎ দর্শনাদিক্রিয়াকর্তৃ, ন দেহ ইত্যবগম্যতে। ৭

স্বপ্নে দৃষ্টস্যৈব দর্শনাদিতি হেতুং ব্যাখ্যায় স্মৃতৌ দৃষ্টস্যৈব দর্শনাদিতি হেতুং ব্যাচষ্টে- তথেতি। দ্রষ্টস্মন্ত্রোরেকত্বেইপি কুতো দেহাতিরিক্তো দ্রষ্টেত্যাশঙ্ক্যাহ-যদা চেতি। দেহাতিরিক্তস্য স্মর্তৃত্বেহপি কুতো দ্রষ্টত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-তস্মাদিতি। দ্রষ্টস্মন্ত্রোরেকত্বস্তোত্তত্বাৎ দেহাতিরিক্তঃ স্মর্তা চেৎ, দ্রষ্টাপি তথা সিধ্যতীতি ভাবঃ। দেহস্যাদ্রষ্টত্বে হেত্বন্তরমাহ-মৃতে চেতি। ন তস্য দ্রষ্টুতেতি শেষঃ। তদেবোপপাদয়তি-দেহস্যৈবেতি। দেহব্যতিরিক্ত- মাত্মানমুপপাদিতমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। চৈতন্যং যৎতদোরর্থঃ। ৭

চক্ষুরাদীন্যেব দর্শনাদিক্রিয়াকর্তৃণীতি চেৎ; ন; যদহমদ্রাক্ষং, তৎ স্পৃশামীতি ভিন্নকর্তৃকত্বে প্রতিসন্ধানানুপপত্তেঃ। মনস্তহীতি চেৎ; ন, মনসোহপি বিষয়ত্বাৎ রূপাদিবৎ দ্রষ্টৃত্বাদ্যনুপপত্তিঃ। তস্মাদন্তঃস্থং ব্যতিরিক্তমাদিত্যাদিবদিতি সিদ্ধম্। ৮

মা। কৃষ্ণদাস মিশ্রের শিষ্যগণ—চতুর্থ—পঞ্চম—ষষ্ঠ—সপ্তম।

১০২৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রত্যভিজ্ঞানাদিতি ন্যায়েন পরিহরতি-নেত্যাদিনা। আত্মপ্রতিপত্তিহেতুনাং মনসি সম্ভবা- দিতি ন্যায়েন শঙ্কতে-মন ইতি। জ্ঞাতুজ্ঞানসাধনোপপত্তেঃ সংজ্ঞাভেদমাত্রমিতি ন্যায়েন পরিহরতি-ন মনসোৎপীতি। দেহাদেরনাত্মত্বে ফলিতমাহ-তন্মাদিতি। আত্মজ্যোতিঃ সঙ্ঘাতাদিতি শেষঃ। ৮

যদুক্তং-কার্য্যকরণসঙ্ঘাত-সমানজাতীয়মেব জ্যোতিরন্তরমনুমেয়ম্, আদি- ত্যাদিভিস্তৎসমানজাতীয়ৈরেবোপক্রিয়মাণত্বাদিতি; তদসৎ; উপকার্য্যোপ- কারকভাবস্যানিয়মদর্শনাৎ। কথম্? পার্থিবৈরিন্ধনৈঃ পার্থিবত্ব-সমানজাতীয়ৈ- স্তৃণোলপাদিভিরগ্নেঃ প্রজ্বলনোপকারঃ ক্রিয়মাণো দৃশ্যতে; ন চ তাবতা তৎ- সমানজাতীয়ৈরেব অগ্নেঃ প্রজ্বলনোপকারঃ সর্ব্বত্রানুমেরঃ স্যাৎ; যেনোদকেনাপি প্রজ্বলনোপকারো ভিন্নজাতীয়েন বৈদ্যুতস্যাগ্নেঃ জাঠরস্য চ ক্রিয়মাণো দৃশ্যতে; তস্মাদুপকার্য্যোপকারকভাবে সমানজাতীয়াসমানজাতীয়নিয়মো নাস্তি,-কদা- চিৎ সমানজাতীয়া মনুষ্যা মনুষ্য্যেরেবোপক্রিয়ন্তে, কদাচিৎ স্থাবরপশ্বাদিভিশ্চ ভিন্নজাতীয়ৈঃ। তস্মাদহেতুঃ-কার্য্যকরণসঙ্ঘাত-সমানজাতীয়ৈরেবাদিত্যাদি- জ্যোতিভিরুপক্রিয়মাণত্বাদিতি। ৯

পরোক্তমনুবদতি—যদুক্তমিতি। অনুগ্রাহ্যসজাতীয়মনুগ্রাহকমিত্যত্র হেতুমাহ— আদিত্যাদিভিরিতি। উপকার্যোপকারকত্বে সাজাত্যনিয়মং দূষয়তি—তদাসদিতি। অনিয়ম- দর্শনমাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমুদাহরতি—কথং পার্থিবৈরিতি। উলপং বালতৃণম্। পার্থিবস্যাগ্নিং প্রত্যুপকারকত্বনিয়মং বারয়তি—ন চেতি। তাবতা পার্থিবেনাগ্নেরুপক্রিয়মাণত্বদর্শনেনেতি যাবৎ। তৎসমানজাতীয়ৈরিতি তচ্ছব্দঃ পার্থিবত্ববিষয়ঃ। তত্র হেতুমাহ—যেনেতি।

দর্শনফলং নিগময়তি-তস্মাদিতি। উপকার্য্যোপকারকভাবে সাজাত্যানিয়মবদপ- কাৰ্য্যাপকারকভাবেহপি বৈজাত্যনিয়মো নাস্তীত্যর্থঃ। তত্রোপকার্য্যোপকারকত্বে সাজাত্যা- নিয়মাভাবমুদাহরণান্তরেণ দর্শয়তি-কদাচিদিতি। অন্তসাগ্নিনা বাগ্নেরুপশাস্ত্যপলন্তাদপ- কাৰ্য্যাপকারকত্বে বৈজাত্যনিয়মোহপি নাস্তীতি মত্বোপসংহরতি-তস্মাদিতি। উক্তানিয়ম- দর্শনং তচ্ছব্দার্থঃ। অহেতুরাত্মজ্যোতিষঃ সঙ্ঘাতেন সমানজাতীয়তায়ামিতি শেষঃ। ৯

যৎ পুনরাথ-চক্ষুরাদিভিরাদিত্যাদিজ্যোতির্ব্বদ দৃশ্যত্বাদিতি-অয়ং হেতু- জ্যোতিরন্তরস্যান্তঃস্থত্বং বৈলক্ষণ্যঞ্চ ন সাধয়তি, চক্ষুরাদিভিরনৈকান্তিকত্বাদিতি; তদসৎ, চক্ষুরাদিকরণেভ্যোহন্যত্বে সতীতি হেতোবিশেষণত্বোপপত্তেঃ। কার্য্য- করণসঙ্ঘাতধৰ্ম্মত্বং জ্যোতিষ ইতি যদুক্তং, তন্ন, অনুমানবিরোধাৎ-আদিত্যাদি- জ্যোতির্ব্বৎ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতাদর্থান্তরং জ্যোতিরিতি হানুমানমুক্তম্, তেন বিরু- ধ্যতে ইয়ং প্রতিজ্ঞা-কার্য্যকরণসঙ্ঘাতধর্ম্মত্বৎ জ্যোতিষ ইতি। তদ্ভাবভাবিত্বং ত্বসিদ্ধম্, মৃতে দেহে জ্যোতিষোহদর্শনাৎ। ১০

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১০২৯

অনুগ্রাহকমনুগ্রাহ্যসজাতীয়মনুগ্রাহকত্বাদাদিত্যবদিত্যপাস্তম্। সংপ্রত্যতীন্দ্রিয়ত্বহেতোর- নৈকান্ত্যং পরোক্তমনুভাষ্য দূষয়তি—যৎ পুনরিত্যাদিনা। বিমতং জ্যোতিঃসঙ্ঘাতধর্ম্মস্তদ্ভাব- ভাবিত্বাদ্রূপাদিবদিত্যুক্তমনুষ্য নিরাকরোতি—কার্য্যেতি। অনুমানবিরোধমেব সাধয়তি— আদিত্যাদীতি। কালাত্যরাপদেশমুক্ত। হেত্বসিদ্ধিং দোষান্তরমাহ—তদ্ভাবেতি। অদর্শনাদিতি চ্ছেদঃ। ১০

সামান্যতো দৃষ্টস্যানুমানস্যাপ্রামাণ্যে সতি পানভোজনাদিসর্ব্বব্যবহারলোপ- প্রসঙ্গঃ; স চানিষ্টঃ; পানভোজনাদিযু হি ক্ষুৎপিপাসাদিনিবৃত্তিমুপলব্ধবতস্তৎ- সামান্যাৎ পানভোজনাদ্যপাদানং দৃশ্যমানং লোকে ন প্রাপ্নোতি; দৃশ্যন্তে হি উপলব্ধপানভোজনাঃ সামান্যতঃ পুনঃ পানভোজনাস্তরৈঃ ক্ষুৎপিপাসাদিনিবৃত্তিম্ অনুমিন্বন্তস্তাদর্থ্যেন প্রবর্তমানাঃ। ১১

যৎ পুনর্বিশেষেহনুগমাভাবঃ সামান্যে সিদ্ধসাধ্যতেত্যনুমানদূষণমভিপ্রেত্য সামান্যতো দৃষ্টস্য চেত্যাদ্যুক্তং, তদ দূষয়তি—সামান্যতোদৃষ্টস্যেতি। বিশেষতোহদৃষ্টস্যেত্যপি দ্রষ্টব্যম্। কিমিত্যনুমানাপ্রামাণ্যে সর্ব্বব্যবহারহানিরিত্যাশঙ্ক্যাহ—পানেতি। তৎসামান্যাৎ পানত্ব- ভোজনত্বাদিসাদৃশ্যাদিতি যাবৎ। পানভোজনাদ্যুপাদানং দৃশ্যমানমিত্যুক্তং বিশদয়তি—দৃশ্যন্তে হীতি। তাদর্থেন ক্ষুৎপিপাসাদিনিবৃত্ত্যুপায়ভোজনপানাদ্যর্থত্বেনেতি যাবৎ। ১১

যদুক্তম্—অয়মেব তু দেহো দর্শনাদিক্রিয়াকর্তেতি, তৎ প্রথমমেব পরিহৃতম্, —স্বপ্নস্মৃত্যোদ্দেহাদর্থান্তরভূতো দ্রষ্টেতি। অনেনৈব জ্যোতিরন্তরস্যানাত্মত্বমপি প্রত্যুক্তম্। যৎ পুনঃ খদ্যোতাদেঃ কাদাচিৎকং। প্রকাশাপ্রকাশকত্বং; তদসৎ, পক্ষাদ্যবয়ব-সঙ্কোচবিকাশনিমিত্তত্বাৎ প্রকাশাপ্রকাশকত্বস্য। যৎ পুনরুক্তম্— ধৰ্ম্মাধর্ময়োরবশ্যং ফলদাতৃত্বং স্বভাবোহভ্যুপগন্তব্য ইতি; তদভ্যুপগমে ভবতঃ সিদ্ধান্তহানাৎ। এতেনানবস্থাদোষঃ প্রত্যুক্তঃ। তস্মাদস্তি ব্যতিরিক্তঞ্চাত্তুঃস্থং জ্যোতিরাত্মেতি ॥ ২৫৭ ॥ ৬ ॥

দেহস্যৈব দ্রষ্টত্বমিত্যুক্তমনুদ্য পূর্ব্বোক্তং পরিহারং স্মারয়তি-যদুক্তমিত্যাদিনা। জ্যোতিরন্তরমাদিত্যাদিবদনাত্মেত্যুক্তং প্রত্যাহ-অনেনেতি। সঙ্ঘাতাদের্দ্রষ্ট ত্বনিরাকরণেনেতি যাবৎ। দেহস্য কাদাচিৎকং দর্শনাদিমত্ত্বং স্বাভাবিকমিত্যত্র পরোক্তং দৃষ্টান্তমনুভাষ্য নিরাচষ্টে- যৎ পুনরিত্যাদিনা। সিদ্ধান্তিনাপি স্বভাববাদস্য কচিদেষ্টব্যত্বমুপদিষ্টমনুদ্য দূষরতি-যৎপুনরিতি। ধর্মাদের্যদি হেত্বন্তরাধীনং ফলদাতৃত্বং, তদা হেত্বন্তরস্যাপি হেত্বন্তরাধীনং ফলদাতৃত্বমিত্যন- বস্থেত্যুক্তং প্রত্যাহ-এতেনেতি। সিদ্ধান্তবিরোধপ্রসঞ্জনেনেতি যাবৎ, লোকায়তমতাসম্ভবে স্বপক্ষমুপসংহরতি-তস্মাদিতি ॥২৫৭॥৬॥

ভাষ্যানুবাদ।—বাক্ প্রশান্ত হইলে অর্থাৎ শব্দ নিবৃত্তি হইলে,—এখানে বুঝিতে হইবে, ব্যবহারনির্ব্বাহের অনুকূল গন্ধপ্রভৃতি সমস্ত বাহ্য জ্যোতিঃ প্রশান্ত হইলে পর, এই পুরুষের সর্ব্বপ্রকার ব্যাপারই নিবৃত্ত হইয়া যায়; অভি-

১০০০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রায় এই যে, জাগ্রৎকালে চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়নিচয় যে সময় আদিত্যাদি জ্যোতির সাহায্য লাভ করে, সে সময় লোকের ব্যবহার উত্তমরূপে সম্পন্ন হইয়া থাকে। এইরূপে আমরা দেখিয়াছি যে, জাগ্রৎকালে পুরুষের যে সমস্ত ব্যবহার নিষ্পন্ন হয়, সে সমস্ত নিজের দেহাবয়বের অতিরিক্ত বাহ্য জ্যোতির সাহায্যেই হইয়া থাকে; অতএব আমরা মনে করিতে পারি যে, জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি সময়েও যখন সমস্ত জ্যোতিঃপদার্থ অস্তমিত হইয়া যায়, সেই অবস্থায়ও নিজের দেহাদি সংঘাতের অতিরিক্ত অপর কোনও জ্যোতিঃ দ্বারাই জ্যোতির কার্য্য সিদ্ধ হইয়া থাকে। দেখিতেও পাওয়া যায়-স্বপ্নাবস্থায় বন্ধুর সহিত সংযোগ ও বিয়োগ এবং দেশান্তরে গমনাদি আলোক-সাপেক্ষ কার্য্য হইয়া থাকে। সুষুপ্তি অবস্থা হইতে উত্থানের পর ‘আমি সুখে নিদ্রা গিয়াছিলাম, কিছুই জানিতে পারি নাই’ এইরূপে তৎকালানুভূত বিষয়ের স্মরণ হইতে দেখা যায়; [ সুষুপ্তি কালে কোনও জ্যোতিঃ না থাকিলে তাৎকালিক সুখ ও অজ্ঞানের অনু- ভব হইতে পারে না, এবং অনুভব না হইলে তাহার স্মৃতিও সম্ভবপর হয় না।] অতএব ব্যবহার-নির্ব্বাহের জন্য দেহাবয়বাতিরিক্ত অন্য কোনও জ্যোতিঃ নিশ্চয়ই আছে স্বীকার করিতে হইবে। ১

[ভাল, জিজ্ঞাসা করি-] বাক্-নিবৃত্তির পর, যাহা জ্যোতিঃস্বরূপ হয়, সে পদার্থটা কি? হাঁ, বলা হইতেছে-তখন আত্মাই ইহার জ্যোতিঃস্বরূপ হইয়া থাকে। এখানে আত্মা-শব্দে তাহারই নির্দেশ হইয়াছে, যাহা-দেহেন্দ্রিয়াদি অবয়বসমষ্টির অতিরিক্ত, অথচ দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতেরই প্রকাশক, এবং বহির্জগতে দৃশ্যমান আদিত্য প্রভৃতি জ্যোতির ন্যায় নিজে অপরের দ্বারা প্রকাশিত হয় না, এইরূপ একটি জ্যোতিঃ। সেই জ্যোতিটি যখন দেহাভ্যন্তরস্থ(অবাহ্য), তখন তাহা যে, দেহাবয়বাতিরিক্ত, ইহাও ফলে ফলে সিদ্ধই হইল; কেন না, দেহেন্দ্রি- য়াদির অতিরিক্ত যে সমস্ত জ্যোতিঃ দেহেন্দ্রিয়াদির উপকার সম্পাদন করিয়া থাকে, দেখিতে পাওয়া যায়, সেই সমস্ত জ্যোতিঃপদার্থই চক্ষুঃপ্রভৃতি বহিরি- ন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষগোচর হইয়া থাকে; আর ইহা কিন্তু আদিত্যাদি জ্যোতির অভাবে কোন ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষগোচর হয় না; কেবল সেই জ্যোতিটির কার্য্য মাত্র দেখিতে পাওয়া যায়; অতএব বুঝা যাইতেছে যে, এই জ্যোতিটি (আত্মা) অন্তঃস্থই(শরীর মধ্যগতই) বটে। বিশেষতঃ সেই হেতুই-আদিত্যাদি জ্যোতিগুলিকে যেরূপ চক্ষুদ্বারা দেখিতে পাওয়া যায়, চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয় দ্বারা ইহাকে সেরূপ দেখিতে পাওয়া যায় না; ইহা হইতে বেশ বুঝা

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৩১

যাইতেছে যে, ইহা আদিত্যপ্রভৃতি হইতে সম্পূর্ণ বিলক্ষণ একটি অভৌতিক জ্যোতিঃ(১)। ২

না-একথা হইতে পারে না; কারণ, সমানজাতীয় পদার্থের মধ্যেই উপ- কার্য্যোপকারকভাব দেখিতে পাওয়া যায়। আদিত্য প্রভৃতি জ্যোতিঃপদার্থের বিলক্ষণ(অন্যরূপ) অনাত্মক জ্যোতিঃ যে, সিদ্ধ হইল বলা হইয়াছে; সে কথাও উত্তম কথা নহে; কি কারণে? যে হেতু আদিত্যপ্রভৃতি জ্যোতিও ভৌতিক পদার্থ এবং তাহাদের প্রকাশনীয় দেহাদি পদার্থগুলিও ভৌতিক; সুতরাং প্রকা- শক আদিত্যাদি জ্যোতিঃ, আর তৎপ্রকাশ্য দেহাদি বস্তু উভয়ই ভৌতিকরূপে একজাতীয় পদার্থ; সুতরাং একজাতীয় পদার্থের মধ্যেই যে, উপকার্য্যোপকারক- ভাব দেখিতে পাওয়া যায়, ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। এখানেও দৃষ্টানুসারেই অনুমান করিতে হইবে;-যদি নিতান্তই দেহেন্দ্রিয়াদির অতিরিক্ত অথচ আদিত্যাদির ন্যায় দেহেন্দ্রিয়াদির উপকারসাধক স্বতন্ত্র কোনও জ্যোতির অস্তিত্ব কল্পনা করিতেই হয়, তাহা হইলেও, উপকার্য্য-দেহেন্দ্রিয়াদি-সংঘাতের তুল্যজাতীয় ভৌতিক জ্যোতিরই অনুমান করিতে হইবে,(বিলক্ষণ জ্যোতির নহে); কারণ, ঐ জ্যোতিঃ-পদার্থ টিও দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতেরই উপকারক; অতএব উহা আদিত্যাদির ন্যায় তজ্জাতীয় পদার্থ হওয়াই যুক্তিসঙ্গত। আরও যে, বলা হইয়াছে-দেহেন্দ্রিয়াদির অনুগ্রাহক এই জ্যোতিঃপদার্থটি যখন অভ্যন্তরস্থ এবং অপ্রত্যক্ষও বটে; তখন উহার বৈলক্ষণ্য থাকাই উচিত হয়; সে কথাও সঙ্গত হয় না; কারণ, চক্ষুঃপ্রভৃতি জ্যোতিঃস্থানেই ঐ নিয়মের ব্যভিচার দৃষ্ট হয়। কেন না, চক্ষুঃপ্রভৃতি জ্যোতিঃসমুহও অভ্যন্তরস্থ অপ্রত্যক্ষ ও ভৌতিক পদার্থ ভিন্ন আর কিছুই নহে। অতএব আদিত্যাদি জ্যোতির বিজাতীয় আত্মজ্যোতির সাধনা কেবল তোমার মনোরথ বা মানসিক কল্পনামাত্র,(কিন্তু উহা কখনই বাস্তবিক নহে)। ৩

বিশেষতঃ দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতের সদ্ভাবে সম্ভাব বলিয়াও আত্মজ্যোতিকে দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতের ধর্ম্ম বলিয়া অনুমান করা যাইতে পারে না; কারণ, ‘সামা- ন্যতো দৃষ্ট’ নামক অনুমান কখনই অব্যভিচারী হয় না(২); সুতরাং উহা

(১) তাৎপর্য্য—বেদান্তমতে সূর্য্য ও অগ্নিপ্রভৃতি পদার্থগুলিও সূক্ষ্ম জড় ভূত হইতে সমুৎপন্ন; সুতরাং উহারাও জড় পদার্থ; কিন্তু আত্মজ্যোতিঃ ভৌতিক নহে, এই জন্য ভাষ্যকার ‘অভৌতিক’ বিশেষণ ব্যবহার করিয়াছেন।

(২) তাৎপর্য্য-অনুমান সাধারণতঃ তিন প্রকার-(১) পূর্ব্ববৎ,(২) শেষবৎ ও

১০৩২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

নিঃসন্দিগ্ধ প্রমাণ হইতে পারে না; অথচ তুমি সেই ‘সামান্যতো দৃষ্ট’ অনুমানের সাহায্যেই আদিত্যাদি-জ্যোতির দৃষ্টান্তানুসারে দেহেন্দ্রিয়াদির অতিরিক্ত জ্যোতির সাধনা করিতেছ;[সুতরাং উহা অসিদ্ধ]। বিশেষতঃ অনুমান দ্বারা কখনই প্রত্যক্ষের বাধা ঘটাইতে পারা যায় না। দেখিতে পাওয়া যায়—এই দেহেন্দ্রিয়- সংঘাতই সাক্ষাৎ সম্বন্ধে দর্শন, শ্রবণ ও মননাত্মক বিশেষ বিজ্ঞান লাভ করিয়া থাকে; আদিত্যাদির ন্যায় অপর কোনও জ্যোতিঃ যদি ইহার প্রত্যক্ষাদি বিষয়ে উপকার বা সাহায্য করিত, তাহা হইলে স্বীকার করিতে হইবে যে, দেহেন্দ্রিয়া- দির উপকারক আদিত্যাদি জ্যোতিঃ যেমন আত্মা নহে, তেমনি তোমার এই অতিরিক্ত জ্যোতিঃপদার্থটিও নিশ্চয়ই আত্মা হইতে পারে না; পরন্তু যাহা প্রত্যক্ষতঃ দর্শনাদি ক্রিয়া করিয়া থাকে, সেই দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতই আত্মা হইতে পারে, অপর কেহ হইতে পারে না; কেন না, প্রত্যক্ষবিরুদ্ধ অনুমান কখনই প্রমাণ নহে। ৪

ভাল কথা, সাক্ষাৎসম্বন্ধে দর্শনাদি ক্রিয়া-নিষ্পাদক এই দেহসংঘাতই যদি প্রকৃত আত্মা হয়, তাহা হইলে, দেহের অবিকল অবস্থায়ও যে দর্শনাদি ক্রিয়া কখনও হয়, কখনও হয় না, তাহার কারণ কি? দেহের স্বভাবসিদ্ধ প্রকাশ- ধর্মটির ত সর্ব্বদাই উপলব্ধি হওয়া সম্ভব হয়। না, ইহাও দোষাবহ হয় না; কেন না, ইহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ; প্রত্যক্ষসিদ্ধ বিষয়ে কোনরূপ আপত্তি চলে না; কারণ, খদ্যোতের যে, প্রকাশ ও অপ্রকাশ, তদুভয়ই প্রত্যক্ষসিদ্ধ; সুতরাং তদ্বি- যয়ে আর কোন প্রকার কারণ কল্পনার আবশ্যক হয় না; আর যদি সেরূপ স্থলেও অনুমান করিতে হয়, তাহা হইলে, যে কোন একটা সাধারণ ধর্ম লইয়া(দৃষ্টান্ত

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৩৩

গ্রহণ করিয়া) সর্ব্বত্রই অনুমান করা যাইতে পারে; কিন্তু তাহা ত কাহারো বাঞ্ছনীয় নহে। তাহার পর, জাগতিক বস্তুগুলির যে, স্বভাবগত বৈষম্য নাই, একথাও বলা যায় না;-অগ্নির স্বাভাবিক উষ্ণতা কিংবা জলের শীতলতা যে, অন্য কোনও কারণ হইতে উৎপন্ন হয়, তাহা নহে; পরন্তু উহা উহাদের স্বভাব- সিদ্ধ(নিত্যসিদ্ধ)। প্রাণিগণের ধর্মাধর্ম্ম যে, ঐ উষ্ণতা ও শীতলতা সমুৎপাদন করে, তাহাও বলিতে পারা যায় না; কারণ, তাহা হইলে ধর্মাধর্ম্মের ঐরূপ গুণ- লমুৎপাদনেও অপর কারণের কল্পনা করিতে হয়। যদি বল, তাহাই হউক; তাহা হইলে, ‘অনবস্থা’ দোষ আসিয়া পড়ে; তাহাও বাঞ্ছনীয় নহে; অতএব বস্তুগত স্বভাবসিদ্ধ শক্তির অপলাপ করা যুক্তিসঙ্গত হয় না। ৫

না, একথাও বলা যায় না; কারণ, স্বপ্নাবস্থায় ও স্মরণসময়ে পূর্ব্বদৃষ্ট বস্তুরই জ্ঞান হইয়া থাকে। ইতঃপূর্ব্বে স্বভাববাদী যে, বলিয়াছিলেন,-দর্শনাদি ক্রিয়াগুলি দেহেরই ধর্ম্ম, তদতিরিক্তের(আত্মার) নহে; সে কথাও উপপন্ন হয় না; কেন না, দর্শনাদি ক্রিয়াগুলি যদি দেহেরই ধর্ম্ম হইত, তাহা হইলে, স্বপ্নসময়ে কেবল পূর্ব্বদৃষ্ট বস্তুরই দর্শন হইত না; বিশেষতঃ অন্ধ ব্যক্তি যখন স্বপ্ন দর্শন করিয়া থাকে, তখন[সে কখনও যাহা দেখে নাই, এরূপ অপ্রসিদ্ধ] শাকদ্বীপাদিগত কোনও অদ্ভুত বস্তু দেখে না।

একথা হইতে ইহাই প্রমাণিত হইতেছে যে, স্বপ্নসময়ে যে ব্যক্তি পূর্ব্বদৃষ্ট বস্তু দর্শন করিয়া থাকে, পূর্ব্বে সেই ব্যক্তিই চক্ষুর দ্বারা সেই বস্তু দর্শন করিয়াছিল, কিন্তু দেহ করে নাই। দেহই যদি দর্শনের যথার্থ কর্তা হইত, তাহা হইলে, সেই দেহ, যে চক্ষুর সাহায্যে দর্শন করিয়াছিল, সেই চক্ষুঃ উৎপাটিত হইলে, স্বপ্নে কখনই সেই পূর্ব্বদৃষ্ট বস্তু দর্শন করিতে সমর্থ হইত না। আর জগতে এরূপ প্রসিদ্ধিও আছে যে, যাহারা অন্ধ হইয়াছে, তাহারাও বলিয়া থাকে—‘আমি পূর্ব্বে(চক্ষু থাকিতে) হিমালয়ের যে শৃঙ্গটি দর্শন করিয়াছিলাম, আজ স্বপ্নে তাহাই দর্শন করিয়াছি’; অতএব বেশ বুঝা যাইতেছে যে, চক্ষু নষ্ট হইবার পূর্ব্বেও, যে দ্রষ্টা ছিল, এখন চক্ষুঃ না থাকা অবস্থায়ও সে-ই স্বপ্নদ্রষ্টা, কিন্তু দেহ নহে। ৬

এইরূপে দর্শন ও স্মরণের এককর্তৃকত্ব সিদ্ধ হইলে বলা যাইতে পারে যে, যিনি দ্রষ্টা, তিনিই স্মর্তা(স্মরণের কর্তা)। এইরূপ সিদ্ধান্ত অভ্রান্ত বলিয়াই, যখন চক্ষুঃ মুদ্রিত করিয়া কোন বিষয় স্মরণ করিতে থাকে, তখনও—পূর্ব্বে যাহা দর্শন করিয়াছিল, তাহাই দর্শন করে, কিন্তু নূতন কিছু দেখে না; অতএব

১০৩৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বুঝা যাইতেছে যে, যাহা নিমীলিতনেত্র(মুদ্রিতচক্ষু দেহ), তাহা প্রকৃত দ্রষ্টা নহে; পরন্তু চক্ষু মুদ্রিত করিলেও যিনি স্মরণপূর্ব্বক দর্শন করিয়া থাকেন, চক্ষুর অমুদ্রণ কালেও, তিনিই যথার্থ দ্রষ্টা,(চক্ষু নহে)। বিশেষতঃ মৃত দেহে যখন, অন্য কোনও বিকার ঘটে নাই, তখনও রূপাদি বিষয়ের দর্শন হয় না; কিন্তু দেহ দ্রষ্টা হইলে মৃতদেহেও দর্শনাদি ক্রিয়া হইতে পারিত। অতএব বেশ বুঝা যাইতেছে যে, যাহার অভাবে শরীরে দর্শন হয় না, অথচ যাহার সদ্ভাবে দর্শন হয়, তাহাই দর্শনাদি ক্রিয়ার কর্তা, কিন্তু দেহ নহে। ৭

চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়সমূহকেই যদি দর্শনাদি ক্রিয়ার কর্তা বলিয়া মনে কর, তাহাও সঙ্গত হয় না; কারণ, কর্তা এক না হইলে—‘যে আমি দর্শন করিয়া- ছিলাম, সেই আমিই এখন স্পর্শ করিতেছি’ এইরূপ প্রতিসন্ধান বা স্মরণ উপপন্ন হয় না। যদি বল, তাহা হইলে মনই কর্তা হউক; তাহাও বলিতে পার না; কেন না, রূপ-রসাদির ন্যায় মনও বিষয়-শ্রেণীভুক্ত(দৃশ্য); সুতরাং তাহারও দ্রষ্টৃত্ব সঙ্গত হয় না; অতএব আদিত্যাদি জ্যোতিঃপদার্থের ন্যায় দেহেন্দ্রিয়াদির অতিরিক্ত শরীরমধ্যস্থ দ্রষ্টার অস্তিত্ব সিদ্ধ হইতেছে। ৮

আরও যে বলা হইয়াছে-সমানজাতীয় আদিত্যাদি পদার্থ দ্বারা যখন তৎ- সমানজাতীয় পদার্থেরই উপকার হইতে দেখা যায়, তখন দেহেন্দ্রিয়াদির উপকারক স্বতন্ত্র জ্যোতিঃপদার্থ টিকেও দেহেন্দ্রিয়াদির সমানজাতীয় বলিয়াই অনুমান করিতে হইবে, তদ্বিজাতীয় নহে; সে কথাও ভাল হয় নাই; কারণ, জগতে উপকার্য্যো- পকারকভাবের কোন নিয়ম নাই, অর্থাৎ সমানজাতীয় পদার্থ ই যে, সমানজাতীয় পদার্থের উপকারক হইবে, বিজাতীয় পদার্থ উপকারক হইবেই না, এরূপ কোনও নিয়ম দেখিতে পাওয়া যায় না। যদি বল, কেন? তদুত্তরে বলি, পার্থিব কাষ্ঠ ও তৎসমানজাতীয় তৃণাদি দ্বারা[তদ্বিজাতীয়] অগ্নির প্রজ্বলনের উপকার হইতে দেখা যায়; সুতরাং অগ্নির প্রজ্বলনে সর্ব্বত্রই তৎসমানজাতীয় পদার্থ দ্বারা উপ- কারের অনুমান করিতে পারা যায় না। বিশেষতঃ জলের দ্বারাও বৈদ্যুতিক ও জঠরগত অগ্নির উপকার হইতে দেখা যায়; অথচ জল ত আর অগ্নির বা কাঠের সমানজাতীয় পদার্থ নহে। অতএব উপকার্য্যোপকারভাব স্থলে সমানজাতীয় বা অসমানজাতীয় বস্তুর কোনও নিয়ম নাই,-কখন বা সমানজাতীয় মনুষ্যগণ তৎসমানজাতীয় মনুষ্যদ্বারা উপকৃত হইয়া থাকে, কখনও বা ভিন্নজাতীয় স্থাবর বা পশু প্রভৃতি দ্বারাও উপকৃত হইয়া থাকে; অতএব নিশ্চয়ই দেহেন্দ্রিয়াদির সমানজাতীয় আদিত্যাদি জ্যোতিঃপদার্থ দ্বারা উপকার দর্শনে তাহাকেই

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৩৫

যে, হেতুরূপে গ্রহণ করা হইয়াছিল, প্রকৃতপক্ষে তাহাও হেতুরূপে গ্রহণ- যোগ্য নহে। ৯

আরো যে বলিয়াছ-আদিত্যপ্রভৃতি জ্যোতিঃপদার্থকে যেমন চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়দ্বারা প্রত্যক্ষ করা যায়, অন্তরস্থ জ্যোতিটি ত সেরূপ প্রত্যক্ষ করা যায় না। হাঁ, কেবল এই ‘অদৃশ্যত্ব’রূপ হেতুতেই যে, অন্য জ্যোতিঃপদার্থের অন্তরস্থত্ব ও বৈলক্ষণ্য প্রমাণ করা হইতেছে, তাহা নহে; অভিপ্রায় এই যে, আদিত্যাদি জ্যোতিঃ- পদার্থগুলি যেরূপ বাহিরে বিদ্যমান দেখিতে পাওয়া যায়, দেহপ্রকাশক জ্যোতিকে সেরূপ দেখিতে পাওয়া যায় না, এই হেতুতেই যে, সেই জ্যোতিকে আদিত্যাদি জ্যোতিঃপদার্থ হইতে অন্যপ্রকার ও অভ্যন্তরে অবস্থিত বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে, তাহা নহে; কারণ, চক্ষুঃ প্রভৃতির স্থলেই এ নিয়মের ব্যভিচার দেখিতে পাওয়া যায়। না, একথাও ভাল হয় না; কারণ, ‘চক্ষুঃপ্রভৃতি সাধনাতি- রিক্ত স্থলে’ এইরূপ একটি বিশেষণ যোগ করিলেই ঐ হেতুটির অসাধকতা দোষ খণ্ডিত হইতে পারে। অভিপ্রায় এই যে, যদিও চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়েতে উক্ত নিয়মের ব্যভিচার দেখিতে পাওয়া যায় সত্য, তথাপি চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয় ভিন্ন সাধন স্থলেই ঐরূপ নিয়ম চলিবে,-এইরূপ একটি বিশেষণ যোগ করি- লেই উক্ত হেতুটি অসিদ্ধ হইবে না। তাহার পর, উক্ত জ্যোতিকে যে, দেহের ধৰ্ম্ম বা গুণ বলা হইয়াছে, তাহাও যুক্তিযুক্ত নহে; কারণ, ঐকথা অনুমান- বিরুদ্ধ। তুমি ইতঃপূর্ব্বে আদিত্যাদি জ্যোতির দৃষ্টান্তানুসারে দেহেন্দ্রিয়াদি হইতে স্বতন্ত্র জ্যোতির অনুমান করিয়াছ, এখন সেই অনুমানের সহিত তোমার এই প্রতিজ্ঞা-উক্ত জ্যোতিকে দেহেন্দ্রিয়-ধর্ম্ম বলিয়া নির্দেশ করা বিরুদ্ধ হইতেছে। তাহার পর, তদ্ভাবভাবিত্বও-দেহসদ্ভাবে জ্যোতির সদ্ভাব, আর দেহের অভাবে অভাব, একথাও অসিদ্ধ; কারণ, মৃতদেহে ত জ্যোতির সত্তা দেখিতে পাওয়া যায় না; অভিপ্রায় এই যে, জ্যোতির্বিজ্ঞান যদি দেহেরই ধর্ম্ম হইত, তাহা হইলে মৃত্যুর পরও দেহেতে জ্যোতির প্রত্যক্ষ হইত; তাহা যখন হয় না, তখন নিশ্চয়ই দেহ ও জ্যোতির মধ্যে তদ্ভাবভাবিত্ব ধর্ম্ম নাই। ১০

বিশেষতঃ ‘সামান্যতো দৃষ্ট’ অনুমানের(প্রত্যক্ষদৃষ্ট বস্তুতে নির্ণীত নিয়- মানুসারে যে, তজ্জাতীয় অপ্রত্যক্ষ বস্তুর অনুমান, তাহার) প্রামাণ্য যদি স্বীকার না করা যায়, তাহা হইলে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পান-ভোজনাদি ব্যব- হারও বিলুপ্ত হইয়া যাইতে পারে; তাহা ত কাহারও বাঞ্ছনীয় নহে। দেখ, একবার জল পান করিয়া যাহার পিপাসানিবৃত্তি হইয়াছে, এবং একবার ভোজন

১০৩৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

করিয়া যাহার ক্ষুধানিবৃত্তি হইয়াছে, সেই ব্যক্তির যে, দ্বিতীয়বার পিপাসা বা ক্ষুধা উপস্থিত হইলে পূর্ব্বানুভব অনুসারে পুনর্ব্বার জলপানে ও অন্নভোজনে প্রবৃত্তি হইয়া থাকে, তাহা আর হইতে পারে না; অথচ সর্ব্বত্রই দেখিতে পাওয়া যায় যে, যাহারা একবার পান-ভোজনের ফল অনুভব করিয়াছে, পুনর্ব্বার ক্ষুধা-পিপাসা উপস্থিত হইলেই, তাহারা পূর্ব্বসাদৃশ্যে সেই সেই পান- ভোজন দ্বারা ক্ষুধা-পিপাসা নিবৃত্তির অনুমান করত, ক্ষুধা-পিপাসা নিবৃত্তির জন্য পান-ভোজনে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে(১)। ১১

আরও যে, বলা হইয়াছে-এই স্কুল দেহই দর্শনাদি-ক্রিয়ার কর্তা,(তদতি- রিক্ত কর্তা নাই); সে কথা প্রথমেই-‘স্বপ্ন ও স্মৃতিজ্ঞানের যিনি দ্রষ্টা বা অনুভবকর্তা, তিনি দেহ হইতে স্বতন্ত্র’ ইত্যাদি স্থলেই খণ্ডিত হইয়াছে। ঐ স্বতন্ত্র জ্যোতিঃপদার্থ টিকে যে, অনাত্মা বলিয়া আশঙ্কা করা হইয়াছিল, একথায় তাহাও প্রত্যাখ্যাত হইল। পুনশ্চ যে, খাদ্যোতপ্রভৃতি জ্যোতিঃপদার্থের সাময়িক প্রকাশ ও অপ্রকাশকে দৃষ্টান্তরূপে উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহাও সুসঙ্গত হয় নাই; কারণ, খদ্যোতের যে, ঐরূপ সাময়িক প্রকাশাপ্রকাশ; পক্ষপ্রভৃতি অব- য়বের সঙ্কোচন ও প্রসারণই তাহার কারণ; সুতরাং উহা তাহাদের স্বভাবসিদ্ধ নহে। আরো যে, বলা হইয়াছে-ধর্মাধর্মের স্বভাবসিদ্ধ ফল-দানশক্তি অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। ভাল, তাহা স্বীকার করিলে ত তোমারই সিদ্ধান্ত ব্যাহত হইয়া পড়ে; সেইরূপ বিরোধ সম্ভাবিত হয় বলিয়াই তোমার আশঙ্কিত অনবস্থা-দোষও নিরস্ত হইল। অতএব স্বীকার করিতে হইবে যে, দেহাদির অতিরিক্ত স্বতন্ত্র একটা জ্যোতিঃ পদার্থ অন্তরে অবস্থিত আছে ॥ ২৫৭ ॥৬॥

কতম আত্মেতি, যোহয়ং বিজ্ঞানময়ঃ প্রাণেষু হৃদ্যন্তজ্যোতিঃ পুরুষঃ, সসমানঃ সন্ভূ লোকাবনুসঞ্চরতি—ধ্যায়তীব লেলায়তীব। সহি স্বপ্নো ভূত্বেমং লোকমতিক্রামতি মৃত্যোরূপাণি ॥২৫৮৷৷৭৷৷

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্

১০৩৭

সক্সলার্থঃ।-[ জনকঃ প্রাগুক্তে আত্মনি জাতসংশয়ঃ সন্ পৃচ্ছতি- কতম ইত্যাদি।][হে যাজ্ঞবল্ক্য, ত্বদুক্তঃ জ্যোতিঃস্বরূপঃ] আত্মা কতমঃ? (শরীরেন্দ্রিয়বুদ্ধ্যাদিযু মধ্যে কঃ?) ইতি।[যাজ্ঞবল্ক্য আহ-] প্রাণেষু (দেহেন্দ্রিয়াদিযু মধ্যে) হৃদি(বুদ্ধৌ) অন্তঃ(অন্তঃস্থং) জ্যোতিঃ(প্রকাশ- স্বভাবঃ) যঃ অয়ং(অনুভবযোগ্যঃ) বিজ্ঞানময়ঃ(বিজ্ঞানপ্রচুরঃ) পুরুষঃ, [স মদুক্ত আত্মা]। সঃ(বিজ্ঞানময় আত্মা) সমানঃ(বুদ্ধিসদৃশঃ-বুদ্ধি- তাদাত্ম্যমিবাপন্নঃ সন্) উভৌ লোকৌ(ইহলোক-পরলোকৌ) অনুসঞ্চ- রতি(ক্রমেণ ভ্রমতি)।[তত্র চ] ধ্যায়তীব(ধ্যানং করোতীব), লেলায়তীব(অতিমাত্রৎ চলতি ইব, ন তু স্বতঃ ধ্যায়তি, ন বা লেলায়তীতি ভাবঃ)। তথা সধীঃ(ধিয়া যুক্তঃ সন্) স্বপ্নঃ ভূত্বা(স্বপ্নব্যাপারং সম্পা- দয়ন্) ইমং লোকং(জাগরিতলক্ষণৎ) মৃত্যোঃ(কর্মাবিদ্যাদেঃ) রূপাণি (দেহেন্দ্রিয়াদীন-তদনন্যভাবং) অতিক্রামতি(অতীত্য স্বয়ংজ্যোতিঃ- স্বরূপেণ তিষ্ঠতি ইত্যর্থঃ) ॥ ২৫৮৷৷ ৭ ॥

মূলাসুবাদ:-[ জনক জিজ্ঞাসা করিলেন-হে যাজ্ঞবল্ক্য,] দেহেন্দ্রিয় বুদ্ধি প্রভৃতি প্রাণবর্গের মধ্যে[তোমার কথিত] আত্মা কোন্টি?[যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন-] দেহেন্দ্রিয়াদি প্রাণবর্গের মধ্যে, এই যে, হৃদয়ের(বুদ্ধির) অভ্যন্তরস্থ জ্যোতিঃস্বরূপ বিজ্ঞানময় পুরুষ, [ইহাই সেই আত্মা।] সেই বিজ্ঞানময় পুরুষ সমান হইয়া-বুদ্ধির সদৃশভাবাপন্ন হইয়া ক্রমে উভয় লোকে-ইহ লোকে ও পর লোকে সঞ্চরণ করিয়া থাকে;[এবং বুদ্ধির সাম্য লাভ করায়] মনে হয়- যেন ধ্যানই করিতেছে; যেন স্পন্দনই করিতেছে,(প্রকৃতপক্ষে কিন্তু আত্মার ধ্যান বা স্পন্দন নাই)। বুদ্ধি সাম্যগত সেই আত্মা স্বপ্নাবস্থা লাভ করিয়া মৃত্যুর অধিকারভুক্ত এই লোক ও পরলোক উভয় লোক অতিক্রম করিয়া স্বীয় জ্যোতিঃস্বরূপে প্রকাশ পাইয়া থাকে ॥২৫৮৷৷৭৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্।—যদ্যপি ব্যতিরিক্তত্বাদি সিদ্ধং, তথাপি সমানজাতী- য়ানুগ্রাহকত্বদর্শননিমিত্তভ্রান্ত্যা করণানামেবান্যতমো ব্যতিরিক্তো বেত্যবিবেকতঃ পৃচ্ছতি—কতম ইতি। ন্যায়সূক্ষ্মতায়া দুর্বিজ্ঞেত্বাদুপপদ্যতে ভ্রান্তিঃ। অথবা, শরীরব্যতিরিক্তে সিদ্ধেহপি করণানি সর্ব্বাণি বিজ্ঞানবন্তি ইব, বিবেকত আত্ম-

১০৩৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

নোহনুপলব্ধত্বাৎ; অতোহহং পৃচ্ছামি-কতম আত্মেতি। কতমোহসৌ দেহে- ন্দ্রিয়প্রাণমনঃসু, যত্ত্বয়োক্ত আত্মা, যেন জ্যোতিষা আস্তে ইত্যুক্তম্। ১

টীকা। নম্বাত্মজ্যোতিঃ সঙ্ঘাতাদ ব্যতিরিক্তমন্তঃস্থং চেতি সাধিতং, তথা চ কথং কতম আত্মেতি পৃচ্ছ্যতে? তত্রাহ-যদ্যপীতি। অনুগ্রাহ্যেণ দেহাদিনা সমানজাতীয়স্যাদিত্যাদেরমু- গ্রাহকত্বদর্শনান্নিমিত্তাদনুগ্রাহকত্বাবিশেষাদাত্মজ্যোতিরপি সমানজাতীয়ং দেহাদিনেতি ভ্রান্তি- র্ভবতি, তয়েতি যাবৎ, অবিবেকিনো নিষ্কৃষ্টদৃষ্ট্যভাবাদিত্যর্থঃ। ব্যতিরেকসাধকস্য ন্যায়স্য দর্শিতত্বাৎ কুতো ভ্রান্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন্যায়েতি। ভ্রান্তিনিমিত্তাবিবেককৃতং প্রশ্নমুক্ত। প্রকারান্তরেণ প্রশ্নমুখাপয়তি-অথবেতি। প্রশ্নাক্ষরাণি ব্যাচষ্টে-কতমোহসাবিতি। ননু জ্যোতির্নিমিত্তো ব্যবহারো ময়োক্তো ন ত্বাত্মেত্যাশঙ্ক্যাহ-যেনেতি। আত্মনৈবায়ং জ্যোতিষেত্যুক্তত্বাদাসনাদিনিমিত্তং জ্যোতিরাত্মেত্যর্থঃ। ১

অথবা, যোহয়মাত্মা ত্বয়াভিপ্রেতো বিজ্ঞানময়ঃ, সর্ব্বে ইমে প্রাণা বিজ্ঞানময়া ইব, এষু প্রাণেষু কতমঃ—যথা সমুদিতেষু ব্রাহ্মণেষু সর্ব্ব ইমে তেজস্বিনঃ, কতম এতেষু ষড়ঙ্গবিদিতি। পূর্ব্বস্মিন্ ব্যাখ্যানে কতম আত্মেত্যেবদেব প্রশ্নবাক্যম্; ‘যোহয়ং বিজ্ঞানময়ঃ’ ইতি প্রতিবচনম্; দ্বিতীয়ে তু ব্যাখ্যানে ‘প্রাণেষু ইত্যেব- মন্তং প্রশ্নবাক্যম্। অথবা সর্ব্বমেব প্রশ্নবাক্যং—‘বিজ্ঞানময়ো হৃদ্যন্তজ্যোতিঃ পুরুষঃ কতমঃ’ ইত্যেতদন্তম্। যোহয়ং বিজ্ঞানময় ইত্যেতস্য শব্দস্য নির্দ্ধারিতার্থ- বিশেষবিষয়ত্বম্। কতম আত্মেতীতিশব্দস্য প্রশ্নবাক্যপরিসমাপ্ত্যর্থত্বৎ ব্যবহিত- সম্বন্ধমন্তরেণ যুক্তমিতি কৃত্বা কতম আত্মেত্যেবমন্তমের প্রশ্নবাক্যম্। যোহয়- মিত্যাদি পরং সর্ব্বমেব প্রতিবচনমিতি নিশ্চয়তে।২

প্রকারান্তরেণ প্রশ্নং ব্যাকরোতি—অথবেতি। সপ্তম্যর্থং কথয়তি—সর্ব্ব ইতি। যোহয়ং ত্বয়াভিপ্রেতো বিজ্ঞানময়ঃ, স প্রাণেষু মধ্যে কতমঃ স্যাৎ, তেহপি হি বিজ্ঞানময়া ইব ভান্তীতি যোজনা। উক্তমর্থং দৃষ্টান্তেন বুদ্ধাবারোপয়তি—যথেতি। ব্যাখ্যানয়োরবান্তরবিভাগমাহ— পূর্ব্বস্মিন্নিত্যাদিনা। হৃদীত্যাদি প্রতিবচনমিতি শেষঃ। পক্ষান্তরমাহ—অথবেতি। সর্ব্বস্য প্রশ্নত্বে বাক্যং যোজয়তি—বিজ্ঞানেতি। স সমানঃ সন্নিত্যাদি প্রতিবচনমিতি শেষঃ। ২

যোহয়মিত্যাত্মনঃ প্রত্যক্ষত্বান্নির্দেশঃ; বিজ্ঞানপ্রায়ো বুদ্ধিবিজ্ঞানোপাধি- সম্পর্কাবিবেকাদ্বিজ্ঞানময় ইত্যুচ্যতে—বুদ্ধিবিজ্ঞানযুক্ত এব হি যস্মাদুপলভ্যতে —রাহুরিব চন্দ্রাদিত্যসংযুক্তঃ। বুদ্ধিহি সর্ব্বার্থ-করণম্ তমসীব প্রদীপঃ পুরোহ- বস্থিতঃ, “মনসা হ্যেব পশ্যতি মনসা শূণোতি” ইতি হ্যুক্তম্; বুদ্ধিবিজ্ঞানালোক- বিশিষ্টমেব হি সর্ব্বং বিষয়জাতমুপলভ্যতে—পুরোহবস্থিতপ্রদীপালোকবিশিষ্টমিব তমসি; দ্বারমাত্রাণি তু অন্যানি করণানি বুদ্ধেঃ; তন্মাত্তেনৈব বিশেষ্যতে— বিজ্ঞানময় ইতি।৩

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৩৯

দ্বিতীয়তৃতীয়পক্ষয়োররুচিং সূচরন্নাদ্যং পক্ষমঙ্গী করোতি-যোহয়মিতি। যন্তয়া পৃষ্টঃ, সোহয়মিত্যাত্মনশ্চিজ্রূপত্বেন প্রত্যক্ষত্বাদরমিতি নির্দেশ ইতি পদদ্বয়স্যার্থঃ। দেহব্যবচ্ছেদার্থং বিশিনষ্টি-বিজ্ঞানময় ইতি। বিজ্ঞানশব্দার্থমাচক্ষাণস্তৎপ্রায়ত্বং প্রকটয়তি-বুদ্ধীতি। বুদ্ধিরেব বিজ্ঞানং বিজ্ঞায়তেহনেনেতি ব্যুৎপত্তেস্তেনোপাধিনা সম্পর্ক এবাবিবেকস্তস্মাদিতি যাবৎ। তৎসম্পর্কে প্রমাণমাহ-বুদ্ধিবিজ্ঞানেতি। তস্মাদ্বিজ্ঞানময় ইতি শেষঃ। ননু চক্ষুর্ময়ঃ শ্রোত্রময় ইত্যাদি হিত্বা বিজ্ঞানময় ইত্যেব কম্মাদুপদিশ্যতে? তত্রাহ-বুদ্ধিহীতি। তস্যাঃ সাধারণ- করণত্বে প্রমাণমাহ-মনসা হীতি। মনসঃ সর্ব্বার্থত্বং সমর্থয়তে-বুদ্ধীতি। কিমর্থানি তর্হি চক্ষুরাদীনি করণানীত্যাশঙ্ক্যাহ-দ্বারমাত্রাণীতি। বুদ্ধেঃ সতি প্রাধান্যে ফলিতমাহ- তস্মাদিতি। ৩

যেষাৎ পরমাত্মবিজ্ঞপ্তিবিকার ইতি ব্যাখ্যানম্, তেষাৎ ‘বিজ্ঞানময়ো মনো- ময়ঃ’ ইত্যাদৌ বিজ্ঞানময়শব্দস্য অন্যার্থদর্শনাদ্ অশ্রৌতার্থতাবসীয়তে। সন্দিগ্ধশ্চ পদার্থোহন্যত্র নিশ্চিতপ্রয়োগদর্শনান্নির্দ্ধারয়িতুং শক্যঃ—বাক্যশেষাৎ নিশ্চিতন্যায়- বলাদ্বা। সধীরিতি চোত্তরত্র পাঠাৎ “হৃদ্যন্তঃ” ইতি বচনাদ্ যুক্তং বিজ্ঞান- প্রায়ত্বমেব। ৪

বিজ্ঞানং পরং ব্রহ্ম, তৎপ্রকৃতিকো জীবো বিজ্ঞানময় ইতি ভর্তৃপ্রপঞ্চৈরুক্তমনুবদতি- যেষামিতি। বিজ্ঞানময়াদিগ্রন্থে ময়টো ন বিকারার্থতেতি তৈরেবোচ্যতে, তত্র মনঃসমভি- ব্যাহারাদ্বিজ্ঞানং বুদ্ধির্ন চাত্মা তদ্বিকারস্তম্মাদস্মিন্প্রয়োগে ময়টো বিকারার্থত্বং বদতাং স্বোক্তিবিরোধঃ স্যাদিতি দূষয়তি-তেষামিতি। কথং বিজ্ঞানময়পদার্থনির্ণয়ার্থং প্রয়োগান্তর- মনুশ্রীয়তে, তত্রাহ-সন্দিগ্ধশ্চেতি। যথা পুরোডাশঃ চতুর্দ্ধা কৃত্বা বর্হিষদং করোতীতি পুরোডাশমাত্রচতুর্দ্ধাকরণবাক্যমেকার্থসম্বন্ধিনা শাখান্তরীয়েণাগ্নেয়ং চতুর্দ্ধা করোতীত্যনেন বিশেষবিষয়তয়া নিশ্চিতার্থেনাগ্নেয় এব পুরোডাশে ব্যবস্থাপ্যতে, যথা চাক্তাঃ শর্করা উপদধাতীত্যত্র কেনাক্ততেত্যপেক্ষায়াং তেজো বৈ ঘৃতমিতি বাক্যশেষান্নির্ণয়স্তথেহাপীত্যর্থঃ। আত্মবিকারত্বে মোক্ষানুপপত্যা হ্রবাধিতন্যায়াম্বা বিজ্ঞানময়পদার্থনিশ্চয় ইত্যাহ-নিশ্চিতেতি। যদুত্তং নির্ণয়ো বাক্যশেষাদিতি, তদেব ব্যনক্তি-সধীরিতি চেতি। ৪

প্রাণেঘিতি ব্যতিরেকপ্রদর্শনার্থা সপ্তমী—যথা বৃক্ষেষু পাষাণ ইতি সামীপ্য- লক্ষণা; প্রাণেষু হি ব্যতিরেকাব্যতিরেকতা সন্দিহৃত আত্মনঃ; প্রাণেষু প্রাণেভ্যো ব্যতিরিক্ত ইত্যর্থঃ; যো হি যেষু ভবতি, স তদ্ব্যতিরিক্তো ভবত্যেব, যথা পাষাণেষু বৃক্ষঃ। ৫

আধারাদ্যর্থা সপ্তমী দৃষ্টা, সা কথং ব্যতিরেকপ্রদর্শনার্থেত্যাশঙ্ক্যাহ—যথেতি। ভবত্বত্রাপি সামীপ্যলক্ষণা সপ্তমী, তথাপি কথং ব্যতিরেকপ্রদর্শনমিত্যাশঙ্ক্যাহ—প্রাণেষু হীতি। ফলিতং সপ্তম্যর্থনভিনয়তি—প্রাণেষিতি। তেষু সমীপস্থোহপি কথং তেভ্যো ব্যতিরিচ্যতে, তত্রাহ— যো হীতি। ৫

১০৪০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হৃদি-তত্রৈতৎ-স্যাৎ-প্রাণেষু প্রাণজাতীয়ৈব বুদ্ধিঃ স্যাদিতি, অত আহ- হৃদ্যন্তরিতি। হৃচ্ছব্দেন পুণ্ডরীকাকারো মাংসপিণ্ডঃ, তাৎস্থ্যাদ বুদ্ধির্হৎ, তস্যাং হৃদি বুদ্ধৌ। অন্তরিতি বুদ্ধিবৃত্তিব্যতিরেকপ্রদর্শনার্থম্। জ্যোতিঃ-অব- ভাসাত্মকত্বাৎ আত্মা উচ্যতে। তেন হি অবভাসকেনাত্মনা জ্যোতিষা আস্তে, পলয়তে, কৰ্ম্ম কুরুতে, চেতনাবানিব হ্যায়ং কার্যকরণপিণ্ডঃ-যথাদিত্যপ্রকাশস্থো ঘটঃ, যথা বা মরকতাদিৰ্ম্মণিঃ ক্ষীরাদিদ্রব্যপ্রক্ষিপ্তঃ পরীক্ষণায় আত্মচ্ছায়মেব তৎ ক্ষীরাদি দ্রব্যৎ করোতি, তাদৃগেতদাত্মজ্যোতিঃ বুদ্ধেরপি হৃদয়াৎ সুক্ষ্মত্বাৎ হৃদ্যন্তঃ- স্থমপি হৃদয়াদিকং কার্যকরণসঙ্ঘাতং চ একীকৃত্য আত্মজ্যোতিস্থায়ৎ করোতি, পারম্পর্য্যেণ সূক্ষ্মস্থলতারতম্যাৎ সর্ব্বান্তরতমত্বাৎ। ৬

বিশেষণান্তরমাদায় ব্যাবর্ত্যাং শঙ্কামুক্ত। পুনরবতার্য্য ব্যাকরোতি-হৃদীত্যাদিনা। বিশেষণান্তরস্য তাৎপর্য্যমাহ-অন্তরিতীতি। জ্যোতিঃশব্দার্থমাহ-জ্যোতিরিতি। তস্য জ্যোভিষ্টুং স্পষ্টয়তি-তেনেতি। আত্মজ্যোতিষা ব্যাপ্তস্য কার্যকরণসঙ্ঘাতন্য ব্যবহারক্ষমত্বে দৃষ্টান্তমাহ-যথেতি। চেতনাবানিবেত্যুক্তং দৃষ্টান্তেনোপপাদয়তি-যথা বেতি। হৃদয়ং বুদ্ধিস্ততোহপি সূক্ষ্মত্বাদাত্মজ্যোতিস্তদন্তঃস্থমপি হৃদয়াদিকং সঙ্ঘাতং চ সর্বমেকীকৃত্য স্বচ্ছায়ং করোতীতি কৃত্বা যথোক্তমণিসাদৃশ্যমুচিতমিতি দাষ্টান্তিকে যোজনা। কথমিদমাত্মজ্যোতিঃ সর্বমাত্মচ্ছায়ং করোতি, তত্রাহ-পারম্পর্য্যেণেতি। বিষয়াদিষু প্রত্যগাত্মান্তেযুত্তরোত্তরং সূক্ষ্মতাতারতম্যাত্তেষেবাত্মাদিবিষয়ান্থেষু স্থূলতাতারতম্যাচ্চ প্রতীচঃ সর্বম্মাদন্তরতমত্বাত্তত্র তত্র স্বাকারহেতুত্বমস্তীত্যর্থঃ। ৬

বুদ্ধিস্তাবৎ স্বচ্ছত্বাদানন্তর্য্যাচ্চাত্মচৈতন্যজ্যোতিঃপ্রতিচ্ছায়া ভবতি, তেন হি বিবেকিনামপি তত্রাত্মাভিমানবুদ্ধিঃ প্রথমা; ততোহপ্যানন্তর্যান্মনসি চৈতন্যাব- ভাসতা বুদ্ধিসম্পর্কাৎ; তত ইন্দ্রিয়েষু মনঃসংযোগাৎ; ততোহনন্তরং শরীরে ইন্দ্রিয়সম্পর্কাৎ। এবং পারম্পর্য্যেণ কৃৎস্নং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতমাত্মা চৈতন্যস্বরূপ- জ্যোতিষা অবভাসয়তি; তেন হি সর্ব্বস্য লোকস্য কার্য্যকরণসঙ্ঘাতে তদ্বৃত্তিযু চ অনিয়তাত্মাভিমানবুদ্ধিঃ যথাবিবেকং জায়তে। তথা চ ভগবতোক্তং গীতাসু,—

“যথা একাননমভ্যঙ্গঃ কুরুৎ লোকবিবর্জ্জিতঃ।

দেবতা দেবী তথা কৃষ্ণং দেবকৃতি ভারত। ॥

“যদাদিত্যগতং তেজঃ” ইত্যাদি চ, “নিত্যো নিত্যানাঞ্চেতনশ্চেতনানাম্” ইতি চ কাঠকে। “তমেব ভান্তমনুভাতি সর্ব্বম্, তস্য ভাসা সর্ব্বমিদং বিভাতি” ইতিচ। “যেন সূর্য্যস্তপতি তেজসেদ্ধঃ” ইতি চ মন্ত্রবর্ণঃ। তেনায়ৎ হৃদ্যন্ত- জ্যোতিঃ পুরুষঃ—আকাশবৎ সর্ব্বগতত্বাৎ পূর্ণ ইতি পুরুষঃ। নিরতিশয়ঞ্চাস্য স্বয়ং-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৪১

জ্যোতিষ্টম্, সর্ব্বাবভাসকত্বাৎ স্বয়মন্যানবভাস্যত্বাচ্চ। স এষ পুরুষঃ স্বয়মেব জ্যোতিঃস্বভাবঃ, যং ত্বৎ পৃচ্ছসি-কতম আত্মেতি। ৭

বুদ্ধেরাত্মচ্ছায়ত্বং সমর্থয়তে-বুদ্ধিস্তাবদিতি। লৌকিকপরীক্ষকাণাং বুদ্ধাবাত্মাভিমান- ভ্রান্তিমুক্তেহর্থে প্রমাণয়তি-তেন হীতি। বুদ্ধেঃ পশ্চান্মনস্যপি চিচ্ছায়তেত্যত্র হেতুমাহ- বুদ্ধীতি। আত্মনঃ সর্ব্বাবভাসকত্বমুক্তমুপসংহরতি-এবমিতি। আত্মনঃ সর্ব্বাবভাসকত্বে কিমিতি কস্যচিৎ কচিদেবাত্মধীরিত্যাশঙ্ক্যাহ-তেন হীতি। বুদ্ধ্যাদেরুক্তক্রমেণাত্মচ্ছায়ত্বং তচ্ছব্দার্থঃ। আত্মজ্যোতিষঃ সর্ব্বাবভাসকত্বে লোকপ্রসিদ্ধিরেব ন প্রমাণং, কিন্তু ভগবদ্বাক্য- মপীত্যাহ-তথা চেতি। নাশিনাময়মনাশী, চেতনাশ্চেতয়িতারো, ব্রহ্মাদয়স্তেষাময়মেব চেতনঃ, যথোদকাদীনামনগ্নীনামগ্লিনিমিত্তং দাহকত্বং, তথাত্মচৈতন্যনিমিত্তমেব চেতরিতৃত্বমন্যেষা- মিত্যাহ-নিত্য ইতি। অনুগমনবদনুমানং স্বগতয়া ভাসা স্যাদিতি শঙ্কাং প্রত্যাহ-তস্যেতি। যেনেতি। তত্র নাবেদবিন্মনুতে তং বৃহন্তমিত্যুত্তরত্র সম্বন্ধঃ। জ্যোতিঃশব্দব্যাখ্যানমুপ- সংহরতি-তেনেতি।

হৃদ্যন্তঃস্থিতোহয়মাত্মা সর্ব্বাবভাসকত্বেন জ্যোতির্ভবতীতি যোজনা। পদান্তরমাদায় ব্যাচষ্টে-পুরুষ ইতি। আদিত্যাদিজ্যোতিষঃ সকাশাদাত্মজ্যোতিষি বিশেষমাহ-নিরতিশয়ং চেতি। প্রতিবচনবাক্যার্থমুপসংহরতি-স এষ ইতি। ৭

বাহ্যানাং জ্যোতিষাং সর্ব্বকরণানুগ্রাহকাণাৎ প্রত্যস্তময়ে অন্তঃকরণদ্বারেণ হৃদ্যন্তর্জ্যোতিঃ পুরুষ আত্মা অনুগ্রাহকঃ করণানামিত্যুক্তম্। যদাপি বাহ্যকরণানু- গ্রাহকাণামাদিত্যাদিজ্যোতিষাং ভাবঃ, তদাপি আদিত্যাদিজ্যোতিষাং পরার্থত্বং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতস্যাচৈতন্যে স্বার্থানুপপত্তেঃ, স্বার্থজ্যোতিষ আত্মনোহনুগ্রহাভাবে- হয়ং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতো ন ব্যবহারায় কল্পতে; আত্মজ্যোতিরনুগ্রহেণৈব হি সর্ব্বদা সর্ব্বসংব্যবহারঃ। “যদেতহৃদয়ং মনশ্চৈতৎ সংজ্ঞানম্” ইত্যাদি শ্রুত্য- ন্তরাৎ; সাভিমানো হি সর্ব্বঃ প্রাণিসংব্যবহারঃ; অভিমানহেতুং চ মরকতমণি- দৃষ্টান্তেনাবোচাম। ৮

স সমানঃ সন্নিত্যাদ্যবতারয়িতুং বৃত্তং কীর্তয়তি-বাহ্যানামিতি। তর্হি বাহ্যজ্যোতিঃ- সম্ভাবাবস্থায়ামকিঞ্চিৎকরমাত্মজ্যোতিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-যদাহপীতি। ব্যতিরেকমুখেনোক্তমর্থমন্বয়- মুখেন কথয়তি-আত্মজ্যোতিরিতি। আত্মজ্যোতিষঃ সর্ব্বানুগ্রাহকত্বে প্রমাণমাহ- যদেতদিতি। সর্ব্বমন্তঃকরণাদি প্রজ্ঞানেত্রমিত্যৈতরেয়কে শ্রবণাদুক্তমাত্মজ্যোতিষঃ সর্ব্বানু- গ্রাহকত্বমিত্যর্থঃ। কিঞ্চ, অচেতনানাং কার্য্যকরণানাং চেতনত্বপ্রসিদ্ধ্যনুপপত্যা সদা চিদাত্ম- ব্যাপ্তিরেষ্টব্যেত্যাহ-সাভিমানো হীতি। কথমসঙ্গস্য প্রতীচঃ সর্বত্র বুদ্ধ্যাদাবহংমান ইত্যা- শঙ্ক্যাহ-অভিমানেতি। ৮

যদ্যপ্যেবমেতৎ, তথাপি জাগ্রদ্বিষয়ে সর্ব্বকরণগোচরত্বাদাত্মজ্যোতিষো বুদ্ধ্যাদি- বাহ্যাভ্যন্তর-কার্য্যকরণব্যবহারসন্নিপাতব্যাকুলত্বান্ন শক্যতে তজ্জ্যোতিরাত্মাখ্যং

১০৪২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মুঞ্জেষীকাবৎ নিষ্কষ্য দর্শয়িতুম্—ইত্যতঃ স্বপ্নে দিদর্শয়িষুঃ প্রক্রমতে—স সমানঃ সন্নভৌ লোকাবনুসঞ্চরতি। যঃ পুরুষঃ স্বয়মেব জ্যোতিরাত্মা, স সমানঃ সদৃশঃ সন্; কেন? প্রকৃতত্বাৎ সন্নিহিতত্বাচ্চ হৃদয়েন। ‘হৃদি’ইতি চ হৃচ্ছব্দবাচ্যা বুদ্ধিঃ প্রকৃতা, সন্নিহিতা চ, তস্মাত্তয়ৈব সামান্যম্। ৯

বৃত্তমনুদ্যোত্তরবাক্যমবতারয়তি-যদ্যপীতি। যথোক্তমপি প্রত্যজ্যোতির্জাগরিতে দর্শয়িতুমশক্যমিতি শ্রুতিঃ স্বপ্নং প্রস্তৌতীত্যর্থঃ। অশক্যত্বে হেতুদ্বয়মাহ-সর্ব্বেতি। স্বপ্নে নিকৃষ্টং জ্যোতিরিতি শেষঃ। সদৃশঃ সন্ননুসঞ্চরতীতি সম্বন্ধঃ। সাদৃশ্যস্য প্রতিযোগিসাপেক্ষত্ব- মপেক্ষ্য পৃচ্ছতি-কেনেতি। উত্তরম্-প্রকৃতত্বাদিতি। প্রাণানামপি তুল্যং তদিতি চেত্তত্রাহ-সন্নিহিতত্বাচ্চেতি। হেতুদ্বয়ং সাধয়তি-হৃদীত্যাদিনা। প্রকৃতত্বাদিফলমাহ- তস্মাদিতি। ৯

কিং পুনঃ সামান্যম্? অশ্বমহিষবদ্বিবেকতোহনুপলব্ধিঃ। অবভাস্যা বুদ্ধিঃ অবভাসকং তদাত্মজ্যোতিঃ, আলোকবৎ: অবভাস্যাবভাসকয়োর্বিবেকতোহনু- পলদ্ধিঃ প্রসিদ্ধা। বিশুদ্ধত্বাদ্ধ্যালোকোহবভাস্যেন সদৃশো ভবতি; যথা রক্তমেব ভাসয়ন্ আলোকো রক্তসদৃশো রক্তাকারো ভবতি, যথা হরিতং নীলং লোহিতং চ অবভাসয়ন্নালোকস্তৎসমানো ভবতি, তথা বুদ্ধিমবভাসয়ন্ বুদ্ধিদ্বারেণ কৃৎস্নং ক্ষেত্রমবভাসয়তীত্যুক্তম্—মরকতমণিনিদর্শনেন। তেন সর্ব্বেণ সমানো বুদ্ধি- সামান্যদ্বারেণ; ‘সর্ব্বময়’ ইতি চ অতএব বক্ষ্যতি। ১০

সামান্যং প্রশ্নপূর্ব্বকং বিশদয়তি-কিং পুনরিত্যাদিনা। বিবেকতোহনুপলব্ধিং ব্যক্তীকর্তুং বুদ্ধিজ্যোতিষোঃ স্বরূপমাহ-অবভাস্যেতি। অবভাসকত্বে দৃষ্টান্তমাহ-আলোকবদিতি। তথাপি কথং বিবেকতোহনুপলব্ধিস্তত্রাহ-অবভাস্যেতি। প্রসিদ্ধিমেব প্রকটয়তি-বিশুদ্ধত্বা- দ্ধীতি। উক্তমর্থং দৃষ্টান্তেন বুদ্ধাবারোপয়তি-যথেত্যাদিনা। দৃষ্টান্তগতমর্থং দার্ষান্তিকে যোজয়তি-তথেতি। পুনরুক্তিং পরিহরতি-ইত্যুক্তমিতি। সর্বাবভাসকত্বে কথং বুদ্ধ্যৈব সাম্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ-তেনেতি। সর্বাবভাসকত্বং তচ্ছব্দার্থঃ। কিমর্থং তর্হি বুদ্ধ্যা সামান্য- মুক্তমিত্যাশঙ্ক্য দ্বারত্বেনেত্যাহ-বুদ্ধীতি। আত্মনঃ সর্ব্বেণ সমানত্বে বাক্যশেষমনুকুলয়তি- সর্ব্বময় ইতি চেতি। ১০

তেনাসৌ কুতশ্চিৎ প্রবিভজ্য মুঞ্জেষীকাবৎ স্বেন জ্যোতীরূপেণ দর্শয়িতুং ন শক্যতে-ইতি সর্বব্যাপারং তত্রাধ্যারোপ্য নামরূপগতং, জ্যোতির্ধৰ্ম্মঞ্চ নাম- রূপয়োঃ, নামরূপে চাত্মজ্যোতিষি-সর্ব্বো লোকো মোমুহ্যতে-অয়মাত্মা নায়- মাত্মা, এবংধর্মা নৈবৎধৰ্ম্মা, কর্তাহকর্তা, শুদ্ধোহশুদ্ধঃ, বন্ধো মুক্তঃ, স্থিতো গত আগতঃ, অস্তিনাস্তীত্যাদিবিকল্পৈঃ। অতঃ সমানঃ সন্ভূভৌ লোকৌ প্রতিপন্ন- প্রতিপত্তব্যৌ ইহলোকপরলোকৌ উপাত্তদেহেন্দ্রিয়াদিসঙ্ঘাতত্যাগান্যোপাদান-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৪৩

সধান প্রবঞ্চতসন্নিপাতৈরনুক্রমেণ সঞ্চরতি। ধীসাদৃশমেবোভয়লোকসঞ্চরণ- হেতুর্ন স্বত ইতি। ১১

বাক্যশেষসিদ্ধেহর্থে লোকভ্রান্তের্গমকত্বমাহ-তেনেতি। সর্ব্বমরত্বেনেতি যাবৎ। আত্মা- নাত্মনোর্বিবেকদর্শনস্যাশক্যত্বে পরস্পরাধ্যাসস্তদ্ধর্মাধ্যাসশ্চ স্যাত্ততশ্চ লোকানাং মোহো ভবেদিত্যাহ-ইতি সর্ব্বেতি। ধর্মিবিষয়ং মোহমভিনয়তি-অয়মিতি। ধর্মবিষয়ং মোহং দর্শয়তি-এবংধর্মেতি। তদেব স্ফুটরতি-কর্তেত্যাদিনা। বিকল্পৈঃ সর্ব্বা লোকো মোমুহ্যত- ইতি সম্বন্ধঃ। স সমানঃ সন্নিত্যস্যার্থমুক্তাবশিষ্টং ভাগং ব্যাকরোতি-অত ইত্যাদিনা। ১১

তত্র নামরূপোপাধিসাদৃশ্যং ভ্রান্তিনিমিত্তৎ যৎ, তদেব হেতুর্ন স্বত ইত্যেত- দুচ্যতে-যস্মাৎ স সমানঃ সন্ভূৌ লোকাবনুক্রমেণ সঞ্চরতি-তদেতৎ প্রত্যক্ষ- মিত্যেতদ্দর্শয়তি-যতো ধ্যায়তীব ধ্যানব্যাপারং করোতীব চিন্তয়তীব-ধ্যান- ব্যাপারবর্তীৎ বুদ্ধিং স তৎস্থেন চিৎস্বভাবজ্যোতীরূপেণাবভাসয়ন্ তৎসদৃশস্তৎ- সমানঃ সন্ ধ্যায়তীব, আলোকবদেব; অতো ভবতি-চিন্তয়তীতি ভ্রান্তির্লোকস্য, ন তু পরমার্থতো ধ্যায়তি। তথা লেলায়তীব অত্যর্থং চলতীব-তেঘেব করণেযু বুদ্ধ্যাদিষু বায়ুযু চ চলৎসু, তদবভাসকত্বাত্তৎসদৃশং তদিতি লেলায়তীব, নতু পরমার্থতশ্চলনধৰ্ম্মকং তদাত্মজ্যোতিঃ। ১২

আত্মনঃ স্বাভাবিকমুভয়লোকসঞ্চরণমিত্যাশঙ্ক্যানন্তরবাক্যমাদত্তে-তত্রেতি। আত্মা সপ্তম্যর্থঃ। যতঃশব্দো বক্ষ্যমাণাতঃশব্দেন সম্বধ্যতে। অক্ষরোত্থমর্থমুক্ত। বাক্যার্থমাহ- ধ্যানেভি। ধ্যানবতীং বুদ্ধিং ব্যাপ্তশ্চিদাত্মা ধ্যায়তীবেত্যত্র দৃষ্টান্তমাহ-আলোকবদিতি। যথা থল্বালোকো নীলং পীতং বা বিষয়ং ব্যশ্নুবানস্তদাকারো দৃশ্যতে, তথায়মপি ধ্যানবতীং বুদ্ধিং ভাসয়ন্ধ্যানবানিব ভবতীত্যর্থঃ। যথোক্তবুদ্ধ্যবভাসকত্বমুক্তং হেতুমনুদ্য ফলিতমাহ-অত ইতি। ইবশব্দার্থং কথয়তি-ন ত্বিতি। বুদ্ধিধর্মাণামাত্মন্যৌপাধিকত্বেন মিথ্যাত্বমুক্ত। প্রাণধৰ্মাণামপি তত্র তথাত্বং কথয়তি-তথেতি। আত্মনি চলনস্যৌপাধিকত্বং সাধয়তি-তেষিতি। ইবশব্দ- সামর্থ্যসিদ্ধমর্থমাহ-ন ত্বিতি। ১২

কথং পুনরেতদবগম্যতে, তৎসমানত্বভ্রান্তিরেবোভয়লোকসঞ্চরণাদিহেতুর্ন স্বতঃ-ইত্যস্যার্থস্থ প্রদর্শনায় হেতুরুপদিশ্যতে-স আত্মা হি যস্মাৎ স্বপ্নো ভূত্বা- স যয়া ধিয়া সমানঃ, সা ধীর্যদ্যভবতি, তত্তদাসাবপি ভবতীব; তস্মাদ যদাসৌ স্বপ্নো ভবতি স্বাপবৃত্তিং প্রতিপদ্যতে ধীঃ, তদা সোহপি স্বপ্নবৃত্তিং প্রতিপদ্যতে; যদা ধীজিজাগরিষতি, তদাহসাবপি; অত আহ-স্বপ্নো ভূত্বা স্বপ্নবৃত্তিমবভাসয়ন্ ধিয়ঃ স্বাপবৃত্ত্যাকারো ভূত্বা ইমৎ লোকৎ জাগরিতব্যবহারলক্ষণং কার্যকরণসঙ্ঘা- তাত্মকং লৌকিকশাস্ত্রীয়ব্যবহারাস্পদম্ অতিক্রামতি অতীত্য ক্রামতি। বিবিক্তেন স্বেনাত্মজ্যোতিষা স্বপ্নাত্মিকাং ধীবৃত্তিমবভাসয়ন্নবতিষ্ঠতে যস্মাৎ, তস্মাৎ স্বয়ং-

১০৪৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

জ্যোতিঃস্বভাব এবাসৌ, বিশুদ্ধঃ সন্ কর্তৃক্রিয়াকারকফলশূন্যঃ পরমার্থতঃ ধীসাদৃশ্য- মেব তু উভয়লোকসঞ্চারাদিসংব্যবহারভ্রান্তিহেতুঃ। মৃত্যোঃ রূপাণি—মৃত্যুঃ কর্মাবিদ্যাদিঃ, ন তস্যান্যদ্রূপং স্বতঃ, কার্য্যকরণান্যেবাস্য রূপানি। অতস্তানি মৃত্যোরূপাণ্যতিক্রামতি ক্রিয়াফলাশ্রয়াণি। ১৩

স হীত্যাঘনন্তরবাক্যমাকাঙ্ক্ষাদ্বারোত্থাপয়তি-কথমিত্যাদিনা। তচ্ছব্দো বুদ্ধিবিষয়ঃ। সঞ্চরণাদীত্যাদিশব্দো ধ্যানাদিব্যাপারসংগ্রহার্থঃ। স্বপ্নো ভূত্বা লোকমতিক্রামতীতি সম্বন্ধঃ। কথমাত্মা স্বপ্নো ভবতি, তত্রাহ-স যয়েতি। উক্তেহর্থে বাক্যমবতার্য্য ব্যাকরোতি-অত আহেতি। উক্তং হেতুমনুদ্য ফলিতমাহ-মৃত্যোরিতি। রুপাণ্যতিক্রামতীতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। ক্রিয়াস্তৎফলানি চাশ্রয়ো যেষাং, তানি বা ক্রিয়াণাং তৎফলানাং চাশ্রয়স্তানীতি যাবৎ। ১৩

ননু নাস্ত্যেব ধিয়া সমানম্ অন্যৎ ধিয়োহবভাসকমাত্মজ্যোতিঃ ধীব্যতিরে- কেণ, প্রত্যক্ষেণ বানুমানেন বা অনুপলম্ভাৎ,-যথা অন্যা তৎকাল এব দ্বিতীয়া ধীঃ। যতু অবভাস্যাবভাসকয়োরন্যত্বেহপি বিবেকানুপলম্ভাৎ সাদৃশ্যমিতি ঘটা- দ্যালোকয়োঃ,-তত্র ভবতু অন্যত্বেনালোকস্যোপলম্ভাঘটাদেঃ, সংশ্লিষ্টয়োঃ সাদৃশ্যং ভিন্নয়োরেব; ন চ তথেহ ঘটাদেরিব ধিয়োহবভাসকং জ্যোতিরন্তরৎ প্রত্যক্ষেণ বা অনুমানেন বোপলভামহে; ধীরেব হি চিৎস্বরূপাবভাসকত্বেন স্বাকারা বিষয়াকারা চ: তস্মান্নানুমানতো নাপি প্রত্যক্ষতো ধিয়োহবভাসকৎ জ্যোতিঃ শক্যতে প্রতিপাদয়িতুৎ ব্যতিরিক্তম্। ১৪

বুদ্ধ্যবভাসকং জ্যোতিরাত্মেত্যুক্তং শ্রুত্বা শাক্যঃ শঙ্কতে-নন্বিতি। প্রমাণাদতিরিক্তাত্মোপ লব্ধিরিত্যাশঙ্ক্য প্রত্যক্ষমনুমানং চেতি প্রমাণদ্বৈবিধ্যনিয়মমভিপ্রেত্য তাভ্যামতিরিক্তাত্মানু- পলস্তান্নাসাবন্তীত্যাহ-ধীব্যতিরেকেণেতি। তত্র দৃষ্টান্তমাহ-যথেতি। ঘটাদিরালোকশ্চেত্যু- ভয়োস্মিথঃ সংসৃষ্টয়োর্বিবেকেনানুপলম্ভবদ্ অবভাস্যাবভাসকয়োবুদ্ধ্যাত্মনোর্ভেদেহপি পৃথগনুপ- লস্তাদৈক্যমবভাসতে, বস্তুতস্ত তয়োরন্যত্বমেবেতি শঙ্কামনুবদতি-যত্ত্বিতি। বৈষম্যপ্রদর্শনোত্তর- মাহ-তত্রেতি।-দৃষ্টান্তঃ সপ্তম্যর্থঃ। ঘটাদেরন্যত্বেনেতি সম্বন্ধঃ। জ্যোতিরন্তরং নাস্তি চেৎ, কুতো গ্রাহগ্রাহকসম্বিতিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-ধীরেবেতি। বাহ্যার্থবাদিনোঃ সৌত্রান্তিকবৈভাবি- কয়োরভিপ্রায়মুপসংহরতি-তস্মান্নেতি। ১৪

যদপি দৃষ্টান্তরূপমভিহিতম্—অবভাস্যাবভাসকয়োভিন্নয়োরেব ঘটাদ্যালো- কয়োঃ সংযুক্তয়োঃ সাদৃশ্যমিতি, তত্রাভ্যুপগমমাত্রমস্মাভিরুক্তম্; ন তু তত্র ঘটা- দ্যবভাস্যাবভাসকৌ ভিন্নৌ; পরমার্থতত্ত্ব ঘটাদিরেবাবভাসাত্মকঃ সালোকঃ, অন্যোহন্যো হি ঘটাদিরুৎপদ্যতে। বিজ্ঞানমাত্রমেব সালোকঘটাদিবিষয়াকারমব- ভাসতে। যদৈবম্, তদা ন বাহ্যে দৃষ্টান্তোহস্তি, বিজ্ঞানস্বলক্ষণমাত্রত্বাৎ সর্ব্বস্য। এবং তস্যৈব বিজ্ঞানস্য গ্রাহ্যগ্রাহকবিনির্মুক্তং বিজ্ঞানৎ স্বচ্ছীভূতৎ ক্ষণিকৎ ব্যব-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৪৫

তিষ্ঠত ইতি কেচিৎ। তস্যাপি শান্তিৎ কেচিদিচ্ছন্তি। তদপি বিজ্ঞানৎ সংবৃতৎ গ্রাহ্য- গ্রাহকাংশবিনির্ম্মুক্তং শূন্যমেব, ঘটাদিবাহ্যবস্তুবদিত্যপরে মাধ্যমিকা আচক্ষতে।১৫

ইদানীং বিজ্ঞানবাদী বাহ্যার্থবাদিভ্যামভ্যুপগতং দৃষ্টান্তমনুবদতি-যদপীতি। বাহ্যার্থবাদ- প্রক্রিয়া ন সুগতাভিপ্রেতেতি দূষয়তি-তত্রেতি। উভয়ত্র দৃষ্টান্তস্বরূপং সপ্তম্যর্থঃ। ননু ঘটাদেরবভাস্যাদালোকোহবভাসকো ভিন্নো লক্ষ্যতে, নেত্যাহ-পরমার্থতস্থিতি। তস্য স্থায়িত্বং ব্যাবর্ত্তয়তি-অন্যোহন্য ইতি। প্রতীতং বিষয়প্রাধান্যং ব্যাবর্ত্তয়ন্নুক্তমেব ব্যনক্তি-বিজ্ঞানমাত্র- মিতি। বিজ্ঞানবাদে যথোক্তদৃষ্টান্তরাহিত্যং ফলতীত্যাহ-যদেতি। শিষ্যবুদ্ধ্যনুসারেণ ত্রিবিধং বুদ্ধ্যভিপ্রায়মুপসংহরতি-এবমিত্যাদিনা। পরিকল্প্যেত্যন্তেন বাহ্যার্থবাদমুপসংহৃত্য তস্যৈবেত্যাদিনা বিজ্ঞানবাদমুপসংজহার। তত্র বিজ্ঞানবাদোপসংহারং বিবৃণোতি-তদ্- বাহ্যেতি। শূন্যবাদিমতমাহ-তস্যাপীতি। তদেব স্ফুটয়তি-তদপীতি। ১৫

সর্ব্বা এতাঃ কল্পনা বুদ্ধিবিজ্ঞানাবভাসকস্য ব্যতিরিক্তস্যাত্মজ্যোতিযোহপহ্নবা- দস্য শ্রেয়োমার্গস্থ্য প্রতিপক্ষভূতা বৈদিকস্য। তত্র, যেষাৎ বাহ্যোহর্থোহস্তি, তান্ প্রত্যুচ্যতে-ন তাবৎ স্বাত্মাবভাসকত্বং ঘটাদেঃ; তমস্যবস্থিতো ঘটাদি- স্তাবন্ন কদাচিদপি স্বাত্মনাবভাস্যতে, প্রদীপাদ্যালোকসংযোগেন তু নিয়মেনৈবাব- ভাস্যমানো দৃষ্টঃ সালোকো ঘটইতি। সংশ্লিষ্টয়োরপি ঘটালোকয়োরন্যত্বমেব, পুনঃ পুনঃ সংশ্লেষে বিশ্লেষে চ বিশেষদর্শনাদ্ রজ্জুঘটয়োবিব; অন্যত্বে চ ব্যতি- রিক্তাবভাসকত্বম্; ন স্বাত্মনৈব স্বমাত্মানমবভাসয়তি। ১৬

পক্ষত্রয়েহপি দোষঃ সম্ভাবয়তি-সর্ব্বা ইতি। কথমমুষাং কল্পনানাং দূষণমিত্যাশঙ্ক্য প্রথমং বাহ্যার্থবাদিনং প্রত্যাহ-তত্রেত্রি। নির্দ্ধারণে সপ্তমী। যৎ তু ধীরেবাবভাসকত্বেন স্বাকারেতি, তত্রাহ-নেতি। যদবভাস্যং তৎ স্বাতিরিক্তাবভাস্যমবভাস্যত্বাদ যথা ঘটাদি। অবভাস্যা চেয়ং বুদ্ধিরিত্যনুমানাদ বুদ্ধিব্যতিরিক্তঃ সাক্ষী সিধ্যতীত্যর্থঃ। দৃষ্টান্তং সাধয়তি তমসীতি। তদ্যাব- ভাসকাপেক্ষাং দর্শয়িতুং বিশেষণম্-সালোকো ঘট ইতি। সংশ্লেষাবগমান্নাস্তি ঘটস্য ব্যতিরিক্তাবভাস্যত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-সংশ্লিষ্টয়োরপীতি। ভবত্বন্যত্বং, কিং ভাবতেত্যাশঙ্ক্যাহ- অন্যত্বে চেতি। ব্যতিরিক্তাবভাসকত্বং তাদৃশাবভাসকসাহিত্যমিতি যাবৎ। অবভাসয়তি ঘটাদিরিতি শেষঃ। ১৬

ননু প্রদীপঃ স্বাত্মানমেবাবভাসয়ন্ দৃষ্ট ইতি-ন হি ঘটাদিবৎ প্রদীপদর্শনায় প্রকাশান্তরমুপাদদতে লৌকিকাঃ; তস্মাৎ প্রদীপঃ স্বাত্মানং প্রকাশয়তি। ন, অবভাস্যত্বাবিশেষাৎ-যদ্যপি প্রদীপোহন্যস্যাবভাসকঃ স্বয়মবভাসাত্মকত্বাৎ, তথাপি ব্যতিরিক্তচৈতন্যাবভাস্যত্বৎ ন ব্যভিচরতি, ঘটাদিবদেব; যদা চৈবম্, তদা ব্যতিরিক্তাবভাস্যত্বৎ তাবদবশ্যম্ভাবি। ননু যথা ঘটঃ চৈতন্যাবভাস্যত্বেহপি ব্যতি- রিক্তমালোকান্তরমপেক্ষতে, নত্বেবং প্রদীপোহন্যমালোকান্তরমপেক্ষতে; তস্মাৎ প্রদীপোহন্যাবভাস্যোইপি সন্নাত্মানং ঘটং চ অবভাসয়তি। ১৭

১০৪৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্

দৃষ্টান্তস্য সাধ্যবিকলত্বে পরিহৃতে ব্যভিচারমাশঙ্কতে-নন্বিতি। তদেব ব্যতিরেকমুখেনাহ- ন হীতি। অনৈকান্তিকত্বং নিগময়তি-তস্মাদিতি। প্রদীপস্য পক্ষতুল্যত্বাৎ ন ব্যভিচারোই- স্তীতি পরিহরতি-নাবভাস্যত্বেতি। অথান্যাবভাসকত্বাৎ তস্য নান্যাবভাস্যত্বমিতি চেৎ, ভত্রাহ-যদ্যপীতি। অবভাস্যত্বহেতোরব্যভিচারে ফলিতমাহ-যদা চেতি। ব্যতিরিক্তাব- ভাস্যত্বং বুদ্ধেরিতি শেষঃ। অবভাস্যত্বে সত্যপি প্রদীপে স্বাতিরিক্তেনৈবাবভাস্যত্বমিতি নিয়মা- সিদ্ধের্ব্ব্যভিচারতাদবস্থ্যমিতি শঙ্কতে-নন্বিতি। ১৭

ন; স্বতঃ পরতো বা বিশেষাভাবাৎ,—যথা চৈতন্যাবভাস্যত্বং ঘটস্য, তথা প্রদীপস্যাপি চৈতন্যাবভাস্যত্বমবিশিষ্টম্। যত্তুচ্যতে—প্রদীপ আত্মানং ঘটঞ্চাবভাস- য়তীতি, তদসৎ; কস্মাৎ? যদাত্মানং নাবভাসয়তি, তদা কীদৃশঃ স্যাৎ; নহি তদা প্রদীপস্য স্বতো বা পরতো বা বিশেষঃ কশ্চিদুপলভ্যতে। স হ্যবভাশ্যো ভবতি, যস্যাবভাসক-সন্নিধাবসন্নিধৌ চ বিশেষ উপলভ্যতে; ন হি প্রদীপস্য স্বাত্মসন্নিধিরসন্নিধির্ব্বা শক্যঃ কল্পয়িতুম্; অসতি চ কাদাচিৎকে বিশেষে, আত্মানং প্রদীপঃ প্রকাশয়তীতি মৃষৈবোচ্যতে। ১৮

যদি প্রদীপস্য স্বাবভাসনাৎ পূর্ব্বমসন্বিশেষঃ সমনন্তরকালে স্যাৎ, তদা স্বাত্মানং ভাসয়তীতি বক্তুং যুক্তং, ন চ সোহস্তীতি দুষয়তি—নেত্যাদিনা। তদেব বিবৃণোতি—যথেতি। অবভাস্যতা- বিশেষাদিত্যর্থঃ। প্রদীপে পরোক্তং বিশেষমনুভান্ত্য দূষয়তি—যতত্ত্বিত্যাদিনা। যদা দীপো ন স্বাত্মানং ভাসয়তি, তদানবভাসমানঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—ন হীতি। বিশেষাভাবেহপি দীপস্য স্বেনৈবাবভাস্যত্বং কিং ন স্যাদিতি চেৎ, তত্রাহ—স হীতি। দীপস্য বিশেষান্তরাভাবেহপি স্বাত্মসন্নিধ্যসন্নিধী বিশেষাবিত্যাশঙ্ক্যাহ—ন হীতি। দীপস্য স্বেনান্যেন বা স্বস্মিন্বিশেষাভাবে ফলিতমাহ—অসতীতি। ১৮

চৈতন্যগ্রাহ্যত্বন্তু ঘটাদিভিরবিশিষ্টং প্রদীপস্য। তস্মাদ্বিজ্ঞানস্যাত্মগ্রাহ্যগ্রাহ- কত্বে ন প্রদীপো দৃষ্টান্তঃ। চৈতন্যগ্রাহ্যত্বৎ চ বিজ্ঞানস্য বাহ্যবিষয়ৈরবিশিষ্টম্; চৈতন্যগ্রাহ্যত্বে চ বিজ্ঞানস্য, কিং গ্রাহ্যবিজ্ঞানগ্রাহ্যতৈব? কিং বা গ্রাহকবিজ্ঞান- গ্রাহ্যতা?—ইতি। তত্র সন্দিহ্যমানে বস্তুনি, যোহন্যত্র দৃষ্টো ন্যায়ঃ, স কল্পয়িতুং যুক্তঃ, ন তু দৃষ্টবিপরীতঃ; তথা চ সতি যথা ব্যতিরিক্তেনৈব গ্রাহকেণ বাহ্যানাং প্রদীপানাং গ্রাহ্যত্বং দৃষ্টম্, তথা বিজ্ঞানস্যাপি চৈতন্যগ্রাহ্যত্বাৎ প্রকাশকত্বে সত্যপি প্রদীপবদ্ ব্যতিক্রমচৈতন্যগ্রাহ্যত্বৎ যুক্তং কল্পয়িতুম্, নতু অনন্যগ্রাহ্যত্বম্; যশ্চান্যো বিজ্ঞানস্য গ্রহীতা, স আত্মা জ্যোতিরন্তরং বিজ্ঞানাৎ।

তদানবস্থেতি চেৎ; ন, গ্রাহ্যত্বমাত্রং হি তদ্‌গ্রাহকস্য বস্তুন্তরত্বে লিঙ্গমুক্তং ন্যায়তঃ; ন, বৈকান্ততো গ্রাহকত্বে তদ্‌গ্রাহকান্তরাস্তিত্বে বা কদাচিদপি লিঙ্গং সম্ভবতি; তস্মান্ন তদনবস্থাপ্রসঙ্গঃ। ১৯

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৪৭

ব্যভিচারনিরাসপূর্ব্বকং ভাষ্যত্বানুমানমুপপাদ্যানুমানান্তরমাহ-চৈতন্যেতি। যদ্যঞ্জকং তৎ স্ববিজাতীয়ব্যঙ্গং যথা সূর্য্যাদি, ব্যঞ্জকং চ বিজ্ঞানং, তস্মান্বিজ্ঞানব্যতিরিক্তশ্চিদাত্মা সিধ্যতী- ত্যর্থঃ। প্রদীপস্য ন স্বাবভাস্যত্বং, কিং তু বিজাতীয়চৈতন্যাবভাস্যত্বমিতি স্থিতে ফলিতমাহ- তস্মাদিতি। যদ্ গ্রাহ্যং তদ্‌ গ্রাহকান্তরগ্রাহ্যং যথা দীপঃ, গ্রাহ্যং চেদং বিজ্ঞানমিত্যনুমানান্তর- মাহ-চৈতন্যেতি। তথাপি কথং ত্বদিষ্টগ্রাহকসিদ্ধিরিত্যাশঙ্ক্য বিমৃশতি-চৈতন্যগ্রাহ্যত্বে চেতি। কথং তর্হি নির্ণয়স্তত্রাহ-ইতি তত্র সন্দিহ্যান ইতি। অস্ত লোকানুসারী নিশ্চয়ঃ, লোকস্তু কথমিত্যাশঙ্ক্যাহ-তথা চেতি। তথাপি কুতো বিবক্ষিতাত্মজ্যোতিস্তত্রাহ-যশ্চেতি।

বিজ্ঞানস্য গ্রাহকান্তরগ্রাহত্বে তস্যাপি গ্রাহকান্তরাপেক্ষায়ামনবস্থাপ্রসক্তিরিতি শঙ্কতে- তদাহনবস্থেতি চেদিতি। কুটস্থবোধস্য বিজ্ঞানসাক্ষিণো২বিষয়ত্বান্নানবস্থেতি পরিহরতি- নেতি। যদ্‌গ্রাহ্যং তৎ স্বাতিরিক্তগ্রাহ্যং যথা ঘটাদীতি। গ্রাহ্যত্বমাত্রং বুদ্ধিগ্রাহকস্য ততো বস্তুস্তরত্বে প্রদীপস্য স্বানবভাস্যত্বন্যায়েন লিঙ্গমুক্তং, ন চ বুদ্ধিসাক্ষিণো গ্রাহ্যত্বমস্তি, কূটস্থদৃষ্টি- স্বাভাব্যাৎ, তৎ কুতোহনবস্থেত্যুপপাদয়তি-গ্রাহ্যত্বমাত্রং হীতি। সাক্ষী স্বাতিরিক্তগ্রাহ্যো গ্রাহকত্বাদ বুদ্ধিবদিত্যাশঙ্ক্যাহ-নত্বিতি। গ্রাহকত্বং হি গ্রহণকর্তৃত্বং বা তৎসাক্ষিত্বং বা। আদ্যে বুদ্ধিসাক্ষিণো মুখ্যবৃত্ত্যা গ্রহণকর্তৃত্বে ন কিঞ্চিল্লিঙ্গং সম্ভবতি। দ্বিতীয়ে তস্য গ্রাহকান্তরাস্তিত্বে ন কদাচিদপি প্রমাণমস্তি, তৎ কুতোহনবস্থেত্যর্থঃ। ১৯

বিজ্ঞানস্য ব্যতিরিক্তগ্রাহ্যত্বে করণান্তরাপেক্ষায়ামনবস্থেতি চেৎ; ন, নিয়মা- ভাবাৎ-ন হি সর্ব্বত্রায়ৎ নিয়মো ভবতি; যত্র বস্তুন্তরেণ গৃহ্যতে বস্তুন্তরম্, তত্র গ্রাহ্যগ্রাহকব্যতিরিক্তং করণান্তরং স্যাদিতি নৈকান্তেন নিয়ন্তং শক্যতে, বৈচিত্র্য- দর্শনাৎ। কথম্? ঘটস্তাবৎ স্বাত্মব্যতিরিক্তেনাত্মনা গৃহ্যতে; তত্র প্রদীপাদি- রালোকো গ্রাহ্যগ্রাহকব্যতিরিক্তং করণম্; ন হি প্রদীপাদ্যালোকো ঘটাংশশ্চক্ষু- রংশো বা; ঘটবচ্চক্ষুগ্রাহ্যত্বেহপি প্রদীপস্য, চক্ষুঃপ্রদীপব্যতিরেকেণ ন বাহ্যমালোক- স্থানীয়ং কিঞ্চিৎ করণান্তরমপেক্ষতে; তস্মান্নৈব নিয়ন্তং শক্যতে-যত্র যত্র ব্যতি- রিক্ত-গ্রাহ্যত্বম্, তত্র যত্র করণান্তরং স্যাদেবেতি। তস্মাদ্বিজ্ঞানস্য ব্যতিরিক্ত- গ্রাহকগ্রাহ্যত্বে ন করণদ্বারানবস্থা, নাপি গ্রাহকত্বদ্বারা কদাচিদপ্যুপপাদয়িতুৎ শক্যতে। তস্মাৎ সিদ্ধং বিজ্ঞানব্যতিরিক্তমাত্মজ্যোতিরন্তরমিতি। ২০

গ্রাহকানবস্থাং পরিহৃত্য করণানবস্থামাশঙ্কতে-বিজ্ঞানস্যেতি। তস্য হি গ্রাহ্যত্বে চক্ষুরাদি- স্থানীয়েন করণেন ভবিতব্যং, তস্যাপি গ্রাহ্যত্বেহন্যৎ করণমিত্যনবস্থাং দূষয়তি-ন নিয়মাভাবা- দিতি। নিয়মাভাবং সাধয়তি-নহীত্যাদিনা। বৈচিত্র্যদর্শনমাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকং স্ফুটয়তি- কথমিত্যাদিনা। উভয়ব্যতিরেকং বিশদয়তি-ন হীতি। তথাপি কথং বৈচিত্র্যং, তত্রাহ- ঘটবদিতি। নিয়মাভাবমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। অনবস্থাদ্বয়নিরাকরণং নিগময়তি- তস্মাদ্বিজ্ঞানস্যেতি। বাহ্যার্থবাদিমতনিরাকরণমুপসংহরতি-তস্মাৎ সিদ্ধমিতি। ২০

ননু নাস্ত্যব-বাহোহর্থো ঘটাদিঃ প্রদীপো বা বিজ্ঞানব্যতিরিকঃ; যদি

১০৪৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যদ্ব্যতিরেকেণ নোপলভ্যতে, তৎ তাবন্মাত্রং বস্তু দৃষ্টম্,—যথা স্বপ্নবিজ্ঞানগ্রাহ্যৎ ঘটপটাদি বস্তু স্বপ্নবিজ্ঞানব্যতিরেকেণানুপলম্ভাৎ স্বপ্নঘটপ্রদীপাদেঃ স্বপ্নবিজ্ঞান- মাত্রতাবগম্যতে, তথা জাগরিতেহপি ঘটপ্রদীপাদেজাগ্রদ্বিজ্ঞানব্যতিরেকেণানু- পলম্ভাৎ জাগ্রদ্বিজ্ঞানমাত্রতৈব যুক্তা ভবিতুম্; তস্মান্নাস্তি বাহ্যোহর্থো ঘটপ্রদী- পাদিঃ, বিজ্ঞানমাত্রমেব তু সর্ব্বম্। তত্র যদুক্তৎ, বিজ্ঞানস্য ব্যতিরিক্তাবভাস্যত্বা- দ্বিজ্ঞানব্যতিরিক্তমস্তি জ্যোতিরন্তরং ঘটাদেরিবেতি, তন্মিথ্যা, সর্ব্বস্য বিজ্ঞান- মাত্রত্বে দৃষ্টান্তাভাবাৎ। ২১

বাহ্যার্থবাদিনি ধ্বস্তে বিজ্ঞানবাদী চোদয়তি-নম্বিতি। বাহ্যার্থো বিজ্ঞানাতিরিক্তো নাস্তীত্যত্র প্রমাণমাহ-যন্ধীতি। নোপলভ্যতে চ জাগ্রদ্বস্তু জাগ্রদ্বিজ্ঞানব্যতিরেকেণেতি শেষঃ। দৃষ্টান্তং সমর্থয়তে-স্বপ্নেতি। দাষ্টান্তিকং বিবৃণোতি-তথেতি। উক্তমনুমানমুপ- সংহরতি-তস্মাদিতি। সর্ব্বং বিজ্ঞানমাত্রমিতি স্থিতে ফলিতমাহ-তত্রেতি। কিমিতি তস্য মিথ্যাত্বং, তত্রাহ-সর্ব্বস্যেতি। ২১

ন;—যাবত্তাবদভ্যুপগমাৎ; ন তু বাহ্যোহর্থো ভবতৈকান্তেনৈব নাভ্যুপ- গম্যতে। ননু ময়া নাভ্যুপগম্যত এব; ন, বিজ্ঞানং ঘটঃ প্রদীপ ইতি চ শব্দার্থ- পৃথক্তাৎ যাবৎ তাবদপি বাহ্যমর্থান্তরমভ্যুপগন্তব্যম্। বিজ্ঞানাদর্থান্তরং বস্তু ন চেদভ্যুপগম্যতে, বিজ্ঞানং ঘটঃ পট ইত্যেবমাদানাৎ শব্দানামেকার্থত্বে পর্যায়শব্দত্বং প্রাপ্নোতি; তথা সাধনানাং ফলস্য চৈকত্বে সাধ্যসাধনভেদোপদেশশাস্ত্রানর্থক্য- প্রসঙ্গঃ, তৎকর্ত্তুরজ্ঞানপ্রসঙ্গো বা। ২২

বাহ্যার্থাপলাপবাদিনং দুষয়তি-নেত্যাদিনা। হেতুং বিশদয়তি-নত্বিতি। বিজ্ঞানমাত্র- বাদিত্বাদেকান্তেন বাহ্যার্থানভ্যুপগতিরিতি শঙ্কতে-নম্বিতি। বাহ্যার্থং হঠাদঙ্গীকারয়তি- নেত্যাদিনা। অন্বয়মুখেনোক্তমর্থং ব্যতিরেকমুখেন বিশদয়তি-বিজ্ঞানাদিতি। জ্ঞান- জ্ঞেয়য়োরৈক্যে দোষান্তরমাহ-তথেতি। অনর্থকং শাস্ত্রমুপদিশতো বুদ্ধস্য সর্বজ্ঞত্বং ন স্যাদিত্যাহ-তৎকর্ত্তুরিতি। বাশব্দশ্চার্থঃ। ২২

কিঞ্চান্যৎ, বিজ্ঞানব্যতিরেকেণ বাদিপ্রতিবাদি-বাদদোষাভ্যুপগমাৎ। ন হি আত্মবিজ্ঞানমাত্রমেব বাদিপ্রতিবাদিবাদঃ, তদ্দোষো বা অভ্যুপগম্যতে, নিরা- কর্তব্যত্বাৎ প্রতিবাদ্যাদীনাম্; ন হি আত্মীয়ং বিজ্ঞানং নিরাকর্তব্যমভ্যুপগম্যতে, স্বয়ং বাত্মা কস্যচিৎ; তথা চ সতি সর্ব্বসংব্যবহারলোপপ্রসঙ্গঃ। ন চ প্রতি- বাদ্যাদয়ঃ স্বাত্মনৈব গৃহ্যন্তে-ইত্যভ্যুপগমঃ; ব্যতিরিক্তগ্রাহ্যা হি তে অভ্যুপ- গম্যন্তে; তস্মাৎ তদ্বৎ সর্ব্বমেব ব্যতিরিক্তগ্রাহ্যং বস্তু, জাগ্রদ্বিষয়ত্বাৎ, জাগ্রদ্বস্তু- প্রতিবাদ্যাদিবদিতি সুলভো দৃষ্টান্তঃ-সন্তত্যন্তরবৎ, বিজ্ঞানান্তরবচ্চেতি। তস্মা- দ্বিজ্ঞানবাদিনাপি ন শক্যৎ বিজ্ঞানব্যতিরিক্তং জ্যোতিরন্তরং নিরাকর্তুম্। ২৩

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৪৯

ইতশ্চ সর্ব্বস্থ্য নাস্তি বিজ্ঞানমাত্রত্বমিত্যাহ-কিঞ্চান্যদিতি। ন কেবলং পূর্ব্বোক্তোপপত্তি- বশাদেব বাহ্যার্থোহভ্যুপেয়ঃ, কিন্তু তত্রৈবাহ্যদপি কারণমুচ্যুত ইতি যাবৎ। তদেব স্ফুটয়তি- বিজ্ঞানেতি। যদ্গ্রাহ্যং তৎ স্বব্যতিরিক্তগ্রাহ্যং, যথা প্রতিবাদ্যাদি, জাগ্রন্বস্ত চেদং গ্রাহ্যমিত্যনু- মানান্ন বাহ্যার্থাপলাপসিদ্ধিরিত্যর্থঃ। দৃষ্টান্তে বিপ্রতিপত্তিং প্রত্যাহ-ন হীতি। নিরাকর্তব্যত্বে- হপি ভেষাং জ্ঞানমাত্রত্বং কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাত্মীয়জ্ঞানত্বমাত্মজ্ঞানত্বং বা তেষামিতি বিকল্প্য ক্রমেণ দূষয়তি-নহীত্যাদিনা। স্বকীয়নিষেধে স্বনিষেধে চানিষ্টাপত্তিমাচষ্টে-তথাচেতি। ত্বদঙ্গীকারালোচনায়ামপি প্রতিবাদাদীনাং বিজ্ঞানাতিরেকঃ সেৎস্যতীত্যাহ-নচেতি। অন্যথা বিবাদাভাবাতাদিতি ভাবঃ। কথং তর্হি তেষামঙ্গীকারস্তত্রাহ-ব্যতিরিক্তেতি। সিদ্ধে দৃষ্টান্তে ফলিতমনুমানং নিগময়তি-তন্মাদিতি। কিঞ্চ, চৈত্রসন্তানেন মৈত্রসন্তানো ব্যবহারাদনু- মীয়তে, সর্বজ্ঞজ্ঞানেন চাসর্বজ্ঞজ্ঞানানি জ্ঞায়ন্তে, তত্র ভেদস্য তেহপি সিদ্ধেস্তদৃষ্টান্তান্নীলা- দেস্তদ্ধিয়শ্চ ভেদঃ শক্যোহনুমাতুমিত্যাহ-সন্তত্যন্তরবদিতি। ইতি ন বাহ্যার্থাপলাপসিদ্ধিরিতি শেষঃ। তদপলাপাসম্ভবে ফলিতমাহ-তন্মাদিতি। ২৩

স্বপ্নে বিজ্ঞানব্যতিরেকাভাবাদযুক্তমিতি চেৎ; ন, অভাবাদপি ভাবস্য বস্ত্বন্তরত্বোপপত্তেঃ,—ভবতৈব তাবৎ স্বপ্নে ঘটাদিবিজ্ঞানস্য ভাবভূতত্বমভ্যুপগতম্; তদভ্যুপগম্য তদ্ব্যতিরেকেণ ঘটাদ্যভাব উচ্যতে; স বিজ্ঞানবিষয়ো ঘটাদিঃ যদ্যভাবো যদি বা ভাবঃ স্যাৎ, উভয়থাপি ঘটাদিবিজ্ঞানস্য ভাবভূতত্বমভ্যুপ- গতমেব; ন তু তন্নিবর্ত্তয়িতুং শক্যতে, তন্নিবর্ত্তকন্যায়াভাবাৎ। এতেন সর্ব্বস্য শূন্যতা প্রত্যুক্তা; প্রত্যগাত্মগ্রাহ্যতা চাত্মনোহহমিতি মীমাংসকপক্ষঃ প্রত্যুক্তঃ। ২৪

বিজ্ঞানাদর্থভেদোক্ত্যা প্রত্যগাত্মা বিজ্ঞানাতিরিক্ত উক্তঃ। সম্প্রতি বিমতং ন জ্ঞানভিন্নং গ্রাহ্যত্বাৎ স্বপ্নগ্রাহ্যবদিত্যুক্তমনুবদতি-স্বপ্ন ইতি। অযুক্তং বিজ্ঞানাতারিক্তত্বমর্থস্যেতি শেষঃ। দৃষ্টান্তস্থ্য সাধ্যবিকলতামভিপ্রেত্য পরিহরতি-নাভাবাদপীতি। সংগ্রহবাক্যং বিবৃণোতি- ভবতৈবেতি। বাহ্যার্থবাদিভ্যো বিশেষমাহ-তদভ্যুপগম্যেতি। তথাপি কথং দৃষ্টান্তস্য সাধ্যবিকলতেত্যাশঙ্ক্যাহ-স ইতি। ঘটাদিবিজ্ঞানস্য ভাবভূতস্যাভ্যুপগতস্য ঘটাদের্ভাবাদ- ভাবাদ্বা বিষয়াদর্থান্তরত্বাদ কস্যচিদ্বাহ্যার্থস্যোপগমাদ দৃষ্টান্তস্য সাধ্যবিকলতা সুপ্রসিদ্ধেত্যর্থঃ। মাধ্যমিকমতমতিদেশেন নিরাকরোতি-এতেনেতি। জ্ঞানজ্ঞেয়য়োনিরাকর্তুমশক্যত্ববচনেনেতি যাবৎ। আত্মনো গ্রাহ্যন্যাহমিতি প্রত্যগাত্মনৈব গ্রাহ্যতেতি মীমাংসকমতমপি প্রত্যুক্তম্, একস্যৈব গ্রাহ্যগ্রাহকতায়া নিরস্তত্বাদিত্যাহ-প্রত্যগাত্মেতি। ২৪

যতূক্তম্, সালোকোহন্যশ্চান্যশ ঘটো জায়ত ইতি; তদসৎ, ক্ষণান্তরেহপি ‘স এবায়ম্’ ইতি প্রত্যভিজ্ঞানাৎ। সাদৃশ্যাৎ প্রত্যভিজ্ঞানং, কৃতোত্থিত-কেশনখাদি- ঘিবেতি চেৎ; ন, তত্রাপি ক্ষণিকত্বস্যাসিদ্ধত্বাৎ জাত্যেকত্বাচ্চ। কৃতেষু পুন- রুখিতেষু চ কেশনখাদিযু কেশনখত্বজাতেরেকত্বাৎ কেশ-নখত্বপ্রত্যয়স্তন্নিমিত্তো-

১০৫০, বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হভ্রান্ত এব; নহি দৃশ্যমান-লুনোখিতকেশনখাদিষু ব্যক্তিনিমিত্তঃ স এবেতি প্রত্যয়ো ভবতি কস্যচিৎ, দীর্ঘকালব্যবহিতদৃষ্টেষু চ তুল্যপরিমাণেষু তৎকালীন- বালাদিতুল্যা ইমে কেশ-নখাদ্যা ইতি প্রত্যয়ো ভবতি, নতু ত এবেতি; ঘটাদিষু পুনর্ভবতি স এবেতি প্রত্যয়ঃ; তস্মান্ন সমো দৃষ্টান্তঃ। ২৫

ক্ষণভঙ্গবাদিনোক্তমনুদ্য প্রত্যভিজ্ঞাবিরোধেন নিরাকরোতি-যভুক্তমিত্যাদিনা। স্বপক্ষে- হপি প্রত্যভিজ্ঞোপপত্তিং শাক্যঃ শঙ্কতে-সাদৃশ্যাদিতি। দৃষ্টান্তং বিঘটয়ন্নুত্তরমাহ-ন তত্রাপীতি। তথাপি কথং তত্র প্রত্যভিজ্ঞেত্যাশঙ্ক্যাহ-জাতীতি। তন্নিমিত্তা তেষু প্রত্যভিজ্ঞেতি শেষঃ। তদেব প্রপঞ্চয়তি-কৃত্তেষিতি। অভ্রান্ত ইতি চ্ছেদঃ। কিমিতি জাতিনিমিত্তৈষা ধীর্ব্যক্তিনিমিত্তা কিং ন স্যাদ, অত আহ-নহীতি। ননু সাদৃগ্যবশাদ ব্যক্তিমেব বিষয়ীকৃত্য প্রত্যভিজ্ঞানং কেশাদিষু কিং ন স্যাত্তত্রাহ-কস্যচিদিতি। অভ্রান্তস্যেতি যাবৎ। দাষ্টান্তিকে বৈষম্যমাহ- ঘটাদিধিতি। বৈষম্যমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ২৫

প্রত্যক্ষেণ হি প্রত্যভিজ্ঞায়মানে বস্তুনি তদেবেতি, ন চান্যত্বমনুমাতুং যুক্তম্, প্রত্যক্ষবিরোধে লিঙ্গস্যাভাসোপপত্তেঃ; সাদৃশ্যপ্রত্যয়ানুপপত্তেশ্চ, জ্ঞানস্য ক্ষণি- কত্বাৎ; একস্য হি বস্তুদর্শিনো বস্ত্বন্তরদর্শনে সাদৃশ্যপ্রত্যয়ঃ স্যাৎ, ন তু বস্তুদর্য্যেকো বস্ত্বন্তরদর্শনায় ক্ষণান্তরমবতিষ্ঠতে, বিজ্ঞানস্য ক্ষণিকত্বাৎ সকদ্বস্তুদর্শনেনৈব ক্ষয়োপপত্তেঃ। তেনেদং সদৃশমিতি হি সাদৃশ্যপ্রত্যয়ো ভবতি; তেনেতি দৃষ্ট- স্মরণৎ, ইদমিতি বর্তমানপ্রত্যয়ঃ; তেনেতি দৃষ্টং স্মৃত্বা যাবদিদমিতি বর্তমান- ক্ষণকালমবতিষ্ঠেত, ততঃ ক্ষণিকবাদহানিঃ। ২৬

যৎ সত্তৎ ক্ষণিকং, যথা প্রদীপাদি, সন্তশ্চামী ভাবাঃ, ইত্যনুমানবিরোধাদ ভ্রান্তং প্রত্যভিজ্ঞান- মিত্যাশঙ্ক্যাহ—প্রত্যক্ষেণেতি। অনুক্ততানুমানবৎ প্রত্যক্ষবিরোধে ক্ষণিকত্বানুমানং নোদেত্য- বাধিতবিষয়স্য্যাপ্যনুমিত্যঙ্গত্বাদিতি ভাবঃ। ইতশ্চ প্রত্যভিজ্ঞানং সাদৃশ্যনিবন্ধনো ভ্রমো ন ভবতীত্যাহ—সাদৃশ্যেতি। তদনুপপত্তৌ হেতুমাহ—জ্ঞানস্যেতি। তস্য ক্ষণিকত্বেইপি কিমিতি সাদৃশ্যপ্রত্যয়ো ন সিধ্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ—একস্যেতি। অস্তু তর্হি বস্তুদ্বয়দর্শিত্বমেকস্যেতি চেৎ, ইত্যাহ—ন ত্বিতি। উক্তমেবার্থং প্রপঞ্চয়তি—তেনেত্যাদিনা। ভবতু, কিং তাবতেতি, তত্রাহ— তেনেতি দৃষ্টমিতি। অবতিষ্ঠেত যদীতি শেষঃ। ২৬

অথ তেনেত্যেবোপক্ষীণঃ স্মার্ত্তঃ প্রত্যয়ঃ, ইদমিতি চান্য এব বার্তমানিকঃ প্রত্যয়ঃ ক্ষীয়তে; ততঃ সাদৃশ্যপ্রত্যয়ানুপপত্তিঃ-তেনেদং সদৃশমিতি, অনেকদর্শিন একস্যাভাবাৎ। ব্যপদেশানুপপত্তিশ্চ-দ্রষ্টব্যদর্শনেনৈবোপক্ষয়াদ্বিজ্ঞানস্যেদং পশ্যা- ম্যদোহদ্রাক্ষমিতি ব্যপদেশানুপপত্তিঃ, দৃষ্টবতো ব্যপদেশক্ষণানবস্থানাৎ। অথাব- তিষ্ঠেত; ক্ষণিকবাদহানিঃ। অথাদৃষ্টবতো ব্যপদেশঃ সাদৃশ্যপ্রত্যয়শ্চ, তদানীং জাত্যন্ধস্যের রূপবিশেষব্যপদেশস্তৎসাদৃশ্যপ্রত্যয়শ্চ; সর্ব্বমন্ধপরস্পরেতি প্রসজ্যেত

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৫১

সর্ব্বজ্ঞশাস্ত্রপ্রণয়নাদি; নচৈতদিষ্যতে। অকৃতাভ্যাগম-কৃতবিপ্রণাশদোষৌ তু প্রসিদ্ধতরৌ ক্ষণবাদে। ২৭

ক্ষণিকত্বহানিপরিহারং শঙ্কিত্বা পরিহরতি-অথেত্যাদিনা। তত্র হেতুমাহ-অনেকেতি। পরপক্ষে দোষান্তরমাহ-ব্যপদেশেতি। তদেব বিবৃণোতি-ইদমিতি। ব্যপদেশক্ষণেহন- বস্থানাসিদ্ধিং শঙ্কিত্বা দূষয়তি-অথেত্যাদিনা। অন্যো দ্রষ্টান্যশ্চ বাপদেষ্টেত্যাশঙ্ক্য-পরি- হরতি-অথেত্যাদিনা। শাস্ত্রপ্রণয়নাদীত্যাদিশব্দেন শাস্ত্রীয়ং সাধ্যসাধনাদি গৃহ্যতে। ক্ষণিকত্বপক্ষে দূষণান্তরমাহ-অকৃতেতি। ২৭

দৃষ্টব্যপদেশহেতুঃ পূর্ব্বোত্তরসহিত এক এব হি শৃঙ্খলাবৎ প্রত্যয়ো জায়ত- ইতি চেৎ, তেনেদং সদৃশমিতি চ; ন, বর্তমানাতীতয়োভিন্নকালত্বাৎ; তত্র বর্তমানপ্রত্যয় একঃ শৃঙ্খলাবয়বস্থানীয়োহতীতশ্চাপরঃ, তৌ প্রত্যয়ৌ ভিন্নকালৌ তদুভয়প্রত্যয়বিষয়স্পৃক্ চেৎ শৃঙ্খলাপ্রত্যয়ঃ, ততঃ ক্ষণদ্বয়ব্যাপিত্বাদেকস্য বিজ্ঞানস্য পুনঃ ক্ষণবাদহানিঃ। মম-তবতাদিবিশেষানুপপত্তেশ সর্ব্বসংব্যবহারলোপ- প্রসঙ্গঃ। ২৮

ব্যপদেশানুপপত্তিমুক্তাং সমাদধানঃ শঙ্কতে—দৃষ্টেতি। সাদৃশ্যপ্রত্যয়শ্চ শৃঙ্খলাস্থানীয়েন প্রত্যয়েনৈব সেৎস্যতীত্যাহ—তেনেদমিতি। অপসিদ্ধান্তপ্রসক্ত্যা প্রত্যাচষ্টে—নেত্যাদিনা। তাবেবোভৌ যৌ প্রত্যয়ৌ বিষয়ৌ তদবগাহী চেন্মধ্যবর্তী শৃঙ্খলাবয়বস্থানীযঃ প্রত্যয় ইতি যাবৎ। ক্ষণানাং মিথঃ সম্বন্ধস্তহি মা ভূদিতি চেত্তত্রাহ—মমেতি। ব্যপদেশসাদৃশ্যপ্রত্যয়ানুপপত্তিস্তু স্থিতৈবেতি চকারার্থঃ। ২৮

সর্ব্বস্য চ স্বসংবেদ্যবিজ্ঞানমাত্রত্বে বিজ্ঞানস্য চ স্বচ্ছাববোধাবভাসমাত্রস্বাভা- ব্যাভ্যুপগমাৎ, ‘তদ্দর্শিনশ্চান্যস্যাভাবেহনিত্যদুঃখশূন্যানাত্মত্বাদনেককল্পনানুপপত্তিঃ। নচ দাড়িমাদেরিব বিরুদ্ধানেকাংশবত্ত্বং বিজ্ঞানস্য, স্বচ্ছাবভাসস্বাভাব্যাদ বিজ্ঞানস্য। অনিত্যদুঃখাদীনাং বিজ্ঞানাংশত্বে চ সতি অনুভূয়মানত্বাদ ব্যতিরিক্তবিষয়ত্ব- প্রসঙ্গঃ। অথানিত্যদুঃখাদ্যাত্মৈকত্বমেব বিজ্ঞানস্য, তদা তদ্বিয়োগাদ্বিশুদ্ধি- কল্পনানুপপত্তিঃ; সংযোগিমলবিয়োগাদ্ধি বিশুদ্ধির্ভবতি, যথা আদর্শপ্রভৃতীনাম্; ন তু স্বাভাবিকেন ধর্ম্মেণ কস্যচিদ্ বিয়োগো দৃষ্টঃ; নহি অগ্নেঃ স্বাভাবিকেন প্রকাশেনৌষ্ণ্যেন বা বিয়োগো দৃষ্টঃ। যদপি পুষ্পগুণানাং রক্তত্বাদীনাং দ্রব্যা- ন্তরযোগেন বিযোজনং দৃশ্যতে, তত্রাপি সংযোগপূর্ব্বত্বমনুমীয়তে, বীজভাবনয়া পুষ্পফলাদীনাং গুণান্তরোৎপত্তিদর্শনাৎ; অতো বিজ্ঞানস্য বিশুদ্ধিকল্পনানু- পপত্তিঃ। ২৯

যৎ তু বিজ্ঞানস্য দুঃখাদ্যপপ্লুতত্বং, তদ্‌দূষয়তি-সর্ব্বস্থ্য চেতি। শুদ্ধত্বাত্তৎসংসর্গদ্রষ্ট্রভাবাচ্চ ন জ্ঞানস্য দুঃখাদিসংপ্লবঃ, স্বসম্বেদ্যত্বাঙ্গীকারাদিত্যর্থঃ। জ্ঞানস্য শুদ্ধবোধৈকস্বাভাব্যমসিদ্ধং

১০৫২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

দাড়িমাদিবন্নানাবিধদুঃখাদ্যংশবত্ত্বাশ্রয়ণাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। তত্রৈব হেত্বন্তরমাহ- অনিত্যেতি। তেষাং তদ্ধর্ম্মত্বে সত্যনুভূয়মানত্বাৎ ততোহতিরিক্তত্বং স্যাৎ, ধর্মাণাং ধর্ম্মমাত্রত্বা- ভাবান্মেয়ানাং চ মানাদর্থান্তরত্বাদতো যন্মেয়ং ন তজ্ঞানাংশো যথা ঘটাদি, মেয়ং চ দুঃখাদী- ত্যর্থঃ। জ্ঞানস্য দুঃখাদি ধর্ম্মো ন ভবতি, কিন্তু স্বরূপমেবেতি শঙ্কামনুভাষ্য দোষমাহ- অথেত্যাদিনা। অনুপপত্তিমেব প্রকটয়তি-সংযোগীত্যাদিনা। স্বাভাবিকস্যাপি বিয়োগো- হস্তি, পুষ্পরক্তত্বাদীনাং তথোপলম্ভাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-যদপীতি। দ্রব্যান্তরশব্দেন পুষ্পসম্বন্ধিনোহ- বয়বাস্তদ্গতরক্তত্বাদ্যারম্ভকা বিবক্ষিতাঃ। বিমতং সংযোগপূর্ব্বকং বিভাগবত্ত্বাম্লেযাদিবদিভ্যমু- মানাৎ ন স্বাভাবিকস্য সতি বস্তুনি নাশোহস্তীত্যর্থঃ। অনুমানানুগুণং প্রত্যক্ষং দর্শয়তি- বীজেতি। কার্পাসাদিবীজে দ্রব্যবিশেষসম্পর্কাদ্রক্তাদিবাসনয়া তৎপুষ্পাদীনাং রক্তাদিগুণো- দয়োপলম্ভাৎ তৎসংযোগিদ্রব্যাপগমাদেব তৎপুষ্পাদিষু রক্তত্বাদ্যপগভিরিত্যর্থঃ। বিশুদ্ধ্যনুপ- পত্তিমুপসংহরতি-অত ইতি। ২৯

বিষয়বিষয্যাভাসত্বঞ্চ যন্মলং পরিকল্প্যতে বিজ্ঞানস্য, তদপ্যন্যসংসর্গাভাবা- দনুপপন্নম্; নহি অবিদ্যমানেন বিদ্যমানস্য সংসর্গঃ স্যাৎ; অসতি চান্যসংসর্গে, যো ধর্ম্মো যস্য দৃষ্টঃ, স তৎস্বভাবত্বান্ন তেন বিয়োগমর্হতি, যথাগ্নেরৌষ্ণ্যম্, সবি- তুর্ব্বা প্রভা। তস্মাদনিত্যসংসর্গেণ মলিনত্বং তদ্বিশুদ্ধিশ্চ বিজ্ঞানস্যেতীয়ৎ কল্পনা অন্ধপরস্পরৈব প্রমাণশূন্যেত্যবগম্যতে। ৩০

কল্পনান্তরমনুদ্য দূষয়তি—বিষয়বিষয়ীতি। কথং পুনজ্ঞানস্যান্যেন সংসর্গাভাবঃ, তস্য বিষয়েণ সংসর্গাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—নহীতি। অথান্যসংসর্গমন্তরেণাপি জ্ঞানস্য বিষয়বিষয্যাভাসত্বমলং স্যাদিতি চেৎ, তত্রাহ—অসতি চেতি। কল্পনাদ্বয়মপ্রামাণিকমনাদেয়মিত্যুপসংহরতি তস্মাদিতি। ৩০

যদপি তস্য বিজ্ঞানস্য নির্ব্বাণং পুরুষার্থং কল্পয়ন্তি, তত্রাপি ফলাশ্রয়ানু- পপত্তিঃ; কণ্টকবিদ্ধস্য হি কণ্টকবেধজনিতদুঃখনিবৃত্তিঃ ফলং, ন তু কণ্টক- বিদ্ধমরণে তদুঃখনিবৃত্তিফলস্যাশ্রয় উপপদ্যতে; তদ্বৎ সর্ব্বনির্ব্বাণে, অসতি চ ফলাশ্রয়ে, পুরুষার্থকল্পনা ব্যর্থৈব। যস্য হি পুরুষশব্দবাচ্যস্য সত্ত্বস্যাত্মনো বিজ্ঞানস্য চার্থঃ পরিকল্প্যতে, তস্য পুনঃ পুরুষস্য নির্ব্বাণে, কস্যার্থঃ পুরুষার্থ ইতি স্যাৎ। যস্য পুনরস্ত্যনেকার্থদর্শী বিজ্ঞানব্যতিরিক্ত আত্মা, তস্য দৃষ্টস্মরণদুঃখসংযোগ- বিয়োগাদি সর্ব্বমেবোপপন্নম্, অন্যসংযোগনিমিত্তং কালুষ্যং, তদ্বিয়োগনিমিত্তা চ বিশুদ্ধিরিতি। শূন্যবাদিপক্ষস্তু সর্ব্বপ্রমাণবিপ্রতিষিদ্ধ ইতি তন্নিরাকরণায় নাদরঃ ক্রিয়তে ॥২৫৮৷৷৭৷৷

কল্পনান্তরমুখাপয়তি—যদপীতি। উপশান্তিনির্ব্বাণশব্দার্থঃ। দুষয়তি—তত্রাপীতি। ফল্য- ভাবেহপি ফলং স্যাদিতি চেৎ, নেত্যাহ—কণ্টকেতি। দাষ্টান্তিকং বিবৃণোতি—যস্য হীতি। ননু ত্বন্মতেহপি বস্তুনোহদ্বয়ত্বাত্তস্যাসঙ্গস্থ্য কেনচিদিপি সংযোগবিয়োগরোরযোগাৎ ফলিত্বাসম্ভকে

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৫৩

মোক্ষাসম্ভবাদি তুল্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যস্য পুনরিতি। যদ্যপি পূর্ণং বস্তু বস্তুতোহসঙ্গমঙ্গীক্রিয়তে, তথাপি ক্রিয়াকারকফলভেদস্যাবিদ্যামাত্রকৃতত্বাদস্মন্মতে সর্ব্বব্যবহারসম্ভবাৎ ন সাম্যমিতি ভাবঃ। ননু বাহ্যার্থবাদো বিজ্ঞানবাদশ্চ নিরাকৃতৌ, শূন্যবাদো নিরাকর্তব্যোহপি কস্মান্ন নিরাক্রিয়তে, তত্রাহ-শূন্যবাদীতি। সমস্তস্য বস্তুনঃ সত্ত্বেন ভানাৎ মানানাং চ সর্বেষাং সদ্বিষয়ত্বাৎ শূন্যস্য চাবিষয়তয়া প্রাপ্ত্যভাবেন নিরাকরণানইত্বাৎ, অদ্বিষয়ত্বে চ শূন্যবাদিনৈব বিষয়- নিরাকরণোক্ত্যা শূন্যস্যাপহ্নবাৎ, তস্য চ স্ফুরণাস্ফুরণয়োঃ সর্ব্বশূন্যত্বাযোগাত্তদ্বাদিনশ্চ সত্ত্বাসত্ত্বয়ো- স্তদনুপপত্তেঃ, সংবৃতেশ্চাশ্রয়াভাবাদসম্ভবাত্তদাশ্রয়ত্বে চ শূন্যস্য স্বরূপহানান্নিরাশ্রয়ত্বে চাসংবৃতি- ত্বান্নাস্মাভিস্তদ্বাদনিরাসায়াদরঃ ক্রিয়তে, তৎ সিদ্ধং বুদ্ধ্যাদ্যতিরিক্তং নিত্যসিদ্ধমত্যন্তশুদ্ধং কুটস্থ- মন্বয়মাত্মজোতিরিতি ভাবঃ। ২৫৮। ৭।

ভাষ্যানুবাদ:-ইতঃপূর্ব্বে যেসমস্ত কথা বলা হইয়াছে, তাহাতে, যদিও আত্মার দেহাতিরিক্ততা সিদ্ধ হইয়াছে সত্য, তথাপি জগতে যখন সমান- জাতীয় পদার্থসমূহের মধ্যেই অনুগ্রাহ্য-অনুগ্রাহকভাব দৃষ্ট হয়, তখন সহজেই ভ্রম উপস্থিত হইতে পারে যে, উক্ত আত্মা কি চক্ষুঃপ্রভৃতি করণবর্গেরই অন্যতম (একটি)? অথবা ভিন্ন? ইহা স্থির করিতে না পারিয়া জনক মহারাজ জিজ্ঞাসা করিতেছেন-‘কতমঃ’ইতি। সুক্ষ্মতানিবন্ধন বিষয়টি সহজ বুদ্ধিগম্য নয়; এই কারণে এ বিষয়ে ভ্রম হওয়া সম্ভবপরই বটে। অথবা, আত্মা দেহ হইতে পৃথক্, ইহা প্রমাণিত হইলেও, চক্ষুঃপ্রভৃতি সমস্ত ‘করণ’ই যেন চৈতন্য- সম্পন্ন বলিয়াই প্রতীত হইয়া থাকে, অথচ সে সমুদয় হইতে আত্মার বিবেক বা পার্থক্যও বুঝিতে পারা যায় না; এই জন্য, অর্থাৎ এই সংশয় দূরীকরণের নিমিত্ত আমি(জনক) জিজ্ঞাসা করিতেছি-“কতম আত্মা” ইতি। তুমি যে আত্মার কথা বলিয়াছ,[জিজ্ঞাসা করি-] দেহ, ইন্দ্রিয়, প্রাণ ও মন-ইহাদের মধ্যে সেই জ্যোতির্ময় আত্মা কোন্টি?-যে জ্যোতির সাহায্যে পুরুষ স্ব স্ব ব্যবহার নিষ্পাদন করিয়া থাকে-বলা হইয়াছে। ১

অথবা, তুমি এই যে আত্মাকে বিজ্ঞানময় বলিয়া মনে করিয়াছ;—অভিপ্রায় এই যে, যেমন বলা হইয়া থাকে—‘এখানে যে সমুদয় ব্রাহ্মণ উপস্থিত আছেন, ইঁহারা সকলেই তেজস্বী; ইঁহাদের মধ্যে ষড়ঙ্গবিদ্(১) ব্রাহ্মণ কোন্টী’? সেই-

১০৫৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রূপ চক্ষুঃকর্ণপ্রভৃতি সমস্ত ইন্দ্রিয়ই যেন বিজ্ঞানময় বলিয়া প্রতীত হইতেছে; ইহাদের মধ্যে তুমি যাহাকে এই বিজ্ঞানময় আত্মা বলিয়া অভিপ্রায় প্রকাশ করিয়াছ, সেই বিজ্ঞানময় আত্মা কোন্টি? পূর্ব্বোক্ত ব্যাখ্যাতে ‘কতম আত্মা’ এইটুকু মাত্র প্রশ্নবাক্য; ‘যোহয়ং বিজ্ঞানময়ঃ’ ইত্যাদি বাক্য তাহার প্রতিবচন বা উত্তরাংশ; দ্বিতীয় ব্যাখ্যায় ‘বিজ্ঞানময়ঃ প্রাণেষু’ এই পর্যন্তই প্রশ্নবাক্য বুঝিতে হইবে(১)। অথবা, ‘কতমঃ’ হইতে ‘হৃদ্যন্তজ্যোতিঃ পুরুষঃ’ এই পর্যন্ত সমস্তটাই প্রশ্নবাক্য। যাহার স্বরূপগত বিশেষত্ব অবধারিত আছে, ‘যোহয়ৎ বিজ্ঞানময়ঃ’ কথায় তাহাই প্রতিপাদিত হইয়াছে। এই শব্দার্থ সম্বন্ধ এবং প্রশ্নবাক্যের পরিসমাপ্তিসূচক ‘কতম আত্মা ইতি’ এই ‘ইতি’ শব্দেরও অব্যবধানে সম্বন্ধ হওয়াই যুক্তিযুক্ত। এইজন্য বেশ বুঝা যাইতেছে যে, ‘কতম আত্মা’ এই পর্য্যন্তই প্রশ্নবাক্য, আর পরবর্তী ‘যোহয়ম্’ ইত্যাদি সমস্তটাই তাহার উত্তর বাক্য। ২

আত্মা প্রত্যক্ষসিদ্ধ; এই জন্য প্রত্যক্ষবোধক ‘অয়ং’ শব্দে তাহার নির্দেশ করা হইয়াছে। ‘বিজ্ঞানময়’ অর্থ-বিজ্ঞানপ্রায়(বিজ্ঞানপ্রচুর); রাহু যেরূপ চন্দ্র ও সূর্য্যের সহিত সম্বদ্ধ হইয়া লোকলোচনগোচর হয়, তদ্রূপ বিজ্ঞানময় আত্মাও বুদ্ধি-বিজ্ঞানরূপ উপাধির সহিত অবিবেকবশতঃ বা পার্থক্যবোধ না থাকায়, যেন বুদ্ধিময় বলিয়াই প্রতীত হয়, সেই হেতু বুদ্ধিবিজ্ঞানসমন্বিত আত্মা ‘বিজ্ঞানময়’ বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। অন্ধকারে সম্মুখস্থ প্রদীপ যেরূপ সর্ব্ববস্তুর প্রকাশক হয়, তদ্রূপ বুদ্ধিও আত্মার সমস্ত বিষয়-প্রতীতির প্রধান সহায় হয়। শ্রুতিও বলিয়াছেন-‘মনের দ্বারাই দর্শন করে, মনের দ্বারাই শ্রবণ করে’ ইত্যাদি। অন্ধকার মধ্যে দর্শনযোগ্য যত কিছু বিষয় থাকে, সে সমস্তই যেমন সম্মু- খস্থ প্রদীপালোকে সমুদ্ভাসিত হইয়া যায়, তেমনি দৃশ্য বিষয়মাত্রই বুদ্ধিবিজ্ঞানের

(১) তাৎপর্য্য—আত্মা স্বভাবতঃ নির্গুণ, নিষ্ক্রিয় ও নির্বিকার; সুতরাং তাহাতে সুখ দুঃখ, ধ্যান ধারণা কিংবা গমনাগমন কিছুই থাকিতে পারে না; অথচ সকলেই আত্মার এই সমস্ত অবস্থা অনুভব করিয়া থাকে। ইহার কারণ কি? ইহার কারণ অবিবেক—অগ্নি সংযোগে লৌহ যেরূপ অগ্নিময় হইয়া যায়, লৌহের দাহশক্তি না থাকিলেও—তদবস্থায় “অয়ো দহতি” লৌহ দগ্ধ করিতেছে, এইরূপ প্রয়োগ করা হয়, ঠিক তেমনি সুখদুঃখসম্পন্ন ও ক্রিয়া- শালিনী বুদ্ধির সহিত দীর্ঘকালব্যাপী ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে সম্বন্ধ হইয়া বিশুদ্ধ আত্মাও বিজ্ঞানাত্মক বুদ্ধির ধর্ম্মে অনুরঞ্জিত হইয়া বুদ্ধির মতই প্রতিভাসমান হয়; এই জন্য আত্মাকে ‘বিজ্ঞানময়’ শব্দে নির্দেশ করা হইয়াছে।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।
১০৫

আলোক সহযোগেই দৃষ্টিগোচর হইয়া থাকে; অতএব বুঝিতে হইবে যে, দর্শন ব্যাপারে বুদ্ধিই প্রধান, অপরাপর ইন্দ্রিয়সমূহ তাহার দ্বার বা সহায় মাত্র। এই জন্য সেই বুদ্ধি দ্বারাই আত্মাকে বিশেষিত করিয়া বলা হইয়াছে—“বিজ্ঞানময়” ইতি। ৩

যাঁহারা ব্যাখ্যা করেন যে, ‘বিজ্ঞানময়’ অর্থ-পরমাত্মবিষয়ক বিজ্ঞানের বিকার; তাঁহাদের ঐরূপ অর্থ যে, শ্রুতিসম্মত নহে, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা যাইতে পারে; কারণ, অন্যত্র ‘বিজ্ঞানময়’ ও ‘মনোময়’ প্রভৃতি ময়ট্ প্রত্যয়ান্ত শ্রৌত শব্দগুলির বিকারাতিরিক্ত অর্থেও প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়(১)। বিশেষতঃ যে শব্দের অর্থবিশেষ নির্ণয়ের পক্ষে সংশয় উপস্থিত হয়, সেইখানেই অন্যস্থানীয় অসন্দিগ্ধ প্রয়োগ দেখিয়া অর্থবিশেষ নির্দ্ধারণ করিতে হয়; এখানেও পরবর্তী বাক্যানুসারে কিংবা নিশ্চিত ন্যায় বা সিদ্ধান্ত বলে এবং ‘সধীঃ’ অর্থাৎ ‘বুদ্ধিবৃত্তিসমন্বিত’ এইরূপ পরবর্তী বাক্যানুসারে ঐরূপ অর্থবিশেষই নির্দ্ধারণ করিতে হইবে; অতএব ‘হৃদি অন্তঃ’ এই বিস্পষ্ট প্রমাণানুসারে ‘বিজ্ঞানময়’ শব্দের ‘বিজ্ঞানপ্রাচুর্য্য’ অর্থ গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। ৪

আত্মা যে, প্রাণসমূহের অতিরিক্ত বা পৃথক্ বস্তু, ইহা জ্ঞাপনের জন্য ‘প্রাণেষু’ পদে সপ্তমী বিভক্তি প্রযুক্ত হইয়াছে; যেমন ‘বৃক্ষেতে পাষাণ’ বলিলে পরস্পর বিভিন্ন পদার্থ—বৃক্ষ ও পাষাণের সামীপ্য মাত্র বোধ করায়, ইহাও ঠিক তদ্রূপ। সাধারণতঃ সংশয় হইয়া থাকে যে, আত্মা ইন্দ্রিয়াদি হইতে পৃথক্? কিংবা অপৃথক্? তাই শ্রুতি বলিয়া দিতেছেন যে, আত্মা কখনই প্রাণ বা ইন্দ্রিয় নহে; পরন্তু সে সমুদয় হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্ বস্তু। ইহা যুক্তিযুক্তও বটে; যে পদার্থ অপর যে সমুদয় পদার্থের মধ্যে বর্তমান থাকে, সেই পদার্থটি নিশ্চয়ই সে সমুদয় পদার্থ হইতে স্বতন্ত্র; যেমন ‘পাষাণে স্থিত বৃক্ষ’। ৫

‘যদি’ ইত্যাদি। পুনশ্চ এরূপ আশঙ্কা হইতে পারে যে, প্রাতে স্থির হইয়া

(১) তাৎপর্য্য—বিকার ও অবয়বাদি নানা অর্থে ময়ট্ প্রত্যয়ের বিধান থাকিলেও বিকারার্থেই তাহার অধিক প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়; তাই আশঙ্কা হইয়াছিল যে, এই ‘বিজ্ঞানময়’ শব্দের ময়ট্-প্রত্যয়ও বিকারার্থেই হইয়াছে; সুতরাং উহার অর্থ হইতেছে বিজ্ঞানের(বুদ্ধির) বিকার বা পরিণাম; সেই আশঙ্কা অপনয়নার্থ ভাষ্যকার বলিতেছেন— ‘মনোময় প্রভৃতি’ অন্যান্য শ্রৌত শব্দে যখন বিকার ভিন্ন অর্থেও ময়ট্প্রত্যয় স্বীকার করিতে হইয়াছে, তখন ‘বিজ্ঞানময়’ শব্দেও যাঁহারা বিকারার্থ ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন, তাঁহাদের ব্যাখ্যা কখনই সমীচীন বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না।

১০৫৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রাণ-সজাতীয় বুদ্ধিও হইতে পারে; সেই আশঙ্কা অপনয়নের নিমিত্ত বলিলেন— ‘হৃদি—অন্তঃ’ ইতি। এখানে হৃৎ অর্থ পদ্মাকার মাংসখণ্ড; বুদ্ধি তাহার মধ্যে অবস্থান করে; এই জন্য উহা হৃৎপদবাচ্য; সুতরাং ‘হৃদি’ অর্থ—বুদ্ধিতে। আত্মা যে, বুদ্ধির বৃত্তিবিশেষ নহে, ইহা জ্ঞাপনের জন্য বলা হইয়াছে—‘অন্তঃ’ ইতি। বুদ্ধিবৃত্তি বুদ্ধিরই অবস্থাবিশেষ; সুতরাং তাহা ‘অন্তঃস্থ’ হইতে পারে না। ‘জ্যোতিঃ’ শব্দের অর্থ—স্বয়ংপ্রকাশস্বভাব; সুতরাং জ্যোতিঃশব্দে স্বপ্র- কাশ আত্মা অভিহিত হইয়াছে। ব্যবহারিক পুরুষ সেই প্রকাশশীল আত্ম- জ্যোতির সাহায্যে স্থিতি লাভ করে, গমন করে, কর্ম্ম করে; কেন না, সূর্য্যা- লোকের মধ্যবর্তী ঘট যেমন প্রকাশাত্মক বস্তুর ন্যায় হয়, অথবা পরীক্ষার জন্য মরকত মণিকে দুগ্ধের মধ্যে নিক্ষেপ করিলে, সেই দুগ্ধ যেমন মরকত মণির সমান আভা প্রাপ্ত হয়, তেমনি এই আত্মজ্যোতিঃ হৃদয় অপেক্ষাও অতি সূক্ষ্মত্ব নিবন্ধন হৃদয়ের মধ্যে থাকিয়াও, হৃদয় ও দেহেন্দ্রিয়সমষ্টিকে একসঙ্গে স্বীয় জ্যোতিঃপ্রভায় উদ্ভাসিত করিয়া থাকে;—সর্ব্বাপেক্ষা অভ্যন্তরস্থ বলিয়া স্কুল-সূক্ষ্মভাবের তারতম্যানুসারে পরম্পরা-সম্বন্ধে চেতনের ন্যায় করিয়া থাকে। ৬

বুদ্ধি বস্তুটি স্বভাবতই স্বচ্ছ এবং আত্মার অতি সন্নিহিত; এইকারণে উহা আত্মচৈতন্যজ্যোতির ঠিক অনুরূপ হইয়া থাকে; সেই জন্যই বিবেকিগণেরও— যাঁহারা আত্মা ও অনাত্মার পার্থক্য অবগত আছেন, তাঁহাদেরও ঐ বুদ্ধিতে প্রথমে আত্মাভিমান হইয়া থাকে; পরে বুদ্ধির সন্নিহিত মনেতে-বুদ্ধি- সম্পর্কবশতই আত্ম-চৈতন্যজ্যোতিঃ প্রতিফলিত হয়; অনন্তর মনের সহিত সম্পর্ক থাকায় ইন্দ্রিয়সমূহে আত্মচৈতন্যের সমুদ্ভাসন ঘটে; তাহার পর, ইন্দ্রিয়- সম্পর্কিত শরীর পর্য্যন্ত সমস্তই আত্মচৈতন্য জ্যোতিঃ দ্বারা প্রকাশিত হইয়া থাকে; এইরূপ পরম্পরা সম্বন্ধক্রমে আত্মা স্বীয় চৈতন্যজ্যোতিঃ দ্বারা সমস্ত দেহেন্দ্রিয়- সংঘাতটিকে প্রকাশময় করিয়া রাখে(১)। এই কারণেই নিজ নিজ বিবেক-

(১) তাৎপর্য্য—বুদ্ধি পদার্থটি স্বভাবতই স্বচ্ছ, এবং সাক্ষাৎ সম্বন্ধে আত্মার ভোগ সম্পাদন করিয়া থাকে; এই জন্য প্রথমে বুদ্ধিতেই আত্ম-চৈতন্য প্রতিফলিত হয়, তজ্জন্যই বুদ্ধিতে আত্মবুদ্ধিও উৎপন্ন হয়; তাহার পরেই মনের সহিত আত্মার সম্বন্ধ; সেই কারণে বুদ্ধির সাহায্যে মনেতে প্রকাশ ও আত্ম-ভ্রান্তি উৎপন্ন হয়; তাহার পরই ইন্দ্রিয়ের সহিত সম্বন্ধ, মনই তাহার সংযোজক; এই জন্য ইন্দ্রিয়েতেও চৈতন্যের(জ্যোতির) আভাস হয় এবং আত্মবুদ্ধি উৎপন্ন হয়, এইরূপে ক্রমে স্কুলদেহে পর্য্যন্ত আত্মভ্রান্তি হইয়া থাকে। একথাটা এইরূপে বুঝিলে ভাল হয়,—বুদ্ধিই সাক্ষাৎ সম্বন্ধে আত্মার ভোগ সম্পাদন করে; কিন্তু মনঃ

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১০৫৭

বিজ্ঞানের তারতম্যানুসারে দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতে এবং তাহাদের বিভিন্ন প্রকার ব্যাপারে অনিয়মিতভাবে আত্মাভিমান হইয়া থাকে; অর্থাৎ লোকের বিবেক- বুদ্ধির তারতম্যানুসারে আত্মাভিমানেরও তারতম্য ঘটিয়া থাকে; এই জন্যই সকলের একাকার অভিমান দেখিতে পাওয়া যায় না। স্বয়ং ভগবান্ এইরূপ কথাই গীতাতে বলিয়াছেন—‘হে ভরতবংশসম্ভব অর্জুন, একই সূর্য্য যেমন সমস্ত জগৎ প্রকাশ করেন, তেমনি একই ক্ষেত্রী—ক্ষেত্রসংজ্ঞক দেহের অধিপতি আত্মা সমস্ত দেহসংঘাতকে প্রকাশ করিয়া থাকে; এবং সূর্য্য, চন্দ্র ও অন্যান্য জ্যোতিঃ- পদার্থসমূহ, যে জ্যোতির সাহায্যে নিখিল জগৎ প্রকাশ করিয়া থাকে, জানিও, তাহা আমারই জ্যোতিঃ’ ইত্যাদি। কঠোপনিষদে আছে—‘তিনি নিত্য পদার্থ- সমুহেরও নিত্য—নিত্যত্ব-স্থাপক, এবং সমস্ত চেতনেরও চেতন—চৈতন্যসম্পাদক’, তিনি নিত্যপ্রকাশমান, এবং তাঁহার দীপ্তিতেই সমস্ত জগৎ উদ্ভাসিত হইতেছে, অন্য মন্ত্রে আছে ‘সূর্য্য যাঁহার তেজে তেজীয়ান্ হইয়া উত্তাপ দিতেছেন’ ইতি। উক্ত প্রকার প্রমাণনিচয়ে হৃদয়াভ্যন্তরস্থ উক্ত জ্যোতির অস্তিত্ব প্রমাণিত হইতেছে।৭

[অতঃপর ‘পুরুষ’ কথার অর্থ কথিত হইতেছে-] পুরুষ-আত্মা সর্ব্বদাই আকাশের ন্যায় সর্বব্যাপী; এইজন্য পূর্ণ; পূর্ণ বলিয়া পুরুষপদবাচ্য। এই আত্মার যে, স্বয়ংজ্যোতিষ্ট(স্বপ্রকাশত্ব), তাহা নিরতিশয়-যাহা অপেক্ষা অধিক হইতে পারে না; কারণ, এই আত্মাই দেহসংঘাতে সর্ব্বপদার্থাবদ্যোতক, অথচ নিজে অন্যের প্রকাশ্য নহে। সেই এই পুরুষ স্বয়ংই প্রকাশস্বভাব, যাহার কথা তুমি ‘কতম আত্মা’ বলিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছ।৭

কর্মসাধন সমস্ত করণবর্গের অনুগ্রাহক বা সামর্থ্যোদ্দীপক আদিত্যাদি বাহ্য- জ্যোতিঃপদার্থসমূহ যে সময় অস্তমিত হয়, সে সময় হৃদয়মধ্যবর্তী জ্যোতিঃ পুরুষ আত্মাই অন্তঃকরণ দ্বারা ঐ সমস্ত করণবর্গের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়া থাকে; এ কথা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। আর যে সময়ে আদিত্য প্রভৃতি জ্যোতিঃপদার্থ বর্তমান থাকে, সে সময়ও, আদিত্যাদি জ্যোতিঃপদার্থসমূহ যখন পরার্থ—পরকে গ্রাহ্য বিষয় উপস্থাপিত না করিলে, বুদ্ধি ভোগ সম্পাদনে সমর্থ হয় না; সুতরাং সে মনের সাহায্য চাহে; ইন্দ্রিয়গণ বাহির হইতে বিষয় আনিয়া না দিলে মনও কিছু করিতে পারে না; কাজেই মনকে ইন্দ্রিয়াপেক্ষিত বলিতে হয়; ইন্দ্রিয়গণও দেহের আশ্রয় না লইয়া কিছু করিতে পারে না; এই জন্য ইন্দ্রিয়গণ দেহসাপেক্ষ; এইরূপে সাক্ষাৎ-পরম্পরাক্রমে আত্মচৈতন্যের বুদ্ধি প্রভৃতিতে যথাসম্ভব অধ্যাস হইয়া থাকে।

3

১০৫৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রকাশ করাই তাহাদের প্রধান প্রয়োজন, তখন দেহেন্দ্রিয়সংঘাতের চৈতন্য না থাকায় কোন স্বার্থই লাধিত হইতে পারে না; সুতরাং স্বয়ংজ্যোতিঃপদার্থ আত্মার অনুগ্রহ লাভ না করিলে অচেতন দেহেন্দ্রিয়সংঘাত কোন ব্যবহার সম্পা- দনেই সমর্থ হইতে পারে না; কেন না, ‘এই যে, বুদ্ধি ও মন, ইহারই জ্ঞান- সাধন’ ইত্যাদি শ্রুত্যন্তর হইতে জানা যায় যে, জগতে যে কোন প্রকার ব্যবহার হয়, আত্মজ্যোতির অনুগ্রহই তাহার মূল। ব্যবহারমাত্রই অভিমান-সহকৃত; সেই অভিমানের হেতু যে, কি, তাহা মরকতমণির দৃষ্টান্ত দ্বারা পূর্ব্বেই প্রমাণ করা হইয়াছে। ৮

যদিও আত্ম-জ্যোতির প্রভাবেই সমস্ত লোকব্যবহার নিষ্পন্ন হয় বটে, তথাপি আত্ম-জ্যোতিঃ কোন ইন্দ্রিয়ের বিষয় নয় এবং তৎকালে দেহাস্রিত বাহ্য ও আন্তর করণবর্গের বিভিন্ন প্রকার ব্যবহারে ব্যাকুল থাকায়, মুঞ্জানামক তৃণ হইতে তাহার ঈষীকাকে(গর্ভপত্রটিকে) যেমন পৃথক্ করিয়া দেখান যায়, আত্মজ্যোতিকে ঠিক সেরূপভাবে পৃথক্ করিয়া প্রদর্শন করা সম্ভব হয় না; এই কারণে স্বপ্নাবস্থায় (ইন্দ্রিয়গণ বিরতব্যাপার থাকায়) পৃথক্‌ভাবে আত্মজ্যোতিঃ প্রদর্শন করিবার উদ্দেশ্যে উপক্রম করিতেছেন—‘সেই পুরুষ সমানভাবে থাকিয়াই উভয়লোকে সঞ্চরণ করিয়া থাকে‘।[ইহার অর্থ এই যে,] যে পুরুষ নিজে জ্যোতিঃস্বরূপ, সেই পুরুষ সমান অর্থাৎ সদৃশ হইয়া—কাহার সদৃশ হইয়া? না, হৃদয়ের প্রসঙ্গ থাকায় এবং নিকটে হৃদয়-শব্দ থাকায় বুঝিতে হইবে যে, হৃদয়ের সদৃশ হইয়া উভয় লোকে সঞ্চরণ করে। এখানে সন্নিহিত ও প্রস্তাবিত ‘হৃদয়’ অর্থ বুদ্ধি। ৯

ভাল, জিজ্ঞাসা করি, এখানে সাদৃশ্যটি কিরূপ?[উত্তর-] অশ্ব ও মহিষকে যেরূপ পৃথক্ করিয়া জানা যায়, বুদ্ধি ও পুরুষকে সেরূপ পৃথক্ করিয়া জানিতে না পারা। দেখ, বুদ্ধি হইতেছে প্রকাশ্য, আর আত্মা হইতেছে আলোকের ন্যায় তাহার প্রকাশক; প্রকাশ্য ও প্রকাশকের যে, পার্থক্যপ্রতীতি ‘না হওয়া, তাহা সুপ্রসিদ্ধ। আলোক পদার্থটি স্বভাবতই বিশুদ্ধ বা উজ্জ্বল; এই কারণে সে তদীয় প্রকাশ্য ঘটাদির সহিত সমানরূপ ধারণ করিয়া থাকে। যেমন, আলোক যখন রক্তবর্ণ বস্তু প্রকাশ করিতে থাকে, তখন সেই রক্তাকার প্রকাশ্য বস্তুর সদৃশ- রক্তাকার ধারণ করে; এবং যেমন, সবুজ, নীল ও লোহিত বস্তু প্রকাশ করিতে যাইয়া সেই সেই বস্তুর সমানাকার প্রাপ্ত হয়, তেমনি আত্মাও বুদ্ধিকে প্রকাশ করিতে যাইয়া বুদ্ধিদ্বারা আবার সমস্ত শরীরকেও প্রকাশ করিয়া থাকে; পূর্ব্বে মরকত মণির দৃষ্টান্ত দ্বারাই ইহা প্রতিপাদন করা হইয়াছে। আত্মা এইরূপে প্রথমে

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১০৫৯

বুদ্ধির তুল্যাকার প্রাপ্ত হয়, পরে সেই বুদ্ধির সহযোগে অপর সমস্ত বস্তুর সহিতও সমানাকার ধারণ করিয়া থাকে; এই কারণেই শ্রুতি তাহাকে ‘সর্ব্বময়’ বলিয়া নির্দেশ করিবেন। ১০

এই কারণেই মুজা হইতে যেরূপ ঈষীকা(গর্ভপত্র) পৃথক্ করিয়া প্রদর্শন করা যায়, আত্মজ্যোতিকে সেরূপ সর্ব্বপদার্থ হইতে পৃথক্ করিয়া তাহার নিজস্ব জ্যোতিঃস্বরূপে প্রদর্শন করিতে পারা যায় না; এইজন্য সকল লোকে নামরূপগত সমস্ত ব্যাপার(ক্রিয়া প্রভৃতি) তাহাতে আরোপ করিয়া এবং জ্যোতির ধর্মকেও নামরূপে আরোপ করিয়া, শেষে সাক্ষাৎ নাম ও রূপকেও আত্মজ্যোতিতে অধ্যারোপ করিয়া বারংবার মোহ প্রাপ্ত হয়-এটা আত্মা, ওটা আত্মা নয়; এ সমস্ত আত্মার ধর্ম, না-এ সমস্ত তাহার ধর্ম নয়; কর্তা, অকর্তা; শুদ্ধ, অশুদ্ধ; বদ্ধ, মুক্ত; স্থিত, গত, আগত; অস্তি(আছে), নাস্তি(নাই) ইত্যাদি বাক্যে নিজ নিজ ব্যামোহ বিবৃত করিয়া থাকে; এই জন্যই বলা হইতেছে যে, আত্মা সমান হইয়া-বুদ্ধিসাদৃশ্য প্রাপ্ত হইয়া উপস্থিত দেহেন্দ্রিয়াদিময় সংঘাতের পরিত্যাগ ও শরীরান্তরের গ্রহণাদি ব্যাপার-পরম্পরাক্রমে উভয় লোকে-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ-লোকে অর্থাৎ ইহলোক ও পরলোকে গমনাগমন করিয়া থাকে। আত্মার যে, উভয় লোকে সঞ্চরণ, বুদ্ধিসাদৃশ্য-প্রাপ্তিই তাহার কারণ, কিন্তু উহা তাহার স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম নহে। ১১

ফলতঃ নামরূপাত্মক উপাধির সহিত তাহার যে, ভ্রান্তিজনিত সাম্যপ্রাপ্তি, তাহাই যে, সঞ্চরণের হেতু, কিন্তু স্বভাব নহে, ইহাই ‘সমানঃ সন্ উভৌ লোকৌ অনুসঞ্চরতি’ কথায় ব্যক্ত করা হইতেছে। তাহার ঐরূপ সঞ্চরণ যে, অনুভবসিদ্ধ, এখন তাহা প্রদর্শন করিতেছেন-যেহেতু আত্মা যেন ধ্যানই করে অর্থাৎ যেন ধ্যান-ব্যাপারই করিতেছে-চিন্তাই করিতেছে; বুঝিতে হইবে যে, প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধিই ধ্যানাত্মক ক্রিয়া করে, আত্মা বুদ্ধিপ্রতিফলিত স্বীয় চৈতন্য দ্বারা তাহাকে প্রকাশ করিতে যাইয়া নিজেও তৎ-সারূপ্য প্রাপ্ত হইয়া-যেন ‘ধ্যানই করিতেছে’ বলিয়া প্রতীত হয়; পূর্ব্বকথিত আলোকই ইহার দৃষ্টান্ত; এই কারণেই লোকের ভ্রান্তি হইয়া থাকে যে, আত্মা যেন চিন্তা করিতেছে; বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু আত্মা কখনও ধ্যান বা চিন্তা করে না। এইরূপ মনে হয় যে, আত্মা যেন খুব চলিতেছে অর্থাৎ স্পন্দিত হইতেছে। উক্ত বুদ্ধি ও করচরণাদি যখন স্পন্দমান হইতে থাকে, তখন আত্মা সে সমুদয়কে প্রকাশ করিতে যাইয়া তাহাদের লাদৃশ্য লাভ করে; এইজন্যই, যেন স্পন্দিত হইতেছে বলিয়া মনে হয়, কিন্তু

১০৬০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রকৃত পক্ষে স্পন্দন বা প্রচলিত হওয়া সেই আত্মজ্যোতির ধর্ম্ম বা স্বভাব নহে। ১২

ভাল, ইহা কিরূপে অবগত হইলে যে, আত্মার বুদ্ধ্যাদি-সাম্যজনিত ভ্রান্তিই তাহার উভয় লোকে সঞ্চরণের হেতু, কিন্তু উহা তাহার স্বাভাবিক নহে? এই বিষয়টা বুঝাইবার নিমিত্ত বলিতেছেন যে, যেহেতু সেই আত্মা স্বপ্ন হইয়া বুদ্ধিসাম্যপ্রাপ্ত হওয়ায় সেই বুদ্ধি যেরূপ হয়, অর্থাৎ বুদ্ধি যে যে আকারে আকারিত হয়, এই পুরুষও যেন সেই সেই আকারেই আকারিত হয়। অতএব বুঝিতে হইবে যে, এই বুদ্ধির যে সময় স্বপ্ন হয় অর্থাৎ স্বপ্নাবস্থা হয়, সে সময় ঐ পুরুষও স্বপ্নাবস্থা প্রাপ্ত হয়; বুদ্ধি যখন জাগরিত হইতে ইচ্ছা করে, তখন এই পুরুষও তাহাই করে; এই কারণে বলিতেছেন-স্বপ্ন হইয়া-যেহেতু বুদ্ধিগত স্বপ্নবৃত্তি প্রকাশ করিতে করিতে স্বাপ্নবৃত্তির আকারে আকারিত হইয়া লৌকিক ও শাস্ত্রীয় দেহে- ন্দ্রিয়সঙ্ঘাতময় জাগ্রদ্ব্যবহার অতিক্রম করিয়া স্বীয় আত্মজ্যোতির সাহায্যে স্বপ্নময় বুদ্ধিবৃত্তিকে প্রকাশ করত অবস্থান করে, সেই হেতু এই পুরুষ স্বভাবতই স্বপ্রকাশ, এবং প্রকৃতপক্ষে কর্তৃত্ব, ক্রিয়া, কারক ও ফলের সহিত সম্বন্ধশূন্য বিশুদ্ধ; কেবল বুদ্ধিসাদৃশ্যই পুরুষের উভয় লোকে সঞ্চরণ-ভ্রান্তি সমুৎপাদন করিয়া থাকে। শ্রুতির ‘মৃত্যুরূপাণি’ অর্থ-মৃত্যু অর্থ কৰ্ম্ম ও অবিদ্যা প্রভৃতি; মৃত্যুর অন্য কোনও স্বাভাবিক রূপ নাই; কার্যকরণ-সমুদয়ই তাহার আশ্রয়; অতএব ঐ পুরুষ স্বপ্ন- সময়ে ক্রিয়া ও তৎফলাশ্রয় ঐ সমস্ত মৃত্যুরূপ অতিক্রম করিয়া থাকে। ১৩

[এখন বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধের আপত্তি হইতেছে যে,] ভাল, বুদ্ধির অনুরূপ অপর কোন পদার্থই ত নাই, যাহাকে বুদ্ধি-প্রকাশক আত্মজ্যোতি বলিয়া নির্দেশ করা যাইতে পারে? কারণ, যেমন এক বুদ্ধির সময় তদতিরিক্ত দ্বিতীয় বুদ্ধির অতিরিক্ত তাদৃশ অপর পদার্থও প্রত্যক্ষ বা অনুমান দ্বারা জানিতে পারা যায় না। আর যে, প্রকাশ্য ঘটাদি, ও তৎপ্রকাশক আলোক স্বরূপতঃ বিভিন্ন পদার্থ হইলেও পার্থক্য-প্রতীতি না হওয়ার দরুণ, প্রকাশ্য ও প্রকাশকের সাদৃশ্য প্রাপ্তি হইয়া থাকে, সেখানে হয় হউক,[কোন আপত্তি নাই]; কারণ, সেখানে ঘটাদি হইতে আলোকের পার্থক্য প্রতীতিসিদ্ধ; সুতরাং পরস্পর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদার্থ- দ্বয়েরই সাদৃশ্য হইতে পারে; কিন্তু এখানে ত আমরা সেরূপ ঘটাদির অবভাসক আলোকের ন্যায় বুদ্ধির প্রকাশক অপর কোনও জ্যোতিঃপদার্থ প্রত্যক্ষ বা অনুমান দ্বারা উপলব্ধি করিতেছি না; পরন্তু চৈতন্যাবভাসকরূপে বুদ্ধিরই স্বাকার(চেতনা- কার) ও বিষয়াকার দ্বিবিধ বৃত্তি দেখিতে পাইতেছি। অতএব অনুমান কিংবা

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৬১

প্রত্যক্ষ দ্বারা যে, বুদ্ধির অবভাসক অতিরিক্ত কোনও জ্যোতির অস্তিত্ব প্রতিপাদন করিতে পারা যায় না, একথা সত্য নহে। ১৪

আর দৃষ্টান্তচ্ছলে যে, তোমরা বলিয়াছ-প্রকাশ্য-প্রকাশকভাবাপন্ন স্বরূপতঃ বিভিন্ন ঘটাদি ও আলোক যখন সংযুক্ত হয়, তখনই তাহাদের মধ্যে সাদৃশ্য সঙ্ঘটিত হইয়া থাকে। বুঝিতে হইবে, সেখানেও আমরা যাহা বলিয়াছি, তাহা কেবল অভ্যুপগম মাত্র(১); বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু অবভাস্য ঘটাদি ও তদবভাসক আলোক পরস্পর ভিন্ন দুইটা স্বতন্ত্র পদার্থ নহে; ঘটাদি পদার্থগুলিই প্রকাশাত্মক আলোকময়;[প্রত্যেক ক্ষণেই] স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ঘটাদি পদার্থ উৎপন্ন হইয়া থাকে,[আবার পরক্ষণেই তাহাদের বিনাশ হইয়া যায়]। একমাত্র বিজ্ঞানই আলোকসমন্বিত ঘটাদি বিষয়াকারে প্রকাশ পাইতে থাকে। ইহাই যখন সিদ্ধান্ত, তখন আর বিজ্ঞানাতিরিক্ত কোন প্রকার বাহ্য দৃষ্টান্তও সম্ভব হয় না; কেন না, দৃশ্যমান সমস্ত পদার্থই একমাত্র বিজ্ঞানাত্মক বা বুদ্ধিবিজ্ঞানের পরিণতি; অতএব একই বিজ্ঞানের গ্রাহ্য-গ্রাহকভাবরূপ মল পরিকল্পনা, তাহারই আবার পরিশুদ্ধি (নির্বিষয়ত্ব) কল্পনা করা হইয়া থাকে। কেহ কেহ বলেন, সেই বিজ্ঞানই গ্রাহ্য- গ্রাহকাভাব হইতে নির্ম্মুক্তির পর স্বচ্ছতা প্রাপ্ত হইয়া ক্ষণিকরূপে-প্রতিক্ষণে উৎপত্তি-ধ্বংসশীল হইয়া অবস্থান করিতে থাকে; কেহ কেহ আবার ক্ষণিক বিজ্ঞা- নেরও প্রশমন ইচ্ছা করিয়া থাকেন, অর্থাৎ অপর সম্প্রদায়(মাধ্যমিক বৌদ্ধগণ) বলিয়া থাকেন যে, অবিদ্যাত্মক সেই বিজ্ঞানও গ্রাহ্য-গ্রাহকভাবরহিত হইয়া বাহ্য- বস্তুর ন্যায় শূন্যে পর্যবসিত হয়, তাহার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না(২)। ১৫

(১) তাৎপর্য্য—অভ্যুপগমবাদ অর্থ—যাহা নিজের অভিমত নয়, এরূপ পরকীয় সিদ্ধান্ত স্বীকার করিয়া লওয়া। দর্শনশাস্ত্রে এরূপ অভ্যুপগমবাদের যথেষ্ট ব্যবহার দেখিতে পাওয়া যায়। অভ্যুপগমবাদন্যায়ে পরের কথা স্বীকার করিলেও তাহা স্বসম্মত বলিয়া ধর্তব্য নহে; সুতরাং সাদৃশ্য সঙ্ঘটনের কথায় এখন আপত্তি করা দোষাবহ হয় নাই।

(২) তাৎপর্য্য—বৌদ্ধমত অনেক ভাগে বিভক্ত; তন্মধ্যে এখানে বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধের আপত্তি প্রথমে উত্থাপন করা হইয়াছে। পরে মাধ্যমিক সম্প্রদায়ের কথাও বলা হইয়াছে। বিজ্ঞানবাদীরা বলেন—বাহিরে দৃশ্যমান কোন পদার্থই সত্য নহে; আন্তর বুদ্ধিবিজ্ঞানই একমাত্র সত্য; সেই বুদ্ধিবিজ্ঞানই অবিদ্যাবশতঃ বাহিরে পৃথক্ বস্তু বলিয়া প্রতিভাত হইয়া থাকে; কিন্তু বিজ্ঞান ও বিষয়ের মধ্যে কিছুমাত্র ভেদ নাই; তথাপি অবিদ্যাপ্রভাবে গ্রাহক বিজ্ঞান ও তাহার গ্রাহ্য বিষয়ের মধ্যে একটা পার্থক্য বোধ হইয়া থাকে। এই বাহ্য বিষয়াকারও পরিণামে শূন্যাকারে পর্য্যবসিত হইয়া যায়; শূন্যই আত্মার যথার্থ তত্ত্ব।

১০৬২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

[এখন প্রতিপক্ষের আপত্তির উত্তরে ভাষ্যকার বলিতেছেন-] উপরে যে সমস্ত কল্পনা-কৌশল প্রদর্শিত হইল, সে সমস্তই বুদ্ধি-প্রকাশের অতিরিক্ত আত্ম- জ্যোতির অপলাপ করে বলিয়া, নিশ্চয়ই বেদবিহিত এই মোক্ষমার্গের প্রতিকূল। তন্মধ্যে যাহারা বাহ্য পদার্থের অস্তিত্ব অস্বীকার করে, এখন প্রথমে তাহাদের মতবাদ নিরাস করা হইতেছে—ঘটাদি পদার্থগুলি যখন অন্ধকারে অবস্থিতি করে, তখন আপনাকে প্রকাশ করিতে পারে না; পরন্তু দীপাদি আলোক-সংযোগেই সেই ঘটাদি প্রকাশ পাইয়া থাকে। সর্ব্বত্রই যখন এই নিয়ম দেখা যায়, তখন ঘটাদি পদার্থকে নিশ্চয়ই স্বপ্রকাশ বলা যাইতে পারে না; অতএব আলোক ও ঘট সংশ্লিষ্ট বা সম্মিলিত অবস্থায়ও পরস্পর পৃথক্ পদার্থই বটে। বিশেষতঃ যখনই আলোকের সহিত ঘটের সংযোগ ঘটে, তখনই বজ্জু ও ঘটের যেরূপ পার্থক্য, সেইরূপ উহাদেরও পার্থক্য দেখিতে পাওয়া যায়;[কিন্তু অভিন্ন হইলে কখনই এরূপ হইত না]। আলোক যখন ঘট হইতে পৃথক্ বস্তু, তখন উহার পৃথক্ পদার্থাবভাসকত্বও সিদ্ধ হইল; বিশেষতঃ নিজে ত নিজকে কখনই প্রকাশ করিতে পারে না;[তাহা হইলে কর্মকর্তবিরোধ উপস্থিত হয়]। ১৬

ভাল, দেখা যায়—প্রদীপ ত আপনাকেও প্রকাশ করিয়া থাকে;—ঘটাদি দর্শনের জন্য যেমন আলোকের আবশ্যক হয়, প্রদীপ-দর্শনের জন্য ত সেরূপ কেহ কখনও অন্য আলোকের অপেক্ষা করে না; অতএব স্বীকার করিতে হইবে যে, প্রদীপ নিজেকেও প্রকাশ করিয়া থাকে। না—একথাও হইতে পারে না; কারণ, ইহাতেও প্রদীপের অবভাস্যত্বাংশের কোন ব্যাঘাত ঘটিতেছে না,—প্রদীপ যদিও প্রকাশস্বভাব বলিয়া অন্যের অবভাসক হউক, তথাপি ঘটাদির ন্যায় প্রদীপও যে, অতিরিক্ত চৈতন্যাবভাস্য, এ অংশে কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য নাই। এইরূপই যখন ব্যবস্থা, তখন আলোকেও ব্যতিরিক্তাবভাস্যত্ব স্বীকার্য্য। ভাল কথা, ঘটাদি পদার্থ- গুলি যদিও চৈতন্য-প্রকাশ্য হউক, তথাপি তাহারা অতিরিক্ত আলোকের অপেক্ষা করে, কিন্তু দীপ তাহা করে না; সুতরাং প্রদীপ বস্তুটি চৈতন্য-প্রকাশ্য হইলেও, সে যে আপনাকে ও ঘটাদি অপর বস্তুকে প্রকাশ করিয়া থাকে,[ ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে]। ১৭

না—একথাও হইতে পারে না; কারণ, এস্থলে স্বতঃ বা পরতঃ প্রকাশ স্বীকার করিলেও কোন বিশেষ নাই—ঘট যেমন চৈতন্য-প্রকাশ্য, তেমনি আলোকও যে, চৈতন্য-প্রকাশ্য, এই অংশ সমানই রহিল;[সুতরাং প্রদীপ নিজেকে প্রকাশ করে, বলিলেও তাহার চৈতন্য-প্রকাশ্যত্ব ব্যাহত হয় না]।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৬৩

আর প্রদীপ যে, আপনাকে ও ঘটকে প্রকাশ করিয়া থাকে-বলা হইয়াছে, তাহাও উত্তম কথা নহে; কারণ? সে যদি আপনাকেও প্রকাশ করিত, [বল দেখি,] তাহা হইলে প্রদীপ যে সময়ে আপনাকে প্রকাশ না করে, সে সময় তাহার কিরূপ রূপ থাকিতে পারে?-সে সময়[যে সময় আপ- নাকে প্রকাশ না করে, সে সময়] তাহাতে স্বতঃ কিংবা পরতঃ কিছুমাত্র বিশেষ বা বৈলক্ষণ্য দেখিতে পাওয়া যায় না; তাহার কারণ এই যে, সেই পদার্থই অবভাস্য বা প্রকাশ্য হইয়া থাকে, প্রকাশক পদার্থের সন্নিধানে ও অসন্নি- ধানে যাহার কোনপ্রকার পার্থক্য দেখিতে পাওয়া যায়, অপচ প্রদীপের পক্ষে সেই প্রদীপেরই সান্নিধ্য বা অসান্নিধ্য কখনই কল্পনা করা যাইতে পারে না। যখন প্রদীপের স্বরূপগত কিছুমাত্র বৈষম্য দেখিতে পাওয়া যায় না, তখন তুমি যে, বলিতেছ-‘প্রদীপ আপনাকে প্রকাশ করে’, একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ১৮

বিশেষতঃ ঘটাদি পদার্থসমূহ যেরূপ চৈতন্য দ্বারা প্রকাশিত হয়, বুদ্ধি- বিজ্ঞানও ঠিক সেইরূপই চৈতন্য দ্বারা প্রকাশিত হয়, উভয়ের মধ্যে কিছুমাত্র প্রভেদ নাই; সুতরাং একই বুদ্ধি-বিজ্ঞানের গ্রাহ্য-গ্রাহকভাব প্রমাণ করিবার উদ্দেশ্যে যে, প্রদীপের দৃষ্টান্ত দেওয়া হইয়াছে, প্রকৃত পক্ষে তাহা ত দৃষ্টান্তই নহে; অতএব অন্যান্য পদার্থের ন্যায় বুদ্ধি-বিজ্ঞানেরও চৈতন্যভাস্যত্ব তুল্য। বুদ্ধি- বিজ্ঞান যদি চৈতন্যদ্বারাই প্রকাশ্য হয়, তাহা হইলেও,[জিজ্ঞাসা করি-] গ্রাহ্য বিজ্ঞানই চৈতন্যগ্রাহ্য? কিংবা গ্রাহক বিজ্ঞান?-ইত্যাদি সংশয়স্থলে, ব্যবহার- সিদ্ধ নিয়মেরই অনুসরণ করিতে হইবে, কিন্তু ব্যবহার-বিরুদ্ধ কল্পনা করা কখনই সঙ্গত হইবে না; তাহা হইলে, বাহ্য প্রদীপাদি পদার্থকে যেরূপ তদতিরিক্ত অপর পদার্থ(চৈতন্য) দ্বারা প্রকাশিত হইতে দেখা গিয়াছে, তদ্রূপ বিজ্ঞান যখন চৈতন্যগ্রাহ্যই বটে, তখন তাহা প্রকাশ-স্বভাব সম্পন্ন হইলেও, প্রদীপের ন্যায় সেই বিজ্ঞানেরও চৈতন্য-গ্রাহ্যত্ব কল্পনা করাই যুক্তিযুক্ত; কিন্তু অনন্য- গ্রাহ্যতা(স্বপ্রকাশকতা) কল্পনা করা কখনই যুক্তিসম্মত হয় না(১)। বিজ্ঞান

১০৬৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যেমন গ্রাহ্য ঘটাদি হইতে স্বতন্ত্র, তদ্রূপ স্বয়ং বিজ্ঞানও তদতিরিক্ত যাহার সাহায্যে গৃহীত হয়, তাহাই বিজ্ঞানের অতিরিক্ত আত্মস্বরূপ জ্যোতিঃ। ভাল কথা,[ঘটাদি-গ্রাহক বুদ্ধিবিজ্ঞানও যদি তদতিরিক্ত চৈতন্য-গ্রাহ্য হয়,] তাহা হইলে ত অনবস্থা দোষ উপস্থিত হয়? না, সে দোষ এখানে হয় না; কেন না; আমরা যুক্তি অনুসারে, বুদ্ধি-বিজ্ঞানের গ্রাহ্যতাকেই কেবল তদ্‌গ্রাহক অতিরিক্ত বস্তু-সত্তার(চৈতন্যসত্তার) অনুমাপক হেতুরূপে উল্লেখ করিয়াছি মাত্র, প্রকৃত- পক্ষে কিন্তু, তাহা যে, কেবলই গ্রাহক, কিংবা তাহারও অপর কোন গ্রাহক থাকিতে পারে, এ বিষয়ে কখনও কোন প্রকার হেতুর উদ্ভাবনা করা হয় নাই; কাজেই সে সম্বন্ধে অনবস্থা দোষ আসিতে পারে না(১)। ১৯

এখন আপত্তি হইতে পারে যে, বিজ্ঞান যদি তদতিরিক্ত চৈতন্য দ্বারাই গৃহীত হয়, তাহা হইলে, তৎপ্রকাশনের জন্যও আবার অপর কোনও করণ বা সহায়ের আবশ্যক হইতে পারে; অপর কোন করণের অপেক্ষা থাকিলেই, পুনশ্চ সেই অনবস্থা দোষেরই সম্ভাবনা হইয়া পড়ে। না-এ পক্ষে অনবস্থা দোষ হয় না; কারণ? যেহেতু এরূপ কোন নিয়ম নাই-অর্থাৎ এরূপ কোনও অব্যভিচারী নিয়ম নাই যে, যেখানেই এক বস্তু অপর বস্তু দ্বারা গৃহীত বা প্রকাশিত হয়, সেখানেই গ্রাহ্য ও গ্রাহকের অতিরিক্ত কোন করণ থাকিবেই থাকিবে; বিশে- যতঃ ওরূপ অব্যভিচারী নিয়ম করাও সম্ভবপর হয় না; কারণ, বস্তু-স্বভাব বিচিত্রা- কার, একরূপ নহে। কি প্রকার? দেখ, ঘট একটা বস্তু, সে আপনার অতিরিক্ত আত্মা(জীব) দ্বারা প্রকাশিত হয়; সে স্থলে গ্রাহ্য ঘট ও তদ্‌গ্রাহক আত্মা, এতদুভয়ের অতিরিক্ত প্রদীপাদি আলোক হয়-তাহার করণ(দর্শনের উপায়);

বিজ্ঞানের স্বপ্রকাশত্ব স্বীকার করিয়া আপত্তি উত্থাপন করিয়া আত্মচৈতন্য জ্যোতির অসম্ভাবের আশঙ্কা করিয়াছিল, তাহা খণ্ডিত হইল।

(১) তাৎপর্য্য—ঘটাদি বাহ্য পদার্থের প্রকাশক বুদ্ধিবিজ্ঞানও যদি তদতিরিক্ত আত্ম- চৈতন্য দ্বারা প্রকাশ্য হয়, তাহা হইলে, আত্ম-চৈতন্য-প্রকাশের জন্যও আবার অপর জ্যোতির সদ্ভাব কল্পনা করা আবশ্যক হয়; এইরূপে তাহার প্রকাশক, তাহার প্রকাশক—ইত্যাকার অনবস্থাদোষ আসিতে পারে। তদুত্তরে ভাষ্যকার বলিতেছেন যে, আমরা যুক্তি ও দৃষ্টান্ত- বলে, তদ্‌গ্রাহক বা বুদ্ধি-প্রকাশক ও বুদ্ধি যে, এক পদার্থ নহে, ইহা প্রতিপাদনের নিমিত্তই বুদ্ধিবিজ্ঞানের গ্রাহ্যতাকে হেতুরূপে উল্লেখ করিয়াছি; কিন্তু সেখানে আমরা এমন কোনও কথাই বলি নাই যে, চৈতন্য জ্যোতিটী কেবলই প্রকাশক, অথবা তাহারও গ্রাহক অপর পদার্থ আছে—ইত্যাদি; কাজেই ঐ কথায় পূর্ব্বোক্ত অনবস্থা দোষ ঘটিতে পারে না।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৬৫

প্রদীপাদি আলোক ত কখনই ঘটের অংশও নয়, কিংবা চক্ষুরও অংশ নয়; সেই প্রদীপও আবার ঘটাদিরই মত চক্ষুগ্রাহ্য; কিন্তু চক্ষুঃ প্রদীপপ্রকাশনের জন্য আলোকস্থলবর্তী প্রদীপাতিরিক্ত অপর কোনও বাহ্য করণ বা সহায়ের অপেক্ষা করে না; অতএব কখনই এরূপ নিয়ম করা যাইতে পারে না যে, যেখানে যেখানে কোন বস্তু অতিরিক্ত পদার্থের গ্রাহ্য হইবে, সেই সেই স্থলে নিশ্চয়ই একটা অতিরিক্ত করণ থাকিবেই থাকিবে। অতএব বিজ্ঞান স্বতন্ত্র গ্রাহকের গ্রাহ্য হইলেও, সে স্থলে করণাপেক্ষায় কিংবা অতিরিক্ত গ্রাহকাপেক্ষায় অনবস্থা-দোষের সম্ভাবনা করিতে পারা যায় না; সুতরাং বুদ্ধিবিজ্ঞানের অতিরিক্ত আত্মজ্যোতির অস্তিত্বই প্রমাণিত হইল। ২০

[অতঃপর বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ আপত্তি উত্থাপন করিয়া বলিতেছেন-] ভাল, বিজ্ঞানের অতিরিক্ত ঘট বা প্রদীপাদি নামে ত কোন পদার্থই নাই, অর্থাৎ বাহিরে ঘট বা প্রদীপাদি বলিয়া যে সমস্ত পদার্থ অনুভূত হয়, সে সমুদয় বুদ্ধিবিজ্ঞানের অতিরিক্ত নহে; বুদ্ধিবিজ্ঞানই বাহ্যবস্তুরূপে প্রতিভাত হয় মাত্র। জগতে দেখিতে পাওয়া যায়-যাহার অভাবে যাহার প্রতীতি হয় না, তাহা তৎ- স্বরূপই বটে; যেমন স্বপ্নজ্ঞান-দৃশ্য ঘট-পটাদি পদার্থ। স্বপ্নদৃশ্য ঘট ও প্রদীপাদি পদার্থ গুলি যেমন কেবলই তৎকালীন বিজ্ঞানের পরিণাম, স্বপ্নবিজ্ঞানের অতিরিক্ত উহাদের সত্তাপ্রতীতি হয় না, তেমনি জাগরণসময়েও ঘট ও প্রদীপাদি যে সমস্ত বস্তু প্রত্যক্ষতঃ দৃষ্ট হয়, জাগ্রৎ-বিজ্ঞান ব্যতীত অর্থাৎ বুদ্ধিবিজ্ঞান পরিত্যাগ করিয়া স্বতন্ত্রভাবে ঐ সমস্ত বস্তুর প্রতীতি হয় না বলিয়া, উহারাও জাগ্রৎ-বিজ্ঞান- স্বরূপই বটে, তদতিরিক্ত নহে; অতএব বহির্দৃশ্য ঘট ও প্রদীপাদি বলিয়া কোন পদার্থ ই সত্য নহে; একমাত্র বিজ্ঞানই(বুদ্ধিবৃত্তিই) সর্ব্বময়। এই বৌদ্ধ সিদ্ধান্তের উপর যে, বলা হইয়াছে-ঘটাদির ন্যায় বিজ্ঞানও যখন স্বতন্ত্র-প্রকাশ্য, অর্থাৎ ঘটাদি যেমন প্রদীপাদি অন্য বস্তু দ্বারা প্রকাশিত হয়, তেমনি বিজ্ঞানও অপর পদার্থের প্রকাশ্য হইবে; সুতরাং বিজ্ঞানকে প্রকাশ করিবার নিমিত্ত তদতিরিক্ত অন্য একটা জ্যোতির অস্তিত্ব অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। না, একথাও যুক্তিসহ নহে; কারণ, সমস্তই যদি বিজ্ঞানাত্মক হয়-তদতিরিক্ত কোন বস্তুই না থাকে, তাহা হইলে বিজ্ঞানের পর-প্রকাশ্যত্ব বিষয়ে দৃষ্টান্ত কোথায়?। ২১

[এতদুত্তরে ভাষ্যকার বলিতেছেন—] না—তোমার একথা সঙ্গত হয় না; কারণ, তুমি ত একেবারেই বাহ্য পদার্থ অস্বীকার করিতেছ না; হাঁ, আমি ত একেবারেই বাহ্য পদার্থের অস্তিত্ব অস্বীকার করিতেছি; না—তুমি সে কথা

১০৬৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বলিতে পার না; কেন না, বিজ্ঞান, ঘট ও প্রদীপ ইত্যাদি শব্দ ও অর্থভেদের জন্য যতটুকু আবশ্যক, অন্ততঃ তোমাকে ততটুকুও বিজ্ঞানাতিরিক্ত বাহ্য পদার্থ স্বীকার করিতেই হইবে। যদি বিজ্ঞানাতিরিক্ত বস্তুই না থাকে, তাহা হইলে বিজ্ঞান, ঘট ও পট—ইত্যাদি শব্দগুলি পর্যায়(একার্থক) শব্দমধ্যে পরিগণিত হইয়া পড়ে। এইরূপ, ফল ও ফলসাধন এক হইলে(বিজ্ঞানাত্মক হইলে) তোমাদের সাধ্য(ফল) ও সাধনের বিভাগ-প্রদর্শক শাস্ত্রগুলিও নিরর্থক হইয়া পড়ে; অথবা ঐ সমস্ত শাস্ত্রকর্তাদিগের অজ্ঞতাও সম্ভাবিত হয়;[অতএব বিজ্ঞানাতিরিক্ত বস্তু নাই, একথা বলিতে পার না]। ২২

আরো এক কথা, বিজ্ঞানের অতিরিক্ত বাদি-প্রতিবাদীর বাদ(আলোচনা- বিশেষ) ও তাহার দোষ প্রদর্শনের ব্যবস্থা স্বীকার করাতেও[বিজ্ঞানকে আত্মা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে]; কেন না, শুধু আত্ম- বিজ্ঞানকেই বাদী ও প্রতিবাদী এবং তাহাদের বাদকথা বা দোষ বলিয়া স্বীকার করিতে পারা যায় না; কারণ, প্রতিবাদী প্রভৃতির পক্ষে তাদৃশ বাদদোষ অপ- নয়ন করিতে হয়; অথচ কেহই আপনাকে(বিজ্ঞানকে) আপনার প্রত্যাখ্যান- যোগ্য বলিয়া স্বীকার করে না, বা করিতে পারে না; তাহা হইলে জগতে লোক- ব্যবহারই বিলুপ্ত হইয়া যাইতে পারে। আর এ কথাও কেহ স্বীকার করে না যে, প্রতিবাদী প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ কেবল নিজেই নিজেকে বাদ-প্রতিবাদরূপে গ্রহণ করিয়া থাকে; কেন না, যাহারা বাদ-প্রতিবাদে নিযুক্ত থাকে, তাহাদের বাদ-প্রতিবাদ ভাবকে, অপরেও গ্রহণ করিয়া থাকে, ইহা[তোমারও] স্বীকার্য্য; অতএব জাগ্রৎকালীন বস্তুসমূহ যে, জাগ্রৎবস্তু বলিয়াই, তদতিরিক্ত বস্তুর (বিজ্ঞানের) বিষয়ীভূত হয়, এবিষয়ে দৃষ্টান্তও সুলভ—সহজেই ইহার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়—যেমন আপনার বিজ্ঞানপ্রবাহ, এবং যেমন অপরের বিজ্ঞান(১)। অতএব উল্লিখিত বিজ্ঞানবাদীও বুদ্ধিবিজ্ঞানের অতিরিক্ত জ্যোতির অস্তিত্ব প্রত্যাখ্যান করিতে পারে না। ২৩

(১) তাৎপর্য্য—বস্তুমাত্রই অপর বস্তুর বিষয়ীভূত হইয়া থাকে, এই নিয়মানুসারে যদিও জাগ্রৎ-অবস্থায় যে সমস্ত বস্তু দৃষ্টিগোচর হইয়া-থাকে, সে সমস্তও অপর কোনও বস্তুর প্রকাশ্য হইতে পারে, কিন্তু জাগ্রৎকালীন কোন বিষয়ই গ্রাহ্য হইতে পারে না, বিজ্ঞানপ্রবাহ বা এক একটা বিজ্ঞানকে ইহার দৃষ্টান্তরূপে ধরিতে পারা যায়। একটা বিজ্ঞানপ্রবাহ যেমন তদতি- রিক্ত বিজ্ঞানের বিষয়ীভূত হইবে, তেমনি প্রত্যেকটী বিজ্ঞানই অতিরিক্ত বিজ্ঞানের বিষয়ীভূত হইবে। সেই যে অতিরিক্ত বিজ্ঞান, তাহাই আত্মজ্যোতিঃস্বরূপ, তাহা হইতে ভিন্ন নহে।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৬৭

যদি বল, স্বপ্নসময়ে বিজ্ঞানাতিরিক্ত বস্তুর অস্তিত্ব না থাকায় উক্ত সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত হইতে পারে না; না-সে কথাও বলিতে পার না; কেন না, যেহেতু অভাব হইতেও ভাব-পদার্থের(তৎকালীন দৃশ্য পদার্থের) বিজ্ঞানাতিরিক্ত বস্তুত্ব সিদ্ধ হইতে পারে। অভিপ্রায় এই যে, স্বপ্নকালীন ঘটাদি-বিজ্ঞানের অর্থাৎ ঘটাদি বস্তুরূপে প্রকাশমান বুদ্ধিবিজ্ঞানের যে, ভাবরূপতা(বস্তুত্ব), তাহা ত তুমিই স্বীকার করিয়াছ। অগ্রে তাহা স্বীকার করিয়া এখন আবার বিজ্ঞানাতি- রিক্ত ঘটাদির অসদ্ভাব বলিতেছ;[সুতরাং তোমার কথা স্বোক্তি-বিরুদ্ধ হই- তেছে]। বুদ্ধিবিজ্ঞানের বিষয়ীভূত ঘটাদি বিষয়সমূহ যদি অবস্তু-অভাবই হয়, অথবা যদি ভাবস্বরূপই হয়, উভয় পক্ষেই উহাদের ভাবরূপতাই স্বীকার করা হয়; তাহার বাধক যখন কোন যুক্তি প্রমাণ নাই, তখন পূর্ব্বস্বীকৃত ভাবরূপত্ব কিছুতেই বারণ করিতে পার না। এই কথায় সর্বশূন্যত্ববাদও খণ্ডিত হইল; এবং মীমাংসকেরা যে, বলেন-আত্মা অহমাকারেই গ্রাহ্য হইয়া থাকে; তাঁহাদের সে কথাও উক্ত যুক্তিতেই নিরস্ত হইল। ২৪

আরও যে, বলা হইয়াছে-আলোকসংযোগে নূতন নূতন ঘট উৎপন্ন হইয়া থাকে; সে কথাও উত্তম কথা নহে; কারণ, পূর্ব্বদৃষ্ট ঘটাদি বস্তুকে সময়ান্তরে দেখিলেও ‘ইহা সেই ঘটই বটে’ এইরূপই প্রত্যভিজ্ঞা হইয়া থাকে;[কিন্তু প্রতিক্ষণে নূতন নূতন ঘটের উৎপত্তি ও ধ্বংস স্বীকার করিলে উক্ত প্রকার প্রত্যভিজ্ঞা হইতে পারে না]। যদি বল, ছেদনের পর পুনরুত্থিত কেশ নখ প্রভৃতিতে যেরূপ সাদৃশ্যমূলক প্রত্যভিজ্ঞা বা অভেদ প্রতীতি হইয়া থাকে, ঘটাদির প্রত্যভিজ্ঞাও সেইরূপ; না-সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, কেশ-নখাদিরও ক্ষণিকত্ব অসিদ্ধ, অর্থাৎ কেশ-নখাদিও যে, ক্ষণিক বস্তু, তাহা ত কোন প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয় নাই; সুতরাং সে সমুদয় তোমার ক্ষণিক-বাদের অনুকূল দৃষ্টান্ত হইতে পারে না। পক্ষান্তরে, জাতিগত একত্বই উহাদের প্রত্য- ভিজ্ঞার কারণ; অর্থাৎ প্রথমতঃ কেশ-নখাদি ক্ষণিকই নহে, দ্বিতীয়তঃ ছিন্ন কেশ ও. উৎপন্ন কেশ উভয়ই যখন একজাতীয়, তখন সেই জাতিগত একত্ব ধরিয়া কেশ-নখাদির প্রত্যভিজ্ঞা-ব্যবহার বিরুদ্ধ হয় না; সুতরাং তদ্বিষয়ক প্রত্যভিজ্ঞা জ্ঞান নিশ্চয়ই অভ্রান্ত; কেন না, পূর্ব্বচ্ছিন্ন কেশ-নখাদি উৎপত্তির পর পুনর্ব্বার প্রত্যক্ষগোচর হইলে, উহাদের সম্বন্ধে, ‘ইহা সেই কেশ ও সেই নখই বটে’ এইরূপ যে, প্রত্যভিজ্ঞা জ্ঞান জন্মে,-ঐ সমস্ত কেশ বা নখ তাহার কারণ নহে, [পরন্তু কেশত্ব ও নখত্ব জাতিই তাহার কারণ]। দীর্ঘকাল পরে, পূর্ব্বদৃষ্টানুরূপ

১০৬৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

কেশ-নখাদি দৃষ্টিগোচর হইলে, লোকের এইরূপ প্রতীতি হইয়া থাকে যে, ‘এই কেশ ও নখসমূহ সেই পূর্ব্বদৃষ্ট কেশ-নখাদিরই তুল্য’, কিন্তু ‘ইহারাই সেই কেশ- নখাদি’ এরূপ প্রতীতি কাহারো কখনও হয় না; অথচ ঘটাদির স্থলে ‘ইহা সেই ঘটাদিই বটে’ এইরূপ অভেদ প্রতীতি(প্রত্যভিজ্ঞা) সমানভাবে সকলেরই হইয়া থাকে; অতএব কেশ-নখাদির দৃষ্টান্ত ঠিক ক্ষণিকবাদের অনুকূল হই- তেছে না। ২৫

অপিচ, প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা বস্তুর অভেদ-প্রত্যভিজ্ঞান সত্ত্বে, কখনই তাহার ভেদগ্রাহক অনুমান করা যাইতে পারে না; কারণ, প্রত্যক্ষ-বিরুদ্ধ স্থলে অনু- মানের জন্য, যে হেতুর প্রয়োগ করা হয়, বাস্তবিক পক্ষে তাহা নির্দোষ হেতু নহে—উহা হেত্বাভাস মাত্র। তাহার পর, জ্ঞান নিজে যখন ক্ষণিক, তখন তদ্বিষয়ে সাদৃশ্য প্রতীতিও হইতে পারে না; কারণ, একই বস্তুদর্শী ব্যক্তি যদি ক্ষণান্তরে ততুল্য অপর বস্তু দর্শন করে, তখনই তাহার সাদৃশ্য প্রতীতি হইয়া থাকে; কিন্তু তোমার মতে বিজ্ঞান যখন ক্ষণিক, তখন পূর্ব্ববস্তুদর্শী(বিজ্ঞান) ব্যক্তি ত পরক্ষণ পর্য্যন্ত বিদ্যমান থাকিতে পারে না, একবার একটা বস্তু দর্শন করিয়াই ক্ষণিক বিজ্ঞান বিনষ্ট হইয়া যায়; সুতরাং পূর্ব্বের সহিত তুলনা করিবে কে? ‘ইদং তেন সদৃশম্’—‘ইহা তাহার সদৃশ’ এইরূপ প্রতীতির নাম সাদৃশ্য প্রতীতি; তন্মধ্যে ‘তেন’ পদে হইতেছে পূর্ব্বানুভূতের স্মরণ, আর ‘ইদম্’ পদে হইতেছে—দৃশ্যমান বস্তুর বর্তমানত্ব প্রতীতি; এখন ‘তেন’ বলিয়া অতীত- কালীন বস্তুর স্মরণ করিয়া যদি ‘ইদম্’—বর্তমানত্ব জ্ঞান পর্য্যন্ত[বুদ্ধি- বিজ্ঞান] বিদ্যমান থাকে—স্বীকার কর, তাহা হইলে তোমার ক্ষণিক-বিজ্ঞান- বাদই ব্যাহত হইয়া যায়। ২৬

আর যদি বল, শুধু ‘তেন’ জ্ঞানমাত্রই স্মরণ জ্ঞান; বর্তমানত্ববোধক ‘ইদম্’ জ্ঞানটা তাহা হইতে স্বতন্ত্র; একথা বলিলেও, পূর্ব্বাপরকালীন বিভিন্নবস্তুদর্শী এক জন কর্তা না থাকায় ‘ইহা অমুকের সদৃশ’ এইরূপ সাদৃশ্যবোধ হইতে পারে না। বিশেষতঃ[তোমার মতে] সাদৃশ্য-ব্যবহারই সঙ্গত হয় না; ক্ষণিক বিজ্ঞান যখন দর্শনযোগ্য বস্তুর দর্শনমাত্রেই বিধ্বস্ত হইয়া যায়, তখন ‘আমি ইহা দেখিতেছি, অমুকটা দেখিয়াছি’ ইত্যাদি ব্যবহারেও(পূর্ব্বাপর পরামর্শেরও) উপপত্তি থাকে না। কারণ, পূর্ব্বদ্রষ্টা বিজ্ঞান উক্তপ্রকার শব্দ-ব্যবহার সময় পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে না; আর যদি বল, ততক্ষণ পর্য্যন্তই বর্তমান থাকে, তাহা হইলে ক্ষণিকবাদ রক্ষা পায় না। যদি বল, যে বিজ্ঞান দেখে নাই, সেই বিজ্ঞা-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৬৯

নেরই ঐরূপ শব্দ-ব্যবহার ও সাদৃশ্য প্রতীতি হইয়া থাকে; তাহা হইলে ত, অন্ধের রূপবিশেষ জ্ঞানের ন্যায় এই সাদৃশ্যাদি ব্যবহার এবং তোমাদের সর্বজ্ঞ বুদ্ধদেবকর্তৃক প্রণীত শাস্ত্রপ্রভৃতি সমস্তই ‘অন্ধপরম্পরা’ রূপে পরিগণিত হইয়া পড়ে; অথচ তোমরা ত তাহা স্বীকার কর না। তাহার পর, ক্ষণভঙ্গবাদে (ক্ষণিক বিজ্ঞানবাদে) যে, কৃতনাশ ও অকৃত-সমাগমনামক দুইটা দোষ উপস্থিত হয়, তাহা ত সুপ্রসিদ্ধই আছে। ২৭

যদি বল, শৃঙ্খল যেমন অনেকাবয়ববিশিষ্ট হইয়াও একত্ব-প্রতীতির বিষয় হয়, তেমনি পূর্ব্বপশ্চাভাবে যে সমুদয় প্রত্যয় বা বুদ্ধিবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, সে সমুদয়ের সহিত সম্মিলিত একটি মাত্র প্রত্যয়ই ‘ইহা এক, অমুক এক’ ইত্যাদি লৌকিক ব্যবহার নিষ্পাদন করিয়া থাকে; এবং সেই একত্ব প্রত্যয়ের বলেই ‘ইহা অমুকের সদৃশ’ এইরূপ সাদৃশ্য-ব্যবহার হইয়া থাকে। না—তাহাও বলিতে পার না; কারণ, বর্তমান ও অতীত বস্তুদ্বয় স্বভাবতই বিভিন্নকালবর্তী; তন্মধ্যে একটা বর্তমান—যাহা শৃঙ্খলের অবয়ব-স্থানবর্তী, আর অপর প্রত্যয়টী অতীত; ঐ উভয় প্রত্যয়ই ভিন্নকালস্থায়ী। এখন ঐ উভয়বিধ প্রতীতির যাহা বিষয়, উক্ত শৃঙ্খল-প্রত্যয় যদি তাহাকেই অবগাহন করে, তাহা হইলে ঐ বিজ্ঞান ক্ষণদ্বয়- ব্যাপক হওয়ায় পুনশ্চ তোমার অভিমত ক্ষণিকবাদের ব্যাঘাত ঘটিল; অধিকন্তু ‘তোমার, আমার’ ইত্যাদি বিশেষ ব্যবহারের অনুপপত্তি নিবন্ধন লৌকিক সমস্ত ব্যবহারও বিলুপ্ত হইবার উপক্রম হইল। ২৮

বিশেষতঃ সমস্ত বস্তুই যদি স্বসংবেদ্য স্বীয় বিজ্ঞানের বিষয়ীভূত হইয়াও বিজ্ঞানাত্মক হয়, তাহা হইলে, বিজ্ঞানকে যখন স্বভাবস্বচ্ছ প্রকাশমাত্র স্বরূপ বলিয়া স্বীকার করা হইয়াছে, তখন, তদ্দর্শী অন্য কেহ না থাকায় তোমার অভি- মত যে, অনিত্যত্ব, দুঃখশূন্যত্ব ও অনেকরূপত্ব প্রভৃতি নানাবিধ কল্পনা, সে সমস্তও কিছুতেই উপপন্ন হয় না। বলিতে পার, দাড়িম ফল যেরূপ অনেকাংশবিশিষ্ট হইয়াও একত্ব-প্রতীতির বিষয় হয়, তদ্রূপ বিজ্ঞানও বিরুদ্ধ অনেকাংশবিশিষ্ট হইয়াও একত্ব-প্রতীতির বিষয় হইতে পারে; না, তাহাও হইতে পারে না; কারণ, [তোমাদের মতে] বিজ্ঞান পদার্থটি হইতেছে স্বচ্ছ প্রতীতিমাত্রস্বরূপ। [সুতরাং তাহার সম্বন্ধে অধিকাংশ কল্পনা হইতেই পারে না]। তাহার পর, অনিত্য দুঃখাদিকেও বিজ্ঞানেরই অংশ বলিয়া স্বীকার করিতে পার না; কারণ, তাহা হইলে, দুঃখাদি বিষয়সমূহও যখন অনুভূতির বিষয়, তখন দুঃখাদি বিষয়কেও বিজ্ঞানাতিরিক্ত বলিয়া স্বীকার করাই আবশ্যক হইতেছে। যদি বল, অনিত্য

১০৭০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

দুঃখাদিই বিজ্ঞানের স্বরূপ; তাহা হইলেও, সেই দুঃখাদির অভাবে বিজ্ঞানের বিশুদ্ধি কল্পনা করা সঙ্গত হইতে পারে না; কেন না, যে সমস্ত মল বা দোষ সংযোগী(অস্বাভাবিক—আগন্তুক), সেই সমুদয় মলের বিয়োগেই বস্তুর বিশুদ্ধি সিদ্ধ হইয়া থাকে,[তেমনি]; কিন্তু যাহা যাহার স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম্ম, তাহার সহিত কখনও তাহার বিয়োগ হইতে পারে না, এবং কুত্রাপি সেরূপ দেখিতেও পাওয়া যায় না; স্বভাবসিদ্ধ প্রকাশ ও উষ্ণতারহিত অগ্নি কোথাও কাহারো দৃষ্টিগোচর হয় নাই এবং হইবেও না। তবে যে, অন্য দ্রব্যের সংযোগে পুষ্পের স্বভাবসিদ্ধ লৌহিত্যাদি গুণের বিয়োগ(বিপর্যয়) দেখিতে পাওয়া যায়, সেখানেও ঐসমস্ত গুণ সংযোগজন্য বলিয়াই অনুমিত হইয়া থাকে; কেন না, দেখিতে পাওয়া যায়,— দ্রব্যবিশেষ দ্বারা ভাবনা দিলে পুষ্পে ও ফলে অন্যপ্রকার গুণ উৎপন্ন হইয়া থাকে; কাজেই বলিতে হইবে যে, উক্ত ক্ষণিকবাদে বিজ্ঞানের বিশুদ্ধি কল্পনা রক্ষা করা সম্ভবপর হয় না। ২৯

তাহার পর, তোমরা যে, বিষয়-বিষয়িভাবে প্রতিভাসমান বিজ্ঞানের অস- ত্যতা-প্রতীতিকেই বিজ্ঞান-মল বলিয়া কল্পনা করিয়া থাক;[বিজ্ঞানানিরিক্ত পদার্থ না থাকায়] বিজ্ঞানের সহিত অপরের সম্বন্ধ সম্ভাবনা না হওয়ায় তাহাও উপপন্ন হয় না; যাহা অবিদ্যমান—অসত্য, তাহার সহিত বিদ্যমান সত্য পদার্থের সম্বন্ধ হইতেই পারে না। যদি অন্য পদার্থের সহিত সম্বন্ধেরই সম্ভাবনা না রহিল, তবে, যাহার যেরূপ ধর্ম দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার তাহাই স্বাভাবিক বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে; সুতরাং অগ্নির উষ্ণতা ও আদিত্যের প্রকাশ ধৰ্ম্ম যেরূপ কস্মিন্ কালেও অগ্নি ও আদিত্য হইতে বিযুক্ত হয় না, তদ্রূপ বিজ্ঞানের ও ঐ স্বাভাবিক ধর্ম্মের বিয়োগ হওয়া কখনও সম্ভবপর হইতে পারে না; অতএব তোমাদের যে, আগন্তুক বস্তুসম্বন্ধবশতঃ বিজ্ঞানের মালিন্য ও তাহার বিয়োগরূপ বিশুদ্ধি কল্পনা, বেশ বুঝা যাইতেছে যে, তাহা অপ্রামাণিক ‘অন্ধপরম্পরা’ ভিন্ন আর কিছুই নহে। ৩০

ইহার উপর, তাহারা যে, সেই বিজ্ঞানেরই নির্ব্বাণকে(পরিসমাপ্তিকে) পুরুষার্থ(পুরুষের প্রার্থনীয় মোক্ষ) বলিয়া কল্পনা করিয়া থাকে; তাহাতেও সেই নির্ব্বাণরূপ ফলের আশ্রয় বা ফলভাগী মিলিতেছে না। দেখ, যাহার শরীরে কণ্টক বিদ্ধ হয়, সেই কন্টকবিদ্ধ পুরুষের মৃত্যু হইলে, সে কখনই সেই কণ্টক- বেধজনিত দুঃখ-নিবৃত্তিরূপ ফলের আশ্রয় হইতে পারে না; এইরূপ বিজ্ঞান- রূপী পুরুষের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হইলে এবং উক্ত ফলের আশ্রয়ও কেহ না

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৭১

থাকিলে, উক্ত পুরুষার্থ কল্পনা নিশ্চয়ই বিফল বা অনাবশ্যক হইয়া পড়ে। কারণ, [তোমার মতে] পুরুষ-শব্দবাচ্য যে, বুদ্ধি-বিজ্ঞানরূপী আত্মার প্রয়োজনকে পুরুষার্থ বলিয়া কল্পনা করা হইতেছে; সেই পুরুষপদবাচ্য বিজ্ঞানের নির্ব্বাণ বা উচ্ছেদ হইয়া গেলে, বল দেখি, কাহার অর্থ(প্রয়োজন) ‘পুরুষার্থ’ বলিয়া পরিগণিত হইবে? পক্ষান্তরে, যাহার মতে বহু বিষয়দর্শী বিজ্ঞানাতিরিক্ত আত্মা আছে, তাহার মতে প্রত্যক্ষ ও স্মরণের বিষয়ীভূত দুঃখনিদানের সহিত সংযোগ- বিয়োগাদি সমস্তই উপপন্ন হয়,—অপর পদার্থের সংসর্গে মালিন্য ও তাহার বিয়োগে বিশুদ্ধি, ইত্যাদি সমস্ত কথাই সঙ্গত হয়,[কিন্তু বিজ্ঞানবাদে তাহার কোনটাই উপপন্ন হয় না]। তাহার পর শূন্যবাদী বৌদ্ধের মতটা ত সর্ব্ব- প্রমাণবিরুদ্ধ; সুতরাং এখানে তাহার প্রতিষেধ বা খণ্ডনের জন্য আর পৃথক্ যত্ন করা হইল না ॥২৫৮৷৷৭৷৷

স বা অয়ং পুরুষো জায়মানঃ শরীরমভিসম্পদ্যমানঃ পাপ্মভিঃ সংসৃজ্যতে, স উৎক্রামন্ ম্রিয়মাণঃ পাপ্ননো বিজহাতি ॥ ২৫৯ ॥ ৮ ॥

সন্নলার্থঃ।—সঃ(পূর্ব্বোক্তঃ) অয়ং(বিজ্ঞানময়ঃ) পুরুষঃ বৈ(অবধারণে) জায়মানঃ—শরীরম্ অভিসম্পদ্যমানঃ(অভিনব-দেহেন্দ্রিয়সমষ্টিম্ আদদানঃ সন্) পাপ্নভিঃ(পাপৈঃ) সংসৃজ্যতে(সংযুজ্যতে), সঃ(পূর্ব্বোক্তঃ পুরুষঃ) উৎ- ক্রামন্(দেহাৎ নির্গচ্ছন্) ম্রিয়মাণঃ সন্ পাপানঃ(পাপানি) বিজহাতি (ত্যজতি) ॥২৫৯৷৷৮৷৷

মূলানুবাদ।—ইতঃপূর্ব্বে যে পুরুষের কথা বলা হইয়াছে, সেই এই পুরুষ যখন জন্মে—শরীর ধারণ করে, তখনই পাপের সহিত সংমিলিত হয়(সংযুক্ত হয়), আবার সেই পুরুষই যখন দেহ হইতে বহির্গত হয়—মুমুর্ষু হয়, তখন সেই সমস্ত পাপ পরিত্যাগ করে ॥ ২৫৯ ॥ ৮ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—যথৈব ইহৈকস্মিন্ দেহে স্বপ্নো ভূত্বা মৃত্যো রূপানি কার্য্যকরণানি অতিক্রম্য স্বপ্নে স্বে আত্মজ্যোতিষি আস্তে, এবং স বৈ প্রকৃতঃ পুরুষঃ অয়ং জায়মানঃ—কথং জায়মানঃ? ইতি—উচ্যতে—শরীরৎ দেহেন্দ্রিয়- সঙ্ঘাতম্ অভিসম্পদ্যমানঃ শরীরে আত্মভাবমাপদ্যমান ইত্যর্থঃ। পাপুভিঃ পাপু- সমবায়িভির্ধৰ্ম্মাধৰ্মাশ্রয়ৈঃ কার্য্যকরণৈরিত্যর্থঃ, সংসৃজ্যতে সংযুজ্যতে; স এবোৎ- ক্রামন্ শরীরান্তরম্ উর্দ্ধং ক্রামন্ গচ্ছন্; ম্রিয়মাণ ইত্যেতস্য ব্যাখ্যানম্ উৎক্রাম-

১০৭২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

স্থিতি; তানেব সংস্থীষ্টান্ পাপ্যরূপান্ কার্য্যকরণলক্ষ্মান্ বিজহাতি তৈর্বিষুযাতে তান্ পরিত্যাগতি।

যথায়ং স্বপ্নজাগ্রদ্বৃত্ত্যোর্ব্বর্তমান একৈকস্মিন্নেব দেহে পাপমরূপকার্য্যকরণো- পাদান-পরিত্যাগাভ্যাম্ অনবরতৎ সঞ্চরতি—ধিয়া সমানঃ সন্; তথা সোহয়ৎ পুরুষঃ উভৌ ইহলোক-পরলোকৌ জন্মমরণাভ্যাং কার্য্যকরণোপাদান-পরিত্যাগা- বনবরতৎ প্রতিপদ্যমান আ সংসারমোক্ষাৎ সঞ্চরতি, তস্মাৎ সিদ্ধমস্যাত্মজ্যোতি- যোহন্যত্বং কার্য্যকরণরূপেভ্যঃ পাপমভ্যঃ সংযোগবিয়োগাভ্যাম্; ন হি তদ্ধর্ম্মত্বে সতি তৈরেব সংযোগো বিয়োগো বা যুক্তঃ ॥২৫৯৷৷৮৷৷

টীকা। প্রসঙ্গাগতং পরপক্ষং নিরাকৃত্য শ্রুতিব্যাখ্যানমেবানুবর্তয়ন্নুত্তরবাক্যতাৎপর্য্যমাহ- যথেতি। এবমাত্মা দেহভেদেহপি বর্তমানং জন্ম ত্যজন্ জন্মান্তরং চোপাদদানঃ কার্যকরণান্যতি- ক্রামতীতি শেষঃ। অতঃ স্বপ্নজাগরিতসঞ্চারাদ্দেহাদ্যতিরেকবদিহলোকপরলোকসঞ্চারোক্ত্যাপি তদতিরেকস্তস্যোচ্যতেহনন্তরবাক্যেনেত্যর্থঃ। সম্প্রত্যুত্তরং বাক্যং গৃহীত্বা ব্যাকরোতি-স বা ইত্যাদিনা। পাপ্যশব্দস্য লক্ষণয়া তৎকার্য্যবিষয়ত্বং দর্শয়তি-পাপ্যসমবায়িভিরিতি। পাপ্যশব্দস্য পাপবাচিত্বেহপি কার্যসাম্যাদ্ধর্ম্মেইপি বৃত্তিং সূচয়তি-ধৰ্ম্মাধর্মেতি। উক্তমর্থং দৃষ্টান্তত্বেনানুবদতি- যথেতি। অবস্থান্বয়সঞ্চারস্থ লোকদ্বয়সঞ্চারং দাষ্টান্তিকমাহ-তথেতি। ইহলোকপরলোকাবনবরতং সঞ্চরতীতি সম্বন্ধঃ। সঞ্চরণপ্রকারং প্রকটয়তি-জন্মেতি। জন্মনা কার্যকরণয়োরুপাদানং, মরণেন চ তয়োস্ত্যাগমবিচ্ছেদেন লভমানো মোক্ষাদর্ব্বাগনবরতং সঞ্চরন্ দুঃখী ভবতীত্যর্থঃ। স বা ইত্যাদিবাক্যতাৎপর্যমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। তচ্ছব্দার্থমেব স্ফুটয়তি-সংযোগেতি। কথমেতাবতা তেভ্যোহন্যত্বং, তত্রাহ-ন হীতি। স্বাভাবিকস্য হি ধৰ্ম্মস্য সতি স্বভাবে কুতঃ সংযোগবিয়োগৌ বহ্নৌঞ্চ্যাদিম্বদর্শনাৎ, কার্যকরণয়োশ্চ সংযোগবিভাগবশাদস্বাভাবিকত্বে সিদ্ধমাত্মনস্তদহ্যত্বমিত্যর্থ: ॥২৫৯৷৮॥

ভাষ্যানুবাদ।—এই একই পুরুষ বর্তমান দেহে যেমন স্বপ্নাবস্থা প্রাপ্ত হইয়া কার্য্যকরণময় দেহেন্দ্রিয়ভাব অতিক্রম করত স্বীয় আত্মজ্যোতিস্বরূপে অবস্থান করে, তেমনি সেই এই প্রস্তাবিত(পূর্ব্ব শ্রুত্যুক্ত) পুরুষও জায়মান হইয়া,—ভাল, পুরুষের আবার জন্ম কিরূপ? তদুত্তরে বলিতেছেন—দেহেন্দ্রিয়সমষ্টিকে প্রাপ্ত হইয়া—স্কুল শরীরে আত্মভাব স্থাপন করিয়া পাপসমূহের সহিত অর্থাৎ পাপপদবাচ্য ধর্ম্মাধর্ম্মের আশ্রয়ীভূত দেহেন্দ্রিয়ের সহিত সংসৃষ্ট হয়—সংযুক্ত হয়; আবার সেই পুরুষই যখন উৎক্রমণ করে—ভাবী শরীর গ্রহণের জন্য গমন করে অর্থাৎ মৃত্যু- গ্রাসে পতিত হয়,—[এখানে বুঝিতে হইবে—] ‘উৎক্রামন্’ কথাটা ‘ম্রিয়মাণ’ কথারই ব্যাখ্যা স্বরূপ। তখন পূর্ব্বলব্ধ পাপফল দেহেন্দ্রিয়সঙ্ঘাত পরিত্যাগ করে, অর্থাৎ প্রাপ্ত দেহাদির সহিত বিযুক্ত হয়।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৭৯

এই পুরুষ বর্তমান এক দেহেই যেমন বুদ্ধিসাম্য প্রাপ্ত হইয়া, স্বপ্ন ও জাগরণা- বস্থাভেদে পাপরূপ দেহেন্দ্রিয়াদির গ্রহণ ও পরিত্যাগপূর্ব্বক নিরন্তর সঞ্চরণ করে, এই পুরুষ ঠিক তেমনি মুক্তি না হওয়া পর্য্যন্ত জন্ম-মরণক্রমে দেহেন্দ্রিয়ের গ্রহণ ও পরিত্যাগরূপ ইহলোক ও পরলোক সর্ব্বদা লাভ করিয়া থাকে। অতএব পাপৃম শব্দবাচ্য দেহেন্দ্রিয়াদির সহিত সংযোগ ও বিয়োগ ঘটে বলিয়াই দেহেন্দ্রিয়াদি হইতে আত্ম-জ্যোতির পার্থক্য প্রমাণিত হইতেছে; কেন না, আত্মজ্যোতিঃ যদি দেহেন্দ্রিয়েরই ধর্ম্ম হইত, তাহা হইলে কখনই তদুভয়ের বিচ্ছেদ সম্ভব হইত না ॥২৫৯৷৷৮৷৷

আভাসভাষ্যম্।—ননু ন স্তঃ অন্যোভৌ লোকৌ, যৌ জন্ম- মরণাভ্যামনুক্রমেণ সঞ্চরতি—স্বপ্ন-জাগরিতে ইব; স্বপ্নজাগরিতে তু প্রত্যক্ষ- মবগম্যেতে, ন ত্বিহলোক-পরলোকৌ কেনচিৎ প্রমাণেন; তস্মাদেতে এব স্বপ্ন- জাগরিতে ইহলোক-পরলোকাবিতি। উচ্যতে—

আভাসভাষ্যানুবাদ।-আচ্ছা জিজ্ঞাসা করি, এই পুরুষ লোক- প্রসিদ্ধ স্বপ্ন-জাগরিতাবস্থার ন্যায় জন্ম-মরণক্রমে, যে লোকদ্বয়ে সঞ্চরণ করিবে, সেই উভয় লোকদ্বয়ের সদ্ভাবে ত কোন প্রমাণ নাই? স্বপ্ন ও জাগ্রদবস্থা প্রত্যক্ষ করিতে পারা যায়; সুতরাং তদ্বিষয়ে সংশয়ের কোন কারণ নাই; কিন্তু ইহলোক ও পরলোক ত কেহই প্রত্যক্ষ করিতে পারে না; অতএব[মনে হয়,] উক্ত স্বপ্ন ও জাগরণাবস্থাই যথাক্রমে ইহলোক ও পরলোক-পদবাচ্য,[তদতিরিক্ত লোক- দ্বয়ের সদ্ভাবে কোনই প্রমাণ নাই]। তদুত্তরে বলা হইতেছে—

তস্য বা এতস্য পুরুষস্য দ্বে এব স্থানে ভবত ইদঞ্চ পরলোকস্থানঞ্চ, সন্ধ্যং তৃতীয়স্বপ্নস্থানম্, তস্মিন্ সন্ধ্যে স্থানে তিষ্ঠন্নেতে উভে স্থানে পশ্যতীদঞ্চ পরলোকস্থানং চ। অথ যথাক্রমোহয়ং পরলোকস্থানে ভবতি তমাক্রমমাক্রম্যোভয়ান্ পাপ্মন আনন্দাশ্চ পশ্যতি। স যত্র প্রস্বপিত্যস্য লোকস্য সর্ব্বাবতো মাত্রামপাদায় স্বয়ং বিহত্য স্বয়ং নির্ম্মায় স্বেন ভাসা স্বেন জ্যোতিষা প্রস্বপিত্যত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতি- র্ভবতি॥ ॥ ২৬০ ॥ ৯ ॥

মদনাভঃ।—[গদ্য] পুষ্করং ইহনৈকশত্রুগণং গচ্ছন্তি কুসুমী—

১০৭৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তস্যেত্যাদি]। তস্য(পূর্ব্বোক্তস্থ্য) এতস্য(হৃদয়াবস্থিতস্থ্য) পুরুষস্থ্য বৈ দ্বেএব স্থানে (অবস্থে) ভবতঃ।[কে তে? ইত্যাহ—] ইদৎ(বর্তমানজন্মরূপং) চ পরলোক- স্থানং(পরজন্ম) চ, তৃতীয়ং চ সন্ধ্যং স্বপ্নস্থানম্। তস্মিন্ সন্ধ্যে স্থানে তিষ্ঠন্(বর্ত্ত- মানঃ সন্) এতে(উক্তে) উভে স্থানে ইদৎ(বর্তমানং জন্ম) চ পরলোকস্থানং চ পশ্যতি।

অথ(প্রশ্নে-কথৎ পশ্যতীত্যর্থঃ), অয়ং পুরুষঃ পরলোকস্থানে(পরলোক- নিমিত্তম্) যথাক্রমঃ(আক্লামতি অনেন ইতি আক্রমঃ=আশ্রয়ঃ-বিদ্যা-কৰ্ম্ম- পূর্ব্বপ্রজ্ঞাত্মকঃ, স যাদৃশঃ অন্য পুরুষস্য,-যথাক্রমঃ যাদৃশসাধনসম্পন্নঃ) ভবতি, তং(আক্রমৎ) আক্রম্য(অবলম্ব্য) উভয়ান পাপ্মনঃ(পাপফলানি দুঃখানি) আনন্দান্(পুণ্যফলানি সুখানি) চ পশ্যতি।(যথোক্তঃ পুরুষঃ) যত্র(যস্মিন্ কালে) প্রস্বপিতি(সন্ধ্যৎ স্থানং প্রাপ্নোতি),[তদা] সর্ব্বাবতঃ(পাপ্সংসর্গ- কারণীভূত-ভূতভৌতিক-মাত্রাসম্পন্নস্য) অন্য লোকস্য(জাগরিতাবস্থায়াঃ) মাত্রাৎ (একদেশৎ সংস্কারং) অপাদায়(গৃহীত্বা), স্বয়ং বিহত্য(দেহং বোধরহিতং কৃত্বা), স্বয়ং নির্মায়(বাসনাময়ং স্বপ্নদেহং বিরচ্য) স্বেন(স্বকীয়েন) ভাসা(গ্রাহ্য- রূপেণ প্রকাশেন) স্বেন জ্যোতিষা(তৎপ্রকাশকেন আত্মচৈতন্যেন)[প্রজ্বলিতঃ সন্] প্রস্বপিতি(স্বপ্নাবস্থাৎ প্রতিপদ্যতে)। অত্র(স্বপ্নাবস্থায়াং) অয়ং পুরুষঃ স্বয়ং জ্যোতিঃ(স্বপ্রকাশচিৎস্বরূপঃ) ভবতি ॥২৬০৷৷৯৷৷

মূলানুবাদ:-এই যথোক্ত পুরুষের দুইটা মাত্র স্থান (ভোগভূমি) আছে-বর্তমান জন্ম বা ইহলোক ও পরলোক; এত- দতিরিক্ত সন্ধ্য-জাগ্রৎ ও স্বপ্নের মধ্যবর্তী তৃতীয় একটা স্থান আছে; তাহার নাম-স্বপ্নস্থান। উক্ত পুরুষ সেই সন্ধ্যস্থানে বর্তমান থাকিয়া ইহলোক(বর্তমান জন্ম) ও পরলোক, এই উভয় স্থান দেখিতে পায়। কিরূপে দেখিতে পায়? তদুত্তরে বলিতেছেন-এই পুরুষ পরলোকের নিমিত্ত এখানে যেরূপ সাধন(জ্ঞান, কৰ্ম্ম প্রভৃতি) সঞ্চয় করে, সে সমুদয়কে অবলম্বন করিয়া অর্থাৎ তদনুসারে পাপফল দুঃখ ও পুণ্যফল আনন্দ উপভোগ করিয়া থাকে। সে যখন স্বপ্নাবস্থা লাভ করে, সে সময়, ভূতভৌতিক বিকারসম্পন্ন এই লোকের অর্থাৎ জাগরিত স্থানের একাংশ সংস্কারমাত্র গ্রহণ করিয়া, নিজেই দেহকে সংজ্ঞাহীন করিয়া, এবং নিজেই বাসনাময় অপর দেহ ও দৃশ্য রচনা করিয়া, প্রকাশময়

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৭৫

স্বীয় চৈতন্যকে নিজ নিত্য চৈতন্য দ্বারা প্রকাশ করত স্বপ্নাবস্থা অনুভব করিতে থাকে। এই সময়েই পুরুষ স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপ হইয়া থাকে ॥ ২৬০ ॥ ৯॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তস্যৈতস্য পুরুষস্য বৈ দ্বে এব স্থানে ভবতঃ, ন তৃতীয়ং চতুর্থৎ বা। কে তে? ইদং চ যৎ প্রতিপন্নং বর্তমানং জন্ম শরীরেন্দ্রিয়বিষয়- বেদনাবিশিষ্টং স্থানং প্রত্যক্ষতোহনুভূয়মানম্; পরলোক এব স্থানং পরলোক- স্থানম্, তচ্চ শরীরাদিবিয়োগোত্তরকালানুভাব্যম্। ননু স্বপ্নোহপি পরলোকঃ, তথা চ সতি দ্বে এবেত্যবধারণমযুক্তম্; ন; কথং তর্হি? সন্ধ্যং তৎ, ইহলোক- পরলোকয়োর্যঃ সন্ধিস্তস্মিন্ ভবৎ সন্ধ্যম্, যৎ তৃতীয়ং, তৎ স্বপ্নস্থানম্; তেন স্থান- দ্বিত্বাবধারণম্; ন হি গ্রাময়োঃ সন্ধিস্তাবেব গ্রামাবপেক্ষ্য তৃতীয়ত্বৎ পরিগণনমর্হতি। কথং পুনস্তস্য পরলোকস্থানস্যাস্তিত্বমবগম্যতে, যদপেক্ষ্য স্বপ্নস্থানং সন্ধ্যৎ ভবেৎ? যতস্তস্মিন্ সন্ধ্যে স্বপ্নস্থানে তিষ্ঠন্ ভবন্ বর্তমানঃ এতে উভে স্থানে পশ্যতি। কে তে উভে? ইদঞ্চ পরলোকস্থানং চ। তস্মাৎ স্তঃ স্বপ্ন-জাগরিতব্যতিরেকে- ণোভৌ লোকৌ, যৌ ধিয়া সমানঃ সন্ননুসঞ্চরতি জন্মমরণসন্তানপ্রবন্ধেন। ১

টীকা। তস্যেত্যাদিবাক্যস্থ ব্যাবর্ত্যাং শঙ্কামাহ-নন্বিতি। অবস্থাদ্বয়বল্লোকদ্বয়সিদ্ধি- রিত্যাশঙ্ক্যাহ-স্বপ্নেতি। কথং তর্হি লোকদ্বয়প্রসিদ্ধিরত আহ-তম্মাদিতি। তত্রোত্তর- ত্বেনোত্তরং বাক্যমুখাপ্য ব্যাকরোতি-উচ্যত ইতি। স্থানদ্বয়প্রসিদ্ধিওতনার্থো বৈশব্দঃ। অবধারণং বিবৃণোতি-নেতি। বেদনা সুখদুঃখাদিলক্ষণা। আগমন্য পরলোকসাধকত্বমভি- প্রেত্যাহ-তচ্চেতি। অবধারণমাক্ষিপতি-নন্বিতি। তস্য স্থানান্তরত্বং দূষয়তি-নেতি। স্বপ্নস্য লোকদ্বয়াতিরিক্তস্থানত্বাভাবে কথং তৃতীয়ত্বপ্রসিদ্ধিরিত্যাহ-কথমিতি। তস্য সন্ধ্যত্বান্ন স্থানান্তরত্বমিত্যুত্তরমাহ-সন্ধ্যং তদিতি। সন্ধ্যত্বং ব্যুৎপাদয়তি-ইহেতি। যৎ স্বপ্নস্থানং তৃতীয়ং মন্যসে, তদিহলোকপরলোকয়োঃ সন্ধ্যমিতি সম্বন্ধঃ। অন্য সন্ধ্যত্বে ফলিতমাহ- তেনেতি। পূরণপ্রত্যয়শ্রুত্যা স্থানান্তরত্বমেব স্বপ্নস্য কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্য প্রথমশ্রুতসন্ধ্যশব্দ- বিরোধান্ মৈবমিত্যাহ-ন হীতি। পরলোকান্তিত্বে প্রমাণান্তরজিজ্ঞাসয়া পৃচ্ছতি-কথমিতি। প্রত্যক্ষঃ প্রমাণয়ন্নুত্তরমাহ-যত ইত্যাদিনা। ১

কথং পুনঃ স্বপ্নে স্থিতঃ সন্নভৌ লোকৌ পশ্যতি-কিমাশ্রয়ঃ কেন বিধিনেতি? উচ্যতে-অথ কথং পশ্যতীতি? শৃণু,-যথাক্রমঃ আক্রামত্যনেনেতি আক্ৰম আশ্রয়োহবষ্টন্ত ইত্যর্থঃ, যাদৃশ আক্রমোহস্য, সোহয়ং যথাক্রমঃ; অয়ৎ পুরুষঃ পরলোকস্থানে প্রতিপত্তব্যে নিমিত্তে যথাক্রমো ভবতি, তাদৃশেন পরলোক- প্রতিপত্তিসাধনেন বিদ্যাকৰ্ম্মপূর্বপ্রজ্ঞালক্ষণেন যুক্তো ভবতীত্যর্থঃ। তমাক্রমৎ পরলোকস্থানায়োন্মুখীভূতং প্রাপ্তাঙ্কুরীভাবমিব বীজৎ তমাক্রমম্ আক্রম্যাবষ্টভ্যা-

১০৭৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

শ্রিত্য উভয়ান্ পশ্যতি বহুবচনং ধৰ্মাধৰ্ম্মফলানেকত্বাৎ, উভয়প্রকারানিত্যর্থঃ। কাংস্তান্?—পাপৃমনঃ পাপফলানি, ন তু পুনঃ সাক্ষাদেব পাপৃমনাৎ দর্শনৎ সম্ভবতি, তস্মাৎ পাপফলানি দুঃখানীত্যর্থঃ। আনন্দাংশ্চ ধর্মফলানি সুখানীত্যে- তৎ; তানুভয়ান্ পাপৃমন আনন্দাংশ্চ পশ্যতি জন্মান্তরদৃষ্টবাসনাময়ান্; যানি চ প্রতিপত্তব্য-জন্মবিষয়াণি ক্ষুদ্রধৰ্ম্মাধৰ্ম্মফলানি ধৰ্মাধৰ্ম্মপ্রযুক্তো দেবতানুগ্রহাদ্বা পশ্যতি। ২

স্বপ্নপ্রত্যক্ষং পরলোকাস্তিত্বে প্রমাণমিত্যুক্তং, তদেবোত্তরবাক্যেন(৭) স্ফুটয়িতুং পৃচ্ছতি- কথমিতি। কথং শব্দার্থমেব প্রকটয়তি-কিমিত্যাদিনা। উত্তরবাক্যমুত্তরত্বেনোখাপয়তি- উচ্যত ইতি। তত্রাথশব্দমুক্তপ্রশ্নার্থতয়া ব্যাকরোতি-অথেতি। উত্তরভাগমুত্তরত্বেন ব্যাচষ্টে- শৃণ্বিতি। যদুক্তং কিমাশ্রয় ইতি, তত্রাহ-যথাক্রম ইতি। যদুক্তং কেন বিধিনেতি, তত্রাহ- তমাক্রমমিতি। পাপ্মশব্দস্য যথাশ্রুতার্থত্বে সম্ভবতি কিমিতি ফলবিষয়ত্বং, তত্রাহ-ন ত্বিতি। সাক্ষাদাগমাদৃতে প্রত্যক্ষেণেতি যাবৎ। পাপ্মনামেব সাক্ষাদ্দর্শনাসম্ভবস্তচ্চব্দার্থঃ। কথং পুনরাদ্যে বয়সি পাপ্মনামানন্দানাং চ স্বপ্নে দর্শনং তত্রাহ-জন্মান্তরেতি। যদ্যপি মধ্যমে বয়সি করণপাটবাদৈহিকবাসনয়া স্বপ্নো দৃশ্যতে তথাপি কথমন্তিমে বয়সি স্বপ্নদর্শনং, তদাহ- যানি চেতি। ফলানাং ক্ষুদ্রত্বমত্র লেশতো ভুক্তত্বম্। যানীত্যুপক্রমোক্তানীত্যুপসংখ্যা- তব্যম্। ২

তৎ কথমবগম্যতে পরলোকস্থানভাবি তৎপাপৃমসন্দর্শনং স্বপ্নে ইতি; উচ্যতে—যম্মাদিহ জন্মন্যননুভাব্যমপি পশ্যতি বহু। ন চ স্বপ্নো নামাপূর্ব্বং দর্শনম্, পূর্ব্বদৃষ্টস্মৃতিহি স্বপ্নঃ প্রায়েণ; তেন স্বপ্নজাগরিতস্থানব্যতিরেকেণ স্ত উভৌ লোকৌ। ৩

ঐহিকবাসনাবশাদৈহিকানামের পাপ্মনামানন্দানাং চ স্বপ্নে দর্শনসম্ভবান্ন স্বপ্নপ্রত্যক্ষং পরলোকসাধকমিতি শঙ্কতে—তৎকথমিতি। পরিহরতি—উচ্যত ইতি। যদ্যপি স্বপ্নে মনুষ্যাণামিন্দ্রাদিভাবোহননুভূতোহপি ভাতি, তথাপি তদপূর্ব্বমেব দর্শনমিত্যাশঙ্ক্যাহ—ন চেতি। স্বপ্নধিয়া ভাবিজন্মভাবিনোহপি স্বপ্নে দর্শনাৎ প্রারেণেত্যুক্তম্। ন চ তদপূর্ব্বদর্শনমপি সম্যগ্‌- জ্ঞানমুখানপ্রত্যয়বাধাৎ। ন চৈবং স্বপ্নধিয়া ভাবিজন্মাসিদ্ধির্যথাজ্ঞানসমর্থাঙ্গীকারাদিতি ভাবঃ। প্রমাণফলমুপসংহরতি—তেনেতি। ৩

যদ্ আদিত্যাদি-বাহ্যজ্যোতিষাম্ অভাবে অয়ং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতঃ পুরুষঃ যেন ব্যতিরিক্তেনাত্মনা জ্যোতিষা ব্যবহারতীত্যুক্তম্, তদেব নাস্তি, যদাদিত্যাদি- জ্যোতিষামভাবগমনম্; যত্রেদৎ বিবিক্তং স্বয়ং জ্যোতিরুপলভ্যেত; যেন সর্ব্বদৈবায়ং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতঃ সংসৃষ্ট এবোপলভ্যতে; তস্মাদসৎসমঃ অসন্নেব বা স্বেন বিবিক্তস্বভাবেন জ্যোতীরূপেণাত্মেতি। অথ কচিদ্বিবিক্তঃ স্বেন জ্যোতি-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৭৭

রূপেণোপলভ্যতে বাহ্যাধ্যাত্মিকভূতভৌতিকসংসর্গশূন্যঃ, ততো যথোক্তং সর্ব্বং ভবিষ্যতীত্যেতদর্থমাহ—। ৪

স যত্রেত্যাদিবাক্যস্থ্য ব্যবহিতেন সম্বন্ধং বক্তুং বৃত্তমনুষ্যাক্ষিপতি—যদিত্যাদিনা। বাহ্য- জ্যোতিরভাবে সত্যয়ং পুরুষঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতো যেন সঙ্ঘাতাতিরিক্তেনাত্মজ্যোতিষা গমনা- গমনাদি নির্বর্ত্তয়তি তদাত্মজ্যোতিরস্তীতি যদুক্তমিত্যনুবাদার্থঃ। বিশিষ্টস্থানাভাবং বক্তুং বিশেষণাভাবং তাবদ্দর্শয়তি—তদেবেতি। আদিত্যাদিজ্যোতিরভাববিশিষ্টস্থানং যত্রেত্যুক্তং, তদেব স্থানং নাস্তি বিশেষণাভাবাদিতি শেষঃ। যথোক্তস্থানাভাবে হেতুমাহ—যেনেতি। সংসৃষ্টো বাহ্যৈর্জ্যোতিভিরিতি শেষঃ। ব্যবহারভূমৌ বাহ্যজ্যোতিরভাবাভাবে ফলিতমাহ— তস্মাদিতি। ৪

স যঃ প্রকৃত আত্মা, যত্র যস্মিন্ কালে প্রস্বপিতি প্রকর্ষেণ স্বাপমনুভবতি, তদা কিমুপাদানঃ কেন বিধিনা স্বপিতি-সন্ধ্যৎ স্থানং প্রতিপদ্যত ইতি, উচ্যতে- অন্য দৃষ্টস্য লোকস্য জাগরিতলক্ষণস্থ্য সর্ব্বাবতঃ,-সর্ব্বমবতীতি সর্ব্বাবান্ অয়ং লোকঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতো বিষয়বেদনাসংযুক্তঃ, সর্ব্বাবত্বমন্য ব্যাখ্যাতমন্নত্রয়প্রকরণে ‘অথো অয়ং বা আত্মা’ ইত্যাদিনা, সর্ব্বা বা ভূতভৌতিকমাত্রা অন্য সংসর্গকারণ- ভূতা বিদ্যন্ত ইতি সর্ব্ববান, সর্ব্ববানেব সর্ব্বাবান্, তস্য সর্ব্বাবতো মাত্রামেকদশ- মবয়বম্ অপাদায়াপচ্ছিদ্যাদায় গৃহীত্বা দৃষ্টজন্মবাসনাবাসিতঃ সন্নিত্যর্থঃ। স্বয়মাত্ম- নৈব বিহত্য দেহৎ পাতয়িত্বা নিঃসম্বোধমাপাদ্য-জাগরিতে হি আদিত্যাদীনাং চক্ষুরাদিঘনুগ্রহো দেহব্যবহারার্থঃ। দেহব্যবহারশ আত্মনো ধর্মাধৰ্ম্মফলোপ- ভোগপ্রযুক্তঃ, তদ্ধর্মাধর্মফলোপভোগোপরমণমস্মিন্ দেহে আত্মকর্মোপরমকৃতম্ ইত্যাত্মাস্থ্য বিহন্তেত্যুচ্যতে। ৫

উত্তরগ্রন্থমুত্তরত্বেনাবতারয়তি-অথেত্যাদিনা। যথোক্তং সর্ব্বব্যতিরিক্তত্বং স্বয়ং জ্যোতিষ্ট- মিত্যাদি। আহ স্বপ্নং প্রস্তৌতীতি যাবৎ। উপাদানশব্দঃ পরিগ্রহবিষয়ঃ। কথমস্য সর্ব্বাবত্ত্বং তদাহ-সর্ব্বাবত্ত্বমিতি। সংসর্গকারণভূতাঃ সাহাধ্যাত্মাদিবিভাগেনেতি শেষঃ। কিমুপাদান ইত্যস্থোত্তরমুক্ত। কেন বিধিনেত্যস্তোত্তরমাহ-স্বয়মিত্যাদিনা। আপাদ্য প্রস্বপিতীত্যুত্তরত্র সম্বন্ধঃ। কথং পুনরাত্মনো দেহবিহস্তত্বং, জাগ্রদ্ধেতুকৰ্ম্মফলোপভোগোপরমণাদ্ধি স বিহন্যতে, তত্রাহ-জাগরিতে হীত্যাদিনা। নির্মাণবিষয়ং দর্শয়তি-বাসনাময়মিতি। যথা মায়াবী মায়াময়ং দেহং নিৰ্ম্মিমীতে, তদ্বদিত্যাহ-ময়োময়মিবেতি। কথং পুনরাত্মনো যথোক্তদেহ- নির্মাণকর্তৃত্বং কৰ্ম্মকৃতত্বাত্তন্নির্মাণস্যেত্যাশঙ্ক্যাহ-নিৰ্ম্মাণমপীতি। স্বেন ভাসেত্যত্রেখং ভাবে তৃতীয়া। করণে তৃতীয়াং ব্যাবর্তয়তি-সা হাঁতি। তত্রেতি স্বপ্নোক্তিঃ। যথোক্তান্তঃকরণ- বৃত্তের্বিষয়ত্বেন প্রকাশমানত্বেইপি স্বভাসো ভবতু করণত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-সা তত্রেতি। স্বেন জ্যোতিষেতি কর্তরি তৃতীয়া। স্বশব্দোহত্রাত্মবিষয়ঃ। কোহয়ং প্রস্বাপো নাম, তত্রাহ- যদেবমিতি বিবিক্তবিশেষণং বিবৃণোতি-বাহ্যেতি। ৫

১০৭৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

স্বরং নির্মায় নির্মাণৎ কৃত্বা বাসনাময়ং স্বপ্নদেহৎ মায়াময়মিব, নির্মাণমপি তৎকর্মাপেক্ষত্বাৎ স্বয়ংকর্তৃকমুচ্যতে; স্বেনাত্মীয়েন ভাসা মাত্রোপাদানলক্ষণেন, ভাসা দীপ্ত্যা প্রকাশেন সর্ব্ববাসনাত্মকেনান্তঃকরণবৃত্তিপ্রকাশেনেত্যর্থঃ। সা হি তত্র বিষয়ভূতা সর্ব্ববাসনাময়ী প্রকাশতে; সা তত্র স্বয়ং ভা উচ্যতে; তেন স্বেন ভাসা বিষয়ভূতেন স্বেন চ জ্যোতিষা তদ্বিষয়িণা বিবিক্তরূপেণালুপ্তদৃস্বভাবেন তদ্ভারূপং বাসনাত্মকং বিষয়ীকুর্ব্বন্ প্রস্বপিতি। যদেবং বর্ত্তনম্, তৎপ্রস্বপিতীত্যু- চ্যতে। অত্র এতস্যামবস্থায়ামেতস্মিন্ কালে অয়ৎ পুরুষ আত্মা স্বয়মেব বিবিক্ত- জ্যোতির্ভবতি; বাহ্যাধ্যাত্মিকভূতভৌতিকসংসর্গরহিতং জ্যোতির্ভবতি। ৬

নন্বস্য লোকস্য মাত্রোপাদানং কৃতম্, কথং তস্মিন্ সতি অত্রায়ৎ পুরুষঃ স্বয়ং জ্যোতির্ভবতীত্যুচ্যতে? নৈষ দোষঃ; বিষয়ভূতমেব হি তৎ; তেনৈব চ অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ং জ্যোতিৰ্দ্দর্শয়িতুং শক্যঃ, ন ত্বন্যথা—অসতি বিষয়ে কস্মিংশ্চিৎ সুযুপ্ত- কাল ইব। যদা পুনঃ সা ভাঃ বাসনাত্মিকা বিষয়ভূতোপলভ্যমানা ভবতি, তদা অসিঃ কোষাদিব নিষ্কৃষ্টঃ সর্ব্বসংসর্গরহিতং চক্ষুরাদিকার্য্যকরণব্যাবৃত্তস্বরূপম্ অলুপ্তদৃক্ আত্মজ্যোতিঃ স্বেন রূপেণ অবভাসয়ৎ গৃহ্যতে। তেন অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ং জ্যোতির্ভবতীতি সিদ্ধম্ ॥২৬০৷৷৯৷৷

স্বপ্নে স্বয়ং জ্যোতিরাত্মেত্যুক্তমাক্ষিপতি-নম্বস্যেতি। বাসনাপরিগ্রহস্য মনোবৃত্তিরূপস্য বিষয়তয়া বিষয়িত্বাভাবাদবিরুদ্ধমাত্মনঃ স্বপ্নে স্বয়ং জ্যোতিষ্ট মিতি সমাধত্তে-নৈষ দোষ ইতি। কুতো বাসনোপাদানস্য বিষয়ত্বমিত্যাশঙ্ক্য স্বয়ং জ্যোতিষ্ট শ্রুতিসামর্থ্যাদিত্যাহ-তেনেতি। মাত্রাদানস্য বিষয়ত্বেনেতি যাবৎ। তদেব ব্যতিরেকমুখেনা(ণা)হ-নত্বিতি। যথা সুযুপ্তিকালে ব্যক্তস্য বিষয়স্যাভাবে স্বয়ং জ্যোতিরাত্মা দর্শয়িতুং ন শক্যতে, তথা স্বপ্নেহপি তস্মাত্তত্র স্বয়ং জ্যোতিষ্ট শ্রুত্যা মাত্রাদানস্য বিষয়ত্বং প্রদর্শিতমিত্যর্থঃ। ভবতু স্বপ্নে বাসনাদানস্য বিষয়ত্বম্, তথাপি কথং স্বয়ং জ্যোতিরাত্মা শক্যতে বিবিচ্য দর্শয়িতুমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যদা পুনরিতি। অবভাসয়দবভাস্যং বাসনাত্মকমন্তঃকরণমিতি শেষঃ। স্বপ্নাবস্থায়ামাত্মনোেবভাসকান্তরাভাবে ফলিতমাহ-তেনেতি। ২৬০। ৯।

ভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্বোক্ত এই পুরুষের দুইটী মাত্র স্থান আছে; তৃতীয় বা চতুর্থ স্থান নাই; সেই দুইটা স্থান কি কি? একটা স্থান হইতেছে এই বর্তমান জন্ম—যাহা শরীর ইন্দ্রিয় বিষয় ও তদনুভবসমন্বিতরূপে প্রত্যক্ষ করা হইতেছে; অপরটা পরলোক স্থান, অর্থাৎ পরলোকরূপ স্থান, দেহেন্দ্রিয়াদি বিরোগের পর যাহা অনুভব করিতে হইবে। ভাল কথা, স্বপ্নও ত একটা পরলোকস্থান মধ্যেই গণনীয়; সুতরাং ‘দুইটা মাত্র স্থান’ এইরূপে অবধারণ করা সঙ্গত হয় কিরূপে? না—তাহা স্বতন্ত্র কোন লোক বা স্থান নহে; তবে কি?

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৭৯

তাহা(স্বপ্ন) সন্ধ্য স্থান; ইহলোক ও পরলোকের মধ্যবর্তী যে স্থান, তাহা হইতে যাহার উৎপত্তি, সেই স্থানের নাম সন্ধ্য; ইহাই তৃতীয় স্বপ্ন স্থান; সুতরাং তাহার নাম সন্ধ্য। “দ্বে এব স্থানে ভবতঃ” বলিয়া যে, জীবস্থানের দ্বিত্বাবধারণ, তাহা অসঙ্গত হয় নাই; কেন না, দুই গ্রামের মধ্যবর্তী সন্ধিস্থান কখনই সেই গ্রামদ্বয়ের অতিরিক্ত তৃতীয় স্থান বলিয়া পরিগণিত হয় না। ভাল, যে পরলোক স্থানকে অপেক্ষা করিয়া স্বপ্ন স্থানটী সন্ধ্য(মধ্যবর্তী) হইতে পারে, সেই পরলোক স্থানের অস্তিত্ব জানা যায় কি উপায়ে? এবং যে জীব সন্ধিক্ষেত্রে অবস্থান করত এই উভয় স্থান অবলোকন করিয়া থাকে, সেই স্থান দুইটা বা কি কি? উত্তর—ইহ এবং পরলোকস্থান, অর্থাৎ বর্তমান জন্ম আর পরজন্ম। অতএব স্বপ্ন ও জাগরণ ভিন্নও অপর দুইটা লোক বা স্থান আছে; পুরুষ বুদ্ধি-সারূপ্য লাভ করত জন্ম-মরণপ্রবাহ পরম্পরা ক্রমে সেই উভয়লোকে সঞ্চরণ করিয়া থাকে।

ভাল কথা, পুরুষ স্বপ্নাবস্থায় অবস্থান করত কিরূপে উভয় লোক অবলোকন করে? তখন তাহার আশ্রয়ই বা কি? এবং দর্শনের প্রণালীই বা কি? হাঁ, সেখানে কিরূপে দর্শন করে, তাহা বলা হইতেছে শ্রবণ কর; যাহার সাহায্যে বা যাহাকে ভর করিয়া আক্রমণ(কার্য্য সাধন) করা যায়, তাহার নাম আক্রম-আশ্রয়; সেই আক্রমটী যে পুরুষের যেরূপ, সেই পুরুষকে ‘যথাক্রম’ বলা হইয়া থাকে। পুরুষ পরলোক পাইবার জন্য এখানে ‘যথাক্রম’ হয়, অর্থাৎ পরলোক প্রাপ্তির উপায়ভূত বিদ্যা, কৰ্ম্ম ও পূর্ব্বপ্রজ্ঞারূপ যাদৃশ সহায় সম্পন্ন হয়, অঙ্কুরীভাবপ্রাপ্ত বীজের ন্যায় সেই আক্রমও যখন পরলোক স্থানের নিমিত্ত উন্মুখ হয়-পুরুষকে পরলোকে লইয়া যাইবার জন্য সচেষ্ট হয়, তখন সেই আক্রম বাসাধনরাশিকে অবলম্বন করিয়া-ভর করিয়া উভয়লোক(ইহলোক ও পর- লোক) নিরীক্ষণ করিতে থাকে। তৎকালে ধর্মাধর্মের বিবিধ বৈচিত্র্য তাহার দৃষ্টিগোচর হইতে থাকে; এই জন্য ‘উভয়’ শব্দে বহুবচন যোগ করা হইয়াছে; ‘উভয়ান’ অর্থ-উভয় প্রকার বুঝিতে হইবে। সেই উভয় প্রকার কি কি? না, পাপরাশি অর্থাৎ পাপের ফলসমূহ; পাপ সাধারণতঃ প্রত্যক্ষ হয় না; এই জন্য এখানে ‘পাপ’ অর্থে পাপফল দুঃখ বুঝিতে হইবে; আর বিবিধ আনন্দ, অর্থাৎ পুণ্যের ফল সুখসমূহ; জন্মান্তরানুভূত বাসনাময় অর্থাৎ পূর্ব্বপূর্ব্ব জন্ম- সঞ্চিত সংস্কারাত্মক সেই পাপ ও পুণ্যের ফল দুঃখ ও সুখসমূহ সন্দর্শন করিতে থাকে; এবং ধর্ম্মাধর্ম্মের সাহায্যে কিংবা দেবতার অনুগ্রহবলে ভবিষ্যৎজন্মে,

১০৮০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যে সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্ম্মাধর্ম্ম ফল অনুভব করিতে হইবে, সে সমস্তও প্রত্যক্ষ করিতে থাকে(১)। ২

ভাল, স্বপ্নাবস্থায় যে, পরলোকভাবী পাপ ও আনন্দ সন্দর্শন হইয়া থাকে, ইহা জানা যায় কিসে? তদুত্তরে বলা হইতেছে যে, যেহেতু ইহজন্মে যাহা অনুভব- গোচর হয় নাই বা হইবার নহে, এরূপ বহু বিষয় স্বপ্নসময়ে দর্শন হইয়া থাকে; অথচ যাহা কস্মিন্কালেও অনুভূত হয় নাই, এরূপ বস্তুদর্শনকে কেহই ‘স্বপ্ন’ বলিয়া নির্দেশ করে না। অধিকাংশ স্বপ্নই পূর্ব্বদৃষ্ট পদার্থের স্মরণ মাত্র; অত- এব স্বীকার করিতে হইবে যে, স্বপ্ন ও জাগ্রৎ অবস্থা ছাড়া আরও দুইটি লোক (ইহলোক ও পরলোক) নিশ্চয়ই আছে। ৩

পুনশ্চ শঙ্কা হইতেছে যে, দেহেন্দ্রিয়াদি সঙ্ঘাতাত্মক এই পুরুষ আদিত্যাদি বাহ্যজ্যোতির অভাবেও, অতিরিক্ত যে আত্মজ্যোতির সাহায্যে ব্যবহার সম্পাদন করিয়া থাকে বলা হইয়াছে; প্রকৃতপক্ষে তাহার সেরূপ অবস্থা একান্ত অসম্ভব, যে অবস্থায় আদিত্যাদি জ্যোতির সম্পূর্ণ অভাব-বিনাশপ্রাপ্তি হয় ও যে অব- স্থায় বাহ্যজ্যোতি-বিরহিত স্বয়ং জ্যোতির স্বরূপ উপলব্ধি হইতে পারে, এবং এই দেহেন্দ্রিয়সংঘাত যাহার সহিত নিত্যই অবিযুক্তরূপে প্রতীতিগোচর হইতে পারে? অতএব আত্মার যে বিবিক্তস্বভাব জ্যোতিঃস্বরূপের কথা বলা হইয়াছে, তাহা অসত্যতুল্য অথবা অসত্যই বটে। যদি কোনও অবস্থায় বাহ্য বা আধ্যাত্মিক ভূত-ভৌতিক জ্যোতির সম্বন্ধ রহিত হইয়া স্বতন্ত্রভাবে স্বীয় জ্যোতিঃস্বরূপ উপ- লব্ধিগোচর হইতে পারে, তাহা হইলেই পূর্ব্বোক্ত সমস্ত কথা সঙ্গত হইতে পারে; এখন এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন-৪

যে আষাঢ়ের কথা বলা হইয়াছে, সেই আষাঢ় যে সময় উত্তমরূপে স্বপ্ন(নিদ্রা)

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৮১

প্রণালী অবলম্বন করিয়া স্বপ্নানুভব-গোচর সর্ব্বাবৎ লোককে[এখানে ‘সর্ব্বাবতঃ’ কথার অর্থ এইরূপ-] সর্ব্বপ্রকার ব্যবহারকে রক্ষা করে বলিয়া বিষয়ানুভূতি- সমন্বিত কার্য্যকরণসমষ্টিরূপ ইহলোকই ‘সর্ব্বাবৎ’; বর্তমানলোকই যে, ‘সর্ব্বাবৎ’ তাহা ইতঃপূর্ব্বে অন্নত্রয় প্রকরণে “অথো অয়ং বা আত্মা” ইত্যাদি বাক্যে বর্ণিত হইয়াছে। অথবা সম্বন্ধের কারণীভূত সর্ব্বপ্রকার ভূতভৌতিক মাত্রা(ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শব্দ স্পর্শাদি বিষয়) বিদ্যমান থাকে বলিয়া’, ইহলোক হইতেছে-‘সর্ব্ববৎ‘। ‘সর্ব্ববৎ’ শব্দ হইতেই ‘সর্ব্বাবৎ’ পদ নিষ্পন্ন করা হইয়াছে; সুতরাং সর্ব্বাবৎ লোক অর্থ- জাগরিতাবস্থা; তাহার মাত্রা-অবয়ব অর্থাৎ কতিপয় অংশ গ্রহণ করিয়া-বর্ত্ত- মান জন্মের সংস্কারসমন্বিত হইয়া, পুরুষ নিজেই নিজের দেহকে নিপাতিত- সংজ্ঞাহীন করিয়া-,[অভিপ্রায় এই যে, জাগরণ সময়ে আদিত্যপ্রভৃতি বাহ্য জ্যোতিঃপদার্থ যে, চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়বর্গের উপকার সাধন করে, দৈহিক ব্যবহার সম্পাদনই তাহার প্রধান উদ্দেশ্য, সেই দৈহিক ব্যাপারনিচয়ও আবার আত্মার ধর্মাধৰ্ম্ম ফলভোগেরই নিমিত্ত; আত্মীয় সেই কর্মরাশির বিরাম হইলেই, এই দেহে ধর্মাধর্মের ফল সুখদুঃখাদি-সম্ভোগেরও বিরাম বা নিবৃত্তি হইয়া যায়; এই কারণে আত্মাকে এই দেহের বিহন্তা(নিহন্তা) বলা হইতেছে। ৫

পুনশ্চ নিজেই নির্মাণ করিয়া—ঐন্দ্রজালিক যেমন মায়াময় দেহ নির্মাণ করে, তেমনি বাসনাময়(পূর্ব্বসংস্কারানুরূপ) স্বপ্নদেহ নির্মাণ করিয়া—পুরুষের ঐরূপ স্বপ্ন- দেহ তদীয় পূর্ব্বকর্মানুসারে হইয়া থাকে; পুরুষই সেই কর্ম্মের কর্তা; এইজন্য স্বপ্ন- দেহ-নির্মাণে পুরুষের কর্তৃত্ব বলা হইয়াছে। তাহার পর স্বীয় দীপ্তি দ্বারা বিষয়- গ্রহণরূপ প্রমাণ দ্বারা—সর্ব্ববিধ বাসনাবিশিষ্ট অন্তঃকরণবৃত্তির প্রকাশন দ্বারা অন্তঃকরণের বৃত্তিই তখন সর্ব্বপ্রকার বাসনাসহকারে গ্রাহ্যবিষয়রূপে প্রকাশ পাইতে থাকে; ‘এই কারণে উহাকে ‘স্বয়ং ভা’(দীপ্তি স্বরূপ) বলা হইয়াছে। বিষয়াত্মক সেই স্বস্বরূপ দীপ্তি এবং তৎপ্রকাশক নির্মাণ বা অবিমিশ্র নিত্য সৎস্বরূপ জ্যোতিঃ- প্রভাবে ঐ বাসনাময় প্রকাশ্যকেও প্রকাশ করত স্বপ্নানুভব করিয়া থাকে। পুরুষের যে, এইরূপ বৃত্তি বা অবস্থান, তাহাই তাহার প্রকৃষ্ট স্বপন বা নিদ্রা বলিয়া কথিত হয়। এই স্বপ্নাবস্থায় পুরুষ(জীব) নিজেই নির্মূল বা অবিমিশ্র জ্যোতিঃস্বরূপ হয়, অর্থাৎ তখন জ্যোতির্ময় আত্মার সহিত বাহ্য বা আধ্যাত্মিক কোনরূপ ভূত ও ভৌতিক জ্যোতির সম্পর্ক থাকে না। ৬

[এবিষয়ে আপত্তি হইতেছে এই যে,] স্বপ্নসময়ে পুরুষ যখন জাগ্রদবস্থার বিষয়সমূহই গ্রহণ করে, তখন তৎসম্পর্কসত্ত্বে, সে সময় স্বয়ংজ্যোতিঃ হয় কিরূপে?

১০৮২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

[উত্তর—] না—ইহা দোষাবহ হয় না; কারণ, পুরুষের যে, জাগ্রৎকালীন বিষয়গ্রহণ, তাহাও তাহার বিষয় স্বরূপই[প্রকাশ্যই]; প্রকাশের সহিত যে, প্রকাশকের ভেদ, ইহা ত স্বতঃসিদ্ধ; সুতরাং সেই সময়েই পুরুষকে স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপে প্রদর্শন করিতে পারা যায়; নচেৎ স্বপ্নসময়ের ন্যায় কোন [বিষয়—প্রকাশ্য] থাকিলে, তাহার স্বয়ংজ্যোতিঃ স্বভাব প্রদর্শন করিতে পারা যায় না।(১)

পরন্তু সেই বাসনাময়ী দীপ্তিই যখন বিষয়রূপে(আত্মপ্রকাশ্যরূপে) উপলব্ধি- গোচর হয়, তখনই চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়াদির সম্পর্কশূন্য নিত্য প্রকাশময় কোষ- নিঃসৃত অসির ন্যায়, সেই আত্মজ্যোতিও স্বস্বরূপে(সর্ব্বাবভাসকরূপে) লোকের প্রতীতিগোচর হইয়া থাকে; এই জন্যই ‘এই সময়ে উক্ত পুরুষ স্বয়ং জ্যোতিঃ হয়’ উক্তি যুক্তিযুক্ত হইল ॥২৬০৷৷৯৷৷

আভাসভাষ্যম্।—নম্বত্র কথং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতিঃ? যেন জাগরিতে ইব গ্রাহ্যগ্রাহকাদিলক্ষণঃ সর্ব্বো ব্যবহারো দৃশ্যতে, চক্ষুরাদ্যনুগ্রাহকাশ্চাদিত্যাদ্যা লোকাস্তথৈব দৃশ্যন্তে, যথা জাগরিতে; তত্র কথং বিশেষাবধারণং ক্রিয়তে—অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতির্ভবতীতি।

উচ্যতে—বৈলক্ষণ্যাৎ স্বপ্নদর্শনস্য; জাগরিতে হি ইন্দ্রিয়-বুদ্ধি-মন-আলো- কাদিব্যাপারসঙ্কীর্ণমাত্মজ্যোতিঃ; ইহ তু স্বপ্নে ইন্দ্রিয়াভাবাৎ তদনুগ্রাহকাদিত্যা- দ্যালোকাভাবাচ্চ বিবিক্তং কেবলং ভবতি, তস্মাদ্বিলক্ষণম্। ননু তথৈব বিষয়া উপলভ্যন্তে স্বপ্নেহপি, যথা জাগরিতে; তত্র কথমিন্দ্রিয়াভাবাদ্বৈলক্ষণ্যমুচ্যতে? ইতি। শৃণু—

টীকা। যদুক্তং স্বপ্নে স্বয়ং জ্যোতিরাত্মেতি, তৎ প্রকারান্তরেণাক্ষিপতি-নন্বিতি। অবস্থাদ্বয়ে বিশেষাভাবকৃতং চোদ্যং দূষয়তি-উচ্যত ইতি। বৈলক্ষণ্যং স্ফুটয়তি-জাগরিতে হীতি। মনস্ত স্বপ্নে সদপি বিষয়ত্বান্ন স্বয়ংজ্যোতিষ্টু বিঘাতীতি ভাবঃ। উক্তং বৈলক্ষণ্যং প্রতীতিমাশ্রিত্যাক্ষিপতি -নন্বিতি। ন তত্রেত্যাদিবাক্যং ব্যাকুর্ব্বন্ উত্তরমাহ-শৃণ্বিতি।

আভাসভঙ্গানুসারে।—এবিষয়ে আপত্তি এই যে, এই পুরুষ পক্ষ-

(১) তাৎপর্য্য—অভিপ্রায় এই যে, অন্যত্র প্রতিফলন ব্যতিরেকে কোন জ্যোতিঃপদার্থই দেখিতে পাওয়া যায় না; উদাহরণ—যেমন সূর্য্যালোক; আকাশে সূর্যরশ্মি বিদ্যমানসত্ত্বেও দেখা যায় না, অথচ কোন স্বচ্ছ পদার্থে পতিত হইবামাত্র, অনায়াসে তাহা বুঝিতে পারা যায়; এইরূপে আত্মজ্যোতিরও প্রতিফলনযোগ্য কোন বিষয় না থাকিলে স্পষ্টানুভূতি হইতে পারে না।

১০৮৩

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

সময়ে স্বয়ং জ্যোতিঃ(অন্য জ্যোতির সম্পর্করহিত) হয় কিরূপে? যেহেতু জাগ- রণ সময়ের ন্যায়, স্বপ্নসময়েও গ্রাহ্য গ্রাহকাদি সমস্ত ব্যবহারই বিদ্যমান থাকে? জাগরণকালে যেমন চক্ষুঃ প্রভৃতির উপকারকারী আদিত্যাদি জ্যোতিঃ বিদ্যমান থাকে, স্বপ্নসময়েও ঠিক তেমনি সমস্ত বিষয় দেখিতে পাওয়া যায়; অতএব ‘এসময়ে(স্বপ্নসময়ে) এই পুরুষ স্বয়ং জ্যোতিঃ হয়’, এরূপ স্থির সিদ্ধান্ত করা হইল কিরূপে?

হাঁ, ইহার পরিহার বলা হইতেছে,—জাগরণ অপেক্ষা স্বপ্নদর্শনের যথেষ্ট বৈলক্ষণ্য রহিয়াছে; জাগরণসময়ে আত্মজ্যোতিঃ স্বভাবতই ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, মন ও বাহ্য আলোকাদি ক্রিয়ার সহিত সঙ্কীর্ণ(সংমিশ্রিত) থাকে; কিন্তু স্বপ্নসময়ে উক্ত ইন্দ্রিয়াদি কিছুই থাকে না—বিরতব্যাপার হইয়া যায়, এবং আদিত্যাদি বাহ্য আলোকেরও অভাব থাকে; এই জন্য পুরুষ সে সময় বিবিক্ত হইয়া পড়ে; সুতরাং স্বপ্ন ও জাগরণের মধ্যে যথেষ্ট বৈলক্ষণ্য রহিয়াছে। ভাল কথা, জাগ্রৎ সময়ে যেরূপ ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা বিষয় রাশি অনুভব করা হইয়া থাকে, স্বপ্নসময়েও যখন সেইরূপই সমস্ত অনুভব করা হয়, তখন(তৎকালে) ইন্দ্রিয়ের অভাব বলা যায় কিরূপে? সুতরাং বৈলক্ষণ্যও বলা যাইতে পারে না?[হাঁ, কিরূপে বৈল- ক্ষণ্য বলা যাইতে পারে, তাহা বলিতেছি,] শ্রবণ কর—

ন তত্র রথা ন রথযোগা ন পন্থানো ভবন্ত্যথ রথান্ রথযোগান্ পথঃ সৃজতে, ন তত্রানন্দা মুদঃ প্রমুদো ভবন্ত্যথা- নন্দান্ মুদঃ প্রমুদঃ সৃজতে, ন তত্র বেশান্তাঃ পুষ্করিণ্যঃ স্রবন্ত্যো ভবন্ত্যথ বেশান্তান্ পুষ্করিণীঃ স্রবন্তীঃ সৃজতে, স হি কর্ত্তা ॥ ২৬১ ॥ ১০ ॥

সরলার্থঃ।—স্বপ্নদৃশ্যানাৎ বৈতথ্যং বক্তমাহ—ন তত্র ইত্যাদি। তত্র (স্বপ্নে) রথাঃ(দৃশ্যমানাঃ রথপ্রভৃতয়ঃ) ন, রথযোগাঃ(রথে যুজ্যন্তে নিব- ধ্যন্তে যে তে অশ্বাদয়ঃ) ন, পন্থানশ্চ ন ভবন্তি(সন্তি); অথ(পুনঃ) রথান্ রথযোগান্ পথঃ সৃজতে(নির্ম্মাতি)[স্বপ্নদর্শীতি শেষঃ];[তথা] তত্র আনন্দাঃ (অভীষ্টবস্তুদর্শনজন্যাঃ), মুদঃ(অভীষ্টবস্তুলাভজন্যাঃ), প্রমুদঃ(অভীষ্টবস্তুভোগ- জন্যাশ্চ) ন ভবন্তি; অথ আনন্দান্, মুদঃ, প্রমুদঃ সৃজতে[স্বপ্নদর্শীতি শেষঃ]; তথা তত্র বেশান্তাঃ(ক্ষুদ্রজলাশয়াঃ), পুষ্করিণ্যঃ, স্রবন্ত্যঃ(নদ্যশ্চ) ন ভবন্তি; অথ বেশান্তান্, পুষ্করিণীঃ, স্রবন্তীঃ সৃজতে।[কস্তত্র রথাদিসৃষ্টিকর্তা? ইত্যাহ—]

১০৮৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হি(নিশ্চয়ে) সঃ(স্বপ্নদ্রষ্টা পুরুষ এব) কর্তা(স্বপ্নে রথাদীনাং নির্মাতা ইত্যর্থঃ) ॥২৬১৷৷১০৷৷

মূলানুবাদ:-[স্বপ্নসময়ে দৃশ্যমান বস্তুসমূহের কল্পিতত্ব প্রদর্শনার্থ বলিতেছেন-] সেই স্বপ্নে রথ নাই, রথে যোজিত অশ্বাদি নাই, এবং গমনোপযোগী পথও নাই; অথচ রথ, অশ্বাদি ও পথ নির্মাণ করে। এইরূপ, স্বপ্নে আনন্দ মুদ্ ও প্রমুদ সমূহ নাই, অথচ সে সমুদয় সৃষ্টি করে; এবং সেই সময় বেশান্ত, পুষ্করিণী ও নদী সমূহ নাই, অথচ সে সমুদয় সৃষ্টি করে[এ সমস্ত সৃষ্টির কর্তা কে? তদুত্তরে বলিতে- ছেন-] সেই স্বপ্নদ্রষ্টা পুরুষই রথাদি সৃষ্টির কর্তা, অর্থাৎ ঐ সমস্ত তাহার পূর্বতন সংস্কার-প্রসূত ॥ ২৬১ ॥ ১০ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।-ন তত্র বিষয়াঃ স্বপ্নে রথাদিলক্ষণাঃ; তথা ন রথ- যোগাঃ-রথেষু যুজ্যন্ত ইতি রণযোগাঃ অশ্বাদয়ঃ তত্র ন বিদ্যন্তে; ন চ পন্থানঃ রথমার্গা ভবন্তি। অথ রথান্ রথযোগান্ পথশ্চ সৃজতে স্বয়ম্। কথং পুনঃ সৃজতে রথাদিসাধনানাং বৃক্ষাদীনামভাবে? উচ্যতে-ননূক্তম্ “অস্য লোকস্য সর্ব্বাবতো মাত্রামপাদায় স্বয়ং বিহত্য স্বয়ং নির্মায়” ইতি। অন্তঃকরণবৃত্তিঃ অন্য লোকস্য বাসনা মাত্রা, তামপাদায়, রথাদিবাসনারূপান্তঃকরণবৃত্তিঃ তদুপলব্ধি- নিমিত্তেন কৰ্ম্মণা চোদ্যমানা দৃশ্যত্বেন ব্যবতিষ্ঠতে; তদুচ্যতে-“স্বয়ৎ নির্মায়” ইতি; তদেবাহ “রথাদীন্ সৃজতে” ইতি; ন তু তত্র করণং বা, করণানুগ্রাহকাণি বা আদিত্যাদিজ্যোতীংষি, তদবভাস্যা বা রথাদয়ো বিষয়া বিদ্যন্তে; তদ্বাসনা- মাত্রন্তু কেবলং তদুপলব্ধিকৰ্ম্মনিমিত্তচোদিতোভূতান্তঃকরণবৃত্ত্যাশ্রয়ং দৃশ্যতে। তদ্- যন্য জ্যোতিষো দৃশ্যতে অলুপ্তদৃশঃ, তদাত্মজ্যোতিরত্র কেবলম্ অসিরিব কোশা- দ্বিবিক্তম্। ১

তথা ন তত্রানন্দাঃ সুখবিশেষাঃ, মুদঃ হর্ষাঃ পুত্রাদিলাভনিমিত্তাঃ, প্রমুদঃ ত- এব প্রকর্ষোপেতাঃ; অথ চানন্দাদীন্ সৃজতে। তথা ন তত্র বেশান্তাঃ পল্ললাঃ, পুষ্করিণ্যস্তড়াগাঃ, স্রবন্ত্যঃ নদ্যো ভবন্তি; অথ বেশান্তাদীন্ সৃজতে বাসনামাত্র- রূপান্। যস্মাৎ স হি কর্তা, তদ্বাসনাশ্রয়-চিত্তবৃত্ত্যুস্তবনিমিত্তকর্ম্ম-হেতুত্বেনেতি অবোচাম তস্য কর্তৃত্বম্; ন তু সাক্ষাদেব তত্র ক্রিয়া সম্ভবতি, সাধনাভাবাৎ; ন হি কারকমন্তরেণ ক্রিয়া সম্ভবতি; ন চ তত্র হস্তপদাদীনি ক্রিয়াকারকাণি সম্ভবন্তি; যত্র তু তানি বিদ্যন্তে জাগরিতে, তত্র আত্মজ্যোতিরবভাদিতৈঃ কার্য্য-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৮৫

করণৈঃ যথাদিবাসনাশ্রয়ান্তঃকরণবভূদ্যুভবনিমিত্তং কর্ম্ম নির্ব্বর্ত্ততে; তেনোচ্যতে— স হি কর্ত্ততি।

তদুক্তম্—‘আত্মনৈবায়ং জ্যোতিষান্তে পল্যয়তে কৰ্ম্ম কুরুতে’ ইতি; তত্রাপি ন পরমার্থতঃ স্বতঃ কর্তৃত্বং চৈতন্যজ্যোতিষঃ অবভাসকত্বব্যতিরেকেণ—যৎ চৈতন্যাত্মজ্যোতিষা অন্তঃকরণদ্বারেণ অবভাসয়তি কার্য্যকরণানি, তদবভাসিতানি কর্মসু ব্যাপ্রিয়ন্তে কার্য্যকরণানি; তত্র কর্তৃত্বমুপচর্য্যত আত্মনঃ। তদুক্তং “ধ্যায়তীব লেলায়তীব” ইতি; তদেবানুদ্যতে—স হি কর্ত্তেতি ইহ হেত্বর্থম্ ॥২৬১৷১০৷৷

টাকা। প্রতীতিং ঘটয়তি—অথেতি। রথাদিসৃষ্টিমাক্ষিপতি—কথং পুনরিতি। বাসনাময়ী সৃষ্টিঃ শ্লিষ্টেত্যুত্তরমাহ—উচ্যত ইতি। তদুপলব্ধিনিমিত্তেনেত্যত্র তচ্ছব্দেন বাসনাত্মিকা মনো- বৃত্তিরেবোক্তা। উক্তমেব প্রপঞ্চয়তি—নত্বিত্যাদিনা। তদুপলব্ধির্বাসনোপলব্ধিঃ, তত্র যৎ কৰ্ম্ম নিমিত্তং, তেন চোদিতা যোদ্ভূতান্তঃকরণবৃত্তিগ্রাহকাবস্থা, তদাশ্রয়ং তদাত্মকং তদ্বাসনারূপং দৃশ্যত ইতি যোজনা। তথাপি কথমাত্মজ্যোতিঃ স্বপ্নে কেবলং সিধ্যতি, তত্রাহ—তদ্যস্যেতি। যথা কোশাদসির্বিবিক্তো ভবতি, তথা দৃশ্যায়া বুদ্ধের্বিবিক্তমাত্মজ্যোতিরিতি কৈবল্যং সাধয়তি— অসিরিবেতি। ১

তথা রথাদ্যভাববদিতি যাবৎ। সুখান্যের বিশিষ্যন্ত ইতি বিশেষাঃ, সুখসামান্যানীত্যর্থঃ। তথেত্যানন্দাদ্যভাবো দৃষ্টান্তিতঃ। অল্পীয়াংসি সরাংসি পব্ললশব্দেনোচ্যন্তে। স হি কর্তেত্যত্র হি-শব্দার্থো যম্মাদিত্যুক্তঃ, তস্মাৎ সৃজতীতি শেষঃ। কুতোহস্য কর্তৃত্বং সহকার্য্যভাবাদিত্যা- শঙ্ক্যাহ-তদ্বাসনেতি। তচ্ছব্দেন বেশান্তাদিগ্রহণম্। তদীয়বাসনাধারশ্চিত্তপরিণামস্তেনো- দ্ভবতি যৎ কৰ্ম্ম, তন্য সৃজ্যমান-নিদানত্বেনেতি যাবৎ। মুখ্যং কর্তৃত্বং বারয়তি-নত্বিতি। তত্রেতি স্বপ্নোক্তিঃ। সাধনাভাবেহপি স্বপ্নে ক্রিয়া কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন হীতি। তর্হি স্বপ্নে কারকাণ্যপি ভবিষ্যন্তি, নেত্যাহ-ন চেতি। তর্হি পূর্ব্বোক্তমপি কর্তৃত্বং কথমিতি চেত্তত্রাহ- যত্র ত্বিতি। উক্তেহর্থে বাক্যোপক্রমমনুকূলয়তি-তদুক্তমিতি। উপক্রমে মুখ্যং কর্তৃত্বমিহ হৌপচারিকমিতি বিশেষমাশঙ্ক্যাহ-তত্রাপীতি। পরমার্থতশ্চৈতন্যজ্যোতিষো ব্যাপারবদুপাধ্যব- ভাসকত্বব্যতিরেকেণ স্বতো ন কর্তৃত্বং বাক্যোপক্রমেহপি বিবক্ষিতমিত্যর্থঃ। আত্মনো বাক্যোপ- ক্রমে কর্তৃত্বমৌপচারিকমিত্যুপসংহরতি-যদিতি। স হি কর্তেত্যোপচারিকং কর্তৃত্বমিত্যুচ্যতে চেৎ, তস্য ধ্যায়তীবেত্যাদিনোক্তত্বাৎ পুনরুক্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-যদুক্তমিতি। অনুবাদে প্রয়োজন- মাহ-হেত্বর্থমিতি। স্বপ্নে রথাদিসৃষ্টাবিতি শেষঃ ॥২৬১৪১০॥

ভাষ্যানুবাদ।—[ জাগ্রদবস্থা হইতে স্বপ্নাবস্থার পার্থক্য এই যে,] স্বপ্নে তৎকালীন দর্শনযোগ্য রথাদি বিষয় বিদ্যমান নাই। সেইরূপ রথযোগ— রথে যে সকলকে সংযোজিত আবদ্ধ করা হয়, সেই রথবাহী অশ্ব প্রভৃতিও সেখানে নাই; এবং রথের গমনোপযোগী পথসমূহও নাই; অথচ সেই সমস্ত রথ, রথযোগ ও পথসমূহও সৃষ্টি করে। রথাদি-নির্মাণের উপকরণ কাষ্ঠাদির অভাবে সৃষ্টি

১০৮৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

করে কিরূপে? ইহার উত্তরে বলা হইতেছে-পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে যে, ‘সর্ব্ব- প্রকার উপকরণসম্পন্ন এই জাগরণাবস্থার মাত্রা(সংস্কার) সংগ্রহ করিয়া এবং নিজেই শরীরকে একবার নিহত করিয়া ও পুনর্ব্বার নির্মাণ করিয়া’ ইত্যাদি। [অভিপ্রায় এই যে, জাগ্রদবস্থার বাসনাসমূহ লইয়া বাসমাময়ী অন্তঃকরণবৃত্তি নিজেই তদুপলব্ধির(বাসনা উপলব্ধির) কারণীভূত প্রাক্তন কর্মরাশি দ্বারা পরিচালিত হইয়া তৎকালদৃশ্য রথাদিরূপে প্রকাশ পাইয়া থাকে; ‘স্বয়ং নির্মায়’ ইত্যাদি কথায় ঐ অভিপ্রায়ই প্রকাশ করা হইয়াছে। এখানে রথাদির সৃষ্টিবোধক বাক্যও সেই ভাবেরই অভিব্যক্তি করিতেছে মাত্র। বাস্তবিকপক্ষে কিন্তু সেখানে করণ-চক্ষুঃ প্রভৃতি, কিংবা চক্ষুঃপ্রভৃতির অনুগ্রাহক সূর্য্যাদি তেজ বা তৎ- প্রকাশ্য রথাদি বিষয় কিছুই বিদ্যমান থাকে না; কেবল জ্ঞান-বাসনা বা মানস- সংস্কারই অন্তঃকরণকে আশ্রয় করিয়া নিজের উপলব্ধিজনক প্রাক্তন কৰ্ম্মপ্রভাবে প্রাদুর্ভূত হইয়া দর্শনপথে উপস্থিত হয়; নিত্য প্রকাশশীল জ্যোতির্ময় আত্মা এখানে কোশ-নির্মুক্ত অসির ন্যায় স্বয়ংজ্যোতিরূপে প্রকাশ পাইয়া থাকে মাত্র। ১

সে সময়ে যেমন রথাদি থাকে না, তেমনি আনন্দ(সুখবিশেষ) মুদ-পুত্রাদি প্রিয় বস্তু লাভজনিত প্রীতি এবং প্রমুদ-প্রিয় বস্তু লাভে নিরতিশয় সুখ, ইহার কিছুই থাকে না; অথচ সেই আনন্দপ্রভৃতি সমস্তই নির্মাণ করে; এইরূপ সেখানে বেশান্ত-ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলাশয়, পুষ্করিণী অর্থাৎ তড়াগ(দিঘী), কিংবা স্রবন্তী-নদীসমূহও নাই; অথচ বাসনাময়(সংস্কারাত্মক) বেশান্তপ্রভৃতি সৃষ্টি করে; যেহেতু তিনিই(আত্মাই) কর্তা।[তাহার কর্তৃত্ব কি প্রকার?] এ আপত্তির উত্তরে পূর্ব্বেই আমরা বলিয়াছি যে, যেহেতু ঐ সমস্ত বাসনার আশ্রয়ভূত অন্তঃকরণে যে, বিবিধ বৃত্তির বিকাশ হয়, জীবের পূর্ব্বকৃত কৰ্ম্মই তাহার একমাত্র নিমিত্ত; এই জন্যই তাহার কর্তৃত্ব আরোপিত হয়; কিন্তু তাহার পক্ষে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে কোন ক্রিয়াসম্পাদনই সম্ভব হয় না; কারণ, সেখানে ক্রিয়ানিষ্পাদক কোনরূপ সাধনসামগ্রী বর্তমান থাকে না; সাধনাভাবে কখনও কোনরূপ ক্রিয়া হইতে পারে না। ক্রিয়া-নিষ্পাদক হস্ত-পদাদি কোন সাধনই (কারকই) সেখানে বিদ্যমান থাকে না সত্য; কিন্তু যে জাগরণদশায় ঐ সমস্ত দেহেন্দ্রিয়াদি বিদ্যমান থাকে, সেই জাগরণদশায় আত্মজ্যোতিঃ দ্বারা এরূপ কৰ্ম্ম নিষ্পাদিত হইয়া থাকে যে, ঐ সমস্ত কর্মজ সংস্কারই মনোমধ্যে সন্নিবিষ্ট থাকিয়া স্বপ্নসময়ে তদনুরূপ বৃত্তি সমুৎপাদন করিয়া দেয়; এই নিমিত্ত ‘স হি কত্তা’ বলিয়া জীবের কর্তৃত্ব অবধারিত করা হইয়াছে। ২

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৮৭

ইতঃপূর্ব্বে ‘পুরুষ আত্মজ্যোতিঃপ্রভাবেই বৃত্তি লাভ করে, কৰ্ম্ম করে এবং সেখান হইতে ফিরিয়া আইসে’ ইত্যাদি বাক্যে এ কথাই উক্ত হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে কিন্তু সেখানেও আত্মা স্বীয় জ্ঞানজ্যোতিঃ দ্বারা অন্তঃকরণাদিকে সমু- দ্ভাসিত করিয়া কর্মে প্রবর্তিত করে বলিয়াই তাহার কর্তৃত্ব নির্দেশ করা হইয়াছে, কিন্তু স্বতঃসিদ্ধ পারমার্থিক কর্তৃত্ব বলা হয় নাই। অভিপ্রায় এই যে, যেহেতু আত্মজ্যোতিঃ অন্তঃকরণ দ্বারা দেহেন্দ্রিয়াদিকে উদ্ভাসিত করে, এবং দেহেন্দ্রিয়াদি সাধনসমূহ তদুদ্ভাসিত হইয়াই নানাবিধ কর্মে ব্যাপৃত হইয়া থাকে, সেই হেতুই আত্মার কর্তৃত্ব-ব্যবহার হইয়া থাকে। অন্য শ্রুতিতেও একথা বলা হইয়াছে; যথা—‘[আত্মা] যেন ধ্যানই করে, যেন স্পন্দনই করে’ ইত্যাদি। আত্মার অকর্তৃত্ব জ্ঞাপনের নিমিত্ত এখানে সেই ‘ধ্যায়তি’ শ্রুতিরই অনুবাদ করা হইয়াছে ৷ ২৬১ ॥ ১০ ॥

তদেতে শ্লোকা ভবন্তি,—

যদোন শৌর্য্যমভিধৃতোঽসুস্থঃ সুশোভিতাচরং।

শুক্লমাদায় পুনরৈতি স্থানং হিরণ্ময়ঃ পুরুষ একহংসঃ ॥

২৬২॥১১॥

সরলার্থঃ।—তৎ(তস্মিন্ যথোক্তে বিষয়ে) এতে(বক্ষ্যমাণাঃ) শ্লোকাঃ(সংক্ষিপ্তার্থাঃ মন্ত্রাঃ) ভবন্তি(সন্তি)।[কে তে? ইত্যাহ—] এক- হংসঃ(এক এব হন্তি—জাগ্রৎস্বপ্নাদ্যবস্থাভেদান্ গচ্ছতি ইতি একহংসঃ), হিরণ্ময়ঃ (সুবর্ণময় ইব জ্যোতিঃস্বভাবাদুজ্জ্বলঃ) পুরুষঃ(জীবঃ)[স্বয়ং] অনুপ্তঃ (অলুপ্তদৃক্‌স্বরূপ এব সন্) শারীরং(শরীরম্) অভিপ্রহত্য(নিষ্ক্রিয়তাম্ আপাদ্য) সুপ্তান্(বাসনারূপেণ অন্তঃকরণে স্থিতান্—বাহ্যান্ আধ্যাত্মিকান্ চ বিঘয়ান্) অভিচাকশীতি(আত্মজ্যোতিষা পশ্যতীত্যর্থঃ)। শুক্রং(শুদ্ধং উজ্জ্বলম্ ইন্দ্রিয়বৃত্তিম্) আদায়(গৃহীত্বা) স্থানং(কর্মক্ষেত্রং জাগরণম্) পুনঃ ঐতি (আগচ্ছতি) ইত্যর্থঃ॥ ২৬২ ॥ ১১ ॥

মূলানুবাদক?—একহংস—যিনি একাকী জাগ্রৎ স্বপ্নাদি নানাবিধ অবস্থা লাভ করেন, সেই হিরণ্ময়—সুবর্ণনির্মিত বস্তুর ন্যায় সমুজ্জ্বল পুরুষ(জীব) নিজে অসুপ্ত থাকিয়া—জ্ঞানশক্তিশূন্য না হইয়া, শরীরকে প্রহত করিয়া অর্থাৎ তাহার ক্রিয়াশক্তি বিলুপ্ত করিয়া দিয়া, সুপ্ত—সংস্কারময় বিষয়সমূহ দর্শন করিতে থাকে। আবার সেই

১০৮৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

পুরুষই ইন্দ্রিয়বৃত্তিসমূহ গ্রহণ করিয়া পুনর্ব্বার কর্মক্ষেত্র-জাগরণ অবস্থা প্রাপ্ত হয় ॥ ২৬২ ॥ ১১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তদেতে—এতস্মিন্নুক্তেহর্থে এতে শ্লোকাঃ মন্ত্রা ভবন্তি। স্বপ্নেন স্বপ্নভাবেন শারীরং শরীরম্ অভিপ্রহত্য নিশ্চেষ্টতামাপাদ্য অনুপ্তঃ স্বয়ম্ অলুপ্তদৃগাদিশক্তিস্বাভাব্যাৎ, সুপ্তান্ বাসনাকারোদ্ভূতান্ অন্তঃকরণবৃত্ত্যাশ্রয়ান্ বাহ্যাধ্যাত্মিকান্ সর্ব্বানের ভাবান্, স্বেন রূপেণ প্রত্যস্তমিতান্ সুপ্তান্, অভি- চাকশীতি অলুপ্তয়া আত্মদৃষ্ট্যা পশ্যতি অবভাসয়তীত্যর্থঃ। শুক্রং শুদ্ধং জ্যোতিষ্মদিন্দ্রিয়মাত্রারূপম্, আদায় গৃহীত্বা পুনঃ কর্ম্মণে জাগরিতস্থানম্, ঐতি আগচ্ছতি; হিরণ্ময়ঃ হিরণ্ময় ইব চৈতন্যজ্যোতিঃস্বভাবঃ, পুরুষঃ একহংসঃ এক এব হস্তীত্যেকহংসঃ,—একঃ জাগ্রৎস্বপ্নোহলোকপরলোকদীন্ গচ্ছতী- ত্যেকহংসঃ ॥২৬২৷৷১১৷৷

টীকা। তদেতে শ্লোকা ভবন্তীত্যেতৎ প্রতীকং গৃহীত্বা ব্যাচষ্টে-তদেত ইতি। উক্তোহর্থঃ স্বয়ংজ্যোতিষ্ট্রাদিঃ। শারীরমিতি স্বার্থে বৃদ্ধিঃ। স্বয়মসুপ্তত্বে হেতুমাহ-অলুপ্তেতি। ব্যাখ্যেয়ং পদমাদায় ব্যাচষ্টে-সুপ্তানিত্যাদিনা। উক্তমনুদ্য পদান্তরমবতায্য ব্যাকরোতি-সুপ্তানভি- চাকশীতীতি। ২৬২॥ ১১॥

ভাষ্যানুবাদ।—‘তদ্ এতে’ ইত্যাদি। এই যে বিষয় বলা হইল, এ বিষয়ে নিম্নলিখিত শ্লোক(মন্ত্রসমূহ) আছে—হিরণ্ময় অর্থাৎ সুবর্ণময় বস্তুর ন্যায় উজ্জ্বল—স্বাভাবিক চৈতন্য জ্যোতিঃসম্পন্ন, একহংস—একাকীই গমন করে বলিয়া—একহংস, অর্থাৎ একই আত্মা জাগ্রৎ, স্বপ্ন, ইহলোক ও পরলোকাদি স্থানে গমন করে বলিয়া ‘একহংস’-পদবাচ্য পুরুষ(জীব) স্বপ্নাবস্থা দ্বারা শরীরকে প্রহত—নিশ্চেষ্টভাবাপন্ন করিয়া অথচ স্বভাবসিদ্ধ দর্শনশক্তি প্রভৃতি গুণগুলি অবিলুপ্ত থাকায় নিজে সুপ্ত না হইয়া, সুপ্ত বিষয়সমূহকে—স্বীয় অন্তঃকরণবৃত্তি আশ্রয় করিয়া বাসনারূপে অভিব্যক্ত, অথচ নিজ নিজ স্বরূপে অনভিব্যক্ত বাহ্য ও আধ্যাত্মিক সমস্ত বিষয়রাশি অবিলুপ্ত স্বীয় জ্ঞান- শক্তিপ্রভাবে দর্শন করিয়া থাকে, অর্থাৎ সেই সমস্ত বাসনাময় বিষয় প্রকাশ করিয়া থাকে(১)। আবার শুক্র শুদ্ধ(উজ্জল) জ্যোতির্ময় ইন্দ্রিয়বৃত্তিনিচয় গ্রহণ করিয়া কর্ম করিবার জন্য পুনশ্চ জাগ্রৎ অবস্থায় আগমন করিয়া থাকে ॥ ২৬২ ॥ ১১ ॥

(১) তাৎপর্য্য—জীব জাগরণ সময়ে চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয় দ্বারা যে সমুদয় বিষয় উপভোগ বা সম্পাদন করে, সে সমুদয়ের সূক্ষ্ম সংস্কাররাশি হৃদয়পটে থাকিয়া যায়, কিন্তু সে সমুদয়

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

প্রাণেন রক্ষন্নবরং কুলায়ং বহিষ্কুলায়াদমৃতশ্চরিত্বা। স ঈয়তেহমৃতো যত্র কামহিরণ্ময়ঃ পুরুষ একহংসঃ ॥ ২৬৩ ॥ ১২ ॥

সরলার্থঃ।—অমৃতঃ(অমরণধৰ্ম্মা) একহংসঃ সঃ হিরণ্ময়ঃ পুরুষঃ(জীবঃ) প্রাণেন(পঞ্চবৃত্ত্যাত্মকেন) অবরং(নিকৃষ্টৎ মলমূত্রাদ্যনেকাশুচিময়ত্বাৎ অশুদ্ধম্) কুলায়ং(বাসনীড়ং শরীরং) রক্ষন্(পরিপালয়ন্),[স্বয়ং] অমৃতঃ(মরণরহিতঃ —স্বরূপেণ বিদ্যমান এব) কুলায়াৎ(শরীরাৎ) বহিঃ(পরিভ্রম্য, শরীরে অনাসক্তঃ) অমৃতঃ(স্বয়ম্ অবিকৃত এব তিষ্ঠন্) যত্র(যত্র যত্র বিষয়ে) কামৎ (অভিলাষঃ),[তত্র তত্র] ঈয়তে(গচ্ছতি) ॥২৬৩৷৷১২৷৷

মূলানুবাদঃ—মরণরহিত একহংস সেই হিরণ্ময় পুরুষ পঞ্চ- বৃত্তিবিশিষ্ট প্রাণ দ্বারা, নিকৃষ্ট বাসস্থান শরীরকে রক্ষা করত নিজে শরীরের বাহিরে বিচরণ করিয়া অর্থাৎ শরীরে অনাসক্তভাবে অবস্থান করিয়া, যেখানে ইচ্ছা, সেখানে গমন করে ॥ ২৬৩ ॥ ১২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তথা প্রাণেন পঞ্চবৃত্তিনা, রক্ষন্ পরিপালয়ন্, অন্যথা মৃতভ্রান্তিঃ স্যাৎ; অবরং নিকৃষ্টম্ অনেকাশুচিসঙ্ঘাতত্বাদত্যন্তবীভৎসম্, কুলায়ৎ নীড়ৎ শরীরম্, স্বয়ং তু বহিঃ তস্মাৎ কুলায়াৎ, চরিত্বা—যদ্যপি শরীরস্থ এব স্বপ্নৎ পশ্যতি, তথাপি তৎসম্বন্ধাভাবাৎ তৎস্থ ইবাকাশঃ বহিশ্চরিত্বেত্যুচ্যতে; অমৃতঃ স্বয়মমরণধৰ্ম্মা, ঈয়তে গচ্ছতি। যত্র কামম্ যত্র যত্র কামঃ বিষয়েষু উদ্ভুতবৃত্তি- র্ভবতি, তং তং কামং বাসনারূপেণোদ্ভূতৎ গচ্ছতি ॥২৬৩৷৷১২৷৷

টাকা। তথাশব্দঃ স্বপ্নগতবিশেষসমুচ্চয়ার্থঃ। কিমিতি স্বপ্নে প্রাণেন শরীরমাত্মা পালয়তি, তত্রাহ—অন্যথেতি। বহিশ্চরিত্বেত্যযুক্তং, শরীরস্থস্য স্বপ্নোপলম্ভাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—যদ্যপীতি। তৎসম্বন্ধাভাবাদ্বহিশ্চরিত্বেত্যুচ্যত ইতি সম্বন্ধঃ। দেহস্থস্যৈব তদসম্বন্ধে দৃষ্টান্তমাহ—তৎস্থ- ইতি ॥২৬৩৷১২॥

ভাষ্যানুবাদ?—সেইরূপ[উক্ত আত্মা] প্রাণনাদি পঞ্চপ্রকার বৃত্তি- বিশিষ্ট প্রাণ দ্বারা অবর নিকৃষ্ট অর্থাৎ অনেক প্রকার অশুচিদ্রব্যসমবায়ে সমুৎপন্ন বলিয়া অত্যন্ত বীভৎস ঘৃণার বিষয় কুলায়কে—জীব পক্ষীর বাসস্থান শরীরকে

30

১০৯০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রক্ষা করত,(১) নচেৎ(আত্মা শরীর ত্যাগ করিলে) দেহে মৃতভ্রান্তি উৎপন্ন হইত; অথচ নিজে এই শরীরের বাহিরে বিচরণ করিয়া এবং নিজে মৃত্যু- রহিত থাকিয়া—যেখানে কামনা অর্থাৎ যে যে বিষয়ে তাহার মনোবৃত্তি বা অভিলাষ উৎপন্ন হয়, পূর্ব্বসংস্কার স্বরূপে প্রাদুর্ভূত সেই সেই বিষয়ে গমন করিয়া থাকে। আত্মা যদিও শরীরমধ্যে থাকিয়াই স্বপ্ন দর্শন করে সত্য, তথাপি আকাশ যেরূপ শরীরে থাকিয়াও শরীরে থাকে না—নির্লিপ্ত, সেইরূপ সে সময়ে দেহের সহিত আত্মার অভিমানাত্মক সম্বন্ধ থাকে না বলিয়া “বহিশ্চরিত্বা” বলা হইয়াছে ॥২৬৩৷৷১২৷৷

স্বপ্নান্ত উচ্চাবচমীয়মানো রূপানি দেবঃ কুরুতে বহুনি। উতেব স্ত্রীভিঃ সহ * মোদমানো জক্ষদুতেবাপি ভয়ানি পশ্যন্ ॥ ২৬৪ ॥ ১৩ ॥

সক্সলার্থঃ।-দেবঃ(দ্যুতিমান্ জীবঃ) স্বপ্নান্তে(স্বপ্নস্থানে) উচ্চাবচম্ (উচ্চম্ উৎকৃষ্টৎ দেবাদিভাবম্, অবচম্ অপকৃষ্টং পশ্বাদিভাবম্) ঈয়মানঃ(প্রাপ্নুবন্ সন্) স্ত্রীভিঃ সহ উত মোদমানঃ(প্রীতিম্ অনুভবন্) ইব(ইবশব্দঃ অবাস্তবত্বদ্যোতকঃ), জক্ষৎ উত(অপি-বয়স্যৈরপি সহ হসন্) ইব, তথা ভয়ানি(ভয়ানকানি) অপি পশ্যন্[ইব] বহুনি রূপাণি(দৃশ্যানি) কুরুতে (নির্মাতি) ॥২৬৪৷৷১৩

মূলানুবাদ।—স্বতঃ প্রকাশসম্পন্ন জীব স্বপ্নসময়ে উত্তমাধম বিবিধ রূপ ধারণ করত[কখনও] যেন রমণীগণের সহিত আমোদই করিয়া থাকে;[কখনও] যেন[বয়স্যগণের সঙ্গে] হাস্যই করিয়া

(১) তাৎপর্য্য—শরীরের বীভৎসতা অন্যত্র স্পষ্টকথায় অভিহিত হইয়াছে। যথা— “স্থানান্বীজাদুপষ্টস্তাৎ নিঃস্যন্দান্নিধনাদপি। কায়মাধেয়শৌচত্বাৎ পণ্ডিতা হ্যশুচিং বিদুঃ।” (পাতঞ্জলদর্শনের বাচস্পতিমিশ্রকৃত টীকা)

নিম্নলিখিত কারণে পণ্ডিতগণ এই স্থূল শরীরকে অশুচি বলিয়া মনে করেন। উৎপত্তিস্থান কদর্য্য জরায়ু; বীজ-শুক্র শোণিত; উপষ্টন্ত-অস্থি প্রভৃতি; নিঃস্যন্দন-মল মুত্রাদি নিঃসরণ; এবং নিধন-মৃত্যু; উক্ত অবস্থা ও বস্তুগুলি সাক্ষাৎ বা পরস্পরাসম্বন্ধে অপবিত্রতার কারণ; অথচ স্থূল শরীর কখনই উহাদের সহিত সম্বন্ধশূন্য হইয়া থাকিতে পারে না; এই জন্য বীভৎস।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৯১

থাকে;[আবার কখনও] যেন ভয়ানক ব্যাঘ্রাদিই দর্শন করে; এইরূপে বহুপ্রকার দৃশ্য বস্তু নির্মাণ করিয়া থাকে ॥ ২৬৪ ॥ ১৩ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—কিঞ্চ, স্বপ্নান্তে স্বপ্নস্থানে উচ্চাবচম্ উচ্চৎ দেবাদি- ভাবম্, অবচং তির্য্যগাদিভাবৎ নিকৃষ্টম্, তদুচ্চাবচম্, ঈয়মানঃ গম্যমানঃ প্রাপ্নুবন্, রূপাণি, দেবঃ দ্যোতনাবান্, কুরুতে নির্ব্বর্ত্তয়তি—বাসনারূপাণি বহুনি অসঙ্খ্যে- য়ানি। উত অপি, স্ত্রীভিঃ সহ মোদমান ইব, জক্ষদিব হসন্নিব বয়স্যৈঃ; উত ইব অপি ভয়ানি—বিভেত্যেভ্য ইতি ভয়ানি—সিংহব্যাঘ্রাদীনি পশ্য- ন্নিব ॥২৬৪৷৷১৩৷৷

টীকা। স্বপ্নস্থং বিশেষান্তরমাহ—কিং চেতি। উচ্চাবচং বিষয়ীকৃত্য তেন তেনাত্মনা স্বেনৈব স্বয়ং গম্যমান ইতি যাবৎ ॥২৬৪৷১৩৷

ভাষ্যানুবাদ।—অপি চ, দেব—স্বাভাবিক প্রকাশসম্পন্ন জীব স্বপ্নান্তে অর্থাৎ স্বপ্নসময়ে উচ্চাবচ—উচ্চ অর্থ—উৎকৃষ্ট দেবতাদিরূপ, অবচ অর্থ নিকৃষ্ট— পশুপক্ষিপ্রভৃতি ভাব লাভ করত বাসনাময়(ভাবনাত্মক) বহু অসংখ্য দৃশ্য বস্তু সম্পাদন করিয়া থাকে।[তাহাই বিশেষ করিয়া প্রদর্শন করিতেছেন—] যেন রমণীগণের সহিত আমোদই অনুভব করে, যেন বন্ধুবর্গের সঙ্গে হাস্যই করে, এবং যেন বহুবিধ ভয় অর্থাৎ যাহাদিগের নিকট হইতে ভয় হয়, সেই সিংহ ব্যাঘ্র প্রভৃতি অবলোকন করে ॥২৬৪৷৷১৩৷৷

আরামমস্য পশ্যন্তি ন তং পশ্যতি কশ্চনেতি। তন্নায়তং বোধয়েদিত্যাহুঃ। দুর্ভিষজ্যহস্মৈ ভবতি, যমেষ ন প্রতি- পদ্যতে। অথো খল্বাহুর্জাগরিতদেশ এবাস্যৈব ইতি, যানি হ্যেব জাগ্রৎ পশ্যতি, তানি সুপ্ত ইতি, অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতি- র্ভবতি, সোহহং ভগবতে সহস্রং দদাম্যত ঊর্দ্ধং বিমোক্ষায় ক্রহীতি ॥ ২৬৫ ॥ ১৪ ॥

সরলার্থঃ।—অন্য(আত্মনঃ) আরামং(বাসনাসম্পাদিতাৎ ক্রীড়াৎ ব্যাপারমাত্রৎ) পশ্যন্তি[সর্ব্বে জনাঃ], কশ্চন(কশ্চিদপি) তম্(আত্মানং) ন পশ্যতি(আত্মনঃ বিবিক্তং রূপং ন জানাতীত্যর্থঃ) ইতি।[অত্রার্থে লোক- প্রসিদ্ধিমাহ—] তং(সুপ্তং পুরুষং) আয়তং(সহসা) ন বোধয়েৎ(জাগরিতং ন কুৰ্য্যাৎ) ইতি আহুঃ(কথয়ন্তি)[চিকিৎসকাদয়ঃ]।[অত্র দোষমাহুঃ—] এষঃ(আত্মা) যম্(ইন্দ্রিয়দ্বারদেশং) ন প্রতিপদ্যতে(যদি কদাচিৎ ত্বরয়া

১০৯২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রবোধ্যমানঃ আত্মা ইন্দ্রিয়াণি স্বস্বগোলকদেশং ন প্রবেশয়েৎ, বিপর্যয়েণ বা প্রবেশয়েৎ, তদা) অস্মৈ(অন্য জাগ্রতঃ) দুর্ভিষজ্যৎ(দুষ্করং ভিষক্-কর্ম্ম যস্য, তৎ) ভবতি হ(প্রসিদ্ধৌ, দুঃখেন চিকিৎসনীয়োহসৌ ভবতীতি ভাবঃ)। অথো (অপি) খলু(প্রসিদ্ধৌ) আহুঃ(কথয়ন্তি)[জনাঃ]—অস্য(সুপ্তস্য) এষঃ(বর্ত্ত- মানঃ) জাগরিতদেশঃ এব(জাগরিতো যো দেশঃ, স এব অন্য দেশ ইত্যর্থঃ);— পুরুষঃ জাগ্রৎ(প্রবুদ্ধঃ সন্) যানি(বস্তুনি) এব হি পশ্যতি, সুপ্তঃ(নিদ্রিতঃ সন্) তানি তৎসংস্কারপ্রসূতানি(বস্তুনি এব)[পশ্যতি]; অত্র(স্বপ্নদশায়াৎ) অয়ং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতিঃ ভবতি ইতি।[এবং প্রবোধ্যমানঃ জনকঃ যাজ্ঞবল্ক্য- মাহ—] সঃ(এবং প্রবোধিতঃ) অহং ভগবতে(পুজনীয়ায় তুভ্যৎ) সহস্রং দদামি; অতঃ ঊর্দ্ধং(অতঃপরং) বিমোক্ষায়(মোক্ষোপায়ং) ব্রূহি(কথয়) ইতি ॥২৬৫॥১৮৷৷

মূলানুবাদ।—সাধারণ লোকে এই আত্মার আরাম অর্থাৎ চেষ্টামাত্রই দর্শন করিয়া থাকে, কিন্তু কেহই ইহার স্বরূপ দর্শন করে না। চিকিৎসকগণ বলিয়া থাকেন যে, নিদ্রিত ব্যক্তিকে হঠাৎ জাগরিত করিবে না; কারণ, ঐরূপ হইলে, আত্মা যে যে ইন্দ্রিয়কে যে যে স্থান হইতে আহরণ করিয়া নিদ্রিত হইয়াছিল, সহসা জাগরণের দরুণ যদি দৈবাৎ সেই সমস্ত ইন্দ্রিয়কে নিজ নিজ স্থানে প্রেরণ করিতে না পারে, তাহা হইলে শরীরে অপ্রতিক্রিয় রোগ উৎপন্ন হইয়া থাকে।

লোকে আরও বলিয়া থাকে যে, এই সুপ্ত ব্যক্তির যে, এই স্বপ্নস্থান, ইহা জাগরিতদেশই বটে, অর্থাৎ জাগ্রদবস্থায় যে বিষয় যেরূপভাবে দর্শন করিয়াছে, এখন বাসনা প্রভাবে সেই সমস্ত বিষয়ই অনুভব করিতেছে; এই স্বপ্নাবস্থায় পুরুষ স্বয়ংজ্যোতিরূপে প্রকাশ পায়।[এইরূপ উপদেশ লাভে পরিতুষ্ট জনক মহারাজ যাজ্ঞবল্ক্যকে বলিলেন—] আপনার নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত আমি পূজনীয় আপনাকে সহস্র(সহস্র- সংখ্যক গো বা স্বর্ণমুদ্রা) দান করিতেছি; অতঃপর মোক্ষলাভের উপায় উপদেশ করুন ইতি ॥ ২৬৫ ॥ ১৪ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—আরামম্ আরমণম্ আক্রীড়াম্ অনেন নির্ম্মিতাৎ বাসনারূপাম্, অস্যাত্মনঃ পশ্যন্তি সর্ব্বে জনাঃ—গ্রামং নগরং স্ত্রিয়ম্ অন্নাদ্যমিত্যাদি

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৯৩

বাসনানিৰ্ম্মিতম্ আক্রীড়নরূপম্; ন তৎ পশ্যতি তৎ ন পশ্যতি কশ্চন। কষ্টং ভো বর্ততে, অত্যন্ত-বিবিক্তং দৃষ্টিগোচরাপন্নমপি—অহো ভাগ্যহীনতা লোকস্য! যৎ শক্যদর্শনমপি আত্মানং ন পশ্যতি, ইতি লোকং প্রত্যনুক্রোশং দর্শয়তি শ্রুতিঃ। অত্যন্তবিবিক্তঃ স্বয়ংজ্যোতিরাত্মা স্বপ্নে ভবতীত্যভিপ্রায়ঃ। ১

টীকা। আরামং বিবৃণোতি-গ্রামমিত্যাদিনা। ন তমিত্যাদেস্তাৎপর্য্যমাহ-কষ্টমিতি। দৃষ্টিগোচরাপন্নমপি ন পশ্যতীতি সম্বন্ধঃ। কষ্টমিত্যাদিনোক্তং প্রপঞ্চয়তি-অহো ইতি। শ্লোকানাং তাৎপর্য্যমুপসংহরতি-অত্যন্তেতি। ১

তৎ নায়তং বোধয়েদিত্যাহুঃ-প্রসিদ্ধিরপি লোকে বিদ্যতে-স্বপ্নে আত্ম- জ্যোতিষো ব্যতিরিক্তত্বে। কাসৌ? তমাত্মানং সুপ্তম্, আয়তং সহসা ভূশং, ন বোধয়েৎ-ইত্যাহুঃ এবং কথয়ন্তি চিকিৎসকাদয়ো জনা লোকে। নূনং তে পশ্যন্তি-জাগ্রদ্দেহাদ ইন্দ্রিয়দ্বারতোহপসৃত্য কেবলা বহির্ব্বর্তত ইতি, যত আহুঃ তৎ নায়তং বোধয়েদিতি। তত্র চ দোষং পশ্যন্তি-ভূশং হ্যসৌ বোধ্যমানঃ তানীন্দ্রিয়দ্বারাণি সহসা প্রতিবোধ্যমানঃ ন প্রতিপদ্যত ইতি। তদেতদাহ- দুর্ভিষজাং হাম্মৈ ভবতি-যমেষ ন প্রতিপদ্যতে, যম্ ইন্দ্রিয়দ্বারদেশম্- যস্মাদ্দেশাৎ শুক্রমাদায়াপসৃতঃ, তমিন্দ্রিয়দেশম্, এষ আত্মা পুনর্ন প্রতিপদ্যতে, কদাচিদ্ ব্যত্যাসেনেন্দ্রিয়মাত্রাঃ প্রবেশয়তি, তত আন্ধ্যবাধির্য্যাদিদোষপ্রাপ্তৌ দুভিষজ্যং-দুঃখভিষকৰ্ম্মতা হ অস্মৈ দেহায় ভবতি, দুঃখেন চিকিৎসনীয়োহসৌ দেহো ভবতীত্যর্থঃ। তস্মাৎ প্রসিদ্ধ্যাপি স্বপ্নে স্বয়ংজ্যোতিষ্টমস্য গম্যতে-স্বপ্নো ভূত্বাতিক্রান্তো মৃত্যো রূপাণীতি, তস্মাৎ স্বপ্নে স্বয়ংজ্যোতিরাত্মা। ২

বাক্যান্তরমাদায় তাৎপর্য্যমুক্তাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমক্ষরাণি-ব্যাকরোতি-তং নেত্যাদিনা। তেষামভিপ্রায়মাহ-নূনমিতি। ইন্দ্রিয়াণ্যেব দ্বারাণ্যস্যেতীন্দ্রিয়দ্বারো জাগ্রদ্দেহস্তস্মাদিতি যাবৎ। তথাপি সহসাসৌ বোধ্যতাং, কা হানিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-তত্রেতি। সহসা বোধ্যমানত্বং সপ্তমার্থঃ। কিমত্র প্রমাণমিত্যাশঙ্ক্যানন্তরবাক্যমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-তদেতদাহেত্যাদিনা। পুনরপ্রতিপত্তৌ দোষপ্রসঙ্গং দর্শয়তি-কদাচিদিতি। ব্যতাসপ্রবেশস্য কার্য্যং দর্শয়ন্ দুর্ভিযজ্য- মিত্যাদি ব্যাচষ্টে-তত ইতি। উক্তাং প্রসিদ্ধিমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ২

অথো অপি খলু অন্যে আহুঃ-জাগরিতদেশ এবাস্যৈষঃ, যঃ স্বপ্নঃ; ন সন্ধ্যৎ স্থানান্তরমিহলোকপরলোকাভ্যাং ব্যতিরিক্তম্; কিং তর্হি? ইহলোক এব জাগ- রিতদেশঃ। যদ্যেবম্, কিঞ্চাতঃ? শৃণু অতো যদ্ভবতি-যদা জাগরিতদেশ এবায়ং স্বপ্নঃ, তদা অয়মাত্মা কার্য্যকরণেভ্যো ন ব্যাবৃত্তস্তৈর্মিশ্রীভূতঃ, অতোন স্বয়ং জ্যোতিরাত্মা ইত্যতঃ স্বয়ংজ্যোতিষ্টবাধনায় অন্য আহুঃ-জাগরিতদেশ এবাস্যৈষ ইতি। তত্র চ হেতুমাচক্ষতে-জাগরিতদেশত্বে, যানি হি যস্মাদ হস্ত্যাদীনি পদার্থ-

১০৯৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

জাতানি, জাগ্রৎ জাগরিতদেশে পশ্যতি লৌকিকঃ, তান্যেব সুপ্তোহপি পশ্যতীতি। তদসৎ; ইন্দ্রিয়োপরমাৎ,-উপরতেষু হীন্দ্রিয়েষু স্বপ্নান্ পশ্যতি; তস্মান্নান্যস্য জ্যোতিষস্তত্র সম্ভবোহস্তি; তদুক্তম্-‘ন তত্র রথা ন রথযোগাঃ’ ইত্যাদি; তস্মাদত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতির্ভবত্যেব। ৩

বৃত্তমনুদ্য মতান্তরমুখাপয়তি-স্বপ্নো ভূত্বেত্যাদিনা। ইতিশব্দো যম্মাদর্থে। তদেব মতান্তরং ফোরয়তি-নেত্যাদিনা। উক্তমঙ্গীকৃত্য ফলং পৃচ্ছতি-যদ্যেবমিতি। স্বপ্নো জাগরিতদেশ ইত্যেবং যদীষ্টমতশ্চ কিং স্যাদিতি প্রশ্নার্থঃ। ফলং প্রতিজ্ঞায় প্রকটয়তি- শৃণ্বিতি। মতান্তরোপন্যাসস্য স্বমতবিরোধিত্বমাহ-ইত্যত ইতি। স্বপ্নস্য জাগ্রদ্দেশত্বং দূষয়তি- তদসদিতি। তন্য জাগ্রদ্দেশত্বাভাবে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। স্বপ্নে বাহ্যজ্যোতিষঃ সম্ভবো নাস্তীত্যত্র প্রমাণমাহ-তদুক্তমিতি। বাহ্যজ্যোতিরভাবেইপি স্বপ্নে ব্যবহারদর্শনাত্তত্র স্বয়ং- জ্যোতিষ্টমাক্ষেপ্ত মশক্যমিত্যুপসংহরতি-তস্মাদিতি। ৩

স্বয়ংজ্যোতিরাত্মাস্তীতি স্বপ্ননিদর্শনেন প্রদর্শিতম্, অতিক্রামতি মৃত্যো রূপা- নীতি চ; ক্রমেণ সঞ্চরন্নিহলোক-পরলোকাদীন্ ইহলোকপরলোকাদিব্যতিরিক্তঃ, তথা জাগ্রৎস্বপ্নকুলায়াভ্যাং ব্যতিরিক্তঃ, তত্র চ ক্রমসঞ্চারান্নিত্যশ্চেত্যেতৎ প্রতিপাদিতং যাজ্ঞবল্ক্যেন। অতো বিদ্যানিষ্ক্রয়ার্থং সহস্রং দদামি—ইত্যাহ জনকঃ। সোহহমেবং বোধিতঃ ত্বয়া, ভগবতে তুভ্যং সহস্রং দদামি; বিমোক্ষশ কামপ্রশ্নো ময়াভিপ্রেতঃ, তদুপযোগী অয়ং তাদর্থ্যাৎ তদেকদেশ এব; অতত্ত্বাং নিযোক্ষ্যামি, সমস্তকামপ্রশ্ননির্ণয়শ্রবণেন বিমোক্ষায় অত ঊর্দ্ধং ব্রূহীতি, যেন সংসারাদ্বিপ্রমুচ্যেয়ম্ ত্বৎপ্রসাদাৎ। বিমোক্ষপদার্থৈকদেশনির্ণয়হেতোঃ সহস্র- দানম্ ॥২৬৫৷১৪

কথং পুনর্বিদ্যায়ামমুক্তায়াং সহস্রদানবচনমিত্যাশঙ্ক্য বৃত্তং কীর্তয়তি-স্বয়ং জ্যোতিরিতি। মৃত্যো রূপাণ্যতিক্রামতীভ্যত্র চ কার্যকরণব্যতিরিক্তত্বমাত্মনো দর্শিতমিত্যাহ-অতিক্রমতীতি। লোকদ্বয়সঞ্চারবশাদুক্তমর্থমনুবদতি-ক্রমেণেতি। আদিশব্দস্তত্তদ্দেহাদিবিষয়ঃ। স্থানদ্বয়- সঞ্চারবশাদুক্তমনুভাষতে-তথেতি। ইহলোকপরলোকাভ্যামিবেতি যাবৎ। লোকদ্বয়ে স্থানদ্বয়ে চ ক্রমসঞ্চারপ্রযুক্তমর্থান্তরমাহ-তত্র চেতি। আত্মনঃ স্বয়ংজ্যোতিষো দেহাদিব্যতি- রিক্তস্য নিত্যস্য জ্ঞাপিতত্বাদিত্যতঃশব্দার্থঃ। কামপ্রশ্নস্য নির্ণীতত্বান্নিরাকাঙ্ক্ষত্বমিতি শঙ্কাং বারয়তি-বিমোক্ষশ্চেতি। সম্যগ্বোধস্তদ্ধেতুরিতি যাবৎ। ননু স এব প্রাগুক্তো নাসৌ বক্তব্যোহস্তি, তত্রাহ-তদুপযোগীতি। অয়মিত্যুক্তাত্মপ্রত্যয়োক্তিঃ। তাদর্থ্যাৎ পদার্থজ্ঞানস্য বাক্যার্থজ্ঞানশেষত্বাদিতি যাবৎ। পদার্থস্য বাক্যার্থবহির্ভাবং দূষয়তি-তদেকদেশ এবেতি। কামপ্রশ্নো নাদ্যাপি নির্ণীত ইত্যত্রোত্তরবাক্যং গমকমিত্যাহ-অত ইতি। কামপ্রশ্নস্যা- নির্ণীতত্বাদিতি যাবৎ। তেনাপেক্ষিতেন হেতুনেত্যর্থঃ। বিমোক্ষশব্দস্য সম্যজ্ঞানবিষয়ত্বং সূচয়তি-যেনেতি। সম্যজ্ঞানপ্রাপ্তৌ গুরুপ্রসাদস্য প্রাধান্যং দর্শয়তি-তৎপ্রসাদাদিতি।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৯৫

ননু বিমোক্ষপদার্থো। নির্ঘণ্টোঽন্যথা সহস্রদানস্য কস্মিকত্বপ্রসঙ্গাদত আহ—বিমো- ক্ষতিঃ ॥২৬৫॥১৪॥

ভাষ্যানুবাদ।—এই আত্মার আরাম—অর্থাৎ জাগ্রৎসংস্কারসমুৎপন্ন ক্রীড়া—গ্রাম, নগর, স্ত্রী বা ভোজনীয় অন্নপ্রভৃতি রূপ ক্রীড়ন বা বিলাসমাত্র সকল লোকে অবলোকন করিয়া থাকে, কিন্তু কেহই তাহাকে দর্শন করে না। এই উপলক্ষে শ্রুতি জনসাধারণকে লক্ষ্য করিয়া খেদ প্রকাশ করিয়া বলিতেছেন —অহো বড়ই কষ্ট—লোকসমূহ বড়ই ভাগ্যহীন! অত্যন্ত বিবিক্ত বা বিশুদ্ধ- রূপে দৃষ্টিগোচরে উপস্থিত হইলেও—দর্শনযোগ্য হইলেও আত্মাকে যে, দর্শন করে না, ইহা ভাগ্যহীনতারই লক্ষণ! অভিপ্রায় এই যে, স্বপ্নসময়ে আত্মা অন্তঃ- করণাদি হইতে পৃথক্ হইয়া স্বয়ংজ্যোতিঃস্বরূপে প্রকাশিত হয়। ১

‘তং ন আয়তৎ বোধয়েৎ-ইত্যাহুঃ’ ইতি। স্বপ্নসময়ে আত্মজ্যোতিঃ যে, অপর সমস্ত হইতে পৃথক্ হইয়া থাকে, এবিষয়ে লোকপ্রসিদ্ধিও আছে। সেই লোকপ্রসিদ্ধিটী কি? সংসারে চিকিৎসক প্রভৃতি অভিজ্ঞ লোকেরা এইরূপ বলিয়া থাকেন যে, তাহাকে-সুপ্ত পুরুষকে সহসা জাগরিত করিবে না, অর্থাৎ ক্রমে ক্রমে জাগরিত করিবে। যেহেতু তাঁহারা এইরূপ বলেন,[সেই হেতু বেশ বুঝা যায় যে,] সুপ্ত পুরুষ জাগ্রদ্দেহ হইতে চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের গোলকস্থান হইতে সরিয়া বাহিরে থাকে, অর্থাৎ তখন ঐ সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বারের সহিত তাহার সংস্পর্শ থাকে না; এই কারণেই তাঁহারা বলেন যে, হঠাৎ একে- বারে জাগরিত করিবে না। তাহাতে যে, কি অনিষ্ট হয়, তাহাও তাঁহারা দেখিতে পান-হঠাৎ একেবারে জাগরিত করিলে সুপ্ত পুরুষ অত সত্বর যথোপ- যুক্তরূপে ইন্দ্রিয়দ্বারসমূহ(ইন্দ্রিয়ের গোলকসমূহ) প্রাপ্ত না হইতে পারে; এই অভিপ্রায়ই ‘দুর্ভিষজ্যৎ হাম্মৈ ভবতি’, ইত্যাদি বাক্যে বিবৃত করা হইতেছে- ইন্দ্রিয়ের যে দ্বারদেশকে, অর্থাৎ স্বপ্নারম্ভসময়ে যে স্থান হইতে ঐন্দ্রিয়িক শক্তি লইয়া সরিয়া পড়ে, ক্ষিপ্রতাবশতঃ ইন্দ্রিয়েরা যদি সেই প্রবেশপথ প্রাপ্ত না হইতে পারে, অথবা সময়বিশেষে বিপরীতভাবেও(এক ইন্দ্রিয়পথে অপর ইন্দ্রিয়কেও) প্রবেশিত করিতে পারে; তাহার ফলে অন্ধতা ও বধিরতা প্রভৃতি রোগপ্রাপ্তির সম্ভাবনা হয়, এবং তখন সেই দেহের চিকিৎসা অতিশয় কষ্টসাধ্য হইয়া পড়ে; অতএব লোকপ্রসিদ্ধি অনুসারেও স্বপ্নসময়ে আত্মার স্বয়ংজ্যোতিঃরূপত্ব প্রতীত হইতেছে। বিশেষতঃ জীব স্বপ্নাবস্থা প্রাপ্ত হইয়া মৃত্যুসম্বন্ধ বা দেহাভিমান অতিক্রম করে; সেই কারণেও আত্মা স্বপ্নে স্বয়ংজ্যোতিঃ হইয়া থাকে। ২

১০৯৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অপর পণ্ডিতগণ বলিয়া থাকেন-ইহার(সুপ্ত পুরুষের) এই যে দেশ (স্বপ্নাবস্থা), ইহা জাগরিতদেশই বটে-অর্থাৎ সন্ধ্য স্বপ্নাবস্থাটী ইহলোক ও পরলোক হইতে অতিরিক্ত স্বতন্ত্র কোন অবস্থা নহে, তবে কি না, ইহা ইহলোকই বটে অর্থাৎ জাগ্রৎ অবস্থায় যাহা কিছু দেখা যায়, তাহা লইয়াই স্বপ্ন; [এই জন্য ইহাকে জাগরিতদেশ বলা হইয়াছে]। ভাল, এইরূপই যদি হয়, তাহাতেই বা কি হয়? হাঁ, ইহাতে যাহা হয়, শ্রবণ কর-এই স্বপ্ন যদি জাগরিত- দেশই হয়, তাহা হইলে এই আত্মা তখনও দেহেন্দ্রিয়াদির সম্বন্ধরহিত হইতে পারে না, পরন্তু সে সমুদয়ের সহিত মিশ্রিতই থাকিতে পারে; সুতরাং তৎকালেও আত্মা স্বয়ংজ্যোতিঃ নহে; এইরূপে আত্মার স্বয়ং জ্যোতিঃস্বভাবত্ব খণ্ডনের নিমিত্ত অপর পণ্ডিতগণ বলিয়া থাকেন যে, আত্মার যে, এই স্বপ্ন, ইহা জাগ- রণেরই অন্তর্গত(স্বতন্ত্র অবস্থা নহে)। তাঁহারা একথার অনুকূলে এইরূপ হেতুও প্রদর্শন করিয়া থাকেন যে, যেহেতু সাধারণ লোকে জাগ্রৎ-অবস্থায় হস্তী প্রভৃতি যে সমস্ত পদার্থ অবলোকন করে, স্বপ্নসময়েও ঠিক সেই সমস্ত পদার্থই দর্শন করিয়া থাকে, তদতিরিক্ত কেহ কোনও পদার্থ দর্শন করে না। না-একথা উত্তম কথা নহে; যেহেতু তখন ইন্দ্রিয়গণ বিরতব্যাপার হয়; ইন্দ্রিয়সমূহ যখন স্বপ্ন কার্য্য হইতে বিরত বা নিবৃত্ত হয়, তখনই লোকে স্বপ্ন দর্শন করে; কাজেই সে সময়[চক্ষুরাদি] অপর কোনও জ্যোতির সম্বন্ধ থাকা সম্ভব হয় না। ‘সেখানে রথ নাই, রথযোগ নাই’ ইত্যাদি বাক্যেও এ কথাই উক্ত হইয়াছে। এই সমস্ত কারণে বলিতে হইবে যে, এ সময় আত্মা নিশ্চয়ই স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপ হয়। ৩

উক্ত স্বপ্নাবস্থার উদাহরণ দ্বারা স্বয়ংজ্যোতিঃ আত্মার অস্তিত্ব প্রদর্শিত হইল, এবং তৎকালে যে, কর্মময় মৃত্যুর অধিকার অতিক্রম করে, তাহাও প্রদর্শিত হইল। একই আত্মা ক্রমশঃ ইহলোক ও পরলোকে সঞ্চরণ করিলেও ইহলোক ও পরলোক হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্; অধিকন্তু ক্রমশঃ বিভিন্ন অবস্থায় সঞ্চরণ করে বলিয়া নিত্যও বটে; এই তত্ত্ব[যাজ্ঞবল্ক্য] জনককে বুঝাইয়া দিলেন। এই কারণে জনক মহারাজ প্রাপ্ত বিদ্যার মূল্য স্বরূপ সহস্র সুবর্ণ দানে প্রস্তুত হইয়া বলিলেন-ভগবন্, আপনার নিকট হইতে আমি যথোক্ত প্রকার উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া, পূজনীয় আপনাকে সহস্র দান করিতেছি। মুক্তিই আমার অভি- লষিত প্রশ্ন; আপনি যাহা যাহা বলিয়াছেন, সে সমুদয়ও মোক্ষলাভেরই উপযোগী; সুতরাং আমার অভিলষিত প্রশ্নেরই একদেশ বা অংশ মাত্র; অতএব আপনাকে অনুরোধ করিতেছি যে, আমি যাহাতে সমস্ত কামপ্রশ্ন শ্রবণে মোক্ষ লাভ

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৯৭

করিতে পারি, আপনার অনুগ্রহে যাহাতে সংসার-বন্ধন হইতে বিমুক্ত হইতে পারি, অতঃপর সেই মোক্ষতত্ত্বই বলুন। জনক মহারাজ যে, সহস্র দান করিতে- ছেন;[বুঝিতে হইবে,] মুক্তিপদার্থের একাংশ নির্ণয়ই তাহার হেতু, অর্থাৎ কামপ্রশ্নের একাংশ নিরূপণ করাতেই জনক মহারাজ সহস্রদানে প্রবৃত্ত হইয়াছেন ॥২৬৫৷১৪৷৷

আভাসভাষ্যম্।-যৎ প্রস্তুতম্ আত্মনৈবায়ং জ্যোতিষা আস্ত ইতি, তৎ প্রত্যক্ষতঃ প্রতিপাদিতম্-অত্রায়ৎ পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতির্ভবতি ইতি স্বপ্নে। যত্তু- ক্তম্-স্বপ্নো ভূত্বেমৎ লোকমতিক্রামতি মৃত্যো রূপাণি-ইতি, তত্রৈতদাশঙ্ক্যতে -মৃত্যো রূপাণ্যেবাতিক্রামতি, ন মৃত্যুম্; প্রত্যক্ষং হোতৎ-স্বপ্নে কার্য্যকরণ- ব্যাবৃত্তস্যাপি মোদত্রাসাদিদর্শনম্; তস্মান্ননং নৈবায়ং মৃত্যুমতিক্রামতি; কর্ম্মণো হি মৃত্যোঃ কাৰ্য্যৎ মোদত্রাসাদি দৃশ্যতে। যদি চ মৃত্যুনা বদ্ধ এবায়ং স্বভাবতঃ, ততো বিমোক্ষো নোপপদ্যতে; ন হি স্বভাবাৎ কশ্চিদ্বিমুচ্যতে। অথ স্বভাবো ন ভবতি মৃত্যুঃ, ততস্তম্মানোক্ষ উপপৎস্যতে; যথাসৌ মৃত্যুরাত্মীয়ো ধর্ম্মো ন ভবতি, তথা প্রদর্শনায় অত ঊর্দ্ধং বিমোক্ষায় ব্রূহীত্যেবং জনকেন পর্য্যনুযুক্তো যাজ্ঞবল্ক্যস্তদ্দিদর্শয়িষয়া প্রববৃতে-

টাকা। উত্তরকণ্ডিকামবতারয়িতুং বৃত্তং কীর্তয়তি-যৎ প্রস্তুতমিতি। আত্মনৈবেত্যাদিনা যদাত্মনঃ স্বয়ংজ্যোতিষ্টুং ব্রাহ্মণাদৌ প্রস্তুতং, তদত্রায়মিত্যাদিনা প্রত্যক্ষতঃ স্বপ্নে প্রতিপাদিত- মিতি সম্বন্ধঃ। বৃত্তমর্থান্তরমনুদ্য চোদ্যমুখাপয়তি-যত্ত ক্তমিতি। মৃত্যুং নাতিক্রামতীত্যত্র হেতুমাহ-প্রত্যক্ষং হীতি। ইচ্ছান্বেষাদিরাদিশব্দার্থঃ। তথাপি কুতো মৃত্যুং নাতিক্রামতি, তত্রাহ-তস্মাদিতি। কাৰ্য্যস্য কারণাদন্যত্র প্রবৃত্ত্যযোগাদিতি যাবৎ। উক্তমুপপাদয়তি- কর্মণো হীতি। অতঃ স্বপ্নং গতো মৃত্যুং কৰ্ম্মাখ্যং নাতিক্রামতীতি শেষঃ। মা তর্হি মৃত্যোরতি- ক্রমো ভূৎ, কো দোষঃ, তত্রাহ-যদি চেতি। স্বভাবাদপি মৃত্যোর্বিমুক্তিমাশঙ্ক্যাহ-ন হীতি। উক্তং হি “ন হি সখাং ধাবিতাং বাসবদেবশোভিতং যৎ। ইতি।”

কথং তহি মোক্ষোপপত্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ—অথেতি। এষা চ শঙ্কা প্রাগেব রাজ্ঞা কৃতেতি দর্শয়ন্ন উত্তরমুখাপয়তি—যথেত্যাদিনা। তন্দিদর্শয়িষয়েত্যত্র মৃত্যোরতিক্রমণং গৃহ্যতে।

আভাসভাষ্যানুবাদ।—ইতঃ পূর্ব্বে “আত্মনৈবায়ৎ জ্যোতিষা আস্তে” বলিয়া যে কথার অবতারণা করা হইয়াছিল, স্বপ্নাবস্থা অবলম্বন করিয়া “অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ং জ্যোতির্ভবতি” ইত্যাদি বাক্যে তাহা প্রত্যক্ষের সাহায্যে প্রতিপাদন করা হইয়াছে; অতঃপর আশঙ্কা হইতেছে যে, ‘জীব স্বপ্নাবস্থা প্রাপ্ত হইয়া মৃত্যুরূপ কর্ম্মসমূহ অতিক্রম করে’, এই বাক্যে কেবল মৃত্যুর রূপসমূহ অতি-

১০৯৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ক্রমণ করিবার কথাই কথিত হইয়াছে, কিন্তু মৃত্যু অতিক্রমের কোন কথা বলা হয় নাই। আর প্রত্যক্ষতও দেখা যায় যে, স্বপ্নসময়ে জীব দেহেন্দ্রিয়াদির সহিত নির্লিপ্ত থাকিলেও, তখন তাহার হর্ষ, বিষাদাদি অবস্থা প্রকাশ পাইয়া থাকে; অতএব বেশ বুঝা যাইতেছে যে, জীব নিশ্চয়ই তখনও অতিক্রম করে না। এখানে মৃত্যু অর্থ কৰ্ম্ম; হর্ষ বিষাদ প্রভৃতি অবস্থাগুলি যে, মৃত্যুরূপ কর্মেরই ফল, তাহাও প্রত্যক্ষসিদ্ধ। আর জীব যদি স্বভাবতঃই মৃত্যু দ্বারা আবদ্ধ হয়, তাহা হইলেও তাহার মুক্তির সম্ভাবনা থাকে না; মৃত্যু তাহার স্বভাবসিদ্ধ না হইলেই, মোক্ষ সম্ভবপর হয়; এই জন্য মৃত্যু যে জীবের স্বাভাবিক ধর্ম হইতে পারে না, তাহা প্রদর্শনার্থ জনক মহারাজ যাজ্ঞবল্ক্যকে অতঃপর মোক্ষোপদেশের জন্য নিয়োগ করিলে পর, যাজ্ঞবল্ক্য তাহা প্রদর্শন করিবার ইচ্ছায় প্রবৃত্ত হইলেন—

স বা এষ এতস্মিন্ সম্প্রদাদে রত্বা চরিত্বা দৃষ্টৈব পুণ্যঞ্চ পাপঞ্চ। পুনঃ প্রতিন্যায়ং প্রতিযোন্যাদ্রবতি স্বপ্নায়ৈব, স যত্তত্র কিঞ্চিৎ পশ্যত্যনন্বাগতস্তেন ভবত্যসঙ্গো হ্যয়ং পুরুষ ইতি, এবমে- বৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য। সোহহং ভগবতে সহস্রং দদাম্যত ঊর্দ্ধং বিমোক্ষায়ৈব ক্রহীতি ॥ ২৬৬॥ ১৫ ॥

সরলার্থঃ।—ইদানীং জনকাভিমতমোক্ষপ্রদর্শনার্থৎ যাজ্ঞবল্ক্য আহ—‘স বা এষঃ’ ইতি। সঃ(স্বপ্নে স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপেণ প্রদর্শিতঃ) এষঃ(প্রকৃতঃ পুরুষঃ) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) এতস্মিন্(যথোক্তে) সম্প্রসাদে(স্বপ্নে) রত্বা(প্রিয়- সন্দর্শনেন রতিম্ অনুভূয়) চরিয়া(অনেকধা বিহৃত্য) পুণ্যৎ চ পাপং চ(পুণ্য- পাপফলং সুখদুঃখরূপম্) দৃষ্টা(অনুভূয়) পুনঃ প্রতিন্যায়ম্(স্বপ্নাগমনবৈপরীত্য- ক্রমেণ) প্রতিযোনি(যথাস্থানম্) স্বপ্নে(স্বপ্নস্থানায়) এব আদ্রবতি(সম্যক্ গচ্ছতি)। সঃ(স্বপ্নদর্শী পুরুষঃ) তত্র(স্বপ্নে) যৎ কিঞ্চিৎ পশ্যতি, তেন(স্বপ্নকৃত- শুভাশুভকর্ম্মফলেন) অনস্বাগতঃ(অসম্বদ্ধঃ) ভবতি।[কুতঃ?] হি(যতঃ) অয়ং পুরুষঃ অসঙ্গঃ(সদা পুণ্যপাপশূন্যঃ); ইতি[এবং প্রবোধিতঃ জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, এতৎ এবম্ এব(ত্বয়া যদুক্তম্, তৎ তথৈবেত্যর্থঃ)। সঃ অহং ভগবতে (পূজনীয়ায় তুভ্যম্) সহস্রং দদামি; অতঃ ঊর্দ্ধং বিমোক্ষায় এব ক্রহি ইতি (ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ) ॥২৫৬৷১৫৷

মূল্যমান।—নই এই বারাণসীঃ পুরুষ উক্ত সংস্থান।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১০৯৯

অবস্থায়(সুষুপ্তে) প্রিয়জনের সহিত রমণ ও পরিভ্রমণ করিয়া এবং পুণ্য ও পাপের ফল সুখদুঃখ উপভোগ করিয়া পুনঃ স্বপ্নসন্দর্শনের উদ্দেশ্যে বিলোমক্রমে স্বস্থানাভিমুখে প্রতিগমন করে। স্বপ্নদর্শী পুরুষ স্বপ্নে যাহা কিছু দর্শন করে,(স্বপ্ন ত্যাগের সময়) তাহা দ্বারা লিপ্ত হয় না; কারণ—এই পুরুষ হইতেছে—অসঙ্গ বা নির্লেপ। একথা শুনিয়া জনক বলিলেন—হাঁ, যাজ্ঞবল্ক্য তুমি যাহা বলিয়াছ, তাহা ঠিক সেই রূপই বটে। আমি মহাশয়কে সহস্র প্রদান করিতেছি; অতঃপর বিমুক্তির কথাই বলুন ॥ ২৬৬ ॥ ১৫ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।-স বৈ প্রকৃতঃ স্বয়ংজ্যোতিঃ পুরুষ এষঃ, যঃ স্বপ্নে দর্শিতঃ; এতস্মিন্ সংপ্রসাদে-সম্যক্ প্রসীদত্যস্মিন্নিতি সম্প্রসাদঃ; জাগরিতে দেহেন্দ্রিয়ব্যাপারশতসন্নিপাতজৎ হিত্বা কালুষ্যৎ তেভ্যো বিপ্রযুক্তঃ ঈষৎ প্রসী- দতি স্বপ্নে; ইহ তু সুযুপ্তে সম্যক্ প্রসীদতীত্যতঃ সুযুপ্তৎ সম্প্রসাদ উচ্যতে; “তীর্ণো হি তদা সর্ব্বান্ শোকান” ইতি, ‘সলিল একো দ্রষ্টা’ ইতি হি বক্ষ্যতি সুষুপ্তস্থমাত্মানম্। স বৈ এষ এতস্মিন্ সম্প্রদাদে ক্রমেণ সম্প্রসন্নঃ সন্ সুযুপ্তে স্থিত্বা। কথং সম্প্রসন্নঃ? স্বপ্নাৎ সুযুপ্তং প্রবিবিক্ষুঃ স্বপ্নাবস্থ এব, রত্বা রতিমনু- ভূয় মিত্রবন্ধুজনদর্শনাদিনা, চরিত্বা বিহৃত্য অনেকধা চরণফলং শ্রমমুপলভ্যেত্যর্থঃ; দৃষ্টৈব ন কৃত্বেত্যর্থঃ, পুণ্যঞ্চ পুণ্যফলং, পাপঞ্চ পাপফলম্; ন তু পুণ্যপাপরোঃ সাক্ষাদ্দর্শনমস্তীত্যবোচাম; তস্মান্ন পুণ্যপাপাভ্যামনুবদ্ধঃ; যো হি করোতি পুণ্য- পাপে, স তাভ্যামনুবধ্যতে; ন হি দর্শনমাত্রেণ তদনুবদ্ধঃ স্যাৎ; তস্মাৎ স্বপ্নো ভূত্বা মৃত্যুমতিক্রামত্যেব, ন মৃত্যুরূপাণ্যের কেবলম্; অতো ন মৃত্যোরাত্মস্বভাব- দ্বাশঙ্কা।১

টাকা। বৈশব্দস্য প্রসিদ্ধার্থত্বমুপেত্য সশব্দার্থমাহ-প্রকৃত ইতি। এষশব্দমনুদ্য ব্যাকরোতি -এষ ইতি। সম্প্রসাদে স্থিত্বা মৃত্যুমতিক্রামতীতি শেষঃ। সুষুপ্তস্থ্য সম্প্রসাদত্বং সাধয়তি- জাগরিত ইত্যাদিনা। তত্র বাক্যশেষমনুকুলয়তি-তীর্ণো হীতি। অস্ত সম্প্রসাদঃ সুষুপ্তং স্থানং, তথাপি কিমায়াতমিত্যত আহ-স বা ইতি। পূর্ব্বোক্তেন ক্রমেণ সম্প্রদাদে সুষুপ্তে স্থিত্বা সম্প্রসন্নঃ সন্ মৃত্যুমতিক্রামতীত্যর্থঃ। উক্তমর্থমুপপাদয়িতুমাকাঙ্ক্ষামাহ-কথমিতি। রত্বেত্যাদি ব্যাকুর্ব্বন্ পরিহরতি-স্বপ্নাদিতি। পুণ্যপাপশব্দয়োর্যথাশ্রুতার্থত্বমাশঙ্ক্যাহ-ন ত্বিতি। অবোচামোভয়ান্ পাপুন আনন্দাংশ্চ পশ্যতীত্যত্রেতি শ্রেয়ঃ। পুণ্যপাপয়োর্দ্দর্শনমেব, ন করণ- মিত্যত্র ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। তৎ দ্রষ্টুরপি তদনুবন্ধঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাতিপ্রসঙ্গাম্মৈবমিত্যাহ- যো হীত্যাদিনা। পুণ্যপাপাভ্যামাত্মনোহসংস্পর্শে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। ১

১১০০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মৃত্যুশ্চেৎ স্বভাবোহস্য, স্বপ্নেহপি কুৰ্য্যাৎ; ন তু করোতি, স্বভাবশ্চেৎ ক্রিয়া স্যাৎ, অনির্মোক্ষতৈব স্যাৎ; ন তু স্বভাবঃ, স্বপ্নে অভাবাৎ; অতো বিমোক্ষোহস্যোপপদ্যতে মৃত্যোঃ পুণ্যপাপাভ্যাম্। ননু জাগরিতে অন্য স্বভাব এব,-ন, বুদ্ধ্যাদ্যপাধিকৃতং হি তৎ; তচ্চ প্রতিপাদিতং সাদৃশ্যাৎ “ধ্যায়তীব লেলায়তীব” ইতি। তস্মাদেকান্তেনৈব স্বপ্নে মৃত্যুরূপাতিক্রমণাৎ ন স্বাভাবিকত্বা- শঙ্কা অনির্মোক্ষতা বা। ২

মৃত্যোরতিক্রমণে কিং স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-অতো নেতি। মৃত্যোরস্বভাবত্বমুপপাদয়তি- মৃত্যুশ্চেদিতি। ইষ্টাপত্তিমাশঙ্ক্যাহ-ন ত্বিতি। অনস্বাগতবাক্যাদসঙ্গবাক্যাচ্চেত্যর্থঃ। মোক্ষ- শাস্ত্রপ্রামাণ্যাদপি মৃত্যোরস্বভাবত্বমিত্যাহ-স্বভাবশ্চেদিতি। ইতশ্চ মৃত্যুঃ স্বভাবো ন ভবতী- ত্যাহ-ন ত্বিতি। অভাবাদিতি ছেদঃ। তস্যাঃ স্বভাবত্বে লব্ধমর্থং কথয়তি-অত ইতি। মৃত্যুমের ব্যাচষ্টে-পুণ্যপাপাভ্যামিতি স্বপ্নে মৃত্যোঃ স্বভাবত্বাভাবেহপি জাগ্রদবস্থায়াং কর্তৃত্ব- মাত্মনঃ স্বভাবঃ, তথা চ নিয়মেন তস্য মৃত্যোরতিক্রমো ন সিধ্যতীতি শঙ্কতে-নম্বিতি। ঔপাধিকত্বাৎ কর্তৃত্বস্ত স্বাভাবিকত্বাভাবাদাত্মনো মৃত্যোরতিক্রমঃ সম্ভবতীতি পরিহরতি- নেতি। কথমৌপাধিকত্বং কর্তৃত্বস্ত সিদ্ধবদুচ্যতে তত্রাহ-তচ্চেতি। ধ্যায়তাবেত্যাদৌ সাদৃশ্যবাচকাদিবশব্দাদৌপাধিকত্বং কর্তৃত্বস্ত প্রাগেব দশিতমিত্যর্থঃ। জাগরিতেহপি কর্তৃত্বস্য স্বাভাবিকত্বাভাবে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। মৃত্যোঃ স্বাভাবিকত্বাশঙ্কাভাবকৃতং ফলমাহ- অনির্মোক্ষতা বেতি। বাশব্দো নঞনুকর্ষণার্থঃ। ২

তত্র ‘চরিত্বা’ ইতি চরণফলং শ্রমমুপলভ্যেত্যর্থঃ। ততঃ সম্প্রসাদানুভবোত্তর- কালং পুনঃ প্রতিন্যায়ং যথান্যায়ং যথাগতম্—নিশ্চিত আয়ো ন্যায়ঃ; অয়নম্ আয়ঃ নির্গমনম্, পুনঃ পূর্ব্বগমনবৈপরীত্যেন যদাগমনং স প্রতিন্যায়ঃ,—যথাগতৎ পুনরাগচ্ছতীত্যর্থঃ। প্রতিযোনি যথাস্থানম্; স্বপ্নস্থানাদ্ধি সুষুপ্তং প্রতিপন্নঃ সন্ যথাস্থানমেব পুনরাগচ্ছতীতি। প্রতিযোন্যাদ্রবতি স্বপ্নায়ৈব স্বপ্নস্থানায়ৈব। ৩

পুণ্যং চ পাপং চেত্যেতদন্তং বাক্যং ব্যাখ্যায় পুনরিত্যাদি ব্যাচষ্টে-তত্রেতি। স্বপ্নাদুখায় সুষুপ্তিমনুভুয়োত্তরকালমিতি যাবৎ। স্থানাৎ স্থানান্তরপ্রাপ্তাবভ্যাসং বক্তুং পুনঃশব্দঃ। প্রতিন্যায়মিত্যস্যাবয়বার্থমুক্তা। বিবক্ষিতমর্থমাহ-পুনরিতি। সংপ্রসাদাদুর্দ্ধমিতি যাবৎ। জাগরিতাৎ স্বপ্নং ততঃ সুষুপ্তং গচ্ছতীতি পূর্বগমনং, ততো বৈপরীত্যেন সুষুপ্তাৎ স্বপ্নং জাগরিতং বা গচ্ছতীতি যদাগমনং, স প্রতিন্যায়ঃ। তমেব সঙ্ক্ষিপতি-যথেতি। যথাস্থানমাত্র- বতীভ্যেতদ্বিবৃণোতি-স্বপ্নস্থানাদিতি। উক্তেহর্থে বাক্যং পাতয়তি-প্রতিযোনীতি। কিমর্থং যথাস্থানমাগমনং, তদাহ-স্বপ্নায়েতি। ৩

ননু স্বপ্নে ন করোতি পুণ্যপাপে, তয়োঃ ফলমেব পশ্যতীতি কথমবগম্যতে? যথা জাগরিতে, তথা করোত্যেব স্বপ্নেহপি, তুল্যত্বাদ্দর্শনস্যেতি; অত আহ—স আত্মা যৎকিঞ্চিৎ তত্র স্বপ্নে পশ্যতি পুণ্যপাপফলম্, অনস্বাগতঃ অননুবন্ধঃ তেন

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১০১

দৃষ্টেন ভবতি, নৈবানুবন্ধো ভবতি। যদি হি স্বপ্নে কৃতমেব তেন স্যাৎ, তেনা- নুবধ্যেত, স্বপ্নাদুখিতোহপি সমন্বাগতঃ স্যাৎ; ন চ তল্লোকে স্বপ্নকৃতকর্মণা অস্বাগতত্বপ্রসিদ্ধিঃ; ন হি স্বপ্নকৃতেনাগসা আগস্কারিণমাত্মানং মন্যতে কশ্চিৎ; ন চ স্বপ্নদৃশ আগঃ শ্রুত্বা লোকস্তং গর্হতি পরিহরতি বা; অতোহনস্বাগত এব তেন ভবতি; তস্মাৎ স্বপ্নে কুর্ব্বন্নিবোপলভ্যতে; ন তু ক্রিয়াহস্তি পরমার্থতঃ। ‘উতের স্ত্রীভিঃ সহ মোদমানঃ’ ইতি শ্লোক উক্তঃ। আখ্যাতারশ্চ স্বপ্নস্য সহ ইবশব্দেনাচক্ষতে,-হস্তিনোহদ্য ঘটীকৃতা ধাবন্তীব ময়া দৃষ্টা ইতি; অতো ন তস্য কর্তৃত্বমিতি। ৪

স যদিত্যাদিবাক্যস্য ব্যাবর্ত্যামাশঙ্কামাহ-নন্বিতি। তত্র বাক্যমুত্তরত্বেনাবতার্য্য ব্যাকরোতি-অত আহেতি। অননুবদ্ধ ইত্যস্যার্থং স্ফুটয়তি-নৈবেতি। স যদিত্যাদি- বাক্যস্যাক্ষরার্থমুক্তা তাৎপয্যমাহ-যদি হীতি। তেনাত্মনেতি যাবৎ। স্বপ্নে কৃতং কৰ্ম্ম পুনস্তেনেত্যুক্তম্। অনুবন্ধে দোষমাহ-স্বপ্নাদিতি। ইষ্টাপত্তিমাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। স্বপ্ন- কৃতেন কর্মণা জাগ্রদবস্তুস্থ্য পুরুষস্যান্বাগতত্বপ্রসিদ্ধিরিতি যদুচ্যতে, তন্ন ব্যবহারভূমৌ সম্প্রতিপন্ন- মিত্যর্থঃ। স্বপ্নদৃষ্টেন জাগ্রদাতস্য ন সঙ্গতিরিত্যত্র স্বানুভবং দর্শয়তি-ন হীতি। যথোক্তেহনু- ভবে লোকস্যাপি সম্মতিং দর্শয়তি-ন চেতি। তত্র ফলিতমাহ-অত ইতি। কথং তর্হি স্বপ্নে কর্তৃত্বপ্রতীতিস্তত্রাহ-তস্মাদিতি। স্বপ্নস্থাভাসত্বাচ্চ ন তত্র বস্তুতোহস্তি ক্রিয়েত্যাহ- উতেবেতি। তদাভাসত্বে লোকপ্রসিদ্ধিমনুকূলয়তি-আখ্যাতারশ্চেতি। স্বপ্নস্থাভাসত্বে ফলিতমাহ-অত ইতি। ৪

কথং পুনরস্যাকর্তৃত্বমিতি, —কার্য্যকরণৈর্ম্মূর্ত্তৈঃ সংশ্লেষো মূর্ত্তস্য, স তু ক্রিয়া- হেতুদৃষ্টঃ। ন হি অমূর্ত্তঃ কশ্চিৎ ক্রিয়াবান্ দৃশ্যতে; অমূর্ত্তশ্চাত্মা, অতোহসঙ্গঃ; যস্মাচ্চ অসঙ্গোহয়ং পুরুষঃ, তস্মাদনস্বাগতস্তেন স্বপ্নদৃষ্টেন। অত এব ন ক্রিয়া- কর্তৃত্বমস্য কথঞ্চিদুপপদ্যতে; কার্য্যকরণসংশ্লেষেণ হি কর্তৃত্বং স্যাৎ; স চ সংশ্লেষঃ সঙ্গোহস্য নাস্তি; যতোহসঙ্গো হ্যায়ং পুরুষঃ; তস্মাদমৃতঃ। এবমেবৈতদ্যাজ্ঞবল্ক্য। সোহহৎ ভগবতে সহস্রং দদাম্যত উর্দ্ধং বিমোক্ষায়ৈব ক্রহি। মোক্ষ- পদার্থৈকদেশস্য কর্ম্মপ্রবিবেকস্য সম্যগ্‌দর্শিতত্বাৎ অত ঊর্দ্ধং বিমোক্ষায়ৈব ক্রহীতি ॥২৬৬৷৷১৫৷৷

অনস্বাগতবাক্যং প্রতিজ্ঞারূপং ব্যাখ্যায়াসঙ্গবাক্যং হেতুরূপমবতারয়িতুমাকাঙ্ক্ষামাহ- কথমিতি। মূর্ত্তস্য মূর্ত্তান্তরেণ সংযোগে ক্রিয়োপলম্ভাদমূর্ত্তস্য তদভাবাদাত্মনশ্চামূর্ত্তত্বে- নাসংযোগাৎ ক্রিয়াযোগাদকর্তৃত্বসিদ্ধিরিত্যুত্তরং হেতুবাক্যার্থকথনপূর্ব্বকং কথয়তি-কার্য্যকরণৈ- রিত্যাদিনা। আত্মনোঽসঙ্গত্বেনাকর্তৃত্বমুক্তং সমর্থরতে-অত এবেতি। অতঃশব্দার্থং বিশদয়তি-কার্য্যেতি। ক্রিয়াবত্ত্বাভাবে জন্মমরণাদিরাহিত্যং কৌটস্থ্যং ফলতীত্যাহ-তস্মা- দিতি। কর্ম্মপ্রবিবেকমুক্তমঙ্গীকরোতি-এবমিতি। তৎপ্রবিবিক্তাত্মজ্ঞানে দার্ঢ্যং সূচয়তি-

১১০২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সোহহমিতি। নৈরাকাঙ্ক্ষ্যং ব্যাবর্ত্তয়তি-অত ইতি। কথং তহি সহস্রদানমিত্যাশঙ্ক্যাহ- মোক্ষেতি। কামপ্রবিবেকবিষয়নিয়োগমভিপ্রেত্য পুনরনুক্রামতি-অত উর্দ্ধমিতি ॥২৬৬৷১৫॥

ভাষ্যানুবাদ।-স্বপ্নে প্রদর্শিত সেই যে, এই স্বয়ংজ্যোতিঃ পুরুষ, সেই পুরুষ এই সম্প্রদাদে-পুরুষ যেখানে সম্পূর্ণরূপে প্রসন্নতা লাভ করে, তাহার নাম সম্প্রসাদ; অভিপ্রায় এই যে, জাগ্রৎ অবস্থায় দৈহিক ও ঐন্দ্রিয়িক বহুবিধ ব্যাপারসম্পর্ক থাকায় পুরুষে মলিনতা উপস্থিত হয়, স্বপ্নাবস্থায় দেহেন্দ্রিয়- সম্পর্ক নষ্ট হইয়া যায়; পুরুষ তখন সেই মালিন্য পরিত্যাগ করিয়া অল্পমাত্র প্রস- ন্নতা লাভ করে; কিন্তু এই সুষুপ্তি সময়ে পুরুষ সম্পূর্ণরূপে প্রসন্নতা লাভ করে; এই জন্য সুষুপ্তি অবস্থাকে “সম্প্রসাদ” বলা হইয়া থাকে। পরেও ‘তখন(সুযুপ্তি সময়ে) হৃদয়গত সমস্ত দুঃখ হইতে উত্তীর্ণ হয়’, ‘সবিলাস একই আত্মা দর্শন করিয়া থাকে’, ইত্যাদি স্থলে সুষুপ্ত আত্মার ঐরূপ রূপ প্রদর্শন করিবেন। সেই এই পুরুষ কিরূপে ক্রমশঃ সম্প্রসন্নতা লাভ করে,[তদুত্তরে বলিতেছেন,] সুযুপ্তিদশায় প্রবেশার্থী জীব প্রথমতঃ স্বপ্নাবস্থায়ই রমণ করিয়া, বন্ধু ও স্বজন সন্দর্শন প্রভৃতি দ্বারা তৃপ্তি অনুভব করে; পরে বিচরণ করিয়া অর্থাৎ স্বপ্নাবস্থায় বিচরণের ফলে বহুবিধ শ্রম বা ক্লেশ উপলব্ধি করিয়া, পুণ্য ও পাপের ফল মাত্র সন্দর্শন করে; কিন্তু তখন কোন প্রকার পুণ্য বা পাপ কার্য্য অনুষ্ঠান করে না; সেই জন্য পুণ্য ও পাপে লিপ্তও হয় না; কারণ, যে লোক পুণ্য বা পাপ অনুষ্ঠান করে, সেই লোকই পুণ্য বা পাপে লিপ্ত হইয়া থাকে; কিন্তু কেবল দর্শনের দরুণ কেহই পুণ্য ও পাপে নিবদ্ধ হয় না। পুণ্য পাপের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে দর্শন করা সম্ভব হয় না বলিয়া, এখানে পুণ্য ও পাপ-শব্দে পুণ্য ও পাপের ফল মাত্র বুঝিতে হইবে। অতএব স্বপ্নসময়ে যে, কেবল মৃত্যুর রূপমাত্রই অতিক্রম করে, তাহা নহে, পরন্তু সাক্ষাৎ মৃত্যুকেও অতিক্রম করে। ১

এই কারণে, মৃত্যুকে আত্মার স্বভাবসিদ্ধ বলিয়াও আশঙ্কা করা চলে না; কেন না, মৃত্যু যদি আত্মার স্বভাবসিদ্ধ ধৰ্ম্ম হইত, তাহা হইলে স্বপ্নেও তাহা বিদ্যমান থাকিত; অথচ তাহা কখনও বিদ্যমান থাকে না। পক্ষান্তরে, মৃত্যুরূপিণী ক্রিয়া ইহার স্বভাব হইলে, কস্মিন্ কালেও তাহা হইতে আত্মার মুক্তি সম্ভব হইত না; অতএব উহা আত্মার স্বভাব নহে; এই জন্যই পুণ্য ও পাপ হইতে আত্মার বিমোক্ষ উপপন্ন হয়। ভাল,[স্বপ্নাবস্থায় না হউক,] জাগ্রদবস্থায় ত উহা নিশ্চয়ই আত্মার স্বভাব হইতে পারে; না—সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, জাগ্রদ- বস্থায় যে, কর্মময় মৃত্যুর সম্বন্ধ হয়, বুদ্ধিপ্রভৃতি উপাধির সহিত সম্বন্ধই তাহার

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩

কারণ; “ধ্যায়তীব” ইত্যাদি বাক্যেই তাহার সাদৃশ্যমূলকত্ব প্রতিপাদন করা হই- য়াছে। অতএব স্বপ্নসময়ে সম্পূর্ণরূপে মৃত্যুরূপী কর্ম্মের সম্বন্ধ অতিক্রম করে বলিয়া মৃত্যুকে আত্মার স্বাভাবিক বলিয়া সম্ভাবনা করাও চলে না, এবং তন্নি- বন্ধন মুক্তিরও অসম্ভাবনা হয় না। ২

সেখানে(স্বপ্নস্থানে) বিচরণ করিয়া শ্রমফল ক্লান্তি অনুভব করিয়া, তাহার পর সম্প্রসাদ অনুভবের পর, পুনর্ব্বার প্রতিন্যায়ে অর্থাৎ যেরূপে সুষুপ্তিতে প্রবেশ করিয়াছিল, তাহার বিপরীত ক্রমে-পূর্বগমনের বিপরীত ক্রমে গমনকে ‘প্রতিন্যায়’ বলে; সেই নিয়মে পুনর্ব্বার আগমন করে। ‘প্রতিযোনি’ অর্থাৎ যথাস্থানে; প্রথমে স্বপ্নস্থান হইতে সুযুপ্তি দশা প্রাপ্ত হয়; সুযুপ্তি দশা প্রাপ্ত হইয়া পুনর্ব্বার সেই স্বপ্নস্থানের উদ্দেশেই যথানিয়মে প্রতিগমন করিয়া থাকে। ৩

এখন আপত্তি হইতেছে এই যে, জীব যে, স্বপ্নসময়ে পুণ্য বা পাপ করে না; কেবল পুণ্য ও পাপের ফল মাত্র ভোগ করিয়া থাকে, ইহা কিপ্রকারে জানা যায়? জাগরণাবস্থায় যেমন কর্মানুষ্ঠান করে, স্বপ্নসময়েও ঠিক তেমনি কৰ্ম্ম করিয়া থাকে; কারণ, দর্শন-কার্য্যটা উভয় স্থলেই তুল্য, কিছুমাত্র প্রভেদ নাই। এতদুত্তরে বলিতেছেন-সেই স্বপ্নদর্শী আত্মা, সে সময়ে-স্বপ্নসময়ে পুণ্য ও পাপ- ফল যাহা কিছু দর্শন করে, সেই স্বপ্নদৃষ্ট পুণ্য ও পাপে অসংস্পৃষ্ট থাকে, অর্থাৎ সে নিশ্চয়ই সেই পুণ্য-পাপে লিপ্ত হয় না। জীব যদি স্বপ্নসময়ে সত্য সত্যই পুণ্য বা পাপ করিত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই সে স্বকৃত পুণ্য ও পাপে সংস্পৃষ্ট হইত, এবং স্বপ্ন হইতে উত্থানের পরও ঐ পুণ্য ও পাপ তাহার অনুসরণ করিত; কিন্তু জগতে স্বপ্নকৃত কৰ্ম্ম যে, কাহারো অনুসরণ করে, ইহা কোথাও প্রসিদ্ধ নাই; এবং স্বপ্ন- কৃত অপরাধে কেহই আপনাকে অপরাধী বলিয়া মনে করে না; অতএব স্বপ্নকৃত কৰ্ম্ম কাহারো অনুগমন করে না; এই জন্যই বলিতে হইবে যে, স্বপ্নে বাস্তবিক পক্ষে কোন ক্রিয়া সম্বন্ধ থাকে না, তথাপি, যেন করিতেছে বলিয়া প্রতীতি হয় মাত্র। ‘পূর্ব্বেও যেন স্ত্রীগণের সহিত আমোদ করিতেছে’ এইরূপ একটা শ্লোক (সংক্ষিপ্তার্থক বাক্য) উক্ত হইয়াছে। আর যাঁহারা স্বপ্নরহস্য বলেন, তাঁহারাও [স্বপ্নদৃশ্যের অসত্যতা জ্ঞাপনার্থ] ‘ইব’ শব্দের সহযোগে স্বপ্নের কথা বলিয়া থাকেন, ‘আমি আজ স্বপ্নে দেখিয়াছি-হস্তিসমূহ যেন দলবদ্ধ হইয়া ধাবিত হইতেছে’ এই জন্যই স্বপ্নদর্শী আত্মার কর্তৃত্ব নাই। ৩

কেন যে, আত্মার কর্তৃত্ব নাই,[তাহা বলিতেছেন,] সাধারণতঃ মূর্ত্ত বা পরি- চ্ছিন্ন দেহেন্দ্রিয়ের সঙ্গে অপর মূর্ত্ত পদার্থেরই সংশ্লেষ বা সম্বন্ধ হইয়া থাকে;

১১০৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সেই সম্বন্ধই ক্রিয়া-নিষ্পত্তির হেতুরূপে জগতে দৃষ্ট হইয়াছে; পক্ষান্তরে কোন অমূর্ত্ত পদার্থে কোনরূপ ক্রিয়া দৃষ্টিগোচর হয় না। আলোচ্য আত্মা-পদার্থ টীও অমূর্ত্ত অপরিচ্ছিন্ন বা নিরবয়ব; সুতরাং অসঙ্গ। যেহেতু এই পুরুষ অসঙ্গ; সেই হেতুই স্বপ্নকৃত পুণ্য বা পাপ তাহার অনুসরণ করে না; তজ্জন্যই কোন প্রকারে ইহার কর্তৃত্বও উপপন্ন হয় না; কেন না, দেহেন্দ্রিয়াদির সহিত সংশ্লেষ বা সম্পর্ক বশতই কর্তৃত্ব ব্যবহার হইয়া থাকে; সেই সংশ্লেষরূপ সঙ্গ ইহার(পুরুষের) নাই। পুরুষ যেহেতু অসঙ্গ, সেই হেতুই অমৃত(কৰ্ম্মময় মৃত্যু রহিত)(১)।[ইহা শ্রবণ করিয়া জনক বলিলেন-] হে যাজ্ঞবল্ক্য, ইহা এইরূপই বটে; আপনার উপদেশপ্রাপ্ত আমি আপনাকে সহস্র প্রদান করিতেছি; অতঃপরও মুক্তিসাধনেরই উপদেশ করুন। আত্মা যে, কর্মসংস্পর্শশূন্য, ইহা হইতেছে মুক্তিপদার্থের একাংশ মাত্র; তাহা যখন যথাযথরূপে প্রদর্শিত হইল, তখন অতঃপর সাক্ষাৎ মুক্তিরই উপদেশ করুন ইতি ॥ ২৬৬৷১৫৷

স বা এষ এতস্মিন্ স্বপ্নে রত্বা চরিত্বা দৃষ্ট্বৈব পুণ্যঞ্চ পাপঞ্চ পুনঃ প্রতিন্যায়ং প্রতিযোন্যাদ্রবতি বুদ্ধান্তায়ৈব। স যত্তত্র কিঞ্চিৎ পশ্যত্যনম্বাগতস্তেন ভবত্যসঙ্গো হ্যয়ং পুরুষ ইত্যেব- মেবৈতদ্ যাজ্ঞবল্ক্য। সোহহং ভগবতে সহস্রং দদাম্যত ঊর্দ্ধং বিমোক্ষায়ৈব ক্রহীতি ॥ ২৬৭ ॥ ১৬ ॥

সরলার্থঃ।—অকর্তৃত্বে হেতুতয়োক্তম্ অসঙ্গত্বমেব দ্রঢ়য়িতুমাহ—“স বৈ” ইত্যাদি। সঃ(উক্তলক্ষণঃ) এষঃ(প্রকৃতঃ) পুরুষঃ(দেহাদ্যভিমানী জীবঃ) বৈ এতস্মিন্(প্রকৃতে) স্বপ্নে রত্ত্বা(রমণং কৃত্বা), চরিত্বা, পুণ্যৎ চ পাপং চ দৃষ্টা এব পুনঃ বুদ্ধান্তায় এব প্রতিন্যায়ং প্রতিযোনি আদ্রবতি। সঃ(স্বপ্নদর্শী পুরুষঃ) তত্র (স্বপ্নে) যৎ কিঞ্চিৎ পশ্যতি, তেন অনস্বাগতঃ ভবতি;[কুতঃ?] হি(যতঃ) অয়ং পুরুষঃ অসঙ্গঃ ইতি।[জনক আহ—] হে যাজ্ঞবল্ক্য, সঃ অহং ভগবতে সহস্রং দদামি; অতঃ উর্দ্ধং বিমোক্ষায় এব ব্রূহি ইতি,[ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥২৬৭৷৷১৬৷৷

(১) তাৎপর্য্য—সঙ্গ অর্থ সংযোগ বটে, কিন্তু সাধারণ সংযোগ নহে; পরন্তু যেরূপ সংযোগের ফলে সংযুক্ত বস্তুতে কোনরূপ ধর্মান্তর উৎপন্ন হয়, সেইরূপ সংযোগ। যেমন পদ্মপত্র জলে থাকিয়াও আর্দ্র হয় না বলিয়া, তাহাকে অসঙ্গ বলা হয়, তেমন পুরুষও বিকৃত হয় না বলিয়া অসঙ্গ।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩৫

মূলানুবাদ?—সেই এই পুরুষ উক্ত স্বপ্নাবস্থায় রমণ ও পরিভ্রমণ করিয়া এবং পুণ্য ও পাপের ফল সুখদুঃখ অনুভব করিয়া বুদ্ধান্তের জন্য—জাগ্রদবস্থা লাভের নিমিত্ত পুনরায় নিজ নিজ স্থানে প্রত্যাগমন করে। পুরুষ স্বপ্নসময়ে যাহা কিছু দর্শন করে, তাহা তাহার অনুসরণ করে না, অর্থাৎ পুরুষ স্বপ্নকৃত পুণ্য-পাপে লিপ্ত হয় না; কারণ, এই পুরুষ স্বভাবতঃ অসঙ্গ বা নির্লেপ। একথা শুনিয়া জনক বলিলেন—ইহা এইরূপই বটে; আমি ইহার বিনিময়ে পূজনীয় আপনাকে সহস্র প্রদান করিতেছি; আপনি ইহার পর মুক্তির কথাই বলুন ॥ ২৬৭ ॥ ১৬ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তত্র “অসঙ্গো হ্যায়ং পুরুষঃ” ইত্যসঙ্গতা অকর্তৃত্বে হেতু- রুক্তঃ। উক্তঞ্চ পূর্ব্বম্—কর্ম্মবশাৎ স ঈয়তে যত্র কামমিতি; কামশ্চ সঙ্গঃ; অতোহসিদ্ধো হেতুরুক্তঃ—“অসঙ্গো হ্যায়ং পুরুষঃ” ইতি। নত্বেতদস্তি; কথং তহি? অসঙ্গ এবেত্যেতদুচ্যতে—স বা এষ এতস্মিন্ স্বপ্নে, স বৈ এষ পুরুষঃ সম্প্রসাদাৎ প্রত্যাগতঃ স্বপ্নে রত্বা চরিত্রা যথাকামং দৃষ্ট্বৈব পুণ্যঞ্চ পাপঞ্চেতি সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ। বুদ্ধান্তায়ৈব জাগরিতস্থানায়। তস্মাদসঙ্গ এবায়ং পুরুষঃ; যদি স্বপ্নে সঙ্গবান্ স্যাৎ কামী, ততস্তৎসঙ্গজৈর্দোষৈবুদ্ধান্তায় প্রত্যাগতো লিপ্যেত ॥২৬৭৷৷১৬৷৷

টীকা। উত্তরকণ্ডিকাব্যাবর্ত্যাং শঙ্কামাহ-তত্রেতি। পূর্ব্বকণ্ডিকা সপ্তম্যর্থঃ। ভবত্ব- কর্তৃত্বহেতুরসঙ্গত্বং, কিং তাবতেত্যাশঙ্ক্যাহ-উক্তং চেতি। পূর্ব্বং শ্লোকোপন্যাসদশায়ামিতি যাবৎ। কৰ্ম্মবশাৎ স্বপ্নহেতুকৰ্ম্মসামর্থ্যাদিত্যর্থঃ। আত্মনঃ স্বপ্নে কামকর্মসম্বন্ধেহপি কিমিতি নাসঙ্গত্বং, তত্রাহ-কামশ্চেতি। হেত্বসিদ্ধিং পরিহরতি-ন ত্বিতি। ন চেদ্ধেতোরসিদ্ধত্বং, তর্হি কথং তৎসিদ্ধিরিতি পৃচ্ছতি-কথমিতি। হেতুসমর্থনার্থমুত্তরগ্রন্থমুখাপয়তি-অসঙ্গ ইতি। প্রতিযোন্যাদ্রবতীত্যেতদন্তং সর্বমিত্যুক্তম্। স্বপ্নে কর্তৃত্বাভাবস্তচ্ছব্দার্থঃ। উক্তমসঙ্গং ব্যতিরেক- মুখেন বিশদয়তি-যদীতি। সঙ্গবানিত্যস্য ব্যাখ্যানং-কামীতি। তৎসঙ্গজৈস্তত্র স্বপ্নে বিষয়বিশেষেষু কামাখ্যসঙ্গবশাদুৎপন্নৈরপরাধৈরিতি যাবৎ, ন তু লিপ্যতে, প্রায়শ্চিত্ত- বিধানস্যাপি স্বপ্নসুচিতাশুভাশঙ্কানিবহণার্থত্বাৎ বস্তুবৃত্তানুসারিত্বাভাবাদিতি শেষঃ ॥২৬৭৷১৬৷

ভাষ্যানুবাদ।—ইতঃ পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে যে, আত্মার অকর্তৃত্বের প্রতি, তাহার অসঙ্গত্বই হেতু অর্থাৎ যে হেতু পুরুষ অসঙ্গ—নির্লেপ, সেই হেতুই তাহার কর্তৃত্ব হইতে পারে না। পূর্ব্বেও একথা উক্ত হইয়াছে যে, প্রাক্তন কর্মানুসারে, যে বিষয়ে কামনা(ইচ্ছা) হয়, পুরুষ সেই বিষয়েই গমন করে। কাম অর্থই সঙ্গ, সুতরাং[অকর্তৃত্বের প্রতি যে, অসঙ্গো হি অয়ং পুরুষঃ,] এই-

১১০৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হেতু প্রযুক্ত হইয়াছে, তাহা অসিদ্ধ।[তদুত্তরে বলিতেছেন-] না-হেতুর অসিদ্ধত্ব দোষ ঘটে না; কেন ঘটে না? যে হেতু শ্রুতি তাহার অসঙ্গত্বই প্রতি- পাদন করিতেছেন-“স বা এবঃ” ইত্যাদি। সেই এই পুরুষ, যিনি সুষুপ্তি অবস্থা হইতে প্রত্যাগত হইয়াছেন; স্বপ্নাবস্থায় ইচ্ছানুসারে রমণ ও পরিভ্রমণ করিয়া এবং পুণ্য ও পাপ দর্শন করিয়া-ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্ব শ্রুতির মত। বুদ্ধান্তের(জাগরিতস্থানের) উদ্দেশে[প্রতিগমন করে]; অতএব অনস্বাগত প্রভৃতি কথায় অবধারিত হইতেছে যে, পুরুষ নিশ্চয়ই অসঙ্গ; কেননা, পুরুষ যদি স্বপ্নাবস্থায় সঙ্গবান্-কামনাবিশিষ্টই হইত, তাহা হইলে জাগরিতা- বস্থায় প্রত্যাগমনের পরেও নিশ্চয়ই স্বপ্নদৃষ্ট বিষয়ের সঙ্গজনিত পাপ- পুণ্য দ্বারা অবশ্যই লিপ্ত হইত; তাহা যখন হয় না, তখন পুরুষ নিশ্চয়ই অসঙ্গ; অতএব অকর্তৃত্বের প্রতি প্রযুক্ত অসঙ্গত্ব-হেতুটি কোনমতেই অসিদ্ধ হইতেছে না ৷ ২৬৭ ॥ ১৬ ॥

আভাসভাষ্যম্।—যথাসৌ স্বপ্নে অসঙ্গত্বাৎ স্বপ্নপ্রসঙ্গজৈর্দোষৈ- র্জাগরিতে প্রত্যাগতো ন লিপ্যতে, এবং জাগরিতসঙ্গজৈরপি দোষৈর্ন লিপ্যত- এব বুদ্ধান্তে। তদেতদুচ্যতে,—

আভাসভাষ্যানুবাদ।—এই পুরুষ অসঙ্গত্বনিবন্ধন জাগ্রদবস্থায় প্রত্যাগত হইয়া যেমন স্বপ্নকালীন ব্যবহারজনিত কোন দোষে লিপ্ত হয় না, তেমনি জাগ্রদবস্থায়ও অবস্থাকৃত কোন দোষে লিপ্ত হয় না; এখন সেই কথাই বলা হইতেছে—

স বা এষ এতস্মিন্ বুদ্ধান্তে রত্বা চরিত্বা দৃষ্ট্বৈব পুণ্যঞ্চ পাপঞ্চ পুনঃ প্রতিন্যায়ং প্রতিযোন্যাদ্রবতি স্বপ্নান্তায়ৈব ॥ ২৬৮ ॥ ১৭ ॥

সত্ত্বলার্থঃ।—সঃ এষঃ(পুরুষঃ) বৈ এতস্মিন্ বুদ্ধান্তে(জাগ্রদবস্থায়াৎ) রত্বা চরিত্বা পুণ্যৎ চ পাপৎ চ দৃষ্টা এব স্বপ্নাস্তায় এব পুনঃ প্রতিন্যায়ৎ প্রতিযোনি আদ্রবতি।(অন্যৎ সর্ব্বং পূর্ব্ববৎ) ॥২৬৮৷৷১৭৷৷

মূলানুবাদ।—এই সেই পুরুষ বুদ্ধান্তে—জাগ্রদবস্থায় রমণ ও পরিভ্রমণ করিয়া এবং পুণ্য ও পাপ দর্শন করিয়া পুনর্ব্বার স্বপ্নান্তের(স্বপ্নাবস্থার) উদ্দেশে প্রতিন্যায় ও প্রতিযোনিতে ধাবিত হয় ॥ ২৬৮ ॥ ১৭ ॥

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৭

শাঙ্কৰ্য্যভাষ্যম্।—স বৈ এষ এতস্মিন্ বুদ্ধান্তে জাগরিতে রত্বা চরিত্রে- ত্যাদি পূর্ব্ববৎ। যৎ তত্র বুদ্ধান্তে কিঞ্চিৎ পশ্যতি, অনস্বাগতঃ তেন ভবতি, অসঙ্গঃ হি অয়ং পুরুষ ইতি। ননু দৃষ্টৈবেতি কথমবধার্য্যতে? করোতি চ তত্র পুণ্যপাপে, তৎফলঞ্চ পশ্যতি; ন, কারকাবভাসকত্বেন কর্তৃত্বোপপত্তেঃ। “আত্মনৈবায়ং জ্যোতিষা আস্তে” ইত্যাদিনা আত্মজ্যোতিষাবভাসিতঃ কার্য্যকরণ- সঙ্ঘাতো ব্যবহারতি, তেনাস্য কর্তৃত্বমুপচর্য্যতে, ন স্বতঃ কর্তৃত্বম্। তথাচোক্তম্ “ধ্যায়তীব লেলায়তীব” ইতি বুদ্ধ্যাদ্যপাধিকৃতমেব, ন স্বতঃ; ইহ তু পরমার্থা- পেক্ষয়া উপাধিনিরপেক্ষমুচ্যতে—দৃষ্টৈব পুণ্যঞ্চ পাপঞ্চ, ন কৃত্বেতি; তেন ন পূর্ব্বাপরব্যাঘাতাশঙ্কা। যস্মান্নিরুপাধিকঃ পরমার্থতো ন করোতি, ন লিপ্যতে ক্রিয়াফলেন। তথা চ ব্যাসেন ভগবতোক্তম্,—

“অনাদিবিবিধং পদার্থং পরমাত্মন্যাসতঃ।

যত্রোত্থৈব কোষ্ঠে ন করোতি ন নিপাত্তয়েৎ ॥ ইতি। ১

টীকা। উত্তমর্থং দৃষ্টান্তীকৃত্য জাগরিতেহপি নির্লেপত্বমাত্মনো দর্শয়তি-যথেত্যাদিনা। তত্র প্রমাণমাহ-তদেভদিতি। জাগ্রদবস্থায়ামুক্তমকর্তৃত্বমাক্ষিপতি-নন্বিতি। তত্র কল্পিতং কর্তৃত্বমিত্যুত্তরমাহ-নেত্যাদিনা। তদেব বিবৃণোতি-আত্মনৈবেতি। স্বতোহকর্তৃত্বে বাক্যোপ- ক্রমং সংবাদয়তি-তথা চেতি। বাক্যার্থং সংগৃহ্লাতি-বুদ্ধ্যাদীতি। কর্তৃত্বমিতি শেষঃ। নম্বৌপাধিকং কর্তৃত্বং পূর্ব্বমুক্তমিদানীং তন্নিরাকরণে পূর্ব্বাপরবিরোধঃ স্যাদিত্যত্রাহ-ইহ ত্বিতি। উপাধিনিরপেক্ষঃ কর্তৃত্বাভাব ইতি শেষঃ। তেনেত্যুক্তং হেতুং স্ফুটয়তি-যস্মাদিতি। আত্মনো লেপাভাবে ভগবদ্বাক্যমপি প্রমাণমিত্যাহ-তথা চেতি। ১

তথা সহস্রদানন্ত কামপ্রবিবেকস্য দর্শিতত্বাৎ, তথা “স বা এষ এতস্মিন্ স্বপ্নে” “স বা এষ এতস্মিন্ বুদ্ধান্তে” ইত্যেতাভ্যাং কণ্ডিকাভ্যামসঙ্গতৈব প্রতিপাদিতা। যম্মাদ বুদ্ধান্তে কৃতেন স্বপ্নান্তং গতঃ সম্প্রসন্নোহসম্বদ্ধো ভবতি স্তৈন্যাদিকার্য্যাদর্শনাৎ, তস্মাৎ ত্রিঘপি স্থানেষু স্বতোহসঙ্গ এবায়ম্; অতোহমৃতঃ স্থানত্রয়ধর্মবিলক্ষণঃ। ২

প্রতিযোন্যাদ্রবতি স্বপ্নান্তায়ৈব সম্প্রসাদায়েত্যর্থঃ। দর্শনবৃত্তেঃ স্বপ্নস্য স্বপ্ন- শব্দেনাভিধানদর্শনাৎ, অন্তশব্দেন চ বিশেষণোপপত্তেঃ; “এতস্মা অন্তায় ধাবতি” ইতি চ সুযুপ্তং দর্শয়িষ্যতি। যদি পুনরেবমুচ্যতে, স্বপ্নান্তে রত্বা চরিত্বা ‘এতা- বুভাবন্তাবনুসঞ্চরতি—স্বপ্নান্তঞ্চ বুদ্ধান্তঞ্চ’ ইতি দর্শনাৎ ‘স্বপ্নাস্তায়ৈব’ ইত্যত্রাপি দর্শনবৃত্তিরেব স্বপ্ন উচ্যতে ইতি, তথাপি ন কিঞ্চিৎ দুষ্যতি; অসঙ্গতা হি সিযাধয়িষিতা সিধ্যত্যেব; যম্মাজ্জাগরিতে দৃষ্ট্বৈব পুণ্যঞ্চ পাপঞ্চ রত্বা চরিত্বা চ- স্বপ্নান্তমাগতঃ ন জাগরিতদোষেণানুগতো ভবতি ॥২৬৯৷১৭৷

১১০৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অবস্থাত্রয়েহপ্যসঙ্গত্বমনস্বাগতত্বং চাত্মনঃ সিদ্ধং চেৎ, বিমোক্ষপদার্থন্য নির্ণীতত্বাৎ জনকস্য নৈরাকাঙ্ক্ষ্যমিত্যাশঙ্ক্যাহ-তথেতি। যথা মোক্ষৈকদেশস্য কৰ্ম্মবিবেকস্য দর্শিতত্বাৎ পূর্বত্র সহস্রদানমুক্তং, তথাত্রাপি তদেকদেশস্য কামবিবেকস্য দর্শিতত্বাৎ তদ্দানং, ন তু কামপ্রশ্নস্য নির্ণীতত্বাদিত্যর্থঃ। দ্বিতীয়তৃতীয়কণ্ডিকয়োস্তাৎপর্য্যং সংগৃহ্লাতি-তথেত্যাদিনা। যথা প্রথম- কণ্ডিকয়া কৰ্ম্মবিবেকঃ প্রতিপাদিতস্তথেতি যাবৎ। কণ্ডিকাত্রিতয়ার্থং সংক্ষিপ্তোপসংহরতি- যম্মাদিতি। অবস্থাত্রয়েহপ্যসঙ্গত্বে কিং সিধ্যতি, তদাহ-অত ইতি। প্রতীকমাদায় স্বপ্নান্ত- শব্দার্থমাহ-প্রতিযোনীতি। কথং পুনস্তস্য সুষুপ্তবিষয়ত্বমত আহ-দর্শনবৃত্তেরিতি। দর্শনং বাসনাময়ং, তস্য বৃত্তির্যস্মিন্নিতি ব্যুৎপত্ত্যা স্বপ্নো দর্শনবৃত্তিস্তস্য স্বপ্নশব্দেনৈব সিদ্ধত্বাদন্তশব্দ- বৈয়র্থ্যাত্তস্যাস্তো লয়ো যস্মিন্নিতি ব্যুৎপত্যা স্বপ্নান্তশব্দেন সুষুপ্তগ্রহে সতি অন্তশব্দেন স্বপ্নস্য ব্যাবৃত্ত্যুপপত্তিরত্র সুষুপ্তস্থানমেব স্বপ্নান্তশব্দিতমিত্যর্থঃ। তত্রৈব বাক্যশেষানুগুণ্যমাহ- এতস্মা ইতি। স্বপ্নাস্তশব্দস্য স্বপ্নে প্রয়োগদশনাদিহাপি তস্যৈব তেন গ্রহণমিতি পক্ষান্তর- মুখাপ্যাঙ্গীকরোতি-যদীত্যাদিনা। সিষাধয়িষিতার্থসিদ্ধৌ হেতুমাহ-যস্মাদিতি ॥২৬৯৷১৭৷

ভাষ্যানুবাদ।—সেই এই পুরুষ এই বুদ্ধান্তে—জাগ্রদবস্থায় রমণ ও পরিভ্রমণ করিয়া ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্বের ন্যায়। সেই পুরুষ এই জাগ্রদবস্থায় যাহা কিছু দর্শন করে, তাহা দ্বারা অনুবদ্ধ হয় না; কারণ, এই পুরুষ অসঙ্গ। ভাল, ‘পুরুষ কেবল দর্শন করিয়াই’ এইরূপ অবধারণ করা হইতেছে কিরূপে? বস্তুতই ত পুণ্য ও পাপ অর্জন করে, এবং তাহার ফল সুখ-দুঃখও ভোগ করিয়া থাকে। না—এ আপত্তি হইতে পারে না; কারণ? যেহেতু চক্ষুঃপ্রভৃতি কারকনিচয়ের প্রকাশকত্ব নিবন্ধনই অকর্তা পুরুষের কর্তৃত্ব উপপন্ন হইতে পারে; অভিপ্রায় এই যে, ‘আত্মজ্যোতির প্রভাবেই ব্যবহার করিয়া থাকে’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, এই দেহেন্দ্রিয়সমষ্টি আত্মজ্যোতির দ্বারা উদ্ভাসিত হইয়াই সমস্ত ব্যবহার নিষ্পাদন করিয়া থাকে; এই কারণেই আত্মাতে কর্তৃত্ব ধর্ম্ম আরোপিত হয়, প্রকৃতপক্ষে কিন্তু পুরুষের কর্তৃত্ব নাই; ঐ কর্তৃত্ব তাহার স্বভাবসিদ্ধ নহে। ‘ধ্যায়তীব লেলায়তীব’ ইত্যাদি শ্রুতিতেও বলা হইয়াছে যে, বুদ্ধ্যাদি উপাধি- জনিতই আত্মার কর্তৃত্ব, কিন্তু স্বভাবতঃ নহে। এখানে উপাধিকৃত ঔপচারিক ভাব পরিত্যাগ করিয়া শুদ্ধ পারমার্থিক অবস্থা মাত্র লইয়াই বলা হইতেছে যে, পুণ্য ও পাপ শুধু দর্শন করিয়া, কিন্তু অনুষ্ঠান করিয়া নহে; সুতরাং পূর্ব্বাপর বিরোধের কোন সম্ভাবনা থাকিতেছে না। কেন না, উপাধিসম্পর্ক-রহিত পুরুষ প্রকৃতপক্ষে কিছুই করে না; করে না বলিয়াই ক্রিয়াফলেও লিপ্ত হয় না। স্বয়ং ভগবান্ও এইরূপই বলিয়া- ছেন—‘হে কুস্তিনন্দন, সর্ব্ববিকার-রহিত এই পরমাত্মা যেহেতু অনাদি ও

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১১০৯

নির্গুণ, সেই হেতু ক্রিয়াসাধন শরীরের মধ্যে বর্তমান থাকিয়াও কর্ম্ম করে না, এবং কর্ম্মফলে লিপ্ত হয় না’, ইতি। ১

পূর্ব্বে কর্মবিবেক-প্রদর্শনে যেমন সহস্রদান উক্ত হইয়াছে, তেমনি এখানেও মোক্ষৈকদেশ কামবিবেক অর্থাৎ আত্মা যে, কোনপ্রকার কামনা বা তৎফলে লিপ্ত নহে, তাহা প্রদর্শিত হওয়ায় সহস্র দান করা হইতেছে;[কিন্তু এখনও জনকের অভিলষিত মোক্ষতত্ত্ব নির্ণীত হয় নাই]। পূর্ব্বোক্ত “স বা এষ এতস্মিন্ স্বপ্নে” ও “স বা এষ এতস্মিন্ বুদ্ধান্তে” ইত্যাদি শ্রুতিদ্বয়ে আত্মার অসঙ্গত্বই প্রতিপাদিত হইয়াছে। যেহেতু স্বপ্ন ও সুযুপ্তি অবস্থাগত আত্মা বুদ্ধান্তে(জাগ্রদবস্থায়) অনুষ্ঠিত কৰ্ম্ম বা ভাবনা দ্বারা সংস্পৃষ্ট হয় না; প্রকৃত চৌর্য্যাদি কার্য্যের অনুষ্ঠান তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায় না; সেই হেতুই এই পুরুষ জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুযুপ্তি, এই স্থানত্রয়েই অসঙ্গ; অসঙ্গত্ব নিবন্ধনই অমৃত; অমৃত অর্থ—উক্ত স্থানত্রয়ের’ যাহা ধৰ্ম্ম বা অবস্থা, তাহা হইতে সম্পূর্ণ বিলক্ষণ। ২

স্বপ্নান্তের—সংপ্রসাদের উদ্দেশ্যে পূর্ব্ববৎ প্রতিযোনিক্রমে ধাবিত হয়; পূর্ব্বে সাক্ষাৎ স্বপ্নশব্দেও দর্শনাত্মক স্বপ্ন অভিহিত হওয়ায় এখানে ‘স্বপ্নান্ত’ শব্দে সুষুপ্তি অবস্থাই বুঝিতে হইবে; সেই জন্য ‘অন্ত’(স্বপ্নান্ত) শব্দ দ্বারা বিশেষিত করাও সুসঙ্গত হইতেছে; ইহার পরেও, ‘এই অন্তের অভিমুখে ধাবিত হয়’ শ্রুতিতে এই অন্ত-শব্দেই সুষুপ্তির স্পষ্টতঃ উল্লেখ করা হইবে। আর যদি এইরূপ ব্যাখ্যা কর যে, ‘স্বপ্নান্তে অর্থাৎ স্বপ্নে রমণ ও পরিভ্রমণ করিয়া’ এবং ‘স্বপ্নাস্ত(স্বপ্ন) ও বুদ্ধান্ত, এই উভয় অন্তে—অর্থাৎ অবস্থাদ্বয়ে যথাক্রমে সঞ্চরণ করে’। এই দুই স্থানে স্বপ্ন অর্থে ‘অন্ত’ শব্দের প্রয়োগ দর্শনে বুঝা যাইতেছে যে, ‘স্বপ্নাস্তায় এব’ এই স্থলেও দর্শনাত্মক স্বপ্নাবস্থারই উল্লেখ করা হইয়াছে। হাঁ, এরূপ ব্যাখ্যা করিলেও কিছুমাত্র দোষ হইতেছে না; কারণ, আমাদের সিষাধয়িষিত(যাহা সাধন বা প্রমাণ করিতে অভিপ্রেত), সেই অসঙ্গত্ব স্বভাবসিদ্ধই হইতেছে; যে হেতু জাগ্রদবস্থায় কেবল পুণ্য ও পাপের ফল দর্শন করিয়া অর্থাৎ ভোগ করিয়া রমণ ও পরিভ্রমণের পর স্বপ্নান্তে উপস্থিত হইয়া জাগ্রৎ-অবস্থার দোষে বা গুণে লিপ্ত হয় না;[সেই হেতু পুরুষের অসঙ্গত্বসিদ্ধির কোনও বাধা ঘটিতেছে না] ॥২৬৯৷৷১৭৷৷

আভাসভাষ্যম্।—এবময়ং পুরুষ আত্মা স্বয়ংজ্যোতিঃ কার্য্যকরণ- বিলক্ষণস্তৎপ্রযোজকাভ্যাং কাম-কর্ম্মভ্যাং বিলক্ষণঃ, যম্মাদসঙ্গো হ্যায়ং পুরুষঃ, অসঙ্গত্বাদিত্যয়মর্থঃ “স বা এষ এতস্মিন্ সম্প্রদাদে” ইত্যাদ্যাভিস্তিসৃভিঃ কণ্ডি-

১১১০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

কাভিঃ প্রতিপাদিতঃ। অত্রাসঙ্গতৈবাত্মনঃ কুতঃ? যস্মাৎ জাগরিতাৎ স্বপ্নং, স্বপ্নাচ্চ সম্প্রসাদঃ, সম্প্রসাদাচ্চ পুনঃ স্বপ্নঃ ক্রমেণ বুদ্ধান্তং জাগরিতম্, বুদ্ধান্তাচ্চ পুনঃ স্বপ্নান্তমিত্যেবমনুক্রমসঞ্চারেণ স্থানত্রয়স্য ব্যতিরেকঃ সাধিতঃ। পূর্ব্বমপ্য- পন্যস্তোহয়মর্থঃ-“স্বপ্নো ভূত্বেমং লোকমতিক্রামতি মৃত্যো রূপাণি” ইতি। তৎ বিস্তরেণ প্রতিপাদ্য কেবলং দৃষ্টান্তমাত্রমবশিষ্টং তদ্বক্ষ্যামীত্যারভ্যতে।-

আভাসভাষ্যানুবাদ।—এইরূপে ‘স বৈ এষ এতস্মিন্ সম্প্রসাদ্দে’ ইত্যাদি তিনটা শ্রুতিদ্বারা এই বিষয় প্রতিপাদন করা হইয়াছে যে, এই পুরুষ- পদবাচ্য আত্মা দেহেন্দ্রিয়াদি হইতে সম্পূর্ণ ভিন্নপ্রকার, এবং অসঙ্গ; অসঙ্গ বলিয়াই দেহেন্দ্রিয়াদি-নিষ্পাদ্য কাম-কৰ্ম্ম হইতেও বিলক্ষণ; তন্মধ্যে আত্মার অসঙ্গত্বধৰ্ম্মটী প্রমাণ করা যায় কিসে?[তদুত্তরে বলিতেছেন,] যে হেতু জাগরণ হইতে স্বপ্ন, স্বপ্ন হইতে সৎপ্রসাদ(সুযুপ্তি), সম্প্রসাদ হইতে পুনর্ব্বার স্বপ্ন, স্বপ্ন হইতে বুদ্ধান্ত(জাগরণ), এবং জাগরণ হইতে আবার অপর স্বপ্ন, এইরূপে ক্রমিক সংচরণ প্রদর্শন দ্বারা স্থানত্রয় হইতে আত্মার ব্যতিরেক বা অসঙ্গত্ব প্রমাণ করা হইয়াছে। তৎপূর্ব্বেও এই বিষয়েরই উল্লেখ রহিয়াছে; যথা ‘স্বপ্নাবস্থা লাভ করিয়া মৃত্যুস্বরূপ ইহলোক অতিক্রম করে’ ইত্যাদি। সেখানেই ইহা বিস্তারিত- রূপে প্রতিপাদন করা হইয়াছে; কেবল তদ্বিষয়ে দৃষ্টান্ত মাত্র প্রদর্শন করিতে বাকি রহিয়াছে; এখন তাহাই বলিতে হইবে; এই জন্য পরবর্তী শ্রুতি আরব্ধ হইতেছে—

তদ্ যথা মহামৎস্য উভে কূলে অনুসঞ্চরতি পূর্ব্বঞ্চা- পরঞ্চ, এবমেবায়ং পুরুষ এতাবুভাবন্তাবনুসঞ্চরতি স্বপ্নান্তঞ্চ বুদ্ধান্তঞ্চ ॥ ২৭০ ॥ ১৮ ॥

সক্সলার্থঃ।—[ আত্মনঃ অসঙ্গত্বং দৃষ্টান্তবলেন সমর্থয়িতুমাহ—“তদ্‌ যথা” ইতি।] তৎ(তত্র আত্মনঃ অসঙ্গত্ববিষয়ে)[অয়ৎ দৃষ্টান্তঃ—] যথা মহামৎস্যঃ (মহান্ বলবত্তরঃ মৎস্যঃ) উভে কূলে(তীরে)—পূর্ব্বং চ অপরং চ(কূলং) অনুসঞ্চরতি(ক্রমেণ পরিভ্রমতি), এবম্ এব(মহামৎস্যবদ্ এব) অয়ৎ পুরুষঃ এতৌ উভৌ অন্তৌ—[কৌ তৌ?] স্বপ্নান্তং(জাগরণম্) চ, বুদ্ধান্তং(স্বপ্নং) চ অনুসঞ্চরতি(ক্রমেণ গচ্ছতি ইত্যর্থঃ) ॥২৭০৷৷১৮৷৷

মূলানুবাদ।—কথিত বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই যে, যেমন বৃহৎ মৎস্য নদীর পূর্ব্ব ও পশ্চিম উভয় তীরে যথাক্রমে সঞ্চরণ(গমনাগমন)

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১১

করিয়া থাকে, ঠিক তেমনই এই পুরুষও স্বপ্নান্ত(জাগ্রদবস্থা) ও বুদ্ধান্ত(স্বপ্নাবস্থা,) এই উভয় অন্তে(অবস্থায়) যথাক্রমে সঞ্চরণ করিয়া থাকে ॥ ২৭০ ॥ ১৮॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তৎ তত্র এতস্মিন্ যথাপ্রদর্শিতে অর্থে দৃষ্টান্তোহয়- মুপাদীয়তে,—যথা লোকে মহামৎস্যঃ—মহাংশ্চাসৌ মৎস্যশ্চ নাদেয়েন স্রোতলা অহার্য্য ইত্যর্থঃ, স্রোতশ্চ বিষ্টম্ভয়তি স্বচ্ছন্দচারী, উভে কূলে নদ্যাঃ পূর্ব্বঞ্চাপরঞ্চ অনুক্রমেণ সঞ্চরতি; সঞ্চরন্নপি কূলদ্বয়ং তন্মধ্যবর্তিনোদকস্রোতোবেগেন ন পরবশীক্রিয়তে; এবমেবায়ং পুরুষ এতাবুভৌ অন্তৌ অনুসঞ্চরতি; কৌ তৌ?— স্বপ্নান্তঞ্চ বুদ্ধান্তং চ। দৃষ্টান্তপ্রদর্শনফলং তু মৃত্যুরূপঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতঃ সহ তৎপ্রযোজকাভ্যাং কাম-কর্ম্মভ্যাম্ অনাত্মধর্ম্মঃ, অয়ঞ্চাত্মা তস্মাদ্বিলক্ষণঃ—ইতি বিস্তরতো ব্যাখ্যাতম্ ॥২৭০॥১৮৷৷

টীকা। কণ্ডিকাত্রয়েণ সিদ্ধমর্থমনুবদতি-এবমিতি। আত্মনঃ স্থানত্রয়সঞ্চারাদসিদ্ধোহ- সঙ্গত্বহেতুরিতি শঙ্কতে-তত্রেতি। প্রতিজ্ঞাহেত্বোর্হেতুনির্ধারণং সপ্তম্যর্থঃ। সপ্রযোজকাদ্দেহ- দ্বয়ান্বৈলক্ষণ্যং তু দূরনিরস্তমিত্যেবশব্দার্থঃ। এবং চোদিতে হেতুসমর্থনার্থং মহামৎস্যবাক্যমিতি সঙ্গতিমভিপ্রেত্য সংগত্যন্তরমাহ-পূর্বমপীতি। যথাপ্রদর্শিতোহর্থোহসঙ্গত্বং কার্য্যকরণ- বিনির্মুক্তত্বং চ। অহার্য্যত্বমপ্রকম্প্যত্বম্। স্বচ্ছন্দচারিত্বং প্রকটয়তি-সঞ্চরন্নপীতি। কিং পুনর্দ ৃষ্টান্তেন দাষ্টান্তিকে লভ্যতে, তদাহ-দৃষ্টান্তেতি ॥২৭০॥১৮॥

ভাষ্যানুবাদ।-এখানে যে বিষয়ের উপদেশ করা হইল, তদ্বিষয়ে এই একটা দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইতেছে,-জগতে মহামৎস্য-বৃহৎ মৎস্য অর্থাৎ যে মৎস্য নদীর স্রোতোবেগে চালিত হয় না, বরং নিজে স্রোতোবেগকে স্থগিত করিতে সমর্থ, এমন স্বচ্ছন্দগতিশীল মৎস্য যেরূপ নদীর উভয় কূলে-পূর্ব্ব ও পশ্চিম তীরে ক্রমশঃ গমনাগমন করে; উভয় তীরে সঞ্চরণ করিলেও যেমন নদীগর্ভস্থ স্রোতো- বেগের বশীভূত হয় না, ঠিক এইরূপ উক্ত পুরুষও এই উভয় অন্তে যথাক্রমে সঞ্চরণ করিয়া থাকে। সেই দুইটি অন্ত কি কি? না, স্বপ্নান্ত ও বুদ্ধান্ত অর্থাৎ স্বপ্ন ও জাগরণাবস্থা। উক্ত দৃষ্টান্তপ্রদর্শনের ফল এই যে, পূর্ব্বোক্ত দেহেন্দ্রিয়-সংঘাতরূপ মৃত্যু এবং দেহেন্দ্রিয়াদির প্রবর্তক কাম ও কৰ্ম্ম, এ সমস্তই অনাত্ম-ধর্ম-আত্মার ধৰ্ম্ম নহে; এই আত্মা দেহেন্দ্রিয়াদি হইতে সম্পূর্ণ ভিন্নপ্রকার। পূর্ব্বেই ইহা বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে ॥২৭০৷৷১৮৷৷

আভাসভাষ্যম্।—অত্র চ স্থানত্রয়ানুসঞ্চারেণ স্বয়ংজ্যোতিষ আত্মনঃ কার্য্যকরণসঙ্ঘাতব্যতিরিক্তস্য কামকর্ম্মভ্যাৎ বিবিক্ততা উক্তা; স্বতো নায়ৎ

১১১২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সংসারধৰ্ম্মবান, উপাধিনিমিত্তমেবাস্য সংসারিত্বমবিদ্যাধ্যারোপিতমিত্যেব সমুদায়ার্থ উক্তঃ। তত্র চ জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তস্থানানাং ত্রয়াণাং বিপ্রকীর্ণরূপ উক্তঃ, ন পুঞ্জীকৃত্যৈকত্র দর্শিতঃ—যস্মাৎ জাগরিতে সসঙ্গঃ সমৃত্যুঃ সকার্য্যকরণসঙ্ঘাত উপ- লক্ষ্যতেইবিদ্যয়া; স্বপ্নে তু কামসংযুক্তো মৃত্যুরূপবিনির্ম্মুক্ত উপলভ্যতে; সুযুপ্তে পুনযুদ্ধান্তমাগতো বুদ্ধান্তাচ্চ সুযুপ্তে সম্প্রসন্নোহসঙ্গো ভবতীতি অসঙ্গতাপি দৃশ্যতে। একবাক্যতয়া তু উপসংহ্রিয়মাণং ফলং নিত্যমুক্তবুদ্ধশুদ্ধস্বভাবতা অন্য ন একত্র পুঞ্জীকৃত্য প্রদর্শিতেতি তৎপ্রদর্শনায় কণ্ডিকা আরভ্যতে।

সুষুপ্তে হ্যেবংরূপতাস্য বক্ষ্যমাণা—“তদ্বা অস্যৈতদতিচ্ছন্দা অপহতপাপ্মাভয়ৎ রূপম্” ইতি। যম্মাদেবংরূপং বিলক্ষণং সুযুপ্তং প্রবিবিক্ষিতমিতি, তৎ কথমিত্যাহ —দৃষ্টান্তেনাস্যার্থস্য প্রকটীভাবো ভবতীতি। তত্র দৃষ্টান্ত উপাদীয়তে,—

আভাসভাষ্য-টীকা। শ্যেনবাক্যমবতাররিতুং বৃত্তং কীর্তয়তি-অত্র চেতি। পূর্ব্বসন্দর্ভঃ সপ্তম্যর্থঃ। দেহদ্বয়েন সপ্রযোজকেন বস্তুতোহসম্বন্ধে ফলিতমাহ-স্বত ইতি। কথং তহি তত্র সংসারিত্বধীরিত্যাশঙ্ক্যাহ-উপাধীতি। ঔপাধিকস্যাপি বস্তুত্বমাশঙ্ক্যাহ-অবিদ্যেতি। বৃত্তমনূদ্যোত্তরগ্রন্থমবতারয়ন্ ভূমিকামাহ-তত্রেতি। স্থানদ্বয়সম্বন্ধিত্বেন বিপ্রকীর্ণং বিশ্লিষ্টং রূপমস্যেত্যাত্মা তথা। পুঞ্জীকৃত্য বিবক্ষিতং সর্ব্বং বিশেষণমাদায়েতি যাবৎ। একত্রেতি বাক্যোক্তিঃ। তত্র হেতুং বদন্ জাগ্রদ্বাক্যেন বিবক্ষিতাত্মোক্তিরিত্যাহ-যম্মাদিতি। সসঙ্গত্বাদেদৃশ্যমানরূপস্থ মিথ্যাত্বং সুচয়তি-অবিদ্যয়েতি। স্বপ্নবাক্যে বিবক্ষিতাত্মসিদ্ধি- মাশঙ্ক্যাহ-স্বপ্নে ত্বিতি। তহি সুষুপ্তবাক্যে তৎসিদ্ধির্নেত্যাহ-সুষুপ্তে পুনরিতি। তত্রাপি বিদ্যানিম্মোকো ন প্রতিভাতীতি ভাবঃ; এবং পাতনিকাং কৃত্বা শ্যেনবাক্যমাদত্তে-এক- বাক্যতয়েতি। পূর্ব্ববাক্যানামিতি শেষঃ। কুত্র তর্হি যথোক্তমাত্মরূপং পুঞ্জীকৃত্য প্রদর্শতে, তত্রাহ-সুযুপ্তে হীতি। তত্রাভয়মিত্যবিদ্যারাহিত্যমুচ্যতে। সা চ সুযুপ্তে স্বরূপেণ সত্যপি নাভিব্যক্তা ভাতীতি দ্রষ্টব্যম্। যস্মাৎ সুযুপ্তে যথোক্তমাত্মরূপং বক্ষ্যতে, তস্মাদিতি যাবৎ। এবংরূপমিত্যেতদেব প্রকটয়তি-বিলক্ষণমিতি। কার্যকরণবিনিমুক্তং কামকর্মাবিদ্যারহিত- মিত্যর্থঃ। স্থানদ্বয়ং হিত্বা কথং সুযুপ্তং প্রবেষ্টুমিচ্ছতীতি পৃচ্ছতি-তৎ কথমিতি। স্বপ্নাদৌ দুঃখানুভবাৎ তত্ত্যাগেন সুযুপ্তং প্রাপ্নোতীত্যাহ-আহেতি। অথোত্তরা শ্রুতিঃ স্থানান্তর- প্রাপ্তিমভিধত্তাং, তথাপি কিং দৃষ্টান্তবচনেনেত্যাশঙ্ক্যাহ-দৃষ্টান্তেনেতি। অন্যার্থস্য সুষুপ্তি- প্রাপ্তিরূপন্যেত্যেতৎ। স এবার্থস্তত্রেতি সপ্তম্যর্থঃ।

আভাসভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্ব শ্রুতিতে, জাগ্রৎ স্বপ্নপ্রভৃতি অবস্থা- ত্রয়ে আত্মার গমনাগমন প্রদর্শন দ্বারা প্রতিপাদন করা হইয়াছে যে, অবস্থাত্রয়েই আত্মা স্বয়ংজ্যোতিঃস্বরূপ এবং দেহেন্দ্রিয়সমষ্টি হইতে স্বতন্ত্র ও কাম-কর্ম্ম দ্বারা অসংস্পৃষ্ট। আত্মার সংসার-ধর্মটী স্বাভাবিক নহে, ঔপাধিক; উপাধি-সম্বন্ধই তাহার সংসার-গমনের কারণ; অবিদ্যাই তাহার উপাধি; অবিদ্যা দ্বারাই

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩

তাহাতে সংসার-ধৰ্ম্ম আরোপিত হয়; এই সমুদয় বিষয় অভিহিত হইয়াছে। বিশেষতঃ জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি, এই স্থানত্রয়ের পৃথক্ পৃথক্ উল্লেখপূর্ব্বক আত্মার স্বরূপও পৃথক্ পৃথক্ ভাগে উক্ত হইয়াছে; কিন্তু এক স্থানে একত্রিত করিয়া প্রদর্শিত হয় নাই; ‘কেন না, জাগ্রদবস্থায় অবিদ্যাপ্রভাবেই আত্মার সঙ্গ, মৃত্যু ও দেহেন্দ্রিয়সমষ্টির সহিত সম্বন্ধ সত্য বলিয়াই যেন প্রতীতি হয়; সুষুপ্তি অবস্থায় আবার সঙ্গরহিত সম্যক্ প্রসন্নতাও দৃষ্ট হয়; এই জন্য তাহার অসঙ্গত্বও দেখা যায়; কিন্তু ঐ সমস্ত বাক্যের একবাক্যতা বা একই অর্থে তাৎ- পর্যাবধারণের সঙ্কলিত ফলস্বরূপ যে, নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ ও মুক্তস্বভাব, তাহা একত্র সঙ্কলন করিয়া প্রদর্শন করা হয় নাই; তৎপ্রদর্শনের অভিপ্রায়েই এই কণ্ডিকা(শ্রুতি) আরব্ধ হইতেছে।

ইহাই যে, আত্মার স্বাভাবিক রূপ, তাহা—‘ইহাই তাহার অপহতপাপ, ও অভয় অচিন্ত্য স্বরূপ’ ইত্যাদি বাক্যে প্রতিপাদিত হইবে। আত্মা যে, এবংবিধ বৈলক্ষণ্যপূর্ণ সুযুপ্তিকালীন রূপে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা করে, তাহা কিরূপে সম্ভবপর হয়, দৃষ্টান্ত দ্বারা তাহা পরিস্ফুট হইতে পারে; এই জন্য, তৎপ্রদর্শনার্থ দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইতেছে—

তদ্ যথাস্মিন্নাকাশে শ্যেনো বা সুপর্ণো বা বিপরিপত্য শ্রান্তঃ সংহত্য পক্ষৌ সংলয়ায়ৈব প্রিয়তে, এবমেবায়ং পুরুষ- এতস্মা অন্তায় ধাবতি, যত্র সুপ্তো ন কঞ্চন কামং কাময়তে, ন কঞ্চন স্বপ্নং পশ্যতি ॥ ২৭১ ॥ ১৯ ॥

সরলার্থঃ।-তৎ(তত্র-যথোক্তে অর্থে)[অয়ং দৃষ্টান্তঃ প্রদর্শ্যতে-] যথা শ্যেনঃ(পক্ষিবিশেষঃ) বা, সুপর্ণঃ(যঃ কশ্চিৎ পক্ষী) বা, অস্মিন্(ভৌতিকে) আকাশে বিপরিপত্য(বিহৃত্য) শ্রান্তঃ(শ্রমযুক্তঃ সন্) পক্ষৌ সংহত্য(পক্ষ-বিস্তারং কৃত্বা) সংলয়ায়(সংলীয়তে অস্মিন্ ইতি সংলয়ঃ-আশ্রয়নীড়ৎ, তস্মৈ) প্রিয়তে (স্বয়মেব ধার্য্যতে); এবম্ এব(শ্যেনাদিবদ্ এব) অয়ং পুরুষঃ এতস্মৈ অন্তায় (সুষুপ্তিস্থানায়) ধাবতি; যত্র(যস্মিন্ অন্তে) সুপ্তঃ সন্ কংচন(কমপি) কামং ন কাময়তে(প্রার্থয়তে), কংচন স্বপ্নং ন পশ্যতি।[জীবঃ জাগ্রৎ- স্বপ্নয়োঃ যথাকামৎ বিহৃত্য শ্রান্তঃ সন্, তচ্ছ্রমাপনোদনায় সুষুপ্তিস্থানং প্রবিশতীতি ভাবঃ] ॥২৭১৷১৯৷৷

১১১৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মূলানুবাদ:-[পূর্ব্বোক্ত বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই যে,] শ্যেন কিংবা সাধারণ পক্ষী যেমন আকাশমণ্ডলে পরিভ্রমণ করত পরিশ্রান্ত হইয়া পক্ষদ্বয় প্রসারিত করত স্বীয় আশ্রয়-নীড়াভিমুখে গমনে প্রবৃত্ত হয়, ঠিক তেমনি এই পুরুষও এই অন্তে(সুষুপ্তিস্থানে) প্রবেশের জন্য ধাবিত হয়,-যেখানে[গমন করিয়া] কোন ভোগ্য বিষয় কামনা করে না, এবং কোনরূপ স্বপ্নও দর্শন করে না ॥ ২৭১ ৷ ১৯ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্?—তৎ যথা—অস্মিন্নাকাশে ভৌতিকে, শ্যেনো বা, সুপর্ণো বা, সুপর্ণশব্দেন ক্ষিপ্রঃ শ্যেন উচ্যতে, যথা আকাশেহস্মিন্ বিহৃত্য বিপরিপত্য শ্রান্তঃ নানাপরিপতনলক্ষণেন কর্ম্মণা পরিখিন্নঃ, সংহত্য পক্ষৌ সঙ্গময্য সম্প্রসার্য্য পক্ষৌ, সম্যক্ লীয়তেহস্মিন্নিতি সংলয়ঃ নীড়ঃ, নীড়ায়ৈব প্রিয়তে স্বাত্মনৈব ধার্য্যতে স্বয়মেব। যথা অয়ং দৃষ্টান্তঃ, এবমেব অয়ং পুরুষঃ এতস্মা এতস্মৈ অন্তায় ধাবতি। অন্তশব্দবাচ্যস্য বিশেষণং—যত্র যস্মিন্নন্তে সুপ্তঃ ন কঞ্চন ন কঞ্চিদপি কামং কাময়তে; তথা ন কঞ্চন স্বপ্নং পশ্যতি।

‘ন কঞ্চন কামম্’ ইতি স্বপ্নবুদ্ধান্তয়োরবিশেষেণ সর্ব্বঃ কামঃ প্রতিষিধ্যতে, ‘কঞ্চন’ ইত্যবিশেষিতাভিধানাৎ; তথা ‘ন কঞ্চন স্বপ্নম্’ ইতি।—জাগরিতেহপি যদ্দর্শনম্, তদপি স্বপ্নং মন্যতে শ্রুতিঃ; অত আহ—ন কঞ্চন স্বপ্নং পশ্যতীতি। তথা চ শ্রুত্যন্তরম্—“তস্য ত্রয় আবসথাস্ত্রয়ঃ স্বপ্নাঃ” ইতি। যথা দৃষ্টান্তে পক্ষিণঃ পরি- পতনজ-শ্রমাপনুত্তয়ে স্বনীড়োপসর্পণম্, এবং জাগ্রৎস্বপ্নয়োঃ কার্য্যকরণসংযোগজ- ক্রিয়াফলৈঃ সংযুজ্যমানস্য, পক্ষিণঃ পরিপতনজ ইব শ্রমো ভবতি; তচ্ছুমাপনুত্তয়ে স্বাত্মনো নীড়মায়তনং সর্ব্বসংসারধর্মবিলক্ষণং সর্ব্বক্রিয়াকারকফলায়াসশূন্যং স্বমাত্মানং প্রবিশতি ॥২৭১৷৷১৯৷৷

টীকা। পরমাত্মাকাশং ব্যাবর্তয়িতুং ভৌতিকবিশেষণম্। মহাকায়ো মন্দবেগঃ শ্যেনঃ, সুপর্ণস্ত বেগবানল্পবিগ্রহ ইতি ভেদঃ। ধারণে সৌকর্য্যং বক্তুং স্বয়মেবেত্যুক্তম্, স্বপ্নজাগরিতয়ো- রবসানমন্তমজ্ঞাতং ব্রহ্ম। তথা ন কঞ্চন স্বপ্নমিতি স্বপ্নজাগরিতয়োরবিশেষেণ সর্ব্বং দর্শনং নিষিধ্যত ইতি শেষঃ। স্বপ্নবিশেষণাৎ স্বপ্নদর্শননিষেধেহপি কুতো জাগ্রদর্শনং নিষিধ্যতে, তত্রাহ—জাগরিতেহপীতি। কথময়মভিপ্রায়ঃ শ্রুতেরবগত ইত্যাশঙ্ক্য বিশেষণসামর্থ্যাদিত্যাহ— অত আহেতি। জাগরিতস্যাপি স্বপ্নত্বে শ্রুত্যন্তরং সম্বাদয়তি—তথা চেতি। দৃষ্টান্তদাষ্টান্তি- কয়োর্বিবক্ষিতমংশং দর্শয়তি—যথেত্যাদিনা। সংযুজ্যমানস্য ক্ষেত্রজ্ঞস্যেতি শেষঃ। সর্বসংসার- ধর্মবিলক্ষণমিতি বিশেষণং ব্যাচষ্টে—সর্ব্বেতি ॥২৭১।১৯৷

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৫

ভাষ্যানুবাদ।—[পূর্ব্বোক্ত বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই—] যেমন এই আকাশ- মণ্ডলে শ্যেন কিংবা সুপর্ণ,—সুপর্ণ শব্দে দ্রুতগামী শ্যেনপক্ষী বুঝায়(১), তাহারা যেমন এই আকাশে বিহার করিয়া—ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করত পরিশ্রান্ত হইয়া—নানাভাবে উড্ডয়ন করিয়া কাতর হয়, এবং কাতর হইয়া, পক্ষদ্বয় প্রসারিত করত—যেখানে সম্যরূপে(সর্ব্বদা) অবস্থিতি করে, সেই নিজ নিবাসনীড়ের উদ্দেশে নিজেই নিজকে ধারণ করে অর্থাৎ নিজ নীড়াভিমুখে যাইতে প্রস্তুত হয়। দৃষ্টান্তটি যেরূপ, ঠিক সেইরূপই এই পুরুষ সেই(পূর্ব্বোক্ত) অন্তে(সুষুপ্তির দিকে) ধাবিত হয়। ‘অন্ত’ শব্দে যাঁহাকে বুঝাইয়াছে, তাহাই বিশেষ করিয়া বলিতেছেন—যে অন্তে(সুষুপ্তি অবস্থায়) সুপ্ত হইয়া, জীব কোনও বিষয়ে কামনাও করে না, এবং কোন প্রকার স্বপ্নও দেখে না।

কোন প্রকার কাম্য বিষয় কামনা করে না, এ কথায় সাধারণতঃ স্বপ্ন ও জাগরণ উভয় অবস্থাগত কামনাই নিষিদ্ধ হইতেছে; কারণ, শ্রুতিতে ‘কংচন’ বলিয়া সাধারণভাবে উল্লেখ রহিয়াছে। এইরূপ ‘ন কংচন স্বপ্নং’ এই বাক্য হইতে বুঝা যাইতেছে যে, জাগ্রৎকালেও যে, বিষয়দর্শন, শ্রুতি তাহাও স্বপ্ন বলিয়াই মনে করেন; এই অভিপ্রায়েই শ্রুতি বলিয়াছেন যে, ‘কোনপ্রকার স্বপ্নই দেখে না‘। ইহার অনুকূলে অন্য শ্রুতিও রহিয়াছে—’তাহার(জীবের) তিনটি বাসস্থান(অবস্থা), এবং তিনপ্রকার স্বপ্ন’ ইতি। দৃষ্টান্তস্থলে যেমন পক্ষীর ইতস্ততঃ পরিভ্রমণজনিত শ্রমাপনোদনের নিমিত্ত নিজ নীড়াভিমুখে গমন হয়, তেমনি জীবেরও দেহেন্দ্রিয়াদির সহিত সংযোগজনিত নানাবিধ ক্রিয়াফলের সহিত সম্বন্ধবশতঃ পক্ষীর মতই পরিশ্রম হইয়া থাকে, সেই পরিশ্রম নিবৃত্তির নিমিত্ত আপনার আশ্রয়স্থান সর্ব্বপ্রকার সংসারসম্বন্ধশূন্য এবং সর্ব্বপ্রকার ক্রিয়া কারক ও ফলসম্ভূত ক্লেশসম্বন্ধরহিত স্বীয় আত্মায়[স্বরূপাবস্থায়] প্রবেশ করে ॥২৭১৷৷১৯৷৷

আভাসভাষ্যম্।—যদি অস্যায়ৎ স্বভাবঃ—সর্ব্বসংসারধর্মশূন্যতা, পরো- পাধিনিমিত্তঞ্চাস্য সংসারধর্ম্মিত্বম্; যন্নিমিত্তঞ্চাস্য পরোপাধিকৃতং সংসারধর্ম্মিত্বং, সা চাবিদ্যা; তস্যা অবিদ্যায়াঃ কিং স্বাভাবিকত্বম্? আহোম্বিৎ কামকর্মাদিবদা- গন্তুকত্বম্? যদি চাগন্তুকত্বং, ততো বিমোক্ষ উপপদ্যতে; তস্যাশ্চাগন্তুকত্বে কা

১১৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

উপপত্তিঃ, কথং বা নাথধর্ম্মোহবিদ্যেতি—সর্ব্বানর্থবীজভূতায়া অবিদ্যায়াঃ সতত্ত্বাবধারণার্থং পরা কণ্ডিকা আরভ্যতে—

আভাসভাষ্য-টীকা। শ্যেনবাক্যেনাত্মনঃ সৌবুপ্তং রূপমুক্তমিদানীং নাড়ীখণ্ডস্য সম্বন্ধং বক্তুং চোদয়তি—যদ্যস্যেতি। পরঃ সন্নুপাধিবুদ্ধ্যাদিঃ। অসঙ্গত্বতঃ স্বতো বুদ্ধ্যাদিসম্বন্ধাসম্ভবমুপেত্যাহ —যন্নিমিত্তং চেতি। সিদ্ধান্তাভিপ্রায়মনূদ্য পূর্ববাদী বিকল্পয়তি—তস্যা ইতি। আগন্তুকত্ব- মস্বাভাবিকত্বম্। আদ্যে মোক্ষানুপপত্তিং বিবক্ষিত্বাহ—যদি চেতি। অন্ত তর্হি দ্বিতীয়ঃ, মোক্ষোপপত্তেরিত্যাশঙ্ক্যাহ—তস্যাশ্চেতি। মা ভূদবিদ্যাত্মস্বভাবস্তদ্ধর্ম্মস্ত স্যাদ্ধর্ম্মান্তরাভাবাদি- ত্যাহ—কথং বেতি। তত্রোত্তরস্থেনোত্তরগ্রন্থমুখাপয়তি—সর্ব্বানর্থেতি।

আভাসভাষ্যানুবাদ।—এই পুরুষের যদি এইরূপই স্বভাব হয় যে, কোন প্রকার সংসারধর্ম্মের সহিত তাহার সম্বন্ধ নাই, এবং তাহার যে, সংসারধর্ম্মের সহিত সম্বন্ধ, অপরাপর উপাধি-সম্বন্ধই তাঁহার কারণ হয়। যাহার দরুণ তাহার পরোপাধিকৃত সংসারধর্ম্ম উপস্থিত হয়, সেই মূল কারণটি হইতেছে অবিদ্যা। এখন জিজ্ঞাস্য এই যে, সেই অবিদ্যা কি ইহার স্বাভাবিক ধর্ম? অথবা কাম-কর্ম প্রভৃতির ন্যায় আগন্তুক?(অস্বাভাবিক?)। যদি আগন্তুক হয়, তাহা হইলেই পুরুষের বিমুক্তি সম্ভবপর হয়; কিন্তু সেই অবিদ্যা যে আগন্তুক, তাহার যুক্তি কি? পক্ষান্তরে উহা আত্মার স্বাভাবিক ধর্মই বা না হয় কেন? এই আশঙ্কায় সর্ব্বপ্রকার অনর্থের বীজভূতা অবিদ্যার যথার্থ স্বরূপ নিরূপণার্থ পরবর্তী শ্রুতি আরব্ধ হইতেছে।—

তা বা অস্যৈতা হিতা নাম নাড্যো যথা কেশঃ সহস্রধা ভিন্নস্তাবতাণিন্না তিষ্ঠন্তি; শুক্লস্য নীলস্য পিঙ্গলস্য হরিতস্য লোহিতস্য পূর্ণাঃ। অথ যত্রেনং ঘ্নন্তীব জিনন্তীব হস্তীব বিচ্ছায়য়তি গর্ত্তমিব পততি। যদেব জাগ্রদ্ভয়ং পশ্যতি, তদত্রাবিদ্যয়া মন্যতেহথ যত্র দেব ইব রাজেবাহমেবেদং সর্ব্বোহস্মীতি মন্যতে, সোহস্য পরমো লোকঃ ॥ ২৭২ ॥ ২০

সরমার্থঃ।—অন্য(হস্তমস্তকাদিসম্পন্নপুরুষস্য) তাঃ(লোকপ্রসিদ্ধাঃ) এতাঃ হিতাঃ নাম(হিতা-নাম্না প্রসিদ্ধাঃ) নাড্যঃ—কেশঃ সহস্রধা(সহস্রভাগেন ভিন্নঃ সন্) যথা(যাবৎপরিমাণঃ—অতি সূক্ষ্মঃ ভবতি),[তথা] শুক্লস্য, নীলস্য, পিঙ্গলস্য, হরিতস্য, লোহিতস্য পূর্ণাঃ(তত্তদ্বর্ণ-রসসমন্বিতাঃ) তিষ্ঠন্তি(বর্তন্তে)। [স্বপ্নসময়ে চ বাসনাবিশিষ্টং সূক্ষ্মম্ শরীরং তত্র বর্ত্ততে]।(অথ এবঞ্চ সতি) যত্র(স্বপ্নসময়ে) এনং(স্বপ্নদর্শিনৎ) ঘ্নন্তি ইব, জিনন্তি ইব(বশীকুর্ব্বন্তি ইব)

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৭

[শত্রবঃ],[তথা] হস্তী বিচ্ছায়য়তি বিদ্রাবয়তি ইব,[স্বয়ং চ] গর্ত্তং(জীর্ণকুপাদিকং) পততি ইব[ইতি মন্যতে। কিং বহুনা,] যৎ এব জাগ্রদ্ভয়ং(জাগরিতাবস্থায়াং যদেব ভয়ানকং কিঞ্চিৎ) পশ্যতি, অত্র অবিদ্যয়া তৎ[প্রত্যক্ষমিব] মন্যতে,—অথ যত্র দেব ইব, রাজা ইব, অহম্ এব ইদং(চৈতন্যং),[তস্মাৎ] সর্ব্বঃ(সর্ব্বাত্মকঃ) অস্মি ইতি মন্যতে, সঃ(সর্ব্বাত্মভাবঃ) অন্য(আত্মনঃ) পরমঃ(প্রকৃতঃ) লোকঃ (দর্শনম্) ॥২৭২৷৷২০৷৷

মূলানুবাক।—এই পুরুষের হিতা নামে প্রসিদ্ধ এই সমস্ত নাড়ী আছে। একটি কেশকে সহস্রভাগে বিভক্ত করিলে যেরূপ সূক্ষ্ম হয়, উহাদের পরিমাণও সেইরূপই সূক্ষ্ম; উহারা শুক্ল, পীত, নীল, পিঙ্গল ও হরিতবর্ণবিশিষ্ট রসযুক্ত। এইরূপে যে অবস্থায়(স্বপ্নাবস্থায়) [ শত্রুগণ] ইহাকে যেন হতই করিতেছে, যেন বশীভূতই করিতেছে, হস্তীই যেন তাড়া করিতেছে; অথবা নিজে যেন গর্তে পড়িতেছে। ফল কথা, জাগ্রৎসময়ে যে সমুদয় ভয়ঙ্কর রূপ দর্শন করে, অজ্ঞানজনিত ভ্রান্তি বশতঃ তখন সে সমুদয়কে বর্তমান বলিয়াই যেন অভিমান করিয়া থাকে। এইরূপ, যে সময়ে, আমি যেন দেবতা, যেন রাজা, অধিক কি, চিন্ময় আমিই সর্বাত্মক, এইরূপ মনে করে;(বুঝিতে হইবে,) তাহাই(সেই সর্বাত্মভাবই) এই স্বপ্নদর্শী আত্মার যথার্থ স্বরূপ ॥ ২৭২ ॥ ২০ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তাঃ বৈ, অন্য শিরঃপাণ্যাদিলক্ষণস্য পুরুষস্য এতাঃ হিতা নাম নাড্যঃ, যথা কেশঃ সহস্রধা ভিন্নঃ, তাবতা তাবৎপরিমাণেনাণিয়া অণু- ত্বেন তিষ্ঠন্তি; তাশ্চ শুক্লস্য রসস্য নীলস্য পিঙ্গলস্য হরিতস্য লোহিতস্য পূর্ণাঃ, এতৈঃ শুক্লত্বাদিভী রসবিশেষৈঃ পূর্ণা ইত্যর্থঃ। এতে চ রসানাং বর্ণবিশেষাঃ বাত- পিত্তশ্লেষ্মণামিতরেতরসংযোগ-বৈষম্যবিশেষাদ্বিচিত্রা বহবশ্চ ভবন্তি। ১

টাকা। তাসাং পরমসূক্ষ্মত্বং দৃষ্টান্তেন দর্শয়তি—যথেতি। কথমন্নরসস্য বর্ণবিশেষপ্রাপ্তি- রিত্যাশঙ্ক্যাহ—বাতেতি। ভুক্তস্যান্নস্য পরিণামবিশেষো বাতবাহুল্যে নীলো ভবতি, পিত্তাধিক্যে পিঙ্গলো জায়তে, শ্লেষ্মাতিশয়ে শুক্লো ভবতি, পিত্তাল্পত্বে হরিতঃ, সাম্যে চ ধাতুনাং লোহিতঃ, ইতি তেষাং মিথঃ সংযোগবৈষম্যাৎ তৎসাম্যাচ্চ বিচিত্রা বহবশ্চান্নরসা ভবন্তি, তদব্যাপ্তানাং নাড়ীনামপি তাদৃশো বর্ণো জায়তে।

“অরুণাঃ শিরা বাতবহা নীলাঃ পিত্তবহাঃ শিরাঃ। অসৃগবহাস্ত রোহিণ্যো গৌর্য্যঃ শ্লেষ্মবহাঃ শিরাঃ।” ইতি সৌশ্রুতে দর্শনাদিত্যর্থঃ। ১

১১১৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তাসু এবংবিধাসু নাড়ীষু বালাগ্রসহস্রভেদপরিমাণাসু শুক্লাদিরসপূর্ণাসু সকল দেহব্যাপিনীষু সপ্তদশকং লিঙ্গৎ বর্ততে; তদাশ্রিতাঃ সর্ব্বা বাসনা উচ্চাবচসংসার ধর্মানুভবজনিতাঃ; তৎ লিঙ্গৎ বাসনাশ্রয়ৎ সূক্ষ্মত্বাৎ স্বচ্ছং স্ফটিকমণিকল্পং নাড়ী- গতরসোপাধি-সংসর্গবশাৎ ধর্মাধৰ্ম্ম-প্রেরিতোভূতবৃত্তিশেষং স্ত্রীরথ-হস্ত্যাদাকার- বিশেষৈঃ বাসনাদিভিঃ প্রত্যবভাসতে। অথৈবং সতি, যত্র যস্মিন্ কালে কেচন শত্রবঃ অন্যে বা তস্করা মামাগত্য ঘ্নস্তীতি মৃধৈব বাসনানিমিত্তঃ প্রত্যয়োহ- বিদ্যাখ্যো জায়তে, তদেতদুচ্যতে-এনং স্বপ্নদৃশং ঘ্নন্তীবেতি। তথা জিনন্তীব বশং কুর্ব্বন্তীব; ন কেচন ঘ্নন্তি, নাপি বশীকুর্ব্বন্তি, কেবলং তু অবিদ্যাবাসনোদ্ভব- নিমিত্তং ভ্রান্তিমাত্রম্; তথা হস্তীবৈনং বিচ্ছায়য়তি বিচ্ছাদয়তি বিদ্রাবয়তি ধাবয়- তীবেত্যর্থঃ; গর্তমিব পততি-গর্তং জীর্ণকুপাদিকমিব পতন্তমাত্মানমুপলক্ষয়তি; তাদৃশী হ্যস্য মৃষা বাসনা উদ্ভবতি অত্যন্তনিকৃষ্টা অধর্মোদ্ভাসিতান্তঃ-করণবৃত্ত্যাশ্রয়া, দুঃখরূপত্বাৎ। কিং বহুনা, যদেব জাগ্রৎ ভয়ৎ পশ্যতি-হস্ত্যাদিলক্ষণম্, তদেব ভয়রূপম্ অত্রাস্মিন্ স্বপ্নে বিনৈব হস্ত্যাদিরূপং ভয়ম্ অবিদ্যাবাসনয়া মৃষৈবোভূতয়া মন্যতে। ২

নাড়ীস্বরূপং নিরূপ্য তত্র জাগরিতে লিঙ্গশরীরবৃত্তিমন্য দর্শয়তি-তাস্থিতি। এবংবিধা- স্বিত্যস্যৈব বিবরণং সূক্ষ্মান্বিত্যাদি। পঞ্চ ভূতানি দশেন্দ্রিয়াণি প্রাণোহন্তঃকরণমিতি সপ্তদশকম্। জাগরিতে লিঙ্গশরীরস্থ্য স্থিতিমুক্তা স্বাপ্নীং তৎস্থিতিমাহ-তল্লিঙ্গমিতি। বিবক্ষিতাং স্বপ্ন- স্থিতিমুক্তা শ্রুত্যক্ষরাণি যোজয়তি-অথেত্যাদিনা। স্বপ্নে ধর্মাদিনিমিত্তবশান্ মিথ্যৈব লিঙ্গং নানাকারমবভাসতে, তৎ মিথ্যাজ্ঞানং লিঙ্গানুগতমূলাবিদ্যাকাৰ্য্যত্বাৎ অবিদ্যেতি স্থিতে সতীত্যথশব্দার্থমাহ-এবং সতীতি। তস্মিন্ কালে স্বপ্নদর্শনং বিজ্ঞেয়মিতি শেষঃ। ইব- শব্দার্থমাহ-নেত্যাদিনা। উক্তোদাহরণেন সমুচ্চিত্যোদাহরণান্তরমাহ-তথেতি। গর্তাদি- পতনপ্রতীতৌ হেতুমাহ-তাদৃশী হীতি। তাদৃশত্বং বিশদয়তি-অত্যন্তেতি। যথোক্তবাসনা- প্রভবত্বং কথং গর্তপতনাদেরবগতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-দুঃখেতি। ২

অথ পুনর্যত্রাবিদ্যা অপকৃষ্যমাণা, বিদ্যা চোৎকৃষ্যমাণা-কিংবিষয়া কিংলক্ষণা চেত্যুচ্যতে-অথ পুনর্যত্র যস্মিন্ কালে দেব ইব স্বয়ং ভবতি, দেবতাবিষয়া বিদ্যা যদোভূতা জাগরিতকালে, তদা উদ্ভূতয়া বাসনয়া দেবমিবাত্মানৎ মন্যতে, স্বপ্নে- হপি তদুচ্যতে-দেব ইব, রাজেব রাজ্যস্থোহভিষিক্তঃ, স্বপ্নেহপি রাজাহমিতি মন্যতে রাজবাসনাবাসিতঃ। এবমত্যন্তপ্রক্ষীয়মাণা অবিদ্যা, উদ্ভূতা চ বিদ্যা সর্ব্বাত্মবিষয়া যদা, তদা স্বপ্নেহপি তদ্ভাবভাবিতঃ অহমেবেদং সর্ব্বমম্মীতি মন্যতে। স যঃ সর্ব্বাত্মভাবঃ, সোহস্যাত্মনঃ পরমো লোকঃ পরম আত্মভাবঃ স্বাভাবিকঃ। বত্ত্ব সর্ব্বাত্মভাবাদর্ব্বাক্ বালাগ্রমাত্রমপ্যন্যত্বেন দৃশ্যতে-নাহমম্মীতি, তদবস্থা

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১১১৯

অবিদ্যা; তয়া অবিদ্যয়া যে প্রত্যুপস্থাপিতা অনাত্মভাবা লোকাঃ, তে অপরমাঃ স্থাবরাস্তাঃ; তান্ সংব্যবহারবিষয়ান্ লোকান্ অপেক্ষ্য অয়ং সর্ব্বাত্মভাবঃ সমস্তো- হনন্তরোহবাহ্যঃ, সোহস্য পরমো লোকঃ। ৩

যদেবেত্যাদিশ্রুতেরর্থমাহ-কিং বহনেতি। ভয়মিত্যস্ত ভয়রূপমিতি ব্যাখ্যানম্। ভয়ং রূপাতে যেন তৎকারণং তথা। হস্ত্যাদি নাস্তি চেৎ, কথং স্বপ্নে ভাতীত্যাশঙ্ক্যাহ-অবিদ্যেতি। অথ যত্র দেব ইবেত্যাদেস্তাৎপর্য্যমাহ-অখেতি। তত্র তস্যাঃ ফলমুচ্যুত ইতি শেষঃ। তাৎপৰ্য্যোত্ত্যা অথ শব্দার্থমুক্ত। বিদ্যায়া বিষয়স্বরূপে প্রশ্নপূর্ব্বকং বদন্ যত্রেত্যাদেরর্থমাহ-কিং- বিষয়েতি। ইবশব্দপ্রয়োগাৎ স্বপ্ন এবোক্ত ইতি শঙ্কাং বারয়তি-দেবতেতি। বিদ্যেত্যু- পান্তিরুক্তা। অভিষিক্তো রাজ্যস্থো জাগ্রদবস্থায়ামিতি শেষঃ। অহমেবেদমিত্যাদ্যবতারয়তি- এবমিতি। যথা বিদ্যায়ামপকৃষ্যমাণায়াং কার্য্যমুক্তং, তদ্বদিত্যর্থঃ। যদেতি জাগরিতোক্তিঃ। ইদং চৈতন্যমহমেব চিন্মাত্রং, ন তু মদতিরেকেশান্তি, তস্মাদহং সর্ব্বঃ পূর্ণোহম্মীতি জানাতীত্যর্থঃ। সর্ব্বাত্মভাবস্য পরমত্বমুপপাদয়তি-যতত্ত্বিত্যাদিনা। তত্র তেনাকারেণাবিদ্যাবস্থিতেত্যাহ- তদবস্থেতি। তস্যাঃ কার্য্যমাহ-তথেতি। সমস্তত্বং পূর্ণত্বম্। অনন্তরত্বমেকরসত্বম্। অবাহ্যত্বম্ প্রত্যক্তুম্। যোহরং যথোক্তো লোকঃ, সোহস্যাত্মনো লোকান্ পূর্ব্বোক্তানপেক্ষ্য পরম ইতি সম্বন্ধঃ। ৩

তস্মাদপকৃষ্যমাণায়ামবিদ্যায়াং বিদ্যায়াঞ্চ কাষ্ঠাৎ গতায়াৎ সর্ব্বাত্মভাবো মোক্ষঃ; যথা স্বয়ংজ্যোতিষ্টং স্বপ্নে প্রত্যক্ষত উপলভ্যতে, তদ্বৎ বিদ্যাফলম্ উপলব্ধ্যত- ইত্যর্থঃ। তথা অবিদ্যায়ামপ্যুৎকৃষ্যমাণায়াং তিরোধীয়মানায়াঞ্চ বিদ্যায়ামবিদ্যায়াঃ ফলং প্রত্যক্ষত এব উপলব্ধ্যতে-“অথ যত্রৈনং ঘন্তীব জিনস্তীব” ইতি। তে এতে বিদ্যাবিদ্যাকার্য্যে-সর্ব্বাত্মভাবঃ পরিচ্ছিন্নাত্মভাবশ্চ; বিদ্যয়া শুদ্ধয়া সর্ব্বাত্মা ভবতি, অবিদ্যয়া চাসর্ব্বো ভবতি, অন্যতঃ কুতশ্চিৎ প্রবিভক্তো ভবতি, যতঃ প্রবিভক্তো ভবতি, তেন বিরুধ্যতে; বিরুদ্ধত্বাৎ হন্যতে জীয়তে বিচ্ছাদ্যতে চ; অসর্ব্ববিষয়ত্বে চ ভিন্নত্বাদেতদ্ ভবতি, সমস্তস্ত সন্ কুতো ভিদ্যতে, যেন বিরুধ্যেত; বিরোধাভাবাৎ কেন হন্যতে, জীয়তে, বিচ্ছাদ্যতে চ। ৪

বাক্যার্থমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। মোক্ষো বিদ্যাফলমিত্যুত্তরত্র সম্বন্ধঃ। তস্য প্রত্যক্ষত্বং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি-যথেতি। বিদ্যাফলবদবিদ্যাফলমপি স্বপ্নে প্রত্যক্ষমিত্যুক্তমনুবদতি- তথেতি। বিদ্যাফলমবিদ্যাফলং চেত্যুক্তমুপসংহরতি-তে এতে ইতি। উক্তং ফলদ্বয়ং বিভজতে-বিদ্যয়েতি। অসর্ব্বো ভবতীত্যেতৎ প্রকটয়তি-অন্যত ইতি। প্রবিভাগফল- মাহ-যত ইতি। বিরোধফলং কথয়তি-বিরুদ্ধত্বাদিতি। অবিদ্যাকার্য্যং নিগময়তি- অসর্ব্বেতি। অবিদ্যায়াশ্চেৎ পরিচ্ছিন্নফলত্বং, তদা তন্য ভিন্নত্বাদেব যথোক্তং বিরোধাদি দুর্ব্বারমিত্যর্থঃ। বিদ্যাফলং নিগময়তি-সমস্তস্থিতি। ৪

অথ ইক্ষ্বাকুনিবংশঃ। গদাধরঃ। তদ্বি-গদাধরঃ। গদাধরঃ। গদাধরঃ। গদাধরঃ। গদাধরঃ।

১১২০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

আত্মনোহন্যদ্বস্তন্তরমবিদ্যমানৎ প্রত্যুপস্থাপয়তি, আত্মানমসর্ব্বমাপাদয়তি; তত- স্তদ্বিষয়ঃ কামো ভবতি; যতো ভিদ্যতে কামতঃ, ক্রিয়ামুপাদত্তে, ততঃ ফলম্— তদেতদুক্তম্, বক্ষ্যমাণৎ চ “যত্র হি দ্বৈতমিব ভবতি, তদিতর ইতরং পশ্যতি” ইত্যাদি। ইদমবিদ্যায়াঃ সতত্ত্বং সহ কার্য্যেণ প্রদর্শিতম্; বিদ্যায়াশ্চ কার্য্যং সর্ব্বাত্মভাবঃ প্রদর্শিতঃ—অবিদ্যায়া বিপর্যয়েণ। সা চাবিদ্যা ন আত্মনঃ স্বাভাবিকো ধর্ম্মঃ—যস্মাৎ বিদ্যায়াম্ উৎকৃষ্যমাণায়াম্ স্বয়মপচীয়- মানা সতী কাষ্ঠাৎ গতায়াং বিদ্যায়াৎ পরিনিষ্ঠিতে সর্ব্বাত্মভাবে সর্ব্বাত্মনা নিবর্ত্ততে—রজ্জামিব সর্পজ্ঞানং রজ্জুনিশ্চয়ে। তচ্চোক্তম্—“যত্র ত্বস্য সর্ব্বমাত্মৈ- বাভূত্তৎ কেন কং পশ্যেৎ” ইত্যাদি। তস্মান্নাত্মধর্ম্মোহবিদ্যা; নহি স্বাভাবিক- স্যোচ্ছিত্তিঃ কদাচিদপ্যুপপদ্যতে সবিতুরিবৌষ্ণ্যপ্রকাশয়োঃ। তস্মাত্তস্য মোক্ষ- উপপদ্যতে ॥২৭২৷৷২০৷৷

নম্ববিদ্যায়াঃ সতত্ত্বং নিরূপয়িতুমারব্ধং, নচ তদদাপি দর্শিতং, তথা চ কিং কৃতং স্যাদত আহ-অত ইতি। কার্য্যবশাদিতি যাবৎ। ইদংশব্দার্থমেব স্ফুটয়তি-সর্ব্বাত্মানমিতি। গ্রাহকত্বমেব ব্যনক্তি-আত্মন ইতি। বস্তুস্তরোপস্থিতিফলমাহ-তত ইতি। কামস্য কাৰ্য্য- মাহ-যত ইতি। ক্রিয়াতঃ ফলং লভতে, তদ্ভোগকালে চ রাগাদিনা ক্রিয়ামাদধাতীত্যবিচ্ছিন্নঃ সংসারস্তদ্যাবন্ন সম্যগ, জ্ঞানং, তাবৎ মিথ্যাজ্ঞাননিদানমবিদ্যা দুর্বারেত্যাহ-তত ইতি। ভেদদর্শননিদানমবিদ্যেত্যবিদ্যাসূত্রে বৃত্তমিত্যাহ-তদেতদিতি। তত্রৈব বাক্যশেষমনুকুলয়তি- বক্ষ্যমাণং চেতি। অবিদ্যাত্মনঃ স্বভাবো ন বেতি বিচারে কিং নির্ণীতং ভবতীত্যাশঙ্ক্য বৃত্তং কীর্তয়তি-ইদমিতি। অবিদ্যায়াঃ পরিচ্ছিন্নফলত্বমস্তি, ততো বৈপরীত্যেন বিদ্যায়াঃ কায্যমুক্তং, সচ সর্ব্বাত্মভাবো দর্শিত ইতি ইতি যোজনা। সম্প্রতি নির্ণীতমর্থং দর্শয়তি-সা চেতি। জ্ঞানে সত্যবিদ্যানিবৃত্তিরিত্যত্র বাক্যশেষং প্রমাণয়তি-তচ্চেতি। অবিদ্যা নাত্মনঃ স্বভাবো নিবর্ত্যত্বাদ্ রজ্জুসর্পবদিত্যাহ-তস্মাদিতি। নিবর্ত্যত্বেহপ্যাত্মস্বভাবত্বে কা হানিরিত্যাশঙ্ক্যাহ- নহীতি। অবিদ্যায়াঃ স্বাভাবিকত্বাভাবে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি ॥২৭২॥২০৷৷

ভাষ্যানুবাদ।—‘তা বৈ’ ইত্যাদি। হস্তমস্তকাদিসম্পন্ন এই পুরুষের ‘হিতা’ নামে প্রসিদ্ধ এই সমস্ত নাড়ী আছে। সহস্রভাগে বিভক্ত কেশ যে পরিমাণ সূক্ষ্ম, উহারাও ঠিক সেই পরিমাণেই অণু বা সূক্ষ্ম; সেগুলি আবার শুক্ল, নীল, পিঙ্গল, হরিত ও লোহিতবর্ণ রসে পরিপূর্ণ অর্থাৎ শুক্লাদি বিশেষ বিশেষ রসে পরিপূর্ণ। রসগত এই সমস্ত বিভাগও আবার বাত, পিত্ত ও শ্লেষ্মার পরস্পর সংযোগবৈচিত্র্যনিবন্ধন বিচিত্র ও বহুপ্রকার হইয়া থাকে। ১

এবংবিধ—কেশাগ্রের সহস্রভাগের সমপরিমাণ সূক্ষ্ম ও শুক্লাদি রসপূর্ণ দেহ- ব্যাপী উক্ত নাড়ীসমূহের অভ্যন্তরে সপ্তদশ অবয়বসম্পন্ন লিঙ্গশরীর অবস্থান

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১১

করে(১); উত্তমাধম সংসারধর্ম্মের অনুভূতি-প্রসূত যতপ্রকার বাসনা বা সংস্কার আছে, সে সমুদয় বাসনা উক্ত লিঙ্গশরীর আশ্রয় করিয়া থাকে। বাসনারাশির আশ্রয়ভূত উক্ত লিঙ্গশরীরও আবার সূক্ষ্মতা নিবন্ধন স্ফটিক মণির ন্যায় নির্মূল; কিন্তু আশ্রয়ভূত নাড়ী-নিহিত রসরূপ উপাধির সম্বন্ধবশতঃ ধর্ম ও অধর্মের প্রেরণায় তাহাতে বিভিন্নাকার বৃত্তি প্রকাশ পাইয়া থাকে; তন্নিবন্ধন সেই লিঙ্গ- শরীরই স্ত্রী, রথ, হস্তী প্রভৃতি নানাপ্রকার বাসনাযোগে প্রতিভাত হইয়া থাকে। এইপ্রকার অবস্থায়, যে সময় কোন শত্রুদল কিংবা তস্করগণ আসিয়া আমাকে মারিতেছে-পূর্ব্বসংস্কারানুসারে কেবল অবিদ্যাত্মক এইরূপ যে, মিথ্যা প্রতীতি হইয়া থাকে, এখন তাহাই কথিত হইতেছে-এই স্বপ্নদর্শীকে যেন বধই করিতেছে, এবং বশীভূতই করিতেছে; প্রকৃতপক্ষে কিন্তু কেহই বধ করিতেছে না, কিংবা বশীভূতও করিতেছে না; পরন্তু অবিদ্যা সংস্কার অভিব্যক্ত হওয়ায় ঐরূপ ভ্রান্তি জন্মে মাত্র। এইরূপ, হস্তাই যেন ইহাকে বিদ্রাবিত করিতেছে; এবং আপনাকে যেন গর্ভে-জীর্ণ কূপ প্রভৃতিতে পতনোন্মুখ বলিয়া মনে করিতেছে; কেন না, সে সময়ে তাহার অত্যন্ত নিকৃষ্ট ঐরূপ মিথ্যা বাসনাই প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে; ঐরূপ বাসনা অতিশয় দুঃখকর; ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, ঐ সমস্ত বাসনার আশ্রয়- ভূত অন্তঃকরণ তখন অধৰ্ম্ম দ্বারা অভিভূত থাকে। অধিক কি, জাগরণ দশার হস্তিপ্রভৃতি যে কিছু ভয়ানক বস্তু দর্শন করিয়া থাকে, এই স্বপ্নসময়ে সেই সমুদয় ভয়ানক প্রাণী বিদ্যমান না থাকিলেও, প্রাদুর্ভূত অবিদ্যা বাসনাবলে কেবলই মিথ্যাত্মক সেই সমুদয় ভরাবহ প্রাণীর দর্শন করিতে থাকে। ২

আবার যে সময়ে অবিদ্যা দুর্ব্বল হয়, আর বিদ্যা বা তত্ত্বজ্ঞান প্রবল হয়,— সেই বিদ্যার বিষয় ও স্বরূপ কিরূপ, তাহা বলিতেছেন—যে সময়ে, নিজে যেন দেবতাই হয়,[অভিপ্রায় এই যে,] জাগ্রদবস্থায় যখন দেবতাবিষয়ক বিদ্যা উদ্ভূত হয়, তখন সেই প্রাদুর্ভূত বাসনা প্রভাবে স্বপ্নেও আপনাকে যেন দেবতা বলিয়াই মনে করে; সেই কথাই বলা হইতেছে,—যেন দেবতাই; যেন রাজাই, রাজা

(১) তাৎপয্য—লিঙ্গশরীরের সপ্তদশ অবয়ব এইরূপ— “পঞ্চপ্রাণমনোবুদ্ধিদশেন্দ্রিয়সমন্বিতম্। শরীরং সপ্তদশভিঃ সূক্ষ্মং তৎ লিঙ্গমুচ্যতে।”(পঞ্চদশী)

অর্থাৎ প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমান, এই পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি, এই সপ্তদশ অবয়বে নির্মিত ‘সূক্ষ্ম শরীরের’ নাম লিঙ্গশরীর। স্থূল দেহের অভ্যন্তরে এই সূক্ষ্ম শরীর থাকে; ইহাই আত্মার আশ্রয় ও ভোগসাধন।

33

১২২২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অর্থ রাজ্যে স্থিত অর্থাৎ রাজ্যে অভিষিক্ত; জাগ্রদবস্থায় রাজ-ভাবে ভাবিত থাকায় স্বপ্নেও সে ‘আমি রাজা’ এইরূপ মনে করিয়া থাকে। এইরূপ যে সময় অবিদ্যা অত্যন্ত ক্ষীয়মাণ হয়, আর সর্ব্বাত্মবিষয়ক বিদ্যা প্রাদুর্ভূত হয়, সে সময় তদগত-চিত্ত থাকায় স্বপ্নদর্শী মনে করে যে, ‘আমিই সর্বাত্মক’। সেই যে, সর্ব্বাত্মভাব, তাহাই আত্মার পরম লোক অর্থাৎ স্বাভাবিক আত্মভাব; এই সর্ব্বাত্মভাব লাভের পূর্ব্বে যে, অতি স্বল্পমাত্রও ভেদদর্শন-‘আমি ব্রহ্ম নহে’ ইত্যাকার জ্ঞান, সেই অবস্থাই অবিদ্যা; সেই অবিদ্যার প্রভাবে যে সমস্ত অনাত্ম- ভাবময় লোক উপস্থাপিত হয়, ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্য্যন্ত সে সমুদয় লোকই(দৃশ্যই) অ-পরম বা অস্বাভাবিক। লোকব্যবহারসিদ্ধ সে সমুদয় লোককে অপেক্ষা করিয়া এই যথোক্ত সর্ব্বাত্মভাবই পূর্ণ ও বাহ্যান্তরভাবরহিত, এবং তাহাই আত্মার পরম স্বভাবসিদ্ধ লোক(অবস্থা)। ৩

অতএব অবিদ্যা যে সময় হীনবল হয়, এবং বিদ্যা উৎকর্ষ প্রাপ্ত হয়, সে সময় বিদ্যাফল—সর্ব্বাত্মভাবরূপ মোক্ষ নিশ্চয়ই তাহার, স্বপ্নদশায় স্বয়ংজ্যোতির্ভাব প্রত্যক্ষের ন্যায় প্রত্যক্ষতঃ উপলব্ধিগোচর হইতে থাকে, আর বিদ্যা অন্তর্হিত হইতে থাকে, সে সময় অবিদ্যার ফলও প্রত্যক্ষতই উপলব্ধিগোচর হইতে থাকে; যেমন— ‘ইহাকে যেন বধই করিতেছে, যেন ইহাকে বশীভূতই করিতেছে’ ইত্যাদি। এই সর্ব্বাত্মভাব আর পরিচ্ছিন্নাত্মভাব, এ দুইটী হইতেছে—বিদ্যা ও অবিদ্যার দুই প্রকার কার্য্য; তন্মধ্যে বিশুদ্ধ বিদ্যা-প্রভাবে হয়—সর্ব্বাত্মা, আর অবিদ্যা- প্রভাবে হয়—অসর্ব্বাত্মা অর্থাৎ অপর যে কোন পদার্থ হইতেই পৃথগ্‌ভূত হয়। যে পদার্থ হইতে বিভক্ত বা পৃথগ্‌ভূত হয়, তাহার সহিত বিরুদ্ধভাবাপন্ন হয়; বিরুদ্ধ বলিয়াই অপরের দ্বারা হত হয়, বশীকৃত হয় এবং বিদ্রাবিত হয়। যে সময় অসর্ব্বভাব হয়, সে সময়ে ভিন্নত্ব নিবন্ধনই ঐ সমস্ত ঘটিয়া থাকে; কিন্তু যখন সর্ব্বাত্মভাবাপন্ন হয়, তখন কোন পদার্থ হইতেই ভিন্নত্ব থাকে না, যাহার সহিত তাহার বিরোধ ঘটিতে পারে; বিরোধ না থাকিলে কে বধ করিবে, কে বশীভূত করিবে, কে-ই বা বিদ্রাবিত করিবে?

ইহা হইতে অবিদ্যার প্রকৃত তত্ত্ব এইরূপ বলা হইতেছে যে, অবিদ্যা সর্ব্বাত্মক আত্মাকেও অসর্ব্বাত্মকরূপে বুঝাইয়া দেয়, আত্মাতিরিক্ত কোন বস্তু বিদ্যমান না থাকিলেও সম্মুখে উপস্থাপিত করে, এবং আত্মাকে অসর্ব্বভাবে ভাবিত করে; তাহার পর সেই বিষয়ে কামনা উপস্থিত করে; কামনাতে অপর পদার্থ হইতে আপনার ভিন্নতা উপলব্ধি করে; কামনার পর ক্রিয়া করিতে থাকে; ক্রিয়া

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৬৩

হইতে ফলভোগ হয়, ইহাই এখানে বলা হইল, এবং পরেও বলা হইবে—‘যখন দ্বৈতের ন্যায় হয়, তখনই অপরে অপরকে দর্শন করিয়া থাকে’ ইত্যাদি। অবিদ্যার এইপ্রকার প্রকৃত তত্ত্ব ও তাহার কার্য্য প্রদর্শিত হইল, এবং তাহারই বিপরীতভাবে বিদ্যার কার্য্য সর্ব্বাত্মভাবও বর্ণিত হইল। অবিদ্যা ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে এবং বিদ্যার চরমোৎকর্ষ সহযোগে সর্ব্বাত্মভাব সুব্যবস্থিত হইলে, রজ্জুসর্প স্থলে রজ্জুজ্ঞানে যেমন সর্প নিবৃত্ত হইয়া যায়, তেমনি অবিদ্যাও আপনা হইতেই নিবৃত্ত হইয়া থাকে;[কিন্তু অবিদ্যা আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম্ম হইলে, কখনই তাহা নিবৃত্ত হইত না]। এ কথা অন্যত্রও কথিত হইয়াছে—‘যে সময় ইহার(মুমুক্ষুর) সমস্ত জগৎ আত্মস্বরূপই হইয়া যায়, সে সময় কিসের দ্বারা কাহাকে দর্শন করিবে’ ইত্যাদি। অতএব অবিদ্যা কখনই আত্মার ধর্ম্ম হইতে পারে না; কেন না, বস্তুসত্ত্বে স্বভাবের কখনও উচ্ছেদ হইতে পারে না; যেমন সূর্য্যের উষ্ণতা ও প্রকাশ ধর্ম্ম সূর্য্যের সমকালস্থায়ী, ইহাও তেমনি; এই কারণেই সেই অবিদ্যা হইতে আত্মার মোক্ষ উপপন্ন হয় ॥২৭২৷৷২০৷৷

তদ্বা অস্যৈতদতিচ্ছন্দা অপহতপাপ্মাভয়রূপম্। তদ্যথা প্রিয়য়া স্ত্রিয়া সম্পরিষক্তো ন বাহ্যং কিঞ্চন বেদ নান্তরম্, এবমেবায়ং পুরুষঃ প্রাজ্ঞেনাত্মনা সম্পরিষক্তো ন বাহ্যং কিঞ্চন বেদ নান্তরম্। তদ্বা অস্যৈতদাপ্তকামমাত্মকামমকামরূপ শোকান্তরম্ ॥ ২৭৩ ॥ ২১ ॥

সরলার্থঃ।—[অতঃপরং সুষুপ্তাবাত্মনঃ ক্রিয়াকারকাদি-সম্বন্ধশূন্যং সর্ব্বাত্ম- ভাবং প্রদর্শয়িতুমুপক্রমতে ‘তদ্বৈ’ ইত্যদিনা।] অন্য(প্রকৃতস্য আত্মনঃ) তৎ (প্রসিদ্ধং) এতৎ(বক্ষ্যমাণং) অতিচ্ছন্দাঃ(অতিচ্ছন্দং কামাতীতং) অপহত- পাপ্ম, অভয়ং রূপম্।[কিং তৎ? ইত্যাহ—] তৎ(অভিমতং রূপং) যথা(যদ্বৎ) প্রিয়য়া(প্রীতিভাজা) স্ত্রিয়া সংপরিঘক্তঃ(আলিঙ্গিতঃ পুরুষঃ) বাহ্যং কিঞ্চন(কিমপি) ন বেদ(ন জানাতি), তথা আন্তরং(দেহান্তর্গতমপি কিঞ্চন) ন[বেদ]; এবম্ এব অয়ং পুরুষঃ(আত্মা) প্রাজ্ঞেন(পরমা- ত্মনা) সংপরিঘক্তঃ বাহ্যং কিঞ্চন ন বেদ, আন্তরং[চ ন বেদ]। অন্য (আত্মনঃ) তৎ এতৎ(যথোক্তপ্রকারং রূপম্) আপ্তকামং(স্বব্যতিরিক্তকাম্যা- ভাবাৎ পূর্ণকামমিত্যর্থঃ), আত্মকামং(আত্মনি এব—নত্বন্যত্র বস্তুনি কামঃ যস্মিন্ রূপে, তৎ তথা),[অত এব বস্তুতঃ] অকামং(কাম্যবিষয়াভা-

১১২৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বাৎ কামনাশূন্যং), শোকান্তরং(শোকচ্ছিদ্রং-শোকরহিতমিতি ভাবঃ) রূপম্ (স্বরূপম্) ॥২৭৩৷৷২১৷৷

মূলানুবাদ:-এই আত্মার ইহাই(সৌযুপ্ত রূপই) অতিচ্ছন্দা অর্থাৎ সর্বপ্রকার কামনাশূন্য, নিষ্পাপ এবং ভয়বিরহিত রূপ। প্রিয়তমা স্ত্রীর সহিত সর্বতোভাবে আলিঙ্গিত হইয়া, পুরুষ যেমন বাহ্য বা আভ্যন্তর কোন বিষয় জানিতে পারে না,[ তন্ময় হইয়া যায়], ঠিক সেইরূপই এই পুরুষও প্রাজ্ঞ পরমাত্মার সহিত সংমিলিত হইয়া বাহ্য বা আভ্যন্তর কোন বিষয় জানিতে পারে না। ইহাই এই পুরুষের সেই প্রসিদ্ধ আপ্তকাম(পূর্ণকাম), আত্মকাম অর্থাৎ আত্মাই তাহার একমাত্র কাম্য পদার্থ; সুতরাং বাহ্য ও আভ্যন্তর বিষয়বিষয়ে চিন্তা না থাকায়, ইহাই শোকরহিত রূপ ॥ ২৭৩॥ ২১॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—ইদানীং যোহসৌ সর্ব্বাত্মভাবো মোক্ষো বিদ্যাফলং ক্রিয়াকারকফলশূন্যম্, স প্রত্যক্ষতো নিদ্দিশ্যতে; যত্রাবিদ্যাকামকর্ম্মাণি ন সন্তি, তদেতৎ প্রস্তুতম্; যত্র সুপ্তো ন কঞ্চন কামং কাময়তে, ন কঞ্চন স্বপ্নং পশ্যতীতি। তদেতদ্বা অন্য রূপম্, যঃ সর্ব্বাত্মভাবঃ; সোহস্য পরমো লোক ইত্যুক্তঃ। তদতি- চ্ছন্দা অতিচ্ছন্দমিত্যর্থঃ, রূপপরত্বাৎ; ছন্দঃ কামঃ, অতিগতঃ ছন্দো যস্মাৎ রূপাৎ তদতিচ্ছন্দং রূপম্। অন্যোহসৌ সান্তঃ ছন্দঃশব্দঃ গায়্যাদিচ্ছন্দোবাচী; অয়ন্তু কামবচনঃ; অতঃ স্বরান্ত এব; তথাপি অতিচ্ছন্দা ইতি পাঠঃ স্বাধ্যায়ধর্ম্মো দ্রষ্টব্যঃ; অস্তি চ লোকে কামবচনপ্রযুক্তচ্ছন্দঃশব্দঃ—স্বচ্ছন্দঃ পরচ্ছন্দ ইত্যাদৌ, অতোহতিচ্ছন্দমিত্যেবমুপনেয়ং কামবর্জিতমেতদ্রূপমিত্যস্মিন্নর্থে। ১

টাকা। তদ্বা অস্যৈতদিত্যনন্তরবাক্যতাৎপর্য্যমাহ-ইদানীমিতি। বিদ্যাবিদ্যয়োস্তৎ- ফলয়োশ্চ প্রদর্শনানন্তরমিতি যাবৎ। মোক্ষমেব বিশিনষ্টি-যত্রেতি। পদদ্বয়স্যান্বয়ং দর্শয়ন্ বিবক্ষিতমর্থমাহ-তদেতদিতি। যত্রেত্যন্তশব্দিতং ব্রহ্মোচ্যতে। ব্যাখ্যাতং পদদ্বয়মনুষ্য বৈশব্দস্য প্রসিদ্ধার্থত্বং মন্থানো রূপশব্দেন ষষ্ঠ্যাঃ সম্বন্ধং দর্শয়তি-তদিতি। অতিচ্ছন্দমিতি প্রয়োগে হেতুমাহ-রূপপরত্বাদিতি। কথমতিচ্ছন্দমিত্যাত্মরূপং বিবক্ষ্যতে, তত্রাহ-ছন্দ ইতি। ছন্দঃশব্দস্য গায়এ্যাদিচ্ছন্দোবিষয়স্য কথং কামবিষয়ত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-অন্যোহসাবিতি। গায়এ্যাদিবিষয়ত্বং ত্যক্ত। ছন্দঃ(নন্দ)শব্দস্য কামবিষয়ত্বমতঃশব্দার্থঃ। যদ্যাত্মরূপং কামবর্জিত- মিত্যেতদত্র বিবক্ষিতং, কিমিতি তর্হি দৈর্ঘ্যং প্রযুজ্যতে, তত্রাহ-তথাপীতি। স্বাধ্যায়ধৰ্ম্মত্বং ছান্দসত্বম্। বৃদ্ধব্যবহারমন্তরেণ কামবাচিত্বং ছন্দঃ(নন্দ)শব্দস্য কথমিত্যাশঙ্ক্যাহ-অস্তি চেতি। তস্য কামবচনত্বে সতি সিদ্ধং তদ্রূপমনুদ্য তস্যার্থমুপসংহরতি-অত ইতি। ১

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩৫

তথা অপহতপাপ্মা, পাপমশব্দেন ধর্মাধর্মাবুচ্যেতে, “পাপমভিঃ সংসৃজ্যতে, পাপনো বিজহাতি ইত্যুক্তত্বাৎ; অপহতপাপা। ধর্মাধৰ্ম্মবর্জিতমিত্যেতৎ। কিঞ্চ, অভয়ং-ভয়ং হি নাম অবিদ্যাকার্য্যম্, “অবিদ্যয়া ভয়ং মন্যতে” ইতি হ্যক্তম্; তৎকার্য্যদ্বারেণ কারণপ্রতিষেধোহয়ম্, অভয়ং রূপমিতি অবিদ্যাবর্জিত- মিত্যেতৎ। যদেতদ্বিদ্যাফলং সর্বাত্মভাবঃ, তদেতদ্ অতিচ্ছন্দাপহতপাপমাভয়ং রূপং-সর্ব্বসংসারধৰ্ম্মবর্জিতম্; অতোহভয়ং রূপমেতৎ। ইদঞ্চ পূর্ব্বমেবোপন্যস্তম্ অতীতানন্তরব্রাহ্মণসমাপ্তৌ, “অভয়ং বৈ জনক প্রাপ্তোহসি” ইত্যাগমতঃ; ইহ তু তর্কতঃ প্রপঞ্চিতম্, দর্শিতাগমার্থপ্রত্যয়দার্চ্যায়। ২

তথা কামবর্জিতত্ববদিত্যেতৎ। নম্বত্রাধৰ্ম্মবর্জিতত্বমেব প্রতীয়তে, ন ধৰ্ম্মবর্জিতত্বং, পাপ্য- শব্দস্যাধৰ্ম্মমাত্রবচনত্বাদত আহ—পাপ্ম-শব্দেনেতি। উপক্রমানুসারেণ পাপ্যশব্দস্তোভয়- বিষয়ত্বে বিশেষণমনূদ্য বিবক্ষিতমর্থং কথয়তি—অপহতেতি। তর্হি কার্য্যমেবাবিদ্যায়া নিষিধ্যতে, নেত্যাহ—তৎকায্যেতি। তস্মাদর্থে তচ্ছব্দঃ। বাক্যার্থমুপসংহরতি—যদেতদিতি। কুর্চ্চব্রাহ্মণাতেইপীদং রূপমুক্তমিত্যাহ—ইদং চেতি। আগমবশাৎ তত্রোক্তং চেৎ, কিমিত্যত্র পুনরুচ্যতে, তত্রাহ—ইহ ত্বিতি। সবিশেষত্বং চেদাত্মত্বানুপপত্তিরিত্যাদিস্তর্কঃ। আগমসিদ্ধে কিং তর্কোপন্যাসেনেত্যাশঙ্ক্যাহ—দশিতেতি। ২

অয়মাত্মা স্বয়ং চৈতন্যজ্যোতিঃস্বভাবঃ সর্ব্বং স্বেন চৈতন্যজ্যোতিষাবভাসয়তি -স যৎ তত্র কিঞ্চিৎ পশ্যতি, রমতে, চরতি, জানাতি চেত্যুক্তম্; স্থিতঞ্চৈতৎ ন্যায়তঃ নিত্যং স্বরূপং চৈতন্যজ্যোতিষ্টমাত্মনঃ। স যদ্যাত্মা অত্রাবিনষ্টশ্চৈতন্য- স্বরূপঃ স্বেনৈব রূপেণ বর্ত্ততে; কস্মাদয়ম্ অহমস্মীত্যাত্মানং বা বহির্ব্বা ইমানি ভূতানীতি জাগ্রৎস্বপ্নয়োরিব ন জানাতীতি? অত্রোচ্যতে, শৃণু-অত্রাজ্ঞানহেতুম্; একত্বমেবাজ্ঞানহেতুঃ; তৎ কথামিতি উচ্যতে-দৃষ্টান্তেন হি প্রত্যক্ষীভবতি বিবক্ষিতোহর্থ ইত্যাহ-তৎ তত্র যথা লোকে, প্রিয়য়া ইষ্টয়া স্ত্রিয়া সম্পরিষক্তঃ সম্যক্ পরিঘক্তঃ, কাময়ন্ত্যা কামুকঃ সন্, ন বাহ্যমাত্মনঃ কিঞ্চন কিঞ্চিদপি বেদ- মত্তোহন্যদ্বস্থিতি, ন চ আন্তরম্-অয়মহমস্মি সুখী দুঃখী চেতি; অপরিঘক্তস্ত তয়া প্রবিভক্তো জানাতি সর্ব্বমেব বাহ্যমাভ্যন্তরঞ্চ; পরিঘঙ্গোত্তরকালং তু একত্বা- পত্তেন জানাতি। ৩

স্ত্রীবাক্যস্য সঙ্গতিং বক্তুং বৃত্তমনুবদতি-অয়মিতি। অনস্বাগতবাক্যে চাত্মনশ্চেতনত্বমুক্ত- মিত্যাহ-স যদিতি। আত্মনঃ সদা চৈতন্যজ্যোতিষ্টুং স্বরূপং ন কেবলমুক্তাদাগমাদেব সিদ্ধং, কিন্তু পূর্ব্বোক্তানুমানাচ্চ স্থিতমিত্যাহ-স্থিতং চেতি। বৃত্তমনুদ্য সম্বন্ধং বক্তুকামশ্চোদয়তি- স যদীতি। অত্রেতি সুষুপ্তিরুক্তা। চৈতন্যস্বভাবস্যৈব সুষুপ্তে বিশেষজ্ঞানাভাবং সাধয়তি- উচ্যত ইতি। সুষুপ্তিঃ সপ্তম্যর্থঃ। অজ্ঞানং বিশেষজ্ঞানাভাবঃ। কোহসাবজ্ঞানহেতুস্তমাহ-

১১৬২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

একত্বমিতি। জীবস্য পরেণাত্মনা যদেকত্বং, তৎ কথং সুষুপ্তে বিশেষজ্ঞানাভাবে কারণং, তস্মিন্ সত্যপি চৈতন্যস্বভাবানিবৃত্তেরিতি শঙ্কতে—তৎ কথমিতি। তত্র স্ত্রীবাক্যমুত্তরত্বেনোখাপয়তি— উচ্যত ইতি। তত্র দৃষ্টান্তভাগমাচষ্টে—দৃষ্টান্তেনেতি। একত্বকৃতো বিশেষজ্ঞানাভাবো বিবক্ষিতোহর্থঃ পরিঘঙ্গপ্রযুক্তসুখাভিনিবেশাদজ্ঞানং কিমিতি কল্প্যতে, স্বাভাবিকমেব তৎ কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—অপরিঘক্তস্থিতি। তর্হি পরিঘঙ্গবতোহপি স্বভাববিপরিলোপসম্ভবাদ্বিশেষ- বিজ্ঞানং স্যাদিতি চেন্নেত্যাহ—পরিঘঙ্গেতি। স্ত্রীপুংসলক্ষণয়োর্ব্যামিশ্রত্বং পরিঘঙ্গস্তদুত্তরকালং সম্ভোগফলপ্রাপ্তিরেকত্বাপত্তিস্তদ্বশাদ্বিশেষাজ্ঞানমিত্যর্থঃ। ৩

এবমেব—যথা দৃষ্টান্তঃ, অয়ং পুরুষঃ ক্ষেত্রজ্ঞঃ ভূতমাত্রাসংসর্গতঃ সৈন্ধবখিল্যবৎ প্রবিভক্তঃ, জলাদৌ চন্দ্রাদি-প্রতিবিম্ববৎ কার্য্যকরণ ইহ প্রবিষ্টঃ, সোহয়ৎ পুরুষঃ, প্রাজ্ঞেন পরমার্থেন স্বাভাবিকেন স্বেনাত্মনা পরেণ জ্যোতিষা সম্পরিষক্তঃ সম্যক্ পরিঘক্ত একীভূতঃ নিরন্তরঃ সর্ব্বাত্মা, ন বাহ্যং কিঞ্চন বস্তুন্তরম্, নাপি আন্তরম্ আত্মনি—অয়মহমস্মি সুখী দুঃখী বেতি বেদ। ৪

দাষ্টান্তিকং ব্যাকরোতি-এবমেবেতি। ভূতমাত্রাঃ শরীরেন্দ্রিয়লক্ষণাস্তাভিশ্চিদাত্মন- স্তাদাত্ম্যাধ্যাসাৎ তৎ প্রতিবিম্বো ভাগন্ততো বিভক্তবদ্ভাতীত্যত্র দৃষ্টান্তমাহ-সৈন্ধবেতি। তস্য দেহাদৌ প্রবেশং দৃষ্টান্তেন দর্শয়তি-জলাদাবিতি। উপসর্গবললব্ধমর্থং কথয়তি-একীভূত ইতি। তাদাত্ম্যং ব্যাবর্ত্তয়িতুং নিরন্তর ইত্যুক্তম্। পরমাত্মাভেদপ্রযুক্তমনবচ্ছিন্নত্বমাহ- সর্ব্বাত্মেতি। এবং স্ত্রীবাক্যাক্সরাণি ব্যাখ্যায় চোদ্যপরিহারং প্রকটয়তি-তত্রেতি। প্রত্যগাত্ম- নীতি যাবৎ। ইহেতি সুষুপ্তিরুচ্যতে। যথা পরিষক্তয়োঃ স্ত্রীপুংসয়োরেকত্বং পুংসো বিশেষ- বিজ্ঞানাভাবে কারণং, তথা পরেণাত্মনা সুষুপ্তে জীবস্যৈকত্বং বিশেষবিজ্ঞানাভাবে তস্য তত্র কারণমুক্তমিত্যর্থঃ। ৪

তত্র চৈতন্যজ্যোতিঃস্বভাবত্বে কস্মাদিহ ন জানাতীতি যদপ্রাক্ষীঃ, তত্রায়ৎ হেতু- ৰ্ম্ময়োক্তঃ—একত্বম্; যথা স্ত্রীপুংসয়োঃ সম্পরিঘক্তয়োঃ। তত্রার্থাৎ নানাত্বং বিশেষ- বিজ্ঞানহেতুরিত্যুক্তং ভবতি। নানাত্বে চ কারণম্—আত্মনো বস্তুন্তরস্য প্রত্যুপ- স্থাপিকা অবিদ্যেত্যুক্তম্। তত্র চ অবিদ্যায়া যদা প্রবিবিক্তো ভবতি, তদা সর্ব্বে- ণৈকত্বমেবাস্য ভবতি; ততশ্চ জ্ঞান-জ্ঞেয়াদিকারকবিভাগে অসতি কুতো বিশেষ- বিজ্ঞানপ্রাদুর্ভাবঃ কামো বা সম্ভবতি—স্বাভাবিকে স্বরূপস্থ আত্মজ্যোতিষি। ৫

স্ত্রীবাক্যে শ্রৌতমর্থমভিধায়ার্থিকমর্থমাহ—তত্রেতি। কিং পুনর্নানাত্বে কারণমিতি, তদাহ—নানাত্বে চেতি। উক্তম্ “অথ যোহন্যাম্” ইত্যাদাবিত্যর্থঃ। কিমেতাবতা সুষুপ্তে বিশেষবিজ্ঞানাভাবস্যায়াতং, তত্রাহ—তত্রেতি। বিশেষবিজ্ঞানে নানাত্বং, তত্র চাবিদ্যা কারণমিতি স্থিতে সতীতি যাবৎ। যদা তদেতি সুষুপ্তিৰ্বিবক্ষিতা। প্রবিবিক্তত্বং কার্য্য- কারণাবিদ্যাবিরহিতত্বম্। সর্ব্বেণ পূর্ণেন পরমাত্মনা সহেত্যর্থঃ। বিজ্ঞানাত্মা ষষ্ঠ্যোচ্যতে। একত্বফলমাহ—ততশ্চেতি। ৫

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১২৭

যস্মাদেবং সর্ব্বৈকত্বমেবাস্য রূপম্; অতস্তদ্বৈ অস্যাত্মনঃ স্বয়ৎজ্যোতিঃস্বভাবস্য এতদ্ রূপম্ আপ্তকামম্; যস্মাৎ সমস্তমেতৎ, তস্মাদাপ্তাঃ কামা অস্মিন্ রূপে, তদিদমাপ্তকামৎ; যস্য হি অন্যত্বেন প্রবিভক্তঃ কামঃ, তদনাপ্তকামং ভবতি; যথা জাগরিতাবস্থায়াং দেবদত্তাদি রূপম্; ন ত্বিদৎ তথা কুতশ্চিৎ প্রবিভজ্যতে; অতস্তদাপ্তকামং ভবতি। ৬

উক্তমুপজীব্যাপ্তকামবাক্যমবতার্য্য ব্যাচষ্টে-যস্মাদিতি। আপ্তকামত্বং সমর্থয়তে-যস্মাৎ সমস্তমিতি। তদেব ব্যতিরেকমুখেন(ণ) বিশদয়তি-যস্য হীত্যাদিনা। ৬

কিমন্যস্মাদ্বস্বন্তরান্ন প্রবিভজ্যতে? আহোস্বিৎ আত্মৈব তদ্বস্তন্তরম্? অত আহ—নান্যদ্ অন্ত্যাত্মনঃ। কথম্? যত আত্মকামম, আত্মৈব কামা যস্মিন্ রূপে, যেহত্র প্রবিভক্তা ইবান্যত্বেন কাম্যমানাঃ, যথা জাগ্রৎস্বপ্নয়োঃ তে অস্যাত্মৈব; অন্যত্বপ্রত্যুপস্থাপকহেতোরবিদ্যায়া অভাবাৎ আত্মকামম্; তত এবাকামম্ এতদ্রূপম্, কাম্যবিষয়াভাবাৎ; শোকান্তরং শোকচ্ছিদ্রং শোকশূন্যমিত্যেতৎ, শোকমধ্যমিতি বা, সর্ব্বথাপ্যশোকমেতদ্রূপৎ শোকবজ্জিতমিত্যর্থঃ ॥২৭৩৷৷২১৷৷

বিশেষণান্তরমাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমাদায় ব্যাচষ্টে-কিমন্যস্মাদিত্যাদিনা। সুষুপ্তেরন্যত্রাত্মনঃ সকাশাদন্যত্বেন প্রবিভক্তা ইব কাম্যমানাঃ, সুষুপ্তাবাত্মৈব কামাস্তম্মাদাত্মকামমাত্মরূপমিত্যেতৎ দৃষ্টান্তেনাহ-যথেতি। অবস্থাদ্বয়ে খল্বাত্মনঃ সকাশাদন্যত্বেন প্রবিভক্তা ইব কামাঃ, কাম্যন্ত- ইতি কামাঃ। ন চৈবং সুষুপ্তাবস্থায়ামাত্মনস্তে ভিদ্যন্তে, কিন্তু সুষুপ্তস্যাত্মৈব কামাঃ, ইত্যাত্ম- কামং তদ্রূপমিত্যর্থঃ। তস্যাত্মৈবেত্যত্র হেতুমাহ-অন্যত্বেতি। যদ্যপি সুষুপ্তেহবিদ্যা বিদ্যতে, তথাপি ন সাভিব্যক্তাস্তীত্যনর্থপরিহারোপপত্তিরিত্যর্থঃ। কামানামাত্মাশ্রয়ত্বপক্ষং প্রতিক্ষেপ্তুং তৃতীয়ং বিশেষণম্। শোকমধ্যং শোকস্যান্তরং প্রত্যগ্‌ভূতমিতি যাবৎ। তর্হি শোকবত্ত্বং প্রাপ্তং, নেত্যাহ-সর্ব্বখেতি। পক্ষদ্বয়েহপি শোকশূন্যমাত্মরূপম্। ন হি শোকো যেনাত্মবাংস্তস্য শোকবত্ত্বং, শোকস্যাত্মাধীনসত্তাস্ফূর্ত্তেরাত্মাতিরেকেণাভাবাদিত্যর্থঃ ॥২৭৩৷৷২১৷

ভাষ্যানুবাদ।-ইতঃ পূর্ব্বে তত্ত্ববিদ্যার ফলস্বরূপ-সর্ব্বপ্রকার ক্রিয়া, কারক ও ফলসম্বন্ধশূন্য এই যে, সর্বাত্মভাব মোক্ষের কথা বলা হইয়াছে, এখন এমনভাবে তাহার প্রত্যক্ষ নির্দেশ করিতেছেন, যেখানে অবিদ্যা, কাম ও কর্মের কোনই সম্পর্ক নাই। ‘তৎ এতৎ’ অর্থ-প্রস্তুত(পূর্ব্বোক্ত)-‘যেখানে সুপ্ত হইয়া কোন প্রকার কামনা করে না, কোন প্রকার স্বপ্ন দর্শন করে না’ ইত্যাদি। যে সর্বাত্মভাব রূপটি “সোহস্য পরমো লোকঃ” বলিয়া পূর্ব্বে উক্ত হই- য়াছে, তাহাই ইহার রূপ। শ্রুতিতে যদিও ‘অতিচ্ছন্দাঃ’ শব্দ আছে সত্য, তথাপি এখানে যখন উহা রূপের বিশেষণ, তখন উহাকে ‘অতিচ্ছন্দং’[ক্লীব- লিঙ্গ] বুঝিতে হইবে। ছন্দ অর্থ কামনা, যে রূপ হইতে ছন্দ চলিয়া গিয়াছে,

১১২৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অর্থাৎ যাহাতে কোন প্রকার কামনা নাই, তাহা অতিচ্ছন্দ রূপ। গায়ত্রীপ্রভৃতি ছন্দোবোধক আরো একটি সকারান্ত ‘ছন্দস্’ শব্দ আছে; কামনাবাচক এই অকা- রান্ত ‘ছন্দ’ শব্দটি নিশ্চয়ই তাহা হইতে স্বতন্ত্র; তথাপি যে, ‘অতিচ্ছন্দা’ পাঠ করা হইয়াছে, ইহা বেদের ধর্ম্ম, অর্থাৎ লৌকিক শব্দ হইতে কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম করাই যেন বেদের স্বভাব। লোকব্যবহারেও কামনা অর্থে ‘ছন্দ’ শব্দের প্রয়োগ রহিয়াছে; যেমন—‘স্বচ্ছন্দ, পরচ্ছন্দ’ ইত্যাদি। অতএব কামনারহিত অর্থে— ‘অতিচ্ছন্দা’ শব্দকে ‘অতিচ্ছন্দং’ রূপে অবশ্যই পরিবর্তিত করিতে হইবে। ১

সেইরূপ, ঐরূপটি অপহতপাপমও বটে; পাপ্ম-শব্দে ধর্মাধৰ্ম্ম বুঝায়; যেহেতু অন্যত্রও, ‘পাপের সহিত সংসৃষ্ট হয়, সর্ব্বপাপ পরিত্যাগ করে’ এইরূপ উক্তি রহিয়াছে; সেই হেতু এখানেও ‘অপহতপাপ’ শব্দে ধর্মাধর্মবিবর্জিত অর্থ ই বুঝিতে হইবে। অপিচ, ঐ রূপটি অভয়; অবিদ্যা হইতে ভয়ের উৎপত্তি হয়; এই জন্য অন্যত্র উক্ত আছে যে, ‘অবিদ্যাবশতঃ মনে ভয় হইয়া থাকে’; অতএব বুঝিতে হইবে যে, অবিদ্যাজনিত ভয়ের নিষেধ দ্বারা, তৎকারণীভূত অবিদ্যারই নিষেধ করা হইয়াছে; সুতরাং ‘অভয় রূপ’ অর্থ—অবিদ্যাবিবর্জিত রূপ। বিদ্যার ফলস্বরূপ এই যে সর্ব্বাত্মভাব, ইহাই অতিচ্ছন্দ অপহতপাপম ও অভয় রূপ; যেহেতু এই রূপটি সর্ব্ববিধ সংসার- ধৰ্ম্মবর্জিত, সেই হেতুই অভয়। ইতঃ পূর্ব্বে অব্যবহিত পূর্ব্ববর্তী ব্রাহ্মণের শেষে ‘হে জনক, তুমি অভয় প্রাপ্ত হইয়াছ’ এই আগম-বাক্যানুসারে পূর্ব্বেই এই অভয় রূপটি প্রদর্শিত হইয়াছে; এখানে আবার সেই আগমোক্ত অর্থই দৃঢ়তা- সম্পাদনের জন্য তর্কসহযোগে বর্ণিত হইল। ২

কথিত আত্মা নিজেই স্বভাবসিদ্ধ চৈতন্যজ্যোতিঃসম্পন্ন; স্বীয় চৈতন্যজ্যোতির প্রভাবে অপর সমস্ত বস্তু প্রকাশিত করিয়া থাকে। পূর্ব্বেও বলা হইয়াছে, ‘সেই আত্মা সেখানে যাহা কিছু দর্শন করে, রমণ করে, সঞ্চরণ করে, কিংবা অনুভব করে’ ইত্যাদি; আর নিত্য চৈতন্য-জ্যোতিই যে, আত্মার প্রকৃত রূপ, ইহা তর্কের সাহায্যেও পূর্ব্বেই ব্যবস্থাপিত হইয়াছে। সেই আত্মা যদি এই সুষুপ্তি অবস্থায়ও অবিনষ্টরূপেই বর্তমান থাকে, তাহা হইলে এই সুষুপ্ত আত্মা জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থার ন্যায়, এসময়েও আপনাকে এবং বাহ্য ভূতবর্গকে জানিতে পারে না কেন? হাঁ, অজ্ঞানের কারণ বলিতেছি; শ্রবণ কর; এখানে একত্বই উক্ত অজ্ঞানের প্রধান হেতু; ইহা যে, কিরূপে সম্ভবপর হয়, তাহাও বলিতেছি। দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝাইলে, বিবক্ষিত(বলিবার অভিপ্রেত) বিষয়টি প্রত্যক্ষবৎ প্রতিভাত

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১২৯

হয়;[এই জন্য দৃষ্টান্ত দ্বারা বলিতেছেন-] কথিত বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই যে, জগতে কামাতুর পুরুষ যেমন মনোরমা কামুকী স্ত্রীর সহিত সম্যরূপে আলিঙ্গিত হইয়া বহির্জগতের কোনও পদার্থ জানে না-তাহা হইতে অতিরিক্ত কোন বস্তু আছে বলিয়া উপলব্ধি করিতে পারে না, এবং আপনার আভ্যন্তরীণ কোন বিষয়ও-‘আমি সুখী বা দুঃখী’ ইত্যাকারে জানে না; অথচ তাদৃশ স্ত্রীকর্তৃক অনালিঙ্গিত সময়ে পরস্পর বিভাগাবস্থায় বাহ্য ও অভ্যন্তরীণ সমস্ত বিষয়ই জানিতে পারে, কিন্তু আলিঙ্গনের সময় উভয়ের একত্ব বা অবিভক্তভাব ঘটে বলিয়াই তখন জানিতে পারে না। ৩

তেমনই—অর্থাৎ উক্ত দৃষ্টান্তেরই মত, এই পুরুষ—দেহস্বামী জীব, ভূত- মাত্রা(পৃথিব্যাদি ভূতের পরিণাম) দেহেন্দ্রিয়াদির সহিত সম্বন্ধবশতঃ সৈন্ধবখণ্ডের ন্যায় সম্পূর্ণ পৃথক্ থাকিয়াও, জলে প্রতিফলিত চন্দ্রবিশ্বের ন্যায় এই দেহমধ্যে প্রবিষ্ট হয়; সেই এই পুরুষ অর্থাৎ দেহস্বামী জীব, প্রাজ্ঞের সহিত অর্থাৎ নিজের স্বভাবসিদ্ধ পারমার্থিক রূপ জ্যোতির্ময় পরমাত্মার সহিত সম্মিলিত—অব্যবধানে একীভূত হয়; সুতরাং তখন সর্ব্বাত্মভাবাপন্ন হইয়া, বাহ্য অপর কোনও বস্তু, কিংবা আন্তর অর্থাৎ আত্মাতে—আমি সুখী দুঃখী ইত্যাদি ভাব উপলব্ধি করে না। ৪

আত্মার চৈতন্যজ্যোতিঃ স্বভাবসিদ্ধ হইলে, সুষুপ্তি-সময়ে কি কারণে সে কিছুই জানিতে পারে না? তোমার এই প্রশ্নের উত্তরে পূর্ব্বেই আমরা বলিয়া‘ছি যে, একত্বই তাহার(জ্ঞানাভাবের) কারণ,-যেমন সমালিঙ্গিত স্ত্রী-পুরুষের হইয়া থাকে, ইহাও তেমনই। ইহা দ্বারা নানাত্মক ভেদবুদ্ধিই যে, বিশেষ বিজ্ঞানের(পরস্পরের মধ্যে পার্থক্যবুদ্ধির) একমাত্র নিদান, একথাও ভঙ্গীক্রমে বলাই হইয়াছে। অবিদ্যাই যে, সেই নানাত্বের-আত্মাতে ভেদবুদ্ধি উপস্থিতির একমাত্র হেতু, সে কথাও পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে। তন্মধ্যে আত্মা যখন অবিদ্যা হইতে সম্পূর্ণ বিবিক্ত বা নির্ম্মুক্ত হয়, তখনই সর্ব্ব বস্তুর সহিত তাহার একত্ব সম্পন্ন হয়; তাহারই ফলে তৎকালে জ্ঞান-জ্ঞেয়াদি বিভাগ বিলুপ্ত হইয়া যায়; সুতরাং তদবস্থায় বিশেষ বিজ্ঞানের উদ্ভব কোথা হইতে হইবে? এবং স্বভাবসিদ্ধ স্বরূপগত আত্মচৈতন্যে কামেরই বা সম্ভাবনা কোথায়। ৫

যেহেতু এইপ্রকার সর্ব্বৈকত্বই ইহার প্রকৃত রূপ, সেই হেতু স্বয়ংজ্যোতিঃ- স্বভাব এই আত্মার উক্ত রূপটি আপ্তকাম,—যেহেতু ইহা সর্ব্বাত্মক, সেই হেতুই সমস্ত কাম্য বিষয় এই রূপের মধ্যেই নিহিত আছে; সুতরাং ইহা আপ্তকাম।

১১৩০. বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যাহার নিকট কাম্য বিষয় পৃথক্তভাবে অবস্থিত থাকে, সে-ই অনাপ্তকাম হইয়া থাকে; যেমন জাগ্রৎকালীন দেবদত্তাদির স্বরূপ, অর্থাৎ দেবদত্তাদিনামক ব্যক্তি অনাপ্তকাম; কিন্তু এই সুষুপ্ত আত্মার রূপটি অন্য কোনও পদার্থ হইতে বিভক্ত নহে; কাজেই তাহা তখন আপ্তকাম(১)। ৬

[এখানে জিজ্ঞাস্য এই যে,] অপর পদার্থ হইতে বিভক্ত বা পৃথক্ না হওয়া কি আত্মার স্বতঃসিদ্ধ? অথবা আত্মার সর্বাত্মকভাবজনিত? তদুত্তরে বলিতে- ছেন—এই আত্মার অতিরিক্ত কোন পদার্থই নাই। কেন নাই? যেহেতু এই আত্মা ‘আত্মকাম’ অর্থাৎ আত্মাই যাহার কাম বা কাম্য, তাদৃশ আত্মকামত্বই তাহার স্বরূপ। অন্যত্র জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থায় দেখিতে পাওয়া যায়, কামনার বিষয়ীভূত বিষয়গুলি যেন অন্য বা পৃথক্ পদার্থ রূপে বিভক্ত থাকে; কিন্তু এখানে ভেদ- সমুৎপাদনের কারণীভূত অবিদ্যা বিদ্যমান না থাকায় এই রূপটি আত্মকাম হয়; এই কারণেই ইহা অকাম; কেন না, সে সময়ে কামনার যোগ্য কোন বিষয়ই থাকে না। তাহার পর, ঐ রূপটি শোকান্তর শোকের ছিদ্র—অবকাশ অর্থাৎ দুঃখ- শূন্য; অথবা ‘শোকান্তর’ অর্থ শোকের মধ্য, অর্থাৎ উহার অগ্রে ও পশ্চাতে শোক- সম্বন্ধ আছে, কেবল মধ্যবর্তী এই স্থানেই শোক-সম্বন্ধ নাই; সুতরাং উভয় মতেই উক্ত রূপটি যে অশোক--শোকবজ্জিত, তাহা সিদ্ধ হইতেছে ॥ ২৭৩॥ ২১ ॥

অত্র পিতাহপিতা ভবতি মাতাহমাতা, লোকা অলোকাঃ, দেবা অদেবাঃ, বেদা অবেদাঃ। অত্র স্তেনোহস্তেনো’ ভবতি, ভ্রূণহাহভ্রূণহা, চাণ্ডালোহচাণ্ডালঃ, পৌল্কসোহপৌল্কসঃ, শ্রমণোহশ্রমণস্তাপসোহতাপসোহনন্বাগতং পুণ্যেনানস্বাগতং পাপেন, তীর্ণো হি তদা সর্ব্বাঙ্কোকান্ হৃদয়স্য ভবতি ॥২৭৪৷৷২২৷৷

সম্বলার্থঃ।—অত্র(অস্মিন্ সম্প্রদাদে) পিতা(জনকঃ) অপিতা(পিতৃত্ব- সম্বন্ধশূন্যঃ) ভবতি; তথা মাতা অমাতা(মাতৃত্বসম্বন্ধরহিতা ভবতি);[এবং

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩১

সর্ব্বত্র]। লোকাঃ(কর্মলভ্যাঃ স্বর্গাদয়ঃ) অলোকাঃ, দেবাঃ(কর্মারাধ্যাঃ ইন্দ্রাদয়ঃ) অদেবাঃ, বেদাঃ(কৰ্ম্মবিধায়কাঃ ঋগাদয়ঃ) অবেদাঃ[ভবন্তি]। অত্র(সুযুপ্তৌ) স্তেনঃ(চৌর্য্যকর্মা ব্রাহ্মণসুবর্ণহর্তা বা) অন্তেনঃ ভবতি; তথা ভ্রূণহা(গর্ভোপ- ঘাতকঃ) অভ্রুণহা, চাণ্ডালঃ(ক্রুরকর্মা) অচাণ্ডালঃ, পৌল্কসঃ(শূদ্রেণ ক্ষত্রিয়ায়া- মুৎপাদিতঃ জাতিবিশেষঃ) অপৌল্কসঃ; শ্রমণঃ(পরিব্রাজকঃ) অশ্রমণঃ; তাপসঃ(বানপ্রস্থঃ) অতাপসঃ[ভবতি];[কিং বহুনা,) পুণ্যেন অনস্বাগতং (অসম্বদ্ধং), পাপেন চ অনস্বাগতৎ[তৎরূপম্]। তদা হি(নিশ্চয়ে) হৃদয়স্য সর্ব্বান্ শোকান্(দুঃখানি) তীর্ণঃ(উত্তীর্ণঃ) ভবতি ॥২৭৪৷৷২২৷৷

মূলানুবাদঃ—এই সুষুপ্তি সময়ে পিতা অপিতা হন, অর্থাৎ পিতার পিতৃত্ব থাকে না; মাতার মাতৃত্ব থাকে না; স্বর্গাদি লোকেরও লোকত্ব(কাম্যত্ব) থাকে না, কর্মারাধ্য দেবতার দেবত্ব থাকে না, এবং তদ্বোধক বেদেরও বেদত্ব(বিধায়কত্ব) থাকে না। এখানে স্তেন (চৌর্য্যকারী কিংবা ব্রাহ্মণের সুবর্ণচোর) অস্তেন হয়, ভ্রূণহত্যাকারী অভ্রূণহা, চাণ্ডাল অচাণ্ডাল, পৌল্কস(নীচজাতিবিশেষ) অপৌল্কস, শ্রমণ(পরিব্রাজক) অশ্রমণ এবং তাপস(বানপ্রস্থ) অতাপস হয়। তখন পুণ্য দ্বারা অসম্বদ্ধ এবং পাপদ্বারাও অসংস্পৃষ্ট; তখন নিশ্চয়ই হৃদয়ের সর্ববিধ শোক অতিক্রম করে অর্থাৎ দুঃখবিমুক্ত হয় ॥২৭৪॥২২॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—প্রকৃতঃ স্বয়ংজ্যোতিরাত্মা অবিদ্যাকামকর্মবিনির্ম্মুক্ত ইত্যুক্তম্। অসঙ্গত্বাদাত্মন আগন্তুকত্বাচ্চ তেষাং, তত্রৈবমাশঙ্কা জায়তে; চৈতন্য- স্বভাবত্বে সত্যপি একীভাবান্ন জানাতি—স্ত্রীপুংসয়োরিব সম্পরিষক্তয়োরিত্যু- ক্তম্। তত্র প্রাসঙ্গিকমেতদুক্তম্, কামকৰ্ম্মাদিবৎ স্বয়ংজ্যোতিষ্টমপি অস্যাত্মনো ন স্বভাবঃ, যস্মাৎ সম্প্রসাদে নোপলভ্যতে, ইত্যাশঙ্কায়াং প্রাপ্তায়াং তন্নিরাকরণায় স্ত্রী-পুংসয়োদৃষ্টান্তোপাদানেন বিদ্যমানস্যৈব স্বয়ংজ্যোতিষ্টস্য সুযুপ্তেহগ্রহণমেকী- ভাবাদ্ধেতোঃ, ন তু কামকৰ্ম্মাদিবদাগন্তকম্, ইত্যেতৎ প্রাসঙ্গিকমভিধায়, যৎ প্রকৃতং তদেবানুপ্রবর্ত্তয়তি। অত্র চৈতৎ প্রকৃতম্—অবিদ্যাকামকর্মবিনির্ম্মুক্ত- মেতদ্রূপম, যৎ সুষুপ্ত আত্মনো গৃহাতে প্রত্যক্ষত ইতি। তদেতদ্ যথাভূতমেবা- ভিহিতং সর্ব্বসম্বন্ধাতীতমেতদ্রূপমিতি। ১

টীকা। অত্র পিতেত্যাদিবাক্যমবতারয়িতুং বৃত্তমনুদ্রবতি-প্রকৃত ইতি। অবিদ্যাদি- নির্মোকে হেতুদ্বয়মাহ-অসঙ্গত্বাদিতি। যদ্যপি নাগন্তুকত্বমবিদ্যায়া যুক্তং, তথাপ্যভিব্যক্তা

১১৩২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সানর্থহেতুরাগন্তকীতি দ্রষ্টব্যম্। স্ত্রীবাক্যনিরস্যাং শঙ্কামনুবদতি-তত্রেতি। কামাদিবিমোক্ষে দর্শিতে সতীতি যাবৎ। স্বভাবস্তাপায়ো ন সম্ভবতীত্যভিপ্রেত্য হেতুমাহ-যম্মাদিতি। শঙ্কোত্তরত্বেন স্ত্রীবাক্যমবতার্য্য তৎতাৎপৰ্য্যং পূর্ব্বোক্তমনুকীর্তয়তি-স্বয়মিতি। বৃত্তমনুদ্যোত্তর- গ্রন্থমুখাপয়তি-ইত্যেতদিতি। স্বয়ংজ্যোতিষ্টস্য স্বাভাবিকত্বমেতচ্ছন্দার্থঃ। প্রাসঙ্গিকং কামাদেরাগন্তকত্বোক্তিপ্রসঙ্গাদাগতমিতি যাবৎ। প্রকৃতমেব দর্শয়তি-অত্র চেতি। অতিচ্ছন্দাদি- বাক্যং সপ্তম্যর্থঃ। প্রত্যক্ষতঃ স্বরূপচৈতন্যবশাৎ যথোক্তাত্মরূপস্থ্য সুষুপ্তে গৃহ্যমাণত্বমুখিতস্য পরামর্শাদবধেয়ম্। কামাদিসম্বন্ধবদাত্মনস্তদ্রহিতমপি রূপং কল্পিতমেবেত্যাশঙ্ক্যাহ-তদেত- দিতি। প্রকৃতমর্থমুক্তোত্তরবাক্যস্থসপ্তম্যর্থমাহ-এতস্মিন্নতি। জনকোহপ্যত্রাপিতা ভবতীতি সম্বন্ধঃ। পিতাহপ্যত্রাপিতা ভবতীত্যুপপাদয়তি-তস্য চেত্যাদিনা। যথাস্মিন্ কালে পিতা পুত্রস্থাপিতা ভবতি, তদ্বদিত্যাহ-তথেতি। নাস্যার্থস্য প্রতিপাদকঃ শব্দোহস্তীত্যাশঙ্ক্যাহ- সামর্থ্যাদিতি। তদেব সামর্থ্যং দর্শয়তি-উক্তয়োরিতি। সুষুপ্তে কৰ্ম্মাতিক্রমে প্রমাণমাহ- অপহতেতি। পুনর্লোকদেবশব্দাবনুবাদার্থে। ১

যস্মাদত্রৈতস্মিন্ সুষুপ্তস্থানে অতিচ্ছন্দাপহতপাপ্মাভয়মেতদ্রূপম্, তস্মাদত্র পিতা জনকঃ, তস্য চ জনয়িতৃত্বাৎ যৎ পিতৃত্বং পুত্রং প্রতি, তৎ কৰ্ম্মনিমিত্তম্; তেন চ কর্মণা অয়মসম্বদ্ধোহস্মিন্ কালে; তস্মাৎ পিতা পুত্রসম্বন্ধনিমিত্তাৎ কর্মণো বিনি- মুক্তত্বাৎ পিতাপি অপিতা ভবতি। তথা পুত্রোহপি পিতুরপুত্রো ভবতীতি সামর্থ্যা- দগম্যতে; উভয়োহি সম্বন্ধনিমিত্তং কৰ্ম্ম, তদয়মতিক্রান্তো বর্ততে; অপহত- পাপ্মেতি হ্যুক্তম্। তথা মাতা অমাতা, লোকাঃ কৰ্ম্মণা জেতব্যাঃ জিতাশ্চ; তৎকৰ্ম্ম-সম্বন্ধাভাবাৎ লোকা অলোকাঃ। তথা দেবাঃ কৰ্ম্মাঙ্গভূতাঃ, তৎকৰ্ম্ম- সম্বন্ধাত্যরাৎ দেবা অদেবাঃ; তথা বেদাঃ সাধ্যসাধনসম্বন্ধাভিধায়কাঃ ব্রাহ্মণলক্ষণা মন্ত্রলক্ষণাশ অভিধায়কত্বেন কর্মাঙ্গভূতাঃ অধীতা অধ্যেতব্যাশ কৰ্ম্মনিমিত্তমেব সম্বধ্যন্তে পুরুষেণ। তৎকর্মাতিক্রমণাদেতস্মিন্ কালে বেদা অপ্যবেদাঃ সম্পদ্যন্তে।২ বাক্যান্তরনাদার ব্যাচষ্টে-তথেত্যাদিনা। সাধ্যসাধনসম্বন্ধাভিধায়কা ব্রাহ্মণলক্ষণা ইতি শেষঃ। অভিধায়কত্বেন প্রমাণত্বেন প্রমেয়ত্বেন চেত্যর্থঃ।২

ন কেবলং শুভকর্মসম্বন্ধাতীতঃ, কিং তহি? অশুভৈরপ্যত্যন্তঘোরৈঃ কৰ্ম্মভি- রসম্বদ্ধ এবায়ং বর্ততে ইত্যেতমর্থমাহ,-অত্র স্তেনঃ ব্রাহ্মণসুবর্ণহর্তা, ভ্রূণঘ্না সহ- পাঠাদবগম্যতে; স তেন ঘোরেণ কর্মণা এতস্মিন্ কালে বিনির্মুক্তো ভবতি, যেনায়ং কৰ্ম্মণা মহাপাতকী স্তেন উচ্যতে। তথা ভ্রূণহা অভ্রূণহা, তথা চাণ্ডালঃ; ন কেবলং প্রত্যুৎপন্নেনৈব কৰ্ম্মণা বিনির্ম্মুক্তঃ, কিং তর্হি? সহজেনাপি অত্যন্ত- নিকৃষ্টজাতিপ্রাপকেণাপি বিনির্ম্মুক্ত এবায়ম্। চাণ্ডালো নাম শূদ্রেণ ব্রাহ্মণ্যা- মুৎপন্নঃ, চণ্ডাল এব চাণ্ডালঃ; স জাতিনিমিত্তেন কৰ্ম্মণাসম্বদ্ধত্বাদ অচাণ্ডালো

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩

ভবতি। পৌল্কসঃ, পুল্কস এব পৌল্কসঃ—শূদ্রেণৈব ক্ষত্রিয়ায়ামুৎপন্নঃ, তথা সোহ- প্যপুল্কসো ভবতি। তথা আশ্রমলক্ষণৈশ্চ কর্মভিরসম্বদ্ধো ভবতীত্যুচ্যতে—শ্রমণঃ পরিব্রাট্ যৎকর্মনিমিত্তো ভবতি, স তেন বিনির্মুক্তত্বাদশ্রমণঃ। তথা তাপসো বানপ্রস্থঃ অতাপসঃ। সর্ব্বেষাং বর্ণাশ্রমাদীনামুপলক্ষণার্থমুভয়োগ্রহণম্। ৩

অত্র স্তেনোহস্তেনো ভবতীত্যাদেস্তাৎপর্য্যমাহ—ন কেবলমিতি। স্তেনশব্দোহত্র চৌরমাত্রে ভাতি, কথং বিশেষণমিতিশঙ্ক্যাহ—হ্রণয়েতি। হ্রণহা চ বরিষ্ঠব্রহ্মহন্তোচ্যতে। তদেব ঘোরং কৰ্ম্ম বিশিনষ্টি—যেনেতি। মহৎ পাতকমস্যেতি ব্যুৎপত্ত্যা মহাপাতকী স্তেনঃ। স্তেনাদিবাক্যেন চাণ্ডালাদিবাক্যস্য গতার্থত্বমাশঙ্ক্যাহ—নেত্যাদিনা। প্রত্যুৎপন্নমাগস্তুকম্।

“যোনিঃ কফঘ্নং হৃতং বৈশম্যৈব চ কফপিত্তজং।

পৃষ্ঠাঙ্কনচণ্ডীঃ সর্ব্বধর্ম্মবিমুক্তঃ। ১”

ইতি স্মৃতিবিবরণ—চতুর্থোঽধ্যায়ঃ।

“শত্রুতো নিপাতোঽপি, শত্রুতাং ভবেৎ পুরুষঃ।”

ইতি স্মৃতেঃ শূদ্রায়াং ব্রাহ্মণাজ্জাতো নিষাদঃ, স চ জাত্যা শূদ্রঃ, তস্মাৎ ক্ষত্রিয়ায়াং জাতঃ পুল্কসো ভবতীতি ব্যাখ্যানমুপেত্যাহ-শূদ্রেণৈবেতি। শ্রমণাদিবাকাস্য তাৎপর্য্যমাহ-তথেতি। তথা চাণ্ডালবদিতি যাবৎ। পরিব্রাট্-তাপসয়োরেব গ্রহণাৎ তৎকৰ্মাযোগেহপি সৌষুপ্তস্য বর্ণাশ্রমান্তরকর্মযোগং শঙ্কিত্বাহ-সর্ব্বেষানিতি। আদিশব্দেন বয়োবস্থাদি গৃহ্যতে। ৩

কিং বহুনা, অনন্বাগতং-ন অন্বাগতমনন্বাগতমসম্বদ্ধমিত্যেতৎ। পুণ্যেন শাস্ত্রবিহিতেন কৰ্ম্মণা; তথা পাপেন বিহিতাকরণ-প্রতিষিদ্ধক্রিয়ালক্ষণেন; রূপ- পরত্বান্নপুংসকলিঙ্গম্; অভয়ং রূপমিতি হ্যানুবর্ততে। কিং পুনরসম্বদ্ধত্বে কারণ- মিতি তদ্ধেতুরুচ্যতে-তীর্ণঃ অতিক্রান্তঃ, হি যস্মাদেবংরূপঃ, তদা তস্মিন্ কালে সর্ব্বান্ শোকান্, শোকাঃ কামা ইষ্টবিষয়প্রার্থনাঃ; তে হি তদ্বিষয়বিয়োগে শোকত্ব- মাপদ্যন্তে; ইষ্টং হি বিষয়মপ্রাপ্তৎ বিযুক্তৎ চোদ্দিশ্য চিন্তয়ানস্তদ্গুণান্ সন্তপ্যতে পুরুষঃ; অতঃ শোকো রতিঃ কাম ইতি পর্যায়াঃ। যস্মাৎ সর্ব্বকামাতীতো হত্রায়ং “ন কঞ্চন কামং কাময়তে” “অতিচ্ছন্দা” ইতি হ্যুক্তম্; তৎপ্রক্রিয়াপতিতো হয়ং শোকশব্দঃ কামবচন এব ভবিতুমর্হতি। কামশ্চ কর্মহেতুঃ; বক্ষ্যতি হি- “স যথাকামো ভবতি তৎক্রতুর্ভবতি; যৎক্রতুর্ভবতি, তৎ কৰ্ম্ম কুরুতে” ইতি; অতঃ সর্ব্বকামাতিতীর্ণত্বাদ যুক্তমুক্তম্ ‘অনন্বাগতৎ পুণ্যেন’ ইত্যাদি। ৪

সৌযুপ্তে পুরুষে প্রকৃতে কথমন্বাগতমিতি নপুংসকপ্রয়োগঃ, তত্রাহ-রূপপরত্বাদিতি। তৎপরত্বে হেতুমনুষঙ্গং দর্শয়তি-অভয়মিতি। হেতুবাক্যমাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-কিং পুনরিত্যাদিনা। যম্মাদতিচ্ছন্দাদিবাক্যোক্তস্বভাবোহয়মাত্মা সুষুপ্তিকালে হৃদয়নিষ্ঠান্ সর্ব’ন্ শোকানতিক্রামতি, তস্মাদেতদাত্মরূপং পুণ্যপাপাভ্যামনস্বাগতং মুক্তমিত্যর্থঃ। শোক- শব্দস্য কামবিষয়ত্বং সাধয়তি-ইষ্টেতি। কথং তন্যাঃ শোকত্বাপত্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-ইষ্টং হীতি।

১১৩৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তেষাং পর্যায়ত্বেহপি প্রকৃতে কিমায়াতং, তদাহ-যম্মাদিতি। অত্রেতি সুষুপ্তিরুচ্যতে। অতঃ সর্ব্বকামাতিতীর্ণত্বাদিত্যুত্তরত্র সম্বন্ধঃ। ন কেবলং শোকশব্দস্য কামবিষয়ত্বমুপপন্নমেব, কিন্তু সন্নিধেরপি সিদ্ধমিত্যাহ-ন কঞ্চনেতি। শোকশব্দস্য কামবিষয়ত্বেহপি তদত্যয়মাত্রাৎ কথং কর্মাত্যয়ঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-কামশ্চেতি। তত্র বাক্যশেষং প্রমাণয়তি-বক্ষ্যতি হীতি। কামস্য কর্মহেতুত্বে সিন্ধে ফলিতমাহ-অত ইতি। ৪

হৃদয়স্য—হৃদয়মিতি পুণ্ডরীকাকারো মাংসপিণ্ডঃ, তৎস্থমন্তঃকরণং বুদ্ধিঃ হৃদয়- মিত্যুচ্যতে, তাৎস্থ্যাৎ, মঞ্চক্রোশনবৎ। হৃদয়স্য বুদ্ধের্যে শোকাঃ; বুদ্ধিসংশ্রয়া হি তে, “কামঃ সঙ্কল্লো বিচিকিৎসেত্যাদি সর্ব্বং মন এব” ইত্যুক্তত্বাৎ। বক্ষ্যতি চ— “কামা যেহস্য হৃদি শ্রিতাঃ” ইতি; আত্মসংশ্রয়ভ্রান্ত্যপনোদায় হীদৎ বচনম্— “হৃদি শ্রিতাঃ”, “হৃদয়স্য শোকাঃ” ইতি চ! হৃদয়-করণ-সম্বন্ধাতীতশ্চায়মস্মিন্ কালে অতিক্রামতি মৃত্যো রূপাণীতি হ্যুক্তম্। হৃদয়করণ-সম্বন্ধাতীতত্ত্বাৎ তৎসংশ্রয়- কামসম্বন্ধাতীতো ভবতীতি যুক্ততরং বচনম্। ৫

হৃদয়স্য শোকানতিক্রামতীত্যত্র হৃদয়শব্দার্থমাহ-হৃদয়মিতীতি। মাংসপিণ্ডবিশেষবিষয়ং হৃদয়পদং কথং বুদ্ধিমাহেত্যাশঙ্ক্যাহ-তাৎস্থ্যাদিতি। যথা মঞ্চাঃ ক্রোশন্তীতি মঞ্চক্রোশনমুচ্য- মানং মঞ্চস্থান্ পুরুষানুপচারাদাহ, তথা হৃদয়স্থত্বাদ বুদ্ধেরুপচারাদ বুদ্ধিং হৃদয়শব্দো দর্শয়তীত্যর্থঃ। হৃদয়শব্দার্থমুক্তা তস্য সম্বন্ধং দর্শয়তি-হৃদয়স্যেতি। তানতিক্রান্তো ভবতীতি শেষঃ। আত্মাশ্রয়াস্তে ন বুদ্ধিমাশ্রয়ন্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-বুদ্ধীতি। কথং তহি কেচিদাত্মাশ্রয়ত্বং তেষাং বদন্তীত্যাশঙ্ক্য ভ্রান্তিবশাদিত্যাহ-আত্মেতি। ভবতু কামানাং-হৃদয়াশ্রিতত্বং, তথাপি তৎসম্বন্ধ- দ্বারা তদাশ্রয়ত্বসম্ভবাৎ কথমাত্মা সুষুপ্তে কামানতিবর্ততে, তত্রাহ-হৃদয়েতি। তৎসম্বন্ধাতীতত্বে শ্রুতিসিদ্ধে ফলিতমাহ-হৃদয়করণেতি। ৫

যে তু বাদিনঃ—হৃদি শ্রিতাঃ কামা বাসনাশ্চ হৃদয়সম্বন্ধিনমাত্মানমুপসৃত্য উপশ্লিষ্যন্তি, হৃদয়বিয়োগেহপি চ আত্মন্যবতিষ্ঠন্তে, পুটতৈলস্থ ইব পুষ্পাদিগন্ধ ইত্যাচক্ষতে; তেষাৎ “কামঃ সঙ্কল্পঃ”, “হৃদয়ে হ্যেব রূপাণি”, “হৃদয়স্য শোকাঃ” ইত্যাদীনাৎ বচনানামানর্থক্যমেব। হৃদয়করণোৎপাদ্যত্বাদিতি চেৎ; ন, হৃদি শ্রিতাঃ ইতি বিশেষণাৎ; ন হি হৃদয়স্য করণমাত্রত্বে ‘হৃদি শ্রিতাঃ’ ইতি বচনং সমঞ্জসম্, “হৃদয়ে হ্যেব রূপাণি প্রতিষ্ঠিতানি” ইতি চ। আত্মবিশুদ্ধেশ্চ বিবক্ষি- তত্বাৎ হৃচ্ছ্রয়ণবচনং যথার্থমেব যুক্তম্; “ধ্যায়তীব লেলায়তীব’ ইতি চ শ্রুতে- রন্যার্থাসম্ভবাৎ। ৬

ভর্তৃপ্রপঞ্চপ্রস্থানমুখাপয়তি-যে ত্বিতি। সত্যেব হৃদয়ে তন্নিষ্ঠানাং কামাদীনামাত্মন্যুপশ্লেষো ন তন্নিবৃত্তাবিত্যাশঙ্ক্যাহ-হৃদয়বিয়োগে হীতি। তন্মতে শ্রুতিবিরোধমাহ-তেষামিতি। হৃদয়েন করণেনোৎপাদ্যত্বাদাত্মবিকারাণামপি কামাদীনাং হৃদয়সম্বন্ধসম্ভবান্নানর্থক্যং শ্রুতীনামিতি শঙ্কতে-হৃদয়েতি। ন কামাদিসম্বন্ধমাত্রং হৃদয়স্য শ্রুত্যর্থঃ, কিম্বাশ্রয়াশ্রয়িত্বং, তচ্চ করণত্বে ন

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩৫

স্যাৎ। ন হি চক্ষুরাদ্যাশ্রয়ং রূপাদিজ্ঞানং দুষ্টমিতি পরিহরতি-ন হৃদীতি। চকারাদ বচনং ন সমঞ্জসমিতি সম্বধাতে। প্রদীপায়ত্তং ঘটজ্ঞানমিতি বদন্তঃ করণারত্তমাত্মাশ্রিতং কামাদীতি তস্য তদাশ্রয়ত্ববচনমৌপচারিকমিত্যাশঙ্ক্যাহ-আত্ম-বিশুদ্ধেশ্চেতি। ইতশ্চেদং যথার্থমেবেত্যাহ- ধ্যায়তীবেতি। অন্যার্থাসম্ভবাদ বুদ্ধ্যাশ্রয়ণবচনস্যেতি শেষঃ। ৬

“কামা যেহস্য হৃদি শ্রিতাঃ” ইতি বিশেষণাদাত্মাশ্রয়া অপি সন্তীতি চেৎ; ন, অনাশ্রিতাপেক্ষত্বাৎ; নাত্রাশ্রয়ান্তরমপেক্ষ্য ‘যে হৃদি’ ইতি বিশেষণম্, কিন্তুর্হি? যে হৃদ্যনাশ্রিতাঃ কামাঃ, তানপেক্ষ্য বিশেষণম্। যে তু অপ্ররূঢ়া ভবিষ্যাঃ, ভূতাঃ প্রতিপক্ষতো নিবৃত্তাঃ, তে নৈব হৃদি শ্রিতাঃ; সম্ভাব্যন্তে চ তে; অতো যুক্তং তানপেক্ষ্য বিশেষণম্—যে প্ররূঢ়া বর্তমানাদিবিষয়ে, তে সর্ব্বে প্রমুচ্যন্তে ইতি। ৭

দক্ষিণেনাক্ষা পণ্যতীত্যুক্তে বামেন ন পণ্যতাতিবৎ, প্রমুচান্তে হৃদি শ্রিতা ইতি বিশেষণ- মাশ্রিত্যাশঙ্কতে—কামা য ইতি। প্রকারান্তরেণ বিশেষণস্যার্থবত্ত্বং দর্শয়তি—নেত্যাদিনা। অত্রেতি প্রকৃতশ্রুত্যুক্তিঃ। আশ্রয়ান্তরং বুদ্ধ্যতিরিক্তমাত্মাখ্যম্। বুদ্ধ্যনাশ্রিতাঃ কামা এবন সন্তি, যদপেক্ষয়া হৃদয়াশ্রয়ত্ববিশেষণমিত্যাশঙ্ক্যাহ—যে ত্বিতি। প্রতিপক্ষতো বিষয়দোষদর্শনাদিতি যাবৎ। কামানাং বর্তমানত্বনিয়মাভাবাদ ভূতভবিষ্যতামপি সম্ভবে ফলিতমাহ—অত ইতি। ৭

তথাপি বিশেষণানর্থক্যমিতি চেৎ; ন, তেষু যত্নাধিক্যাৎ, হেয়ার্থত্বাৎ; ইত- রথা অশ্রুতমনিষ্টঞ্চ কল্পিতং স্যাৎ—আত্মাশ্রয়ত্বং কামানাম্। ‘ন কঞ্চন কামৎ কাময়তে’ ইতি প্রাপ্তপ্রতিষেধাদাত্মাশ্রয়ত্বং কামানাং শ্রুতমেবেতি চেৎ; ন, “সধীঃ স্বপ্নো ভূত্বা” ইতি পরনিমিত্তত্বাৎ কামাশ্রয়ত্বপ্রাপ্তেঃ; অসঙ্গবচনাচ্চ; ন হি কামা- শ্রয়ত্বে অসঙ্গবচনমুপপদ্যতে; সঙ্গশ্চ কাম ইত্যবোচাম। “আত্মকামঃ” ইতি শ্রুতে- রাত্মবিষয়োহস্য কামো ভবতীতি চেৎ; ন, ব্যতিরিক্তকামাভাবার্থত্বাৎ তস্যাঃ। ৮

হৃদয়ানাশ্রিতভূত-ভবিষ্যৎকামসম্ভবেহপি সর্ব্বকামনিবৃত্তেঃ বিবক্ষিতত্বাৎ বর্তমানবিশেষণ- মনর্থকমিতি শঙ্কতে-তথাপীতি। অতীতানাগতকামাভাবঃ সম্ভবতি স্বতঃসিদ্ধঃ, ন তন্নিবৃত্তৌ যত্নোহপেক্ষ্যতে, শুদ্ধাত্মদিদৃক্ষুণা তু মুমুক্ষুণা বর্তমানকামনিরাসে যত্নাধিক্যমাধেরমিতি জ্ঞাপয়িতুং বর্তমানগ্রহণমিতি পরিহরতি-ন তেধিতি। যদি যথোক্তং ব্যাখ্যানমনাদৃত্যাত্মা- শ্রয়ত্বমেব কামানামাশ্রীয়তে, তদা অশ্রুতং মোক্ষাসম্ভবেনানিষ্টং চ কল্পিতং স্যাদিত্যাহ- ইতরথেতি। অশ্রুতত্বমসিদ্ধমিতি শঙ্কতে-ন কঞ্চনেতি। অর্থাদাত্মাশ্রয়ত্বং শ্রুতমেব কামানামিত্যেতৎ দূষয়তি-নেত্যাদিনা। নিষেধো হি প্রাপ্তিমপেক্ষতে, ন বাস্তবং কামানাত্ম- ধর্মত্বং, প্রাপ্তিস্তু ভ্রান্ত্যাপি সম্ভবতি। তন্মাদাত্মনো বস্তুতো ন কামাদ্যাশ্রয়ত্বমিত্যর্থঃ। ইতশ্চাত্মনো ন কামাদ্যাশ্রয়ত্বমিত্যাহ-প্রসঙ্গেতি। নম্বসঙ্গবচনমাত্মনঃ সঙ্গাভাবং সাধয়ত্তস্য কামিত্বে ন বিরুধ্যতে, তত্রাহ-সঙ্গশ্চেতি। কামশ্চ সঙ্গতোহসিদ্ধো হেতুরত্রেতি শেষঃ। বাক্যান্তরমাশ্রিত্যাত্মনি কামাশ্রয়ত্বং শঙ্কিত্বা দুষয়তি-আত্মেত্যাদিন্যা। ৮

১১৩৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বৈশেষিকাদিতন্ত্রন্যায়োপপন্নমাত্মনঃ কামাদ্যাশ্রয়ত্বমিতি চেৎ; ন, “হৃদি শ্রিতাঃ” ইত্যাদিবিশেষশ্রুতিবিরোধাদনপেক্ষ্যাস্তা বৈশেষিকাদি-তন্ত্রোপপত্তয়ঃ; শ্রুতিবিরোধে ন্যায়স্যাভাসত্বোপগমাৎ। স্বয়ংজ্যোতিষ্টবাধনাচ্চ; কামাদীনাঞ্চ স্বপ্নে কেবল-দৃশিমাত্রবিষয়ত্বাৎ স্বয়ংজ্যোতিষ্টং সিদ্ধং স্থিতঞ্চ বাধ্যেত-আত্মসমবায়িত্বে দৃশ্যত্বানুপপত্তেঃ, চক্ষুর্গতবিশেষবৎ; দ্রষ্টুহি দৃশ্যমর্থান্তরভূতম্, ইতি দ্রষ্টুঃ স্বয়ং- জ্যোতিষ্টং সিদ্ধম্, তদ্‌ বাধিতৎ স্যাৎ, যদি কামাদ্যাশ্রয়ত্বং পরিকল্প্যেত। ৯

ইচ্ছাদয়ঃ কচিদাশ্রিতা গুণত্বাদ্ রূপাদিবদিত্যনুমানাৎ পরিশেষাৎ কামাদ্যাশ্রয়ত্বমাত্মনঃ সেৎস্যতীতি শঙ্কতে-বৈশেষিকাদীতি। শ্রুত্যবষ্টন্তেন নিরাচষ্টে-নেত্যাদিনা। স্বয়ংজ্যোতিষ্ট- বাধনাচ্চ নাত্মাশ্রয়ত্বং কামাদীনামিতি শেষঃ। তদেব বিবৃণোতি-কামাদীনামিতি। স্থিতং চানুমানাদিতি শেষঃ। যদ্যত্র সমবেতং, তৎ তেন ন দৃশ্যতে, যথা চক্ষুর্গতং কাৰ্য্যং তেনৈব চক্ষুষান দৃশ্যতে, তথা কামাদীনামাত্মসমবায়িত্বে দৃশ্যত্বং ন স্যাৎ, দৃশ্যত্ববলেনৈব স্বয়ংজ্যোতিষ্টুং সাধিতং, তথা চ তদ্বাধে পূর্ব্বোক্তমনুমানমপি বাধ্যেতেত্যর্থঃ। কথং কামাদীনামাত্মদৃশ্যত্ব- মাশ্রিত্য স্বপ্নে স্বয়ংজ্যোতিষ্টুস্যোপদিষ্টত্বং, তত্রাহ-দ্রষ্টুরিতি। তথাপি তেষামাত্মাশ্রয়ত্বে কানুপপক্তিস্তত্রাহ-তদ্বাধিতমিতি। ৯

সর্ব্বশাস্ত্রার্থবিপ্রতিষেধাচ্চ—পরস্যৈকদেশকল্পনায়াং কামাদ্যাশ্রয়ত্বে চ সর্ব্ব- শাস্ত্রার্থজাতং কুপ্যেত। এতচ্চ বিস্তরেণ চতুর্থেইবোচাম। মহতা হি প্রযত্নেন কামাশ্রয়ত্বকল্পনাঃ প্রতিষেধব্যাঃ, আত্মনঃ পরেণৈকত্ব-শাস্ত্রার্থসিদ্ধয়ে; তৎকল্প- নায়াৎ পুনঃ ক্রিয়মাণায়াং শাস্ত্রার্থ এব বাধিতঃ স্যাৎ। যথা ইচ্ছাদীনামাত্মধমত্বং কল্পয়ন্তো বৈশেষিকা নৈয়ায়িকাশ্চোপনিষচ্ছাস্ত্রার্থেন ন সঙ্গচ্ছন্তে, তথা ইয়মপি কল্পনা উপনিষচ্ছাস্ত্রার্থবাধনান্নাদরণীয়া ॥২৭৪৷৷২২৷৷

যৎ তু পরমাত্মৈকদেশং জীবমাশ্রিত্য তদাশ্রিতং কামাদীতি, তত্রাহ-সর্ব্বশাস্ত্রেতি। তদেব স্ফুটয়তি-পরস্যেতি। শাস্ত্রার্থজাতং নিরবয়বত্বপ্রত্যগেকত্বাদি, তস্য কথং কোপঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-এতচ্চেতি। চতুর্থে চেৎ ভর্তৃপ্রপঞ্চমতং নিরস্তং, তর্হি পুননিরাকরণ- মকিঞ্চিৎকরম্, ইত্যাশঙ্ক্যাহ-মহতেতি। পরেণ সহ প্রত্যগাত্মনো যদেকত্বং, তস্য শাস্ত্রার্থস্য সিদ্ধ্যর্থমিতি যাবৎ। অংশত্বাদিকল্পনায়ামপি শাস্ত্রার্থসিদ্ধিমাশঙ্ক্যাহ-তৎ কল্পনায়ামিতি। ভর্তৃপ্রপঞ্চকল্পনায়া হেয়ত্বমুপসংহরতি-যথেত্যাদিনা ॥২৭৪॥২২॥

ভাষ্যানুবাদ?—যে আত্মার প্রসঙ্গ চলিতেছে, সেই আত্মা যে, স্বয়ং- জ্যোতিঃস্বভাব এবং অবিদ্যা-কাম-কর্মবিরহিত, একথা পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে; সে সম্বন্ধে এই যুক্তি বলা হইয়াছে যে, আত্মা স্বভাবতঃ অসঙ্গ, অবিদ্যা ও কাম-কর্মাদি ধর্মগুলি তাহার আগন্তুক বা অস্বাভাবিক। সে কথার উপর এখন আশঙ্কা হইতেছে যে, প্রথমে বলা হইয়াছে,—আত্মা চৈতন্যস্বরূপ হইলেও

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩৭

[ সুষুপ্তি সময়ে] পরস্পর সমালিঙ্গিত স্ত্রী-পুরুষের ন্যায় একীভাব প্রাপ্ত হওয়ায় কিছুই জানিতে পারে না; সেই প্রসঙ্গে আশঙ্কা হইয়াছিল যে, কাম-কর্মাদি ধর্মগুলি যেমন আত্মার স্বভাব নহে, তেমনি স্বয়ংজ্যোতিষ্ট বা স্বপ্রকাশত্বও আত্মার স্বভাব হইতে পারে না; যেহেতু সুষুপ্তি সময়ে উহার সদ্ভাব দেখিতে পাওয়া যায় না; এই আশঙ্কার নিরাসার্থ সমালিঙ্গিত স্ত্রী-পুরুষের দৃষ্টান্ত প্রদর্শনপূর্ব্বক সমাধান করিয়াছেন যে, সুষুপ্তি-সময়েও আত্মার স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাব বিদ্যমানই থাকে, কেবল একীভাব নিবন্ধন তাহার প্রতীতি হয় না মাত্র; কিন্তু কাম-কর্মাদির ন্যায় উহা কখনই আগন্তুক(অস্বাভাবিক) নহে; এই প্রাসঙ্গিক কথা শেষ করিয়া, যাহা প্রকৃত(প্রস্তাবিত) বিষয়, এখন তাহারই অনুসরণ করিতেছেন। এখানে ইহাই প্রকৃত বা বর্ণনীয় বিষয় যে, আত্মার সেই রূপটি সত্যসত্যই অবিদ্যা ও কাম- কর্মাদিবিনির্মুক্ত, যে রূপটি সুষুপ্তিসময়ে প্রত্যক্ষ করা হয়; আর আত্মার যে রূপটিকে সর্ব্ব পদার্থের সহিত সম্বন্ধাতীত বলা হইয়াছে, তাহাও যথার্থ স্বরূপই বলা হইয়াছে। ১

যেহেতু এই সুষুপ্তিসময়ে উক্ত অতিচ্ছন্দ অপহতপাপ্ম ও অভয়(সর্ব্বভয়রহিত) রূপটি পরিনিষ্পন্ন হয়, সেইহেতুই এই সময়ে পিতা-জনক অর্থাৎ পুত্রের প্রতি যে পিতৃত্ব সম্বন্ধ, পুত্রোৎপাদনরূপ কর্মই তাহার নিমিত্ত; সুষুপ্তি সময়ে সেই ক্রিয়ার সহিত সম্বন্ধ থাকে না; থাকে না বলিয়াই তখন পিতাও পুত্রত্ব সম্বন্ধের কারণীভূত জনকত্ব হইতে বিমুক্ত হন; এই কারণে তখন পিতাও অ-পিতা হন। একথা হইতে ইহাও বেশ বুঝা যাইতেছে যে, পিতার ন্যায় পুত্রও তখন পিতার অ-পুত্র হয় অর্থাৎ তাহারও পুত্রত্ব সম্বন্ধ তখন রহিত হইয়া যায়; কেন না, পিতা ও পুত্র উভয়ের সম্বন্ধই কর্মঘটিত; ‘অপহতপাপ্ম’ উক্তি হইতে পাওয়া যায় যে, সে সম্বন্ধ তখন তিরোহিত হইয়া যায়;[সুতরাং তখন পিতার প্রতি পুত্রের পুত্রত্বও থাকিতে পারে না]। এইরূপ মাতাও অ-মাতা হন, অর্থাৎ পুত্রের প্রতি মাতার মাতৃত্ব তখন রহিত হইয়া যায়; এইপ্রকার, কর্ম দ্বারা স্বর্গাদি যে সমস্ত লোক জয় করা হইয়াছে বা হইবে, সে সমুদয় কর্মের সহিতও সম্বন্ধ বিধ্বস্ত হওয়ায়, তখন ঐ সমস্ত স্বর্গাদি লোকও অ-লোক হয়; যে সমস্ত দেবতা কর্মের অঙ্গস্বরূপ, কর্মের সহিত সম্বন্ধ ধ্বংস হওয়ায়, সেই সমস্ত দেবতাও তখন দেবতা থাকেন না; এবং সাধ্য-সাধনসম্বন্ধ প্রতিপাদক সমস্ত বেদ অর্থাৎ অমুক কৰ্ম্ম দ্বারা অমুক ফল লাভ করা যায়, ইহা প্রতিপাদন করাই যাহাদের উদ্দেশ্য, সেই সমুদয় ব্রাহ্মণ ও মন্ত্র-কর্মাঙ্গ-সংবদ্ধ এই উভয়-

১১৩৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রকার বেদই কর্মসম্পাদনার্থ লোকের অধীত ও অধ্যেতব্য হইয়া থাকে; তখন সেই কৰ্ম্মসম্বন্ধ বিলুপ্ত হইয়া যায়, এই কারণে সে সময় বেদসমূহও অবেদে পরিণত হয়। ২

পুরুষ তখন যে, কেবল শুভকর্মের সম্বন্ধই অতিক্রম করে, তাহা নহে, পরন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ অশুভ কর্মের সম্বন্ধ হইতেও তখন বিনির্মুক্ত হইয়া থাকে। অতঃপর সেই কথাই বলা হইতেছে-এ সময়ে স্তেন অর্থাৎ ব্রাহ্মণের সুবর্ণাপহারী- যাহার দরুণ মহাপাতকী ‘স্তেন’ বলিয়া কথিত হয়, সেই চৌর্য্যজনিত পাপ হইতেও বিমুক্ত হয়। এখানে মহাপাতকী ভ্রূণহত্যাকারীর সহিত এক সঙ্গে পঠিত হইয়াছে বলিয়া ‘স্তেন’ শব্দে ব্রাহ্মণের সুবর্ণাপহারী বুঝিতে হইবে(১)। এইরূপ, এখানে ভ্রূণহত্যাকারীও অভ্রূণহা হয়। কেবল যে, ইহজন্মকৃত কৰ্ম্ম হইতেই বিমুক্ত হয়, তাহা নহে; পরন্তু অত্যন্ত নিকৃষ্ট যোনিতে জন্মের কারণীভূত স্বাভাবিক কৰ্ম্ম হইতেও নিৰ্ম্মুক্ত হইয়া থাকে।[ইহা জ্ঞাপনের জন্য বলিতেছেন-] এখানে চাণ্ডালও চাণ্ডাল থাকে না; শূদ্রকর্তৃক ব্রাহ্মণীর গর্ভে উৎপাদিত সন্তান চণ্ডালনামে প্রসিদ্ধ; চণ্ডাল ও চাণ্ডাল একই অর্থ। সেসময় চাণ্ডাল-জন্মপ্রাপক কর্মদ্বারা অসম্বদ্ধ হওয়ায়, সেই চাণ্ডালও চাণ্ডাল থাকে না। এইরূপ পৌল্কস-পুল্কস অর্থ শূদ্র হইতে ক্ষত্রিয়া- গর্ভে জাত সন্তান; সেই পুল্কসও তখন অ-পুল্কস হয়। এইরূপ আশ্রমসম্বদ্ধ যে সমুদয় কৰ্ম্ম আছে, সে সমুদয় কর্মের সহিতও যে, তখন তাহার অসম্বদ্ধভাব ঘটে, তাহা বলিতেছেন-তখন শ্রমণও অশ্রমণ হয়। শ্রমণ অর্থ পরিব্রাজক; যে কৰ্ম্মদ্বারা শ্রমণ হয়, সেই কৰ্ম্মসম্বন্ধরহিত হওয়ায় তখন সেই শ্রমণও অ-শ্রমণ হয়। এইরূপ তাপস -বানপ্রস্থও অতাপস হয়। যত রকম বর্ণাশ্রমাদি-বিভাগ আছে, তৎসমস্তেরই অভাব বুঝাইবার নিমিত্ত এখানে শ্রমণ ও তাপসের পৃথক্ উল্লেখ করা হইয়াছে।

অধিক কি, তখন শাস্ত্রবিহিত পুণ্য কৰ্ম্ম এবং বিহিতের অকরণ ও নিষিদ্ধের আচরণজনিত যে পাপ হয়, সে পাপেও লিপ্ত হয় না। এখানে ‘অনন্বাগতম্’ কথাটি ‘রূপের’ বিশেষণ; এইজন্য ক্লীবলিঙ্গ হইয়াছে; কারণ, এখানেও পূর্ব্বোক্ত

(১) তাৎপর্য্য—ভ্রূণহত্যাকারী মাত্রই মহাপাতকী নহে; পরন্তু ব্রাহ্মণ ভ্রূণহত্যাকারীই মহাপাতকীমধ্যে পরিগণিত হয়; অতএব ‘ভ্রূণহা’ শব্দেও এখানে ব্রহ্মহত্যাকারী বুঝিতে হইবে। মনু বলিয়াছেন—

“ব্রহ্মহত্যা সুরাপানং স্তেয়ং গুর্ব্বঙ্গনাগমঃ। মহান্তি পাতকান্যাহস্তৎসংসর্গশ্চ পঞ্চমঃ।” ভাষ্যকার এই অভিপ্রায়ে ‘স্তেন’ শব্দের ঐরূপ অর্থ করিয়াছেন।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩৯

‘অভয়ং রূপম্’ কথারই অনুবৃত্তি হইয়াছে। কেন যে পাপাদির সহিত সম্বন্ধ থাকে না, এখন তাহার কারণ নির্দেশ করিতেছেন-যেহেতু সুষুপ্ত পুরুষ সেই সময়ে হৃদয়গত সমস্ত শোক অতিক্রম করে, অর্থাৎ শোকবিমুক্ত হয়। এখানে শোক অর্থ-কামনা; অভিলষিত বিষয়বিষয়ে প্রার্থনাই(কামনাই) সেই বিষয়ের বিয়োগে শোকে পরিণত হইয়া থাকে; কেন না, প্রার্থিত বিষয়টি যদি লাভ করা না যায়, কিংবা লাভের পর বিনষ্ট হইয়া যায়, তখন সেই বিষয়ের উদ্দেশ্যে চিন্তাকুল হইয়া লোকে সন্তাপ অনুভব করিয়া থাকে; এইজন্যই শোক, রতি ও কাম, এই তিনটি সমানার্থক শব্দ। পূর্ব্বেও কথিত হইয়াছে যে, পুরুষ এ সময় কোন বিষয়ে কামনা করে না, এবং ‘অতিচ্ছন্দা’ হয়; সেই প্রস্তাবান্তর্গত এই ‘শোক’ শব্দও কামনাবোধক হওয়াই উচিত। কামনাই কর্মের হেতু অর্থাৎ কৰ্ম্মে প্রবৃত্তির কারণ; পরেও বলিবেন-‘সেই পুরুষ যেরূপ কামনাসম্পন্ন হয়, সেই- রূপই সঙ্কল্প করিয়া থাকে, সেই কর্মেরই অনুষ্ঠান করে’ ইতি। যেহেতু পুরুষ এ সময়ে সমস্ত কামনার অতীত হয়, সেইহেতু-সর্ব্বপ্রকার কামনা উত্তীর্ণ হওয়ায় ‘অনস্বাগতৎ পুণ্যেন’ কথা বলা যুক্তিযুক্তই হইয়াছে। ৪

‘হৃদয়স্য’ ইতি; হৃদয় অর্থ-পদ্মাকার মাংসপিণ্ড; অন্তঃকরণ বুদ্ধি সেই হৃদয়-পদ্মের মধ্যে অবস্থান করে; এই জন্য-মঞ্চস্থ লোকে শব্দ করিলে যেমন ‘মঞ্চ শব্দ করিতেছে’ বলা হইয়া থাকে, তেমনি হৃৎপদ্ম-মধ্যগত বুদ্ধিকেও হৃদয় বলা হইয়া থাকে। ‘কাম, সংকল্প ও সংশয় ইত্যাদি সমস্তই মনের ধর্ম’ এই শ্রুতিবাক্য হইতেও জানা যায় যে, হৃদয়ের যে সমস্ত শোক, সে সমস্ত বুদ্ধিরই ধৰ্ম্ম। ইহার পরেও বলিবেন-‘ইহার হৃদয়াশ্রিত যে সমস্ত কাম’ ইতি। শোক আত্মাশ্রিত-আত্মার ধৰ্ম্ম, এইরূপ ভ্রম হইতে পারে, সেই ভ্রম নিরাসের জন্য এখানে ‘হৃদি শ্রিতাঃ’ ও ‘হৃদয়স্য শোকাঃ’ বলা হইয়াছে। পূর্ব্বোক্ত ‘মৃত্যুর রূপসমূহ অতিক্রম করে’ এই বাক্য হইতে জানা যায় যে, সুষুপ্তি সময়ে পুরুষ জ্ঞান-সাধন হৃদয়ের সহিত সম্বন্ধরহিত হয়; জ্ঞান-সাধন সেই হৃদয়ের সম্বন্ধ অতিক্রম করায় হৃদয়াশ্রিত কাম-সম্বন্ধও যে, অতিক্রম করে, এ কথা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত হইতেছে। ৫

কিন্তু, যে সমস্ত বাদী বলিয়া থাকেন—হৃদয়াশ্রিত কামনা ও বাসনাসমূহ বুদ্ধির সহিত সম্বন্ধ প্রাপ্ত আত্মায় যাইয়া সম্মিলিত হয়; পুটপাক তৈলে যেমন পুষ্পের অভাবেও পুষ্পগন্ধ থাকিয়া যায়, তেমনি হৃদয়ের ধ্বংস হইলেও তৎসংসৃষ্ট আত্মায় বুদ্ধির ধর্ম্ম কামনা ও তাহার সংস্কাররাশি বিদ্যমান থাকে। তাহাদের

১১৪০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মতে ‘কাম সঙ্কল্প[ইত্যাদি মনের ধর্ম]’, ‘রূপসমূহ হৃদয়েই থাকে’ এবং ‘হৃদয়ের শোক’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যগুলিরও নিশ্চয়ই আনর্থক্য হইয়া পড়ে। যদি বল, হৃদয়ের সাহায্যে উৎপন্ন হয় বলিয়া[কামাদিকে হৃদয়ের ধৰ্ম্ম বলা হইয়াছে]; না—সে কথাও বলিতে পার না; কেন না, ‘হৃদি শ্রিতাঃ’ শ্রুতিতে ঐ কথাটি আরও স্পষ্ট করিয়া বলা আছে। হৃদয় যদি কামাদির আশ্রয় না হইয়া কেবল করণই অর্থাৎ কামাদি উৎপত্তির কেবলই দ্বার মাত্র হইত, তাহা হইলে, ‘হৃদি শ্রিতাঃ’(হৃদয়ে অবস্থিত), এবং ‘হৃদয়েই সমস্ত রূপ বিদ্যমান থাকে’ এসমস্ত কথা সঙ্গত হইত না; পক্ষান্তরে, এখানে আত্মশুদ্ধি প্রতিপাদন করাই যখন শ্রুতির অভিপ্রেত, তখন কামাদিকে হৃদয়গত বলিয়া প্রতিপাদন করাই যুক্তি- যুক্ত হয়; কারণ, ‘যেন ধ্যানই করিতেছে, যেন স্পন্দনই করিতেছে’ এই স্পষ্টার্থক শ্রুতির অন্যপ্রকার অর্থ করা কখনই সম্ভবপর হয় না। ৬

ভাল কথা, এখানে ‘হৃদয়াশ্রিত যে সমুদয় কাম’ এইরূপ বিশেষোক্তি হইতে বেশ বুঝা যাইতেছে যে, আত্মাশ্রিতও কতকগুলি কামনা আছে? না, সেরূপ আশঙ্কা হইতে পারে না; কারণ, এখানে অন্য কোনও আশ্রয়কে লক্ষ্য করিয়া উক্ত বিশেষণ প্রযুক্ত হইয়াছে;[অভিপ্রায় এই যে,] যে সমুদয় কামনা হৃদয়ে প্রাদুর্ভূত হয় নাই, ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত রহিয়াছে, এবং যে সমুদয় কামনা প্রাদুর্ভূত হইবার পর, প্রতিকূল ভাবনার দ্বারা নিবৃত্ত হইয়া গিয়াছে, সে সমুদয় বাসনাও নিশ্চয়ই এক সময়ে হৃদয়াশ্রিত ছিল; এই কারণে এখনও সেগুলির হৃদয়ে সম্ভাবনা হইতে পারে, সেই সমুদয় সম্ভাবিত কামনাকে অপেক্ষা করিয়া —যে সমস্ত কামনা হৃদয়ে প্রাদুর্ভূত হইয়া বিষয়বিশেষে বর্তমান আছে, ‘সেই সমুদয় কামনা হইতে বিমুক্ত হয়’, এইরূপ বিশেষ বচন যুক্তিযুক্তই হইয়াছে। ৭

যদি বল, তথাপি বিশেষণের—‘হৃদয়ের শোক’ এইরূপ বিশেষোক্তির ত কিছুমাত্র প্রয়োজন দেখা যায় না? না—সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, প্রথমতঃ ঐ সমস্ত কামনার পরিত্যাগে যত্নাধিক্য প্রদর্শন করা ইহার একটি প্রয়োজন; দ্বিতীয়তঃ শাস্ত্রে ঐরূপ উপদেশ না থাকিলে, একটা অনিষ্টকর কল্পনাও হইতে পারিত—কামনাসমূহকে আত্মার ধর্ম্ম বলিয়াও কেহ কেহ মনে করিতে পারিত; অথচ তাহা শ্রুতির অভিপ্রেত নহে; ঐরূপ বিশেষ বচনে সেই আশঙ্কা নিবারিত হইয়াছে। বলিতে পার যে, ‘ন কৎচন কামং কাময়তে’ (কোন কাম্য বিষয়েই কামনা করে না,) এই বাক্যে আত্মাতে কামনার নিষেধ

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৬১

থাকায়, কামনাসমূহের আত্মাশ্রিতত্ব ত শ্রুতই হইয়াছে;[সুতরাং অশ্রুত বলিতেছ কিরূপে?] না—এরূপ আশঙ্কা করিতে পার না; ‘সধীঃ স্বপ্নো ভূত্বা’ (বুদ্ধির সহযোগে স্বপ্নাবস্থা লাভ করিয়া,) এই বাক্যে প্রতিপাদিত হইয়াছে যে, আত্মার যে কামাশ্রয়ত্ব, বুদ্ধি-সম্বন্ধই তাহার একমাত্র কারণ। বিশেষতঃ অন্যত্র আত্মাকে অসঙ্গ বলিয়াও নির্দেশ করা হইয়াছে; আত্মা যদি যথার্থই কামনার আশ্রয় হইত, তাহা হইলে আত্মাকে অসঙ্গ বলিয়া প্রতিপাদন করা কখনই যুক্তি- যুক্ত হইত না; কেন না, সঙ্গ আর কাম যে, একই পদার্থ, এ কথা আমরা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। যদি বল, ‘আত্মকামঃ’ শ্রুতি হইতে আত্মার স্ববিষয়ে কামনার সদ্ভাব পাওয়া গিয়াছে; না—তাহাও পাওয়া যায় নাই; নিজের অতিরিক্ত বিষয়ে কামনা নিষেধ করাই ঐ শ্রুতির অভিপ্রেত অর্থ, কিন্তু আত্ম-বিষয়ে কামনার সদ্ভাব প্রতিপাদন করা উহার অর্থ নহে। ৮

যদি বল, বৈশেষিকাদি দর্শনশাস্ত্রে ত আত্মাকেই কামাদি ধর্ম্মের আশ্রয় বলিয়া প্রতিপাদন করা হইয়াছে; না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, “হৃদি শ্রিতাঃ” ইত্যাদি স্পষ্টার্থক শ্রুতিবিরুদ্ধ বলিয়া বৈশেষিকাদি শাস্ত্রোক্ত ঐ সমস্ত যুক্তি উপেক্ষণীয়; কারণ, শ্রুতিবিরুদ্ধ যুক্তিকে অসদযুক্তি বলিয়া স্বীকার করা হইয়া থাকে(১)। বিশেষতঃ শ্রুতির ‘স্বয়ংজ্যোতিষ্ট’ বচনও ঐরূপ যুক্তির অনাদরণীয়তার পক্ষে অপর কারণ, অর্থাৎ ঐরূপ যুক্তিকে যদি প্রমাণ বলিয়া গ্রহণ করা যায়, তাহা হইলে, শ্রুতি স্বপ্নাবস্থায় আত্মাকে যে, স্বয়ং- জ্যোতিঃস্বরূপ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন, এবং কামাদি ধর্মগুলিকেও যে, কেবল চৈতন্যমাত্রাবলম্বী বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন, সে কথারও ব্যাঘাত হইয়া পড়ে; কারণ, কামাদি যদি আত্মসমবেত—আত্মার স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম হয়, তাহা হইলে, সেই কামাদিকে শুদ্ধ চৈতন্যমাত্রাবলম্বী বলিয়া নির্দেশ করা যুক্তিসঙ্গত হইতে পারে না। চক্ষুরিন্দ্রিয়গত বিশেষ গুণ ইহার দৃষ্টান্ত। দৃশ্যমাত্রই দ্রষ্টা

(১) তাৎপয্য—মীমাংসকগণ বলিয়া থাকেন যে, ‘নিরপেক্ষো রবঃ শ্রুতিঃ’ অর্থাৎ শ্রুতিবাক্য নিজের প্রামাণ্য স্থাপনের জন্য অপর কোনও প্রমাণের অপেক্ষা করে না; সুতরাং উহা স্বতঃ প্রমাণ; আর যুক্তি যতই সুদৃঢ় হউক না কেন, অগ্রে তাহার পরীক্ষা করা আবশ্যক হয়—উহা সত্য কি না; সুতরাং কোন যুক্তিই স্বতঃ প্রমাণ নহে; কাজেই স্বতঃ প্রমাণ শ্রুতির বিরুদ্ধে উপস্থাপিত যুক্তি মাত্রই দুর্ব্বল, দুর্ব্বল ত কখনই প্রবলের বাধা ঘটাইতে পারে না। বিশেষতঃ ঐরূপ যুক্তির ভ্রম প্রদর্শন করাও অসম্ভব নহে; অতএব উহা ঠিক যুক্তি নহে— যুক্ত্যাভাস—দেখিতে যুক্তির মত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উহা যুক্তি নহে।

১১৪২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

হইতে স্বতন্ত্র পদার্থ; এই যুক্তি দ্বারা স্বপ্নসময়ে দ্রষ্টার(আত্মার) স্বয়ংজ্যোতিঃ- স্বরূপত্ব সমর্থন করা হইয়াছে; আত্মাকে কামাদি ধর্ম্মের আশ্রয় বলিয়া স্বীকার করিলে শ্রুতির ঐ সমস্ত কথা বাধিত হইয়া পড়ে। ৯

সমস্ত শাস্ত্রার্থের সহিত বিরোধ সম্ভাবনাও এপক্ষে অপর যুক্তি—আত্মাকে পরমাত্মার একদেশ ও কামাদির আশ্রয় বলিয়া কল্পনা করিলে, অসঙ্গত্বাদি বোধক সমস্ত শাস্ত্রের অর্থ বাধিত হইবার সম্ভাবনা হয়; একথা আমরা ইতঃ- পূর্ব্বেই বিস্তৃতভাবে প্রতিপাদন করিয়াছি; এখন বিশেষ যত্নসহকারে আত্মার কামাদি-ধর্ম-সম্বন্ধ প্রতিষেধ করা আবশ্যক হইয়াছে; কারণ, তাহা না হইলে জীব যে, পরমাত্মার সহিত অভিন্ন, ইহা সিদ্ধ হয় না; অধিকন্তু আত্মাকে পরমাত্মার একদেশ ও কামাদি ধর্মবিশিষ্ট বলিয়া কল্পনা করিলে, শাস্ত্রের অভিপ্রেত অর্থই বাধিত হইবার সম্ভব হয়। নৈয়ায়িক ও বৈশেষিকগণ যেমন, ইচ্ছা যত্ন প্রভৃতি ধর্মগুলিকে আত্মার ধর্ম বলিয়া কল্পনা করায় উপনিষৎ-শাস্ত্রের মুখ্যার্থের সহিত একমত হন না, তেমনি ভর্তৃপ্রপঞ্চের এই কল্পনাও উপনিষৎ-শাস্ত্রের অভিপ্রেত অর্থের বাধা ঘটায় বলিয়া কখনই আদরণীয় হইতে পারে না।(১) ॥২৭৪৷২২

আভাসভাষ্যম্:-স্ত্রীপুংসয়োরিবৈকত্বাৎ ন পশ্যতীত্যুক্তম্; স্বয়ং- জ্যোতিরিতি চ। স্বয়ংজ্যোতিষ্টং নাম চৈতন্যাত্মস্বভাবতা; যদি হি অগ্ন্যুষ্ণত্বাদি- বৎ চৈতন্যাত্মস্বভাব আত্মা, স কথমেকত্বেহপি হি স্বভাবৎ জহ্যাৎ-ন জানায়াৎ? অথ ন জহাতি; কথমিহ সুযুপ্তে ন পশ্যতি? বিপ্রতিষিদ্ধমেতৎ-চৈতন্যম্ আত্ম- স্বভাবঃ, ন জানাতি চেতি। ন বিপ্রতিষিদ্ধম্, উভয়মপ্যেতদুপপদ্যত এব। কথম্?-

আভাসভাষ্যানুবাদ।—পূর্ব্ব প্রকরণে কথিত হইয়াছে যে, সমা- লিঙ্গিত স্ত্রী-পুরুষের ন্যায় একত্ব ঘটে বলিয়াই, জীব কিছুমাত্র জানিতে পারে না, এবং সে সময় আত্মা স্বয়ংজ্যোতিঃস্বরূপে প্রকাশিত থাকে। স্বয়ংজ্যোতিষ্ট অর্থ— চৈতন্যস্বভাবত্ব। এখন জিজ্ঞাস্য এই যে, চৈতন্যই যদি আত্মার স্বভাব হয়, তাহা হইলে, পরমাত্মার সহিত একত্ব হইলেই বা, সে নিজের স্বভাব পরিত্যাগ

(১) তাৎপর্য্য—ন্যায় ও বৈশেষিকমতে জীবাত্মা ও পরমাত্মা সম্পূর্ণ পৃথক্। পরমাত্মারও কতকগুলি গুণ আছে, এবং জীবাত্মারও কতকগুলি গুণ আছে; তাহার নির্দেশ এইরূপ—

“বুদ্ধ্যাদি যট্কং সংখ্যাদিপঞ্চকং ভাবনা তথা। ধর্ম্মাধর্ম্মৌ গুণা এতে আত্মনঃ স্যশ্চতুর্দ্দশ।” অর্থাৎ বুদ্ধি, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ, যত্ন, সংখ্যা, পরিমাণ, পার্থক্য, সংযোগ, বিভাগ, ভাবনা- নামক সংস্কার, ধর্ম ও অধৰ্ম্ম—এই চতুর্দ্দশটী গুণ আত্মার ধর্ম।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৪৩

করিবে কিরূপে? এবং সে সময়ে কিছু জানিতেই বা পারে না কেন? যদি নিশ্চয়ই স্বভাব ত্যাগ না করে, তাহা হইলে সুষুপ্তি সময়ে দেখিতে পায় না কেন? অতএব চৈতন্য আত্মার স্বভাব, অথচ সে সময়ে আত্মা কিছুই জানিতে পারে না, একথা যুক্তিবিরুদ্ধ। না—ইহা বিরুদ্ধ হয় না, এই উভয় কথাই উপপন্ন হয়; কিরূপে?[শ্রুতি তাহা বলিতেছেন—]।

যদ্বৈ তন্ন পশ্যতি পশ্যন্ বৈ তন্ন পশ্যতি, নহি দ্রষ্টুদৃষ্টে- বিপরিলোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ। ন তু তদ্বিতীয়মস্তি ততোহন্যদ্বিভক্তং যৎ পশ্যেৎ ॥২৭৫৷২৩৷৷

সরলার্থঃ।—তৎ(তত্র সুষুপ্তৌ) যৎবৈন পশ্যতি(ন জানাতি) [আত্মা],[বস্তুতঃ] তৎ পশ্যন্ বৈ(জানন্—এব) ন পশ্যতি;[কুতঃ?] অবি- নাশিত্বাৎ(ধ্বংসরহিতত্বাৎ হেতোঃ); দ্রষ্টুঃ(পুরুষস্য) দৃষ্টেঃ(জ্ঞানস্য) বিপরি- লোপঃ(সম্যক্ অভাবঃ) নহি(নৈব) বিদ্যতে(নিত্যস্য আত্মজ্যোতিষঃ কদাচি- দপি অভাবো ন ভবতীত্যাশয়ঃ)।[তর্হি কথং ন পশ্যতি, তত্রাহ—] তু(কিন্তু) তৎ(তদা সুষুপ্তৌ) ততঃ(সুযুপ্তাৎ পুরুষাৎ) বিভক্তং(পৃথগ্‌ভূতং) অন্যৎ দ্বিতীয়ং ন অস্তি, যৎ পশ্যেৎ(জানীয়াৎ);[তদানীং দর্শনীয়-দ্বৈতাভাবাৎ ন পশ্যতীতি ভাবঃ] ॥২৭৫৷৷২৩৷৷

মূলানুবাদ?—সুষুপ্তি সময়ে জীব যে দর্শন করে না,[বুঝিতে হইবে,] দেখিয়াও দেখে না; দ্রষ্টার(জীবের) দৃষ্টি বা জ্ঞানস্বভাব অবিনাশী অর্থাৎ ধ্বংসরহিত; সুতরাং কখনও তাহার সম্পূর্ণ অভাব হয় না; পরন্তু, যাহা দর্শন করিবে, এরূপ অতিরিক্ত দ্বিতীয় কোন বস্তু থাকে না।[অতএব সে সময়ে দর্শন-ব্যবহার থাকে না বলিয়াই যে, তাহার চৈতন্যস্বভাব বিলুপ্ত হয়, তাহা মনে করিতে পারা যায় না]॥২৭৫॥ ২৩।

শাঙ্করভাষ্যম্।—যদ্বৈ সুষুপ্তে তৎ ন পশ্যতি, পশ্যন্ বৈ তৎ তত্র পশ্যন্নেব ন পশ্যতি, যৎ তত্র সুষুপ্তে ন পশ্যতীতি জানীষে, তন্ন তথা গৃহ্নীয়াঃ। কস্মাৎ? পশ্যন্ বৈ ভবতি তত্র। ১

টীকা। যদ্বৈ তৎ ন পণ্যতীত্যাদেঃ সম্বন্ধং বক্তুং বৃত্তং কীর্তয়তি-স্ত্রীপুংসয়োরিতি। চকারাদুক্তং স্বয়ংজ্যোতিষ্টুমিতি সম্বধ্যতে। কিমিদং স্বরংজ্যোতিষ্টুমিতি, তদাহ-স্বয়ং- জ্যোতিষ্টং নামেতি। এবং বৃত্তমমুদ্যোত্তরবাক্যব্যাবর্ত্যাং শঙ্কামাহ-যদীত্যাদিনা। স্বভাব-

১১৪৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ত্যাগমেবাভিনয়তি-ন জানীয়াদিতি। তৎত্যাগাভাবে সুষুপ্তে বিশেষবিজ্ঞানরাহিত্যমযুক্ত- মিত্যাহ-অথেত্যাদিনা। আত্মা চিদ্রূপোৎপি সুষুপ্তে বিশেষং ন জানাতি চেৎ, কিং দুষ্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ-বিপ্রতিষিদ্ধমিতি। পরিহরতি-নেতি। উভয়ং চৈতন্যস্বভাবত্বং বিশেষ- বিজ্ঞানরাহিত্যং চেত্যর্থঃ। উভয়স্বীকারে শঙ্কিতং বিপ্রতিষেধমাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকং শ্রুত্যা নিরা- করোতি-কথমিত্যাদিনা। যদ্বৈ তদিত্যাদিবাক্যং চোদিতার্থানুবাদস্তৎপরিহারস্তু পশ্যন্ ইত্যাদিবাক্যমিতি বিভজতে-যৎ তত্রেতি। ১

নন্বেবং ন পশ্যতীতি সুষুপ্তে জানীমঃ, যতো ন চক্ষুর্ব্বা মনো বা দর্শনে করণং ব্যাপৃতমস্তি; ব্যাপৃতেষু হি দর্শনশ্রবণাদিযু পশ্যতীতি ব্যবহারো ভবতি, শূণো- তীতি বা। ন চ ব্যাপৃতানি করণানি পশ্যামঃ; তস্মান্ন পশ্যত্যেবায়ম্। ন হি; কিন্তুহি? পশ্যন্নেব ভবতি; কথম্? ন হি যস্মাৎ দ্রষ্টুঃ দৃষ্টিকর্ত্তুঃ, যা দৃষ্টিঃ, তস্যা দৃষ্টৈর্বিপরিলোপঃ বিনাশঃ, স ন বিদ্যতে; যথা অগ্নেরৌষ্ণ্যং যাবদগ্নিভাবি, তথা অয়ং চাত্মা দ্রষ্টা অবিনাশী, অতঃ অবিনাশিত্বাদাত্মনো দৃষ্টিরপি অবিনাশিনী, যাবদ্রষ্টুভাবিনী হি সা। ২

ন হীত্যাদিবাক্যনিরস্যামাশঙ্কামাহ-নন্বিতি। চক্ষুরাদিব্যাপারাভাবেহপি সুষুপ্তে দর্শনাদি কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ব্যাপৃতেধিতি। অস্তু তর্হি তত্রাপি করণব্যাপারঃ, নেত্যাহ-ন চেতি। অয়মিতি সুযুপ্তপুরুষোক্তিঃ। ন পশ্নত্যেবেতি নিয়মং নিষেধতি-ন হীতি। তত্র হেতুং বক্তুং প্রশ্নপূর্ব্বকং প্রতিজ্ঞাং প্রস্তৌতি-কিং তহীতি। তত্রাকাঙ্ক্ষাপূর্বকং হেতুবাক্য- মুখাপ্য ব্যাচষ্টে-কথমিত্যাদিনা। অবিনাশিত্বাদিত্যেতহ্যাকুর্ব্বন্ দৃষ্টের্বিনাশাভাবং স্পষ্টয়তি -যথেত্যাদিনা। ২

ননু বিপ্রতিষিদ্ধমিদমভিধীয়তে—দ্রষ্টুঃ সা দৃষ্টিঃ, ন বিপরিলুপ্যতে ইতি চ; দৃষ্টিশ্চ দ্রষ্ট্রা ক্রিয়তে; দৃষ্টিকর্তৃত্বাদ্বি দ্রষ্টেত্যুচ্যতে; ক্রিয়মাণা চ দ্রষ্ট্রা দৃষ্টির্ন বিপরি- লুপ্যত ইতি চ অশক্যং বক্তুম্। ননু ন বিপরিলুপ্যতে ইতি বচনাদবিনাশিনী স্যাৎ, ন, বচনস্য জ্ঞাপকত্বাৎ; ন হি ন্যায়প্রাপ্তো বিনাশঃ কৃতকস্য বচনশতেনাপি বারয়িতুৎ শক্যতে, বচনস্য যথাপ্রাপ্তার্থজ্ঞাপকত্বাৎ। ৩

দ্রষ্টু দৃষ্টির্ন নশ্যতীত্যত্র বিরোধং চোদয়তি-নম্বিতি। বিপ্রতিষেধমেব সাধয়তি- দৃষ্টিশ্চেতি। কার্য্যস্যাপি বচনাদবিনাশঃ স্যাদিতি শঙ্কতে-নম্বিতি। তস্যাকারকত্বান্ নৈবমিতি পরিহরতি-ন বচনস্যেতি। তদেব স্ফুটয়তি-ন হীতি। যৎ কৃতকং তদনিত্যমিতি ব্যাপ্ত্যনু- গৃহীতানুমানবিরোধাদ্ বচো ন কার্য্যনিত্যত্ববোধকমিত্যর্থঃ। ৩

নৈষ দোষঃ, আদিত্যাদিপ্রকাশকত্ববৎ দর্শনোপপত্তেঃ; যথা আদিত্যাদয়ো নিত্যপ্রকাশস্বভাবা এব সন্তঃ স্বাভাবিকেন নিত্যেনৈব প্রকাশেন প্রকাশয়ন্তি; ন হি অপ্রকাশাত্মনঃ সন্তঃ প্রকাশৎ কুর্ব্বন্তঃ প্রকাশয়ন্তীত্যুচ্যন্তে; কিং তর্হি?

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৫

স্বভাবেনৈব নিত্যেন প্রকাশেন। তথায়মপি আত্মা অবিপরিলুপ্তস্বভাবয়া দৃষ্ট্যা নিত্যয়া দ্রষ্টেত্যুচতে। গৌণং তর্হি দ্রষ্টত্বম্? ন, এবমেব মুখ্যত্বোপপত্তেঃ; যদি হি অন্যথাপ্যাত্মনো দ্রষ্টৃত্বং দৃষ্টম্, তদাস্য দ্রষ্টৃত্বস্য গৌণত্বম্; ন তু আত্মনোহন্যো দর্শনপ্রকারোহস্তি; তদেবমেব মুখ্যং দ্রষ্টৃত্বমুপপদ্যতে, নান্যথা—যথা আদিত্যা- দীনাং প্রকাশয়িতৃত্বং নিত্যেনৈব স্বাভাবিকেনাক্রিয়মাণেন প্রকাশেন, তদেব চ প্রকাশয়িতৃত্বং মুখ্যং, প্রকাশয়িতৃত্বান্তরানুপপত্তেঃ। তস্মান্ন দ্রষ্টৃদৃষ্টিবিপরিল্যুপ্যত- ইতি—ন বিপ্রতিষেধগন্ধোহপ্যন্তি। ৪

কুটস্থদৃষ্টিরেবাত্র দ্রষ্ট শব্দার্থো ন দৃষ্টিকর্তা, তৎ ন বিপ্রতিষেধোহস্তীতি সিদ্ধান্তয়তি-নৈয দোষ ইতি। আদিত্যাদিপ্রকাশকত্ববদিত্যুক্তং দৃষ্টান্তং ব্যাচষ্টে-তথেতি। দৃষ্টান্তেইপি বিপ্রতিপন্নং প্রত্যাহ-ন হীতি। দর্শনোপপত্তেরিত্যুক্তং দাষ্টান্তিকং বিভজতে-তথেতি। আত্মনো নিত্যদৃষ্টিত্বে দোষমাশঙ্কতে-গৌণমিতি। গৌণস্য মুখ্যাপেক্ষত্বাৎ, মুখ্যস্ত চান্যঙ্গ দ্রষ্ট ত্বস্যাভাবাম্বৈবমিত্যুত্তরমাহ-নেত্যাদিনা। তামেবোপপত্তিমুপদর্শয়তি-যদি হীত্যাদিনা। অন্যথা কূটস্থদৃষ্টিত্বমস্তরেণেতি যাবৎ। দর্শনপ্রকারস্তান্যত্বং ক্রিয়াত্মত্বম্। তস্য নিষ্ক্রিয়ত্বশ্রুতি- স্মৃতিবিরোধাদিতি শেষঃ। দ্রষ্টত্বান্তরানুপপত্তৌ ফলিতমাহ-তদেবমেবেতি। নিত্যদৃষ্টিত্বে- নৈবেতার্থঃ। উক্তেহর্থে দৃষ্টান্তমাহ-যথেত্যাদিনা। তথাত্মনোহপি দ্রষ্টত্বং নিত্যেনৈব স্বাভাবিবেন চৈতন্যজ্যোতিষা সিধ্যতি, তদেব চ দ্রষ্টত্বং মুখ্যং দ্রষ্টত্বান্তরানুপপত্তেরিতি শেষঃ। আত্মনো নিত্যদৃষ্টস্বভাবত্বে ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। ৪

ননু অনিত্যক্রিয়াকর্তৃবিষয় এব তৃচ প্রত্যয়ান্তস্য শব্দস্য প্রয়োগো দৃষ্টঃ—যথা ছেত্তা ভেত্তা গন্তেতি, তথা দ্রষ্টেত্যত্রাপীতি চেৎ; ন, প্রকাশয়িতেতি দৃষ্টত্বাৎ। ভবতু প্রকাশকেষু, অন্যথা অসম্ভবাৎ, ন ত্বাত্মনীতি চেৎ? ন, দৃষ্ট্যবিপরিলোপ- শ্রুতেঃ। পশ্যামীত্যনুভবদর্শনাৎ নেতি চেৎ? ন, করণব্যাপারবিশেষাপেক্ষত্বাৎ; উদ্ধৃত-চক্ষুষাঞ্চ স্বপ্নে আত্মদৃষ্টেরবিপরিলোপদর্শনাৎ; তস্মাদবিপরিলুপ্তস্বভাবৈবা- ত্মনো দৃষ্টিঃ; অতস্তয়া অবিপরিলুপ্তয়া দৃষ্ট্যা স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাবয়া পশ্যন্নেব ভবতি সুষুপ্তে। ৫

তৃজন্তং দ্রষ্টুশব্দমাশ্রিত্য শঙ্কতে-নন্বিতি। অত্রাপ্যনিত্যক্রিয়াকর্তৃবিষয়স্তুজন্ত-শব্দপ্রয়োগ- ইতি শেষঃ। তৃজন্তশব্দপ্রয়োগস্যানিত্যক্রিয়াকর্ভবিষয়ত্বং ব্যভিচারয়ন্নুত্তরমাহ-নেতি। বৈষম্য- মাশঙ্কতে-ভবত্বিতি। আদিত্বাদিষু স্বাভাবিকপ্রকাশেন প্রকাশরিতৃত্বমস্ত, কাদাচিৎকপ্রকাশেন প্রকাশরিতৃত্বস্য তেষসন্তবাৎ, ন ত্বাত্মনি নিত্যা দৃষ্টিরস্তি, তন্মানাভাবাৎ। তথা চ কাদাচিৎক- দৃষ্ট্যৈব তস্য দ্রষ্টুতেত্যর্থঃ। প্রতীচশ্চিদ্রূপত্বস্থ্য শ্রৌতত্বাৎ কর্তৃত্বং বিনা প্রকাশয়িতৃত্বমবিশিষ্ট- মিত্যুত্তরমাহ-ন দৃষ্টীতি। কূটস্থদৃষ্টিরাত্মেত্যুক্তে প্রত্যক্ষবিরোধং শঙ্কতে-পশ্যামীতি। দ্বিবিধোহনুভবস্তন্য কুটস্থদৃষ্টিত্বমনুগৃহ্লাতি, চক্ষুরাদিব্যাপার-ভাবাভাবাপেক্ষয়া পশ্যামি ন পশ্যামীতি

১১৪৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ধিয়োরাত্মসাক্ষিকত্বাদিত্যুত্তরমাহ-ন করণেতি। আত্মদৃষ্টেনিত্যত্বে হেত্বন্তরমাহ-উদ্ধৃতেতি। আত্মদৃষ্টেনিত্যত্বমুপসংহরতি-তস্মাদিতি। তন্নিত্যত্ব্যেক্তিফলমাহ-অত ইতি। ৫

কথং তর্হি ন পশ্যতীতি? উচ্যতে,-ন তু তদন্তি; কিংতৎ? দ্বিতীয়ং বিষয়- ভূতম্; কিংবিশিষ্টম্? ততঃ দ্রষ্টুঃ অন্যৎ অন্যত্বেন বিভক্তং, যৎ পশ্যেৎ যদু- পলভেত। যদ্ধি তদ্বিশেষদর্শনকারণমন্তঃকরণং চক্ষুঃ রূপং চ, তদবিদ্যয়া অন্যত্বেন প্রত্যুপস্থাপিতমাসীৎ; তদ্ এতস্মিন্ কালে একীভূতম্, আত্মনঃ পরেণ পরি- ঘঙ্গাৎ; দ্রষ্টুর্হি পরিচ্ছিন্নস্য বিশেষদর্শনায় করণমন্যত্বেন ব্যবতিষ্ঠতে, অয়ন্তু স্বেন সর্বাত্মনা সম্পরিষক্তঃ-স্বেন পরেণ প্রাজ্ঞেনাত্মনা প্রিয়য়েব পুরুষঃ; তেন ন পৃথক্ত্রেন ব্যবস্থিতানি করণানি বিষয়াশ্চ। তদভাবাদ্বিশেষদর্শনং নাস্তি; করণা- দিকৃতং হি তৎ, ন আত্মকৃতম্; আত্মকৃতমিব প্রত্যবভাসতে। তস্মাত্তৎ-কৃতেয়ৎ ভ্রান্তিঃ আত্মনো দৃষ্টিঃ পরিলুপ্যত ইতি ॥ ২৭৫ ॥ ২৩ ॥

বাক্যান্তরমাকাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-কথমিত্যাদিনা। দ্বিতীয়াদিপদানাং পৌনরুক্ত্য- মাশঙ্ক্যার্থভেদং দর্শয়তি-যদ্ধীত্যাদিনা। সাভাসমন্তঃকরণং যৎ পণ্যেদিতি বিশেষদর্শনকারণং প্রমাতৃ, দ্বিতীয়ং তস্মাদন্যচ্চক্ষুরাদি প্রমাণং, রূপাদি চ প্রমেয়ং বিভক্তং, তৎ সর্ব্বং জাগ্রৎস্বপ্নয়ো- রবিদ্যাপ্রতিপন্নং সুষুপ্তিকালে কারণমাত্রতাং গতমভিব্যক্তং নাস্তীত্যর্থঃ। সুসুপ্তে দ্বিতীয়ং প্রমাতৃরূপং নাস্তাত্যেতদুপপাদয়তি-আত্মন ইতি। প্রমাতৃরূপং পৃথনাস্তীতি শেষঃ। তথাপি করণব্যাপারকৃতং বিষয়দর্শনমাত্মন: স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-দ্রষ্টুরিতি। সুযুপ্তস্যাপি পরিচ্ছিন্নত্বমাশঙ্ক্যাহ-অয়ং ত্বিতি। তস্য পরেণৈকীভাবফলমাহ-তেনেতি। বিষয়েন্দ্রিয়া- ভাবকৃতং ফলমাহ-তদভাবাদিতি। কিমিতি বিষয়াদ্যভাবাদিশেষদর্শনং নিষিদ্ধতে, সত্ত্বমেব তস্যাত্মসত্ত্বাধীনং কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-করণাদীতি। নম্ববস্থান্বয়ে বিশেষদর্শনমাত্মকৃতং প্রতিভাতি, তস্য প্রধানত্বাদত আহ-আত্মকৃতমিবেতি। নন্বিত্যাদেস্তাৎপর্য্যমুপসংহরতি- তস্মাদিতি। প্রমাতৃকরণবিষয়কৃতত্বাদ্বিশেষদৃষ্টেন্তেষাং চ সুযুপ্তাবভাবাৎ তৎকাৰ্য্যায়া বিশেষ- দৃষ্টেরপি তত্রাভাবাদিতি যাবৎ। তৎকৃতা জাগরাদাবাত্মকৃতত্বেন ভ্রান্তিপ্রতিপন্নবিশেষদর্শনা- ভাবপ্রযুক্তেত্যর্থঃ। ২৭৫। ২৩॥

ভাষ্যানুবাদ।—সুষুপ্তি সময়ে পুরুষ যে, দেখে না;[বুঝিতে হইবে], সে সময়ে দেখিয়াই দেখে না। অভিপ্রায় এই যে, আত্মা সুষুপ্তিসময়ে যে, দেখে না বলিয়া মনে করিতেছ, তাহা সেরূপ বুঝিও না; কারণ? যেহেতু আত্মা সে সময়েও দ্রষ্টাই থাকে। ১।

ভাল, যেহেতু সুষুপ্তিসময়ে দর্শনসাধন চক্ষুঃ কিংবা মনের কোনও ব্যাপার থাকে না, সেই হেতুই আমরা বুঝিতেছি যে, সুষুপ্তিকালে নিশ্চয়ই দর্শন করে না; কেন না, চক্ষুঃ-কর্ণাদি ইন্দ্রিয়নিচয় ব্যাপারশীল(কার্য্যকারী) হইলেই

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৭৯

‘দর্শন করিতেছে বা শ্রবণ করিতেছে’, এইরূপ ব্যবহার হইয়া থাকে; অথচ সে সময়ে যখন কোন ইন্দ্রিয়েরই কোনরূপ ব্যাপার দেখিতে পাওয়া যায় না, অতএব এই সুযুপ্ত পুরুষ নিশ্চয়ই দর্শন করে না, বলিতে হইবে; না-তাহা নহে; তবে কি না, নিশ্চয়ই দর্শন করে। কিরূপে? যেহেতু দ্রষ্টার-দর্শন-কর্তার যে দৃষ্টি, তাহার বিপরিলোপ-বিনাশ কখনও সম্ভব হয় না। অগ্নির উষ্ণতা যেমন অগ্নির সমকালস্থায়ী, তেমনি এই আত্মার দ্রষ্টৃত্বও অবিনাশী; অতএব-আত্মা অবিনাশী বলিয়াই তাহার দৃষ্টি বা প্রকাশশক্তিও অবিনাশিনী-তাহার সমকালস্থায়িনী। ২।

ভাল, ইহা ত বড়ই বিরুদ্ধ কথা হইতেছে যে, সেই দৃষ্টিটি দ্রষ্টার ধর্ম, অথচ তাহার বিনাশ হয় না;(১) একথা সঙ্গত হয় কিরূপে? দেখিতে পাওয়া যায়, দ্রষ্টা নিজেই তাহার দৃষ্টি সম্পাদন করিয়া থাকে; দৃষ্টির(জ্ঞানের) কর্তা বলিয়াই তাহাকে দ্রষ্টা বলা হয়। দ্রষ্টা দৃষ্টি সমুৎপাদন করে, অথচ সেই উৎপন্ন দৃষ্টি কখনও বিলুপ্ত হয় না, একথা কিছুতেই বলিতে পারা যায় না। যদি মনে কর, ‘বিলুপ্ত হয় না’ বলাতেই সেই দৃষ্টির অবিনাশিত্ব সমর্থিত হইতেছে; না-সে কথাও বলিতে পার না; কেন না, বাক্য ত কারক নহে, জ্ঞাপক মাত্র, অর্থাৎ যে বস্তু যে প্রকার, তাহা জানাইয়া দেওয়াই বাক্যের কার্য্য; কিন্তু কোন প্রকার গুণ- সমুৎপাদনে তাহার সামর্থ্য নাই। উৎপন্ন বস্তুর যে, বিনাশ, তাহা যুক্তিসিদ্ধ; শতবচনেও তাহার অন্যথা করিতে পারা যায় না; কারণ, শুধু যথাযথ বস্তুমাত্র- জ্ঞাপনেই বাক্যের সামর্থ্য। ৩

না, এ দোষ হয় না; আদিত্য প্রভৃতি প্রকাশমান পদার্থের সম্বন্ধে যেরূপ প্রকাশকত্ব ব্যবহার হইয়া থাকে, তদনুসারে এখানেও আত্মার প্রকাশকত্ব ধৰ্ম্ম উপপন্ন হইতে পারে। অভিপ্রায় এই যে, প্রকাশমান আদিত্যপ্রভৃতি পদার্থসমূহ

১১৪৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যেমন স্বভাবসিদ্ধ নিত্যপ্রকাশ-সম্পন্ন হইয়াও স্বীয় প্রকাশ দ্বারা অপরকে প্রকাশিত করিয়া থাকে; কিন্তু তাহারা যে, প্রথমে প্রকাশ-বিহীন থাকিয়া পরে প্রকাশশক্তি লাভ করত অপরকে প্রকাশিত করে, একথা কেহই বলে না; পরন্তু স্বভাবসিদ্ধ স্বীয় প্রকাশ দ্বারাই তাহারা প্রকাশকত্ব-ব্যবহার নিষ্পন্ন হইয়া থাকে।

তেমনি স্বভাবতঃ বিনাশহীন নিত্য-সিদ্ধ স্বীয় দৃষ্টিশক্তি দ্বারাই আত্মার দ্রষ্টৃত্ব ব্যবহার হইয়া থাকে। ভাল, তাহা হইলে, তাহার দ্রষ্টৃত্ব বা দর্শনশক্তি ত গৌণ হইতে পারে? না, পারে না, যেহেতু এইরূপেই দর্শনের মুখ্যার্থত্ব উপপন্ন হয়; কারণ, আত্মার যদি অন্যপ্রকার দর্শন কোথাও দৃষ্ট হইত, তাহা হইলেই এই দর্শনের গৌণত্ব সম্ভাবনা করা যাইত; কিন্তু আত্মার অন্যপ্রকার দর্শন ত কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না; অতএব উক্তপ্রকার দর্শনই আত্মার মুখ্য দর্শন; অন্যপ্রকার নহে;-যেমন স্বভাবসিদ্ধ নিত্য প্রকাশ দ্বারা আদিত্য- প্রভৃতির প্রকাশময়ত্ব, এবং তাহাই যেমন তাহাদের প্রকাশকত্ব; কারণ, অন্য- প্রকার প্রকাশকত্ব তাহাদের পক্ষে সম্ভবপরই হয় না; ইহাও তেমনই, অতএব ‘দ্রষ্টার দৃষ্টি বিলুপ্ত হয় না’ এ কথায় বিরোধের গন্ধমাত্রও নাই। ৪

ভাল, যদি বল, অনিত্য ক্রিয়ার কর্তৃত্ব-অর্থে ই তৃচপ্রত্যয়ের প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়; যেমন—ছেত্তা(ছেদনের কর্তা), ভেত্তা(ভেদন ক্রিয়ার কর্তা), গন্তা (গমন ক্রিয়ার কর্তা) ইত্যাদি; তেমনি[তৃচপ্রত্যয়ান্ত] ‘দ্রষ্টা’ শব্দের প্রয়োগেও অনিত্য দৃষ্টির কর্তৃত্ব অর্থই গ্রহণ করা উচিত? না—তাহা বলিতে পার না; কারণ, [স্বতঃসিদ্ধ প্রকাশসম্পন্ন আদিত্যপ্রভৃতিতেও] ‘প্রকাশয়িতা’(প্রকাশনের কর্তা), এই জাতীয় শব্দ-প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়। যদি বল, প্রকাশক অর্থে ঐরূপ প্রয়োগ হয় হউক; কারণ, সেখানে অন্যপ্রকার প্রয়োগের সম্ভাবনা নাই, কিন্তু আত্মাতে ত সেরূপ প্রয়োগের কারণ দেখা যায় না। না, সে কথাও বলা যায় না; যেহেতু শ্রুতিতে আত্মদৃষ্টির বিলোপাভাব শ্রুত হইতেছে। যদি বল, ‘আমি দর্শন করিতেছি, আবার দর্শন করিতেছি না,’ ইত্যাদি অনুভব অনুসারে বলিতে হইবে যে, দৃষ্টির অবিনশ্বরত্ব কথাটি সত্য নহে; না, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, দর্শনসাধন ইন্দ্রিয়ের ব্যাপারগত বৈলক্ষণ্যই ঐরূপ দর্শন ও অদর্শনের প্রযোজক; যেহেতু, যাহাদের চক্ষু উৎপাটিত হইয়াছে, স্বপ্নসময়ে তাহাদেরও আত্মদৃষ্টির অবিপরিলোপ বা বিদ্যমানতা দেখিতে পাওয়া যায়; অতএব স্বীকার করিতে হইবে যে, আত্মার দৃষ্টি বা জ্ঞানশক্তি স্বভাবতঃই অবিপরিলুপ্ত; এইজন্য

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৩৯

সুষুপ্তি সময়েও স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাব আত্মা সেই অবিলুপ্ত দৃষ্টি দ্বারা নিশ্চয়ই দর্শন করিতে থাকে। ৫

তবে, সে সময়ে দর্শন করে না কেন? হাঁ, তাহার কারণ বলিতেছি-সেখানে ত সেরূপ কোন বস্তু নাই। সেরূপ বস্তু কি? দ্বিতীয় বস্তু অর্থাৎ দৃষ্টির বিষয়ীভূত- যাহা দর্শন করিতে পারা যায়। সেই বিষয়ীভূত বস্তুটি কিরূপ? যাহা দ্রষ্টার জন্য, অর্থাৎ দ্রষ্টার অতিরিক্ত পৃথক্ বস্তু,-যাহা দর্শন করিবে বা দৃশ্য। বিশেষ বিশেষ দর্শনের কারণীভূত যে, অন্তঃকরণ, চক্ষু ও রূপ প্রভৃতি বিষয়, পূর্ব্বে অবিদ্যাবশতঃ সে সমুদয় পৃথকরূপে প্রত্যুপস্থাপিত ছিল; এসময়ে(সুযুপ্তিকালে) সে সমুদয় একীভূত হইয়া গিয়াছে; কারণ, আত্মা তখন পরমাত্মার সহিত সম্মিলিত হইয়া রহিয়াছে। দ্রষ্টা যখন পরিচ্ছিন্নের মত হয়, তখনই তাহার দর্শনের জন্য অন্তঃকরণপ্রভৃতি করণবর্গের পৃথকভাবে থাকা আবশ্যক হয়; এ সময়ে সেই দ্রষ্টা সর্ব্বতোভাবে স্বরূপের সহিত-সম্যরূপে আলিঙ্গিত-প্রিয় পত্নীর সহিত পুরুষ যেমন আলিঙ্গিত হয়, তেমনি ভাবে স্বস্বরূপ প্রাজ্ঞ পরমাত্মার সহিত সম্পূর্ণভাবে মিলিত হইয়া থাকে; সেই কারণে তখন ইন্দ্রিয়সমূহ এবং দৃশ্য বিষয়সমূহও আর পৃথকভাবে বিদ্যমান থাকে না; সেই ইন্দ্রিয় ও বিষয় পৃথক্ না থাকায় তখন বিশেষ বিশেষ জ্ঞানও হয় না। যাহা কিছু বিশেষ জ্ঞান, চক্ষুঃপ্রভৃতি করণই তাহার কারণ; আত্মা তাহার কারণ নহে; কেবল অজ্ঞানবশতঃ আত্মকৃত বলিয়া প্রতীতি হয় মাত্র; অতএব, আত্মার দৃষ্টি বিলুপ্ত হয় বলিয়া যে, মনে হয়, তাহা কেবল অজ্ঞানজনিত ভ্রান্তি মাত্র,(উহা বাস্তবিক সত্য নহে) ॥২৭৫৷৷২৩৷

যদ্বৈ তন্ন জিঘ্রতি জিঘ্রন্ বৈ তন্ন জিঘ্রতি, ন হি ঘাতুর্ঘাতে- বিপরিলোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ, ন তু তদ্বিতীয়মস্তি ততো- হন্যদ্বিভক্তং যজ্জিঘ্রেৎ ॥২৭৬৷২৪৷৷

সরমার্থঃ।—তৎ(তদা) যৎ বৈ ন জিঘ্রতি(গন্ধং ন গৃহ্লাতি),[বস্তুতঃ] জিঘ্রন্ বৈ(এব) তৎ ন জিঘ্রতি;[যতঃ], ঘ্ৰাতুঃ(গন্ধগ্রহীতুঃ আত্মনঃ) ঘ্রাতেঃ (গন্ধগ্রহণস্য) বিপরিলোপঃ ন হি(নৈব) বিদ্যতে;[কুতঃ?] অবিনাশিত্বাৎ (বিনাশরহিতত্বাৎ তস্য)।[তর্হি কুতঃ তস্যানুপলব্ধিঃ? তদাহ] ততঃ(তস্মাদ ঘ্রাতুঃ) বিভক্তং(পৃথগ্‌ভূতং) অন্যৎ দ্বিতীয়ং তু(পুনঃ) তৎ(বস্তু) ন অস্তি, যৎ জিঘ্রেৎ। [বিষয়াভাবাদেব গ্রহণাভাবঃ প্রতীয়তে, ন তু স্বরূপাসত্তয়া ইতি ভাবঃ] ॥২৭৬৷৷২৪৷৷

১১৫০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

মূলাসুনাকে?—পুরুষ সুষুপ্তি সময়ে যে, আঘ্রাণ করে না, প্রকৃত পক্ষে আঘ্রাণ করিয়াও তাহা করে না; কেন না, ঘ্রাণকর্তা পুরুষের ঘ্রাণশক্তি কখনও বিলুপ্ত হয় না; কারণ, উহা অবিনাশী বা নিত্য। তখন পুরুষ হইতে পৃথগ্‌ভূত অন্য দ্বিতীয় কিছু থাকে না, যাহা আঘ্রাণ করিবে;[এই কারণে তখন ঘ্রাণ প্রতীতি হয় না] ॥২৭৬৷২৪৷৷

যদ্বৈ তন্ন রসয়তে, রসয়ন্ বৈ তন্ন রসয়তে, ন হি রসয়িতৃ রসয়তের্বিপরিলোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ, ন তু তদ্বিতীয়মস্তি ততোহন্যদ্বিভক্তং যদ্ রসয়েৎ ॥২৭৭৷২৫৷৷

সরলার্থঃ।—তৎ(তদা) যৎ বৈ ন রসয়তে(রসগ্রহণং ন করোতি); [বস্তুতস্তু] তৎ(তদা) রসয়ন্ বৈ ন রসয়তে;[যতঃ] রসয়িতুঃ(পুরুষস্য) রসয়তেঃ(রসগ্রহণস্য) বিপরিলোপঃ নহি বিদ্যতে;[কুতঃ?] অবিনাশিত্বাৎ। তৎ(তদা) ততঃ বিভক্তং অন্যৎ দ্বিতীয়ং নাস্তি, যৎ রসয়েৎ ॥ ২৭৭ ॥ ২৫ ॥

মূলানুবাদ?—সে সময়ে পুরুষ যে, রস আস্বাদন করে না, [বুঝিতে হইবে], তখন আস্বাদন করিয়াও আস্বাদন করে না; কেন না, অবিনাশী বলিয়াই রসগ্রহীতা পুরুষের রসাস্বাদন কখনও বিলুপ্ত হয় না; কিন্তু সে সময়ে তাহার অতিরিক্ত দ্বিতীয় অন্য কোনও বস্তু থাকে না, যাহা আস্বাদন করিবে;[এইজন্য তাহার রস গ্রহণ হয় না]॥ ২৭৭ ॥ ২৫ ॥

যদ্বৈ তন্ন বদতি, বদন্ বৈ তন্ন বদতি, ন হি বক্তুর্বক্তের্বিপরি- লোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ, ন তু তদ্বিতীয়মস্তি ততোহন্যদ্বি- ভক্তং যদ্বদেৎ ॥২৭৮৷৷২৬৷৷

সরলার্থঃ।—তৎ(তদা) যৎবৈন বদতি,[বস্তুতঃ] বদন্ বৈ তৎ ন বদতি;[যতঃ], বক্তুঃ বক্তেঃ(বচনস্য) বিপরিলোপঃ ন হি বিদ্যতে; [কুতঃ?] অবিনাশিত্বাৎ। ততঃ(বক্তুঃ পুরুষাৎ) বিভক্তং দ্বিতীয়ং অন্যৎ ন অস্তি, যৎ বদেৎ(বাক্যেন প্রকাশয়েৎ)। ২৭৭॥ ২৬॥

মূলানুবাদ:-সুষুপ্তি সময়ে পুরুষ যে, কিছু বলে না; প্রকৃতপক্ষে, সে সময়ে বলিয়াও বলে না। অবিনাশী বলিয়াই বক্তা

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৫১

পুরুষের বচনশক্তি বিলুপ্ত হয় না; কিন্তু সে সময়ে তাহা হইতে বিভক্ত দ্বিতীয় অন্য কোন বস্তু থাকে না,—যাহা বলিতে পারে;[ এই কারণে তখন বলে না] ॥ ২৭৮ ॥ ২৬ ॥

যদ্বৈ তন্ন শৃণোতি শৃণ্বন্ বৈ তন্ন শৃণোতি, ন হি শ্রোতুঃ শ্রুতের্বিপরিলোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ, ন তু তদ্বিতীয়মস্তি ততোহন্যদ্বিভক্তং যচ্ছৃণুয়াৎ ॥২৭৯৷৷২৭৷৷

সরলার্থঃ?—তৎ(তদা) যৎ ন শূণোতি;[বস্তুতস্তু] তৎ শৃণ্বন্ বৈ ন শৃণোতি;[যতঃ] শ্রোতুঃ শ্রুতেঃ(শ্রবণস্য) বিপরিলোপঃ ন হি বিদ্যতে; [কুতঃ?] অবিনাশিত্বাৎ; তু(পুনঃ) তৎ(তদা) ততঃ বিভক্তং দ্বিতীয়ং অন্যৎ নাস্তি, যৎ শৃণুয়াৎ ॥২৭৯৷৷২৭৷৷

মূলানুবাদ।—পুরুষ তখন যে, শ্রবণ করে না, প্রকৃতপক্ষে সে শ্রবণ করিয়াও শ্রবণ করে না; কারণ, তাহার শ্রবণশক্তি অবিনাশী। তখন তাহা হইতে বিভক্ত অপর দ্বিতীয় কোন বস্তু থাকে না, যাহা শ্রবণ করিতে পারে;[এইজন্য তখন শ্রবণ করে না] ॥ ২৭৯ ॥ ২৭ ॥

যদ্বৈ তন্ন মনুতে মন্থানো বৈ তন্ন মনুতে, ন হি মন্তৰ্ম্মতে- বিপরিলোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ, ন তু তদ্বিতীয়মস্তি ততো- ইন্যদ্বিভক্তং যন্মস্বীত ॥২৮০॥২৮৷৷

সরলার্থঃ।—তৎ(তদা) যৎ বৈ ন মনুতে; মন্থানঃ বৈ তৎ ন মনুতে; [যতঃ] মন্তুঃ(মননকর্ত্তুঃ) মতেঃ(মননস্য) বিপরিলোপঃ ন হি বিদ্যতে; অবিনাশিত্বাৎ। তৎ(তদা) ততঃ বিভক্তং দ্বিতীয়ং অন্যৎ ন অস্তি, যৎ মন্বীত (মননং কুৰ্য্যাৎ) ॥২৮০৷৷২৮৷৷

মূলানুবাদ?—সে সময়ে পুরুষ যে, মনন করে না; বাস্তবিক পক্ষে তখন সে মননশীল থাকিয়াও মনন করে না; কারণ, মননকারী পুরুষের মননশক্তি কখনও বিলুপ্ত হয় না; যেহেতু উহা অবিনাশী; কিন্তু সেখানে তাহার অতিরিক্ত দ্বিতীয় অন্য কোনও বস্তু থাকে না, যাহা মনন করিতে পারে;[এইজন্য তখন তাহার মনন প্রকাশ পায় না] ॥ ২৮০ ॥ ২৮ ॥

১১৫২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

যদ্বৈ তন্ন স্পৃশতি স্পৃশন্ বৈ তন্ন স্পৃশতি, ন হি স্প্রষ্টু- স্পৃষ্টের্বিপরিলোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ, ন তু তদ্বিতীয়মস্তি ততোহন্যদ্বিভক্তং, যৎ স্পৃশেৎ ॥২৮১৷২৯৷৷

সরলার্থঃ।—তৎ(তদা) যৎ বৈ ন স্পৃশতি,[বস্তুতঃ] স্পৃশন্ বৈ তৎ ন স্পৃশতি;[যতঃ], স্প্রষ্টুঃ(স্পর্শকর্ত্তুঃ পুরুষস্য) স্পৃষ্টেঃ বিপরিলোপঃ ন হি বিদ্যতে;[কুতঃ?] অবিনাশিত্বাৎ। তৎ(তদা) ততঃ বিভক্তং অন্যৎ দ্বিতীয়ৎ তু ন অস্তি, যৎ স্পৃশেৎ ॥২৮১৷৷২৯৷৷

মূলানুবাদঃ—সুষুপ্তি সময়ে পুরুষ যে, কিছু স্পর্শ করে না, বস্তুতঃ তখনও স্পর্শশক্তিসম্পন্ন থাকিয়াই স্পর্শ করে না; কারণ, স্পর্শকর্তা পুরুষের স্পর্শশক্তি অবিনশ্বর; সুতরাং কখনও তাহার স্পর্শ- শক্তির বিলোপ সম্ভবপর হয় না; তবে সে সময়ে তাহার অতিরিক্ত দ্বিতীয় অপর কোন বস্তু থাকে না, যাহা স্পর্শ করিতে পারে;[কাজেই তখন স্পর্শব্যবহার হয় না] ॥ ২৮১ ॥ ২৯ ॥

যদ্বৈ তন্ন বিজানাতি বিজানন্ বৈ তন্ন বিজানাতি, ন হি বিজ্ঞাতুর্বিজ্ঞাতের্বিপরিলোপো বিদ্যতেহবিনাশিত্বাৎ, ন তু তদ্দ্বি- তীয়মস্তি ততোহন্যদ্বিভক্তং যদ্বিজানীয়াৎ ॥২৮২৷৩০॥

সরলার্থঃ।—তৎ(তদা) যৎ বৈ ন বিজানাতি, বিজানন্ বৈ তৎ ন বিজা- নাতি,[যতঃ], বিজ্ঞাতুঃ(পুরুষস্য) বিজ্ঞাতেঃ(জ্ঞানস্য) বিপরিলোপঃ ন হি বিদ্যতে;[কুতঃ?] অবিনাশিত্বাৎ। তৎ(তত্র) তু(পুনঃ) ততঃ বিভক্তং অন্যৎ দ্বিতীয়ং ন অস্তি, যৎ বিজানীয়াৎ;[বিজ্ঞেয়াভাবৎ বিজ্ঞানাভাব ইত্যভি- প্রায়ঃ] ॥২৮২॥৩০॥

মূলানুবাদ?—সে সময়ে পুরুষ যে, বিশেষ জ্ঞান লাভ করে না, অর্থাৎ জানে না, বাস্তবিকপক্ষে তখনও সে বিজ্ঞাতা থাকিয়াই জানে না; কারণ, বিজ্ঞাতার বিশেষ জ্ঞানের কখনও বিলোপ হয় না; যেহেতু উহা অবিনাশী। তবে কিনা, সে সময়ে, তাহার অতিরিক্ত দ্বিতীয় এমন কোনও বস্তু থাকে না, যাহা বিশেষরূপে জানিতে পারে;[সুতরাং জ্ঞাতব্য বিষয়াভাবেই তাহার বিজ্ঞানাভাব মনে হয় মাত্র] ॥২৮১৷৷৩০৷৷

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।. ১১৫৩

শাঙ্করভাষ্যম্।—সমানমন্যৎ—যদ্বৈ তন্ন জিঘ্রতি, যদ্বৈ তন্ন রসয়তে, যদ্বৈ তন্ন বদতি, যদ্বৈ তন্ন শূণোতি, যদ্বৈ তন্ন মনুতে, যদ্বৈ তন্ন স্পৃশতি, যদ্বৈ তন্ন বিজানাতীতি। মননবিজ্ঞানয়োর্দ্দষ্ট্যাদিসহকারিত্বেহপি সতি চক্ষুরাদিনিরপেক্ষো ভূতভবিষ্যদ্বর্ত্তমানবিষয়ব্যাপারো বিদ্যতে ইতি পৃথগ্‌ গ্রহণম্। ১

টীকা। যদ্ বৈ তন্ন পশ্যতীত্যাদাবুক্তন্যায়মুত্তরবাক্যেঘতিদিশতি—সমানমন্যদিতি। মনোবুদ্ধ্যোঃ সাধারণকরণত্বাৎ পৃথগব্যাপারাভাবে কথং পৃথঙ্নির্দেশঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ— মননেতি। ১

কিং পুনর্ ষ্ট্যাদীনাম্ অগ্নেরৌষ্ণ্য-প্রকাশন-জলনাদিবৎ ধৰ্ম্মভেদঃ? আহোস্বিৎ অভিন্নস্যৈব ধর্মস্য পরোপাধিনিমিত্তং ধর্মান্তত্বমিতি। অত্র কেচিদ্ ব্যাচক্ষতে— আত্মবস্তুনঃ স্বত এবৈকত্বং নানাত্বং চ,—যথা গোঃ গোদ্রব্যতরৈকত্বং, সাম্নাদীনাং ধর্মাণাং পরস্পরতো ভেদঃ; যথা স্কুলেযু একত্বং নানাত্বং চ, তথা নিরবয়বেঘ- মূর্ত্তবস্তুষু একত্বং নানাত্বং চানুমেয়ম্; সর্ব্বত্রাব্যভিচারদর্শনাৎ আত্মনোঽপি তদ্ব- দেব দৃষ্ট্যাদীনাং পরস্পরং নানাত্বম্ আত্মনা চৈকত্বমিতি। ২

বাক্যানি ব্যাখ্যায় স্বসিদ্ধান্তস্ফুটীকরণার্থং বিচারয়তি-কিং পুনরিতি। ধর্মভেদো ধর্মাণাং সতাং মিথো ধৰ্ম্মিণশ্চ ভেদোহস্তীতি যাবৎ। ধম্মস্য দৃষ্ট্যাদিপদার্থস্যেত্যর্থঃ। পরোপাধিনিমিত্তং চক্ষুরাদ্যুপাধিকৃতমিত্যেতৎ। ধর্ম্মান্যত্বং ধৰ্ম্মত্বং ধৰ্ম্মিণো মিথোহন্যত্বং চেত্যর্থঃ। ভর্তৃপ্রপঞ্চমতেন পূর্ব্বপক্ষং গৃহ্লাতি-অত্রেতি। গবাদীনাং সাবয়বত্বাদ রূপভেদসম্ভবাদেকেন রূপেণাভিন্নত্বং রূপান্তরেণ ভিন্নত্বমিত্যুভয়পাতেহপি নিরবয়বেধাত্মাদিষু কথমনেকরসত্বসিদ্ধিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-যথা স্থলেধিতি। একরূপত্বে বস্তনো দৃষ্টান্তাদষ্টেঃ নানারূপত্বে গবাদিদৃষ্টান্তদর্শনাৎ তদেবানুমেয়ম্। বিমত’ ভিন্নাভিন্নং, বস্তুত্বাদ্, গবাদিবদিত্যর্থঃ। যদ্যপি গগনাদিষু ভিন্নাভিন্নত্বমনুমীয়তে, তথাপি কথমাত্মনি তদনুমানমিত্যাশঙ্কা বস্তত্বস্য নানারূপত্বেনাব্যভিচারাদাত্মন্যপি যথোক্তমনুমানং নিরঙ্কুশপ্রসরমিত্যাহ-সব্বত্রেতি। যথোক্তানুমানানুগ্রহাদ যবৈ তদিত্যাদের্ভিন্নাভিন্নে বস্তুনি তাৎপর্য্যমিতি ভাবঃ। ২

ন, অন্যপরত্বাৎ,-ন হি দৃষ্ট্যাদিধর্মভেদ প্রদর্শনপরমিদং বাক্যং ‘যদ্বৈ তৎ’ ইত্যাদি; কিং তর্হি, যদি চৈতন্যাত্মজ্যোতিঃ, কথৎ ন জানাতি সুযুপ্তে, নূনমতো ন চৈতন্যাত্মজ্যোতিরিত্যেবমাশঙ্কাপ্রাপ্তৌ তন্নিরাকরণায়ৈতদারব্ধম্-‘যদ্বৈ তৎ’ ইত্যাদি। সদস্য জাগ্রৎস্বপ্নয়োশ্চক্ষুরাদ্যনেকোপাধিদ্বারা চৈতন্যাত্মজ্যোতিঃ- স্বাভাব্যমুপলক্ষিতৎ দৃষ্ট্যাদ্যভিধেয়ব্যবহারাপন্নম্, সুযুপ্তে উপাধিভেদব্যাপারনিবৃত্তৌ অনুদ্ভাস্যমানত্বাৎ অনুপলক্ষ্যমাণস্বভাবমপি উপাধিভেদেন ভিন্নমিব-যথাপ্রাপ্তানু- বাদেনৈব বিদ্যমানত্বমুচ্যতে। তত্র দৃষ্ট্যাদিধৰ্ম্মভেদকল্পনা বিবক্ষিতার্থানভিজ্ঞতয়া;

੩੨

১১৫৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সৈন্ধবঘনবৎ প্রজ্ঞানৈকরসঘনশ্রুতিবিরোধাচ্চ; “বিজ্ঞানমানন্দং”, “সত্যৎ জ্ঞানং” “প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যশ্চ। শব্দপ্রবৃত্তেশ-লৌকিকী চ শব্দপ্রবৃত্তিঃ- ‘চক্ষুষা রূপৎ বিজানাতি, শ্রোত্রেণ শব্দং বিজানাতি, রসনেনান্নস্য রসৎ বিজানাতি’ ইতি চ সর্ব্বত্রৈব চ দৃষ্ট্যাদিশব্দাভিধেয়ানাং বিজ্ঞানশব্দবাচ্যতামেব দর্শয়তি; শব্দ- প্রবৃত্তিশ্চ প্রমাণম্। ৩

ভর্তৃপ্রপঞ্চোক্তং বাক্যতাৎপর্য্যং নিরাকরোতি-নেত্যাদিনা। চৈতন্যাবিনাশে বাক্য- তাৎপৰ্য্যং চেৎ, কথং তহি দৃষ্ট্যাদিভেদবচনমিত্যাশঙ্ক্যাহ-যদস্যেতি। তদ্ধি সুষুপ্ত্যবস্থায়া- মুপাধেরন্তঃকরণস্য চক্ষুরাদিভেদাধীনপরিণামব্যাপারনিবৃত্তৌ সত্যামুপাধিভেদস্তানুদ্ভাস্যমানত্বাৎ তেন ভিন্নমিবানুপলক্ষ্যমাণস্বভাবং যদ্যপি, তথাপি চক্ষুদ্বারেণ জায়মানায়াং বুদ্ধিবৃত্তৌ ব্যক্তং চৈতন্যং দৃষ্টিঃ ঘ্রাণদ্বারেণ জাতায়াং তস্যাং ব্যক্তং ঘ্রাতিরিতি উপাধিভেদাৎ প্রাপ্তভেদানুবাদেন চৈতন্যস্যাবিনাশিত্বে বাক্যতাৎপয্যামিত্যর্থঃ। উক্তে বাক্যতাৎপয্যে স্থিতে ফলিতমাহ- তত্রেতি। ইতশ্চ দৃষ্ট্যাদিভেদকল্পনা ন শ্লিষ্টেত্যাহ-সৈন্ধবেতি। তদেব স্পষ্টয়তি-বিজ্ঞান- মিতি। ন দৃষ্ট্যাদিভেদকল্পনেতি শেষঃ। যথা ঘটাকাশো মহাকাশ ইত্যেকশব্দবিষয়ত্বাদুপাধি- ভেদেহপ্যাকাশস্যৈকত্বমিষ্টং, তথৈকশব্দপ্রবৃত্তোরেকত্বং চিতোহপি স্বীকর্তব্যং, তৎ কুতো দৃষ্ট্যাদিভেদসিদ্ধিরিত্যাহ-শব্দপ্রবৃত্তেশ্চেতি। তামেব বিবৃণোতি-লৌকিকী চেতি। ৩

দৃষ্টান্তোপপত্তেশ্চ—যথা হি লোকে স্বচ্ছস্বাভাব্যযুক্তঃ স্ফটিকঃ, তন্নিমিত্তমেব কেবলং হরিত-নীল-লোহিতাদ্যপাধিভেদসংযোগাৎ তদাকারত্বং ভজতে, ন চ স্বচ্ছস্বাভাব্যব্যতিরেকেণ হরিতনীললোহিতাদিলক্ষণ। ধর্মভেদাঃ স্ফটিবস্য কল্প- য়িতুং শক্যন্তে, তথা চক্ষুরাদ্যপাধিভেদ-সংযোগাৎ প্রজ্ঞানঘনস্বভাবস্যৈবাত্ম- জ্যোতিষো দৃষ্ট্যাদিশক্তিভেদ উপলক্ষ্যতে, প্রজ্ঞানঘনস্য স্বচ্ছস্বাভাব্যাৎ স্ফটিক- স্বচ্ছস্বাভাব্যবৎ। স্বয়ংজ্যোতিষ্টাচ্চ—যথা চাদিত্যজ্যোতিঃ অবভাস্যভেদৈঃ সংযুজ্যমানং হরিতনীলপীতলোহিতাদিভেদৈরবিভাজ্যং তদাকারাভাসং ভবতি, তথা চ কৃৎস্নং জগৎ অবভাসয়ৎ চক্ষুরাদীনি চ তদাকারং ভবতি। তথা চোক্তম্— “আত্মনৈবায়ং জ্যোতিষাস্তে” ইত্যাদি। ৪

যৎ তু সিদ্ধান্তে দৃষ্টান্তো নাস্তীতি, তত্রাহ-দৃষ্টান্তেতি। কিমেকরূপত্বে বস্তুনো দৃষ্টান্তো নাস্তি, কিং বা মিথ্যাত্বে তন্নানারূপত্বস্যেতি বক্তব্যম্। নাদ্যঃ। নানারূপবস্তুবাদিরপ্যেকৈক- রূপস্যানবস্থাপরিহারার্থমনানারূপত্বাঙ্গীকারাদম্মাকং দৃষ্টান্তসিদ্ধের্বস্তত্বহেতোশ্চ তত্রৈবানৈকান্তি- কত্বাৎ, তস্মাদেকরূপমেব বস্তু স্বীকর্তব্যমিতি ভাবঃ। দ্বিতীয়ং দূষয়তি-যথা হীতি। তন্নিমিত্ত- মেবেত্যত্র তচ্ছব্দেন স্বচ্ছস্বাভাব্যং পরামৃশ্যতে। স্ফটিকে হরিতাদিধর্মাণাং স্বাভাবিকত্বং কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ন চেতি। তস্য হি স্বচ্ছস্বাভাব্যং, তদ্বশেন হরিতাদ্যুপাধিভেদসম্বন্ধ- ব্যতিরেকেণেতি যাবৎ। একস্য নানারূপত্বং মিথ্যেত্যত্র-দৃষ্টান্তমুক্ত। দাষ্টান্তিকমাহ-তথেতি। আত্মা মিথ্যানানানির্ভাস উপহিতত্বাৎ স্ফটিকবদিত্যর্থঃ। কিঞ্চাত্মা মিথ্যানানাত্বাধারঃ স্বচ্ছত্বাৎ

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৫ট

সংপ্রতিপন্নবদিত্যাহ—প্রজ্ঞানেতি। কিঞ্চাত্মা কল্পিতনানাত্বাধারো জ্যোতিষ্ট্বাদাদিত্যাদি- জ্যোতির্ব্বদিত্যাহ—স্বয়মিতি। আদিত্যাদাবকল্পিতোহপি ভেদোহস্তীত্যাশঙ্ক্য বিবক্ষিতে সাম্যমাহ—যথা চেত্যাদিনা। অবিভাগ্যং বস্তুতো বিভাগাযোগ্যমিতি যাবৎ। চক্ষুরাদীনি চাবভাসয়দিতি সম্বন্ধঃ। আত্মনঃ সর্ব্বাবভাসকত্বে বাক্যোপক্রমং প্রমাণয়তি—তথা চেতি। ৪

ন চ নিরবয়বেধনেকাত্মতা শক্যতে কল্পয়িতুম্, দৃষ্টান্তাভাবাৎ। যদপি আকাশস্য সর্ব্বগতত্বাদিধর্মভেদঃ পরিকল্প্যতে, পরমাব্বাদীনাঞ্চ গন্ধরসাদ্যনেকগুণবত্বম্, তদপি নিরূপ্যমাণং পরোপাধিনিমিত্তমেব ভবতি। আকাশস্য তাবৎ সর্ব্বগতত্বং নাম ন স্বতো ধর্মোহস্তি; সর্ব্বোপাধিসংশ্রয়াদ্ধি সর্ব্বত্র স্বেন রূপেণ সত্ত্বমপেক্ষ্য সর্ব্বগতত্বব্যবহারঃ; ন ত্বাকাশঃ কচিদগতো বা, অগতো বা স্বতঃ; গমনং হি নাম দেশান্তরস্থস্য দেশান্তরেণ সংযোগকারণম্। সা চ ক্রিয়া নৈবাবিশেষে সম্ভবতি; এবং ধর্মভেদা নৈব সম্ভ্যাকাশে। ৫

যৎ তু নিববয়বেধপি নানারূপত্বমনুমেয়মিতি, তত্রাহ-ন চেতি। আকাশাদীনাং দৃষ্টান্তত্ব- মাশঙ্ক্য নিরাচষ্টে-যদপীত্যাদিনা। কথমাকাশস্যানেকধর্মবস্তুমৌপাধিকমিত্যাশঙ্ক্য তস্য সর্ব্বগতত্বং তাবদৌপাধিকমিতি সাধয়তি-আকাশস্যেতি। কথং তহি সর্ব্বগতত্বব্যবহারঃ, তত্রাহ-সর্ব্বোপাধীতি। নন্বাকাশস্য সর্বত্র গমনমপেক্ষ্য সর্ব্বগতত্বং কিমিতি ন ব্যবহ্রিয়তে, তত্রাহ-ন ত্বিতি। আকাশে গমনাযোগং বক্তুং তৎস্বরূপমাহ-গমনং হীতি। ননু কুতশ্চিন্নি- ভাগে সংযোগে চ কেনচিদ্দেশেন তৎকারণীভূতা ক্রিয়াপি খ্যেনাদাবিবাকাশে ভবিষ্যতি, নেত্যাহ-সা চেতি। সাবয়বে হি খ্যেনাদৌ ক্রিয়া দৃশ্যতে, আকাশং ত্ববিশেষং নিরবয়বং, কুতস্তত্র ক্রিয়েত্যর্থঃ। তথাপি ধর্মান্তরাণ্যাকাশে ভবিষ্যন্তীত্যাশঙ্কা তেষামপি ক্রিয়াপূর্ব্বকাণা- মুক্তন্যায়কবলীকৃতত্বমাহ-এবমিতি। ভেদাভেদাভ্যাং দুর্ব্বচত্বাচ্চ তত্র ধৰ্ম্মধম্মিভাবো ন সম্ভবতীতি ভাবঃ। ৫

তথা পরমাণ্বাদাবপি; পরমাণুর্নাম পৃথিব্যা গন্ধঘনায়াঃ পরমঃ সূক্ষ্মোহবয়বো গন্ধাত্মক এব; ন তস্য পুনর্গন্ধবত্ত্বং নাম শক্যতে কল্পয়িতুম্। অথ তস্যৈব রসাদিমত্ত্বং স্যাদিতি চেৎ; ন, তত্রাপি অবাধিসংসর্গনিমিত্তত্বাৎ। তস্মান্ন নিরবয়ব- স্যানেকধৰ্ম্মবত্ত্বে দৃষ্টান্তোহস্তি। এতেন দৃগাদিশক্তিভেদানাং পৃথক্ চক্ষুরূপাদি- ভেদেন পরিণামভেদকল্পনা পরমাত্মনি প্রত্যুক্তা ॥ ২৭৬—২৮২৷৷৩০৷৷

আকাশে দর্শিতন্যায়মন্যত্রাপি সঞ্চারয়তি-তথেতি। পার্থিবত্বং পরমাণোরেকং রূপং গন্ধবত্ত্বং চাপরমিত্যনেকরূপত্বমিত্যাশঙ্ক্যাহ-পরমাণুর্নামেতি। ন হি পার্থিবত্বাতিরেকি গন্ধবত্ত্বং প্রামাণিকমিতি ভাবঃ। বৈশেষিকপরিভাষামাশ্রিত্যাশঙ্কয়তি-অথেতি। পার্থিবে পরমাণৌ রসাদিমত্ত্বমনৌপাধিকং ন ভবতি, জলাদিসংসর্গকৃতত্বাৎ, তথা চ নিরুপাধিকভেদেনেদ- মুদাহরণমিতি পরিহরতি-ন তত্রাপীতি। উক্ত্যায়স্য দিগাদাবপি সমত্বং মহ্বোপসংহরতি- তস্মাদিতি। সন্তি পরস্মিন্নাত্মনি দৃগাদিশক্তিভেদাস্তেষাং মধ্যে দৃশক্তিশ্চক্ষুরাত্মনা রূপাত্মনা চ

১১৫৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

পৃথগেব পরিণমতে, ঘ্রাতিশক্তিশ্চ ঘ্রাণাত্মনা গন্ধাত্মনা চেত্যনেন ক্রমেণ পরস্মিন্ পরিণামকল্পনা ভর্তৃপ্রপঞ্চৈর্যা কৃতা, সাপি পরস্যৈকরূপত্বোপপাদনেন নিরস্তেত্যাহ-এতেনেপি। ২৭৬-২৮২। ২৪-৩০॥

ভাষ্যানুবাদ।—তখন যে, আঘ্রাণ করে না; তখন যে, রসাস্বাদন করে না; তখন যে, কথা বলে না; তখন যে, শ্রবণ করে না; তখন যে, মনন করে না; তখন যে, স্পর্শানুভব করে না; তখন যে, বিজ্ঞান লাভ করে না; ইত্যাদি বাক্যের অপরাপর অংশের ব্যাখ্যা পূর্ব্বশ্রুতির ব্যাখ্যার অনুরূপ। মনের কার্য্য মনন ও বুদ্ধির ধর্ম্ম বিজ্ঞান; যদিও এই উভয়ই চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের বৃত্তি-সাপেক্ষ হউক, তথাপি অতীত ও ভবিষ্যৎ বিষয়ে চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের সাহায্য না লইয়াও উহারা কার্য্য করিতে পারে; এই কারণে উহাদের পৃথক্ উল্লেখ করা হইয়াছে। ১

এখন জিজ্ঞাস্য হইতেছে এই যে, একই অগ্নির যেমন উষ্ণতা, প্রকাশ ও প্রজলন প্রভৃতি ধর্মগুলি স্বতই ভিন্ন ভিন্ন, পুরুষের উক্ত দর্শন-শ্রবণপ্রভৃতিও কি সেইরূপই স্বভাবভিন্ন ধৰ্ম্ম? অথবা অপর কোনও উপাধির সহিত সম্বন্ধনিবন্ধন এইরূপ ধর্মভেদ ঘটিয়া থাকে? এতদুত্তরে কেহ কেহ ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন— আত্মার একত্ব ও নানাত্ব-উভয়ই স্বভাবসিদ্ধ; যেমন গো-দ্রব্যরূপে সমস্ত গো এক, আবার সাম্নাগলকম্বলাদি ধর্মগুলি দ্বারা সকলেই পরস্পর পৃথক্। স্থূল পদার্থে যেরূপ একত্ব ও নানাত্ব দুইই থাকে, সূক্ষ্ম নিরবয়ব বস্তুতেও তেমনি স্বভাবসিদ্ধ একত্ব ও নানাত্বের অনুমান করা যাইতে পারে; এ নিয়মের কোথাও ব্যভিচার দৃষ্ট হয় না বলিয়া, স্থুল সূক্ষ্ম পদার্থের ন্যায় আত্মার সম্বন্ধেও দর্শনাদি ধর্মগুলি পরস্পর বিভিন্ন, এবং আত্মারূপে অভিন্ন, এইরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। ২

না, এ কথা বলিতে পারা যায় না; কারণ, উক্ত বাক্যের তাৎপর্য্য অন্য রূপ। দৃষ্টি প্রভৃতি ধর্ম্মের প্রভেদ প্রদর্শনে যে, উক্ত “যদ্বৈ তৎ” ইত্যাদি বাক্যের তাৎপর্য্য, তাহা নহে; তবে কি না, আত্মা যদি চৈতন্যজ্যোতিঃ- স্বভাব হয়, তবে সুষুপ্তি সময়েও সে দর্শন করে না কেন? অতএব নিশ্চয়ই আত্মা চৈতন্যজ্যোতিঃস্বরূপ নহে; এইরূপ আশঙ্কা সম্ভাবনা করিয়া তন্নিরাসার্থ “যদ্বৈ তৎ” ইত্যাদি বাক্য আরব্ধ হইয়াছে। জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থায় আত্মার স্বভাবসিদ্ধ চৈতন্যজ্যোতিঃ চক্ষুঃপ্রভৃতি নানাবিধ উপাধির সহযোগে প্রতীতিগোচর হইয়া দর্শন-শ্রবণাদি ব্যবহার লাভ করিয়া

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৫৭

থাকে; সুষুপ্তিসময়ে উক্ত চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের ব্যাপার বিরত হইয়া যায়; কাজেই তখন চৈতন্যজ্যোতিঃ প্রকাশ পায় না; কিন্তু তদবস্থায় চৈতন্য স্বভাবটি প্রতিভাসমান না হইলেও, তাহা যে, বিদ্যমান থাকে, ইহাই এখানে প্রকাশ করিয়া বলা হইয়াছে; সুতরাং এ কথাটি ঐ অংশের অনুবাদ মাত্র; অতএব, এখানে যে, দর্শনাদি ধর্ম্মের ভেদ কল্পনা করা, তাহা কেবল শ্রুতির অর্থ বুঝিতে না পারার ফল। বিশেষতঃ ঐরূপ ধর্মভেদ কল্পনাটা ‘ব্রহ্ম বিজ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ’, ‘সত্য ও জ্ঞানস্বরূপ’, ‘ব্রহ্ম প্রজ্ঞানস্বরূপ’ ইত্যাদি শ্রুতিবিরুদ্ধ, এবং সৈন্ধবখণ্ডের ন্যায় ব্রহ্মের বিজ্ঞানৈকরসরূপত্ব প্রতিপাদক শ্রুতিবিরুদ্ধও বটে। প্রসিদ্ধ শব্দব্যবহারও এ পক্ষে অনুকূল,—‘চক্ষু দ্বারা রূপ জানে’, ‘শ্রবণোন্দ্ৰয় দ্বারা শব্দ জানে’, এবং ‘রসনা দ্বারা রস অনুভব করে’ ইত্যাদি লৌকিক শব্দব্যবহারও সর্ব্বত্রই দৃষ্টি প্রভৃতি শব্দবোধ্য অর্থসমূহকে বিজ্ঞান শব্দবাচ্য বলিয়া প্রতিপাদন করিতেছে। ৩

এ পক্ষে দৃষ্টান্তও সুসঙ্গত হয়,—জগতে স্বভাবস্বচ্ছ স্ফটিক যেরূপ কেবল স্বচ্ছতা গুণেই শোভিত; অথচ নীল ও লোহিতাদি বিভিন্ন উপাধির সহিত সংযোগ বশতঃ সেই সেই বর্ণ ভজনা করে সত্য; কিন্তু তাহা হইলেও স্বভাব- শুভ্র স্ফটিকের যেরূপ স্বাভাবিক স্বচ্ছতাভিন্ন হরিত-নীল-লোহিতাদিরূপ ধর্মভেদ কল্পনা করিতে পারা যায় না, সেইরূপ স্বভাবসিদ্ধ জ্ঞানঘন আত্মজ্যোতির সম্বন্ধেও চক্ষুঃপ্রভৃতি বিভিন্ন উপাধির সম্বন্ধবশতঃই দর্শন-শ্রবণাদি শক্তি- ভেদ লক্ষিত হইয়া থাকে মাত্র; কারণ, স্ফটিকের স্বাভাবিক স্বচ্ছতার ন্যায়, প্রজ্ঞানঘন আত্মারও স্বচ্ছতাই স্বভাবসিদ্ধ;[সুতরাং কখনও তাহার পরিবর্তন সম্ভব হয় না]। আত্মার স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাবত্বও ইহার অপর কারণ; আদিত্য- জ্যোতি যেরূপ হরিত, পীত, নীল ও লোহিতাদি রূপভেদে অবিভাজ্য অর্থাৎ বিভাগযোগ্য না হইরাও, সম্বন্ধ বশতঃ যেন সেই সেই আকারেই উপরঞ্জিত হয়, সেইরূপ আত্মজ্যোতিও সমস্ত জগৎ ও চক্ষুঃপ্রভৃতি জ্ঞানসাধনকে প্রকাশিত করিতে যাইয়া তাহাদের আকারে প্রকাশ পাইয়া থাকে; ‘এই পুরুষ আত্ম- জ্যোতিঃ দ্বারাই বিষয় প্রকাশ করতঃ বিদ্যমান আছে’, এই শ্রুতিতেও ঐরূপ অভিপ্রায়ই উক্ত হইয়াছে। ৪

বিশেষতঃ নিরাকার পদার্থে কখনও অনেকবিধ আকার কল্পনা করিতে পারা যায় না; কারণ, ঐরূপ কোন দৃষ্টান্ত নাই। নিরবয়ব আকাশে যে, সর্ব্বগতত্ব প্রভৃতি ধর্ম্মের পরিকল্পনা করা হয়, এবং নিরংশ পরমাণু

১১৫৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রভৃতির যে, গন্ধবত্তাদি বহুবিধ গুণ কল্পনা করা হয়, বিচার করিলে বুঝিতে পারা যায় যে, অপরাপর উপাধির সহিত সম্বন্ধই তাহার প্রধান কারণ; কেন না, আকাশের সর্ব্বব্যাপিত্ব বলিয়া কোনও স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম নাই, কিন্তু সর্ব- প্রকার উপাধির সহিত সম্বন্ধ বশতঃ অর্থাৎ জগতের অপরাপর বস্তুর সহিত তাহার সম্বন্ধ থাকায় সর্ব্বত্রই তাহার সত্তা বা অস্তিত্ব অনুভবগোচর হইয়া থাকে; এই কারণে তাহার সর্ব্বব্যাপিত্ব ব্যবহার হয় মাত্র; কিন্তু আকাশ স্বরূপতঃ কোথায় যায়ও না, কিংবা কোথা হইতে আইসেও না। গমন হইতেছে এক-স্থানস্থ বস্তুর অপর স্থানে সম্বন্ধের প্রযোজক; সেই গমনরূপ ক্রিয়াটি নির্বিশেষে অর্থাৎ যাহার পক্ষে কখনও স্বস্থান ত্যাগ বা স্থানান্তর- প্রাপ্তি হয় না, সেই আকাশে কখনও সম্ভবপর হয় না, এবং অপরাপর ধর্মগত প্রভেদও তাহাতে থাকিতে পারে না। পরমাণু প্রভৃতির অবস্থাও এইরূপ। পরমাণু অর্থ—গন্ধময়ী পৃথিবীর পরম সূক্ষ্ম অবয়ব; তাহাও গন্ধাত্মকই বটে। সুতরাং গন্ধাত্মক পরমাণুর আবার গন্ধবত্তা(গন্ধযোগ) কখনই কল্পনা করা যাইতে পারে না। যদি বল যে,[গন্ধাত্মক পার্থিব পরমাণুর গন্ধবত্তা বরং না হয়, না হউক, কিন্তু] তাহাতে রসাদি ধৰ্ম্ম থাকিতে বাধা কি? না, সে কথাও বলিতে পার না; কারণ, তাহাতে যে, রসাদি-গুণযোগ বা রসাদি-ধর্মসম্বন্ধ, জল প্রভৃতি অপর পদার্থের সম্বন্ধই তাহার কারণ;[উহা তাহার স্বাভাবিক নহে]। অতএব নিরবয়ব পদার্থের যে, অনেক প্রকার ধর্মসম্বন্ধ আছে বা হইতে পারে, তদ্বিষয়ে কোনও দৃষ্টান্ত নাই। ইহা দ্বারা, পরমাত্মগত দর্শনাদি শক্তির যে, চক্ষুঃ ও রূপাদিভেদে পৃথক্ পৃথক্ পরিণামভেদ কল্পনা, তাহাও নিরস্ত হইল(১)॥ ২৭৬—২৮২ ॥ ২৪—৩০ ॥

যত্র বাঘাদিব স্যাৎ তত্রোদ্যমং পশ্যেনোদ্যমঞ্চি-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৫৯

দন্যোহন্যদ্রসয়েদন্যোহন্যদ্বদেদন্যোহন্যচ্ছৃণুদাদন্যোহন্যন্মথীতাশ্যো- হন্যৎ স্পৃশেদন্যোহন্যদ্বিজানীয়াৎ ॥ ২৮৩ ॥ ৩১ ॥

সম্বলার্থঃ।—[ইদানীম্ আত্মনো বিশেষদর্শনে নিদানমাহ—“যত্র বৈ” ইত্যাদিনা।] যত্র(অবস্থায়াং জাগরণে স্বপ্নে চ) অন্যৎ ইব(আত্মনঃ পৃথগ্‌- ভূতম্ ইব বস্তুরং) স্যাৎ(অবিদ্যয়া প্রত্যুপস্থাপিতং ভবেৎ), তত্র(স্বপ্ন- জাগরয়োঃ) অন্যঃ(বিষয়াৎ ভিন্নমিব আত্মানং মন্যমানঃ) অন্যৎ(বস্তু) পশ্যেৎ (উপলভেত); তথা, অন্যঃ অন্যৎ জিঘ্রেৎ; অন্যঃ অন্যৎ রসয়েৎ; অন্যঃ অন্যৎ বদেৎ; অন্যঃ অন্যৎ শৃণুয়াৎ; অন্য অন্যৎ মন্বীত; অন্যঃ অন্যৎ স্পৃশেৎ; অন্যঃ অন্যৎ বিজানীয়াৎ।[ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ] ॥২৮৩৷৷৩১৷৷

মূলানুবাদ।—সর্বাত্মভাবাপন্ন আত্মার বিশেষ দর্শন যে, কেন হয়, এখন তাহা বলা হইতেছে। যে সময় অর্থাৎ স্বপ্ন ও জাগরণাবস্থায় অন্যের মত হয়, অর্থাৎ অবিদ্যাবশতঃ আত্মাতিরিক্ত অপর বস্তুই যেন উপ- স্থাপিত হয়, এইজন্য তখন অন্যে অন্য বিষয় দর্শন করে; অন্যে অন্য বিষয় আঘ্রাণ করে; অন্যে অন্য বিষয় আস্বাদন করে; অন্যে অন্য বিষয় বলে; অন্যে অন্য বিষয় শ্রবণ করে; অন্যে অন্য বিষয় মনন করে; অন্যে অন্য বিষয় স্পর্শ করে; এবং অন্যে অন্য বিষয় বিশেষ ভাবে জানে ॥২৮৩৷৷৩১৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্।—জাগ্রৎ-স্বপ্নয়োরিব যৎ বিজানীয়াৎ, তৎ দ্বিতীয়ং প্রবিভক্তম্ অন্যত্বেন নাস্তীত্যুক্তম্; অতঃ সুষুপ্তে ন বিজানাতি বিশেষম্। ননু যদি অস্যায়মের স্বভাবঃ, কিংনিমিত্তমস্য বিশেষবিজ্ঞানং স্বভাবপরিত্যাগেন? অথ বিশেষবিজ্ঞানমেব স্বভাবঃ, কস্মাদেষ বিশেষং ন বিজানাতীতি? উচ্যতে, শৃণু,—যত্র যস্মিন্ জাগরিতে স্বপ্নে বা অন্যদিবাত্মনো বস্তুন্তরমির অবিদ্যয়া প্রত্যুপস্থাপিতং ভবতি, তত্র তস্মাদবিদ্যাপ্রত্যুপস্থাপিতাৎ অন্যঃ অন্যমিবাত্মানং মন্যমানঃ অসত্যাত্মনঃ প্রবিভক্তে বস্তুন্তরে, অসতি চাত্মনি ততঃ প্রবিভক্তে, অন্যঃ অন্যৎ পশ্যেৎ উপলভেত। তচ্চ দর্শিতং স্বপ্নে প্রত্যক্ষতঃ “—ঘ্নন্তীব জিনন্তীব” ইতি। তথা অন্যোহন্যৎ জিহ্রেৎ রসয়েদ্ বদেৎ, শৃণুয়াৎ, মন্বীত-স্পৃশেদ্বিজা- নীয়াদিতি ॥২৮৩৷৷৩১৷৷

টাকা। ঔপাধিকো দৃষ্ট্যাদিভেদো ন বাস্তবোহস্তীত্যুপপাদ্য বৃত্তমনুদ্রবতি-জাগ্রদিতি। যত্রেত্যুত্তরবাক্যব্যাবর্ত্যামাশঙ্কাং দর্শয়তি-নন্বিতি। কিমস্য বিশেষবিজ্ঞানরাহিত্যং স্বরূপম্, কিং বা বিশেষবিজ্ঞানবস্ত্বম্। আদ্যে জাগ্রৎস্বপ্নয়োরমুপপত্তিঃ। দ্বিতীয়ে সুষুপ্তেরসিদ্ধিরিতি

১১৬০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ভাবঃ। প্রতীচশ্চিন্মাত্রজ্যোতিষো বিশেষবিজ্ঞানরাহিত্যমেব স্বরূপং, তথাপি স্বাবিদ্যাকল্পিত- বিশেষবিজ্ঞানবত্ত্বমাশ্রিত্যাবস্থাদ্বয়ং সিধ্যতীত্যুত্তরবাক্যমবলম্ব্যোত্তরমাহ—উচ্যত ইত্যাদিনা। তচ্চেত্যাবিদ্যং দর্শনমিত্যর্থঃ ॥২৮৩॥১১॥

ভাষ্যানুবাদ।—জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থার ন্যায় সুষুপ্তি অবস্থায়ও যাহা জানিতে পারা যায়, এমন আত্মব্যতিরিক্ত কোনও দ্বিতীয় বস্তু সুষুপ্তি সময়ে থাকে না; এই কারণেই সুষুপ্তি সময়ে পুরুষ কোনও বিষয় জানিতে পারে না; এ কথা ইতঃপূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে।

এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, ইহাই(বিশেষ বিজ্ঞানাভাবই) যদি ইহার স্বভাব হয়, তাহা হইলে,[জাগ্রৎ ও স্বপ্নে] বিশেষ জ্ঞান হয় কি কারণে? আর যদি বিশেষ বিজ্ঞানই ইহার স্বভাবসিদ্ধ হয়, তাহা হইলেই বা[সুষুপ্তি সময়ে] বিজ্ঞান থাকে না কেন?[যে কারণে এইরূপ হয়,] তাহা বলা হইতেছে; শ্রবণ কর; যে সময়ে-জাগরণে কিংবা স্বপ্নে যেন অন্যের মতই হয়, অর্থাৎ আত্মা হইতে স্বতন্ত্র বস্তুই যেন অবিদ্যা দ্বারা উপস্থাপিত হয়, সেই উভয় অবস্থায়, পুরুষ অবিদ্যা-প্রত্যুপস্থাপিত বস্তু হইতে অন্য অর্থাৎ আত্মা হইতে বিভক্ত অন্য বস্তু না থাকিলেও আপনাকে অন্যের ন্যায় পৃথক্ বস্তু মনে করিয়া, এবং অবিদ্যা-প্রত্যু- পস্থাপিত বিষয় হইতে আত্মা পৃথক্ না হইলেও, তখন ভ্রান্তিবশতঃ অন্যে অন্য বস্তু দর্শন করে, উপলব্ধি করে; ইহা ইতঃপূর্ব্বে স্বপ্নাবস্থায় ‘যেন হতই করে, যেন বশী- ভূতই করে’ ইত্যাদি বাক্যেও প্রদর্শিত হইয়াছে। এইরূপ, অপরে অপরকে আঘ্রাণ করে, আস্বাদন করে, বলে, শ্রবণ করে, মনন করে, স্পর্শ করে, এবং অনু- ভব করে ॥২৮৩৷৷৩১৷৷

সলিল একো দ্রষ্টাদ্বৈতো ভবত্যেষ ব্রহ্মলোকঃ সম্রাড়িতি হৈনমনুশশাস যাজ্ঞবল্ক্যঃ। এষাস্য পরমা গতিরেষাস্য পরমা সম্পদেযোহস্য পরমো লোক এযোহস্য পরম আনন্দঃ, এতস্যৈ- বানন্দস্যান্যানি ভূতানি মাত্রামুপজীবন্তি ॥ ২৮৪ ॥ ৩২ ॥

সরলার্থঃ।—[তদানীম্ অবিদ্যায়াঃ প্রশান্তত্বেন আত্মনঃ সম্প্রসাদমুপ- সংহরন্ আহ—“সলিলঃ” ইত্যাদি।][অপি চ, তদানীং স পুরুষঃ] সলিলঃ(জল- মিব স্বচ্ছঃ), একঃ(দ্বিতীয়রহিতঃ), দ্রষ্টা(আত্মজ্যোতিঃস্বভাবঃ) অদ্বৈতঃ (দ্রষ্টব্যাভাবাৎ দ্বৈতহীনঃ) ভবতি। হে সম্রাট্(জনক), এষঃ(সম্প্রসাদঃ) ব্রহ্মলোকঃ(ব্রহ্মৈব লোকঃ—ব্রহ্মলোকঃ, সর্ব্বোপাধিপরিত্যাগাৎ স্বরূপমাপন্নঃ

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৬১

ইত্যর্থঃ); অন্য(আত্মনঃ) এষা পরমা গতিঃ(উত্তমা প্রাপ্তিঃ), অন্য এষা পরমা সম্পদ(উত্তমা বিভূতিঃ), অন্য এষঃ পরমঃ লোকঃ(সর্ব্বোত্তমং স্থানং), অন্য এষঃ পরমঃ(নিরতিশয়ঃ) আনন্দঃ; অন্যান্য ভূতানি(অবিদ্যয়া পৃথকত্বেন স্থিতাঃ প্রাণিনঃ) এতস্য আনন্দস্য এব মাত্রাৎ(কলাং অংশং) উপজীবন্তি (ভজন্তে), ইতি হ এনং(জনকং) যাজ্ঞবল্ক্যঃ অনুশশাস(উপদিষ্ট- বান্) ॥২৮৪৷৷৩২৷৷

মূলানুবাদ?—পুনশ্চ সম্প্রসাদকালীন আত্মায় স্বরূপ উপ- সংহার করিয়া বলিতেছেন—‘সলিলঃ’ ইত্যাদি[সংপ্রসাদ সময়ে] পুরুষ জলের ন্যায় স্বচ্ছ(নির্ম্মল) হয়, এবং এক অদ্বিতীয় দ্রষ্টাস্বরূপে প্রকটিত হয়।

হে সম্রাট্ জনক, ইহাই আত্মার ব্রহ্মলোক অর্থাৎ ব্রহ্মরূপী আশ্রয়, ইহাই ইহার পরমা গতি(গন্তব্য স্থান), ইহাই ইহার পরম সম্পদ, ইহাই ইহার সর্বোত্তম লোক, এবং ইহাই ইহার সর্বোত্তম আনন্দ। অবিদ্যাবশতঃ বিভিন্নাকারে প্রকটিত প্রাণিগণ এই পরমানন্দেরই অংশমাত্র উপভোগ করিয়া থাকে। যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি সম্রাট্ জনককে এই প্রকার উপদেশ দিয়াছিলেন ॥ ২৮৪ ॥ ৩২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—যত্র পুনঃ সা অবিদ্যা সুযুপ্তে বস্তুন্তরপ্রত্যুপস্থাপিকা শান্তা, তেনান্যত্বেনাবিদ্যা প্রবিভক্তস্য বস্তুনোহভাবাৎ তৎ কেন কং পশ্যেৎ জিহ্রেৎ বিজানীয়াৎ বদেদ্বা; অতঃ স্বেনৈব হি প্রাজ্ঞেনাত্মনা স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাবেন সম্পরিষক্তঃ সমস্তঃ সম্প্রসন্নঃ, আপ্তকামঃ, আত্মকামঃ, সলিলবৎ স্বচ্ছীভূতঃ—সলিল ইব সালিলঃ, একঃ, দ্বিতীয়স্যাভাবাৎ; অবিদ্যয়া হি দ্বিতীয়ঃ প্রবিভজ্যতে; সা চ শান্তা অত্র, অত একঃ; দ্রষ্টা দৃষ্টেরবিপরিলুপ্তত্বাৎ আত্মজ্যোতিঃস্বভাবায়াঃ; অদ্বৈতে দ্রষ্টব্যস্য দ্বিতীয়স্যাভাবাৎ। এতদমৃতম্ অভয়ম্; এব ব্রহ্মলোকঃ, ব্রহ্মৈব লোকঃ ব্রহ্মলোকঃ; পর এবায়মস্মিন্ কালে ব্যাবৃত্তকার্য্যকরণোপাধিভেদঃ স্বে আত্মজ্যোতিষি—শান্ত-সর্ব্বসম্বন্ধো বস্তুতে, হে সম্রাট্, ইতি হ এবং হ, এনং জনকম্ অনুশশাস অনুশিষ্টবান্ যাজ্ঞবল্ক্যঃ—ইতি শ্রু‘তবচনমেতৎ। ১

টীকা। পূর্ব্বোক্তবস্তুপসংহারাথং সলিলবাক্যমুখাপয়তি—যত্রেত্যাদিনা। তেনাবিদ্যায়াঃ শান্তত্বেনেতি যাবৎ। বস্তুনোহভাবাৎ তত্রেতি শেষঃ। সুষুপ্তে বিশেষবিজ্ঞানাভাবপ্রযুক্তং ফলমাহ—অত ইতি। পূর্ব্বমেবাস্তার্থস্তোত্তত্বং দ্যোতয়িতুং হি-শব্দঃ। সংপরিধঙ্গফলং

১১৬২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

সমস্তত্বমপরিচ্ছিন্নত্বং, তৎফলং সম্প্রসন্নত্বম্। অসম্প্রসাদো হি পরিচ্ছেদাভিমানকৃতঃ। সম্প্রসন্নত্বে হেত্বন্তরমাহ-আপ্তকাম ইতি। তদেব সম্প্রসন্নত্বং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি-সলিলবদিতি। উক্তেহর্থে বাক্যাক্সরাণি যোজয়তি-সলিল ইবেতি। দ্বিতীয়স্যাভাবং সুষুপ্তে ব্যক্তীকরোতি- অবিদ্যয়েতি। অদ্রষ্টা দ্রষ্টেতি বা ছেদঃ। একোহদ্বৈত ইত্যভ্যাসস্তাৎপর্যলিঙ্গং, তস্য পরম- পুরুষার্থত্বৎ দর্শয়ন্ কূটস্থত্বমাহ-এতদিতি। কিমিতি ষষ্ঠীসমাসমুপেক্ষ্য কৰ্ম্মধারয়ো গৃহ্যতে, তত্রাহ-পর এবেতি। অস্মিন্ কালে সুষুপ্ত্যবস্থায়ামিত্যেতৎ। ১

কথং বা অনুশশাস?—এষা অন্য বিজ্ঞানময়স্য পরমা গতিঃ, যান্তু অন্যা দেহ- গ্রহণলক্ষণা ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্য্যন্তাঃ, অবিদ্যাকল্পিতাঃ তা গতয়ঃ অতোহপরমাঃ, অবিদ্যা- বিষয়ত্বাৎ; ইয়ন্তু দেবত্বাদিগতীনাং কৰ্ম্মবিদ্যাসাধ্যানাং পরমা উত্তমা—যঃ সমস্তাত্মভাবঃ, যত্র নান্যৎ পশ্যতি, নান্যৎ শূণোতি, নান্যৎ বিজানাতীতি। এষৈব চ পরমা সম্পৎ—সর্ব্বাসাং সম্পদাং বিভুতীনাম্ ইয়ং পরমা, স্বাভাবিকত্বাদস্যাঃ; কৃতকা হি অন্যাঃ সম্পদঃ। তথা এষোহস্য পরমো লোকঃ; যে অন্যে কর্মফলাশ্রয়া লোকাঃ, তে অস্মাৎ অপরমাঃ, অয়ন্তু ন কেনচন কৰ্ম্মণা মীয়তে, স্বাভাবিকত্বাৎ। এষোহস্য পরমো লোকঃ। তথা এষোহস্য পরম আনন্দঃ; যানি অন্যান্যি বিষয়েন্দ্রিয়সম্বন্ধ-জনিতানি আনন্দজাতানি, তান্যপেক্ষ্য এষোহস্য পরম আনন্দঃ, নিত্যত্বাৎ; “যো বৈ ভূমা তৎ সুখম্” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ; যত্র অন্যৎ পশ্যতি অন্য- দ্বিজানাতি, তদল্পং মর্ত্যমমুখ্যং সুখম্; ইদং তু তদ্বিপরীতম্; অতএব এষোহস্য পরম আনন্দঃ। ২

পরমত্বং সাধয়তি—যাস্থিতি। প্রস্তুতং সমস্তাত্মভাবং বিশেষবিজ্ঞানরাহিত্যেন বিশিনষ্টি— যত্রেতি। সর্ব্বাত্মভাবাখ্যস্য লোকস্য পরমত্বমুপপাদয়তি—যেহন্য ইতি। মীয়তে পরিচ্ছিদ্যতে সাধ্যত ইতি যাবৎ। সৌপ্তস্থ্য সর্ব্বাত্মভাবস্য পরমানন্দত্বং বিশদয়তি—যানীতি। আত্মনোহ- নবচ্ছিন্নানন্দত্বে ছান্দোগ্যশ্রুতিং সংবাদয়তি—যো বৈ ভূমেতি। ২

এতস্যৈবানন্দস্য মাত্রাৎ কলাম্ অবিদ্যাপ্রত্যুপস্থাপিতাং বিষয়েন্দ্রিয়সম্বন্ধ-কাল- বিভাব্যাম্ অন্যানি ভূতানি উপজীবন্তি। কানি তানি? তত এবানন্দাৎ অবিদ্যয়া প্রবিভজ্যমানস্বরূপাণি, অন্যত্বেন তানি ব্রহ্মণঃ পরিকল্প্যমানানি অন্যানি সন্তি উপজীবন্তি ভূতানি, বিষয়েন্দ্রিয়সম্পর্কদ্বারেণ বিভাব্যমানাম্ ॥২৮৪৷৷৩২৷৷

ননু বৈষয়িকমেকং সুখমাত্মরূপং চাপরমিতি সুখভেদাঙ্গীকারাদপসিদ্ধান্তঃ স্যাদিত্যাশঙ্ক্য মুখ্যামুখ্যভেদেন তদুপপত্তৈর্ম্মৈবমিত্যাহ—যত্রেত্যাদিনা। কিঞ্চ বস্তুতো নাস্ত্যেবাত্মসুখাতিরিক্তং বৈষয়িকং সুখমিত্যাহ—এতস্যেতি। ব্রহ্মাতিরিক্তচেতনাভাবে কাম্যুপজীবকানি স্যরিত্যাশঙ্ক্য পরিহরতি—কানীত্যাদিনা। বিভাব্যমানামানন্দস্য মাত্রামিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ ॥২৮৪॥৩২॥

ভাষ্যানুসারে।—যে পরশ—সুধুরি নয়, পরশ-ধারিয়া নয়। সেই

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১১৬৩

অবিদ্যা দ্বারা উপস্থাপিত বস্তুভেদ না থাকায়, কে কিসের দ্বারা কাহাকে দেখিবে, আঘ্রাণ করিবে, অথবা চিন্তা করিবে? অতএব সে সময়ে নিজের প্রকৃত স্বরূপ স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাব প্রাজ্ঞ পরমাত্মার সহিত সম্মিলিত হইয়া এইরূপে প্রকটিত হয়, —ইন্দ্রিয়সম্বন্ধ ত্যাগ করতঃ সম্প্রসন্ন, আপ্তকাম, আত্মকাম, জলের ন্যায় স্বচ্ছস্বভাব হয়। এখানে ‘সলিল’ অর্থ—সলিলের মত; দ্বিতীয় বস্তু না থাকায় এক; কারণ, অবিদ্যাই দ্বিতীয় বস্তুবিষয়ক ভ্রম উৎপাদন করে; সুষুপ্তিসময়ে সেই অবিদ্যা নির্ব্যাপার হইয়া পড়ে; কাজেই তখন এক; দ্রষ্টা—আত্মজ্যোতিঃস্বরূপ দৃষ্টি কখনও বিলুপ্ত হয় না, এইজন্য দ্রষ্টা; এবং দর্শন-যোগ্য দ্বিতীয় কোনও পদার্থ থাকে না বলিয়াই তখন অদ্বৈতরূপে প্রকাশ পায়। ইহা অমৃত ও অভয়; ইহা ব্রহ্মলোক; ব্রহ্মলোক অর্থ—ব্রহ্মস্বরূপ লোক; এই সুষুপ্তিসময়ে পুরুষ দেহে- ন্দ্রিয়াদি উপাধিভেদ হইতে বিনির্মুক্ত হইয়া এবং সর্ব্ববিধ সম্বন্ধশূন্য হইয়া পরমাত্ম- স্বরূপ স্বীয় আত্মজ্যোতিরূপে অবস্থান করে; এইরূপে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি জনককে ‘সম্রাট্’ বলিয়া সম্বোধনপূর্ব্বক অনুশাসন বা উপদেশ দিয়াছিলেন।

কি প্রকার অনুশাসন করিয়াছিলেন? না, এই বিজ্ঞানময় জীবের ইহাই পরমা গতি; ব্রহ্মা হইতে তৃণপর্য্যন্ত শরীর-গ্রহণাত্মক অপর যে সমস্ত গতি, সে সমুদয় গতি অবিদ্যা-কল্পিত; সুতরাং পরম বা উৎকৃষ্ট নহে; কারণ, ঐ সমস্ত গতি অবিদ্যাধিকারে স্থিত; কিন্তু যাহা সর্ব্বাত্মভাবময়, যাহাতে অন্য বিষয়ের দর্শন, শ্রবণ ও চিন্তা থাকে না, তাহা উপাসনা ও কৰ্ম্মলভ্য দেবতাদিরূপ গতি অপেক্ষা পরম(উত্তম)। ইহাই পরমা সম্পদ, অর্থাৎ যতপ্রকার সম্পদ বা ঐশ্বর্য্য আছে, তন্মধ্যে ইহাই সর্বোত্তম; কারণ, এই সম্পদ হইতেছে স্বাভাবিক-স্বতঃসিদ্ধ; অপর সমস্ত সম্পই কৃতক অর্থাৎ ক্রিয়াসাধ্য(অনিত্য)। এইরূপ, ইহাই আত্মার পরম লোক; অপর যে সমুদয় লোক(ভোগস্থান) কর্মফলে লাভ করা যায়, সে সমুদয় লোক এতদপেক্ষা অপরম বা নিকৃষ্ট; কিন্তু এই অবস্থাটি কোন কৰ্ম্ম দ্বারা পরিচ্ছিন্ন নহে; পরন্তু ইহা পুরুষের স্বাভাবিক; এই জন্য ইহা আত্মার পরম লোক। এইরূপ উক্ত অবস্থাই ইহার পরম আনন্দ; বিষয়েন্দ্রিয়-সম্বন্ধজনিত অপর যে সমস্ত অনিত্য আনন্দ, সে সমুদয়ের অপেক্ষা ইহাই আত্মার পরম আনন্দ; কারণ, ইহা নিত্য; অপর শ্রুতিতে আছে-‘যাহা ভূমা বা মহৎ, তাহাই সুখ’; পক্ষান্তরে, যেখানে অন্য বস্তু দৃষ্ট হয়, অন্য বস্তু বিজ্ঞাত হয়, তাহা অল্প-মর্ত্য (ক্ষয়শীল) অমুখ্য সুখ; উক্ত সুখ তাহার বিপরীত; এই কারণেই ইহা আত্মার পরম আনন্দ। ২

১১৬৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

উপরে যে আনন্দের কথা বলা হইল, এই আনন্দেরই কলা—মাত্রা অর্থাৎ অংশমাত্র—যাহা অবিদ্যা দ্বারা উপস্থাপিত হইয়া বিষয় ও ইন্দ্রিয়ের সম্বন্ধকালে অনুভবগোচর হইয়া থাকে, সেই আনন্দমাত্রাকে অপরাপর ভূতবর্গ ভোগ করিয়া থাকে। সেই সমুদয় ভূত কাহারা? না, যাহারা অবিদ্যা দ্বারা সেই আনন্দ হইতেই বিভক্ত বা পৃথক্ হইয়া রহিয়াছে; ব্রহ্ম হইতে স্বতন্ত্রভাবাপন্নবৎ সেই সমস্ত প্রাণী বিষয়েন্দ্রিয়-সম্পর্ক বশতঃ অভিব্যক্ত আনন্দের অংশমাত্র[ভোগ করিয়া থাকে] ॥২৮৪৷৷৩২৷৷

স যো মনুষ্যাণাং রাদ্ধঃ সমৃদ্ধো ভবত্যন্যেষামধিপতিঃ সর্ব্বৈৰ্ম্মানুয্যকৈর্ভোগৈঃ সম্পন্নতমঃ, স মনুষ্যাণাং পরম আনন্দঃ, অথ যে শতং মনুষ্যাণামানন্দাঃ স একঃ পিতৃণাং জিতলোকা- নামানন্দঃ, অথ যে শতং পিতৃণাং জিতলোকানামানন্দাঃ, স একো গন্ধর্ব্বলোক আনন্দঃ, অথ যে শতং গন্ধর্ব্বলোক আনন্দাঃ, স একঃ কৰ্মদেবানামানন্দঃ,-যে কৰ্ম্মণা দেবত্বমভিসম্পদ্যন্তে; অথ যে শতং কৰ্ম্মদেবানামানন্দাঃ স এক আজানদেবানামানন্দঃ, যশ্চ শ্রোত্রিয়োহবৃজিনোহকামহতঃ, অথ যে শতমাজান- দেবানামানন্দাঃ স একঃ প্রজাপতিলোক আনন্দো যশ্চ শ্রোত্রিয়োহবৃজিনোহকামহতঃ, অথ যে শতং প্রজাপতিলোক- আনন্দাঃ স একো ব্রহ্মলোক আনন্দো যশ্চ শ্রোত্রিয়োহবৃজিনো- হকামহতঃ, অথৈষ এব পরম আনন্দঃ, এষ ব্রহ্মলোকঃ সম্রাড়িতি হোবাচ যাজ্ঞবল্ক্যঃ। সোহহং ভগবতে সহস্রং দদাম্যত ঊর্দ্ধং বিমোক্ষায়ৈব ক্রহীত্যত্র হ যাজ্ঞবল্ক্যো বিভয়াঞ্চকার-মেধাবী রাজা সর্ব্বেভ্যো মাহন্তেভ্য উদরৌৎসীদিতি ॥ ২৮৫ ॥ ৩৩ ॥

সন্মলার্থঃ।—[পূর্ব্বোক্তস্য পরমানন্দস্য স্বরূপমুপদর্শয়িতুৎ দৃষ্টান্তমাহ— “স যঃ” ইতি।] মনুষ্যাণাৎ মধ্যে সঃ যঃ(যঃ কশ্চিৎ) রাদ্ধঃ(সুসিদ্ধঃ সকলাবয়ব- সম্পন্নঃ) সমৃদ্ধঃ(ঐশ্বর্য্যবান্) অন্যেষাৎ(সঙ্গতীয়ানাম্) অধিপতিঃ(প্রভুঃ) সর্ব্বৈঃ মানুষ্যকৈঃ(মনুষ্যোচিতৈঃ) ভোগৈঃ(ভোগ্যপদার্থৈঃ) সম্পন্নতমঃ (অতিশয়েন সম্পন্নঃ) ভবতি, মনুষ্যাণাৎ সঃ পরম আনন্দঃ; অথ(অনন্তরং)

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৬৫

মনুষ্যাণাৎ যে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ জিতলোকানাং পিতৃণাম্ এক আনন্দঃ; অথ জিতলোকানাং পিতৃণাৎ যে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ গন্ধর্ব্বলোকে এক আনন্দঃ; অথ গন্ধর্ব্বলোকে যে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ কৰ্ম্মদেবানাং-যে কৰ্মণা(যজ্ঞাদিনা) দেবত্বম্ অভিসম্পদ্যন্তে,[তেষাম্] এক আনন্দঃ; অথ কৰ্ম্মদেবানাং যে শতৎ আনন্দাঃ, সঃ আজানদেবানাং-যশ্চ অবৃজিনঃ(নিষ্পাপঃ) অকামহতঃ(নিষ্কামঃ) শ্রোত্রিয়ঃ(বেদবিৎ),[তস্য চ] এক আনন্দঃ; অথ আজানদেবানাং যে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ প্রজাপতিলোকে এক আনন্দঃ; যঃ চ অবৃজিনঃ, অকামহতঃ শ্রোত্রিয়ঃ,[তস্য চ একঃ আনন্দঃ]। অথ প্রজাপতিলোকে যে শতম্ আনন্দাঃ, সঃ ব্রহ্মলোকে এক আনন্দঃ; যঃ চ অবৃজিনঃ অকামহতঃ শ্রোত্রিয়ঃ,[তস্যচেতি পূর্ব্ববৎ]। অথ(অনন্তরং) যাজ্ঞবল্ক্যঃ উবাচ হ-হে সম্রাট, এষ এব পরমঃ আনন্দঃ, এষ ব্রহ্মলোকঃ-ইতি।[এতৎ শ্রুত্বা জনক আহ-] সঃ(ভবতা এবং প্রবোধিতঃ) অহৎ ভগবতে গবাৎ সহস্রৎ দদামি; অত ঊর্দ্ধং(অতঃপরং) বিমোক্ষায় এব ব্রূহি-ইতি।

অত্র(পুনঃপ্রার্থনায়াম্) যাজ্ঞবল্ক্যঃ বিভয়াঞ্চকার(ভীতঃ বভূব)।[ভয়- কারণমাহ-] মেধাবী(ধারণক্ষমবুদ্ধিসম্পন্নঃ) রাজা(জনকঃ) সর্ব্বেভ্যঃ অন্তেভ্যঃ (প্রশ্ন-নির্ণয়েভ্যঃ চরমতত্ত্বনির্ণয়ার্থমিতি যাবৎ) মা(মাৎ) উদরৌৎসীৎ(উপরোধৎ কৃতবান্),[মদীয়ৎ সর্ব্বং বিজ্ঞানং জ্ঞাতুমিচ্ছতীতি ভয়ং জাতং যাজ্ঞবল্ক্যস্যেতি ভাবঃ] ॥২৮৫৷৷৩৩৷৷

মূলানুবাদ:-মনুষ্যগণের মধ্যে যে কোন ব্যক্তি সুস্থ সর্বাবয়ব- সম্পন্ন, সমৃদ্ধিশালী, সর্বাপেক্ষা অধিক পরিমাণে এবং সর্বপ্রকারে মনুষ্যো- চিত ভোগোপকরণসমন্বিত ও লোকাধিপতি হয়; তাহার যে আনন্দ, তাহাই মনুষ্যগণের পক্ষে পরম আনন্দ; মনুষ্যগণের যে একশত আনন্দ, তাহা আবার জিতলোক(শ্রাদ্ধাদি কৰ্ম্ম দ্বারা যাহারা পিতৃলোক লাভ করিয়াছেন, সেই) পিতৃগণের পক্ষে এক আনন্দ; জিতলোক পিতৃগণের যে একশত আনন্দ, তাহা আবার গন্ধর্ব্ব-লোকের পক্ষে একটা মাত্র আনন্দ; আবার সেই গন্ধর্ব্বলোকের যে শত আনন্দ, কর্মদেবগণের—যাঁহারা শুভ কৰ্ম্ম দ্বারা দেবত্ব লাভ করিয়াছেন, তাঁহাদের একটা আনন্দ; কর্মদেবগণের যে শত-গুণিত আনন্দ, তাহাই আবার আজান দেবগণের(যাঁহারা প্রথমেই দেবতা হইয়া জন্মিয়াছেন, তাঁহাদের) এবং নিষ্পাপ ও নিষ্কাম

১১৬৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

শ্রোত্রিয়ের(বেদজ্ঞের) পক্ষে একটামাত্র আনন্দ; আবার আজান দেবগণের যাহা একশত আনন্দ, তাহাই প্রজাপতিলোকে একটামাত্র আনন্দের তুল্য, এবং যাহারা নিষ্পাপ ও নিষ্কাম শ্রোত্রিয়, তাহাদের পক্ষেও সেইরূপ; প্রজাপতিলোকের যে শত আনন্দ, তাহা আবার ব্রহ্মলোকে এবং নিষ্পাপ নিষ্কাম শ্রোত্রিয়ের নিকট একটী মাত্র আনন্দের তুল্য। অতঃপর যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন,—হে সম্রাট্, ইহাই পরম আনন্দ, ইহাই ব্রহ্মলোক।[অনন্তর জনক মহারাজ বলিলেন—] আমি মহাশয়কে সহস্র গো দান করিতেছি; আপনি অতঃপর মোক্ষোপায়ই উপদেশ করুন। একথায় যাজ্ঞবল্ক্য ভীত হইয়াছিলেন; কারণ, মেধাবী রাজা আমাকে সর্বাপেক্ষা শেষ সিদ্ধান্ত বলিবার জন্য অনুরোধ করিয়াছেন।[রাজা আমার সমস্ত বিজ্ঞান জানিবার চেষ্টা করিতেছেন—এই মনে করিয়া তিনি ভীত হইয়া- ছিলেন; কিন্তু নিজের জ্ঞান-দুর্বলতার জন্য নহে] ॥ ২৮৫ ॥ ৩৩ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—যস্য পরমানন্দস্য মাত্রা অবয়বাঃ ব্রহ্মাদিভিৰ্ম্মনুষ্য- পর্যন্তৈর্ভূতৈরুপজীব্যন্তে, তদানন্দমাত্রাদ্বারেণ মাত্রিণং পরমানন্দমধিজিগময়ি- যন্নাহ—সৈন্ধবলবণশকলৈরিব লবণশৈলম্। স যঃ কশ্চিৎ মনুষ্যাণাৎ মধ্যে রাদ্ধঃ— সংসিদ্ধোহবিকলঃ সমগ্রাবয়ব ইত্যর্থঃ, সমৃদ্ধঃ উপভোগোপকরণসম্পন্নঃ ভবতি; কিঞ্চ অন্যেষাং সমানজাতীয়ানাম্ অধিপতিঃ স্বতন্ত্রঃ পতিঃ, ন মাণ্ডলিকঃ; সর্ব্বৈঃ সমস্তৈঃ মানুষ্যকৈরিতি দিব্যভোগোপকরণনিবৃত্ত্যর্থম্—মনুষ্যাণামের যানি ভোগোপকরণানি, তৈঃ সম্পন্নানামপ্যতিশয়েন সম্পন্নঃ সম্পন্নতমঃ, স মনুষ্যাণাং পরম আনন্দঃ। ১

টীকা। স যো মনুষ্যাণামিত্যাদিবাক্যতাৎপর্য্যমাহ—যস্যেতি। যথা সৈন্ধবাবয়বৈঃ সৈন্ধবাচলং লোকো বোধয়তি, তথা তন্তানন্দস্য মাত্রা নাম অবয়বাস্তৎপ্রদর্শনদ্বারেণাবয়বিনং পরমানন্দমধিগময়িতুমিচ্ছন্ননন্তরো গ্রন্থঃ প্রবৃত্ত ইত্যর্থঃ। তাৎপর্য্যমুক্তাক্ষরাণি ব্যাচষ্টে—স যঃ কশ্চিদত্যাদিনা। রাদ্ধত্বমবিকলত্বং চেৎ, সমৃদ্ধত্বেন পুনরুক্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ—সমগ্রেতি। তদেব সমৃদ্ধত্বমপীত্যাশঙ্ক্য ব্যাকরোতি—উপভোগেতি। অন্তর্ব্বহিঃসম্পত্তিভেদাদপুনক্তিরিতি ভাবঃ। ন কেবলমুক্তমেব তস্য বিশেষণং, কিন্তু বিশেষণান্তরং চাস্তীত্যাহ—কিঞ্চেতি। বিশেষণ-তাৎপর্য্যমাহ—দিব্যেতি। তদনিবর্ত্তনে ত্বস্য বক্ষ্যমাণগন্ধর্ব্বাদিসম্ভর্ভাবঃ স্যাদিতি ভাবঃ। অতিশয়েন সম্পন্ন ইতি শেষঃ। ১

তব যোনিঃ কুণ্ডলং নিরাকারং ন বাপিচাপ্যতেজঃ; পরমানন্দ-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১১৬৭

স্যৈবেয়ং বিষয়বিষয্যাকারেণ মাত্রা প্রসূতেতি হি উক্তম্-‘যত্র বা অন্যদিব স্যাৎ’ ইত্যাদিবাক্যেন; তস্মাৎ যুক্তোহয়ং- ‘পরম আনন্দঃ’ ইত্যভেদনির্দেশঃ। যুধিষ্ঠিরাদিতুল্যো রাজা অত্রোদাহরণম্। দৃষ্টং মনুষ্যানন্দম্ আদিং কৃত্বা শত- গুণোত্তরোত্তরক্রমেণোন্নীয় পরমানন্দৎ-যত্র ভেদো নিবর্ততে, তমধিগময়তি। অত্রায়মানন্দঃ শতগুণোত্তরোত্তরক্রমেণ বর্দ্ধমানঃ যত্র বৃদ্ধিকাষ্ঠামনুভবতি-যত্র গণিতভেদো নিবর্ততে, অন্যদর্শন-শ্রবণ-মননাভাবাৎ; তৎ পরমানন্দং বিবক্ষ- ন্নাহ-অথ যে মনুষ্যাণাম্ এবম্প্রকারাঃ শতমানন্দভেদাঃ, স একঃ পিতৃণাম্; তেষাং বিশেষণং-জিতলোকানামিতি। শ্রাদ্ধাদিকৰ্ম্মভিঃ পিতন্ তোষয়িত্বা, তেন কৰ্ম্মণা জিতো লোকো যেষাম্, তে জিতলোকাঃ পিতরঃ, তেষাং পিতণাং জিতলোকানাৎ মনুষ্যানন্দশতগুণীকৃতপরিমাণ এক আনন্দো ভবতি, সোহপি শতগুণীকৃতো গন্ধর্ব্বলোক এক আনন্দো ভবতি। স চ শতগুণীকৃতঃ কর্মদেবানাম্ এক আনন্দঃ; অগ্নিহোত্রাদিশ্রৌতকর্মণা যে দেবত্বং প্রাপ্নুবন্তি, তে কৰ্ম্ম- দেবাঃ। ২

অভেদনির্দেশস্যাভিপ্রায়মাহ—তত্রেতি। প্রকৃতং বাক্যং সপ্তম্যর্থঃ। আত্মনঃ সকাশাদা- নন্দস্যেতি শেষঃ। ঔপচারিকত্বমভেদনির্দেশস্য ভবিষ্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ—পরমানন্দস্যেতি। তস্যৈব বিষয়ত্বং বিষয়িত্বমিতি স্থিতে ফলিতমাহ—তস্মাদিতি। যথোক্তো মনুষ্যো ন দৃষ্টি- প্রথমবতরতীত্যাশঙ্ক্যাহ—যুধিষ্ঠিরাদীতি। অথ যে শতং মনুষ্যাণামিত্যাদেস্তাৎপয্যমাহ— দৃষ্টমিতি। শতগুণেনোত্তরোত্তরানন্দস্যোৎকর্ষপ্রদর্শনক্রমেণ পরমানন্দমুন্নীয় তমধিগময়ত্যুত্তরেণ গ্রন্থেনেতি সম্বন্ধঃ। পরমানন্দমেব বিশিনষ্টি—যত্রেতি। ভেদঃ সংখ্যাব্যবহারঃ। উক্তমেব প্রপঞ্চয়তি—যত্রেত্যাদিনা। পরমানন্দে বিবৃদ্ধিকাষ্ঠায়াং হেতুমাহ—অন্যেতি। যদ্যপি যস্যেত্যাদিনোক্তমেতৎ, তথাপীহাক্ষরব্য’খ্যানাবসরে তদেব বিবৃতমিত্যবিরোধঃ। তত্তদানন্দ- প্রদর্শনানন্তয্যং তত্র তত্রার্থশব্দার্থঃ, তৎতদ্বাক্যোপক্রমো বা। এবংপ্রকারত্বং সমৃদ্ধত্বাদি। পিতৃণামানন্দ ইতি সম্বন্ধঃ। শ্রাদ্ধাদিকৰ্ম্মভিরিত্যাদিশব্দেন পিণ্ডপিতৃযজ্ঞাদি গৃহ্যতে। ২

তথৈব আজানদেবানাম্ এক আনন্দঃ; আ জানত এব উৎপত্তিত এব যে দেবাঃ, তে আজানদেবাঃ; যশ্চ শ্রোত্রিয়ঃ অধীতবেদঃ অবৃজিনঃ-বৃজিনং পাপৎ, তদ্রহিতঃ যথোক্তকারীত্যর্থঃ, অকামহতঃ বীততৃষ্ণঃ, আজানদেবেভ্যোহর্ব্বাক্ যাবন্তো বিষয়াঃ, তেষু, তস্য ‘চ এবংভূতস্যাজানদেবৈঃ সমান আনন্দ ইত্যেতদম্বা- কৃষ্যতে চ-শব্দাৎ। তচ্ছতগুণীকৃতপরিমাণঃ প্রজাপতিলোকে এক আনন্দো বিরাটশরীরে; তথা তদ্বিজ্ঞানবান্ শ্রোত্রিয়ঃ অধীতবেদশ অবৃজিন ইত্যাদি পূর্ব্ববৎ। তচ্ছতগুণীকৃতপরিমাণ এক আনন্দো ব্রহ্মলোকে হিরণ্যগর্ভাত্মনি; যশ্চেত্যাদি পূর্ব্ববদেব। ৩

১১৬৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

কে তে কৰ্ম্মদেবা নাম, তত্রাহ-অগ্নিহোত্রাদীতি। যথা গন্ধর্ব্বানন্দঃ শতগুণীকৃতঃ কৰ্ম্মদেবানামেক আনন্দস্তথা কৰ্ম্মদেবানন্দঃ শতগুণীকৃতঃ সন্নাজানদেবানামেক আনন্দো ভবতীত্যাহ-তথৈবেতি। কুত্র বীততৃষ্ণত্বং, তত্রাহ-আজানদেবেভ্য ইতি। শ্রোত্রিয়াদি- বাক্যস্য প্রকৃতাসঙ্গতিমাশঙ্ক্যাহ-তস্য চেতি। এবংভূতস্য বিশেষণত্রয়বিশিষ্টস্যেতি যাবৎ। প্রজাপতিলোকশব্দস্য ব্রহ্মলোকশব্দাদর্থভেদমাহ-বিরাড়িতি। যথা বিরা- ড়াত্মন্যাজানদেবানন্দঃ শতগুণীকৃতঃ সন্নেক আনন্দো ভবতি, তথা বিরাড়াত্মোপাসিতা শ্রোত্রিয়ত্বাদিবিশেষণো বিরাজা তুল্যানন্দঃ স্যাদিত্যাহ-তথেতি। তচ্ছতগুণীকৃতেতি তচ্ছব্দো বিরাড়ানন্দবিষয়ঃ। শ্রোত্রিয়ত্বাদিবিশেষণবানপি হিরণ্যগর্ভোপাসকত্বেন তুল্যানন্দো ভবতীত্যাহ-যশ্চেতি। ৩

অতঃপরং গণিতনিবৃত্তিঃ; এষ পরম আনন্দ ইত্যুক্তঃ, যস্য চ পরমানন্দস্য ব্রহ্মলোকাদ্যানন্দা মাত্রাঃ—উদধেরিব বিপ্রুষঃ; এবং শতগুণোত্তরোত্তরবৃদ্ধ্যুপেতা আনন্দাঃ যত্র একতাং যান্তি, যশ্চ শ্রোত্রিয়প্রত্যক্ষঃ, অথ এষ এব সম্প্রসাদলক্ষণঃ পরম আনন্দঃ; তত্র হি নান্যৎ পশ্যতি, নান্যৎ শূণোতি, অতো ভূমা; ভূমত্বাদ- মৃতঃ; ইতরে তদ্বিপরীতা আনন্দাঃ। অত্র চ শ্রোত্রিয়ত্বাবৃজিনত্বে তুল্যে; অকামহতত্বকৃতো বিশেষ আনন্দশতগুণবৃদ্ধিহেতুঃ। ৪

হিরণ্যগর্ভানন্দাদুপরিষ্টাদপি ব্রহ্মানন্দে গণিতভেদে প্রাকরণিকে প্রাপ্তে, প্রত্যাহ-অতঃ পরমিতি। এযোহস্য পরম আনন্দ ইত্যুপক্রম্য কিমিত্যানন্দান্তরমুপদর্শিতমিত্যাশঙ্ক্যাহ- এষ ইতি। তথাপি সৌযুপ্তং সর্ব্বাত্মত্বমুপেক্ষিতমিতি চেন্নেত্যাহ-যন্য চেতি। প্রকৃতস্য ব্রহ্মানন্দস্যাপরিচ্ছিন্নত্বমাহ-তত্র হীতি। অনবচ্ছিন্নত্বফলমাহ-ভূমত্বাদিতি। ব্রহ্মানন্দাদিতরে পরিচ্ছিন্না মর্ত্যাশ্চেত্যাহ-ইতর ইতি। অথ যত্রান্যৎ পশ্যতীত্যাদিশ্রুতেরিতি ভাবঃ। শ্রোত্রিয়াদিপদানি ব্যাখ্যায় তাৎপয্যং দশয়তি-অত্র চেতি। মধ্যে বিশেষণেষু ত্রিঘিতি যাবৎ। তুলে: সর্ব্বপর্যায়েধিতি শেষঃ। বিশেষণান্তরে বিশেষমাহ-অকামহতত্বেতি। ৪

অত্রৈতানি সাধনানি শ্রোত্রিয়ত্বাবৃজিনত্বাকামহতত্বানি তস্য তস্যানন্দস্য প্রাপ্তাবর্থাদভিহিতানি, যথা কর্মাণি অগ্নিহোত্রাদীনি দেবানাং দেবত্বপ্রাপ্তৌ। তত্র চ শ্রোত্রিয়ত্বাবৃজিনত্বলক্ষণে কৰ্ম্মণী অধরভূমিঘপি সমানে, ইতি নোত্তরা- নন্দপ্রাপ্তিসাধনে অভ্যুপেয়েতে; অকামহতত্ত্বৎ তু বৈরাগ্য-তারতম্যোপপত্তে- রুত্তরোত্তরভূম্যানন্দপ্রাপ্তিসাধনমিত্যবগম্যতে। স এষ পরম আনন্দঃ বিতৃষ্ণ- শ্রোত্রিয়প্রত্যক্ষোহধিগতঃ। তথা চ বেদব্যাসঃ—

“যচ্চ কামসুখং লোকে যচ্চ দিব্যং মহৎ সুখম্।

কৃষ্ণকন্যার গৃহস্থালীতে নাইবঃ বোড়শী কলাম্ ॥ ইতি।

এবং বক্রলোকঃ, যে গবাদি পশুগণঃ। গোরক্ষকং যদুনিধিঃ।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।
১১৬৯

ভগবতে তুভ্যং সহস্রং দদামি গবাম্; অত ঊর্দ্ধং বিমোক্ষায়ৈব ভ্রূহীতি ব্যাখ্যাত- মেতৎ। ৫

যথোক্তং বিভাগমুপপাদয়িতুং সিদ্ধমর্থমাহ—অত্রৈতানীতি। যশ্চেত্যাদিবাব্যং সপ্তম্যর্থঃ। তস্য তস্যানন্দস্যেতি। দৈবপ্রাজাপত্যাদিনিৰ্দ্দেশঃ। অর্থাদভিহিতত্বে দৃষ্টান্তমাহ—যথেতি। যে কৰ্ম্মণা দেবত্বমিত্যাদিশ্রুতিসামর্থ্যাদ্দেবানন্দাপ্তৌ যথা কর্ম্মাণি সাধনান্যুক্তানি, তথা যশ্চেত্যাদিশ্রুতিসামর্থ্যাদেতান্যপি শ্রোত্রিয়ত্বাদানি তত্তদানন্দপ্রাপ্তৌ সাধনানি বিবক্ষিতা- নীত্যর্থঃ।

ননু ত্রয়াণামবিশেষশ্রতো কথং শ্রোত্রিয়ত্বাবৃজিনত্বয়োঃ সর্বত্র তুল্যত্বং, ন হি তে পূর্ব্বভূমিষু শ্রুতে; তথা চাকামহতত্ববদানন্দোৎকর্ষে তয়োরপি হেতুতেতি, তত্রাহ-তত্র চেতি। নির্দ্ধারণার্থা সপ্তমী। ন হি শ্রোত্রিয়ত্বাদিশূন্যঃ সার্বভৌমাদিসুখমনুভাবিতুমুৎসহতে। তথা চ সর্বত্র শ্রোত্রিয়ত্বাদেস্তুল্যত্বাৎ ন তদানন্দাতিরেকপ্রাপ্তাবসাধারণং সাধনমিত্যর্থঃ। যদুক্ত- মানন্দশতগুণবৃদ্ধিহেতুরকামহতত্বকৃতো বিশেষ ইতি, তদুপপাদয়তি-অকামহতত্বং ত্বিতি। পূর্ব্বপূর্ব্বভূমিষু বৈরাগ্যমুত্তরোত্তবভূম্যানন্দপ্রাপ্তিসাধনম্, বৈরাগ্যস্য তরতমভাবেন পরমকাষ্ঠোপ- পত্তের্নিরতিশয়স্য তস্য পরমানন্দপ্রাপ্তিসাধনত্বসম্ভবাদিত্যর্থঃ। যশ্চেত্যাদিবাক্যস্তেখং তাৎপর্য্য- মুক্তা প্রকৃতে পরমানন্দে বিদ্বদনুভবং প্রমাণয়তি-স এষ ইতি। নিরতিশয়মকামহতত্বং পরমানন্দপ্রাপ্তিহেতুরিত্যত্র প্রমাণমাহ-তথা চেতি। প্রকৃতং প্রত্যভূতং পরমানন্দমেধ ইতি পরামৃশতি। ৫

অত্র হ-বিমোক্ষায়েত্যস্মিন্ বাক্যে যাজ্ঞবল্ক্যঃ বিভয়াঞ্চকার ভীতবান্। যাজ্ঞ- বল্ক্যস্য ভয়কারণমাহ শ্রুতিঃ-ন যাজ্ঞবল্ক্যো বক্তৃত্বসামর্থ্যাভাবাভীতবান, অজ্ঞানাদ্বা; কিন্তুর্হি? মেধাবী রাজা সর্ব্বেভ্যঃ মা মাম্ অন্তেভ্যঃ প্রশ্ননির্ণয়াব- সানেভ্য উদরৌংসীৎ আবণোৎ অবরোধং কৃতবানিত্যর্থঃ; যদ্যৎ ময়া নির্ণীতং প্রশ্নরূপং বিমোক্ষার্থম্, তত্তদ্ একদেশত্বেনৈব কামপ্রশ্নস্য গৃহীত্বা পুনঃ পুনর্মাৎ পর্যনুযুক্ত এব, মেধাবিত্বাৎ ইত্যেতদ্ভয়কারণম্,-সর্ব্বং মদীয়ৎ বিজ্ঞানং কাম- প্রশ্নব্যাজেনোপাদিৎসতীতি ॥২৮৫৷৷৩৩৷৷

শ্রুতির্ম্মেধাবীত্যাদ্যা; তাং ব্যাচষ্টে-নেত্যাদিনা। তথাপি কিং তদ্ভয়কারণং, তদাহ- মদ্যদিতি। মেধাবিত্বাৎ প্রজ্ঞাতিশয়শালিত্বাদিতি যাবৎ। তদেব ভয়কারণং প্রকটয়তি- সর্ব্বমিতি ॥২৮৫৷৩৩৷

ভাষ্যানুবাদ।-ব্রহ্মা হইতে আরম্ভ করিয়া মনুষ্যপর্যন্ত জীবগণ যে পরমানন্দের মাত্রাসকল(অংশসমূহ) ভোগ করিতেছে, সেই আনন্দের মাত্রা দ্বারা তাহার মাত্রী অর্থাৎ মাত্রার মূলভূত পরমানন্দের স্বরূপটী-সৈন্ধবলবণের খণ্ডসমূহ দ্বারা যেমন লবণাচলের স্বরূপাবগতি করান হয়, তেমনিভাবে অবগত করাইবার অভিপ্রায়ে বলিতেছেন,-মনুষ্যগণের মধ্যে যে ব্যক্তি রাদ্ধ অর্থাৎ

১১৭০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

অবিকল—পরিপূর্ণাঙ্গ, এবং সমৃদ্ধ—ভোগবিলাসের বিবিধ উপকরণসম্পন্ন, অধিকন্তু সমানজাতীয় অন্যান্য ব্যক্তিগণের অধিপতি অর্থাৎ স্বাধীন প্রভু, কিন্তু, মণ্ডলেশ্বর ( খণ্ডভূমির ঈশ্বর) নহে, এবং মনুষ্য-লভ্য সর্ব্বপ্রকার ভোগসম্পন্নতম অর্থাৎ যে সমুদয় ভোগোপকরণ কেবল মনুষ্যগণেরই প্রাপ্তিযোগ্য, সেই সমুদয় ভোগ-সামগ্রী- শালী অন্যান্য মনুষ্য অপেক্ষা অধিক পরিমাণে ভোগসামগ্রীপূর্ণ। সেই আনন্দই মনুষ্যের পরম আনন্দ। এখানে ‘মানুষ্যকৈঃ’ এই বিশেষণ দ্বারা দৈব ভোগের নিবৃত্তি করা হইয়াছে। ১

[সেই মনুষ্যগণের মধ্যে যাহা পরম আনন্দ অর্থাৎ যিনি পরমানন্দশালী] এই বাক্যে যে, আনন্দ ও আনন্দীকে অভিন্নরূপে অর্থাৎ আনন্দবান্ ব্যক্তিকেই আনন্দরূপে নির্দেশ করা হইয়াছে; ইহা দ্বারা বুঝিতে হইবে যে, উভয়ই এক-কেহই ভিন্ন পদার্থ নহে। পরমানন্দের এই মাত্রাই(অংশই) যে, বিষয় ও বিষয়িভাবে(গ্রাহ-গ্রাহকরূপে) বিস্তৃত হইয়াছে, একথা ‘যখন ভিন্নেরই মত হয়’ ইত্যাদি বাক্যে অভিহিত হইয়াছে। অতএব ‘পরম আনন্দঃ’ বলিয়া আনন্দ ও আনন্দবানের অভেদ নির্দেশ করা উপযুক্তই হইয়াছে। যুধিষ্ঠিরাদি নৃপতিগণ ইহার উদাহরণ। এক্ষণে সর্ব্বাগ্রে মনুষ্যের প্রত্যক্ষগ্রাহ্য আনন্দ হইতে আরম্ভ করিয়া উত্তরোত্তর শতগুণক্রমে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত পরমানন্দের অনুমান করিবার পর, যেখানে আনন্দের বিভাগ নিবৃত্ত হইয়া যায়, সেই পরম আনন্দ অনুভবগোচর করাইতেছেন। উক্ত আনন্দই পর-পর শতগুণ- ক্রমে বৃদ্ধি পাইয়া, যেখানে বৃদ্ধির চরম সীমা প্রাপ্ত হয়, যেখানে দর্শন শ্রবণ ও মননের অভাব নিবন্ধন গণিতের ক্রিয়া-গণনাও নিবৃত্ত হইয়া যায়, সেই পরমানন্দের স্বরূপ নিরূপণের অভিপ্রায়ে অতঃপর বলিতেছেন-মনুষ্যগণের যে, এইরূপ শতগুণিত আনন্দ, জিতলোক পিতৃগণের পক্ষে তাহা একটামাত্র আনন্দ। জিতলোক অর্থ,-যাহারা শাস্ত্রবিহিত শ্রাদ্ধাদি কৰ্ম্ম দ্বারা পিতৃগণকে পরিতুষ্ট করিয়া, সেই লোক জয় করিয়াছেন, সেই পিতৃগণের নিকট মনুষ্যগণের শত- গুণিত আনন্দও এক আনন্দ হয়; সেই শতগুণিত আনন্দও আবার গন্ধর্ব্বলোকে এক আনন্দ বলিয়া গৃহীত হয়, এবং গন্ধর্ব্বলোকে যাহা শতগুণিত আনন্দ, তাহাও কর্মদেবগণের এক আনন্দ। কর্মদেব কাহারা? যাঁহারা অগ্নিহোত্রাদি কর্ম দ্বারা দেবত্ব লাভ করিয়াছেন। ২

পূর্ব্বের ন্যায় কর্ম্মদেবগণের শতগুণিত আনন্দও আবার আজান দেবগণের এক আনন্দ। ‘অ’জান’ অর্থ—যাঁহারা জান হইতে অর্থাৎ উৎপত্তিকাল হইতেই

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৭১

দেবতা, ফলকথা—যাঁহারা দেবতারূপে জন্মলাভ করিয়াছেন। আজান দেব এবং যিনি শ্রোত্রিয়—অধীতবেদ(১) ও অবৃজিন—বৃজিন অর্থ পাপ, তদ্বিহীন এবং অকামহত অর্থাৎ নিস্পৃহ—আজান দেবগণের অধস্তন যত প্রকার বিষয় আছে, সে সমুদয় বিষয়ে অভিলাষশূন্য; এবস্তুত সাধুর আনন্দ ও আজানদেবের আনন্দ সমান বা একরূপ। “যশ্চ” এই “চ” হইতে বুঝা যায় যে, তাঁহাদের শতগুণিত আনন্দও প্রজাপতিলোকে অর্থাৎ বিরাটশরীরে এক আনন্দ বলিয়া গৃহীত হয়। এখানেও ‘যশ্চ’ ইত্যাদির ব্যাখ্যা পূর্ব্ববৎ। পুনশ্চ ইহার শতগুণিত আনন্দ আবার হিরণ্যগর্ভাত্মক ব্রহ্মলোকে একটা আনন্দরূপে গৃহীত হয়। এখানেও ‘যশ্চ’ ইত্যাদির অর্থ পূর্ব্ববৎ। ৩

ইতঃপর গণিত সংখ্যানিবৃত্তি—সে আনন্দের আর কোনরূপ সংখ্যা বা পরিমাণ নাই। পূর্ব্বে পরম আনন্দ বলিয়া যাহা উক্ত হইয়াছে, সমুদ্রের জলবিন্দুর ন্যায় ব্রহ্মলোকাদিগত আনন্দ তাহার মাত্রা অর্থাৎ কণামাত্র। এই ভাবে উত্তরোত্তর শতগুণক্রমে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আনন্দরাশি যেখানে যাইয়া একত্ব প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ এক হইয়া যায়, এবং যাহা শ্রোত্রিয়গণের প্রত্যক্ষসিদ্ধ, তাহাই সম্প্রসাদরূপ পরম আনন্দ; তাহাতে অন্য কিছু দর্শন হয় না, অন্য কিছু শ্রবণ করা যায় না; অতএব, তাহা ভূমা মহান্; ভূমা বলিয়াই অমৃত অর্থাৎ অবিনশ্বর; ভূমাভিন্ন সমস্ত আনন্দই তদ্বিপরীত অর্থাৎ বিনাশশীল। পূর্ব্বোক্ত বিশেষণত্রয়ের মধ্যে শ্রোত্রিয়ত্ব ও “অবৃজিনত্ব” বিশেষণদ্বয় তুল্যার্থক, কিন্তু অকামহতত্বরূপ বিশেষণটাই(ধৰ্ম্মটী) শতগুণ আনন্দের বৃদ্ধিহেতু। ৪

অগ্নিহোত্রাদি কর্মসকল যেমন দেবত্বপ্রাপ্তির সাধন, এই স্থানেও উক্ত শ্রোত্রিয়ত্ব, অবৃজিনত্ব ও অকামহতত্ত্বই পূর্ব্বোক্ত সেই সেই আনন্দবিশেষ-প্রাপ্তির সাধনরূপে অভিহিত হইয়াছে; তন্মধ্যে বিশেষ এই যে, শ্রোত্রিয়ত্ব ও অবৃজিনত্ব- রূপ ধর্মদ্বয় সর্বাবস্থায়ই সমান; এইজন্য উহাদিগকে আর পরবর্তী আনন্দলাভের সাধন বা উপায় বলিয়া স্বীকার করা হয় না; কিন্তু বৈরাগ্যের উৎকর্ষাপকর্ষের কারণ বিধায়, কেবল অকামহতত্ব ধৰ্ম্মটাই উত্তরাবস্থায়ও আনন্দ প্রাপ্তির সাধন

(১) তাৎপর্য্য—শ্রোত্রিয় অর্থ—কেবল বেদবিদ্ নহে, পরন্তু তাহার লক্ষণ এইরূপ— “একাং শাখাং সকল্লাং বা ষড়ভিরঙ্গৈরধীত্য বা। যটকর্মনিরতো বিপ্রঃ শ্রোত্রিয়ো নাম ধর্ম্মবিৎ।” ইতি।

অর্থাৎ যিনি ছয়টি বেদাঙ্গের সহিত, অন্ততঃ কল্পসূত্রের সহিত একটা বেদশাখা অধ্যয়ন করিয়া ব্রাহ্মণোচিত ষটকর্ম্মে নিয়ত থাকেন, তাদৃশ ধর্মজ্ঞ ব্রাহ্মণকে ‘শ্রোত্রিয়’ বলে।

১১৭২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বা উপায়, ইহাই উক্ত কথায় বুঝা যাইতেছে। বেদব্যাসও এইরূপ বলিয়াছেন,- ‘জগতে যাহা কাম-সুখ অর্থাৎ কামোপভোগজনিত সুখ বলিয়া প্রসিদ্ধ, আর যাহা স্বর্গীয় মহৎ সুখ, এই উভয় সুখই তৃষ্ণা-ক্ষয়জনিত সুখের অর্থাৎ বৈরাগ্য- সুখের ষোড়শ ভাগের এক ভাগেরও সমান নহে‘। অতঃপর যাজ্ঞবল্ক্য বলিলেন, হে সম্রাট্, ইহাই সেই ব্রহ্মলোক। তখন সম্রাট্ বলিলেন, এই প্রকারে অনু- শাসন প্রাপ্ত আমি পূজনীয় আপনাকে সহস্র গো দান করিতেছি; অতঃপর বিমোক্ষার্থই বলুন; এ সব কথা বিস্তারিতরূপে পূর্ব্বেই ব্যাখ্যাত হইয়াছে। ৫

এখানে “বিমোক্ষায়” এই বাক্য শ্রবণে যাজ্ঞবল্ক্য ভীত হইলেন। শ্রুতি নিজেই যাজ্ঞবল্ক্যের ভয়ের কারণ বলিয়া দিতেছেন,—যাজ্ঞবল্ক্য যে, বলিবার সামর্থ্যাভাবে ভীত হইয়াছিলেন, কিংবা জ্ঞান-দুর্ব্বলতা বশতঃ ভীত হইয়াছিলেন, তাহা নহে; তবে কি না, বিচক্ষণ রাজা সমস্ত প্রশ্ন নির্ণয়ের অন্ত বা অবসানের জন্য অর্থাৎ চরম সিদ্ধান্ত বলিবার জন্য আমাকে আবদ্ধ বা অনুরুদ্ধ করিতেছেন, ইহাই ভয়ের কারণ। তাৎপর্য্য এই যে, আমি বিমোক্ষার্থ যে যে প্রশ্নোত্তর নির্ণয় করিয়া বলিয়াছি, রাজা তৎসমস্তই মোক্ষপ্রশ্নের একদেশরূপে গ্রহণ করিয়া পুনঃ পুনঃ আমাকে প্রশ্ন করিতেছেন, এবং আমার সমস্ত বিজ্ঞান পূর্ব্বোক্ত কাম-প্রশ্নচ্ছলে গ্রহণ করিবার উপক্রম করিতেছেন ॥ ২৮৫ ॥ ৩৩ ॥

স বা এষ এতস্মিন্ স্বপ্নান্তে রত্বা চরিত্বা দৃষ্টেব পুণ্যঞ্চ পাপঞ্চ পুনঃ প্রতিয্যায়ং প্রতিযোন্যাদ্রবতি বুদ্ধান্তায়ৈব ॥ ২৮৬ ॥ ৩৪ ॥

সন্মলার্থঃ?—সঃ বৈ এষঃ(আত্মা) এতস্মিন্ স্বপ্নান্তে(স্বপ্নে) রত্বা চরিত্বা, পুণ্যং(পুণ্যফলৎ সুখং) চ, পাপং(পাপফলৎ দুঃখং) চ, দৃষ্টা এব(নতু কৃত্বা), পুনঃ প্রতিন্যায়ৎ প্রতিযোনি বুদ্ধান্তায়(জাগ্রদবস্থায়ৈ) এব আদ্রবতি [পূর্ব্বং কৃতব্যাখ্যানমেতৎ] ॥২৮৬৷৷৩৪৷৷

মূলানুবাদ?—সেই এই আত্মা এই স্বপ্নাবস্থায় রমণ ও পরি-ভ্রমণ করিয়া এবং পুণ্য ও পাপের ফল—সুখ ও দুঃখ কেবল দর্শন করিয়া পুনর্ব্বার জাগ্রদবস্থার জন্য স্বপ্নের বিপরীতক্রমে যথাস্থানে ধাবিত হয় ॥ ২৮৬ ॥ ৩৪ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—অত্র বিজ্ঞানময়ঃ স্বয়ংজ্যোতিরাত্মা স্বপ্নে প্রদর্শিতঃ, স্বপ্নান্তযুদ্ধান্তসঞ্চারেণ কার্য্যকরণব্যতিরিক্ততা কাম-কর্মপ্রবিবেকশ্চ অসঙ্গতয়া -মহামৎস্যদৃষ্টান্তেন প্রদর্শিতঃ। পুনশ্চ অবিদ্যাকার্য্যৎ স্বপ্ন এব ঘ্নন্তীবেত্যাদিনা

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৭৩

প্রদর্শিতম্; অর্থাদবিদ্যায়াঃ সতত্ত্বং নির্দ্ধারিতম্-অতদ্ধর্মাধ্যারোপণরূপত্বম্ অনাত্মধর্মত্বঞ্চ। তথা বিদ্যায়াশ্চ কার্য্যৎ প্রদর্শিতং-সর্ব্বাত্মভাবঃ স্বপ্নে এব প্রত্যক্ষতঃ সর্ব্বোহস্মীতি মন্যতে, সোহস্য পরমো লোকঃ-ইতি। তত্র চ সর্ব্বাত্মভাবঃ স্বভাবোহস্য, এবম্ অবিদ্যাকামকৰ্ম্মাদি-সর্ব্বসংসারধৰ্ম্মসম্বন্ধাতীতৎ রূপমস্য সাক্ষাৎ সুষুপ্তে গৃহ্যত ইত্যেতদ্বিজ্ঞাপিতম্। স্বয়ংজ্যোতিরাত্মা এষ পরম আনন্দঃ, এষ বিদ্যায়া বিষয়ঃ, স এষ পরমঃ সংপ্রসাদঃ, সুখস্য চ পরা কাষ্ঠা, ইত্যেতৎ-এবমন্তেন গ্রন্থেন ব্যাখ্যাতম্। ১।

টীকা। স বা এষ এতস্মিন্নিত্যাদ্যুত্তরগ্রন্থস্য সম্বন্ধং বক্তুং বৃত্তং কীর্তয়তি-অত্রেতি। অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতির্ভবতীতি বাক্যং সপ্তম্যর্থঃ। বৃত্তমর্থান্তরমনুদ্রবতি-স্বপ্নান্তেতি। কার্য্যকরণব্যতিরিক্তত্বং প্রদর্শিতমিতি সম্বন্ধঃ। উক্তমর্থাত্তরমাহ-কামেতি। অথ যত্রৈনং ঘ্নন্তীবেত্যাদাবুক্তমনুভাষতে-পুনশ্চেতি। কিং তৎকাৰ্য্যপ্রদর্শনসামর্থ্যান্নিদ্ধারিতমবিদ্যায়াঃ সতত্ত্বং, তদাহ-অতদ্ধর্মোত। অনাত্মধৰ্ম্মত্বমাত্মনি চৈতন্যবদস্বাভাবিকত্বম্। অবিদ্যাকার্য্য- বদ্বিদ্যাকায্যং চ স্বপ্নে সর্ব্বাত্মভাবলক্ষণং প্রত্যক্ষত এব প্রদর্শিতমিত্যাহ-তথেতি। সুযুপ্তেহপি স্বপ্নবদেতদ্দর্শিতমিত্যাহ-এবমিতি। সাক্ষাৎস্বরূপচৈতন্যবশাদিত্যেতৎ। অন্যথোত্থিতস্য সুখ- পরামর্শো ন স্যাদিতি ভাবঃ। উক্তং বিদ্যাকার্য্যং নিগময়তি-এষ ইতি। তমেব বিদ্যাবিষয়ং বিশদয়তি-স এষ ইতি। বৃত্তানুবাদমুপসংহরতি-ইত্যেতদিতি। এবমন্তেন গ্রন্থেন ব্রহ্ম- লোকান্তবাক্যেনেতি যাবৎ। সোহহমিত্যাদেস্তাৎপয্যমনুবদতি-তচ্চেতি। যতো রাজেবং মন্যতে, অতস্তস্য সহস্রদানে যুক্তা প্রবৃত্তিরিত্যর্থঃ। অত উর্দ্ধমিত্যাদেরভিপ্রায়মনুদ্রবতি-তে চেতি। যদ্যপি যথোক্তলক্ষণে মোক্ষ-বন্ধনে প্রাগেবোপদিষ্টে, তথাপি পূর্ব্বোক্তং সর্ব্বং দৃষ্টান্ত- ভূতমেব তয়োরিতি, যতো রাজা ভ্রাম্যতি, অতো মোক্ষবন্ধনে দাষ্টান্তিকভূতে বক্তব্যে যাজ্ঞ- বন্ধ্যেনেতি মন্যমানন্তং প্রেরয়তীত্যর্থঃ। ১

তচ্চৈতৎ সর্ব্বং বিমোক্ষপদার্থস্য দৃষ্টান্তভূতৎ বন্ধনস্য চ; তে চ এতে মোক্ষ- বন্ধনে সহেতুকে সপ্রপঞ্চে নিদ্দিষ্টে বিদ্যাবিদ্যাকার্য্যে, তৎ সর্ব্বং দৃষ্টান্ত-ভূতমেব, ইতি তদ্দৃষ্টান্তিকস্থানীয়ে মোক্ষ-বন্ধনে সহেতুকে কামপ্রশ্নার্থভূতে ত্বয়া বক্তব্যে, ইতি পুনঃ পর্য্যনুযুক্তে জনকঃ—অত উর্দ্ধং বিমোক্ষায়ৈব ব্রূহীতি। ২।

বন্ধমোক্ষয়োর্ব্বক্তব্যত্বেন প্রাপ্তয়োরপি প্রথমং বন্ধো বর্ণিত ইতি বক্তুং দৃষ্টান্তং স্মারয়তি— তত্রেতি। দৃষ্টান্তমনুদ্য দাষ্টান্তিকস্য বন্ধস্য সূত্রিতত্বং দর্শয়তি—যথা চেত্যাদিনা। উভৌ লোকাবিত্যত্র প্রথমমেবংশব্দো দ্রষ্টব্যঃ। বৃত্তমনুধ্যানন্তরপ্রকরণমুখাপরতি—তদিহেতি। অজ্ঞঃ সংসারী সপ্তম্যর্থঃ। সনিমিত্তং কামাদিনা নিমিত্তেন সহিতমিত্যেতৎ। ২

তত্র মহামৎস্যবৎ স্বপ্নযুদ্ধান্তাবসঙ্গঃ সঞ্চরত্যেক আত্মা স্বয়ংজ্যোতিরিত্যুক্তম্। যথা চাসৌ কার্য্যকরণানি মৃত্যুরূপাণি পরিত্যজন্ পাদদানশ্চ মহামৎস্যবৎ স্বপ্নযুদ্ধান্তাবনুসঞ্চরতি, তথা জায়মানো ম্রিয়মাণশ্চ তৈরেব মৃত্যুরূপৈঃ সংযুজ্যতে

১১৭৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বিযুজ্যতে চ, উভৌ লোকাবনুসঞ্চরতীতি সঞ্চরণৎ স্বপ্নবুদ্ধান্তানুসঞ্চারস্য দাষ্টান্তিকত্বেন সূচিতম্; তদিহ বিস্তরেণ সনিমিত্তং সঞ্চরণং বর্ণয়িতব্যমিতি তদর্থোহয়মারম্ভঃ। তত্র চ বুদ্ধান্তাৎ স্বপ্নান্তময়মাত্মানুপ্রবেশিতঃ; তস্মাৎ সম্প্রসাদস্থানং মোক্ষদৃষ্টান্তভূতম্; ততঃ প্রচ্যাব্য বুদ্ধান্তে সংসারব্যবহারঃ প্রদর্শয়ি- তব্য ইতি, তেনাস্য সম্বন্ধঃ। স বৈ বুদ্ধান্তাৎ স্বপ্নান্তক্রমেণ সম্প্রসন্ন এষঃ, এতস্মিন্ সম্প্রসাদে স্থিত্বা ততঃ পুনরীষৎ প্রচ্যুতঃ স্বপ্নান্তে রত্বা চরিত্বেত্যাদি পূর্ব্ববৎ —বুদ্ধান্তায়ৈবাদ্রবতি ॥২৮৬৷৷৩৷৷

প্রকরণারম্ভমুক্তা সমনন্তরবাক্যস্য ব্যবহিতেন সম্বন্ধমাহ—তত্র চেতি। স বা এষ এতস্মিন্ বুদ্ধান্তে রত্বেত্যুপক্রম্য স্বপ্নান্তায়ৈবেতি বাক্যং সপ্তম্যা পরামৃশ্যতে। স্বপ্নান্তশব্দস্য স্বপ্ন- বিষয়ব্যাবৃত্ত্যর্থং বিশিনষ্ট—সংপ্রসাদেতি। কথং পুনঃ সম্প্রসন্নস্য সংসারোপবর্ণনমিত্যা- শঙ্ক্যাহ—তত ইতি। প্রাগুক্তঃ সপ্তমার্থো ব্যবহিতো গ্রন্থস্তেনেতি পরামৃশ্যতে। সমনন্তরগ্রন্থঃ যষ্ঠ্যোচ্যতে। বাক্যস্য ব্যবহিতেন সম্বন্ধমুক্তা তদক্ষরাণি যোজয়তি—স বৈ বুদ্ধান্তাদিতি। স্বপ্নান্তে রত্বা চরিত্বেত্যাদি বুদ্ধান্তায়ৈবাদ্রবতীত্যেতদন্তং পূর্ব্ববদিতি যোজনা ॥ ২৮৬॥ ৩৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।—[পূর্ব্বশ্রুতিতে] বিজ্ঞানময় আত্মার স্বপ্নাবস্থায় স্বয়ং জ্যোতিঃস্বভাব প্রদর্শিত হইয়াছে, এবং স্বপ্ন ও জাগরণ অবস্থায় গমনাগমন- ক্রমে কার্য্যকরণ(দেহেন্দ্রিয়াদি) হইতে বিভিন্নতা এবং মহামৎস্যের দৃষ্টান্ত দ্বারা আত্মার অসঙ্গত্বও(নিষ্পাপত্বও) প্রদর্শিত হইয়াছে। পুনশ্চ স্বপ্নেই “ঘ্নন্তীব” ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা সর্ব্বপ্রকার বিদ্যা ও অবিদ্যাকার্য্য নিদ্দিষ্ট হইয়াছে। ইহা দ্বারাই অবিদ্যার যাহা তত্ত্ব—অতদ্ধর্মাধ্যারোপণ,(অর্থাৎ যাহাতে যাহা নাই, তাহাতে তাহার আরোপণ করা এবং অনাত্মধর্মত্ব, তাহাও নির্দ্ধারিত হইয়াছে)। এইরূপ, বিদ্যার কার্য্য যে সর্ব্বাত্মভাব, তাহাও স্বপ্নাবস্থাতেই ‘সর্ব্বোহহমস্মি’ অর্থাৎ আমিই সর্ব্বাত্মক—এইরূপ সাক্ষাৎ অনুভবানুসারে প্রদর্শিত হইয়াছে; এই সর্ব্বাত্মভাবই ইহার পরম লোক। উক্ত সর্ব্বাত্মভাবই আত্মার অবিদ্যা কামনা ও কর্মপ্রভৃতি সর্ব্ববিধ সাংসারিক ধর্ম-সম্বন্ধরহিত স্বাভাবিক রূপ, এবং সুষুপ্তি সময়ে ইহার প্রত্যক্ষোপলব্ধি হইয়া থাকে, একথাও বিশেষভাবে বিজ্ঞাপিত হইয়াছে। তাহার পর এইপর্যন্ত গ্রন্থে, স্বয়ং-জ্যোতিঃস্বরূপ আত্মা, ইহাই পরম আনন্দ, ইহা বিদ্যার বিষয়, ইহাই সেই সম্প্রসাদ এবং ইহাই সুখের পরা- কাষ্ঠা, এ সমস্ত বিষয়ও বর্ণিত হইয়াছে। ১

পূর্ব্ব শ্রুতিতে ঐ যে সমস্ত বিষয় কথিত হইয়াছে,[বুঝিতে হইবে যে,] সে সমস্ত হইতেছে—বর্ণনীয় মোক্ষ ও বন্ধ পদার্থের দৃষ্টান্ত বা উদাহরণস্বরূপ। সেই

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্। ১১৭৫

মোক্ষ ও বন্ধন উভয়ই বিদ্যা ও অবিদ্যার ফলস্বরূপ, অর্থাৎ বিদ্যার ফল—মোক্ষ, আর অবিদ্যার ফল—বন্ধন। এই মোক্ষ ও বন্ধন এবং-তাহার হেতুভূত বিদ্যা ও অবিদ্যা বিস্তৃতভাবে কথিত হইয়াছে; প্রকৃত পক্ষে অপরাপর বিষয়সমূহ এই মোক্ষ ও বন্ধেরই দৃষ্টান্ত মাত্র; এই কারণে তাহার দাষ্টান্তিক-স্থলবর্তী[যাহার দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হয়, তাহাকে দাষ্টান্তিক বলে।] কামপ্রশ্নের বিষয়ীভূত সেই মোক্ষ ও বন্ধন এবং তাহার হেতুদ্বয় তোমাকে অবশ্য বলিতে হইবে; এই জন্য জনক মহারাজ যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রকৃত মোক্ষ-তত্ত্ব বলিবার জন্য বারংবার অনুরোধ করিতেছেন। ২

তন্মধ্যে পূর্ব্বে কথিত হইয়াছে, মহামৎস্যের ন্যায় স্বয়ংজ্যোতিঃস্বরূপ একই আত্মা অসঙ্গভাবে স্বপ্ন ও জাগরণে সঞ্চরণ করিয়া থাকে। সেখানে এই আত্মা মহামৎস্যের ন্যায় মৃত্যুস্বরূপ দেহেন্দ্রিয়সংঘাতকে একবার ত্যাগ করিয়া আবার গ্রহণ করত যেমন স্বপ্ন ও জাগরণে সঞ্চরণ করিয়া থাকে, তেমনি জন্ম-মরণ সময়েও মৃত্যুরূপ সেই দেহেন্দ্রিয়ের সহিতই সংযুক্ত ও বিযুক্ত হইয়া থাকে। এইরূপে কথিত উভয় লোকে সঞ্চরণই যে, স্বপ্ন ও জাগরণাবস্থায় ক্রমসঞ্চারের দাষ্টান্তিক, তাহার সূচনা করা হইয়াছে। এখন সেই সঞ্চরণ ও তাহার কারণ বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করিতে হইবে; এই জন্য পরবর্তী শ্রুতির আরম্ভ হইতেছে। প্রথমতঃ আত্মার জাগ্রদবস্থা হইতে স্বপ্নাবস্থায় প্রবেশ দেখান হইয়াছে; সেই স্বপ্নাবস্থা হইতে আবার মোক্ষের দৃষ্টান্ত—মোক্ষের অনুরূপ সম্প্রসাদনামক সুষুপ্তি অবস্থাও প্রদর্শিত হইয়াছে। সেই সুষুপ্তি অবস্থার পর এখন জাগ্রৎকালীন সংসারব্যবহার প্রদর্শন করা আবশ্যক; এইরূপ সম্বন্ধ লইয়া পরবর্তী শ্রুতি আরব্ধ হইয়াছে। সেই এই আত্মা জাগ্রদবস্থা হইতে ক্রমে স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থা প্রাপ্ত হয়; সেই সুষুপ্তি অবস্থায় অবস্থান করত, সেই অবস্থা হইতে কিঞ্চিৎ স্খলিত হইয়া, পুনর্ব্বার স্বপ্নাবস্থায় রমণ ও পরিভ্রমণ করিয়া, পূর্ব্ববৎ পুনশ্চ জাগ্রদবস্থার দিকে ধাবিত হয় ॥২৮৬৷৷৩৪৷৷

তদ্যথানঃ সুসমাহিতমুৎসর্জদ্ যায়াদেবমেবায়ং শারীর আত্মা প্রাজ্ঞেনাত্মনান্বারূঢ় উৎসর্জন্ যাতি, যত্রৈতদূর্দ্ধোচ্ছাসী ভবতি ॥ ২৮৭ ॥ ৩৫ ॥

সরলার্থঃ।-[জীবস্য স্বপ্নাৎ জাগরপ্রাপ্তিন্যায়েন দেহাৎ দেহান্তরপ্রাপ্তি- প্রকারমাহ-‘তদ্যথা’ ইত্যাদিনা।] অনঃ(শকটং) সুসমাহিতং(দ্রব্যসম্ভার-

১১৭৬. বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

পূর্ণং সৎ) যথা উৎসর্জৎ(শব্দং কুর্ব্বৎ) যায়াৎ(গচ্ছেৎ), এবম্ এব অয়ং(বর্ণ- নীয়ঃ) শারীরঃ(শরীরাভিমানী) আত্মা(জীবঃ) প্রাজ্ঞেন(পরমাত্মনা) অন্বারূঢ়ঃ(অধিষ্ঠিতঃ সন্) উৎসর্জন্(মর্মচ্ছেদবশাৎ দুঃখবেদনয়া কাতরশব্দং কুর্ব্বন্, অথবা বিদ্যমানদেহং পরিত্যজন্) যাতি। যত্র(যস্মিন্ সময়ে) এতৎ (ইত্থং) ঊর্দ্ধোচ্ছাসী ভবতি(উচ্চৈঃ ঊর্দ্ধশ্বাসবান্ আসন্নমৃত্যুঃ ভবতি ইত্যর্থঃ) ॥১৮৭৷৩৫৷৷

মূলানুবাদ:-[ জীব যেমন স্বপ্ন হইতে পুনর্ব্বার জাগরণে যায়, তেমনি এক দেহ হইতে দেহান্তর প্রাপ্তির কথা বর্ণিত হইতেছে-] নানাবিধ দ্রব্যসম্ভারপূর্ণ শকট যেরূপ শব্দ করিতে করিতে চলিতে থাকে, ঠিক এইরূপই এক-শরীরাভিমানী জীবাত্মাও, যখন ঊর্দ্ধশ্বাস উপস্থিত হয়, তখন প্রাজ্ঞসংজ্ঞক পরমাত্মাকর্তৃক অধিষ্ঠিত(পরিচালিত) হইয়া, মর্ম্মান্তিক শব্দ করিতে করিতে চলিয়া যায়;(অথবা উৎসর্জন্ যাতি— এই দেহ ত্যাগ করিয়া যায়) ॥ ২৮৭ ॥ ৩৫ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—ইত আরভ্যাস্য সংসারো বর্ণ্যতে,—যথা অয়মাত্মা স্বপ্নান্তাদ বুদ্ধান্তমাগতঃ, এবময়ম্ অস্মাৎ দেহাৎ দেহান্তরং প্রতিপৎস্যতে, ইত্যাহ অত্র দৃষ্টান্তম্—তৎ তত্র যথা লোকে, অনঃ শকটং, সুসমাহিতং সুষ্ঠু ভূশং বা সমাহিতং ভাণ্ডোপস্করণেন উলুখলমুসলশূর্পপিঠরাদিনা অন্নাদ্যেন চ সম্পন্নৎ সম্ভারেণাক্রান্তমিত্যর্থঃ; তথা ভারাক্রান্তং সৎ উৎসর্জৎ শব্দং কুর্ব্বৎ যথা যায়াৎ গচ্ছেৎ শাকটিকেনাধিষ্ঠিতং সৎ; এবমেব যথা উক্তো দৃষ্টান্তঃ, অয়ং শারীরঃ শরীরে ভবঃ; কোহসৌ? আত্মা লিঙ্গোপাধিঃ, যঃ স্বপ্নবুদ্ধান্তাবিব জন্মমরণাভ্যাং পাপৃমসংসর্গাবয়োগলক্ষণাভ্যাম্ ইহলোক-পরলোকৌ অনুসঞ্চরতি, যস্য উৎক্রমণম্ অনু প্রাণাদ্যুৎক্রমণম্, সঃ প্রাজ্ঞেন পরেণাত্মনা স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাবেন অন্বারূঢ়ঃ অধিষ্ঠিতঃ অবভাস্যমানঃ, তথা চোক্তম্—“আত্মনৈবায়ং জ্যোতিষাস্তে পল্যয়তে” ইতি, উৎসর্জন যাতি। ১

টীকা। তদ্যথেত্যাদেঃ ইতি নু কাময়মান ইত্যন্তস্য সন্দর্ভস্য তাৎপর্য্যং তদিহেত্যত্রোক্ত- মনুবদতি—ইত আরভ্যেতি। তদ্যথেত্যস্মাদ্বাক্যাদিত্যেতৎ। দৃষ্টান্তবাক্যমুখাপ্য ব্যাকরোতি— যথেত্যাদিনা। ইত্যত্র দৃষ্টান্তমাহেতি যোজনা। ভাণ্ডোপস্করণেন ভাণ্ডপ্রমুখেণ গৃহোপস্করণে- নেতি যাবৎ। তদেবোপস্করণং বিশিনষ্টি—ডলুখলেতি। পিঠরং পাকার্থং স্থূলং ভাণ্ডম্। অন্বয়ং দর্শয়িতুং যথাশব্দোহনুষ্যতে। লিঙ্গবিশিষ্টমাত্মানং বিশিনষ্টি—যঃ স্বপ্নেতি। জন্মমরণে বিশদয়তি—পাপ্মেতি। কার্যকরণানি পাপ্মশব্দেনোচ্যন্তে। শারীরস্য প্রাধান্যং দ্যোতয়তি—

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৭৭

ঘস্যেতি। উৎসর্জন্ যাতীতি চেৎ, তদাঙ্গীকৃতমাত্মনো গমনমিত্যাশঙ্ক্যাহ-তত্রেতি। লিঙ্গোপাধেরাত্মনো গমনপ্রতীতিরিত্যত্রার্থর্ব্বণশ্রুতিং প্রমাণয়তি-তথা চেতি। উৎসর্জন্ যাতীতিশ্রুতেমুখ্যার্থত্বার্থমাত্মনো বস্তুতো গমনং কিং ন স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-ধ্যায়তীবেতি চেতি। ঔপাধিকমাত্মনো গমনমিত্যত্র লিঙ্গান্তরমাহ-অত এবেতি। কথমেতাবতা নিরুপাধেরাত্মনো গমনং নেষ্যতে, তত্রাহ-অন্যথেতি। ১

তত্র চৈতন্যাত্মজ্যোতিষা ভাষ্যে লিঙ্গে প্রাণ প্রধানে গচ্ছতি সতি, তদু- পাধিরপ্যাত্মা গচ্ছতীব; তথা চ শ্রুত্যন্তরং-“কস্মিন্নহম্” ইত্যাদি, “ধ্যায়তীব” ইতি চ; অত এবোক্তম্,-প্রাজ্ঞেনাত্মনান্বারূঢ় ইতি; অন্যথা প্রাজ্ঞেনীকীভূতঃ শকটবৎ কথমুৎসর্জন্ যাতি। তেন লিঙ্গোপাধিরাত্মা উৎসর্জন্ মৰ্ম্মসু নিকৃত্য- মানেষু দুঃখবেদনয়া আর্তঃ শব্দং কুর্ব্বন্, যাতি গচ্ছতি। তৎ কস্মিন্ কালে- ইত্যুচ্যতে, যত্রৈতদ্ভবতি, এতদিতি ক্রিয়াবিশেষণম্; ঊর্দ্ধোচ্ছাসী যত্রোর্দ্ধোচ্ছ্বাসিত্বমস্য ভবতীত্যর্থঃ। দৃশ্যমানস্যাপ্যনুবদনং বৈরাগ্যহেতোঃ- ঈদৃশঃ কষ্টঃ হল্বয়ৎ সংসারঃ, যেনোৎক্রান্তিকালে মৰ্ম্মসুৎকৃত্যমানেষু স্মৃতিলোপঃ, দুঃখবেদনার্তস্য পুরুষার্থ- সাধনপ্রতিপত্তৌ চাসামর্থ্যৎ পরবশীকৃতচিত্তস্থ্য; তস্মাৎ যাবদিয়মবস্থা নাগমিষ্যতি, তাবদেব পুরুষার্থসাধনকর্তব্যতায়াম্ অপ্রমত্তো ভবেৎ-ইত্যাহ কারুণ্যাৎ শ্রুতিঃ ॥২৮৭৷৷৩৫৷৷

প্রমাণফলং নিগময়তি-তেনেতি। তৎ কস্মিন্নিত্যত্র তচ্ছব্দেনার্ত্তস্য শব্দবিশেষকরণপূর্ব্বকং গমনং গৃহ্যতে। এতদূর্দ্ধোচ্ছ্বাসিত্বমন্য যথা স্থাৎ, তথাবস্থা যস্মিন্ কালে ভবতি, তস্মিন্ কালে তদগমনমিত্যুপপাদয়তি—উচ্যত ইত্যাদিনা। কিমিতি প্রত্যক্ষমর্থং শ্রুতিরনুবদতি, তত্রাহ— দৃশ্যমানস্যেতি। কথং সংসারস্বরূপানুবাদমাত্রেণ বৈরাগ্যসিদ্ধিন্তত্রাহ--ঈদৃশ ইতি। ঈদৃশত্বমেব বিশদয়তি—যেনেত্যাদিনা। অনুবাদশ্রতেরভিপ্রায়মুপসংহরতি—তস্মাদিতি ॥ ২৮৭ ॥ ৩৫ ॥

ভাষ্যানুবাদ।-এই শ্রুতি হইতে আরম্ভ করিয়া জীবের সংসার-ক্রম বর্ণিত হইতেছে। এই জীবাত্মা স্বপ্নাবস্থা হইতে যেরূপ জাগ্রদবস্থায় উপস্থিত হয়, (লোকান্তরগমনের ক্রমও) ঠিক সেইরূপ, সেই আত্মা যে, এক দেহ হইতে অন্য দেহ প্রাপ্ত হইয়া থাকে, তদ্বিষয়ে দৃষ্টান্ত বলিতেছেন-জগতে অনস্- শকট যেমন সুসমাহিত-উত্তমরূপে অথবা অতিশয়রূপে সমাহিত হইয়া, অর্থাৎ বিবিধ ভাণ্ড ও ভাণ্ডসংস্কারক উদুখল, মুসল, কুলা ও পাকপাত্র প্রভৃতি এবং খাদ্যসামগ্রীতে পূর্ণ হইয়া-দ্রব্যভারে আক্রান্ত এবং শকটচালক দ্বারা পরিচালিত হইয়া শব্দ করিতে কবিতে গমন করিয়া থাকে, ঠিক সেইরূপ অর্থাৎ উক্ত দৃষ্টান্তের মত, এই শারীর-শরীরাভিমানী-; এই শারীর-কে?

১১৭৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

আত্মা—লিঙ্গশরীরোপহিত, যিনি পুণ্যপাপহেতু দেহেন্দ্রিয়ের সহিত সংযোগ- বিয়োগাত্মক জন্ম-মরণক্রমে স্বপ্ন ও জাগরণাবস্থার ন্যায় ইহলোকে ও পরলোকে সঞ্চরণ(গমনাগমন) করিয়া থাকেন, এবং যাঁহার দেহত্যাগের সঙ্গে- সঙ্গে প্রাণাদিও উৎক্রমণ করিয়া থাকে; সেই আত্মা, স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাব প্রাজ্ঞ পরমাত্মাকর্তৃক অন্বারূঢ়—অধিষ্ঠিত অর্থাৎ প্রকাশিত হইয়া, কাতর শব্দ করিতে করিতে চলিয়া যায়।[আত্মা যে,] পরমাত্ম-জ্যোতিঃ দ্বারা প্রকাশিত হয়,[অন্যত্রও] এ কথা উক্ত আছে;—যথা ‘এই জীবাত্মা আত্মজ্যোতির সাহায্যেই বৃত্তি লাভ করে, এবং যাতায়াত করে’ ইতি। ১

[তন্মধ্যে বিশেষ এই যে,] চৈতন্যজ্যোতিঃ-প্রকাশ্য প্রাণপ্রধান(প্রাণ যাহাতে প্রধান, সেই) লিঙ্গশরীরই দেহ হইতে বহির্গত হয়, তাহাতে লিঙ্গদেহো- পাধিক আত্মাও যেন বহির্গমন করিতেছে বলিয়া মনে হয়,[কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে] আত্মার কোথাও গমন বা আগমন নাই(১); এ বিষয়ে অন্য শ্রুতিও আছে— যথা ‘কে উৎক্রমণ করিলে আমি উৎক্রমণ করিব?’ এবং ‘যেন ধ্যানই করিতেছে’ ইত্যাদি। এই জন্যই এখানে প্রাজ্ঞ পরমাত্মার অধিনায়কতার কথা বলা হইয়াছে; তাহা না হইলে, প্রাজ্ঞ আত্মার সহিত একীভূত হইলে, শকটের ন্যায় শব্দ করিতে করিতে চলিয়া যাওয়া সম্ভবপর হয় কিরূপে? এই কারণে[বলিতে হইবে যে,] লিঙ্গশরীরোপাধিযুক্ত আত্মা—[প্রয়াণ সময়ে] মর্মগ্রন্থিসমূহ যখন ছিন্ন হইতে থাকে, তখন সেই দুঃখযাতনায় কাতর হইয়া শব্দ করত দেহ হইতে বহির্গত হয়। কোন সময়ে বহির্গত হয়, তাহা বলা হইতেছে—

যে সময়ে এইরূপ হয়; শ্রুতির ‘এতৎ’ পদটী ‘ভবতি’ ক্রিয়ার বিশেষণ। উর্দ্ধোচ্ছাসী অর্থ—অধিক পরিমাণে ঊর্দ্ধশ্বাসযুক্ত হয়, অর্থাৎ যে সময়ে ইহার মৃত্যুকালীন ঊর্দ্ধশ্বাস হইতে থাকে,[সেই সময়ে]। যদিও এ ঘটনা সাধা- রণের প্রত্যক্ষদৃশ্য, তথাপি লোকের হৃদয়ে বৈরাগ্য-সমুৎপাদনের নিমিত্ত তাহারই অনুবাদ করা হইয়াছে;[প্রমাণসিদ্ধ বিষয়ের উল্লেখকে ‘অনুবাদ’ কহে]। অভিপ্রায় এই যে, এই সংসার এমনই কষ্টকর যে, দেহত্যাগের সময়ে, মর্মগ্রন্থি-

(১) তাৎপর্য্য—পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি, এই সপ্তদশ পদার্থের সমবায়ে লিঙ্গশরীর নির্ম্মিত হয়; ইহাই আত্মার উপাধি। এই লিঙ্গশরীরে থাকিয়াই আত্মা যাহা কিছু ভোগ করিয়া থাকে। মৃত্যুকালে এই লিঙ্গশরীরই দেহ হইতে বহির্গত হইয়া অপর স্থূল দেহে প্রবেশ করে; এই কারণে তদুপহিত আত্মারও গমনাগমন কল্পিত হইয়া থাকে; নচেৎ সর্ব্বব্যাপী নিঃসঙ্গ আত্মার পক্ষে ভোগ বা গমনাগমন কিছুই সম্ভব হয় না।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৭৯

সমূহ যখন ছিন্ন হইতে থাকে, তখন তাহার[কর্তব্যাকর্তব্য বিষয়ে] স্মরণশক্তি বিলুপ্ত হইয়া যায়; দুঃখ-যাতনায় কাতর হইয়াও—চিত্ত নিজের বশে না থাকায়, তখন সে নিজের হিতসাধনের চেষ্টাতেও সমর্থ হয় না; অতএব যতক্ষণ এই ভীষণ অবস্থা না আইসে, সেই সময়ের মধ্যেই আপনার প্রকৃত হিতসাধনানুষ্ঠানে অপ্রমত্ত—মনোযোগী হইবে; শ্রুতি দয়া করিয়া এই উপদেশ করিতে- ছেন ॥২৮৭৷৩৫৷৷

স যত্রায়মণিমানং ন্যেতি জরয়া বোপতপতা বাণিমানং নিগচ্ছতি, তদ্ যথাম্রং বোদুম্বরং বা পিপ্পলং বা বন্ধনাৎ প্রমুচ্যতে, এবমেবায়ং পুরুষ এভ্যোহঙ্গেভ্যঃ সংপ্রমুচ্য পুনঃ প্রতিন্যায়ং প্রভিযোন্যাদ্রবতি প্রাণায়ৈব ॥ ২৮৮ ॥ ৩৬ ॥

সরলার্থঃ।—[অথ কস্মিন্ কালে কিংনিমিত্তম্ ঊর্দ্ধোচ্ছ্বাসী ভবতি, তদাহ—“স যত্র” ইতি।] সঃ(পূর্ব্বোক্তঃ) অয়ং(আত্মা) যত্র(যস্মিন্ কালে) অণিমানং(কার্য্যং) ন্যেতি(সম্যক্ প্রাপ্নোতি);[কিংনিমিত্তম্, তদাহ—] জরয়া(বার্দ্ধক্যান) বা, উপতপতা(কষ্টদায়কেন রোগাদিনা) বা অণিমানং নিগচ্ছতি(নিঃশেষেণ নিশ্চয়েন বা প্রাপ্নোতি);[তদা ঊর্দ্ধোচ্ছ্বাসী ভবতীতি ভাবঃ]। তৎ(তদা), আম্রং বা, উদুম্বরং বা, পিপ্পলং বা[ফলং, এতৎ ত্রয়ং ফলান্তরাণামপি উপলক্ষণম্।] যথা বন্ধাৎ(বৃত্তাৎ) প্রমুচ্যতে(গলিতং ভবতি); এবম্ এব অয়ং(আসন্নমৃত্যুঃ) পুরুষঃ, এভ্যঃ অঙ্গেভ্যঃ(চক্ষুঃপ্রভৃতি-দেহাবয়বেভ্যঃ) সংপ্রমুচ্য(নির্গত্য) পুনঃ প্রাণায় এব(প্রাণাদিসাধন-গ্রহণার্থমেব) প্রতিন্যায়ং (যথাগতং—পূর্ব্বগমনবৎ) প্রতিযোনি(জ্ঞানকর্মানুসারেণ বিভিন্নমুৎপত্তিস্থানং) আদ্রবতি(গচ্ছতি);[তদা দেহান্তরপ্রাপ্ত্যর্থং উপাত্তদেহাৎ নির্গচ্ছতীত্যা- শয়ঃ] ॥২৮৮৷৷৩৬৷৷

মূলানুবাদ:-[কোন্ সময়ে কি কারণে বা পুরুষের ঊর্দ্ধ- শ্বাস উপস্থিত হয়, তাহা বলিতেছেন-] সেই এই পুরুষ যে সময়ে কৃশতা প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ জরা কিংবা সন্তাপকর রোগাদি দ্বারা শুষ্ক- শরীর হয়, সেই সময়-আম্রফল, কিংবা উদুম্বর(যজ্ঞডুমুর ফল), অথবা অশ্বত্থ-ফল যেমন পক্কাবস্থায় বৃন্ত হইতে বিচ্যুত হয়, ঠিক তেমনই এই মুমুর্ষুপুরুষ এই সমস্ত দেহবয়ব হইতে বিমুক্ত হইয়া, পুনর্ব্বার

১১৮০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

প্রাণাদি সাধন-সমূহ পাইবার নিমিত্ত প্রতিন্যায়ে অর্থাৎ ইহার পূর্ব্বেও যেরূপে গমন করিয়াছিল, ঠিক সেইরূপেই(নিজ নিজ কর্মানুযায়ী) উৎপত্তি-স্থানের উদ্দেশে ধাবিত হয় ॥ ২৮৮ ॥ ৩৬ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তদস্যোর্দ্ধোচ্ছ্বাসিত্বং কস্মিন্ কালে, কিংনিমিত্তৎ, কথং, কিমর্থং বা স্যাৎ, ইত্যেতদুচ্যতে—সোহয়ং প্রাকৃতঃ শিরঃপাণ্যাদিমান্ পিণ্ডঃ, যত্র যস্মিন্ কালে, অয়ম্, অণিমানম্ অণোর্ভাবম্ অণুত্বং কার্য্যমিত্যর্থঃ, ন্যেতি নিগচ্ছতি। কিংনিমিত্তম্? জ্বরয়া বা স্বয়মের কালপক্কফলবৎ জীর্ণঃ কার্য্যং গচ্ছতি; উপতপতীতি উপতপন্ জ্বরাদিরোগঃ, তেনোপতপতা বা; উপতপ্যমানো হি রোগেণ বিষমাগ্নিতয়া অন্নং ভুক্তং ন জ্বরয়তি; ততোহন্নরসেনানুপচীয়মানঃ পিণ্ডঃ কার্য্যমাপদ্যতে; তদুচ্যতে—উপতপতা বেতি, অণিমানং নিগচ্ছতি। যদা অত্যন্তকার্য্যং প্রতিপন্নো জরাদিনিমিত্তৈঃ, তদা ঊর্দ্ধোচ্ছাসী ভবতি; যদোর্দ্ধো- চ্ছাসী, তদা ভূশাহিতসম্ভার-শকটবৎ উৎসর্জন্ যাতি। জরাভিভবঃ, রোগাদি- পীড়নম্, কার্য্যাপত্তিশ্চ শরীরবতোহবশ্যম্ভাবিন এতেহনর্থা ইতি বৈরাগ্যায়েদ- মুচ্যতে। ১

টীকা। প্রশ্নচতুষ্টয়মনুদ্য তদুত্তরত্বেন স যত্রেত্যাদি বাক্যমাদায় ব্যাকরোতি-তদস্যে- ত্যাদিনা। প্রশ্নপূর্ব্বকং কার্য্যনিমিতং স্বাভাবিকমাগন্তুকং চেতি দর্শয়তি-কিং নিমিত্ত- মিত্যাদিনা। কথং জরাদিনা কার্য্যপ্রাপ্তিরিত্যাশঙ্ক্যাহ-উপতপ্যমানো হীতি। যথোক্ত- নিমিত্তদ্বয়বশাৎ কার্য্যপ্রাপ্তিং নিগময়তি-অণিমানমিতি। কস্মিন্ কালে তদূর্দ্ধোচ্ছ্বাসিত্ব- মন্যেতি প্রশ্নস্যোত্তরমুক্তয়া বিধয়া সিদ্ধমিত্যাহ-যদেতি। অবশিষ্টপ্রশ্নত্রয়স্যোত্তরমাহ- যদোদ্ধোচ্ছাসীতি। তত্র হি কার্য্যনিমিত্তং সংভৃতশকটবন্নানাশব্দকরণং স্বরূপং শরীরবিমোক্ষণং চ প্রয়োজনমিত্যর্থঃ। স যত্রেত্যাদিবাক্যাদর্থসিদ্ধমর্থমাহ-জরেতি। ১

যদা অসৌ উৎসর্জন্ যাতি, তদা কথং শরীরং বিমুঞ্চতীতি দৃষ্টান্ত উচ্যতে- তৎ তত্র, যথা আম্রং বা ফলম্, উদুম্বরং বা ফলম্, পিপ্পলং বা ফলম্; বিষ- মানেকদৃষ্টান্তোপাদানং মরণস্যানিয়তনিমিত্তত্বখ্যাপনার্থম্; অনিয়তানি হি মরণস্য নিমিত্তানি অসঙ্খ্যাতানি চ। এতদপি বৈরাগ্যার্থমেব-যস্মাদয়- মনেকমরণনিমিত্তবান্, তস্মাৎ সর্ব্বদা মৃত্যোরাস্যে বর্ততে ইতি। বন্ধনাৎ- বধ্যতে যেন বৃন্তেন সহ, স বন্ধনকারণো রসঃ, যস্মিন্ বা বধ্যতে ইতি বৃন্ত- মেবোচ্যতে বন্ধনম্; তস্মাৎ রসাদ্ বৃত্তাৎ বা বন্ধনাৎ প্রমুচ্যতে বাতাদনেক- নিমিত্তম্; এবমেব অয়ং পুরুষঃ লিঙ্গাত্মা লিঙ্গোপাধিঃ এভ্যোহঙ্গেভ্যঃ চক্ষুরাদি- দেহাবয়বেভ্যঃ-সম্প্রনুচ্য সম্যক্ নির্লেপেন প্রমুচ্য-ন সুযুপ্ত-গমনকাল ইক

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৬১

প্রাণেন রক্ষন্; কিং তর্হি? সহ বায়ুনা উপসংহৃত্য, পুনঃ প্রতিন্যায়ম্;-‘পুনঃ” শব্দাৎ পূর্ব্বমপ্যয়ং দেহাদ্দেহান্তরমসকৃৎ গতবান্-যথা স্বপ্নবুদ্ধাস্তৌ পুনঃ পুনর্গচ্ছতি, তথা, পুনঃ প্রতিন্যায়ং প্রতিগমনং যথাগতমিত্যর্থঃ, প্রতিযোনি যোনিং যোনিং প্রতি কৰ্ম্মশ্রুতাদিবশাৎ আদ্রবতি; কিমর্থম্? প্রাণায়ৈব প্রাণব্যুহায়ৈবেত্যর্থঃ; সপ্রাণ এব হি গচ্ছতি, ততঃ প্রাণায়ৈবেতি বিশেষণমনর্থকম্; প্রাণব্যুহায় হি গমনং দেহাদ্দেহান্তরং প্রতি; তেন হ্যস্য কৰ্ম্মফল-ভোগার্থসিদ্ধিঃ, ন প্রাণ- সত্তামাত্রেণ। তস্মাত্তাদর্থ্যার্থং যুক্তং বিশেষণম্-প্রাণব্যুহায়েতি ॥২৮৮৷৷৩৬৷৷

তদ্যথেত্যাদিবাক্যং প্রশ্নপূর্বকমাদায় ব্যাচষ্টে-যদেত্যাদিনা। ফলং বন্ধনাৎ প্রমুচ্যুত ইতি সম্বন্ধঃ। কিমিতি বিষমানেকদৃষ্টান্তোপাদানমেকেনাপি বিবক্ষিতসিদ্ধেরিত্যাশঙ্ক্যাহ-বিষমেতি। কথং মরণস্যানিয়তান্যনেফানি নিমিত্তানি সম্ভবন্তীত্যাশঙ্ক্যানুভবমনুসৃত্যাহ-অনিয়তানীতি। অথ মরণস্যানেকানিয়তনিমিত্তবত্বসংকীর্তনং কুত্রোপযুজ্যতে, তত্রাহ-এতদপীতি। তদর্থবত্ত্ব- মেব সমর্থরতে-যম্মাদিতি। ইত্যপ্রমত্তৈর্ভবিতব্যমিতি শেষঃ। বৃত্তেন সহ ফলং যেন রসেন সম্বধ্যতে, স রসো বন্ধনকারণভূতো বন্ধনং, বৃন্তমেব বা বন্ধনং, যস্মিন্ ফলং বধ্যতে রসেনেতি ব্যুৎপত্তেঃ, তস্মাৎ বন্ধনাদনেকনিমিত্তবশাৎ পূর্বোক্তস্য ফলস্য ভবতি প্রমোক্ষণমিত্যাহ- বন্ধনাদিত্যাদিনা। লিঙ্গমাত্মোপাধিরস্তেতি তদ্বিশিষ্টঃ শারীরস্তথোচ্যতে। সংপ্রমুচ্যাদ্রবর্তীতি সম্বন্ধঃ।

সমিত্যুপসর্গস্য তাৎপর্য্যমাহ-নেত্যাদিনা। যদি স্বপ্নাবস্থায়ামিব মরণাবস্থায়াং প্রাণেন দেহং রক্ষন্নাদ্রবতীতি নাদ্রিয়তে, কেন প্রকারেণ তর্হি তদা দেহান্তরং প্রতি গমনমিত্যাশঙ্ক্যাহ- কিং তহীতি। বায়ুনা প্রাণেন সহ করণজাতমুপসংহৃত্যাদ্রবতীতি পূর্ববৎ সম্বন্ধঃ। পুনঃ প্রতিন্যায়মিতি প্রতীকমাদায় পুনঃশব্দস্য তাৎপয্যমাহ-পুনরিত্যাদিনা। তথা পুনরাদ্রবতীতি সম্বন্ধঃ। যথা পূর্বমিমং দেহং প্রাপ্তবান্, পুনরপি তথৈব দেহান্তরং গচ্ছতীত্যাহ-প্রতিন্যায়- মিতি। দেহান্তরগমনে কারণমাহ-কৰ্ম্মেতি। আদিশব্দেন পূর্বপ্রজ্ঞা গৃহ্যতে। প্রাণব্যূহায় প্রাণানাং বিশেষাভিব্যক্তিলাভায়েতি যাবৎ। প্রাণায়েতি শ্রুতিঃ কিমর্থমিখং ব্যাখ্যায়তে, তত্রাহ-সপ্রাণ ইতি। এতচ্চ তদন্তরপ্রতিপত্ত্যধিকরণে নির্দ্ধারিতম্। প্রাণায়েতি বিশেষণ- স্যানর্থক্যাদযুক্তং প্রাণব্যুহায়েতি বিশেষণমিত্যাহ-প্রাণেতি। নন্বন্য প্রাণঃ সহ বর্ততে চেৎ, তাবতৈব ভোগসিদ্ধেরলং প্রাণব্যূহেনেত্যাশঙ্ক্যাহ-তেন হীতি। অন্যথা সুযুপ্তিমূর্ছয়োরপি ভোগপ্রসক্তেরিত্যর্থঃ। তাদর্থার্থং প্রাণস্য ভোগশেষত্বসিদ্ধ্যর্থমিতি যাবৎ ॥ ২৮৮। ৩৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ।—এই পুরুষের যে, ঐরূপ ঊর্দ্ধশ্বাস হয়, তাহা কোন্ সময়ে, কি কারণে, কি প্রকারে এবং কি উদ্দেশ্যেই বা হয়, এখন তাহা কথিত হইতেছে। —হস্তপদাদিবিশিষ্ট সেই পুরুষ অর্থাৎ দেহপিণ্ড, যে সময় অণিমা—অণুভাব অর্থাৎ কৃশতা প্রাপ্ত হয়। কৃশতাপ্রাপ্তির কারণ কি?[তদুত্তরে বলিতেছেন—] জরা দ্বারা—কালপক্ক ফলের ন্যায় নিজেই জীর্ণ হইয়া কৃশতা লাভ করে; অথবা

১১৮২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

উপতপৎ—সন্তাপকর জ্বরাদি রোগদ্বারাও ঐরূপ হইতে পারে; কারণ, রোগজনিত সন্তাপগ্রস্ত ব্যক্তির অগ্নিবৈষম্য ঘটে; অগ্নিমান্দ্য নিবন্ধন তখন আর ভুক্ত অন্ন জীর্ণ হইতে পারে না; তাহার ফলে শরীর অন্নরসে পরিপুষ্ট না হইয়া ক্রমশঃ কৃশতা প্রাপ্ত হয়; এই অভিপ্রায় প্রকাশের জন্য বলা হইতেছে—‘উপতপতা বা’ ইতি। বার্দ্ধক্যাদি নিমিত্ত বশতঃ যখন অত্যন্ত কৃশতা প্রাপ্ত হয়, তখনই পুরুষের উর্দ্ধশ্বাস হয়; যখন উর্দ্ধশ্বাস হয়, তখন অতি ভারাক্রান্ত শকটের ন্যায় আর্তনাদ করিতে করিতে গমন করে। যাহার শরীর আছে, তাহার পক্ষেই বার্দ্ধক্যের আক্রমণ, রোগজনিত যাতনা ও কৃশতাপ্রাপ্তি, এ সমুদয় অনর্থ অবশ্য- ম্ভাবী; ইহা জানিলে লোকের মনে সহজেই বৈরাগ্য বা অনাসক্তির ভাব আসিতে পারে; এই কারণে এখানে এ সমুদয়ের উল্লেখ করা হইয়াছে। ১

এই পুরুষ, যে সময়ে শব্দ করিতে করিতে চলিয়া যায়, সে সময়ে কিরূপে শরীর পরিত্যাগ করে, তদ্বিষয়ে দৃষ্টান্ত কথিত হইতেছে।—সে বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই যে, আম্রফল, কিংবা উদুম্বর ফল, অথবা পিপ্পল ফল(অশ্বত্থ ফল) যেরূপ বন্ধন হইতে —বন্ধন অর্থ—আম্রাদি ফল যাহা দ্বারা বৃন্তের(বোঁটার) সহিত বাঁধা থাকে, তাহা অর্থাৎ বন্ধনসাধন রস, অথবা ফল যাহাতে আবদ্ধ থাকে, সেই বৃন্ত ‘বন্ধন’ শব্দে অভিহিত হইয়াছে। ঐ সমস্ত ফল যেমন বায়ুবেগপ্রভৃতি নানাকারণে— বন্ধন-শব্দবাচ্য রস বা বৃন্ত হইতে বিচ্যুত হইয়া থাকে, তেমনি, এই পুরুষও অর্থাৎ লিঙ্গশরীরোপহিত আত্মাও এই সমস্ত অঙ্গ হইতে—চক্ষুঃপ্রভৃতি দেহাবয়ব হইতে সম্প্রযুক্ত হইয়া—সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষভাবে—কিন্তু সুষুপ্তিতে প্রবেশের সময় যেরূপ প্রাণ থাকিয়া যায়, সেরূপ নহে, পরন্তু প্রাণবায়ুর সহিত সমস্ত করণবর্গ সংগ্রহ করিয়া—সঙ্গে লইয়া পুনর্ব্বার প্রতিন্যায়ে—এখানে ‘পুনঃ’ শব্দ থাকায় বুঝা যাই- তেছে যে, পুরুষ স্বপ্ন ও জাগরণাবস্থায় প্রবেশের ন্যায়, ইতঃপূর্ব্বেও অনেক বার এক দেহ হইতে দেহান্তরে গমন করিয়াছে; এখনও আবার ‘প্রতিন্যায়ে’ অর্থাৎ পূর্ব্বগতির অনুরূপভাবে, প্রতিযোনিতে অর্থাৎ স্বীয় কৰ্ম্ম ও জ্ঞানানুসারে যেরূপ যোনিতে জন্মলাভ সম্ভব হয়, সেইরূপ যোনিতে গমন করে।

কিসের জন্য? না, প্রাণের জন্য অর্থাৎ—প্রাণসমূহের বিশেষরূপে অভিব্যক্তি লাভের জন্য[গমন করে]। পুরুষত প্রয়াণ কালে প্রাণসহকারেই গমন করিয়া থাকে; সুতরাং ‘প্রাণায় এব’ এই বিশেষোক্তি নিরর্থক হইয়া পড়ে; অতএব বলিতে হইবে যে, এখানে প্রাণ অর্থ—প্রাণসমূহের বিশেষভাবে অভিব্যক্তি। সেই উদ্দেশ্যেই পুরুষ এক দেহ ছাড়িয়া দেহান্তরে গমন করে; এবং তাহা

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৬৩

দ্বারাই পুরুষের কর্মফল-ভোগরূপ স্বার্থ সুসিদ্ধ হয়, কিন্তু কেবল প্রাণমাত্র বিদ্যমান থাকিলেই হয় না; অতএব ঐপ্রকার অভিপ্রায় সিদ্ধির জন্য ‘প্রাণব্যূহায়’ এইরূপ বিশেষোক্তি করা যুক্তিসঙ্গতই হইয়াছে।

উপরে শ্রুতিতে যে, আম্র, উদুম্বর ও পিপ্পল, এই বহু দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহার উদ্দেশ্য—মরণের অনিয়ত-নিমিত্তত্ব অর্থাৎ সকলের পক্ষে যে, একই প্রকার মৃত্যুকারণ সংঘটিত হইবে, এরূপ কোনও নিয়ম নাই—ইহা জ্ঞাপন করা; কেন না, মরণের কারণ অনিশ্চিত এবং অসংখ্য; ইহাও বৈরাগ্যোৎপাদনার্থই বলা হইয়াছে। যেহেতু মরণের নিমিত্ত বহুপ্রকার, সেইহেতু মনে রাখা উচিত যে, আমরা সর্ব্বদাই মৃত্যুর মুখে পতিত রহিয়াছি;[এইরূপ চিন্তার ফলে লোকের মনে সহজেই বৈরাগ্য আসিতে পারে] ॥ ২৮৮ ॥ ৩৬ ॥

আভাসভাষ্যম্।—তত্র অন্যেদং শরীরং পরিত্যজ্য গচ্ছতো ন অন্যস্য দেহান্তরস্যোপাদানে সামর্থ্যমস্তি, দেহেন্দ্রিয়বিয়োগাৎ; ন চান্টেহস্য ভৃত্যস্থানীয়াঃ, গৃহমিব রাজ্ঞে, শরীরান্তরং কৃত্বা প্রতীক্ষমাণা বিদ্যন্তে; অথৈবং সতি কথমস্য শরীরান্তরোপাদানমিতি?

উচ্যতে।—সর্ব্বং হাস্য জগৎ স্বকর্মফলোপভোগসাধনত্বায়োপাত্তম্; স্বকর্ম- ফলোপভোগায় চায়ং প্রবৃত্তো দেহাৎ দেহান্তরং প্রতিপিৎসুঃ; তস্মাৎ সর্ব্বমেব জগৎ স্বকর্মপ্রযুক্তং তৎকর্মফলোপভোগযোগ্যং সাধনং কৃত্বা প্রতীক্ষত এব, “কৃতং লোকং পুরুষোহভিজায়তে” ইতি শ্রুতেঃ, যথা স্বপ্নাজ্জাগরিতং প্রতিপিৎসোঃ। তৎ কথমিতি লোকপ্রসিদ্ধো দৃষ্টান্ত উচ্যতে—

আভাসভাষ্য-টীকা। তদ্যথা রাজানমিত্যাদিবাক্যব্যাবর্ত্যামাশঙ্কামাহ—তত্রেতি। মুমুর্য্যাবস্থা সপ্তম্যর্থঃ। অথাস্য স্বয়মসামর্থ্যেহপি শরীরান্তরকর্তারোহন্যে ভবিষ্যন্তি, যথা রাজ্ঞে ভৃত্যা গৃহনির্মাতারঃ, তত্রাহ—ন চেতি। স্বয়মসামর্থ্যমন্যেষাং চাসত্ত্বমিতি স্থিতে: ফলিতমাহ— অথেতি। তদ্যথেত্যাদিবাক্যস্য তাৎপর্য্যং দর্শয়ন্নুত্তরমাহ—উচ্যত ইতি। ভবত্বজ্ঞস্য স্বকৰ্ম্ম- ফলোপভোগে সাধনত্বসিদ্ধ্যর্থং সর্ব্বং জগদুপাত্তং, তথাপি দেহাদ্দেহান্তরং প্রতিপিৎসমানস্য কিমায়াতমিত্যাশঙ্ক্যাহ—স্বকর্ম্মেতি। স্বকর্ম্মণেত্যত্র স্বশব্দঃ তৎকর্ম্মফলোপভোগযোগ্যমিত্যত্র তচ্ছব্দশ্চ প্রকৃতভোক্তৃবিষয়ৌ। তত্র প্রমাণমাহ—কৃতমিতি। পুরুষো হি ত্যক্তবর্তমানদেহো ভূতপঞ্চকাদিনা নির্মিতমেব দেহান্তরমভিব্যাপ্য জায়ত ইতি শ্রুতেরর্থঃ। উক্তমেবার্থং দৃষ্টান্তেন স্পষ্টয়তি—যখেতি। স্বপ্নস্থানাজ্জাগরিতস্থানং প্রতিপত্তমিচ্ছতঃ শরীরং পূর্বমেব কৃতং নাপূর্ব্বং ক্রিয়তে, তথা দেহাদ্দেহান্তরং প্রতিপিৎসমানস্য পঞ্চভূতাদিনা কৃতমেব দেহান্তরমিত্যর্থঃ।

আভাসভাষ্যানুবাদ।—কথিত বিষয়ে জিজ্ঞাস্য এই যে, পুরুষ যে সময়ে বর্তমান দেহ ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়, সে সময়ে তাহার অপর দেহ গ্রহণ,

১১৮৪ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

করিবার সামর্থ্য থাকে না; কারণ, তখন তাহার দেহেন্দ্রিয়াদির সহিত সম্বন্ধ বিলুপ্ত হইয়া যায়; অথচ রাজার ভৃত্যগণ যেমন[রাজার গন্তব্য স্থানে অগ্রে যাইয়া] রাজার জন্য গৃহনির্মাণপূর্ব্বক রাজার আগমন প্রতীক্ষা করিতে থাকে, তেমন এই পুরুষের ভৃত্যস্থানীয় এমন অপর কেহই নাই, যাহারা পুরুষের জন্য দেহান্তর নির্মাণপূর্ব্বক পুরুষের আগমন প্রতীক্ষা করিবে; এমত অবস্থায় পরলোরুগামী পুরুষের দেহান্তর গ্রহণ করা কিরূপে সম্ভবপর হয়?

হাঁ, ইহার উত্তর বলা যাইতেছে—এই সমস্ত জগৎ পুরুষের স্বীয় কর্ম্মফল ভোগের সাধনরূপে প্রাপ্ত; সেই পুরুষ স্বীয় কর্ম্মফল উপভোগের নিমিত্তই এক দেহ হইতে দেহান্তরে যাইতে ইচ্ছুক হয়; সুতরাং সমস্ত জগৎই তখন তাহার কর্ম্মদ্বারা পরিচালিত হইয়া, তদীয় কর্ম্মফল ভোগের উপযুক্ত সাধন(শরীরাদি) নির্মাণপূর্ব্বক নিশ্চয়ই প্রতীক্ষা করিতে থাকে। শ্রুতিও একথা বলিয়াছেন— ‘পুরুষ স্বকৃত লোকেই জন্মলাভ করে’ ইতি। উদাহরণ—যেমন স্বপ্নাবস্থা হইতে জাগ্রদবস্থায় প্রবেশের ইচ্ছুক পুরুষের জন্য[ভোগ্য নির্মিত হইয়া থাকে, ইহাও তেমনি](১)। তাহা যে, কিপ্রকারে হয়, তদ্বিষয়ে লোকপ্রসিদ্ধ দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইতেছে—

তদ্যথা রাজানমায়ান্তমুগ্রাঃ প্রত্যেনসঃ সূত-গ্রামণ্যোহন্নৈঃ পানৈরাবসথৈঃ প্রতিকল্পন্তেহয়মায়াত্যয়মাগচ্ছতীত্যেবং হৈবং- বিদৎ সর্ব্বাণি ভূতানি প্রতিকল্পন্ত ইদং ব্রহ্মায়াতীদমাগচ্ছ- তীতি ॥ ২৮৯ ॥ ৩৭ ॥

সরলার্থঃ।—তৎ(তত্র বিষয়ে)[অয়ং দৃষ্টান্তঃ—] যথা উগ্রাঃ(ক্রুর- কর্মাণঃ, চণ্ডশীলা বা) প্রত্যেনসঃ(তস্করাদিদমনকাঃ), সূত-গ্রামণ্যঃ(সূতাঃ সংকরজাতয়ঃ, গ্রামণ্যঃ গ্রামনায়কাঃ চ) রাজানং আয়াস্তং(আগচ্ছন্তং সন্তং) —‘অয়ম্(রাজা) আয়াতি—অয়ম্ আগচ্ছতি’ ইতি(এবং কৃত্বা) অন্নেঃ পানৈঃ

(১) তাৎপর্য্য—জীবগণ যখন জাগ্রদবস্থা হইতে অপসৃত হইয়া স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থায় প্রবেশ করে, তখন তাহার বহির্জগতের সহিত কোনরূপ সম্বন্ধ থাকে না; আবার যখন স্বপ্নাবস্থা হইতে জাগ্রদবস্থায় উপস্থিত হইয়া ভোগ করা আবশ্যক হয়, তখন তাহার ভোগ্য বস্তু যোগায় কে? না, জগৎ; তাহার স্বকীয় কর্ম্ম দ্বারা প্রেরিত হইয়া স্বয়ং জগৎই তাহার উপযুক্ত ভোগ্য সামগ্রী সম্মুখে আনয়ন করিয়া থাকে। এইরূপ—মৃত্যুর পরেও জগৎই জীবের কর্ম্মানুযায়ী ভোগ্য বিষয় সম্পাদন করিয়া থাকে।

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং অধ্যায়ম্।
১১৮৫

আবসথৈঃ(ভবনৈঃ) চ প্রতিকল্পন্তে(প্রতীক্ষন্তে); এবং হ(যথোক্তবৎ এব) এবংবিদৎ(যথোক্ততত্ত্বদর্শিনং)—‘ইদং ব্রহ্ম আয়াতি, ইদং(ব্রহ্ম) আগচ্ছতি’ ইতি[কৃত্বা] সর্ব্বাণি ভূতানি প্রতিকল্পন্তে—(প্রতীক্ষন্তে ইত্যর্থঃ) ॥২৮৯৷৷৩৭৷৷

মুলাসুবাদঃ—কথিত বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই যে, রাজা আসিতে- ছেন জানিবা মাত্র, দুষ্টদমনকারী উগ্রজাতি, সূত(অশ্বসারথ্যকারী সংকর- জাতি) ও গ্রামাধ্যক্ষগণ যেরূপ ‘এই রাজা আসিতেছেন—এই রাজা আসিতেছেন’ বলিয়া তাঁহার জন্য নানাপ্রকার অন্নপানীয় ও বাসভবন প্রভৃতির ব্যবস্থা করিয়া প্রতীক্ষা করিতে থাকে, ঠিক সেইরূপ ‘এই ব্রহ্ম আসিতেছেন—এই ব্রহ্ম আসিতেছেন’ মনে করিয়া সমস্ত ভূতবর্গ দেহবিমুক্ত সেই জ্ঞানীর জন্য প্রতীক্ষা করিতে থাকে ॥ ২৮৯ ॥ ৩৭ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তৎ তত্র, যথা রাজানং রাজ্যাভিষিক্তমায়ান্তং স্বরাষ্ট্রে, উগ্রাঃ জাতিবিশেষাঃ ক্রুরকর্মাণো বা, প্রত্যেনসঃ—প্রতি প্রতি এনসি পাপকর্ম্মণি নিযুক্তাঃ প্রত্যেনসঃ তস্করাদি-দণ্ডনাদৌ নিযুক্তাঃ, সুতাশ্চ গ্রামণ্যশ্চ সূত-গ্রামণ্যঃ, সূতাঃ বর্ণসঙ্করজাতিবিশেষাঃ, গ্রামণ্যঃ গ্রামেনেতারঃ, পূর্ব্বমেব রাজ্ঞ আগমনং বুদ্ধা অন্নৈভোজ্যভক্ষ্যাদিপ্রকারৈঃ, পানৈঃ মদিরাদিভিঃ, আবসথৈশ্চ প্রাসাদাদিভিঃ প্রতিকল্পন্তে নিষ্পন্নৈরেব প্রতীক্ষন্তে—অয়ং রাজা আয়াতি অয়মাগচ্ছতীত্যেবং বদন্তঃ। যথা অয়ং দৃষ্টান্তঃ, এবং হ এবংবিদং কর্মফলস্য বেদিতারং সংসারিণমিত্যর্থঃ। কর্মফলং হি প্রস্তুতম্, তৎ এবংশশব্দেন পরামৃশ্যতে; সর্ব্বাণি ভূতানি শরীরকর্ত্তনি, করণানুগ্রহীতুণি চ আদিত্যাদীনি, তৎকৰ্ম্মপ্রযু- ক্তানি কৃতৈরেব কৰ্ম্মফলোপভোগসাধনৈঃ প্রতীক্ষন্তে—ইদং ব্রহ্ম ভোক্তৃ কর্তৃ চাস্মাকমায়াতি, তথা ইদমাগচ্ছতীতি, এবমেব চ কৃত্বা প্রতীক্ষন্ত- ইত্যর্থঃ ॥২৮৯৷৷৩৭৷৷

টীকা। সর্বেষাং ভূতানাং দেহান্তরং কৃত্বা সংসারিণি পরলোকায় প্রন্থিতে প্রতীক্ষণং কেন প্রকারেণেতি প্রশ্নপূর্ব্বকং দৃষ্টান্তবাক্যমুখাপ্য ব্যাচষ্টে-তৎ তত্রেত্যাদিনা। তত্র পাপকর্মণি নিযুক্তত্বমেব ব্যনক্তি-তস্করাদীতি। আদিপদেনান্যেহপি নিগ্রাহ্যা গৃহ্যন্তে। দণ্ডনাদাবিত্যাদি- শব্দো হিংসাপ্রভেদসংগ্রহার্থঃ। ‘ব্রাহ্মণ্যাং ক্ষত্রিয়াৎ সুতঃ’ ইতি স্মৃতিমাশ্রিত্য সুতশব্দার্থমাহ- বর্ণসঙ্করেতি। ভোজ্যভক্ষ্যাদিপ্রকারৈরিত্যাদিশব্দেন লেহ্যচোয্যয়োঃ সংগ্রহঃ। মদিরাদিতি- রিত্যাদিপদেন ক্ষীরাদি গৃহতে। প্রাসাদাদিভিরিত্যাদিশব্দো গোপুরতোরণাদিগ্রহার্থঃ। বিদ্বন্মাত্রে প্রতীয়মানে কিমিতি কৰ্ম্মফলস্য বেদিতারমিতি বিশেষোপাদানমিত্যাশঙ্ক্যাহ-

30

১১৬৬ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

কর্মফলং হীতি। তৎকৰ্ম্মপ্রযুক্তানীত্যত্র তৎশব্দঃ সংসারিবিষয়ঃ। সংসারিণো বস্তুতো ব্রহ্মাভিন্নত্বাৎ তস্মিন্ ব্রহ্মশব্দঃ। অভ্যাসস্তু ভয়ত্রাদরার্থঃ ॥২৮৯৷৩৭৷

ভাষ্যানুবাদ।-যথোক্ত বিষয়ে দৃষ্টান্ত এইরূপ,-রাজ্যাভিষিক্ত রাজা স্বীয় রাজ্যমধ্যে যাইতেছেন[জানিতে পারিয়া,] প্রত্যেনস্-যাহারা প্রতি- নিয়ত পাপকার্য্যে নিরত, সেই তস্কর প্রভৃতির দণ্ডবিধানে নিযুক্ত উগ্রগণ অর্থাৎ উগ্রনামক জাতিবিশেষ, অথবা যাহারা অত্যন্ত ক্রুরকর্মা, তাহারা এবং সুত ও গ্রামণীগণ, সূত অর্থ-বর্ণসঙ্কর একপ্রকার জাতি, আর গ্রামণী অর্থ-গ্রামের নেতা; তাহারা যেমন রাজার আগমনবার্তা জানিতে পারিয়া অগ্রেই ভোজ্য- ভক্ষ্যাদি নানাপ্রকার অন্ন, মদিরা প্রভৃতি বিবিধ পানীয় এবং আবসথ-প্রাসাদ (রাজভবন) প্রভৃতি পূর্ব্ব সম্পাদিত ভোগ্য পদার্থ দ্বারা ‘এই রাজা আসিতেছেন, এই রাজা আসিতেছেন’ বলিয়া প্রতীক্ষা করিতে থাকে।

উক্ত দৃষ্টান্তটী যে প্রকার, ঠিক সেই প্রকার এবংবিদকে-কৰ্ম্মফলাভিজ্ঞ সংসারীকে লক্ষ্য করিয়া সমস্ত ভূতগণ অর্থাৎ শরীর-নির্মাতৃগণ ও ইন্দ্রিয়াধিপতি সূর্য্যপ্রভৃতি দেবতাগণ, তাহারই কৰ্ম্ম দ্বারা প্রেরিত হইয়া পূর্ব্বসম্পাদিত কৰ্ম্ম- ফলের উপভোগসাধনসমূহ লইয়া প্রতীক্ষা করিতে থাকে-‘আমাদের ভোক্তা ও কর্তা এই ব্রহ্ম আসিতেছেন-এই আসিতেছেন’ এইরূপ করিয়াই অপেক্ষা করিতে থাকেন। এখানে কর্মফলেরই প্রস্তাব রহিয়াছে; এই জন্য ‘এবংবিদং’ কথার ‘এবং’ শব্দে সেই কৰ্ম্মফলই গ্রহণ করা হইয়াছে ॥২৮৯৷৷৩৭৷৷

তদ্যথা রাজানং প্রবিযাসন্তমুগ্রাঃ প্রত্যেনসঃ সূত-গ্রামণ্যো- হভিসমায়ন্ত্যেবমেবেমমাত্মানমন্তকালে সর্ব্বে প্রাণা অভিসমায়ন্তি যত্রৈতদূর্দ্ধোচ্ছাসী ভবতি ॥ ২৯০ ॥ ৩৮ ॥

ইতি চতুর্থ্যাধ্যায়ং তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্ ॥ ৪ ॥ ৩ ॥

সরলার্থঃ।—[ইদানীং তৎসহগামিনঃ প্রদর্শয়িতুমাহ—‘তদ্যথা’ ইত্যাদি।] তৎ(তত্র গমনে)[অয়ৎ দৃষ্টান্তঃ—] প্রত্যেনসঃ উগ্রাঃ, সূতগ্রামণ্যঃ যথা—রাজানৎ প্রবিষাসন্তৎ(প্রস্থাতুকামং)[জ্ঞাত্বা স্বয়মেব] অভিসমায়ন্তি (একীভূতাঃ তমনুবর্তন্তে), এবম্ এব(উক্তদৃষ্টান্তবদ্ এব) অন্তকালে(মরণসময়ে) যত্র(যস্মিন্ সময়ে) এতৎ(এবং যথা স্যাৎ, তথা)[এষঃ আত্মা] ঊর্দ্ধোচ্ছাসী ভবতি,[তদা] সর্ব্বে প্রাণাঃ(করণবর্গাঃ) ইমৎ(দেহান্তরজিগমিযুম্) আত্মানম্ অভিসমায়ন্তি(মিলিতাঃ সন্তঃ অনুগচ্ছন্তি ইত্যর্থঃ) ॥২৯০৷৷৩৮৷৷

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—তৃতীয়ং ব্রাহ্মণম্।

১১৬৭

মূলানুবাদ।—দুষ্টদমনকারী উগ্রজাতি কিংবা সূত ও গ্রামণী- গণ যেমন, রাজা যাইতেছেন জানিয়া তাঁহার অনুগমন করিয়া থাকে, ঠিক সেইরূপ যে সময়ে এই আত্মার ঊর্দ্ধশ্বাস উপস্থিত হয়, সেই সময়ে—মরণ- কালে, আত্মা দেহ হইতে বহির্গমনের উপক্রম করিবামাত্র সমস্ত প্রাণ— চক্ষুঃপ্রভৃতি করণবর্গ সেই আত্মার অনুগমন করিয়া থাকে ॥ ২৯০ ॥ ৩৮॥

ইতি চতুর্থ্যাধ্যায় তৃতীয়ব্রাহ্মণব্যাখ্যা ॥ ৪ ॥ ৩ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—তমেবং জিগমিষুং কে সহ গচ্ছন্তি; যে বা গচ্ছন্তি, তে কিং তৎক্রিয়া-প্রণুন্নাঃ? আহোস্বিৎ তৎকর্ম্মবশাৎ স্বয়মেব গচ্ছন্তি—পরলোক- শরীরকর্ত্তৃণি চ ভূতানীতি। অত্রোচ্যতে দৃষ্টান্তঃ—তদ্যথা রাজানং প্রযিযাসন্তং প্রকর্ষেণ যাতুমিচ্ছন্তম্, উগ্রাঃ প্রত্যেনসঃ সূতগ্রামণ্যঃ তৎ যথা অভিসমায়ন্তি আভি- মুখ্যেন সমায়ন্তি একীভাবেন তমভিমুখা আয়ন্তি অনাজ্ঞপ্তা এব রাজ্ঞা, কেবলং তজ্জিগমিষাভিজ্ঞাঃ, এবমেব ইমমাত্মানং ভোক্তারমন্তকালে মরণকালে সর্ব্বে প্রাণাঃ বাগাদয়ঃ অভিসমায়ন্তি—যত্রৈতদূর্দ্ধোচ্ছ্বাসী ভবতীতি ব্যাখ্যাতম্ ॥২৯০৷৷৩৮৷৷

ইতি বৃহদারণ্যকবর্ত্তী চতুর্থোহধ্যায়ঃ তৃতীয়ং স্কন্ধে। অধ্যায়ঃ ॥৩॥

টীকা। তদ্যথা রাজানং প্রযিযাসন্তমিত্যাদিবাক্যব্যাবর্ত্যং চোদ্যমুখাপয়তি-তমেবমিতি। বাগাদয়স্তমনুগচ্ছত্তীত্যাশঙ্ক্যাহ-যে বেতি। তৎক্রিয়াপ্রণুন্নাস্তস্য গন্তর্ব্বাগাদিব্যাপারেণ প্রেরিতাঃ সমাহৃতা ইতি যাবৎ। যানি চ ভূতানি পরলোকশব্দিতং শরীরং কুর্ব্বন্তি, যানি বা করণানুগ্রহীতৃণ্যাদিত্যাদীনি, তেষপি যথোক্তপ্রশ্নপ্রবৃত্তিং দর্শয়তি-পরলোক্রেতি। নাদ্যং, পরলোকার্থং প্রস্থিতস্য বাগাদিব্যাপারাভাবাদাহ্বানানুপপত্তেঃ। ন দ্বিতীয়ঃ, ভোক্তকৰ্ম্মণাপি বাগাদিঘচেতনেয় স্বয়ংপ্রবৃত্তেরনুপপত্তেরিতি চোদয়িতুরভিমানঃ। উত্তরবাক্যেণোত্তরমাহ- অত্রেত্যাদিনা। মরণকালমেব বিশিনষ্টি-যত্রেতি। অচেতনানামপি রথাদীনাং চেতন- প্রেরিতানাং প্রবৃত্তিদর্শনাৎ ‘বাগাদীনামপি ভোক্তকৰ্ম্মবশাৎ তদাহুতত্বমন্তরেণ প্রবৃত্তিঃ সম্ভবতীতি ভাবঃ ॥২৯০৷৩৮৷

ইতি বৃহদারণ্যকোপনিষদ্ভাষ্যটীকায়াং চতুর্থধ্যায়ঃ তৃতীয়ং জ্যৈষ্ঠমাসঃ ॥৪॥

ভাষ্যানুবাদ।—সেই আত্মা যে সময়ে এইপ্রকারে পরলোকে প্রস্থান করিতে অভিলাষী হয়, সে সময়ে কাহারা তাহার সহিত গমন করে? এবং যাহারা তাহার সঙ্গে গমন করে, তাহারা কি সেই পুরুষের প্রাক্তন কর্ম্ম দ্বারা প্রেরিত হইয়া গমন করে, অথবা তাহারই কর্ম্মানুসারে উহারা এবং তাহার পারলৌকিক শরীরনির্মাতা ভূতগণ স্বয়ংই তাহার সঙ্গে সঙ্গে গমন করিয়া থাকে? এতদুত্তরে দৃষ্টান্ত বলা হইতেছে—

১১৬৮ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রাজা অন্যত্র যাইতে ইচ্ছুক হইলে পর, প্রত্যেনস্ উগ্রজাতি, এবং মৃত ও গ্রামনেতৃবৃন্দ যেমন তাহাকে লক্ষ্য করিয়া গমন করে, অর্থাৎ রাজার আদেশ ব্যতিরেকেও কেবল তাহার গমনবার্তা অবগত হইয়াই যেমন সকলে একযোগে রাজার অভিমুখে অনুগমন করিয়া থাকে, ঠিক তেমনই অন্তকালে—মৃত্যুসময়ে— যখন ইহার ঊর্দ্ধশ্বাস উপস্থিত হয়, সেই সময়ে সমস্ত প্রাণ অর্থাৎ আত্মার ভোগোপকরণ বাক্প্রভৃতি এই ভোক্তা আত্মাকে লক্ষ্য করিয়া তাহার অনু- গমন করিয়া থাকে। “ঊর্দ্ধোচ্ছাসী ভবতি” ইত্যাদি কথা পূর্ব্বেই ব্যাখ্যাত হইয়াছে ॥২৯০৷৷৩৮৷৷

ইতি চতুর্থ্যাধ্যায়ঃ তৃতীয়োঽধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ॥৪॥

চতুর্থ ব্রাহ্মণম্।

আভাসভাষ্যম্।—স যত্রায়মাত্মা। সংসারোপবর্ণনং প্রস্তুতম্। তত্রায়ং পুরুষ এভ্যোহঙ্গেভ্যঃ সম্প্রনুচ্যেত্যুক্তম্। তৎসম্প্রমোক্ষণৎ কস্মিন্ কালে কথং বেতি সবিস্তরং সংসরণং বর্ণরিতব্যমিত্যারভ্যতে—

আভাসভাষ্যানুবাদ।—‘স যত্রায়মাত্মা’ ইত্যাদি। সম্প্রতি সংসারা- বস্থার বর্ণনা চলিতেছে; তাহাতে বলা হইয়াছে যে, ‘এই পুরুষ এই সমস্ত অঙ্গ হইতে বিমুক্ত হইয়া’ ইত্যাদি। সেই যে, পুরুষের-দেহ-বিমোচন, তাহা কোন্ সময়ে এবং কি প্রকারে হইয়া থাকে, এখন বিস্তৃতভাবে সেই বিষয় বর্ণনা করিতে হইবে, এই উদ্দেশ্যে পরবর্তী প্রকরণ আরব্ধ হইতেছে—

স যত্রায়মাত্মাবল্যং ন্যেত্য সম্মোহমিব ন্যেত্যথৈনমেতে প্রাণা অভিসমায়ন্তি, স এতাস্তেজোমাত্রাঃ সমভ্যাদদানো হৃদয়- মেবান্ববক্রামতি; স যত্রৈষ চাক্ষুষঃ পুরুষঃ পরাপর্য্যাবর্ত্ততে- হথারূপজ্ঞো ভবতি ॥ ২৯১ ॥ ১ ॥

সরলার্থঃ?—সঃ(লোকান্তরজিগমিষুঃ) অয়ম্ আত্মা যত্র(মরণকালে) অবল্যৎ(অবলভাবং দুর্ব্বলতাৎ) জ্যেত্য(নিশ্চয়েন প্রাপ্য) সম্মোহং(সম্মূঢ়তাৎ) ইব দ্যেতি(নিঃশেষেণ প্রাপ্নোতি)।[অত্র ইব-শব্দপ্রয়োগঃ সম্মোহস্য বাস্তবতাৎ নিরস্ত্যতি]। অথ(অনন্তরৎ) এতে প্রাণাঃ(চক্ষুঃপ্রভৃতয়ঃ) ইমম্ আত্মানং অভিসমায়ন্তি(অভিগচ্ছন্তি)। সঃ(আত্মা) এতাঃ(প্রকৃতাঃ) তেজোমাত্রাঃ (তৈজসানি করণানি) সমভ্যাদদানঃ(সম্যক্ নির্লেপেন গৃহ্ণন্—সমাহরন্) হৃদয়ম্ এব অন্ববক্রামতি(হৃদয়মাত্রে অভিব্যক্তবিজ্ঞানঃ ভবতি)।[তত্র বিশেষমাহ—] যত্র(যস্মিন্ কালে) স এষ চাক্ষুষঃ(চক্ষুরনুগ্রাহকঃ) পুরুষঃ (আদিত্যরূপঃ) পরাক্(পূর্ব্ব-বৈপরীত্যেন) পর্যায়বর্ততে(নিবর্ততে), অথ (অতঃপরম্) অরূপজ্ঞঃ ভবতি,[চক্ষুরনুগ্রাহকস্যাদিত্যপুরুষস্য নিবৃত্তেঃ তস্য রূপজ্ঞানমপি নিবর্ততে ইতি ভাবঃ] ॥২৯১৷৷১৷৷

মুলাসুবাদ।—লোকান্তরে প্রস্থানোদ্যত এই পুরুষ যে সময়ে (মৃত্যুকালে) বলহীন হইয়া, সম্মোহ বা বিমুঢ়ভাবই যেন প্রাপ্ত হয়,

১১৩০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

তখন চক্ষুঃপ্রভৃতি প্রাণবর্গ এই আত্মার অভিমুখে গমন করে; তখন সেই আত্মা এই সমস্ত তৈজস ইন্দ্রিয়বর্গকে সমাহরণ করিয়া হৃৎপিণ্ডে অবস্থান করে। যখন এই চাক্ষুষ পুরুষ অর্থাৎ চক্ষুর অধিদেবতা সূর্য্য স্বকার্য্য হইতে নিবৃত্ত হয়, তখন এই পুরুষ আর শ্বেতপীতাদি রূপ নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হয় না, অর্থাৎ তখন তাহার রূপ দেখিবার শক্তি বিলুপ্ত হইয়া যায় ॥ ২৯১ ॥ ১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।—স যত্র। সোহয়মাত্মা প্রস্তুতঃ, যত্র যস্মিন্ কালে, অবল্যম্ অবলভাবম্, নি এত্য গত্বা—যৎ দেহস্য দৌর্ব্বল্যম্, তদাত্মন এব দৌর্ব্বল্যমিত্যুপ- চর্য্যতে—‘অবল্যং ন্যেত্য’ ইতি। ন হ্যসৌ স্বতঃ অমূর্ত্তত্বাদবলভাবং গচ্ছতি; তথা সম্মোহমিব—সংমুঢ়তা সম্মোহঃ বিবেকাভাবঃ, সম্মূঢ়তামিব—ন্যেতি নিগচ্ছতি; ন চাস্য স্বতঃ সম্মোহঃ অসম্মোহো বা অস্তি, নিত্যচৈতন্যজ্যোতিঃ- স্বভাবত্বাৎ; তেন ইবশব্দঃ—সম্মোহমিব ন্যেতাতি। উৎক্রান্তিকালে হি কর- ণোপসংহারনিমিত্তো ব্যাকুলীভাব আত্মন ইব লক্ষ্যতে লৌকিকৈঃ। তথা চ বক্তারো ভবন্তি—সংমুঢ়ঃ সংমুঢ়োহয়মিতি। অথবা উভয়ত্র ইবশব্দপ্রয়োগো যোজ্যঃ—অবল্যমিব ন্যেত্য, সম্মোহমিব ন্যেতীতি, উভয়স্য পরোপাধিনিমিত্তত্বা- বিশেষাৎ, সমানকর্তৃকনির্দেশাচ্চ। ১

টীকা। ব্রাহ্মণান্তরমুখাপয়তি-স যত্রেতি। তস্য সম্বন্ধং বক্তু মুত্তং কীর্তয়তি-সংসারেতি। বক্ষ্যমাণোপযোগিত্বেনোক্তমর্থান্তরমুদ্রবতি-তত্রেতি। সংসারপ্রকরণং সপ্তমার্থঃ। সম্প্রত্যা- কাঙ্ক্ষাপূর্ব্বকমুত্তরব্রাহ্মণমাদত্তে-তৎসংপ্রমোক্ষণমিতি। এবং ব্রাহ্মণমবতায্য তদক্ষরাণি ব্যাকরোতি-সোহয়মিত্যাদিনা। গত্বা সংমোহমিব দ্যোতীত্যুত্তরত্র সম্বন্ধঃ। কথমাত্মনো দৌর্ব্বল্যং, তদাহ-যদ্দেহস্যেতি। কিমিত্যুপচারঃ, মুখ্যমেবাত্মনো দৌর্ব্বল্যং কিং ন স্যাদিত্যা- শঙ্ক্যাহ-ন হীতি। যথায়মবলভাবং নিগচ্ছতি, তথা সংমোহং সংমূঢ়তামিব প্রতিপদ্যতে। বিবেকাভাবো হি সংমোহঃ। তথা চ সংমুঢ়তামিব নিগচ্ছতীতি যুক্তমিত্যাহ-তথেতি। ইব-শব্দার্থমাহ-ন চেতি। কথং পুনরাত্মনঃ সমারোপিতোহপি সংমোহঃ স্যান্নিত্যচৈতন্য- জ্যোতিষ্টাদিত্যাশঙ্ক্যাহ-উৎক্রান্তীতি। ব্যাকুলীভাবো লিঙ্গস্থ্যেতি শেষঃ। তত্র লৌকিকীং বার্তামনুকূলয়তি-তথেতি। ১

অথ অস্মিন্ কালে এতে প্রাণাঃ বাগাদয়ঃ এনমাত্মানম্ অভিসমায়ন্তি; তদাস্য শারীরস্যাত্মনঃ অঙ্গেভ্যঃ সম্প্রমোক্ষণম্। কথং পুনঃ সম্প্রমোক্ষণম্, কেন বা প্রকারেণ আত্মানমভিসমায়ন্তীতি? উচ্যতে-স আত্মা এতাঃ তেজোমাত্রাঃ তেজসো মাত্রাস্তেজোমাত্রাঃ তেজোহবয়বাঃ, রূপাদিপ্রকাশকত্বাৎ চক্ষুরাদীনি করণানীত্যর্থঃ,

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।

১১১

তা এতাঃ সমভ্যাদদানঃ সম্যক্ নির্লেপেন অভ্যাদদানঃ অভিমুখ্যেন আদদানঃ সংহরমাণঃ, তৎস্বপ্নাপেক্ষয়া বিশেষণং ‘সম্’ ইতি, ন তু স্বপ্নে নির্লেপেন সম্যগাদানম্; অস্তি তু আদানমাত্রম্; “গৃহীতা বাক্ গৃহীতৎ চক্ষুঃ” “অস্য লোকস্য সর্ব্বাবতো মাত্রামপাদায় শুক্রমাদায়” ইত্যাদিবাক্যেভ্যঃ। ২।

যথাশ্রুতমিবশব্দং গৃহীত্বা বাক্যং ব্যাখ্যায় পক্ষান্তরমাহ-অথবেতি। ইবশব্দপ্রয়োগস্যো- ভয়ত্র যোজনামেবাভিনয়তি-অবল্যমিতি। উভয়ত্র তদ্যোজনে হেতুমাহ-উভয়স্যেতি। তুল্যপ্রত্যয়েনাবল্যাসংমোহয়োরেককর্তৃকত্বনির্দেশাদপ্যুভয়ত্রেবকারো দ্রষ্টব্য ইত্যাহ- সমানেতি। অথেত্যাদি বাক্যমবতায্য ব্যাকুর্ব্বন্ কস্মিন্ কালে তৎসংপ্রমোক্ষণমিত্যস্যোত্তর- মাহ-অপেত্যাদিনা। কথং বেত্যুক্তং প্রশ্নমনুদ্য প্রশ্নান্তরং প্রস্তৌতি-কথমিতি। অস্তোত্তর- ত্বেনোত্তরবাক্যমাদায় ব্যাকরোতি-উচ্যত ইত্যাদিনা। রূপাদিপ্রকাশনশক্তিমৎসত্ত্বপ্রধান- ভূতকার্য্যত্বাৎ তেজোমাত্রাশ্চক্ষুরাদীনীত্যুক্তং, সংপ্রতি সমভ্যাদদান ইত্যস্যার্থমাহ-তা এতা ইতি। সংহরমাণো হৃদয়মন্ববক্রামতীত্যন্বয়ঃ। তৎ সমিতি বিশেষণং স্বপ্নাপেক্ষয়েতি সম্বন্ধঃ। কথং স্বপ্নাপেষয়া বিশেষণং, তদাহ-ন ত্বিতি। আদানমাত্রমপি স্বপ্নে নাস্তাতি কুতস্তদ্- ব্যাবৃত্ত্যর্থং বিশেষণমিত্যাশঙ্ক্যাহ-অন্তীতি। ২

হৃদয়মেব পুণ্ডরীকাকাশম্ অন্ববক্রামতি অম্বাগচ্ছতি, হৃদয়ে অভিব্যক্ত- বিজ্ঞানো ভবতীত্যর্থঃ—বুদ্ধ্যাদিবিক্ষেপোপসংহারে সতি। ন হি তস্য স্বতশ্চলনং বিক্ষেপোপসংহারাদিবিক্রিয়া বা, “ধ্যায়তীব লেলায়তীব” ইত্যুক্তত্বাৎ; বুদ্ধ্যাদ্য- পাধিদ্বারৈব হি সর্ববিক্রিয়া অধ্যারোপ্যতে তস্মিন্। কদা পুনস্তস্য তেজোমাত্রা- ভ্যাদানমিতি? উচ্যতে—সঃ যত্র এষঃ, চক্ষুষি ভবঃ চাক্ষুষঃ পুরুষঃ আদিত্যাংশঃ ভোক্তুঃ কর্মণা প্রযুক্তঃ যাবদ্দেহধারণম্, তাবৎ চক্ষুযোহনুগ্রহৎ কুর্ব্বন্ বর্ত্ততে; মরণকালে তু অন্য চক্ষুরনুগ্রহৎ পরিত্যজতি, স্বম্ আদিত্যাত্মানং প্রতি- পদ্যতে। ৩।.

স এতাস্তেজোমাত্রাঃ সমভ্যাদদান ইত্যেতদ্ব্যাখ্যায় হৃদয়মেবেত্যাদি ব্যাচষ্টে-হৃদয়- মিত্যাদিনা। সবিজ্ঞানো ভবতীতি বাক্যশেষমাশ্রিত্য বাক্যার্থমাহ-হৃদয় ইতি। কথমাত্মনো নিষ্ক্রিয়স্য তেজোমাত্রাদানকর্তৃত্বমৌপচারিকমিত্যর্থঃ। তর্হি তদ্বিক্ষেপোপসংহর্তৃত্ববৎ তদাদান- কর্তৃত্বমপি মুখ্যমের ভবিষ্যতীত্যাশঙ্ক্যাহ-ন হীতি। আদিশব্দেন ক্রিয়াবিশেষঃ সর্ব্বো গৃহ্যতে। কথং তহি প্রতীচি কর্তৃত্বাদিপ্রথেত্যাশঙ্ক্যাহ-বুদ্ধ্যাদীতি। স যত্রেত্যাদি বাক্যমাকাঙ্ক্ষা- পূর্ব্বকমবতার্য্য ব্যাকরোতি-কদা পুনরিত্যাদিনা। তস্য পুরুষশব্দাদভোক্তৃত্বে প্রাপ্তে বিশিনষ্টি-আদিত্যাংশ ইতি। তস্য চাক্ষুষত্বং সাধয়তি-ভোক্তুরিত্যাদিনা। যাবদ্দেহধারণ- মিতি কুতো বিশেষণং, তত্রাহ-মরণকালে ত্বিতি। আদিত্যাংশস্য চক্ষুরনুগ্রহমকুর্ব্বতঃ স্বাতন্ত্র্যং বারয়তি-স্বমিতি। ৩

তৎপরং, —“যথাযথং পুরুষং মৃতস্যপি বাণেন, বাণেন ধৃতশ্চ।

১১১২ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

রাদিত্যম্’ ইত্যাদি; পুনর্দেহগ্রহণকালে সংশ্রয়িষ্যন্তি; তথা স্বপ্ন্যতঃ প্রবুধ্যতশ্চ। তদেতদাহ—চাক্ষুষঃ পুরুষঃ, যত্র যস্মিন্ কালে, পরাহ পর্য্যাবর্ততে—পরি সমন্তাৎ পরাভূব্যাবর্ততে ইতি; অথ অত্রাস্মিন্ কালে, অরূপজ্ঞো ভবতি মুমুর্ষুঃ রূপং ন জানাতি; তদায়ম্ আত্মা চক্ষুরাদিতেজোমাত্রাঃ সমভ্যাদদানো ভবতি, স্বপ্নকাল ইব ॥ ২৯১ ॥ ১ ॥

মরণাবস্থায়াং চক্ষুরাদ্যমুগ্রাহকদেবতাংশানামধিদেবতাত্মনোপসংহারে শ্রুত্যন্তরং সংবাদয়তি —তদেতদিতি। তর্হি দেহান্তরে বাগাদিরাহিত্যং স্যাদিত্যাশঙ্ক্যাহ—পুনরিতি। সংশ্রয়িষ্যন্তি বাগাদয়ন্তত্তদ্দেবতাধিষ্ঠিতা যথাস্থানমিতি শেষঃ। মুমুর্যোরিব স্বপস্যতঃ সর্ব্বাণি করণানি লিঙ্গাত্মনোপসংহ্রিয়ন্তে, প্রবুধ্যমানস্য চোৎপিৎসোরিব তানি যথাস্থানং প্রাদুর্ভবন্তীত্যাহ— তথেতি। উক্তেহর্থে বাক্যং পাতয়তি—তদেতদাহেতি। পরাঙ্ পর্যাবর্ত্তত ইতি রূপবৈমুখ্যং চাক্ষুষস্য বিবক্ষিতমিতি শেষঃ ॥২৯১৪১॥

ভাষ্যানুবাদ।—যে আত্মার প্রস্তাব চলিয়াছে, সেই আত্মা যে সময়ে —অবলভাব(দুর্ব্বলতা) প্রাপ্ত হইয়া যেন সম্মোহই—বিবেক-জ্ঞানের অভাবই অর্থাৎ সম্যক্ মুঢ়তাই যেন প্রাপ্ত হয়। এখানে ‘অবল্যং ন্যেত্য’ কথায় দেহের দুর্ব্বলতাই আত্মার দুর্ব্বলতা বলিয়া আরোপ করা হইতেছে; কারণ, আত্মা যখন অমূর্ত্ত, তখন তাহার পক্ষে স্বাভাবিক দুর্ব্বলতা কখনই সম্ভব হয় না। স্বভাবতঃ নিত্য চৈতন্যজ্যোতিঃস্বরূপ এই আত্মার সম্বন্ধে স্বরূপতঃ কখনই সম্মোহ বা অসম্মোহ কিছুই সম্ভবপর হয় না; এই জন্যই ‘ইব’ শব্দ—‘সম্মোহম্ ইব’ প্রযুক্ত হইয়াছে—দেহত্যাগের সময়ে চক্ষুঃপ্রভৃতি করণবর্গ সমাহৃত হয়; তন্নিবন্ধন সাধারণলোকে আত্মারই যেন ব্যাকুলতা মনে করিয়া থাকে; বক্তারাও সেইরূপই বলিয়া থাকে যে, ‘এই ব্যক্তি সম্মূঢ় সম্মূঢ়(মোহপ্রাপ্ত)’। অথবা ‘সম্মোহম্ ইব’ এই ‘ইব’ শব্দটার উভয় স্থলেই যোজনা করিতে হইবে—‘অবল্যম্ ইব ন্যেত্য’ (অবলভাবই যেন প্রাপ্ত হইয়া) এবং ‘সম্মোহম্ ইব ন্যেতি’(যেন সম্মোহই প্রাপ্ত হয়); কেন না, অবল্য ও সম্মোহ—উভয়ই অপরাপর উপাধি-সম্বন্ধের ফল এবং ‘ন্যেত্য’ ও ‘ন্যেতি’ এই উভয়ের একই কর্তা নিদ্দিষ্ট হইয়াছে। ১।

অতঃপর এই সমস্ত প্রাণ(বাক্প্রভৃতি), প্রয়াণোন্মুখ এই আত্মার অভিমুখে খাবিত হয়; সেই সময়েই এই দেহাবয়বসমূহ হইতে জীবাত্মার বহির্গমন হয়। কিরূপে দেহত্যাগ হয়, এবং কিপ্রকারেই বা প্রাণসমুহ আত্মাভিমুখী হয়, এখানে তাহা কথিত হইতেছে।—এই আত্মা এই সমুদয় তেজোমাত্রা—তেজের মাত্রা অর্থাৎ তেজের অংশ চক্ষুঃপ্রভৃতি করণবর্গ, রূপাদি বিষয় প্রকাশ করে বলিয়া

. চতুর্থোহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।

১১৬৭

[চক্ষুঃ প্রভৃতির তৈজনত্ব প্রমাণিত হয়](১); এই সকল ভেজোমাত্রা সম্যক্— নির্লেপভাবে আদান করত অর্থাৎ উপসংহৃত করত—স্বপ্নাবস্থা অপেক্ষা বিশেষত্ব সূচনার জন্য এখানে ‘সম্’(সম্ অভ্যাদদানঃ) বিশেষণটী প্রযুক্ত হইয়াছে; কেন না, ‘তখন বাগিন্দ্রিয় গৃহীত হয়, চক্ষুঃ গৃহীত(নির্ব্যাপার কৃত) হয়; এখানকার সমস্ত অবয়ব বিচ্ছিন্ন করিয়া এবং শুক্র(তেজোমাত্রা) লইয়া’ ইত্যাদি বাক্য হইতে জানা যায় যে, স্বপ্ন সময়েও ইন্দ্রিয়সমূহ সমাহৃত হয় সত্য, কিন্তু নির্লেপভাবে হয় না; এইজন্য এখানে ‘সম্’ বিশেষণের প্রয়োগ করা আবশ্যক হইয়াছে। ২।

[‘হৃদয়ম্ এব অন্ববক্রামতি’] হৃদয়ে-হৃৎপদ্মাকাশে আগমন করে, অর্থাৎ বুদ্ধিপ্রভৃতিজনিত বিক্ষেপ বা চাঞ্চল্য নিবৃত্ত হইলে পর, তখন একমাত্র হৃদয়ে তাহার বিজ্ঞান পরিস্ফুট হয়। “ধ্যায়তীব” ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য হইতে জানা যায় যে, আত্মার স্বতঃসিদ্ধ চলন(গমনাগমন) কিংবা বিক্ষেপ ও তন্নিবৃত্তিরূপ বিকার নাই; কেবল বুদ্ধিপ্রভৃতি উপাধিসম্বন্ধ বশতই তাহাতে ঐ সমস্ত বিকার আরো- পিত হয় মাত্র। আত্মা কোন্ সময়ে উক্ত তেজোমাত্রা গ্রহণ করে, এখন তাহা কথিত হইতেছে-যে সময়ে সেই এই চাক্ষুষ পুরুষ-চক্ষুর কার্য্যে সহায়ভূত আদিত্যাংশ-ভোক্তা জীবের প্রাক্তন কর্মদ্বারা প্রেরিত হইয়া, যতকাল দেহধারণ আবশ্যক হয়, ততকাল চক্ষুর প্রতি অনুগ্রহ-প্রকাশপূর্ব্বক বর্তমান থাকে, কিন্তু মৃত্যুসময় উপস্থিত হইলে, এই চক্ষুর অনুগ্রহ পরিত্যাগ করিয়া স্বীয় আদিত্যভাব প্রাপ্ত হয়,[সেই সময়ে]। ৩।

এই কথা অন্যত্রও উক্ত হইয়াছে—‘যে সময়ে এই মৃত পুরুষের বাগিন্দ্রিয় অগ্নিকে, প্রাণ বায়ুকে এবং চক্ষুঃ আদিত্যকে প্রাপ্ত হয়’ ইত্যাদি। জীব পুনর্ব্বার যখন নূতন দেহ গ্রহণ করে, তখন এই চাক্ষুষ পুরুষই আবার সেই দেহকে আশ্রয় করিবে; স্বপ্ন এবং প্রবোধকালেও এইরূপই ব্যবস্থা, অর্থাৎ স্বপ্নকালে ইন্দ্রিয়গণের বৃত্তি লয় হয়, প্রবোধসময়ে আবার প্রাদুর্ভাব হয়। সেই কথাই এখানে

(১) তাৎপর্য্য—আত্মার ভোগসাধন করণবর্গের মধ্যে পঞ্চ প্রাণ ও পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয় পঞ্চভূতের রাজস ভাগ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে; এইজন্য উহারা ক্রিয়াপ্রধান। এইরূপ চক্ষুঃ প্রভৃতি জ্ঞানেন্দ্রিয় সমূহ পঞ্চভূতের সত্ত্বভাগ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে; এইজন্য উহারা তৈজস; এবং উহাদের কার্য্য হইতেছে রূপাদি বিষয়কে প্রকাশ করা। এইজন্য এখানে ভাষ্যকার ‘রূপাদিপ্রকাশকত্বাৎ’ এই হেতুর উপন্যাস করিয়াছেন। সত্ত্বগুণের পরিণাম বলিয়াই চক্ষুঃ শ্বেত-পীতাদি রূপ প্রকাশ করিতে সমর্থ হয়।

১১১৪. বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

বলিতেছেন—চাক্ষুষ পুরুষ যে সময়ে পরাবৃত্ত হয়, অর্থাৎ সর্ব্বতোভাবে ব্যাপারহীন হয়; সেই সময়ে ভোক্তা পুরুষ অরূপজ্ঞ হয়, অর্থাৎ তখন তাহার আর রূপ বিষয়ে জ্ঞান থাকে না; কারণ, মুমুর্ষু ব্যক্তি ত কোনপ্রকার রূপ অনুভব করিতে পারে না। এই আত্মা স্বপ্নসময়ের ন্যায় এ সময়েও চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের তেজোমাত্রা গ্রহণ করিয়া থাকে ॥ ২৯১ ॥ ১ ॥

একীভবতি ন পশ্যতীত্যাহুরেকীভবতি ন জিঘ্রতীত্যাহুরেকী- ভবতি ন রসয়ত ইত্যাহুরেকীভবতি ন বদতীত্যাহুরেকীভবতি ন শূণোতীত্যাহুরেকীভবতি ন মনুত ইত্যাহুরেকীভবতি ন স্পৃশতীত্যাহুরেকীভবতি ন বিজানাতীত্যাহুঃ, তস্য হৈতস্য হৃদয়স্যাগ্রং প্রদ্যোততে, তেন প্রদ্যোতেনৈষ আত্মা নিষ্ক্রামতি। চক্ষুষ্টো বা মূর্দ্ধে। বান্যেভ্যো বা শরীরদেশেভ্যঃ, তমুৎক্রামন্তং প্রাণোহনূৎক্রামতি, প্রাণমনূৎক্রামন্তংসর্ব্বে প্রাণা অনূৎক্রামন্তি, সবিজ্ঞানো ভবতি সবিজ্ঞানমেবান্ববক্রামতি। তং বিদ্যাকৰ্ম্মণী সমন্বারভেতে পূর্ব্বপ্রজ্ঞা চ ॥ ২৯২ ॥ ২॥

সরলার্থঃ।—[অত্র লোকসংবাদম্ অনুকূলয়িতুমাহ—‘একীভবতি’ ইত্যাদি।][অস্য মুমুর্যোঃ] একীভবতি ন পশ্যতি(চক্ষুরিন্দ্রিয়ং লিঙ্গদেহেনাভিন্নং জাতম্, অতঃ দর্শনব্যাপারং ন করোতি) ইতি আহুঃ(কথয়ন্তি)[লৌকিকাঃ]; [তথা ঘ্রাণং] একীভবতি,[অতঃ] ন জিঘ্রতি ইতি আহুঃ;[রসনেন্দ্রিয়ম্] একী- ভবতি,[অতঃ] ন রসয়তে(রসাস্বাদং ন করোতি) ইতি আহুঃ;[বাগিন্দ্রিয়ং] একীভবতি, ন বদতীতি আহুঃ;[শ্রবণেন্দ্রিয়ং] একীভবতি, ন শূণোতি ইতি আহুঃ;[মনঃ] একীভবতি, ন মনুতে ইতি আহুঃ;[ত্বগিন্দ্রিয়ং] একীভবতি, ইতি ন স্পৃশতি ইতি আহুঃ;[বুদ্ধিঃ] একীভবতি, ন বিজানাতি ইতি আহুঃ। [তদানীং] তস্য এতস্য(সর্ব্বেন্দ্রিয়াশ্রয়স্য) হৃদয়স্য অগ্রং(আত্ম-নির্গমনদ্বারম্) প্রদ্যোততে(আত্মজ্যোতিষা প্রকাশতে); এষঃ(প্রকৃতঃ মুমুর্ষুঃ) আত্মা তেন প্রদ্যোতেন(প্রকাশমানহৃদয়াগ্রেণ) নিষ্ক্রামতি(বহিনির্গচ্ছতি)।

[অথ বহির্গমনে দ্বারভেদানাহ-] চক্ষুষ্টঃ(আদিত্যলোকপ্রাপ্ত্যর্থং চক্ষুষঃ) বা, মূর্দ্ধঃ(ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তয়ে ব্রহ্মরন্ধ্রাৎ) বা,[জ্ঞান-কর্মাদিবিভেদেন] অন্যেভ্যঃ শরীর-দেশেভ্যঃ(অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেভ্যঃ) উৎক্রামন্তং(বহিনির্গচ্ছন্তৎ) তম্

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।

১১৫

(আত্মানম্) অনু(লক্ষ্যীকৃত্য) প্রাণঃ(পঞ্চবৃত্ত্যাত্মকঃ) উৎক্রামতি; প্রাণম্ উৎক্রামন্তং অনু, সর্ব্বে প্রাণাঃ(বাগাদয়ঃ) উৎক্রামন্তি।

[তদাপি আত্মা] সবিজ্ঞানঃ(বাসনাময়-বিশেষজ্ঞানসম্পন্নঃ) এব ভবতি; তথা সবিজ্ঞানং(বিজ্ঞানযুক্তৎ যথা স্যাৎ, তথা) এব অম্ববক্রামতি(গন্তব্যং স্থানম্ অনুগচ্ছতি)।[তদা] বিদ্যা-কর্মণী(বিদ্যা—উপাসনা, কৰ্ম্ম চ বিহিতপ্রতি- যিদ্ধানুষ্ঠানম্, তে) তং(পরলোকপ্রস্থিতং) সমন্বারভেতে(সম্যক্ অনুগচ্ছতঃ) পূর্ব্বপ্রজ্ঞা চ(প্রাক্তনকৰ্ম্মফলানুভবজনিতা বাসনা চ) ॥ ২৯২॥ ২॥

মূলানুবাদ?—[ এ বিষয়ে লোকপ্রসিদ্ধি প্রদর্শন করিতে- ছেন—] এবংবিধ মুমূর্ষুকে লক্ষ্য করিয়া লোকে বলিয়া থাকে যে, [ এখন ইহার] চক্ষুরিন্দ্রিয় হৃদয়ে যাইয়া একীভূত হইতেছে, অতএব দর্শন করিতেছে না; ঘ্রাণেন্দ্রিয় একীভূত হইতেছে; অতএব আঘ্রাণ করিতেছে না; জিহ্বা একীভূত হইতেছে, অতএব রসাস্বাদ করিতে পারিতেছে না; বাগিন্দ্রিয় একীভূত হইতেছে; অতএব কথা বলিতেছে না; শ্রবণেন্দ্রিয় একীভূত হইতেছে; অতএব শব্দ শ্রবণ করিতেছে না; মনঃ একীভূত হইতেছে; অতএব চিন্তা করিতেছে না; ত্বগিন্দ্রিয় একীভূত হইতেছে; অতএব স্পর্শানুভব করিতেছে না; বুদ্ধি একীভূত হইতেছে; অতএব বিশেষ বিজ্ঞান লাভ করিতেছে না।

সে সময়ে সেই এই হৃদয়ের অগ্রভাগ অর্থাৎ আত্মা যে পথে নির্গত হইবে, সেই নাড়ীদ্বার আত্মজ্যোতিঃ দ্বারা উদ্ভাসিত হয়; সেই হৃদয়াগ্র- পথে আত্মা নির্গত হয়।[ভবিষ্যৎ ফলানুসারে বহির্গমনের পথ অনেকপ্রকার হইতে পারে, এখন তাহা বলিতেছেন-] সূর্য্যলোকে যাইতে হইলে চক্ষুঃ-পথে, ব্রহ্মলোকে যাইতে হইলে, ব্রহ্মরন্ধ্র পথে, [অন্যান্য স্থানে যাইতে হইলে,] অন্যান্য শরীরাবয়ব দ্বারা নিষ্ক্রান্ত হয়। আত্মা উৎক্রমণ করিবার সময়, তাহাকে লক্ষ্য করিয়া প্রাণ উৎক্রমণ করিতে থাকে; প্রাণ উৎক্রমণ করিতে উদ্যত হইলে, তাহাকে লক্ষ্য করিয়া অপর সমস্ত প্রাণ বা ইন্দ্রিয়বর্গ উৎক্রমণ করিতে থাকে। [উৎক্রমণ কালেও] আত্মা বিজ্ঞানসম্পন্নই(জ্ঞানবাসনাযুক্তই) থাকে, এবং সেই বিজ্ঞান সহকারেই পরলোকে প্রস্থান করে। তখন তাহার

১১৬১ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

ঐহিক উপাসনা ও কর্ম্ম এবং প্রাক্তন জ্ঞানসংস্কারও সঙ্গে সঙ্গে অনুগমন করিতে থাকে ॥ ২৯২ ॥ ২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।-একীভবতি করণজাতং স্বেন লিঙ্গাত্মনা, তদৈনং পার্শ্বস্থা আহঃ পশ্যতীতি; তথা ঘ্রাণদেবতানিবৃত্তৌ ঘ্রাণমেকীভবতি লিঙ্গাত্মনা, তদান জিঘ্রতীত্যাহুঃ। সমানমন্যৎ। জিহ্বায়াৎ সোমো বরুণো বা দেবতা, তন্নিবৃত্ত্যপেক্ষয়া ন রসয়তে ইত্যাহুঃ। তথা ন বদতি ন শূণোতি ন মনুতে ন স্পৃশতি ন বিজানাতীত্যাহুঃ। তদা উপলক্ষ্যতে দেবতানিবৃত্তিঃ, করণানাঞ্চ হৃদয়ে একীভাবঃ। তত্র হৃদয়ে উপসংহৃতেষু করণেষু যোহন্তর্ব্যাপারঃ, স কথাতে,-তস্য হ এতস্য প্রকৃতস্য হৃদয়স্য হৃদয়চ্ছিদ্রস্যেত্যেতৎ, অগ্রং নাড়ীমুখং নির্গমনদ্বারং প্রদ্যোততে, স্বপ্নকাল ইব স্বেন ভাসা তেজোমাত্রাদানকৃতেন, স্বেনৈব জ্যোতিষা আত্মনৈব চ; তেনাত্মজ্যোতিষা প্রদ্যোতেন হৃদয়াগ্রেণ, এষ আত্মা বিজ্ঞানময়ঃ লিঙ্গোপাধিঃ নির্গচ্ছতি নিষ্ক্রামতি। তথা আথর্ব্বণে-“কস্মিন্ স্বহমুৎক্রান্ত উৎক্রান্তো ভবিষ্যামি, কস্মিন্ বা প্রতিষ্ঠিতে প্রতিষ্ঠাস্যামীতি, স প্রাণ- মসৃজত” ইতি। ১

টীকা। তর্হি ভোক্তোপসংহৃতং চক্ষুরত্যন্তাভাবীভূতমিত্যাশঙ্ক্যাহ-একীতি। উক্তেহর্থে লোকপ্রসিদ্ধিং দর্শয়তি-তদেতি। চক্ষুষি দর্শিতং ন্যায়ং ঘ্রাণেহতিদিশতি-তথেতি। যথা চক্ষুদেবতায়া নিবৃত্তৌ লিঙ্গাত্মনা চক্ষুরেকীভবতি, তথা ঘ্রাণদেবতাংশস্য ঘ্রাণানুগ্রহনিবৃত্তি- দ্বারেণাংশিদেবতয়ৈক্যে লিঙ্গাত্মনা ঘ্রাণমেকীভবতীত্যর্থঃ। তন্নিবৃত্ত্যপেক্ষয়া বরুণাদিদেবতায়া জিহ্বারামনুগ্রহনিবৃত্তৌ জিহ্বায়া লিঙ্গাত্মনৈক্যব্যপেক্ষয়েত্যর্থঃ। তত্তদনুগ্রাহকদেবতাংশস্য তত্র তত্রানুগ্রহনিবৃত্ত্যা তত্তদংশিদেবতাপ্রাপ্তৌ তত্তৎকরণস্য লিঙ্গাত্মনৈক্যং ভবতীত্যভি- প্রেত্যাহ-তথেতি। মরণদশায়াং রূপাদিদর্শনরাহিত্যমর্থদ্বয়সাধকমিত্যাহ-তদেতি। তস্য হৈতস্তেত্যাদি বাক্যমুপাদত্তে-তত্রেতি। মুমুর্যাবস্থা সপ্তম্যর্থঃ। কেনায়ং প্রদ্যোতো ভবর্তীত্য- পেক্ষায়ামাহ-স্বপ্নেতি। যথা স্বপ্নকালে যেন ভাসা। যেন জ্যোতিষা প্রস্বপিতীতি ব্যাখ্যাতম্, তথাত্রাপি তেজোমাত্রাণাং যদাদানং, তৎকৃতেন বাসনারূপেণ প্রাপ্তফলবিষয়-বুদ্ধিবৃত্তিরূপেণ যেন ভাসা যেন চাত্মনা চৈতন্য-জ্যোতিষা হৃদয়াগ্রপ্রদ্যোতনমিত্যর্থঃ। তস্যার্থক্রিয়াং দর্শয়তি- তেনেতি। কিমিতি লিঙ্গদ্বারাত্মনো নির্গমনং প্রতিজ্ঞায়তে, তত্রাহ-তথেতি। ১

তত্র চ আত্মচৈতন্যজ্যোতিঃ সর্ব্বদাভিব্যক্ততরম্, তদুপাধিদ্বারা হ্যাত্মনি জন্ম- মরণগমনাগমনাদি-সর্ব্ববিক্রিয়ালক্ষণঃ সংব্যবহারঃ, তদাত্মকং হি দ্বাদশবিধৎ করণম্ বুদ্ধ্যাদি, তৎ সূত্রম্, তৎ জীবনম্, সোহন্তরাত্মা জগতস্তস্থুষশ্চ। তেন প্রদ্যোতেন হৃদয়াগ্রপ্রকাশেন নিষ্ক্রমমাণঃ কেন মার্গেণ নিষ্ক্রামতীত্যুচ্যতে—চক্ষুষ্টো বা আদিত্যলোকপ্রাপ্তিনিমিত্তং, জ্ঞানং কৰ্ম্ম বা যদি স্যাৎ; মূর্খো বা, ব্রহ্মলোক-

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্। ১১৯৭

প্রাপ্তিনিমিতৎ চেৎ; অন্যেভ্যো বা শরীরদেশেভ্যঃ শরীরাবয়বেভ্যঃ যথাকৰ্ম্ম যথাশ্রুতম্। তৎ বিজ্ঞানাত্মানমুৎক্রামন্তৎ পরলোকায় প্রস্থিতং পরলোকায় উদ্ভুতাকৃতমিত্যর্থঃ। ২

যদি মরণকালে তেজোমাত্রাদানং, ন তর্হি সদা লিঙ্গোপাধিরাত্মেত্যাশঙ্ক্যাহ-তত্র চেতি। সপ্তম্যা লিঙ্গমুচ্যতে, সর্বদেতি লিঙ্গসত্তাদশোক্তিঃ। আত্মোপাধিভূতে লিঙ্গে কিং প্রমাণমিত্যা- শঙ্ক্যাত্মনি কুটস্থে সংব্যবহারদর্শনমিত্যাহ-তদুপাধীতি। চক্ষুরাদিপ্রসিদ্ধিরপি প্রমাণমিত্যাহ- তদাত্মকং হীতি। একাদশবিধং করণমিত্যভ্যুপগমাৎ কুতো দ্বাদশবিধত্বমিত্যাশঙ্ক্য বিশিনষ্টি- বুদ্ধ্যাদীভি। ‘বায়ুর্বৈ গৌতম তৎ সূত্রম্’ ইত্যাদি শ্রুতিরপি যথোক্তে লিঙ্গে প্রমাণমিত্যাহ- তৎ সূত্রমিতি। জগতো জীবনমপি তত্র মানমিত্যাহ-তজ্জীবনমিতি। ‘এষ সর্বভূতান্তরাত্মা’ ইতি শ্রুতিরপি যথোক্তং লিঙ্গং সাধয়তীত্যাহ-সোহন্তরাত্মেতি। লিঙ্গোপাধেরাত্মনো যথোক্ত- প্রকাশেন মরণকালে হৃদয়াৎ নিষ্ক্রমণে মার্গং প্রশ্নপূর্ব্বকমুত্তরবাক্যেণোপদিশতি-তেনে- ত্যাদিনা। চক্ষুষ্টো বেতি বিকল্পে নিমিত্তং সূচরতি-আদিত্যেতি। মূর্দ্ধো বেতি বিকল্পে হেতুমাহ-ব্রহ্মলোকেতি। তৎপ্রাপ্তিনিমিত্তং চেৎ জ্ঞানং কৰ্ম্ম বা স্যাদিতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ। দেহাবয়বান্তরেভ্যো নিষ্ক্রমণে নিয়ামকমাহ-যথেতি। কথং পরলোকায় প্রস্থিতমিত্যুচ্যতে, প্রাণগমনাধীনত্বাদ বিজ্ঞানাত্মগমনস্তেত্যাশঙ্ক্যাহ-পরলোকায়েতি। ২

প্রাণঃ সর্ব্বাধিকারিস্থানীয়ঃ রাজ্ঞ ইব অনুৎক্রামতি; তঞ্চ প্রাণমনুৎক্রামন্তৎ বাগাদয়ঃ সর্ব্বৈ প্রাণা অনুৎক্রামন্তি। যথাপ্রধানান্বাচিখ্যাসেয়ম্, ন তু ক্রমেণ সার্থবদগমনমিহ বিবক্ষিতম্। তদা এষ আত্মা সবিজ্ঞানো ভবতি-স্বপ্ন ইব বিশেষবিজ্ঞানবান্ ভবতি কৰ্ম্মবশাৎ, ন স্বতন্ত্রঃ। স্বাতন্ত্র্যেণ হি সবিজ্ঞানত্বে সর্ব্বঃ কৃতকৃত্যঃ স্যাৎ; নৈব তু তল্লভ্যতে; অতএবাহ ব্যাসঃ,-“সদা তদ্ভাব- ভাবিতঃ” ইতি। কর্মণা তু উদ্ভাব্যমানেন অন্তঃকরণবৃত্তিবিশেষাশ্রিতবাসনাত্মক- বিশেষবিজ্ঞানেন সর্ব্বো লোক এতস্মিন্ কালে সবিজ্ঞানো ভবতি; সবিজ্ঞানমেব চ গন্তব্যম্ অন্ববক্রামতি অনুগচ্ছতি, বিশেষবিজ্ঞানোদ্ভাসিতমেবেত্যর্থঃ। তস্মাৎ তৎকালে স্বাতন্ত্র্যার্থং যোগধর্মানুসেবনম্, পরিসঙ্খ্যানাভ্যাসশ্চ, বিশিষ্টপুণ্যো- পচয়শ্চ শ্রদ্দধানৈঃ পরলোকার্থিভিরপ্রমত্তৈঃ কর্তব্য ইতি। সর্ব্বশাস্ত্রাণাং যত্নতো বিধেয়োর্থঃ-দুশ্চরিতাচ্চোপরমণম্। ৩

ননু জীবস্য প্রাণাদি-তাদাত্ম্যে সতি কথমনুশব্দেন ক্রমো বিবক্ষ্যতে, তত্রাহ-যথা- প্রধানেতি। প্রধানমনতিক্রম্য হীয়মন্যাখ্যানেচ্ছা। তথা চ জীবাদেঃ প্রাধান্যাভিপ্রায়েণানু- শব্দপ্রয়োগো ন ক্রমাভিপ্রায়েণ, দেশকালভেদাভাবাদিত্যর্থঃ। সার্থে সমূহে, ব্যক্তিষু ক্রমেণ গমনং দৃশ্যতে, ন তথা প্রাণাদিঘিতি ব্যতিরেকঃ। যদুক্তং হৃদয়াগ্রপ্রদ্যোতনং, তৎ সবিজ্ঞান- শ্রুত্যা প্রকটয়তি-তদেতি। কর্মবশাদিতি বিশেষণং সাধয়তি-নেতি। বিপক্ষে দোষমাহ- স্বাতন্ত্র্যেণেতি। ইষ্টাপত্তিমাশঙ্ক্যাহ-নৈবেতি। মুমুর্ধোরস্বাতন্ত্র্যে মানমাহ-অত এবেতি।

১১১৮: বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।

কৰ্ম্মবশাদুক্তং সবিজ্ঞানত্বমুপসংহরতি-কর্মণেতি। অন্তঃকরণস্য বৃত্তিবিশেষো ভাবিদেহ- বিষয়স্তদাশ্রিতং তদ্রূপং যদ্বাসনাত্মকং বিশেষবিজ্ঞানং, তেনেতি যাবৎ। ম্রিয়মাণস্থ্য সবিজ্ঞানত্বে সত্যর্থসিদ্ধমর্থমাহ-বিজ্ঞানমেবেতি। গন্তব্যস্য সবিজ্ঞানত্বং বিজ্ঞানাশ্রয়ত্বমিত্যাশঙ্ক্য বিশিনষ্টি- বিশেষেতি। প্রাগেবোৎক্রান্তেঃ সবিজ্ঞানত্ববাদিশ্রুতেস্তাৎপর্য্যমাহ-তস্মাদিতি। পুরুষস্য কর্মানুসারিত্বং তচ্ছব্দার্থঃ। যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ তন্য ধৰ্ম্মা যমনিয়মপ্রভৃতয়ঃ, তেষামনু- সেবনং পুনঃ পুনরাবর্তনম্। পরিসংখ্যানাভ্যাসো যোগানুষ্ঠানম্। কর্তব্য ইতি প্রকৃতশ্রুতে- বিধেয়োহর্থ ইতি শেষঃ। ৩

ন হি তৎকালে শক্যতে কিঞ্চিৎ সম্পাদয়িতুম্, কৰ্ম্মণা নীয়মানস্য স্বাতন্ত্র্যা- ভাবাৎ; “পুণ্যো বৈ পুণ্যেন কর্মণা ভবতি, পাপঃ পাপেন” ইত্যুক্তম্। এতস্য হি অনর্থস্যোপশমোপায়বিধানায় সর্ব্বশাখোপনিষদঃ প্রবৃত্তাঃ; ন হি তদ্বিহিতো- পায়ানুসেবনং মুক্তা আত্যন্তিকোহস্যানর্থস্যোপশমোপায়োহস্তি। তস্মাদত্রৈবো- পনিষদ্বিহিতোপায়ে যত্নপবৈর্ভবিতব্যমিত্যেষ প্রকরণার্থঃ। ৪

কিঞ্চ পুণ্যোপচয়কর্তব্যতারূপেহর্থে সর্বমেব বিধিকাণ্ডং পর্য্যবসিতমিত্যাহ-সর্ব্বশাস্ত্রাণা- মিতি। সর্বম্মাদাগামিদুশ্চরিতাদুপরমণং কর্তব্যমিত্যস্মিন্নর্থে নিষেধশাস্ত্রমপি পয্যবসিত- মিত্যাহ-দুশ্চরিতাচ্চেতি। ননু পূর্ব্বং যথেষ্টচেষ্টাং কৃত্বা মরণকালে সর্বমেতৎ সংপাদয়িষ্যতে, নেত্যাহ-ন হীতি। কৰ্ম্মণা নীয়মানত্বে মানমাহ-পুণ্য ইতি। তহি পুণ্যোপচয়াদেব যথোক্তা- নর্থনিবৃত্তের্ব্যর্থং তত্ত্বজ্ঞানমিত্যাশঙ্ক্যাহ-এতস্যেতি। উপশমোপায়স্তত্ত্বজ্ঞানং, তস্য বিধানং প্রকাশনং তদর্থমিতি যাবৎ। দেবতাধ্যানাদনর্থো নিবর্তিষ্যতে, কিং তত্ত্বজ্ঞানেনেত্যাশঙ্ক্যাহ- ন হীতি। তদ্বিহিতেতি তচ্ছব্দেন প্রকৃতাঃ সর্বশাখোপনিষদো গৃহ্যন্তে। বিধান্তরেণানর্থ- ধ্বংসাসিদ্ধৌ ফলিতমাহ-তস্মাদিতি। জ্ঞাপিতঃ সবিজ্ঞানবাক্যেনেতি শেষঃ। ৪

শকটবৎ সম্ভূতসম্ভার উৎসর্জন্ যাতীত্যুক্তম্; কিং পুনস্তস্য পরলোকায় প্রবৃত্তস্য পথ্যদনং শাকটিকসম্ভারস্থানীয়ম্, গত্বা বা পরলোকং যদ্ভক্তে, শরীরাদ্যা- রম্ভকং চ যৎ, তৎ কিম্—ইত্যুচ্যতে—তং পরলোকায় গচ্ছন্তম্ আত্মানং বিদ্যা- কর্মণী—বিদ্যা চ কর্ম্ম চ বিদ্যাকর্মণী; বিদ্যা সর্ব্বপ্রকারা—বিহিতা, প্রতিযিদ্ধা চ, অবিহিতা, অপ্রতিযিদ্ধা চ। তথা কৰ্ম্ম—বিহিতম্, প্রতিষিদ্ধঞ্চ, অবিহিতম্, অপ্রতিযিদ্ধঞ্চ, সমন্বারভেতে সম্যক্ অন্বারভেতে অন্বালভেতে অনুগচ্ছতঃ; পূর্ব্ব- প্রজ্ঞা চ—পূর্ব্বানুভূতবিষয়া প্রজ্ঞা পূর্ব্বপ্রজ্ঞা অতীতকর্মফলানুভববাসনেত্যর্থঃ। ৫

বৃত্তমনুদ্য প্রশ্নপূর্ব্বকমুত্তরবাক্যমবতার্য্য ব্যাচষ্টে—শকটবদিত্যাদিনা। বিহিতা বিদ্যা ধ্যানাত্মিকা। প্রতিষিদ্ধা নগ্নস্ত্রীদর্শনাদিরূপা। অবিহিতা ঘটাদিবিধয়া। অপ্রতিষিদ্ধা পথি পতিততৃণাদিবিষয়া। বিহিতং কৰ্ম্ম যাগাদি। প্রতিষিদ্ধং ব্রহ্মহননাদি। অবিহিতং গমনাদি। অপ্রতিষিদ্ধং নেত্রপক্ষবিক্ষেপাদি। ৫

না চ বাসনা। অপূর্ব্বকর্ম্মার্থং কর্ম্মবিপাকে চাঙ্গং ভবতি; যেন অসাধ্যপি

চতুর্থোহধ্যায়ঃ—চতুর্থং ব্রাহ্মণম্।;

১১৩৯

অম্বারভতে; ন হি তয়া বাসনয়া বিনা কৰ্ম্ম কর্ত্তুং ফলঞ্চোপভোক্তুৎ শক্যতে; নহি অনভ্যস্তে বিষয়ে কৌশলমিন্দ্রিয়াণাৎ ভবতি; পূর্ব্বানুভববাসনাপ্রবৃত্তানাৎ তু ইন্দ্রিয়াণাম্ ইহাভ্যাসম্ অন্তরেণ কৌশলম্ উপপদ্যতে। দৃশ্যতে চ কেষাঞ্চিৎ কাসুচিৎ ক্রিয়াসু চিত্রকর্মাদিলক্ষণাসু বিনৈব ইহ অভ্যাসেন, জন্মত এব কৌশ- লম্; কাসুচিদত্যন্তসৌকর্য্যযুক্তাস্বপি অকৌশলং কেষাঞ্চিৎ; তথা বিষয়োপভোগেষু স্বভাবত এব কেষাঞ্চিৎ কৌশলাকৌশলে দৃশ্যেতে। ৬

বিদ্যাকৰ্ম্মণোরুপভোগসাধনত্বপ্রসিদ্ধেরম্বারম্ভেহপি কিমিত্যদ্বারভতে বাসনেত্যাশঙ্ক্যাহ-সা চেতি। অপূর্ব্বকর্মারম্ভাদাবঙ্গং পূর্ববাসনেত্যত্র হেতুমাহ-ন হীতি। উক্তমেব হেতুমুপ- পাদয়তি-ন হীত্যাদিনা। ইন্দ্রিয়াণাং বিষয়েষু কৌশলমনুষ্ঠানে প্রযোজকং, তচ্চ ফলোপভোগে হেতুঃ। ন চান্তরেণাভ্যাসমিন্দ্রিয়াণাং বিষয়েষু কৌশলং সম্ভবতি। তস্মাদনুষ্ঠানাদি অভ্যাসাধীন- মিত্যর্থঃ। তথাপি কথং পূর্ববাসনা কৰ্মানুষ্ঠানাদাবঙ্গমিত্যাশঞ্চ্যাহ-পূর্ব্বানুভবেতি। তত্র লোকানুভবং প্রমাণয়তি-দৃশ্যতে চেতি। চিত্রকর্মাদীত্যাদিশব্দেন প্রাসাদনির্মাণাদি গৃহ্যতে। পূর্ববাসনোদ্ভবকৃতং কার্যমুক্ত। তদভাবকৃতং কার্য্যমাহ-কাসুচিদিতি। রজ্জুনিৰ্ম্মাণাদিধিতি যাবং। তত্রৈবোদাহরণসৌলভ্যমাহ-তথেতি। ৬

তচ্চৈতৎ সর্ব্বং পূর্ব্বপ্রজ্ঞোদ্ভবানুদ্ভবনিমিত্তম্, তেন পূর্ব্বপ্রজ্ঞয়া বিনা কর্মণি বা ফলোপভোগে বা ন কস্যচিৎ প্রবৃত্তিরুপপদ্যতে; তস্মাদেতৎ ত্রয়ং শাকটিক- ‘সম্ভারস্থানীয়ং পরলোকপথ্যদনং বিদ্যা-কর্ম্ম-পূর্ব্বপ্রজ্ঞাখ্যম্। যস্মাদ্বিদ্যাকৰ্ম্মণী পূর্ব্ব- প্রজ্ঞা চ দেহান্তরপ্রতিপত্যুপভোগসাধনম্, তস্মাদ্বিদ্যাকৰ্ম্মাদি শুভমেব সমাচরেৎ, যথা ইষ্টদেহসংভোগোপভোগৌ স্যাতামিতি প্রকরণার্থঃ ॥২৯২৷৷২৷৷

তত্র হেত্বন্তরমাশঙ্ক্য পরিহরতি—তচ্চেতি। কর্ম্মানুষ্ঠানাদৌ পূর্ব্বপ্রজ্ঞায়া হেতুত্বমুপ- সংহরতি—তেনেতি। সমস্বারম্ভবচনার্থং নিগময়তি—তস্মাদিতি। তস্যৈব তাৎপর্য্যার্থমাহ— যস্মাদিতি ॥২৯২॥২॥

ভাষ্যানুবাদ।—[মৃত্যু সময়ে] করণসমূহ(ইন্দ্রিয়নিচয়) স্বীয় লিঙ্গ- দেহের সহিত সম্মিলিত হয়; তখন পার্শ্বস্থ লোকেরা ইহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়া থাকে—‘এখন দেখিতে পাইতেছে না’। এইরূপ ঘ্রাণেন্দ্রিয়ও লিঙ্গদেহে মিলিত হয়; তখন বলিয়া থাকে যে, ‘আঘ্রাণ করিতেছে না’। অন্যান্য কথার অর্থও এতদনুরূপ। জিহ্বার দেবতা হইতেছেন চন্দ্র অথবা বরুণ; তাঁহার নিবৃত্তি হইলে লোকে বলিয়া থাকে যে, ‘রসাস্বাদ করিতেছে না’। সেই সময়েই ইন্দ্রিয়াধি- ষ্ঠাত্রী দেবতাসমূহের নিবৃত্তি ও প্রাণপ্রভৃতি করণসমূহের হৃদয়মধ্যে একীভাব বুঝিতে পারা যায়। চক্ষুঃপ্রভৃতি করণবর্গ হৃদয়মধ্যে সমাহৃত হইলে পর, দেহা- ভ্যন্তরে যে সমস্ত ব্যাপার হইতে থাকে, তাহা বলা হইতেছে—তখন সেই এই

১২০০ বৃহদারণ্যকোপনিষদ্।
(১) তাৎপর্য্য—বুদ্ধি, মন ও চক্ষুঃ প্রভৃতি পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, এবং বাক্ প্রভৃতি পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয়, এই দশপ্রকার করণ অর্থাৎ আত্মার ভোগসাধন ঐ লিঙ্গদেহ মধ্যে অধিষ্ঠিত থাকে।

হৃদয়ের অর্থাৎ হৃদয়স্থিত রন্ধ্রের বা আকাশের অগ্রভাগ-নাড়ীমুখ অর্থাৎ যে স্থান হইতে নাড়ীসমূহ চতুর্দিকে প্রসূত হইয়াছে, আত্মনির্গমনের দ্বারস্বরূপ সেই নাড়ীমুখ-স্বপ্নসময়ে যেরূপ ইন্দ্রিয়শক্তি সমাহরণের ফলে আত্মজ্যোতিঃ দ্বারা উদ্ভাসিত হয়, সেইরূপ স্বীয় আত্মজ্যোতিঃ দ্বারাই উদ্ভাসিত হয়; লিঙ্গ- শরীরোপাধিযুক্ত বিজ্ঞানময় আত্মা সেই প্রদীপ্ত হৃদরাগ্র দ্বারা দেহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হয়। আথর্ব্বণ উপনিষদেও এইরূপ কথা আছে,[-‘প্রাণ জিজ্ঞাসা করিল-] কে উৎক্রমণ করিলে অর্থাৎ দেহত্যাগ করিলে, আমি উৎক্রমণ করিব, এবং কে দেহে প্রতিষ্ঠিত থাকিলে আমি প্রতিষ্ঠিত থাকিব;[এই ব্যবস্থার জন্য] তিনি প্রাণ সৃষ্টি করিলেন’ ইতি। ১

সেই হৃদয়মধ্যেই আত্মচৈতন্য-জ্যোতিঃ সর্ব্বসময়ে সমধিক অভিব্যক্ত থাকে, এবং সেই হৃদয়প্রধান সূক্ষ্মশরীররূপ উপাধির সহিত সম্বন্ধ বশতই আত্মার জন্ম, মরণ, গমন ও আগমন প্রভৃতি বিকারাত্মক সর্ব্বপ্রকার সাংসারিক ব্যবহার হইয়া থাকে; বুদ্ধিপ্রভৃতি দ্বাদশপ্রকার করণ বা ভোগসাধনও তদাত্মক(ঐ লিঙ্গদেহ- ময়)(১); এবং তাহাই সূত্র(সর্ব্বপ্রাণীতে অনুস্যুত), তাহাই জীবন, এবং তাহাই স্থাবর-জঙ্গমাত্মক জগতের অন্তরাত্মা। আত্মা সেই হৃদয়াগ্র-প্রকাশের সাহায্যে নিষ্ক্রান্ত হইবার সময় যে যে পথে নির্গত হয়, এখন তাহা বলা হই- তেছে—আদিত্যলোক-প্রাপ্তির উপযুক্ত জ্ঞান বা কৰ্ম্ম যদি কাহারও থাকে, তাহা হইলে, সে চক্ষু হইতে(ঐ চক্ষুঃপথে নিষ্ক্রান্ত হয়); অথবা যদি কাহারও ব্রহ্মলোক লাভের উপযুক্ত সাধন বিদ্যমান থাকে, তাহা হইলে, মুর্দ্ধস্থান হইতে অর্থাৎ ব্রহ্মরদ্রূপথে নিষ্ক্রান্ত হয়; অথবা মুমুর্ষুর জ্ঞান ও কর্মানুসারে অপরাপর দেহাবয়ব-পথেও[নিষ্ক্রান্ত হয়]। সেই বিজ্ঞানাত্মা জীব যখন উৎক্রমণ করে,— পরলোকের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করে, অর্থাৎ পরলোকে যাইবার নিমিত্ত যখন তাহার অভিলাষ প্রকাশ পায়, তখন, রাজকীয় প্রধান পুরুষের ন্যায়, দৈহিক প্রাণও তাহার সঙ্গে সঙ্গে উৎক্রমণ করে, এবং সেই প্রাণ উৎক্রমণ করিবার সময়ে, বাক্- প্রভৃতি সমস্ত প্রাণই তাহার সঙ্গে সঙ্গে উৎক্রমণ করিয়া থাকে। ২

এখানে যাহা বলা হইল, প্রধানের অনুগমন বা অনুসরণপদ্ধতি জ্ঞাপন করাই তাহার উদ্দেশ্য; কিন্তু দলবদ্ধ ব্যক্তিরা যেরূপ ক্রমশঃ পর পর গমন করিয়া